প্রাণিজগতের কিছু অদ্ভুত হৃৎপিণ্ড

হৃৎপিণ্ড। বুকের বাম পাশের এই ঢিপ ঢিপ করতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটা ঠিক কবে কীভাবে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বলা কঠিন। সত্যিকার অর্থে হৃৎপিণ্ড ঠিক বামদিকে থাকে না। থাকে আমাদের শরীরের মাঝবরাবর ঘেঁষে বামদিকে। আর হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপারও হৃৎপিণ্ডে ঘটে না। ভালোবাসার প্রতীক হৃদয় ও সত্যিকারের হৃদয় দেখতেও এক নয়। প্রেম যদি হয়ে থাকে তবে তার উৎপত্তি মস্তিষ্কে যা আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রস্থল।

অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কাজ রক্ত সঞ্চালন করা। আমাদের দেহের সবখানে রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। হ্যাঁ, ভালোবাসার মানুষটিকে দেখলে আমাদের হার্টবিট বেড়ে যায় বটে। তার পেছনেও কারণ আছে। সংক্ষেপে বললে, এর কারণ এড্রেনালিন ক্ষরণ।

যখন পছন্দের মানুষটিকে আমরা দেখি তখন মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায় এড্রেনাল গ্ল্যান্ডে। সেখান থেকে হরমোন নিঃসরণের কারণেই পরবর্তীতে হার্টবিটসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার ঘটে। এ কারণেই ভালোবাসলে অথবা ভালোবেসে কষ্ট পেলে হৃদয়ে তা অনুভব করি বেশি।

তবে আমাদের আজকের আলোচনা এই দিক নিয়ে নয়। এমনকি মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়েও নয়। প্রাণিজগতের কয়েকটি প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের কথা আলোচনা থাকবে এখানে। এদের হৃৎপিণ্ড আমাদের চেয়ে আলাদা এবং কিছুটা অদ্ভুত রকমের।

মানুষের স্বাভাবিক হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৭২ বার। কিন্তু কাঠবেড়ালির হার্টবিট প্রতি মিনিটে মাত্র ৫ বার। উড়তে থাকা ছোট্ট হামিংবার্ডের হার্টবিট মিনিটে অন্তত ১২৬০ বারের মতো। অবাক করা ব্যাপার। আমাদের হৃৎপিণ্ডের ভর বড়জোর ৩০০৩১০ গ্রাম। অন্যদিকে একটি জিরাফের হৃৎপিণ্ডের ভর প্রায় ১২ কেজি। জিরাফের লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্যে বড় আর শক্তিশালী হৃৎপিণ্ডের প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাণিজগতে আরো কিছু ব্যতিক্রমী ।

তিনপ্রকোষ্ঠের হৃৎপিণ্ড

স্তন্যয়ায়ী প্রাণী (যেমন মানুষ) ও পাখিদের হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ চারটি করে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের হৃৎপিণ্ডে থাকে তিন প্রকোষ্ঠ। দুইটি অলিন্দ আর মাত্র একটি নিলয় দিয়ে তাদের হৃৎপিণ্ড গঠিত।

সাধারণত পুরো শরীর থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃৎপিণ্ডে আসে। এরপর সেখান থেকে এ রক্ত ফুসফুসে যায় যেন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশতে পারে। তারপর তা আবার হৃৎপিণ্ডে আসলে হৃৎপিণ্ড সেই রক্ত পাম্প করে সমগ্র শরীরে পাঠিয়ে দেয়। মানুষের হৃৎপিণ্ডে এই অক্সিজেনযুক্ত আর অক্সিজেনবিহীন রক্ত আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের বেলায় একটা মাত্র নিলয়ে ট্র্যাবেকুলি নামক বিশেষ খাঁজের মাধ্যমে এই দুই ধরনের রক্ত আলাদা থাকে।

তিমির বিশালাকার হৃৎপিণ্ড

চিত্র: তিমির হৃৎপিণ্ড আস্ত মানুষের চেয়েও বড়

প্রায় ছোটখাটো একটা গাড়ির সমান বড় এবং ওজন প্রায় ৪৩০ কেজি। নীল তিমির হৃৎপিণ্ড জীবিত সকল প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের মতো এদের হৃৎপিণ্ডও চারপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। প্রায় দুটি স্কুলবাসের সমান বিশালাকার তিমির দেহে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রটিই কাজ করে থাকে।

সেফালোপডদের তিন হৃৎপিণ্ড

অক্টোপাস, সস্কুইড, কাটলফিসসহ কর্ষিকাযুক্ত এই শামুক প্রজাতির হৃৎপিণ্ড অন্তত তিনটি। একদিকে শরীরের দুইপাশে দুটি হৃৎপিণ্ড ফুলকার রক্তবাহিকার মাধ্যমে আসা রক্তকে অক্সিজেনযুক্ত করে। অন্যদিকে শরীরের কেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড সে অক্সিজেনযুক্ত রক্তকে পাম্প করে পুরা শরীরে ছড়িয়ে দেয়।

সেফালোপডরা মূলত নীল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। এদের রক্তে কপারের উপস্থিতি রয়েছে বলে রক্ত নীল দেখায়। মানুষের রক্ত লাল কারণ মানুষের রক্তে রয়েছে রয়েছে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের আছে আয়রন। অক্সিজেনযুক্ত হলে আয়রনের রঙ হয় লাল। কিন্তু সেফালোপডদের বিশেষ উপাদানের কারণে সেখানে অক্সিজেনযুক্ত রক্তের রঙ হয় নীল।

তেলাপোকার হৃৎপিণ্ড

তেলাপোকার রক্তসংবহনতন্ত্র হলো মুক্ত প্রকৃতির। অর্থাৎ এতে কোন ধমনীশিরা নামক আলাদা রক্তসরবরাহকারী নালী থাকে না। তার বদলে ১২ থেকে ১৩ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট অঙ্গের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।

তেলাপোকার দেহপৃষ্ঠের অবস্থিত সাইনাস এই ১৩ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হৃৎপিণ্ডে রক্ত পাঠাতে সহায়তা করে। কিন্তু এই হৃৎপিণ্ডকে তেলাপোকার দেহে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহের কাজ করতে হয় না। কারণ তেলাপোকার দেহে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র আছে। এদের স্পিরাকল বলে। এই এদের মাধ্যমে তেলাপোকার রক্ত বাতাস থেকে অক্সিজেন পেয়ে থাকে। তাই অক্সিজেন পাওয়ার জন্যে রক্তকে দেহের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয় না। তবে এদের হৃৎপিণ্ড কী কাজে লাগে? এদের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সমগ্র শরীরে প্রবাহিত হয়।

নকল হৃৎপিণ্ড

কেঁচোরা ‘হৃদয় দেয়া নেয়া’ করতে পারে না। কেননা এদের হৃৎপিণ্ডই নেই। এর বদলে এদের ৫টি ছদ্মহৃৎপিণ্ড থাকে। এগুলো খাদ্যনালীকে জড়িয়ে থাকে। এই ছদ্মহৃৎপিণ্ডগুলো রক্ত পাম্প করে না। বরং রক্তবাহিকাকে সংকুচিত করে রক্ত সরবরাহে সাযাহ্য করে। কেঁচোদের ফুসফুসও থাকে না। এরা দেহের সিক্ত আবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে।

মাটির নীচে কিংবা উপরে যখন কেঁচো সিক্ত থাকে তখন দেহাবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে কোষে প্রেরণ করে। এদের রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকে যা অক্সিজেন বহন করে। কিন্তু মানুষের মতো রক্তসংবহনতন্ত্র বদ্ধ নয়, মুক্ত প্রকৃতির।

জলজ প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড

যদি কোনো কারণে হৃদয় ভেঙে যায় তো জেব্রাফিশ তা আবার নতুন করে বানিয়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, ২০০২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিখ্যাত সাময়িকী সায়েন্স জানায়, জেব্রাফিশ তাদের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তাদের হৃৎপিণ্ড পুনরায় তৈরি করতে পারে।

মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজে নিজেই ক্ষতিপূরণ করে নিতে পারে। উভচর আর টিকটিকি তাদের লেজ পুনরোৎপাদন করতে পারে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড? এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। জেব্রাফিশের হৃৎপিণ্ড পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতার নমুনা থেকে ভবিষ্যতে হার্ট সম্বন্ধীয় ব্যাপারে আবিষ্কার হতে পারে চমৎকার কিছু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *