মৌমাছির মধুর রহস্য

মৌমাছি মধু তৈরি করে, এটা সকলেই জানে। কিন্তু কারো কি জানতে ইচ্ছে হয়েছে কেন তারা এই মধু বানায়? সে উত্তর আমরা জানবো। তার আগে মৌমাছি সম্বন্ধে সামান্য আলোচনা করা দরকার।

প্রতিটি মৌমাছি তাদের সারা জীবনে মাত্র ১/১২ টেবিল চামচ মধু তৈরি করতে পারে। মধু পুষ্টিগুণ সস্মৃদ্ধ ও শক্তিবর্ধক তরল উপাদান। প্রিয় খাবার ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন মধুকে ভালবাসে অনেকে। তারা নিয়মিত খেয়ে থাকে মধু। বর্তমানে পৃথিবীতে আফ্রিকানাইজড, বাকফ্যাস্ট, ক্যারনিওল্যান, কাউক্যাসিওন, কর্ডোভান, ইটানিলয়ান এবং রাশিয়ান নামে সাতটি প্রধান প্রজাতি সহ মোট ৪০টি উপপ্রজাতির মৌমাছি আছে।

অন্যদিকে, বাম্বল-বি ভ্রমর মধু বানায় না। তারা শুধু ফুলের মধু (নেকটার) সংগ্রহ করে থাকে। তাদের কলোনিগুলো খুব অল্প সময়ের জন্য তৈরি করে, ফলে তারা বেশিদিন মধু সংগ্রহ করতে পারে না। মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং উত্তর আমেরিকায় মেলপিনা নামে হুল ছাড়া এক প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। এরা বিভিন্ন প্রকৃতির মধু বানায়। যদিও এই মধুর পরিমাণটা সচারচর পাওয়া মৌমাছির মধুর তুলনায় অনেক কম।

মৌমাছি কেন মধু বানায়?

মৌমাছির খাবার হলো মধু এবং পোলেন। নিজেদের খাওয়ার জন্য তারা অতিরিক্ত মধু সংরক্ষণ করে রাখে। মধুতে কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকে এবং পোলেনে বেশি থাকে প্রোটিন বা আমিষ। শীতকালে ফুলে মধু কম থাকে। গ্রীষ্মে মধু বানায় শীতের সময় দেহের চাহিদা পূরণের জন্য। কারণ শীতে মধু তেমন পাওয়া যায় না। খুব ঠাণ্ডার সময় তাদের সঞ্চিত মধু খেয়ে জীবন ধারণ করে। শীতে ফুল বেশি থাকলেও, অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে তারা উড়ে গিয়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করতে পারে না। তাই তাদের পুরো কলোনির জীবন ধারণের জন্য অনেক মধুর প্রয়োজন পড়ে।

রাণী মৌমাছি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মধু খেয়ে থাকে। প্রতিটি মৌমাছির মৌচাকে অন্তত ১০ হাজার মৌমাছি থাকে, যার ফলে তাদের বেচে থাকার জন্য প্রচুর মধুর প্রয়োজন হয়। তাই তারা মধু সংগ্রহ করে এবং জমা রাখে। মধুতে প্রচুর গ্লুকোজ থাকে যা মৌমাছির শক্তি ও সুস্থ্যতা বজায় রাখে। বিরূপ প্রকৃতিতে মৌমাছির জীবন ধারণের জন্য অনেক খাবারের প্রয়োজন পড়ে। উড়তে বেশি শক্তি খরচ হয়। শীতে পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে এদের দেহের তাপমাত্রার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বেশি শক্তি গ্রহণ করে তাপ উতপন্ন করতে হয়। মৌচাকের মধ্যে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অন্যতম ভুমিকা রাখে মধু।

মৌমাছি আসলে কি খায়? মৌমাছি প্রধানত দুই ধরনের খাবার গ্রহণ করে। পোলেন ও নেকটার।

পোলেন বা পরাগ

পরাগ হলো ফুলের মধ্যে অবস্থিত শুকনো পাউডারের মতো উপাদান। এর রঙ ফুলের উপর নির্ভর করে। ফুল ভেদে এর রঙের ভিন্নতা দেখা যায়। মৌমাছি ফুলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তন্ন তন্ন করে খোজে তা সংগ্রহ করে। একেক ফুলের পরাগের রঙ একেক রকম। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় আফিম ফুলের পরাগ কালো, ডালিয়া ফুলের পরাগ পোড়া মাটির মতো। তারা বাম পায়ের মধ্যে ঝুড়ির মতো অংশে এই পরাগ সংগ্রহ করে। এগুলো প্রোটিনের অন্যতম উৎস। এগুলোকে মৌচাকে সঞ্চিত করে রাখা হয়। কর্মী মৌমাছিরা তাদের মাথা দিয়ে মৌচাকের ষড়ভুজাকৃতির কোষের মধ্যে ভালভাবে প্রবেশ করিয়ে রাখে।

নেকটার বা ফুলের মধু

ফুলের মধ্যে অবস্থিত নেকটারিস গ্রন্থির থেকে গ্লুকোজ পূর্ণ তরল পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা মৌমাছি সংগ্রহ করে। মধু প্রস্তুতকারী মৌমাছি ফুল থেকে এই নেক্টার গ্রহণ করে মৌচাকে নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়ার সময় তারা হ্যানি স্টমাক বা মধু পাকস্থালীতে রাখে, তবে এখানে তা হজম হয়ে যায় না। মৌমাছির দুটি পাকস্থলী। একটিতে সে খায় এবং অপরটি মধু তৈরিতে ব্যবহার করে। পরে মৌমাছির মধু থলি থেকে বাসায় থাকা মৌমাছিগুলো গ্রহণ করে।

সুন্দর স্তরে স্বজ্জিত মৌচাকের কোষে নিজের শরীরের পাচক রসের সাথে নেকটার মিশ্রিত করে রাখে। এতপর কর্মী মৌমাছি মধুতে মাত্র ১৮ শতাংশ পানি রাখে বাকিটা পাখার বাতাসে শুকিয়ে রাখে। এভাবেই মধু তৈরি হয়। মৌচাকে মধু তৈরি হওয়ার পরে প্রতিটি কক্ষ মোম দিয়ে আটকিয়ে দেয়। ১২ টা মৌমাছিকে ১ চা চামক মধু তৈরির জন্য নেকটার সংগ্রহের জন্য প্রায় ২৬০০টি ফুলের মধ্যে ঘুরতে হয়।

মৌচাকে অবস্থানরত মৌমাছি

অসংখ্য মৌমাছিকে মধু তৈরির কাজে নিয়োজিত হতে হয় কারণ একটি মৌমাছি তার সারাজীবনে মাত্র ১ চা চামুচের ১২ ভাগের এক ভাগ মধু প্রস্তুত করতে পারে। নেকটার সংগ্রহের পরে মৌমাছি তাদের লালা গ্রন্থির এক প্রকার পাচকরস মিশ্রিত করে। নেকটার জমা করে পাকস্থালীতে এটা অবশ্য খাদ্য থলীর চেয়ে আলাদা।

ফুল থেকে মৌমাছি নেকটার নিয়ে মৌচাকে আসলে সেখানেও অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এক মৌমাছি থেকে নেকটার অন্য মৌমাছিতে হস্তান্তর করে। যতক্ষণ না রস হালকা গাঢ় হয়। শেষে জমাট বাধার জন্য মৌমাছি তাদের পাখনা দিয়ে রসকে ফ্যানের মত বাতাস দিয়ে শুকিয়ে নেয়। পরে মৌচাকের ষড়ভুজাকৃতির সুন্দর স্তরে সজ্জিত কক্ষে জমা করে এবং মোম দিয়ে কক্ষের পথ বন্ধ করে দেয়। মধু প্রস্তুতের সময় চিনির ঘনত্ব বেশি থাকায় কোন প্রকার ব্যাকটেরিয়া ও ছাত্রাক জন্মাতে পারে না। এই কারণেই মধুকে কোনো প্রিজারভেটিভস ছাড়াই দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *