জীবজগৎ

স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন?

এক মাইলকে অর্ধেক করুন। আধেক আধেক পেলেন তো? আধেককেও সমান ভাগে অর্ধেক করুন। চতুর্থাংশ পেলেন। এমন করে চলতে দিলাম, যতক্ষণ না একটা পরমাণুর ব্যাসের দৈর্ঘ্য পর্যন্ত পৌঁছানো গেল। কিন্তু, এরপর? আমরা কি অসীম পর্যন্ত এটা চালিয়ে যেতে পারব? নাকি একটা সীমায় গিয়ে থমকে যেতে হবে? প্রশ্নটি হচ্ছে আসলে কতটুকু সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব? আবার তার সীমা আছে কিনা?

2চিত্রঃ কত ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব?

সমকালীন কিছু তত্ত্বের সাফল্য একে ব্যাখ্যার আওতায় ফেলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই ধাঁধাঁটি আড়াই হাজার বছর আগের। গ্রীক দার্শনিক জেনোর বিখ্যাত এক প্যারাডক্স। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী থেকে এ রহস্যজনক ধাঁধাঁটির বিরাজ শুরু। এই কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এর জট খুলতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সমাধানের পর আরেক প্রশ্ন এসে হাজির, ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য কি আছে, যার পর আর ভাগ করা যাবে না? প্যারাডক্সটি সমাধান হয়েও এই আঙুল তোলা প্রশ্নটি সেঁটে আছে। জেনোর প্যারাডক্সটি সংক্ষেপে এমনঃ গ্রীক বীর একিলিস আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা। একিলিস সেরা দৌড়বিদ, আর কচ্ছপ তো কচ্ছপের মতোই।

জেনো বললেন,কচ্ছপকে যদি সামান্য সামনে থেকেও শুরু করতে দেয়া হয় একিলিস কখনো কচ্ছপকে পিছনে ফেলতে পারবে না। বাস্তবিক দৃষ্টিতে,একিলিসের টপকে যাওয়া কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু জেনোর যুক্তি প্রদর্শনের দৃষ্টিকোণই একে দীর্ঘায়ু দান করেছে। জেনো দেখালেন,কচ্ছপ সামনে থাকার কারণে ধীরগতির হলেও একিলিস যখন এসে কচ্ছপকে ধরে ফেলবেন ততক্ষণে কচ্ছপ আরেকটু এগিয়ে যাবে। এভাবে আসলে কচ্ছপটা এগিয়েই থাকছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবধানে।

3 চিত্রঃ জেনোর যুক্তি বলছে,একিলিস কচ্ছপ থেকে দূরত্ব কমাতে থাকবে কিন্তু তারপরেও পিছিয়েই থাকবে।

অবাক করা দিকটি হলো, জেনোর এই প্যারাডক্সের সমাধান করতে দীর্ঘ সময় ধরে গণিতকে উন্নয়ন করতে হয়েছে। এখন আমরা জানি জেনোর যুক্তি স্পষ্টভাবে ভুল ছিল। গণিতবিদেরা অসীম সংখ্যাকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে যোগফল বের করা শিখে যাওয়ার পর এখন ঠিক কোন সময়টাতে একিলিস কচ্ছপকে পার করে ফেলবে তার গণিতও বের করে ফেলেছেন। বর্তমান পর্যায়ে এসে পদার্থবিদেরা ন্যূনতম পরম দৈর্ঘ্য থাকার অস্তিত্ব থাকাকে আরেক তত্ত্বের সহায়ক বলে মনে করছেন। যখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোয়ান্টাম ভার্সনে প্রবেশ করা হয় অসীমের ব্যাপার স্যাপার চলে আসে। এর আদুরে নাম ‘কোয়ান্টাম গ্রাভিটি’।

জেনোর বিশ্বাসের মতো করে ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যকে মেনে নিলে তত্ত্ববিদেরা অসীমতা সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটিকে সসীম সংখ্যায় দেখাতে পারেন। আর সসীম দৈর্ঘ্য পাওয়ার এক উপায় স্থান-কালকে কেটে কুঁচি কুঁচি করে হিসাব করা। মানে একে বিচ্ছিন্নতায় ফেলে দেয়া। এ পর্যায়ে এসে জেনোও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বেন। কারণ,কোয়ান্টাম গ্রাভিটিকে যৎসামান্য দৈর্ঘ্যের ধারণায় আনা গেলেও,বিচ্ছিন্নতা দিয়ে সর্বোপরি এটাকে ধরে রাখা যায় না। মানে স্থান এবং কালকে আলাদা করে তো আর এটা করা সম্ভব না। কোয়ান্টাম গ্রাভিটির কিছু তত্ত্ব বলে,ন্যূনতম দৈর্ঘ্যের কথা আসে রেজুলেশন লিমিট থেকে,যেখানে রেজুলেশন লিমিট বিচ্ছিন্নতার ধার ধারে না।

মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোনো নমুনা পর্যবেক্ষণ করার কথা কল্পনা করা যাক। বিবর্ধন করতে করতে মাইক্রোস্কোপের রেজুলেশন লিমিট অতিক্রম করে ফেললে ছবিটি ঘোলা হয়ে যাবে। এটা যদি ডিজিটাল ফটোর মতো জুম করা হয়,আমরা দেখতে পাব আলাদা আলাদা একেকটা পিক্সেল। কিন্তু আরো জুম করলেও সেই পিক্সেলের থেকে নতুন কোনো তথ্য আমরা পাব না। উভয় ক্ষেত্রেই রেজুলেশনের একটা বাধাধরা ব্যাপার বা সীমা আছে।

স্ট্রিং থিওরিতে স্ট্রিং এর সম্প্রসারণ সীমাবদ্ধ বলে বিশ্লেষণ করা হয়। একারণে নয় যে,সব বস্তুই চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এখানে লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি নামে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের কথা এসে যায়, যেখানে বলা হচ্ছে স্থান ও কাল পৃথক পৃথক ব্লকে বিচ্ছিন্ন। প্ল্যাংকের ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যের (১০–৩৫ মিটার) তথ্যটিও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আইনস্টাইন বলেছেন স্থান এবং কাল হচ্ছে যুগ্ম-একক সত্তা, একে বলে ‘স্থান-কাল’। অধিকাংশ পদার্থবিদই আইনস্টাইনের এ দৃষ্টিভঙ্গীকে মেনে নেন। তাই বেশিরভাগ প্রস্তাবনা বা অগ্রসরতাই কোয়ান্টাম গ্রাভিটির স্থান এবং কালকে হয় অবিচ্ছিন্ন না হয় উভয়কেই বিচ্ছিন্ন হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু কিছু ভিন্ন মতাবলম্বী কেবল স্থান বা কেবল কালকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে ধরার পক্ষে।

কেমন করে পদার্থবিদেরা ঠিক করবেন,স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন? বিচ্ছিন্ন গঠন এত ক্ষুদ্র যে, পরিমাপ করা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু কিছু মডেল অনুযায়ী বিচ্ছিন্নতা কণাসমূহ কীভাবে স্থান দিয়ে চলে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রভাব,কিন্তু কণাদের যোগফল অনেক বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করায়। এটা যদি সত্য হয় তবে দূর নাক্ষত্রিক বস্তু থেকে পাওয়া ছবি আমাদের ভুল তথ্য দিতে পারে। ছবির ওপর ছবি উপরিপাতিত বা ছবি বিচ্ছিন্ন হয়ে আসতে পারে। বিভিন্ন সময়ে নির্গত কণা একই সময়ে পৃথিবীতে আসায় অথবা একই সময়ে নির্গত হওয়া কণার বিভিন্ন সময়ে গন্তব্যে আসায় এমন হতে পারে। জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানীরা দুই ধরনের সিগনালের জন্যই অনুসন্ধান চালিয়েছেন,কিন্তু সেই সোনার হরিণরূপী সিগনালের কোনো নজির খুঁজে পাননি। তাই সিদ্ধান্তও নেয়া যায়নি।

এমনকি যদি কণাদের গতির ওপর সরাসরি প্রভাব অপরিমাপযোগ্য হয়, বিচ্ছিন্ন স্ট্রাকচারে ত্রুটি ধরে ফেলা যাবে। একটি হীরক খণ্ড কল্পনা করা যাক। হীরক খণ্ডে আণবিক স্ফটিকে সামান্যতম ভেজাল থাকলে স্ফটিকের নির্দিষ্ট পথে আলো পরিবহনই নষ্ট হয়ে যায়। এটা হীরকের স্বচ্ছতা ধ্বংস করে। যদি আপনি অলংকারের দোকান থেকে হীরের দাম থেকে কিছু বুঝতে চান সেটা হল হীরেটা কতটা নিখুঁত তার হার! স্থান-কালের ব্যাপারটাও তেমন, যদি বিচ্ছিন্ন হয় তবে ত্রুটি থাকবে, সেই ত্রুটি আলোর পরিবহনে বাধা দিবে।

স্থান-কালের বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ খোঁজা ভবিষ্যতের আধুনিক প্যারাডক্স হতে যাচ্ছে। ব্ল্যাক হোলের তথ্য হারানোর সমস্যা তার মধ্যে একটি। স্টিফেন হকিং যেটা ১৯৭৪ সালে বিবৃত করেছেন। আশা করি জেনোর অসন্তোষজনক প্যারাডক্স এর মত স্থান-কালের প্যারাডক্স সমাধান করতে আমাদের ২০০০ বছর লাগবে না!

তথ্যসূত্রঃ

http://www.pbs.org/wgbh/nova/blogs/physics/2015/10/are-space-and-time-discrete-or-continuous/

 

শাহরিয়ার কবির পাভেল
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি

স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন?
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top