দ্রুত বংশবৃদ্ধির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

পেকে ওঠা একটা পপি বা পোস্ত ফল ক্ষুদে ক্ষুদে দানায় ভরা; প্রত্যেকটি দানাবীজ থেকে একটি করে গাছ গজাতে পারে। যতগুলো বীজ বুনেছি তার প্রত্যেকটি থেকে যদি একটি করে গাছ গজায়, তাহলে পপি গাছের সংখ্যা কত দাঁড়াবে?

এটা বের করার জন্য আমাদের অবশ্যই জানতে হবে প্রত্যেকটি পপিতে কতগুলো করে বীজদানা রয়েছে। কাজটা হয়তো খুব ক্লান্তিকর কিন্তু ফলটা এত আগ্রহ জাগাবার মতো যে ধৈর্য ধরে কাজটা খুঁটিয়ে করলে পরিশ্রমটুকু সার্থক হবে। প্রথমত, আপনি জেনে নেবেন যে প্রত্যেকটি পপিতে গড়ে ৩ হাজার বীজদানা আছে।

তারপর? লক্ষ্য করবেন, আমাদের ঐ পপি গাছটির চারপাশে যদি যথেষ্ট ফসল ফলাবার মতো জমি থাকে তাহলে প্রত্যেকটি বীজ থেকে একটি করে গাছ গজাবে। ফলে পরবর্তী গ্রীষ্মকালে আমরা পাব ৩ হাজার পপি গাছ। মাত্র একটি পপি থেকে পুরো একটি পপি ক্ষেত।

এরপর কি হচ্ছে দেখা যাক। এই ৩,০০০ গাছের প্রত্যেকটিতে অন্তত একটি করে (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বেশি) ৩,০০০ হাজার বীজদানা সমেত পপি ধরবে। এগুলোর প্রত্যেকটি থেকে আরও ৩,০০০ নতুন গাছ গজাবে। সুতরাং দ্বিতীয় বছরের শেষে আমাদের পপি গাছের সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত ৩০০০ x ৩০০০ = ৯০,‌০‌০,০০।

সহজেই হিসাব করা যায় যে, তৃতীয় বছরের শেষে আমাদের একটি মাত্র আদি পপির বংশধরের সংখ্যা দাঁড়াবে— ৯০,০০,০০০ x ৩০০০ = ২৭,০০,০০,০০,০০০। পঞ্চম বছরের শেষে পৃথিবীর বুকে আমাদের এই পপিগুলোর জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকবে না। কারণ তখন সংখ্যাটি দাঁড়াবে- ৮,১০,০০,০০,০০,০০,০০০ x ৩০০০ = ২,৪৩,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০০।

পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগের– অর্থাৎ সমস্ত মহাদেশ আর দ্বীপের আয়তন ১৩,৫০,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এবং এটা হল যত পপি গাছ গজিয়েছে তার প্রায় ২০০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

সমগ্র পপি গাছের সমস্ত বীজ থেকে যদি গাছ হয়, তাহলে একেকটি পপির বংশধররা পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রতি বর্গমিটারে ২০০০ পপি গাছ সমেত- ভূগোলোকের সমস্ত স্থলভাগকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এই খুদে পপি বীজদানাটির মধ্যে সত্যিই একটি রাক্ষুসে সংখ্যা লুকিয়ে আছে, তাই নয় কি?

চিত্র: পপি গাছ
চিত্র: পপির বীজে অনেক বীজদানা থাকে

আরো কম বীজ উৎপন্ন হয় এমন কোনো গাছ নিয়ে আমরা এই একই ব্যাপার চেষ্টা করে দেখতে পারি। ফলাফল দাঁড়াবে একই। শুধু এক্ষেত্রে এর বংশধররা ভূপৃষ্ঠের পুরোটা আচ্ছন্ন করে ফেলতে সময় নেবে পাঁচ বছরের সামান্য কিছু বেশি। যেমন—একটি ড্যান্ডেলিয়ন নিন যেটা গড়ে বছরে ১০০ টি বীজ উৎপাদন করে। অবশ্য এমন ড্যান্ডেলিয়নও আছে যা বছরে ২০০ পর্যন্ত বীজ উৎপাদন করে। তবে সে উদাহরণ বেশ বিরল। এ সমস্ত বীজ থেকে যদি গাছ গজাতো তাহলে আমরা পেতাম-

প্রথম বছরের শেষে ১ টি গাছ

দ্বিতীয় বছরের শেষে ১০০ টি গাছ

তৃতীয় বছরের শেষে ১০,০০০ টি গাছ

চতুর্থ বছরের শেষে ১০,০০,০০০ টি গাছ

পঞ্চম বছরের শেষে ১০,০০,০০,০০০ টি গাছ

ষষ্ঠ বছরের শেষে ১০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

সপ্তম বছরের শেষে ১০,০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

অষ্টম বছরের শেষে ১০,০০,০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

অষ্টম বছরের শেষে ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

ভূগোলকের সমস্ত স্থলভাগের যত বর্গমিটার জায়গা আছে এ হলো তার ৭০ গুন বেশী। সুতরাং, নবম বছরের শেষে সমস্ত মহাদেশই ড্যান্ডেলিয়নে ছেয়ে যাবে। প্রতি বর্গ মিটারে ৭০টি করে।

চিত্র: ড্যান্ডেলিয়ন

কিন্তু তাহলে পৃথিবীতে এরকম ঘটনা সত্যিই ঘটছে না কেন? কারণটা সহজ। বীজদানাগুলোর একটা বিপুল অংশ নতুন চারা হিসেবে শেকড় মেলার আগেই বিনষ্ট হয়ে যায়। হয় তারা অনুর্বর জমিতে পড়ে, শিকড় মেললেও অন্যান্য গাছের দ্বারা চাপা পড়ে যায় কিংবা পশুপাখির দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। বীজ আর গাছের এই ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ড যদি না ঘটতো, তাহলে দেখতে দেখতে আমাদের এই গ্রহকে আচ্ছন্ন করে ফেলত।

তবে শুধু উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই নয়, জীবজন্তুর ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। এদের যদি মৃত্যু না হতো, পৃথিবীটা আজ হোক আর কাল হোক, মাত্র একজোড়া জন্তুর বংশধরদের অত্যধিক ভিড়ে আক্রান্ত হয়ে উঠত। মৃত্যু যদি প্রাণীর সংখ্যাবৃদ্ধির পথে অন্তরায় না হতো, তাহলে কি যে ঘটতো, তা কল্পনাই করা যায় না।

অল্প-বিস্তর বিশ বছরের মধ্যে আমাদের মহাদেশগুলোর সমস্তই বনে জঙ্গলে আর স্তেপভূমিতে ছেয়ে যেতো আর তার মধ্যে কোটি কোটি প্রাণী প্রাণধারণের জায়গাটুকুর জন্য পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করতো। মহাসাগরগুলোতে এত মাছ কিলবিল করতো যে জাহাজ চলাচলের কোনো প্রশ্নই উঠত না। আকাশে উড়ন্ত অসংখ্য পাখি আর পতঙ্গের দরুন আমরা দিনের আলো প্রায় দেখতেই পেতাম না।

উদাহরণ হিসেবে, সাধারণ মাছির কথাই ধরা যাক। এদের প্রজননক্ষমতা স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো। মনে করা যাক, প্রত্যেক স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ে এবং গ্রীষ্মকালের মধ্যে এই ১২০টি ডিম থেকে বংশাণুক্রমে সাত প্রজন্ম মাছি সৃষ্টি হবে যার অর্ধেক স্ত্রী মাছি। মনে করা যাক,  প্রথম ডিমগুলো পাড়া হলো এপ্রিলের ১৫ তারিখে এবং এসব ডিম ফুটে বেরিয়ে আসা স্ত্রী মাছিগুলো (ডিম পাড়বার দিন থেকে) বিশ দিনের মধ্যে যথেষ্ট বড়সড় হয়ে নিজেরাই ডিম পাড়ার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা দাঁড়াবে এরকম

এপ্রিল ১৫ তারিখে প্রত্যেকটি স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ল, মে’র শুরুতে ১২০টি মাছি ডিম ফুটে বেরুবে- যেগুলোর মধ্যে ৬০টি স্ত্রী মাছি। মে’র পাঁচ তারিখে প্রত্যেকটি স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ল এবং এই মাসের মাঝামাঝি ৬০ x ১২০ = ৭,২০০ মাছি বেরুবে ডিম ফুটে– যেগুলোর মধ্যে ৩,৬০০ টি স্ত্রী মাছি।

মে’র ২৫ তারিখে এই ৩,৬০০ স্ত্রী মাছির প্রত্যেকে ১২০টি ডিম পাড়ছে এবং জুন মাসের শুরুতে জন্ম নিয়েছে ৩৬০০ x ১২০ = ৪৩২০০০টি মাছি। এদের মধ্যে ২,১৬,০০০টি স্ত্রী মাছি। জুনের ১৪ তারিখে এই স্ত্রী মাছিগুলোর প্রত্যেকে ১২০টি করে ডিম পাড়বে এবং মাসের শেষে ডিম ফুটে বেরুবে ২৫৯২০০০০টি মাছি। এর মধ্যে আছে ১২৯৬০০০০টি স্ত্রী মাছি।

জুলাই ৫ তারিখে এই ১২৯৬০০০০ স্ত্রী মাছি প্রত্যেকে ১২০টি করে ডিম পাড়বে এবং মাসের ১৫৫৫২০০০০০ মাছি জন্মাবে (৭৭৭৬০০০০০ স্ত্রী মাছি)। জুলাই ২৫ তারিখে মাছির সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৩৩১২০০০০০০, যাদের মধ্যে ৪৬৬৫৬০০০০০০ স্ত্রী মাছি। আগস্ট ১৩ তারিখে সংখ্যাটি দাঁড়াচ্ছে ৫৫,৯৮,৭২,০০,০০,০০০। এদের মধ্যে স্ত্রী মাছির সংখ্যা হলো ২৭৯৯৩৬০০০০০০০। সেপ্টেম্বর ১ তারিখে ৩৫৫৯২৩২০০০০০০০০ মাছি ডিম ফুটে বেরুবে।

কোনো মাছি যদি মারা না পড়ে, তাহলে মাত্র একটি গ্রীষ্মকাল জুড়ে জন্মাতে পারে এ যে মাছির দল। এদের বিপুল সংখ্যা সম্বন্ধ আরো স্পষ্ট ছবি পাবার জন্য দেখা যাক কী দাঁড়াবে যদি এরা পরপর সারি বেঁধে একটা লাইন তৈরি করে। একটি মাছির দৈর্ঘ্য ৫ মিলিমিটার হলে এ লাইনটি দাঁড়াবে ২,৫০,০০,০০,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের ১৮ গুণ বেশী। পৃথিবী থেকে বহু দূরের গ্রহ ইউরেনাসের দূরত্বের প্রায় সমান।

সবশেষে জীবজন্তুর অনন্যসাধারণ দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত আরো কিছু তথ্য উল্লেখ করছি।

আমেরিকায় একসময় চড়ুইপাখি ছিল না। শস্যের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। তাদের ধ্বংস করার মতো কোনো জন্তু বা শিকারি পাখি সে দেশে ছিল না এবং তারা অতি দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। শস্যনাশক পোকাস সংখ্যা ক্রমেই কমে আসতে লাগল কিন্তু চড়ুইদের সংখ্যা বেড়ে চললো দ্রুত হারে। শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য আর যথেষ্ট পরিমাণে কীটপতঙ্গ না থাকায়, তারা ফসল ধ্বংস করতে শুরু করে দিল।

তখন চড়ুই পাখিদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো এবং দেখা গেলো সেটা এতোই ব্যয়বহুল যে পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো জন্তুর আমদানি নিষিদ্ধ করে আইন বিধিবদ্ধ করতে হয়েছিল।

আরেকটি উদাহরণ- ইউরোপীয়রা যখন অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করে তখন সেখানে খরগোশ ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সেখানে প্রথম কয়েকটি খরগোশ আনা হয়। খরগোশদের মেরে ফেলার মতো কোনো শিকারি জন্তু ছিল না সেখানে। তাই তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে চলে দ্রুত হারে। অল্পদিনের মধ্যেই বিরাট বিরাট খরগোশের পাল অস্ট্রেলিয়া ছেয়ে ফেলে এবং ফসল ধ্বংস করতে থাকে। দেশজুড়ে এক সর্বনেশে অবস্থা দেখা দেয় এবং এদের ধ্বংস করার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে।

জনসাধারণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিল বলেই এই মহা বিপর্যয়কে রোধ করা গিয়েছিল। পরে ক্যালিফোর্নিয়াতেও মোটামুটি এই রকম ঘটনা ঘটেছিল।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে জ্যামাইকায়। সেখানে ছিল প্রচুর সংখ্যক বিষধর সাপ। এদের ধ্বংস করার জন্য সাপের ঘোর শত্রু হিসেবে কেরানী পাখি (Secretory Bird) আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অল্পকালের মধ্যেই সাপের সংখ্যা কমে গেল। কিন্তু এর ফলে সাপেরা যাদের গিলে খেত, সেই মেঠো ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যেতে শুরু করলো।

এই ইঁদুররা আখ খেতের এতো বড় ক্ষতি করে যে এদের বংশালোপ ঘটানোর জন্য চাষিদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। তারা নিয়ে এল চারজোড়া ভারতীয় বেজি- যাদের ইঁদুরেরা শত্রু বলে সবাই জানে। এই বেজিদের অবাধে দ্রুত বংশবিস্তার ঘটাতে দেয়া হলো এবং অল্পকালের মধ্যেই দ্বীপটি ভরে গেল বেজিতে।

বছর দশেকের মধ্যে এরা সব ইঁদুরকে ধ্বংস করলো বটে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা সর্বভুক হয়ে দাঁড়ালো– শিশুদের, কুকুরছানাদের আর সদ্যজাত শুয়োরছানাদের, মুরগিছানাদের তারা আক্রমণ করতে শুরু করলো, ডিম ধ্বংস করে দিতে শুরু করলো। সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটানোর সাথে সাথে এরা ছেয়ে ফেলল সমগ্র গমের ক্ষেত, আখের ক্ষেত আর ফলবাগিচা। দ্বীপবাসীদের এবার তাদের ভূতপূর্ব মিত্রদের বিপক্ষে দাঁড়াতে হলো কিন্তু ক্ষতিটাকে রোধ করার ব্যাপারে মাত্র আংশিক সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিল তারা।

ইয়াকভ পেরেলম্যানের বই অবলম্বনে । 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *