কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী মহামারী

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব গিয়েনার গ্রাম মিলেন্ডাও-তে দুই বছর বয়সী একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির নাম এমিল ওয়ামনো। প্রথমে তার জ্বর হয়। তারপর তীব্র বমি ও সাথে রক্ত আমাশয়। গ্রামে এ ধরনের রোগ কেউ আগে দেখেনি। শিশুটির পরিবারের লোকজন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শিশুটি মারা গেলো। তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল একটি ভাইরাস।

এই ভাইরাসটি তার পরিবারের মাঝেও ছড়িয়ে যায়। শীঘ্রই শিশুটির ৪ বছর বয়সী বোনটিও একই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। একই ঘটনা ঘটে ওয়ামনোর মা ও দাদীর সাথে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো তারা সবাই মারা গেছেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে।

যদি ভাইরাসটি আর না ছড়াতো তাহলে মিলেন্ডাও গ্রামের বাইরে আর কেউ এই পরিবারের করুণ পরিণতির কথা জানতো না। কারণ গিয়েনাতে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষই মারা যায়। কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সে সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ শতাংশ লোকই মারা যেতো।

ওয়ামনোর পরিবার থেকে এই ভাইরাস একজন নার্স ও গ্রামের একজন ধাত্রীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। ধাত্রীটিকে সেবা শুশ্রূষার জন্য তার গ্রামে নেয়া হলে সেখানও ভাইরাস ছড়িয়ে যায়। আর যারা এমিলি ওয়ামনোর দাদীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তারাও তাদের গ্রামে ভাইরাস নিয়ে গেলেন।

খুব দ্রুত ভাইরাসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে গেলো। কারণ মিলেন্ডাও গ্রাম গিয়েনা, সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। আর মিলেন্ডাওয়ে সবাই ব্যবসা কিংবা আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আসতো। ভাইরাসটি তখনও কিছু কিছু গ্রামে ছড়াচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীর অতটা টনক নড়েনি এই ব্যাপারে। ২০১৪ সালের মার্চে গিয়েনার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ এই রোগের কারণ হিসেবে ইবোলা ভাইরাসের নাম ঘোষণা করলেন। তখন সারা পৃথিবী এই রোগের ভয়াবহতা ব্যাপারে জানতে পারলো।

কিছু ভাইরাস আমাদের পূর্ব শত্রু। রাইনো ভাইরাস প্রথম আক্রান্ত করেছে মিশরীয়দের। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাস দশ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের জিনোমে প্রবেশ করেছে। অন্য ভাইরাসরা তুলনামুলকভাবে নতুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এইচআইভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র এক শতক হলো। নতুন ভাইরাসরাও মহামারী সৃষ্টি করছে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হতে যাচ্ছে ইবোলা।

ইবোলা ভাইরাস তার ভয়ংকর যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে যায়রে নামক এক দূরবর্তী অঞ্চলে। আক্রান্ত লোকেরা জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বমি করে। কিছু রোগীর শরীরের সকল ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে থাকে। এমনকি চোখ থেকেও! একজন ডাক্তার এক মুমূর্ষু সন্ন্যাসিনীর রক্তের নমুনা নিয়ে কিনহাসাতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পিটার পাইয়ট নামের একজন ভাইরাসবিদ নমুনাগুলো ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সাপের আকৃতির কিছু ভাইরাস দেখতে পান।


চিত্র: ইবোলা ভাইরাস

সেই সময় বিজ্ঞানীরা সর্পাকৃতির আরেকটি ভাইরাস সম্বন্ধে জানতেন। ভাইরাসটির নাম মার্গবার্গ ভাইরাস। মার্গবার্গ ভাইরাসটির নাম এসেছে জার্মানির মার্গবার্গ শহর থেকে। ওই শহরের ল্যাব কর্মীরা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করার ফলে রক্তক্ষরণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাইয়ট বুঝতে পারেন তিনি যে ভাইরাসটি দেখেছেন তা মার্গবার্গ ভাইরাস নয়। বরং তার কোনো আত্মীয়।

পাইয়ট ও তার সহকর্মীরা ভাইরাসটির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জায়েরার গ্রাম ইয়ামবুকুতে চলে গেলেন। তারা একটা অতিথিশালা খুঁজে পেলেন যেখানে যাজক ও সন্ন্যাসিরা দড়ি দিয়ে সে জায়গাটুকু আলাদা করে রেখেছেন যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। দড়ি থেকে একটা সাইন ঝোলানো আছে যাতে লেখা “অনুগ্রহ করে থামুন। যে এই লাইন অতিক্রম করবে সে মারা যেতে পারে।”

পাইয়ট ও তার দল একটা সমীক্ষা করলেন। তারা বের করলেন কে কে আক্রান্ত হয়েছে এবং কখন হয়েছে। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা হামের মতো বাতাসে ছড়াচ্ছে না। বরং রোগীর শরীরের তরল পদার্থ দিয়ে তা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতাল যেগুলোতে একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে ওখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যেসব মানুষ এসব রোগীর সেবা করছে কিংবা মৃত দেহের গোসলের কাজ করছে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাস ভয়ংকর হলেও এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা ছিল খুব সহজ। পাইয়ট ও তার দল হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিলেন। আর কেউ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখলেন। তিন মাস পরে মহামারী থামলো। ফলাফল ৩১৮ জনের মৃত্যু। পাইয়ট যদি এ উদ্যোগ না নিতেন তাহলে হয়তো মহামারীর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারতো। এখন বাকি রইলো ভাইরাসটিকে একটি নাম দেয়া। পাইয়ট পাশে বয়ে যাওয়া একটি নদীর দিকে তাকালেন। নদীর নাম ‘ইবোলা’।

চিত্র: ৪০ বছর আগে পিটার পাইয়ট আবিষ্কার করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস।

একই বছর সুদানেও ইবোলা দেখা দেয়। এতে ২৮৪ জন মারা যায়। তিন বছর পর সুদানে আবার ইবোলা দেখা দেয়। এবার মারা যায় ৩৪ জন। তারপর বছর পনেরোর জন্য ইবোলাকে আর দেখা যায়নি। ১৯৯৪ সালে এটি গেবনে আঘাত হানে। ফলাফাল ৫২ জনের মৃত্যু।

প্রতিবার ইবোলার এই আঘাতের সাথে পাইয়টের পরবর্তী বিজ্ঞানীরা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে লাগলেন। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত এবং বাকিদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে তারা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ করার চেষ্টা করতো। কারণ ওই সময় কোনো ভ্যাক্সিন বা অন্য কোনো ওষুধ ছিল না।

সঠিক পরিবেশ পেলে অনেক ভাইরাসই মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু হাম অথবা জলবসন্তের মতো রোগ একবার মহামারী হওয়ার মাধ্যমে হারিয়ে যায় না। এরা তখনও কম মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আলাদা। ইবোলার একবার মহামারী হলে অনেক বছর ধরে আর কোনো মহামারী হয় না। দীর্ঘ সময় পর সে তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবার হাজির হয়।

মাঝখানের বছরগুলোতে ইবোলা কোথায় হারিয়ে যায়? ভাইরাসবিদরা এই ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। তারা দেখলেন গরিলা ও শিম্পাঞ্জীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা বাদুড়েও ইবোলার বিরুদ্ধে এন্টিবডি পেলেন। কিন্তু বাদুর এই ভাইরাস সহ্য করতে পারে। এমন হতে পারে ইবোলা এমনিতে বাদুর থেকে বাদুরে ছড়ায় কোনো রোগ তৈরি ছাড়া। আর সময়ে সময়ে মানুষে মহামারী সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাস আমাদের কাছে নতুন হলেও এই ভাইরাস আসলে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরে ইবোলার মতো একটা ভাইরাসের জিন পেয়েছেন। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাসের মতো এই ভাইরাস তার পোষকের দেহে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে গিয়েছে। ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরের পূর্বপুরুষ বাস করতো আজ থেকে ষোল মিলিয়ন বছর আগে। আর তখনই হয়তো ইবোলা ভাইরাস তার নিকট আত্মীয় মার্গবার্গ ভাইরাস হতে বর্তমান রূপে অবতীর্ণ হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইবোলার বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস স্তন্যপায়ীদের আক্রান্ত করে আসছে। অনেক পোষকে তারা কোনো ক্ষতি করতো না। ওই পোষক থেকে অন্য প্রজাতির কোনো পোষকে গেলে হয়তো তা তার জন্য মারণরূপ ধারণ করতো। ইবোলার শেষ আশ্রয় মানুষ।

এমন হতে পারে মানুষ যখন আক্রান্ত পশুর মাংস খায় কিংবা বাদুরের লালা যুক্ত ফল খায় তখন সে ইবোলায় আক্রান্ত হয়। ইবোলা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষকে আক্রান্ত করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভয়াবহ ডাইরিয়া, বমি এবং অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়।

ইবোলা একজন মানুষকে আক্রান্ত করার পরে তা অন্য কারও কাছে ছড়াবে কি ছড়াবে না তা নির্ভর করে পাশের মানুষগুলো কাজকর্মের উপর। যদি তারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তাহলে তারাও ইবোলা দিয়ে আক্রান্ত হবে। ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ৩৭ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় প্রথম মহামারী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ইবোলা ভাইরাস হারিয়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রত্যেকেই হয়তো মারা গিয়েছিল।

গত ৩৭ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ সালে আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল ২২১ মিলিয়ন। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ বিলিয়নের উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়ানোই অনেক কঠিন ছিল। এখন বনজঙ্গল কেটে শহর হচ্ছে। বাড়ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর সাথে বাড়ছে ইবোলার সংক্রমণ।

কিন্তু গিয়েনা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনি এর মতো দেশে গণস্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর দারিদ্রের ফলে এসব দেশে ডাক্তার ও হাসপাতালের সংখ্যা কম। আর ইবোলায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরাও এতে আক্রান্ত হয়। ফলে মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব পড়ে।

চিত্র: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরাও ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের নাগরিক পলিনকে যিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কেউ জানে না এমিলি ওয়ামনো কীভাবে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু থেকে ছড়ানো ভাইরাসটিই ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী সৃষ্টি করে। দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে তাদেরকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পোলিও নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ইবোলাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিম আফ্রিকার সরকারগুলো ইবোলায় আক্রান্ত পুরো গ্রাম কিংবা এলাকাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকলো। কারণ তাদের আর কিছু করার ছিল না। আর অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

ইবোলা সর্বপ্রথম বাইরের দেশে যায় এরোপ্লেনের মাধ্যমে। একবার ইবোলায় আক্রান্ত এক কূটনীতিবিদ প্ল্যানে নাইজেরিয়া যান। ওখানে তার ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আরেকটি প্ল্যানে একজন আক্রান্ত নার্সকে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আর দুইটি প্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাস আসে। একটা হোস্টনে আরেকটা নিউইয়র্কে।

আফ্রিকার বাইরের খুব কম মানুষ ইবোলা সম্বন্ধে জানতো। একটু আধটু যা জানতো তা রিচার্ড প্রেস্টনের ‘দ্য হট জোন’ এর মতো ভীতিকর বই কিংবা ‘আউটব্রেক’ নামের কাল্পনিক মুভি থেকে। পুরো আমেরিকা ইবোলার ভয়ে ভীত ছিল। ২০১৪ সালের নেয়া এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করে আমেরিকায় ইবোলার মহামারী হতে পারে। ৪৩ শতাংশ লোক মনে করেন তিনি ইবোলায় আক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে গেলো যে ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখ খবর এলো যে ডাক্তার গিয়েনাতে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন। রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে তিনি এক জায়গায় বোলিং করতে যান।

উদ্বিগ্ন পাঠকরা নিউইয়র্ক টাইমসকে জিজ্ঞেস করতে থাকে বল থেকে ইবোলা ছড়াতে পারে কিনা। সাংবাদিক ডোনাল্ড ম্যাকনিল জুনিয়র খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ইবোলায় আক্রান্ত কেউ যদি রক্ত, বমি কিংবা মল বলে রেখে যায় আর আরেকজন যদি তাতে হাত রাখে। পরে সেই হাত চোখে, নাকে কিংবা নাকে লাগায় তাহলে ইবোলা ছড়াতে পারে।”

এত আশঙ্কার পরেও আমেরিকাতে ইবোলার কোনো মহামারী হয়নি। এমনকি অন্য কোথাও হয়নি। নাইজেরিয়াতে ২০ জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে আটজন মারা যায়। সেনেগালে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়। মালিতে মহামারী বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এসব দেশ মহামারী ঠেকাতে সক্ষম হওয়ার একটা কারণ হলো তাদের কাছে আগে থেকে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল। অন্যদিকে লাইবেরিয়া, গিনিয়া এবং সিয়েরা লিওনিতে ইবোলার সংক্রমণ চলতে থাকে। এসব দেশে ইবোলার সংক্রমণ এতই বেশি যে সেখানে এতো সহজে তা থামার নয়।

বিশেষজ্ঞরা ইবোলার এই মাত্রা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ দশমিক ৪ মিলিয়নে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং কিউবা সেসব আক্রান্ত এলাকায় ডাক্তার ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

নতুন ইবোলা হাসপাতাল তৈরি হলো। গণস্বাস্থ্য কর্মীরা মানুষকে সচেতন করে দিলো যাতে তারা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সাবধানের সাথে দাফন করে। যাতে করে মৃত ব্যক্তি থেকে জীবাণু না ছড়ায়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে লাইবেরিয়া, গিনিয়াতে মহামারীর মাত্রা কমতে থাকে। পরের কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক কমে যায়।

তবে মনে করার কোনো কারণ নেই যে এই মহামারী শেষ হলেই ইবোলা চিরতরে বিদায় নেবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে যেখানে ইবোলা ভবিষ্যতে আঘাত হানতে পারে, কোন কোন প্রাণীতে এই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে আর ওই এলাকায় মানুষের বসবাসের অবস্থার তার উপর ভিত্তি করে এই ম্যাপটি করা হয়েছে।

এই ম্যাপের বেশিরভাগ অংশ মধ্য আফ্রিকা জুড়ে। আর বাকি অংশগুলো তানজানিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই ম্যাপ অনুসারে ২২ মিলিয়ন লোকের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আর আফ্রিকার লোক যত বাড়ছে এই ঝুকিও দিন দিন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিত্র: ইবোলা সংক্রমণের অনুমিত ম্যাপ।

ইবোলার মতো এরকম আরও অনেক ভাইরাস নানা সময় আবির্ভাব হয়েছে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের এক কৃষক অতিরিক্ত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে চীনের ওই অঞ্চলের লোক ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে থাকে। কিন্তু সবাই তখনো এই রোগ সম্বন্ধে জানতো না।

একবার এক আমেরিকান ব্যবসায়ী চীন থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে এরোপ্লেনে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্লেনটি হানই এ থামে এবং লোকটি মারা যায়। এই ঘটনার ফলে পুরো বিশ্বে নাড়া পড়ে। সারা পৃথিবী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় চীন ও হংকং। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ লোক মারা যায়। ডাক্তাররা এই নতুন রোগের নাম দেন সার্স (Severe acute respiratory syndrome)।

চিত্র: সার্স ভাইরাস।

বিজ্ঞানীরা এই রোগে আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলেন। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মালিক পেইরিস ও তার দল এই রোগের কারণ খুঁজে পান। এই ভাইরাসটি ছিল করোনাভাইরাস (Coronavirus) গ্রুপের। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করলেন এইচআইভি এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো সার্স ভাইরাসও হয়তো এমন কোনো ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়েছে যা কোনো পশুকে আক্রমণ করতো।

চীনের মানুষেরা যেসব পশুর সাথে সচরাচর বেশি সংস্পর্শে থাকে তাদের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এভাবে তারা সার্স ভাইরাসের বিবর্তন বৃক্ষ পেয়ে গেলেন। জানা হলো সার্স ভাইরাসের ইতিহাস।

এই ভাইরাস হয়তো প্রথমে চীনের বাদুড়ে পাওয়া যায়। বাদুড় থেকে বিড়াল সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘সিভিট’ (Civet)-এ ছড়ায়। সিভিট চীনের পশু বাজারে নিত্যদিন দেখা যায়। সিভিট থেকে এই ভাইরাস পরে মানুষে ছড়ায়। আর এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়াতে পারে। যেমন হাঁচি-কাশির মতো খুব সাধারণ ব্যাপার থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

ইবোলা সংক্রমণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল সার্সের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সেগুলো সফলও হয়। সার্সের ফলে ৯০০০ লোক এতে আক্রান্ত হয় এবং ৯০০ লোক মারা যায়। আর এরকম ফ্লু-তে আড়াই লাখ মানুষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। সার্স সে তুলনায় খুব অল্পতেই সেরে গিয়েছে বলা যায়।

এর এক যুগ পর আরেক ধরনের করোনাভাইরাস সৌদি আরবে দেখা যায়। ২০১২ সালে সৌদি আরবের ডাক্তাররা দেখতে পেলেন তাদের রোগীরা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা এই রোগ আসলে কী নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আক্রান্ত রোগীর এক তৃতীয়াংশ এই রোগে মারা যায়।

রোগটি MERS (Middle Eastern Respiratory Syndrome) নামে পরিচিত হয়। খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভাইরাসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ভাইরাসের জিনোমে সিকুয়েন্সিং করে তারা এর কাছাকাছি একটি ভাইরাস আফ্রিকার বাদুড়ের মধ্যে পেলেন।

আফ্রিকার বাদুড় থেকে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রোগ ছড়াতে পারে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। তারা সৌদি আরবের মানুষের জীবন যার উপর নির্ভর করে তাকে গবেষণা শুরু করলেন। আর তা হলো উট। তারা উটের সর্দিতে MERS ভাইরাস পেলেন।

এখন প্রশ্ন আসে আফ্রিকার বাদুড় হতে মধ্যপ্রাচ্যের উটে এই ভাইরাস কীভাবে আসলো? এর কেবল একটাই উত্তর হতে পারে। বাদুড় হতে উত্তর আফ্রিকার উটে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়ায়। আর উত্তর আফ্রিকা হতে মধ্যপ্রাচ্যে উট কেনাবেচা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে উত্তর আফ্রিকার আক্রান্ত কোনো উট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উটগুলো MERS ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

SARS থেকে MERS আরও অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৌদি আরবে প্রতি বছর দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ সারা পৃথিবী থেকে হজ্জ করতে আসে। তাই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য এটা খুব ভালো পরিবেশ।

মানুষগুলো তখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজের দেশে গেলে ওখানেও সেই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০২৬ জন লোক MERS এ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গিয়েছে ৩৭৬ জন। আর এই ঘটনাগুলো সবই সৌদি আরবের ভেতরে। সৌদি আরবের বাইরে এই ভাইরাস এখনো ছড়ায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই ভাইরাস শুধুমাত্র দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মানুষেই রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের জন্যে একটা হুমকির কারণ হতে পারে।

চিত্র: হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয়, যা মহামারীর জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হজযাত্রী এবং হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভাইরাসের মহামারীর ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরকে খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরবর্তী মহামারীর ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী হতে আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে। আমরা হয়তো সেই ভাইরাস সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্যে বিজ্ঞানীরা পশুর মধ্যকার ভাইরাস সমীক্ষা করছেন।

কিন্তু আমরা যেহেতু ভাইরাসের কিলবিল করা পৃথিবীতে বাস করি তাই এই কাজটা বেশ কঠিন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক শহরে ১৩৩টি ইঁদুর ধরেন এবং ১৮ ধরনের ভাইরাস পান যা মানুষে আক্রমণকারী জীবাণুর কাছাকাছি। আরেক গবেষণায় বাংলাদেশের এক প্রজাতির বাদুড়ের উপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায় বাদুড়ে পাওয়া ৫৫টি ভাইরাসের ৫০টি ভাইরাসই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা!

এই অজানা ভাইরাসের কোনো একটি থেকে হয়তো সামনে বড় ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। তার মানে এই না যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। ভাইরাসগুলো যাতে অন্য প্রাণী হতে আমাদের মধ্যে না ছড়াতে পারে সেজন্যে সব ধরনের ব্যবস্থা আমাদের নিয়ে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses, Carl Zimmer

featured image: sciencealert.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *