উদ্ভিদের অভিযোজনের অনন্য কৌশল

উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে বৈচিত্র্যময় পরিবেশের সাথে তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং জীবনধারণ পদ্ধতি মানিয়ে নিতে পারে। খাপ খাইয়ে চলতে পারে। বিশেষ এই বৈশিষ্ট্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো তাদেরকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এদের মাঝে কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে যাদের অভিযোজন ক্ষমতা একদমই অনন্য।

রেইন ফরেস্ট এবং জলাভূমি অঞ্চলে উর্বর মাটির পরিমাণ কম। সেখানকার উদ্ভিদ যদি শুধু মাটির উপর নির্ভর করে থাকে তাহলে তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটবে না। তাই টিকে থাকতে হলে এসব উদ্ভিদের বিকল্প কোনো উপায় বের করে নিতেই হবে। এ ধরনের কিছু উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা থাকছে এখানে।

ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ

মাটি এদের পুষ্টির যোগান দিতে পারে না। তবে অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ অভিযোজিত হয়েছে মাংসাশী উদ্ভিদ হিসেবে। এদের পাতায় এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ রয়েছে যা অন্যান্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে।

যখন কোনো পতঙ্গ লোভে পড়ে ভুল করে পাতার স্পর্শক অঙ্গে ছোয়া দেয়, তখনই সম্পূর্ণ পাতা গুটিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর হজম সহায়ক নল দিয়ে পতঙ্গের নরম অংশ ভেঙ্গে ফেলে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়। প্রায় একদিন পর পতঙ্গের কঙ্কাল ও উচ্ছিষ্ট অংশ ত্যাগ করে ফেলে দেয়।

ভেনাস ফ্লাইট্রাপের দুই পাতার ভাজে প্রায় ৬ টি স্পর্শক অঙ্গ থাকে। সেসবে কোনো পতঙ্গের ছোঁয়া লাগলে পাতা দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফাঁদটা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ক্ষুদ্র পতঙ্গ বেড়িয়ে আসতে পারে যেগুলো পুষ্টি যোগাতে সক্ষম নয়।

চিত্র: ফাঁদে আটকা পড়া পতঙ্গ।

ইন্ডিয়ানা পাইপ

এরা দেখতে অনেকটা মাশরুমের মতো সাদা রঙের। পরিপূর্ণ বয়সে এদের দেহে ফ্যাকাশে হালকা বাদামী রং ধারণ করতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের দেহে কোনো পাতা থাকে না। ক্লোরোফিলের অভাবে নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না। এর বিকল্প হিসেবে এরা পরভোজী ছত্রাকের সাথে আত্মীয়তা করে। ইন্ডিয়ান পাইপ তাদের মূল দিয়ে ছত্রাকের দেহকে ঘিড়ে ফেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে নেয়।

কলসী উদ্ভিদ

এদের পাতা দেখতে লম্বা কলসের মতো। এভাবেই এরা বিবর্তিত হয়েছে। এরাও মাংসাশী। পাতার অংশ বিশেষ এক ধরনের তরলের সুবাসে ভরপুর। এই সুবাস অন্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। যখন কোনো পতঙ্গ পাতার অভ্যান্তরে ঢুকে পড়ে ঠিক তখনই শিকারী পাতার ঢাকনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর শিকারী পাতা নল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এবং পতঙ্গকে পাতার নিচের অংশের তরলে ভাসিয়ে দেয়। এরপর হজম করার জন্য এসিড এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে সৃষ্ট এনজাইম দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান পুষ্টি শোষণ করে।

কলসী উদ্ভিদ যখন পুর্ণবয়স্ক হয় তখন শিকারি ঢাকনা উন্মুক্ত হয়। ঐ অবস্থায় ফাঁদটি শিকার ধরার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে থাকে। কলসীর অভ্যন্তরে কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পতঙ্গ বাস করে। যেমন উড়ন্ত মশা-মাছির লার্ভা ইত্যাদি। দেহের অভ্যান্তরে ব্যকটেরিয়া বসবাস করে যা এনজাইম উৎপন্ন করে কলসী উদ্ভিদের হজম কাজে সাহায্য করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে সহায়ক পাতা জন্মে যা তাদের কোথাও ঝুলে থাকতে বা আঁকড়ে ধরে থাকতে সাহায্য করে।

ব্রমেলিডাস

এদের মাটির প্রয়োজন হয় না। মাটির পরিবর্তে এরা মূল দিয়ে অন্য উদ্ভিদকে আঁকড়ে ধরে থাকে। ব্রমেলিডাস উদ্ভিদ সকল ধরনের আর্দ্রতা এবং পুষ্টি উপাদান বাতাস থেকে সংগ্রহ করে। উড়ে আসা পাতা বা আবর্জনা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। পাতাগুলো সর্পিলাকার হবার কারণে সহজেই শিশির কিংবা বৃষ্টি থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে নিতে পারে।

এই উদ্ভিদগুলো ছোটখাটো বাস্তুসংস্থানের মতো কাজ করে। যেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, পতঙ্গ, পোকামাকড় এমনকি ব্যাঙও আছে। এই উদ্ভিদকে কিছু প্রজাতির পতঙ্গ বসত-বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বসবাসকারী পতঙ্গের মলমুত্র ও ময়লা আবর্জনা এদের বেড়ে ওঠার কাজে লাগে।

তথ্যসূত্র: The Big Idea – Science Book (DK)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *