অতীত জলবায়ু পুনর্গঠন

পৃথিবী অত্যন্ত জটিল একটা সিস্টেম। এই সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন জলবায়ুর সমস্যার কথা আসে তখন তো প্রত্যেকটা অংশ বারবার পরীক্ষা করে দেখতে হয় যে আসলে কোথায় গণ্ডগোল। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন কয়েকটি জিনিসের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে। সেগুলো হচ্ছে, বায়ুমণ্ডল, পানিমণ্ডল, পৃথিবীর কাঠিন্যতা, জীবমণ্ডল এবং Cryosphere।

শেষেরটা অনেকের কাছে অপরিচিত লাগতে পারে। Cryosphere হচ্ছে তুষার, গ্লেসিয়ার, বরফ ভূমি ইত্যাদির সন্নিবেশ। এই ৫ টি অংশের মধ্যে শক্তি এবং আর্দ্রতার বিনিময় ঘটে। আর এই কয়েকটা পরিমণ্ডল নিয়ে গঠিত পৃথিবীর জলবায়ু সিস্টেম।

কীভাবে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন বুঝতে পারব? কেন এই পরিবর্তন? পৃথিবীর জলবায়ুর আগের অবস্থা কেমন ছিল? ভবিষ্যৎ অবস্থা কীভাবে আমরা অনুমান করতে পারি এমন সব প্রশ্ন চলে আসে। বিজ্ঞানীরা প্রথমেই পৃথিবীর বর্তমান সময়ের আগের সময়কার জলবায়ু অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেন। আগের জলবায়ুর উপাত্ত যদি কোনোভাবে বের করা যায় তাহলে জলবায়ু সিস্টেমের বিভিন্ন অংশ বুঝতে অসুবিধা হবে না।

আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গত কয়েক শতকের উপাত্ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ফলপ্রসূ বা ফলাফল এতে পাওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে উপাত্ত (data) যত বেশি হবে ফলাফল তত বেশি নিখুঁত হবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা কিছু Proxy Data-র উপর নির্ভর করেন।

এইসব উপাত্ত আসে সমুদ্রের নিচের মাটিতে থাকা পলিমাটি থেকে। কিছু আসে দুই মেরু অথবা অন্য কোথাও জমাটবাধা বরফ (হিমবাহ), ফসিল রেনু ইত্যাদি থেকে। কিছু আমরা বুঝতে পারি গাছের বর্ষবলয় থেকে। এই ধরনের বিষয়গুলো যেখানে আলোচিত হয় তাকে বলে Paleoclimatology।

চিত্রঃ Bristlecone pine গাছ

আসলে একেকটা রেখা পূর্ণ হতে একটা পুরো বছর লাগে। তাই রেখা গুলো যদি আমরা গুনে যেতে থাকি তাহলে আমরা ওই গাছের বয়স জানতে পারব। পাশাপাশি ঐ সময়কার জলবায়ু সম্পর্কেও ধারণা নিতে পারবো।Bristlecone pine নামের গাছগুলো প্রায় ৪০০০ বছরের পুরনো। বিজ্ঞানীরা এই গাছের বর্ষবলয় বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর আগেকার জলবায়ু অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। একটা গাছের কাণ্ড কেটে এর তল বরাবর পর্যবেক্ষণ করলে অনেকগুলো গোল রেখা দেখতে পাওয়া যায়। রেখাগুলো ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়।

উল্লেখ্য বর্ষবলয় শুধু spring wood- এর মাঝেই দেখা যায়। যদি গাছের রিং প্রশস্ত হয় তাহলে বুঝতে হবে তখনকার জলবায়ু অনুকূলে ছিল, কিন্তু যদি গাছের রিং যদি সরু হয় তাহলে ধ্রে নিতে হবে জলবায়ু প্রতিকূলে ছিল। গাছের এই বলয়গুলো বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। তাই ঐ সময়কার আবহাওয়া সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। যে শাখায় এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে Dendrochronology বলে।

চিত্রঃ Bristlecone pine গাছের বর্ষবলয় (annual ring)।

সমুদ্রের নিচের মাটিতে থাকা পলল গুলো জলবায়ু সংক্রান্ত উপাত্ত সংগ্রহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব পললে বিভিন্ন organism থাকে যেগুলো সমুদ্র তলদেশের মাটির খুব কাছাকাছি থাকে। যখন organism-গুলো মারা যায় তখন এদের দেহের চারপাশে এক ধরনের খোলসের মতো আবরণ তৈরি হয় যা মাটিতে তলানি হিসেবে জমা হয়। এগুলোকে sedimentary record হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

এই organism-গুলো সমুদ্রের তাপমাত্রা, পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এদের সংখ্যা, এদের কার্যকলাপ জলবায়ুর পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। বরফ যুগের সময়কার তাপমাত্রা এবং আবহাওয়ার তারতম্য এখান থেকেই বার করা হয়েছে। অনেক গুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে CLIMAP (Climate: long range investigation mapping and prediction) নামের একটা প্রজেক্ট করে যেখানে এইসব sediment সংগ্রহ করে অতীত জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা হয়।

আগেকার দিনের জলবায়ু সম্পর্কে জানার জন্য অক্সিজেন আইসোটোপ হচ্ছে আরেকটি উপায়। বিশেষ করে গ্লেসিয়ারগুলো থেকে এই পদ্ধতিতে আমরা পরিবর্তন অনুমান করতে পারি। অক্সিজেন-১৬ এবং অক্সিজেন-১৮ এই দুই ধরনের আইসোটোপই H2O গঠন করতে পারে। এর মধ্যে অক্সিজেন-১৬ হচ্ছে হালকা এবং সমুদ্রের পানি থেকে বাষ্পীভূত হয়ে পারে। এজন্য সাগরে ভাসমান বরফগুলতে এই আইসোটোপ বেশি পাওয়া যায়। অপরদিকে অক্সিজেন-১৮ ভারী। এটা সমুদ্রে থেকে যায়। এজন্য শীতকালে বেশিরভাগ অক্সিজেন-১৬ বরফে আবদ্ধ থেকে যায়। কিন্তু যখনই গরমকাল চলে আসে তখন বরফ গলে যায়। অক্সিজেন ১৬ সমুদ্রে চলে আসে। অক্সিজেন-১৬ এবং ১৮ এর অনুপাতের তারতম্য ঘটে।

কথা হচ্ছে এখান থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের আমরা কী বুঝবো? যদি আমাদের কাছে আগের অক্সিজেন-১৮ বা অক্সিজেন-১৬ এর অনুপাতের data থাকত তাহলে আমরা বলতে পারতাম কখন glacier যুগ ছিল, জলবায়ুর অবস্থা কখন কেমন হতো এইসব।

মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের কাছে এসবের উপাত্ত আছে। ঐ যে আগে বলেছিলাম, সমুদ্রের তলদেশের পলিমাটি ও সেখানকার organism-গুলোর মৃতদেহের উপরে যে শক্ত আবরণ থাকে ওখান থেকে আমরা এই দুটি অক্সিজেন আইসোটোপের অনুপাতের তারতম্য বুঝতে পারি।

এই অনুপাত তাপমাত্রার সাথেও পরিবর্তিত হয়। যদি অক্সিজেন-১৬ বেশি বাষ্পীভূত হয় এবং অক্সিজেন-১৮ যদি বেশি পরিমাণে সাগরে থেকে যায় তাহলে বুঝতে হবে ঐ সময় গরম ছিল। আবার ঠাণ্ডা হলে ঠিক এর বিপরীতটা ঘটবে। বিজ্ঞানীরা এখন বরফের বিভিন্ন স্তর নিয়ে গবেষণা করছেন যেন করে আগেকার কয়েক হাজার বছরের তাপমাত্রার একটা উপাত্ত তৈরি করতে পারেন।

চিত্রঃ গত ৪০,০০০ বছরের তাপমাত্রার পরিবর্তন।

উদ্ভিদের ফসিল রেণু বা স্পোর থেকে আমরা অনেক আগেকার গাছপালার বর্ধন, vegetation অবস্থা বের করতে পারি। যদি কোনো sediment-এ কোনো ছোট উদ্ভিদ পাওয়া যায় এবং ঐ sediment এর বয়স ঠিকভাবে বের করা হয় তাহলে অনেক ভালো মানের উপাত্ত আমরা পেতে পারি। প্রকৃতিতে রেণু বা স্পোর প্রচুর পরিমাণে থাকে এবং খুব সহজে শনাক্ত করা যায়। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে আমরা রেণুগুলোর পৃষ্ঠের আকার-আকৃতি, তাপমাত্রার সাথে পরিবর্তন ইত্যাদি তথ্য থেকে এতোদিন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হলো তা সম্পর্কে জানতে পারি।

একবার নিউ ইংল্যান্ডে পলিমাটি থেকে তুন্দ্রা গাছের ফসিল রেণু পাওয়া যায়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটা প্রায় ১২ হাজার বছর আগের এবং ঐ স্থানের তাপমাত্রা ১২ হাজার বছর আগে এখনকার তাপমাত্রা থেকে অনেক ঠাণ্ডা ছিল।

এতটুকুই ছিল আজকের পর্বের জন্য। যদি ভালো লাগে তো এরপর জলবায়ুর উপর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ইত্যাদির প্রভাব, ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করবো।

featured image: progressivereform.org

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *