শরীর বাঁকানো রোগ ধনুষ্টঙ্কারের গল্প

ছোটবেলায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে কতো লোহা-পেরেকের গুঁতো খেয়েছি। মায়ের কাছ থেকে শুনতে হতো- ‘লোহার গুঁতো খেলে কিন্তু টিটেনাস ইনজেকশন দিতে হবে’। এর অভিজ্ঞতাও আছে, লোহার গুঁতো খেয়ে আমাকে ইনজেকশনের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তখন মনে করতাম, ধনুষ্টঙ্কার হলে ঘাড় মটকিয়ে যায়। তাই ছোটবেলায় পেরেককে ভয় পেতাম খুব। আজ এতদিন পর আমি সেই ধনুষ্টঙ্কারের জন্য দায়ী অণুজীব নিয়েই আলোচনা করতে বসেছি।

ধনুষ্টঙ্কার সৃষ্টির জন্য দায়ী মূল অণুজীব হলো Clostridium tetani. কিতাসাতো নামের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম মানবদেহ থেকে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি আলাদা করেন। এরা কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে তা জানার আগে এদের সাথে একটু পরিচিত হওয়া দরকার। এদের প্রথম পরিচয় এরা গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া। দেখতে রডের মতো এবং অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এরা বাঁচতে পারে না। এজন্য এদেরকে অবাত শ্বসনকারী বলা হয়। এমনিতে অধিক তাপ সহ্য করতে পারে না, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে স্পোর সৃষ্টি করে।

মাটিতে, মানুষ ও পশুর মলে এদের বিচরণ। তবে এরা এমনিতেই মানবদেহে সংক্রমিত হয় না। শরীরে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হলে সেই ক্ষতে যদি এরা প্রবেশ করে তবে ধনুষ্টঙ্কার হয়। এরা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে তবে গড়ে ৮ দিনের মতো সময় লাগে। নবজাতকের ক্ষেত্রে সময় লাগে গড়ে ৭ দিনের মতো।

একটি অণুজীব শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ সৃষ্টি করবে, এমন কিন্তু না। প্রত্যেক অণুজীবের নিজস্ব উপাদান থাকে যার মাধ্যমে সে রোগ সৃষ্টি করে। ইংরেজিতে যাকে বলে virulence factor. C.tetani’র ক্ষেত্রে সেই উপাদানটি হলো একটি টক্সিন, টিটানোস্পাসমিন (Tetanospasmin).

আমাদের শরীরের পেশী সংকোচন করে এসিটাইলকোলিন। ইনহিবিটোরি নিউরো-ট্রান্সমিটার এসিটাইলকোলিনকে শরীরে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে পেশী স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। কিন্তু টিটানোস্পাসমিন ইনহিবিটোরি নিউরোট্রান্সমিটারকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে শরীরে অস্বাভাবিক পেশী সংকোচন দেখা দেয়।

image source: medicalnewstoday.com

প্রথম দিকের এ রোগের উপসর্গ, মুখের চোয়াল লেগে যাওয়া। যাকে ‘লক জ’ (Lock jaw) বলে। অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো খিঁচুনি, খাবার গিলতে সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ঘাম, জ্বর ইত্যাদি। পেশীর অত্যধিক সংকোচনের ফলে স্পাইনাল কর্ড কিংবা শরীরের হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। শ্বাস প্রক্রিয়াও ব্যহত হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

ধনুষ্টঙ্কার চার ধরনের হতে পারে। একটি হলো সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার। আমরা ধনুষ্টঙ্কার বলতে মূলত একেই বুঝি। এটা আক্রান্ত স্থান থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রথম উপসর্গ হলো ‘লক জ’ বা চোয়াল লেগে জাওয়া। ধীরে ধীরে বাকি উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক মাস সময় লাগে।

দ্বিতীয় প্রকার ধনুষ্টঙ্কার হলো লোকালাইজড (Localized) ধনুষ্টঙ্কার। এর মানে হলো আক্রান্ত স্থানেই এই ধনুষ্টঙ্কার সীমাবদ্ধ থাকে। এই ধনুষ্টঙ্কার খুবই কম হয়। এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

তিন নম্বর ধনুষ্টঙ্কারটি হলো সেফালিক (Cephalic) ধনুষ্টঙ্কার। এটাও এক ধরনের লোকালাইজড ধনুষ্টঙ্কার। এটা আমাদের ক্রেনিয়াল নার্ভকে আক্রান্ত করে। ফলে মুখের পেশী আক্রান্ত হয়।

চিত্রঃ স্টেইনিংয়ের পর C.tetani কে টেনিস রেকেটের মতো দেখায়

সর্বশেষ ধনুষ্টঙ্কারটি হলো নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার। জন্মের পর নাড়ি কাটার সময় যদি জীবাণুযুক্ত কাচি ব্যবহার করা হয় তখন এ রোগের সংক্রমণ হয়। কিছু কিছু সংস্কৃতিতে নাড়ি কাটার পর তাতে গরুর গোবর দেয়া হয়। কি সাঙ্ঘাতিক! এ যেন দাওয়াত দিয়ে ধনুষ্টঙ্কার ডেকে নিয়ে আসা! যদিও এই রোগ ধীরে ধীরে কমছে তবুও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও এই রোগের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় করা যায় না। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় মূলত রোগের উপসর্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়। কারণ C.tetani চিহ্নিত করার সমস্যা। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৩০% C.tetani শনাক্ত করা যায়। এমনকি সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও C.tetani চিহ্নিত হতে পারে। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয়ের আরেকটি উপায় হলো স্পাটুলা টেস্ট।

ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধের জন্যে Tetanus toxoid টীকা নেয়া হয়। CDC এর মতে প্রতি দশ বছর পর পর ধনুষ্টঙ্কারের টীকা নেয়া উচিৎ। ধনুষ্টংকার চিকিৎসার জন্যে metronidazole, diazepam ব্যবহার করা হয়। শুরুতে পেরেক আর ধনুষ্টংকার নিয়ে যে কথা বলেছিলাম সেক্ষেত্রে বলে রাখি পেরেক বা লোহা বিঁধলেই যে ধনুষ্টংকার হবে এমন কোন কথা নেই। ধনুষ্টংকার হতে হলে সেই পেরেকে C.tetani থাকতে হবে।

featured image: oshatrainingu.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *