ব্যাঙ যখন বোকা শিকারী

১৯৯৭ সালে বের হওয়া অ্যানাকোন্ডা মুভিতে গল্পের খাতিরে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার দেখানো হয়েছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো যে, অ্যানাকোন্ডা তার গিলে ফেলা শিকারকে জ্যান্ত উগড়ে বের করে দেয় আরেকবার হত্যার রোমাঞ্চ পেতে। প্রকৃতপক্ষে অ্যানাকোন্ডার গেলার সময় শিকারকে যে ধরনের সংকোচন প্রসারণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বের হবার সময় তাতে আর প্রাণপাখির পালকটাও থাকে না।

bombardier beetle
ফোরসেপ দিয়ে উত্যক্ত করায় বোম্বার্ডিয়ার বিটলের ঘটানো বিস্ফোরন; image source: Nbcnews

তবে কিছু কিছু পান্ডব আছে, যারা শিকারির পেটের ভিতর থেকে ঘুরে আসতে পারে। এরকম একটি হচ্ছে বোম্বার্ডিয়ার বিটল। এরা এক ধরনের জ্বালাময় রাসায়নিক নিক্ষেপ করে বলে তাদের এমন নাম। দুটো আলাদা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত আপাত নিষ্ক্রিয় দুই ধরনের রাসায়নিক উপাদান যখন মিশ্রিত হয় তখন এক ধরনের বিস্ফোরণ হয়। এই বিটলরা সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার এমন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। যার ফলে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রাসায়নিক তার শরীর থেকে ঘন্টায় ২২ মাইল বেগে বের হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় বেশিরভাগ শিকারি ভয় পেয়ে গেলেও ব্যাঙ এর কাছে বোম্বার্ডিয়ার কিছুটা অসহায়। কারণ ব্যাঙ এত দ্রুত তার জিহবা দিয়ে ছোঁ মারে যে পোকাটি কিছু বুঝে উঠার আগেই পেটের ভিতর চলে যায়। তবে এরপর পোকাটি ব্যাঙের পেটের ভিতরই যখন তার অস্ত্র চালায় তখন বাইরে থেকেও তার শব্দ পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক বিষাক্ত না হলেও এতটাই বিচ্ছিরি যে ব্যাং তাকে উগলে দিতে বাধ্য হয়। তবে, ব্যাঙের কিন্তু আমাদের মতো গ্যাগ রিফ্লেক্স নেই যার কারণে সে বমি করতে পারে না। তাদের একমাত্র উপায় পাকস্থলিকে উল্টে ফেলা। যা করতে তার ৪৫ মিনিট সময় লাগে। এই পোকাগুলো নিজেরা কিন্তু বিষাক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ফোরসেপ দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরক্ত করার পর যখন তাদের বিস্ফোরক সম্পুর্ণ্রুপে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তারপর কিন্তু ব্যাঙ এদের আরামেই খেয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে বোম্বার্ডিয়ারের মধ্যেও কিন্তু পাকস্থলির এসিডপূর্ণ পরিবেশেও বহুক্ষণ টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে।

ব্যাঙের পেট থেকে ছাড়া পাবার আরো কিছু ঘটনা রয়েছে। ২০০২ সালে পূর্ব তিমুরে অভিযানের সময় মার্ক’ও শেয়া তার ল্যাবের দরজা খোলা রাখার জন্য একটা পাথর খুঁজতে যান। একটাকে সুবিধাজনক মনে হওয়ায় যখন সেটা তুলতে গেলেন দেখা গেলো পেছনে একটা কোলাব্যাঙ এবং তার পিছন দিয়ে বের হয়ে আছে একটা ব্রাহ্মিনি সাপ। এই সাপটি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো। ফুলের টবে লুকিয়ে থাকার স্বভাবের কারণে এরা সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে গেছে। অন্ধকার, অক্সিজেন শূন্য কিংবা সংকোচনশীল পরিবেশে এরা টিকে থাকতে পারলেও ব্যাঙের পশ্চাৎদেশ এদের প্রাকৃতিক আবাসন নয়। ব্যাঙটি হয়তো তাকে কেঁচো ভেবে গিলে ফেলেছিল এবং সর্পসাহেব তার ভক্ষকের সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্র ঘুরে এসে পেছন দিয়ে বের হতে চেষ্টা করছে। ও’শিয়া এদেরকে ধরে নিয়ে আলাদা হতে সাহায্য করেন। সাপটি অবশ্য এর পর আর কয়েক ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনি।

brahminy blind snake
ব্রাহ্মিনি সাপ, image source: californiaherps.com

কিছু কিছু প্রাণীর জন্য কিন্তু ভক্ষিত হওয়া সুবিধাজনক। বহু শামুক পাখির পেটে গেলেও বেঁচে থাকে আর এভাবে করে দূর দূরান্তে ছড়াতে পারে। যদিও ডাঙ্গার শামুকের চলাচলের প্রকৃতি খুবই ধীর, কিন্তু পাখির মাধ্যমে তারা ভিন্ন মহাদেশেও পৌঁছে যেতে পারে, যে সম্ভাবনার কথা ডারউইন বলে গিয়েছিলেন আর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন।

epomis beetle infesting on frog
ইপোমিস বিটলের লার্ভা দ্বারা আক্রান্ত ব্যাঙ

কখনো কখনো কিন্তু ভক্ষিত প্রাণী তার ভক্ষনকারীর অবস্থা নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে। গিল উইজেন এবং আভিতাল গাসিথ এমনই এক নজির পেয়েছেন ইপোমিস বিটল সম্পর্কে জানতে গিয়ে। এই পোকারা ব্যাঙ ছাড়া কিছু খায় না। ব্যাঙ যখন এদের ধরার জন্য জিভ ছোটায় তখন এরা সুকৌশলে আক্রমণকারীর মুখ কামড়ে ধরে এবং ধীরে ধীরে তাকে খেয়ে নেয়। বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০০ পর্যবেক্ষণে প্রতিটাতেই জিতেছিলো ইপোমিস। শুধু একটা ঘটনায় প্রথমে ইপোমিস হেরে যায়। কিন্তু ২ ঘন্টা পর ব্যাঙটি ইপোমিসকে উগড়ে দেয়ার পর নাটকীয়ভাবে সে তার খাদককে খেতে শুরু করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *