in ,

মাল্টিপল অ্যালিল এবং পিতৃত্বের জটিলতা

রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ প্রকার ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত হলো ABO এবং Rh ফ্যাক্টর ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম।

ABO সিস্টেম অনুযায়ী চার ধরনের ব্লাড গ্রুপ বিদ্যমান। A, B, AB এবং O। গ্রুপগুলো মূলত লোহিত রক্ত কণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের ধরনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। A গ্রুপের লোহিত কণিকায় একধরনের গ্লাইকোলিপিড থাকে আর B গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের। AB গ্রুপে থাকে উভয় ধরনের আর O গ্রুপে থাকে না কোনোটিই।

জিনতত্ত্ব বলছে সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বায়ী হলো জিন। তেমনই ABO ব্লাড গ্রুপের জন্যও দায়ী হলো জিন। A গ্রুপের জন্য আছে A অ্যালিল, B গ্রুপের জন্য B অ্যালিল, AB গ্রুপের জন্য A ও B উভয় অ্যালিল এবং O গ্রুপের জন্য নাল (শূন্য) অ্যালিল।

অ্যালিল আবার কী জিনিস? গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আছে দুটি করে অ্যালিল। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এটি অনুধাবন করতে হলে কলেজ পর্যায়ের জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা চাই।

ধরি কোনো একটি ইঁদুরের লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য জিন আছে। এর জিনোটাইপ (Tt)। এক্ষেত্রে লম্বা লেজ (T), খাটো লেজের (t) উপর প্রকট। ইঁদুরের দেহে লম্বা (T) লেজের জিন এসেছে তার পিতার জনন কোষ থেকে আর খাটো (t) লেজের জিন এসেছে তার মাতার জনন কোষ থেকে। ইঁদুরের লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য পিতা (T) এবং মাতা (t) থেকে আগত জিন দুটির একটিকে অপরটির অ্যালিল বলে।

চিত্র: মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যালিল সঞ্চারণ

অর্থাৎ মেন্ডেলিয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি জিনের দুটি করে চেহারা বা রূপ থাকে। প্রতিটি চেহারাকে অ্যালিল বলে। এ দুটির একটি অ্যালিল আসে মাতা থেকে আর অন্যটি আসে পিতা থেকে।

কিন্তু এ নিয়ম ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। কেননা এখানে লোহিত রক্তকণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের জন্য রয়েছে A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল। তিনটি অ্যালিল কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে? একে মেন্ডেলিয় তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এরূপ ঘটনাকে বলা হয় মাল্টিপল অ্যালিল।

যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুইয়ের অধিক অ্যাালিল কাজ করে তখন তাকে মাল্টিপল অ্যালিল বলে। মজার বিষয় হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক অ্যালিল থাকলেও ডিপ্লয়েড জীব বলে আমাদের কোষে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকা সম্ভব। মাল্টিপল অ্যালিল ব্যাপারটি সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্যাচ লেগে গেল? তাহলে একটু গল্পের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। ধরি বাসায় ১০ জন মানুষ আছে। সবার জন্য বিস্কুট আনা হলো বাজার থেকে। তিন ধরনের বিস্কুট আছে- অরেঞ্জ বিস্কুট, চকলেট বিস্কুট এবং লেমন বিস্কট। কিন্তু শর্ত হলো প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র দুটি করে বিস্কুট নিতে পারবে। এ শর্তে বিস্কুট বন্টনের পর দেখা যাবে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেকোনো একধরনের দুটি বিস্কুট (অরেঞ্জ-অরেঞ্জ, চকলেট-চকলেট, লেমন-লেমন) বা দুটি ভিন্ন ধরনের বিস্কুট (অরেঞ্জ-লেমন, অরেঞ্জ-চকলেট, চকলেট-লেমন) বিদ্যমান।

তাহলে সবাই কী ধরনের খাবার পেয়েছে? বিস্কুট পেয়ছে। কিন্তু বিস্কুটের ধরন ছিল ভিন্ন। তাহলে সামগ্রিকভাবে ১০ জনের জন্য কত ধরনের বিস্কুট ছিল? তিন ধরনের। ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক পদ্ধতি বিদ্যমান। সকল মানুষের রক্তের জন্য A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল বিদ্যমান।

আগের উদাহরণে সবার জন্য যেমন বিস্কুট ছিল তেমনই এ ক্ষেত্রেও সকল মানুষের লোহিত রক্তকণিকার জন্য আছে একটি ABO জিন। কিন্তু বিস্কুটের যেমন তিনটি ধরন ছিল তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও ABO জিনের ধরন তিনটি। এদের নাম হলো A, B এবং O অ্যালিল।

কিন্তু যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব তাই আমাদের কোষে শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকতে পারে। তাই ABO জিনের ক্ষেত্রে তিনিটি অ্যালিল থাকলেও জীনোটাইপ হবে শুধুমাত্র AA, AO, BB, BO, AB এবং OO। মানে মানুষের সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যালিল প্রযোজ্য, কিন্তু একটি মাত্র মানুষের দেহে অ্যালিল থাকবে দুটি।

চিত্র: ABO ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে মাল্টিপল অ্যালিল পদ্ধতিতে সন্তানে অ্যালিল সঞ্চারণ

এ নিয়ম অনুযায়ী পিতা যদি হয় A ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ AO) এবং মাতা যদি হয় B ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ BO) তাহলে সন্তানের ব্লাড গ্রুপ A, B, AB এবং O এই চার ধরনেরই হতে পারে। আর যদি পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BO হয় তাহলে সন্তান হবে A এবং AB এই দুই গ্রুপের।

পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে শুধুমাত্র AB গ্রুপের। পিতার জিনোটাইপ AO মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে AB এবং B ব্লাড গ্রুপের। পিতামাতা উভয় O হলে সন্তান সবাই O হবে।

A ও B জিন দুটি সমান প্রকট হওয়ায় তারা একত্রে থাকলে উভয়েই সমানভাবে প্রকাশ লাভ করে এবং AB ব্লাড গ্রুপ গঠন করে। কিন্তু O জিন প্রচ্ছন্ন হওয়ায় A বা B জিনের সাথে থাকলে প্রকাশ লাভ করে না। শুধুমাত্র O জিন থাকলে প্রকাশ লাভ করে O ব্লাড গ্রুপ গঠন করে।

ABO ব্লাড গ্রুপ কি সবসময় এ নিয়ম মেনে চলে? মাঝে মাঝে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ম অনুযায়ী মাতা B এবং পিতা O ব্লাড গ্রুপ হলে সন্তান B কিংবা O ব্লাড গ্রুপের হওয়া সম্ভব। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানের এক পরিবারে দেখা গেল স্বামীর ব্লাড O আর স্ত্রীর ব্লাড B গ্রুপের হলেও সন্তানের ব্লাড গ্রুপ হয়েছে A। বাঁধল ঝামেলা, অভিযোগ আসল উনি এই সন্তানের বাবা নন!

আদালত পর্যন্ত গড়ালে পরে গবেষণা করে জানা গেল উনিই আসল বাবা। কিন্তু এই তথৈবচ ঘটনা কীভাবে ঘটল? মূলত এমন ব্যতিক্রম হয়েছে মিউটেশনের ফলে। কীভাবে? চলুন জেনে আসি।

খুব সহজে বলতে গেলে ডিএনএ’র মাঝে যেকোনো পরিবর্তন হওয়াকে মিউটেশন বলে। কোষ বিভাজনের পূর্বে ডিএনএ অনুলিপনের সময়ও ডিএনএতে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। জন্মের সময় আমাদের দেহে গড়ে প্রায় ১০০ বা তারও বেশি সংখ্যক মিউটেশন ঘটে থাকে।

চিত্র: AO এবং BO জিনোটাইপের পিতামাতার সন্তানের ব্লাড গ্রুপ

আমরা জানি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অংখ্য অণু দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে নাইট্রোজেন বেস। জিন হলো একটি রেসিপি যে রেসিপি অনুসরণ করে প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করা হয়। ABO ব্লাড গ্রুপের জন্য A, B এবং O অ্যালিল দায়ী।

এ তিনটি অ্যালিলের মাঝে গাঠনিক পার্থক্যও সামান্য, তাই এদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন ব্লাড গ্রুপের ব্যতিক্রমের কারণ হতে পারে। A ও O অ্যালিলের মধ্যে মাত্র একটি নাইট্রোজেন বেসের পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে A ও B অ্যালিলের মাঝে পার্থক্য সাতটি নাইট্রোজেন বেসে।

চিত্র: A, B এবং O অ্যালিলের গাঠনিক পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটিমাত্র বেস কম থাকা বা সাতটি ভিন্ন বেস থাকা তেমন কিছু না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি জিনের ক্ষেত্রে তিনটি করে বেস একটি জেনেটিক কোড হিসেবে কাজ করে। তাই যেকোনো একটি বেসে পরিবর্তন হলে সম্পূর্ণ কোডটিকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, The old man had one new hat. বাক্যটিতে প্রতিটি শব্দে তিনটি করে অক্ষর আছে। বাক্যের প্রতিটি অক্ষরকে নাইট্রোজেন বেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

এখন যদি প্রথম শব্দ থেকে একটি অক্ষর E কমে যায় তাহলে বাক্যটি হয়, Tho ldm anh ado nen ewh am. নতুন বাক্যে যদিও তিনটি করে অক্ষর একত্রিত হয়েছে কিন্তু একটিমাত্র অক্ষর হারিয়ে গেছে বলে বাক্যটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন। জিনে সামান্য মিউটেশনের ফলে অনেকটা এরূপ ঘটনাই ঘটে থাকে। অল্প একটু পরিবর্তনে বিশাল ফলাফল।

এরকম এক মিউটেশনের ফলেই A ব্লাড গ্রুপ থেকে O ব্লাড গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। সদূর অতীতে A ব্লাড গ্রুপের জিনের মিউটেশনের ফলে একটি নাইট্রোজেন বেস হারিয়ে গেলেই আবির্ভাব হয় নতুন ব্লাড গ্রুপ O এর।

তাহলে কি B ব্লাড গ্রুপ থেকে A ব্লাড গ্রুপ পাওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, মিউটেশনের ফলে এটিও সম্ভব। ধরুণ, আবুল নামের এক ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ B এবং ব্লাড গ্রুপের জিনোটাইপ BO। তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম অনু্যায়ী উনার প্রতিটি শুক্রাণুতে হয় B অ্যালিল থাকবে নয়ত O অ্যালিল। কারণ জনন কোষ হলো হ্যাপ্লয়েড তাই কেবল একটি করে অ্যালিল অবস্থান করবে।

আগেই জেনেছি যে O অ্যালিল দেখতে অনেকটা A অ্যালিলের মতো, শুধুমাত্র একটি নাইট্রোজেন বেস কম রয়েছে। তাই আবুল সাহেবের শুক্রাণু গঠনের পূর্বে যদি রিকম্বিনেশনের ফলে B ও O অ্যালিলের মাঝে অংশ বিনিময় হয়, তাহলে O অ্যালিল তার হারানো নাইট্রোজেন বেস ফিরে পেয়ে A অ্যালিল রূপে কাজ করতে পারে। এরূপ মিউটেশন হলে আবুল সাহেবের শুক্রাণু A অ্যালিল বহন করবে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব ছিল। এই শুক্রাণু A বা O অ্যালিল বিশিষ্ট্য ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন হবে।

চিত্র: BO জিনোটাইপের ব্লাডে মিউটেশনের ফলে A গ্রুপ সৃষ্টি

পূর্বে উল্লিখিত জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিল। এ দম্পতির মাঝে স্বামীর যেহেতু ব্লাড গ্রুপ O তাই তার সকল শুক্রাণু O অ্যালিল বহন করবে। কিন্তু স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ B বলে চিত্রে উল্লিখিত মিউটেশন হলে তার ডিম্বাণু B বা O এর পরিবর্তে A অ্যালিল বিশিষ্ট্য হতে পারবে। আবুল সাহেবের মতো একই মিউটেশনের ফলে স্ত্রীর ডিম্বাণু A অ্যালিল বহন করে যা স্বামীর O অ্যালিল বিশিষ্ট্য শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন করে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সন্তানের B বা O ব্লাড গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল।

চিত্র: জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা

শেষ বেলায় আরো একটি তথ্য দিতে চাই। শুধুমাত্র ABO ব্লাড গ্রুপ নয়, অন্য কোনো জিনের ক্ষেত্রেও মিউটেশন বা রিকম্বিনেশনের ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা দেখা যেতে পারে।

উদ্ভিদজগতের অজানা দশ

নীল আর্মস্ট্রংদের বাংলাদেশ সফর