রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়