প্ল্যাস্টিক খাওয়া ব্যাকটেরিয়ার গল্প

বর্তমান সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হয় যার বিশাল একটি অংশ ব্যবহৃত হয় প্যাকেজিং শিল্পে। এদের মধ্যে মাত্র ১৪% পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয় আর বাকিটা থেকে যায় পরিবেশে। প্লাস্টিক পঁচনশীল নয় বলে এদের অস্তিত্ব অন্যান্য অস্তিত্বকে ফেলে দেয় ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে সামুদ্রিক দূষণের অন্যতম হোতা হচ্ছে প্লাস্টিক। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বর্তমানে পঁচনশীল প্লাস্টিক তৈরির জন্য যে গবেষণা চলছে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আশা দিতে সক্ষম হলেও আশু সমাধান এর থেকে সম্ভব নয়।

তাহলে উপায়? একটা সময় মানুষেরা ছিল পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণ প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতো। কালের পরিক্রমায় আমরা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা শিখলাম। সেই ব্যবহার এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সে যাই হোক, প্লাস্টিক আমাদের জীবনযাত্রা সহজ করে থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নিঃসন্দেহে পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে ৭০ বছর ধরে। এই সমস্যা সমাধানের আভাস যখন প্রকৃতির মাঝেই পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন আশাবাদী মন ভাবতেই পারে, সেরা জীব হিসেবে মানুষের স্পর্ধা অহংকারের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলেও, প্রকৃতি হয়তো এখনো আমাদের ভালোবাসে।

জাপানের বিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন প্লাস্টিকভুক এক ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির। এই ব্যাকটেরিয়া পলিথাইলিন টেরেফথ্যালেট (Polyethylene Terephthalate) সংক্ষেপে PET কে ভাঙ্গতে সক্ষম। এই পি.ই.টি. দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন পানীয় কিংবা খাবারের বোতল তৈরি হয়। বিশ্বের প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ পি.ই.টি। প্রাকৃতিকভাবে এই প্লাস্টিকের ক্ষয় হতে ৫ থেকে ১০ বছর লাগলেও নতুন আবিষ্কৃত ব্যাকটেরিয়াটি এর পাতলা ফিল্মকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙ্গে নিয়ে যায় এর কার্বন উৎসে। এই আবিষ্কার ক্ষতিকারক প্লাস্টিক থেকে আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়র হতে পারে।

চিত্রঃ মাইক্রোস্কোপের নিচে Ideonella sakaiensis

এতদিন পর্যন্ত আমরা জানতাম পি.ই.টি এর জৈববিভাজন (Bio-degradation) সম্ভব নয়। কিন্ত একেও বিভাজিত করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব স্বয়ং আবিষ্কারকদেরকেও বিস্মিত করেছে। এমনটাই জানিয়েছেন জাপানের কিয়োটো ইন্সটিউট অব টেকনোলজির অণুজীববিজ্ঞানী কোহেই ওদা। নতুন আবিষ্কৃত প্লাস্টিকভুক ব্যাকটেরিয়ার নাম Ideonella sakaiensis। যেহেতু বিভিন্ন জটিল অণুকে ডিগ্রেড করার যুদ্ধে বিভিন্ন অণুজীব সবসময়ই থাকে একেবারে সামনের সারিতে, তাই এই আবিষ্কার কোনো দূর্ঘটনা নয়। প্রকৃতিতে বিভিন্ন অণুজীব বিভিন্ন জটিল অণুকে সরল অণুতে পরিণত করার এনজাইম নিঃসরণ করে থাকে। কিন্তু অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকে একেবারেই পাত্তা না দেয়া PET এর রাসায়নিক বন্ধনগুলোকে ভাঙ্গতে পারছে বলেই আইডিওনেলা ব্যাকটেরিয়াটি এতটা অনন্য।

আইডিওনেলাকে পাবার জন্য জাপানের ওসাকা শহরের প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের পলি, মাটি, বর্জ্যপানি এবং কাঁদা থেকে ২৫০ ধরনের প্লাস্টিকের ভগ্নাবশেষ সংগ্রহ করা হয়। এদের মধ্যে থেকে যাচাই বাছাই শেষে একটিতে পাওয়া গিয়েছে এই আনকোরা অণুজীবটি। এটি শুধুমাত্র প্লাস্টিককে তার একমাত্র পুষ্টির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে টিকে থাকছে। ব্যাপারটা দুই ধাপে ঘটে। প্রথমে এরা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি এনজাইম PETase নিঃসরণ করে। এই এনজাইম পি.ই.টি প্লাস্টিককে বিভাজত করে তৈরি করে Mono Hydroxyethyl Terephthalic Acid (MHET)। MHET কে ব্যাকটেরিয়াটি নিজের দেহে শোষণ করে নেয়। সেখানে MHET hydrolase এর মাধ্যমে ইথিলিন গ্লাইকল এবং টেরেফথ্যালিক এসিড তৈরি হয়। মজার বিষয় হলো, টেরেফথ্যালিক এসিডকে পি.ই.টি প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদি এই ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে প্লাস্টিক থেকে টেরেফথ্যালিক এসিড সংগ্রহ করা যায় তাহলে এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল-ভিত্তিক কাঁচামাল বাঁচানো সম্ভব।

চিত্রঃ আইডিওনেলার প্লাস্টিক ভোজন প্রক্রিয়া।

যেহেতু এখনো এর জৈববিভাজন ক্ষমতা খুবই ধীর, তাই ব্যবহারিক পর্যায়ে যেতে আরো সময় লাগবে। এমন হতে পারে যে আইডিওনেলাকে আরো শক্তিশালী করা হলো, কিংবা এর যে জিনগুলোর দ্বারা PETase এবং MHET hydrolase তৈরি হচ্ছে সেসব সংগ্রহ করে অন্য আরেকটি ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডের মাঝে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ঢুকিয়ে বিপুল পরিমাণে এই এনজাইমগুলো তৈরি করা হলো। তবে তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

পি.ই.টি প্লাস্টিক প্রকৃতিতে আছে মাত্র ৭০ বছর। এই সময়ের কোনো পর্যায়ে আইডিওনেলা গণের ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হলো কিংবা যদি এরা আগে থেকেও থেকে থাকে কীভাবে এই প্লাস্টিকে এদের রুচি তৈরি হলো সেটাও কিন্তু ভাবার বিষয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রকৃতিতে হয়তো অন্যান্য প্লাস্টিকের জৈববিভাজনে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াও ইতোমধ্যে আবির্ভুত হয়ে গেছে। আমাদের শুধু সঠিক উপায়ে, সঠিক জায়গায় খুঁজে দেখতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

Feeding on plastic a bacterium completely degrades poly (ethylene terephthalate) by Uwe T. Bornscheuer, Science magazine, 11th March, 2016

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *