ডি ক্যাপ্রিওর অস্কার বক্তৃতা ও জিকা ভাইরাসের উত্থান

গত কয়েক বছর যাবত মার্কিন অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কার না পাওয়া নিয়ে অনলাইনে একটি কৌতুক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হলিউডের এ অভিনেতা টাইটানিক (১৯৯৭) থেকে শুরু করে অনেকগুলো চলচিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন। গত পাঁচ-দশ বছর ধরে সবাই আশা করছিলেন তিনি অভিনয়ের জন্য অস্কার পাবেন। কয়েকবার একাডেমি এওয়ার্ডে অস্কারের জন্য মনোনীতও হয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিবছরই সবার আশাভঙ্গ হচ্ছিলো। কৌতুকটা হলো, এখন থেকে ত্রিশ বছর পর লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কার-না-পাওয়া কর্মবহুল জীবন নিয়ে তৈরি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ভবিষ্যতের কোনো প্রতিভাবান অভিনেতা অস্কার পেয়ে যেতে পারেন।

সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো ২০১৬ সালের একাডেমী এওয়ার্ডে, যেখানে ডিক্যাপ্রিও দ্যা রেভেন্যান্ট (২০১৫) চলচিত্রটির জন্য অস্কার পুরস্কার পান। সকলেই আগ্রহী ছিলেন এ অভিনেতা অস্কার ভাষণে কী বলেন। তবে ডিক্যাপ্রিও অস্কারের মঞ্চটিকে ব্যবহার করেন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার জন্য।

ডিক্যাপ্রিও বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন বাস্তব; এটা এখনই ঘটছে। আমাদের সমস্ত প্রজাতি গুরুতর এই ঝুঁকির সম্মুখীন; আমাদের একসাথে কাজ করা দরকার এবং দীর্ঘসূত্রীতা থামানো দরকার।

অনেকেই অবাক হয়েছে ডিক্যাপ্রিওর মতো বিশ্বমানের অভিনেতা পরিবেশের ভূমিকাটা বড় করে দেখাতে। তবে জলবায়ুর পরিবর্তনের গুরুত্ব আসলেই অনেক। ডিক্যাপ্রিওর অস্কার পুরস্কারের মতো ২০১৬ সালে গুরুত্ববহ একটি ঘটনা হলো জিকা ভাইরাস কর্তৃক নতুন একটি রোগের বিশ্ববিস্তার। জিকা ভাইরাসকে হঠাৎ আবির্ভূত মশাবাহিত রোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই ভাইরাসের বিশ্ববিস্তার আসলে পরিবর্তিত জলবায়ুরই একটি পরিণাম।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও

তবে এটাই শেষ নয়। প্রতিবছর বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সমান তালে এখন মশাদের ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে দূরেও পাওয়া যাচ্ছে। মিশরীয় এডিস মশা (Aedes aegypti) সাধারণত এমন জায়গায় থাকতে পারে না যেখানে শীতে তাপমাত্রা দশ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে চলে যায়। মশারা এতো শীত সহ্য করতে পারে না। কিন্তু এখন অনেক উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা উষ্ণশীতকালের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রকারান্তরে মিশরীয় এডিস মশা তাদের গন্ডী বাড়াচ্ছে সহজেই।

জিকার মতো মশাবাহিত অনেক রোগই এডিস মশার দুইটি প্রজাতির মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন Aedes aegyptiAedes albopictus। এ দুটি প্রজাতির উৎপত্তি আফ্রিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায়। এদেরকে এখন ভূগোলকের ক্রান্তীয় ও গ্রীষ্ম-মন্ডলীয় এলাকা পাওয়া যায়। এরা নিশ্চয়ই নিজেদের পাখায় উড়তে উড়তে মহাসাগর পেরিয়ে অন্য মহাদেশে স্থানান্তরিত হয়নি। বরং অতীতের দাস ব্যবসা ও বর্তমানের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এদের বিশ্বভ্রমণে সাহায্য করেছে।

চিত্রঃ পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে মিশরীয় এডিস মশার বিস্তার।

জিকা ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে উগান্ডার জিকা বনের নামানুসারে। অর্ধশত বছরেরও আগে থেকে গবেষকরা জিকা বনে আসেন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে- মশাবাহিত ভাইরাস নিয়ে গবেষণার জন্য। জিকা বনে এ গবেষণার শুরু মূলত পীতজ্বর (ইয়েলো ফিভার) ভাইরাসের অনুসন্ধানের জন্য। এটি এমন একটি বন যেখানে প্রায় প্রতি বছরই গড়ে একটি করে নতুন ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে গবেষকরা বুঝতে পারেন যে একেক ধরনের মশকী একেক উচ্চতায় সক্রিয় থাকে। তাই তাঁরা পীতজ্বর গবেষণার জন্য জঙ্গলের মাঝে এক সুউচ্চ লৌহ-টাওয়ার তৈরি করেন।

১৯৪৭ সালের এপ্রিলে আলেক্সান্ডার হ্যাডো ও জর্জ ডিক সেই টাওয়ারে সংরক্ষিত একটি রেসাস বানরে মৃদু জ্বরের লক্ষণ দেখতে পান। সেই বানর থেকে পরবর্তীতে একটি নতুন ভাইরাস সনাক্ত করা হয়, যার নাম দেয়া হয় ‘জিকা ভাইরাস’।

প্রথম সনাক্তকণের সময় ভাইরাসটি কেবল বানরদের সংক্রমিত করতে পারতো; অন্তত তথ্যপ্রমাণ তা-ই বলে। এমনকি পরবর্তী কয়েক দশকে যখন কয়েক ডজন রোগীর মধ্যে জিকা ভাইরাস পাওয়া যায়, তখনো রোগের লক্ষণ খুব মৃদু ছিল। উগান্ডাতে কখনোই জিকা ভাইরাস হুমকি সরূপ হয়ে দেখা দেয়নি। তাহলে পরবর্তী সময়ে এমন কী হলো যে জিকা ভাইরাস এতো ভয়াবহ রোগের কারণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়লো? এ প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর পেতে গবেষকদের আরো সময় লাগবে।

যখনই পৃথিবী কোনো গুরুতর জলবায়ু পরিবর্তনের (মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক) মধ্য দিয়ে গিয়েছে তখন একটি বৈশ্বিক-প্রপঞ্চ ঘটেছে। ঐ সময়ে বিভিন্ন প্রাণী তার নিজস্ব জীবাণু সাথে করে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। ফলে সেসব জীবাণু এমনসব প্রজাতীর সংস্পর্শে এসেছে যাদের ঐ জীবাণুর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে সবাই হঠাৎ অঘটন বলে ভাবছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি অনুরূপ কয়েকটি ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ।

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ওয়েস্ট নীল ভাইরাসও কিন্তু জিকা ভাইরাসের সমসাময়িক। ১৯৩৭ সালে উগান্ডার একটি হাসপাতালে রহস্যময় জ্বরে আক্রান্ত এক রোগী থেকে ওয়েস্ট নীল ভাইরাস সনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা। পরবর্তী কয়েক দশকে এই ভাইরাসটি পশ্চিম এশিয়া, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াতে রোগ ছড়ায়। ১৯৯৯ সালে এই ভাইরাসটির দেখা পাওয়া যায় আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। ওয়েস্ট নীল ভাইরাসটি তিনটি ভিন্ন পোষকের মধ্যে আবর্তিত হতে পারে- মশা, পাখি ও মানুষ।

ওয়েস্ট নীল ভাইরাস

এক গবেষণায় দেখা যায় আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে ওয়েস্ট নীল ভাইরাসের দ্বারা জ্বরের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। ভারী বৃষ্টিপাত, উচ্চ আর্দ্রতা ও উষ্ণ তাপমাত্রা মশার বংশবিস্তারে গতি যোগায় ও তাদের প্রজনন কালকে দীর্ঘায়িত করে। সাথে সাথে মশার ভেতরে ভাইরাসের বৃদ্ধি বাড়িয়ে দেয় এমন আবহাওয়া। দুঃখজনক বিষয় হলো, অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এরকম স্যাঁতস্যাঁতে উষ্ণ, গুমোট বর্ষণের আবহাওয়া আরো ঘনঘন দেখা দেবে। কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য তাপখেকো গ্যাস বায়ুমন্ডলে বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরো দ্রুততর হতে থাকবে। ফলে মশাদের জন্য আবহাওয়া আরো আরামদায়ক হতে থাকবে, সাথে সাথে বাড়বে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ।

বর্ধনশীল তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তিত ধরণ, মশার মাধ্যমে জিকা ভাইরাস বিস্তারে ঠিক কী ভূমিকা পালন করছে এটা পরিস্কার নয়। কোনো সংক্রমক রোগের বিস্তারে জলবায়ুর পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানুষের ভ্রমণ সম্ভবত বড় ভূমিকা রাখছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, জলবায়ুর পরিবর্তন ভেক্টর ও পানিবাহিত রোগ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বদলে দেবে। ভেক্টর বলতে জীববিজ্ঞানে কোনো বাহক প্রাণী বোঝায় যা নিজে রোগ সৃষ্টি না করলেও রোগের জীবাণু এক পোষক থেকে অন্য পোষকে সংক্রমিত করে।

WHO বলছে পৃথিবীর গড় তাপমত্রা যদি ২-৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়ে তাহলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে ৩-৫ শতাংশ। এই বর্ধিত ৩-৫% কয়েকশ মিলিয়ন মানুষের সমতুল্য। যেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া সবসময় পাওয়া যায় সেখানে ম্যালেরিয়া-মৌসুমের স্থায়িত্ব আরো দীর্ঘতর হয়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর সকল বাস্তুসংস্থানে প্রভাব ফেলার সাথে সাথে বিভিন্ন রোগব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। বর্ধিত বৃষ্টিপাত মশার বংশবিস্তারের উপযোগী বদ্ধ-জলাশয়ের সংখ্যা বাড়াবে। ফলে ম্যালেরিয়া সহ রিফ্ট ভ্যালি জ্বর, ডেঙ্গু, জিকা সহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়বে বৈ কমবে না।

অন্যদিকে বন উজাড় ও কৃষিকাজের তীব্রতা বৃদ্ধিও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। মহাসাগরের তাপমাত্রা বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়তে থাকবে। ফলে বিষাক্ত শৈবালের পরিমাণ বৃদ্ধি মানুষে রোগ সংক্রামণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখাটা শেষ করতে চাই লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর একটি উক্তি দিয়ে। আমি কৃতজ্ঞতাভারে উদ্বেলিত, কিন্তু আমি এটাও অনুভব করছে ঘড়ির কাটা টিক টিক করে চলছে (পরিবেশ বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে)সত্য হলো- আপনি যদি পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আপনি আধুনিক বিজ্ঞান কিংবা পরীক্ষা লব্ধ সত্যকেও বিশ্বাস করেন না। এখন খুব প্রয়োজন এ বিপর্যয় রোধে জনমত গড়ে তোলা।

তথ্যসূত্রঃ
১. Leonardo DiCaprio Uses Oscar Speech to Urge Action on Climate Change, লিসা ফ্রিডম্যান, ক্লাইমেট ওয়্যার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

২. Uganda’s Zika Forest, birthplace of the Zika virus, ব্রান্ট সোয়ালস ও ডেভিড ম্যাককেনজি, সিএনএন, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৩. Climate change may have helped spread Zika virus, according to WHO scientists, অলিভার মিলম্যান, দ্যা গার্ডিয়ান, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৪. Climate change and urbanization are spurring outbreaks of mosquito-borne diseases like Zika, লরেন গ্রুশ, দ্যা ভার্জ, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

৫. A planet of viruses, কার্ল জিমার, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো প্রেস, ২০১১

featured photo: mx.usembassy.gov

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *