in

পিঁপড়ার ব্যক্তিত্ব

একটি স্বপ্ন। একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একটি সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্নই মানুষকে অণুপ্রাণিত করেছে সমাজের ছায়াতলে এসে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের। কথাটি শুধু মানবসমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, ক্ষুদ্রাকার পিপীলিকা সমাজের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়ে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের মতামতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মতামত কেমন হবে তা নির্ভর করে সদস্যটির ব্যক্তিত্ব, রুচিশীলতা প্রভৃতির উপর।

সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব আলাদা। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের কারণে তৈরি হওয়া বিচিত্র মতামতকে বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মানুষ বৈচিত্র্যময় পন্থার কথা ভেবেছে। প্রয়োগও করেছে। তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত এবং প্রচলিত পন্থা সম্ভবত ভোট দেয়া। এখন পিঁপড়াদের মধ্যে তো ভোটাভুটির মতো কোনো ব্যাপার প্রচলিত নেই। তাহলে পিঁপড়া সমাজ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

পিঁপড়ারা সিদ্ধান্ত নেয় কোরাম (quoram) করে। মানে কিছু পিঁপড়া কোনো ব্যাপারে একমত হলে দলের অন্যান্য পিঁপড়াও তাদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে।

পিঁপড়া সমাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটি ব্যাপার। তবে তারচেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে- মানব সমাজের প্রতিটি মানুষের মতো পিপীলিকা সমাজের প্রতিটি পিপীলিকার আচরণে রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি পিঁপড়া চলনে-বলনে অন্যান্য পিঁপড়া থেকে আলাদা। বিষয়টিকে পিঁপড়ার ব্যক্তিত্বও বলা যায়।

পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা মানুষের মতোই পিঁপড়া সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়াকে প্রভাবিত করে। মোটামুটি অবিশ্বাস্য শোনালোও পিঁপড়া নিয়ে নতুন একটি গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

রক এন্টদের (Temnothorax albipennis) পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বাড়ি বানায় পাহাড়ের সরু কোনো ফাটলে। এ ধরনের ফাটল প্রচুর পাওয়া যায় তবে তা সহজেই বিনষ্ট হতে পারে পাথর ধ্বসে বা বৃহৎ প্রাণীদের উৎপাতে। যদি তাদের বাসা ভেঙে যায় বা দলের সন্ধানী পিপীলিকারা নতুন কোনো সুবিধাজনক বাসার সন্ধান পায় তাহলে তারা নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হয়।

চিত্র: রক এন্ট বা পাথুরে পিঁপড়া।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের এন্ট ল্যাবের থমাস হোয়েলার বলেন, “নতুন বাসা খোঁজার সময় অনুসন্ধিৎসু পিপীলিকারা অনেক প্রয়োজন মাথায় রাখে। তারা এমন বাসার সন্ধান করে যেখানে হালকা আলো থাকবে, বাসার দরজা হবে ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার মাপের, বাসার উচ্চতা হবে ২ মিলিমিটার এবং বাসার ভেতরের জায়গা হবে প্রায় ২০ বর্গসেন্টিমিটার।”

আলাদাভাবে দলের প্রত্যেকটি পিঁপড়া তাদের সম্ভাব্য বাড়ির ব্যাপারে কী ভাবে এবং এটা কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা পরীক্ষা করতে হোয়েলার ও তার সহকর্মীরা ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কলোনী থেকে ১৬টি করে মোট ১৬০টি পিপড়াকে কৃত্রিমভাবে তৈরি বাসায় ছেড়ে দেন। বাসাগুলো ছিল তিন ধরনের। খুব ভালো, তুলনামুলক কম ভালো এবং জীর্ণ।

এতে স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটল তা হলো বাসাটা যত ভাল হলো পিঁপড়ারা তত বেশি সময় সেখানে কাটাল এবং দলের সঙ্গীরা যাতে তাদের খুঁজে পায় এজন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে রাখল। হোয়েলার বলেন “কোনো একটা বাসায় অবস্থান করে পিঁপড়ারা কার্যকরভাবে কোরামে বা একমত হবার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। যত বেশি সময় একটা পিঁপড়া কোনো বাসায় অবস্থান করবে, তত বেশি পিঁপড়া তার সাথে যোগ দেবে।”

হোয়েলারের গবেষক দল এটি থেকে দেখতে পান কোনো বিশেষ ধরনের বাসায় ভিন্ন ভিন্ন পিঁপড়াদের কাটানো সময় ভিন্ন। হোয়েলার এ সম্পর্কে বলেন, “কিছু পিঁপড়া আছে খুতখুতে, কিছু পিঁপড়া আবার স্বাধীনচেতা। তারা তাদের বর্তমান বাসার চেয়ে ভাল বাসা পেলেই খুশী। অনেকটা মানুষের মতোই।”

কিছু পিঁপড়াকে কখনোই সুখী মনে হয় না, তাদের বাসা যত সুন্দরই হোক না কেন। এই অস্থির স্বভাবের পিঁপড়ারা যে বাসায় বাস করে তারচেয়েও সুন্দর বাসার সন্ধানে থাকে। এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং তারা সবসময় নতুন কিছুতে আগ্রহী। কোনো কোনো পিঁপড়া আবার শান্ত স্বভাবের।

গবেষক দল দেখতে পান পিঁপড়ারা নির্বোধই হোক আর চালাকই হোক দুটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে একটি বেছে নিতে তাদের নির্বোধ বা চালাক ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটামুটি একই গতিতে হয়ে থাকে।

কিন্তু পিপড়ার কলোনীটি যদি দুটি ছন্নছাড়া বাসা থেকে একটি বেছে নিতে চায় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া (heterogeneity of responses) দেখা যায়। ফলে তারা দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। একটু কড়া স্বভাবের পিঁপড়ারা কলোনীর বাসিন্দাদের এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

image source: insider.si.edu

হোয়েলারোর সহকর্মীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে কোনটি বেছে নেবে তা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপরও নির্ভর করে। হোয়েলারের ভাষ্যমতে, যদি পিঁপড়ারা খুব ভালো বাসা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ভালো বাসায় যায় তাহলে তারা বুঝতে পারে যে এটা আগেরটার মতো ভালো নয়। যদি পিঁপড়ারা জীর্ণ কোনো বাসায় থাকে তাহলে পরে খুঁজে পাওয়া ভাল বাসায় বেশি সময় কাটায় তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণ কী? গবেষক ডর্নহেউস বলেন “অনেক নিয়ামকই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত পারে। হরমোনের মাত্রায় পার্থক্য, সেন্সরি রিসেপ্টরের সংখ্যায় পার্থক্য, বয়স, দেহের আকার অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত করে কোনোকিছু বলা মুশকিল।”

এখন সামনে গবেষকদেরকে জানতে হবে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তার পেছনে কী দায়ী এবং বিবর্তনের পথে এর ভূমিকা কী। এই গবেষণা অন্তত আমাদের এটুকু জানাতে পেরেছে যে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা আসলে প্রয়োজনীয় এবং তা পিপড়া কলোনীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

Ant’s choosiness reveals that they all have different personalities by Chris Simms, the new scientist, February 1, 2017.

featured image: aquarianonline.com

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প