মিলনের স্বকীয়তায় প্রজাপতি

শহুরে মানুষের কাছে একটুখানি সবুজ অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। যার কারণে সময় পেলেই শহরের ইট-পাথরের দেয়াল ছেড়ে কোথাও বেড়িয়ে পড়ি। কোথাও ঘুরতে গেলে প্রকৃতির রঙবেরঙের পতঙ্গের মাঝে সবচে বেশি যে পতঙ্গটির দেখা মেলে তা হচ্ছে প্রজাপতি। নানা বর্ণে সজ্জিত হবার কারণে এরা যে কারো মনোযোগ মুহুর্তেই কেড়ে নিতে সক্ষম। কোথাও বাগান থাকলে তো এদের দেখা মেলেই তার উপর মাঝে মাঝে শহরের যানজটপূর্ণ পরিবেশেও এদের উড়ে চলতে দেখা যায়।

Pale Grass Blue (Pseudozizeeria maha)

প্রজাপতির জীবনচক্রে চারটি দশা থাকে- ডিম, শূককীট, মূককীট ও পরিণত প্রজাপতি। আমরা সাধারণত যেটা দেখি তা হচ্ছে পরিণত প্রজাপতি। সর্বসাকুল্যে এদের গড় আয়ু মাত্র দেড় মাস। না ভূল পড়েননি, ডিম থেকে শুরু করে পরিণত অবস্থাতে আসার পরে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এরা মাত্র দেড় মাস বাঁচে। এই স্বল্প জীবনের মাঝেই খাবার সংগ্রহ, মধু সংগ্রহ, প্রজনন, ডিম পাড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ চলতে থাকে।
যাই হোক, মূল বিষয়ে আসা যাক। আজ এখানে প্রজাপতির প্রজনন নিয়ে আলোচনা করব।

প্রজনন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো প্রজাতি তার বংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। যেকোনো প্রাণী অপেক্ষা বিভিন্ন পতঙ্গ তথা প্রজাপতি এমন কিছু বৈশিষ্টের অবতারণা করে যা তাদেরকে অন্য এক ধরনের স্বকীয়তা দিয়েছে।

অন্যান্য প্রাণীদের মতো পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি মিলনে অংশ নিয়ে থাকে। একটা প্রজাপতির লার্ভার কাজ যেমন শুধু খাবার গ্রহণ করা ঠিক তেমনি পরিণত প্রজাপতির কাজ বলতে বিপরীত লিঙ্গের সদস্যের সাথে মিলনে অংশ নেয়া। মিলনের পূর্বে স্ত্রী প্রজাপতি এক ধরনের ফেরোমন নিঃসৃত করে যা সেক্স ফেরোমন নামে পরিচিত। জেনে রাখা ভালো যে, ফেরোমন হচ্ছে এমন এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন প্রাণী সংবাদ আদান-প্রদানে ব্যবহার করে থাকে।

Common Rose (Pachliopta aristolochiae)

স্ত্রী প্রজাপতি কর্তৃক নিঃসৃত এই ফেরোমনের গন্ধ পুরুষ প্রজাপতিগুলো মুহুর্তের মধ্যেই পেয়ে যায় এবং অনেক দূরে থাকলেও গন্ধ পেলে ঠিকই ঐ পুরুষ প্রজাপতি মিলনের জন্য স্ত্রী প্রজাপতির কাছে চলে আসবে। স্ত্রী প্রজাপতির কাছে আসার পরে পুরুষ প্রজাপতি নানান ধরনের অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করবে, যদি স্ত্রী প্রজাপতি মনে করে যে, ঐ পুরুষটি তার জন্য যথার্থ তাহলেই সে মিলনে অংশ নিবে, অন্যথায় নয়।

Common Mormon

মিলনের আগে পুরুষ প্রজাপতিটিকে অনেকভাবে পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। কোনো কোনো সময় স্ত্রী প্রজাপতিটি একস্থানে বসে থাকে এবং পুরুষ প্রজাপতিটি শূন্যে একস্থানে স্থির থেকে পাখা নাড়তে থাকে। স্ত্রী প্রজাপতিটি রাজী না হওয়া পর্যন্ত এরা এরকম করতে থাকে। এছাড়াও দেখা যায়, পুরুষ প্রজাপতিটি স্ত্রী প্রজাপতির চারপাশে উড়ছে কিংবা একই তালে উড়ে চলেছে।

মিলনের আগে স্ত্রী প্রজাপতিটির ফেরোমন নিঃসরণ থেকে শুরু করে মিলন পর্যন্ত সময়কালকে ‘কোর্টশিপ’ বলা হয়। অনেকেই হয়তো মনে করছেন, মিলনের পূর্বে এতো পরীক্ষা নেবার কী আছে? কিন্তু এটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা একটু পরেই বুঝতে পারবেন।

পরিণত অবস্থায় রূপান্তরের পর এরা মাত্র দু’সপ্তাহ বেঁচে থাকে যার কারণে এমনভাবে এদের সময় পার করতে হয় যাতে করে একটুও সময় নষ্ট না করে অধিক পরিমাণ বংশধর তৈরি করতে পারে। আর প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য অবশ্যই যোগ্য শুক্রাণু দরকার, যোগ্য শুক্রাণু না হলে বাচ্চার সুস্থ থাকার ব্যাপারটা নিশ্চিত হয় না। যার কারণে এতো কিছু।

মিলনের পরে এরা একস্থানে অনেকটা সময় বসে থাকে। জেনিটালিয়া একসাথে লাগিয়ে রেখে এরা প্রজনন পদার্থ আদান-প্রদান করতে থাকে। পুরুষ প্রজাপতিগুলো তাদের ক্লাস্পারের সাহায্যে স্ত্রী প্রজাপতিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। অনেক সময় ঘন্টার পর ঘন্টা মিলন-পর্ব চলতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে এরা বিরক্ত হলে কিংবা কোনো ক্ষতির আভাস পেলে স্থান পরিবর্তন করে। বিরক্তের মাত্রা খুব বেশি হলে জেনিটালিয়া আলাদা হয়ে যায় অর্থাৎ মিলন শেষ না হবার আগেই পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি আলাদা হয়ে যায়।

Common Grass Yellow (Eurema hecabe)

অনেক সময় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেমন, পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতির মিলনের সময়ে এদের মাঝে আরেকটি পুরুষ প্রজাপতি এসে তার জেনিটালিয়া ঐ স্ত্রী প্রজাপতির জেনিটালিয়ার সাথে স্থাপন করতে যায় কিংবা ঐ মেটিংরত যুগলের চারপাশে ঘুরতে থাকে। ফেরোমন নিঃসরণের কারণেই এমনটা ঘটে।
আবার অনেকসময় জোরপূর্বক কোনো পুরুষ প্রজাপতি মূককীট থেকে সদ্য বের হওয়া প্রজাপতির সাথে মিলনে অংশ নেয়। এই ঘটনা ‘পিউপাল মেটিং’ নামে পরিচিত।

মিলন সমাপ্ত হলে স্ত্রী প্রজাপতি ডিম পাড়ার জন্য লার্ভার জন্য ফুড প্লান্ট খুঁজতে থাকে এবং তার লার্ভা যে গাছের পাতা খেয়ে বাঁচতে পারবে সে গাছেই সে ডিম পাড়ে। এভাবেই প্রজাপতির জীবনের চক্র চলতে থাকে।
বিঃ দ্রঃ এই লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলোর আলোকচিত্রী লেখক নিজে।‏

featured image: gardensdecor.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *