কাগজের আঘাতে আঙুল কেটে গেলে তা কেন অধিক পীড়াদায়ক?

কারো হাতের কোথাও কেটে গেছে আর তার কারণ যদি হয় তুচ্ছ কাগজ তাহলে তো অবাক হতেই হয়। কাগজের মত নিরীহ বস্তুও যখন তীক্ষ্ণ ব্যথা উদ্রেক করে তখন মনে হয় জীবনের ক্ষুদ্রতম, অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বাজে।

বস্তুসমূহের বিশাল পরিসরের বিবেচনায় কাগজ ততটা গণ্য না হয়েও যে ব্যথার সূচনা করে তা যথেষ্ট বেদনাদায়ক। কাগজ দিয়ে ত্বক কেটে যাবার ক্ষেত্রে সূঁচ বিঁধে যাবার মত যন্ত্রণা অনুভব হলেও কাগজের কিছুই কিন্তু বিঁধে যায় না।

মানুষের শরীরজুড়ে স্নায়ুতন্ত্র ছড়িয়ে আছে। দেহের অন্যান্য যেকোন স্থানের চেয়ে আঙুলের ডগায় অধিকসংখ্যক ব্যথা সংবহনতন্ত্রের রিসেপ্টরগুলো অবস্থিত। সে অনুযায়ী এ সংশ্লিষ্ট স্নায়ুতন্ত্রের প্রান্তই এজন্য দোষী। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলসের ত্বকবিশেষজ্ঞ হেয়লে গোল্ডবাখ বলেন, “আঙুলের ডগা আমাদের দেখিয়ে দেয় আমরা কিভাবে জগতটাকে ছুঁয়ে দেখি, কিভাবে সূক্ষ্ম কাজগুলো করি”। ডগায় রিসেপ্টর বেশি থাকার ফলে অল্পেই আমরা কোনো কিছু অনুভব করতে পারি, তাই আঙুলের ডগা খুবই সূক্ষ্ণ কাজ করার পেছনে একটি হাতিয়ারস্বরূপ।

এই স্নায়ুপ্রান্তগুলোকে বলা হয় নোসিসেপ্টর (nociceptors) অর্থাৎ ব্যথা সংগ্রাহক। এরাই সংবেদন সৃষ্টির মাধ্যমে মস্তিষ্কে জানান দেয়– উচ্চ তাপমাত্রা, বিপদজনক রাসায়নিক দ্রব্য এবং ত্বকের জন্য ক্ষতিকর মাত্রার চাপ ইত্যাদি।

কিছুটা দোষ অবশ্য কাগজেরও আছে, কারণ দূর থেকে খালি চোখে কাগজের ধার বা পার্শ্বকে আমাদের যতই মসৃণ মনে হোক, মোটেও সে মসৃণতার দেখা পাওয়া যাবে না আণুবীক্ষণিক দৃষ্টিতে, দেখতে অনিয়মিত ও খাঁজকাটা। ব্যাপারটা কল্পনা করা সহজ হবে যদি একটি গাজরকে ছুড়ি দিয়ে কাটার বদলে করাত দিয়ে কাটার তুলনা করা হয়। এছাড়া কাগজ উৎপাদনের সময় এর ধোলাইয়ের কারণে রাসায়নিক যুক্ত হয়।

কাগজের ধার বা পার্শ্বচিত্র (১০০ গুণ বিবর্ধিত)

শেষ কারণ, কাগজের কারণে এই ক্ষত সাধারণত খুব গভীর হয় না। যে কারণে দেহের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখানে কাজ করে না। তাই দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধে না ও ক্ষয়পূরণও হয় না, তাই ক্ষতিগ্রস্থ প্রান্ত উন্মুক্তই থেকে যায়। এর উপর আবার আঙুল প্রতিনিয়ত ব্যবহার হয়। যে কারণে আহত অংশের চামড়া বারবার টান খায়, বিশ্রাম থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আহত ত্বকের অপেক্ষাকৃত অধিক সময় প্রয়োজন হয় সুস্থ অবস্থায় ফিরে যেতে।

সবকথার শেষে এই দাঁড়ায় যে, এ ধরনের আঘাত আমাদের সামঞ্জস্যহীন ব্যথার সূত্রপাত ঘটায়। অন্যান্য আঘাতের তুলনায় আপাতদৃষ্টে নিরীহ হলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়ার কারণে ব্যাপারটি অনুমিত ঘটনার ব্যতিক্রম উদাহরণ প্রদর্শন করে। এমন দুর্ঘটনায় পড়লে করণীয় দ্রুত ঠান্ডা পানি দিয়ে আক্রান্ত স্থান ধুয়ে ফেলা, প্রয়োজনে সাবান দিয়ে ধুয়ে অ্যান্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করা (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী) এবং সে স্থান কোনো ব্যান্ডেজ বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.sciencealert.com/why-paper-cuts-hurt-so-much-according-to-science-2018
  2. http://sites.psu.edu/siowfa16/2016/09/14/the-science-of-a-paper-cut/
  3. http://abcnews.go.com/Health/PainManagement/story?id=4258917&page=1

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *