in , , ,

প্রকৃতিতে কেন ষড়ভুজের ছড়াছড়ি

মৌমাছির বাসা বা মধুর চাককে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাহলে সেখানে স্তরে স্তরে সজ্জিত ষড়ভুজের সজ্জা পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য তারা যে ঘর বানায় তার স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ষড়ভুজ আকৃতির প্রত্যেকটি খোপের দেয়ালের কৌণিক ঢাল সমান। খোপ ও দেয়ালের পুরুত্বও একদম ঠিকঠিক বাহুল্যবর্জিত হতে থাকে।

ষড়ভুজাকার খোপগুলো এমনভাবে হেলে থাকে যেন তরল মধুর সামান্য অংশও নিচে না পড়ে। সবগুলো খোপ একই আকারের একই আকৃতির। কোনোটার কম-বেশ হয় না। পুরো বাসাটা আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থান করে।

এমন নিয়মতান্ত্রিক গঠন কেন? আর মৌমাছিরা কীভাবেই বা এরকম স্থাপত্য তৈরি করে? দুই একটা বাসায় যদি এরকম সজ্জা পাওয়া যেত তাহলে কোনো একটা কিছু দিয়ে চালিয়ে দেয়া সম্ভব হতো, কিন্তু মৌমাছির প্রতিটি বাসাতেই এরকম সজ্জার উপস্থিতি থাকে। তার উপর একটি বাসায় শত শত মৌমাছি কাজ করে।

বারোয়ারী সদস্যের কাজে বেমিল ও হেরফের হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো এক কারণে মৌমাছির বাসাগুলোতে চমৎকার নিয়মতান্ত্রিকতা দেখা যায়। এরকম নিয়মতান্ত্রিকতার উপস্থিতির কারণে একে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

গ্রিক দার্শনিক পাপাস মনে করতেন, মৌমাছিরা স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা এরকম স্থাপত্য তৈরি করতে পারে। উইলিয়াম কার্বি নামে একজন ব্যক্তি ১৮৫২ সালে বলেছিলেন, মৌমাছিরা হচ্ছে ‘স্বর্গ থেকে তৈরিকৃত গণিতবিদ’।

কিন্তু প্রকৃতিবিদ চার্লস রবার্ট ডারউইন এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি মৌমাছিদের এমন ক্ষমতার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। এর জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছিলেন। পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলেন মৌমাছিদের এই ক্ষমতা আসলে বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত।

হতে পারে শুরুতে নিখুঁত এবং অ-নিখুঁত সকল প্রকার মৌচাকই ছিল। অ-নিখুঁত বাসার ক্ষেত্রে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সমান্তরাল না থাকার কারণে হয়তো ভালোভাবেটিকে থাকার উপযোগ কম পেয়েছে। কিংবা খোপগুলো সুষম ষড়ভুজ না হবার কারণে বা ছোট-বড় হবার কারণে সঠিকভাবে হেলানো না থাকার কারণে ভেতরে মধু আটকে থাকতে পারেনি।

মধু সাধারণত তার পৃষ্ঠটান ও সান্দ্রতা ব্যবহার করে দেয়ালে আটকে থাকে। খোপ যদি বড় হয় কিংবা খোপের দেয়ালের কৌণিক অবস্থান ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে মধুর অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠটান মধুকে দেয়ালে আটকে রাখতে পারে না।

যারা এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারেনি তারা বেঁচে থাকার জন্য ভালো উপযোগ পায়নি। টিকে থাকার ভালো উপযোগ না পাওয়াতে তারা ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়েছে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা ভালোভাবে বাসা তৈরি করতে পেরেছে তারাটিকে থাকার জন্য বাড়তি উপযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে অ-নিখুঁতদের উপর কর্তৃত্ব করেছে। অ-নিখুঁতরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াতে একসময় তারাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।

পৃষ্ঠটানের এই দিকটাকে কাজে লাগিয়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে এক পাশে রেখে পদার্থবিদরা বলছে, মৌচাকের এরকম আকৃতির পেছনে আসলে পৃষ্ঠটান ধর্ম কাজ করছে। পৃষ্ঠটান ধর্মই তার প্রভাবের মাধ্যমে খোপগুলোকে সুষম ষড়ভুজ আকৃতি প্রদান করে।

চিত্রঃ মৌচাক। ছবিঃ Grafissimo

নিয়মতান্ত্রিকতা আছে, ভালো কথা। কিন্তু এত এত জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে ষড়ভুজের আকৃতি কেন? আসলে জ্যামিতিক স্বাভাবিকতা অনুসারে ষড়ভুজই হওয়া উচিৎ। যদি এমন কোনো জ্যামিতিক আকৃতির কথা বিবেচনা করা হয় যাদেরকে পাশাপাশি সজ্জিত করলে কোনো অতিরিক্ত ফাঁকা থাকবে না তাহলে মাত্র তিনটি আকৃতি পাওয়া যাবে। সমবাহু ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও ষড়ভুজ।

এদের মাঝে ষড়ভুজেই বেশি দেয়াল বিদ্যমান এবং ভেতরের জায়গা সবচেয়ে কম অপচয় হয়। বাকি দুই প্রকারের ক্ষেত্র ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজের কোনাগুলো ব্যবহার করা যায় না, মোম বা মধু সেখানটাতে পৌঁছায় না। স্থানের অপচয় হয়। এদিক বিবেচনা করে পরিশ্রম-ক্লান্ত মৌমাছিরা অবশ্যই এমন আকৃতিকে বেছে নেবে যেখানে স্থানের ব্যবহার করা যায় সর্বোচ্চ এবং শ্রমের অপচয় হয় সর্বনিম্ন।

এখন এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নিখুঁত ষড়ভুজ আকৃতির বাসা বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষমতা মৌমাছিদের আছে। তবে ষড়ভুজের প্রাকৃতিক বিস্তৃতি উপলব্ধির জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত গুণাবলির উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই ষড়ভুজ উৎপন্ন করে।

পানির পৃষ্ঠে যদি বুদবুদের একটি স্তর তৈরি করা হয় তাহলে স্তরে অবস্থান করা বুদবুদগুলো ষড়ভুজ আকৃতির হবে। পুরোপুরি নিখুঁত ষড়ভুজ না হলেও মোটামুটিভাবে ষড়ভুজ হবে। ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আকৃতির বুদবুদ কখনোই পাওয়া যাবে না। যখন তিন-চারটি বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ বুদবুদ একত্র হয় তখন তারা এমনভাবে অবস্থান করে যে তিনটি বুদবুদের তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে মিলিত হয়। মার্সিডিজ-বেনজ কোম্পানির প্রতীকের মতো।

এই সজ্জাটিই সবচেয়ে বেশি সুস্থিত সুগঠিত। এভাবে অবস্থান করলেই তাদের স্থায়িত্ব বেশি হয়। অনেকটা দালান তৈরিতে ইট যেভাবে গাথা হয় তেমন। নিচের স্তরের ইটের অবস্থানের সাথে উপরের স্তরের ইটের অবস্থানের মিল নেই। দালানের ইট যদি এক মিলে একটির বরাবর আরেকটি বসিয়ে গাথুনি দেয়া হয় তাহলে দালান ভেঙে পড়তে বেশিদিন সময় লাগবে না।

চিত্রঃ মার্সিডিজ-বেনজ এর প্রতীক এবং দালানে ইটের গাথুনি। গাথুনিতে এক স্তরের সাথে আরেক স্তরের মিল নেই। ছবিঃ 123rf.com

মৌমাছির বাসার গঠনে স্বয়ং মৌমাছিরা স্থপতি হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এখানে ফেনার বেলায় এরকম সজ্জা প্রদানের জন্য কাউকে কোনো কিছু করে দিতে হয় না। এখানে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কাজ করছে। এক স্তরের বুদবুদ পেরিয়ে বহু স্তরের ফেলার বেলাতেও এই কথা প্রযোজ্য।

বালতিতে পানি রেখে তাতে ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নাড়াচাড়া করলে বেশ ফেনা উৎপন্ন হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসব ফেনার সংযোগস্থলও এখানের সংযোগস্থলের মতোই। তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে বিল্ডিং ব্লকের মতো মিলিত হয়।

চিত্রঃ ষড়ভুজাকার বুদবুদ সজ্জা। ছবিঃ শাটারস্টক।

মৌমাছির বাসায় অপচয় কম হবার জন্য এবং উপযোগ বেশি পাবার জন্য মৌমাছিরা নিজেরা খেটে বিশেষ আকৃতির বাসা বানায়। কিন্তু বুদবুদের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কোনো জিনিস বা কোনো নিয়ম কাজ করছে? এক্ষেত্রে বলতে হবে প্রকৃতি আসলে মৌমাছির চেয়েও আরো বেশি হিসেবি। বুদবুদ ও সাবানের ফেনার প্রধান উপাদান হচ্ছে পানি। সাবানের ফেনায় পানির উপরিস্তরে সাবানের কিছু অণু থাকে। পানির পৃষ্ঠটান পানিকে যতটা সম্ভব কম ক্ষেত্রফলের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গোলক আকৃতির হয়ে থাকে। কারণ গোলক আকৃতিই হচ্ছে সকল ত্রিমাতৃক জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে সবচেয়ে স্বল্প ক্ষেত্রফলের অধিকারী। একই আয়তনের কোনো বস্তুকে বিভিন্ন আকৃতি প্রদান করা হলে তাদের মাঝে গোলক আকৃতিই সবচেয়ে কম ক্ষেত্রফল দখল করবে।

বুদবুদ বা ফেনার বেলায় একাধিক ফেনার পাশাপাশি অবস্থান, তাদের সংযোগস্থলে সুস্থিতি অর্জন, মধ্যবর্তী স্থানের অপচয় রোধ এবং পৃষ্ঠটানের ফলে স্বল্প ক্ষেত্রফল অর্জন এসবের মিলিত প্রভাবে বুদবুদগুলো মোটামুটি ষড়ভুজ আকৃতির হয়ে থাকে।

পতঙ্গের চোখ? ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে তোলা ছবিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পতঙ্গের চোখগুলো অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে চোখ বা অক্ষির এই পুঞ্জ গঠিত বলে এদেরকে বলা হয় পুঞ্জাক্ষি। পুঞ্জাক্ষির প্রতিটি অংশ আসলে ষড়ভুজ আকৃতির। বড় করে দেখার সুযোগ থাকলে দেখা যাবে প্রতিটি ষড়ভুজের মিলনস্থলে তিনটি কোনা একত্র হয়েছে। সেই সাবানের ফেনার দেয়াল আর ইটের বিসদৃশ ব্লকের মতো।

বিবর্তনের পথে ধীরে ধীরে পতঙ্গের মধ্যে এধরনের চোখের আবির্ভাব ঘটেছে। এধরনের পুঞ্জাক্ষি দ্রুত গতিতে চলমান বস্তু (খাবার) ধরতে সাহায্য করে। কারণ এতগুলো ক্ষুদ্র চোখে একসাথে অনেকগুলো ছবি ওঠে চলমান বস্তুর। এতগুলো চোখকে ফাঁকি দেয়া বেশ কঠিন কাজ।

প্রকৃতির পরতে পরতে অনেক জটিলতার দেখা পাওয়া যায়। আবার এসব জটিলতার মাঝেও অনেক সারল্যের খোঁজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সত্যিই খুব অবাক হতে হয়। নিয়মহীন ছন্নছাড়া প্রকৃতির মাঝেও কত সুন্দর প্যাটার্ন কত সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে।

তথ্যসূত্র

  1. Why Nature Prefers Hexagons, The geometric rules behind fly eyes, honeycombs, and soap bubbles, by Philip Ball, April 7, 2016 http://nautil.us/issue/35/boundaries/why-nature-prefers-hexagons
  2. Why do Flies have Compound Eyes? http://www.pitara.com/science-for-kids/5ws-and-h/why-do-flies-have-compound-eyes

featured image: mt.nl

‘ব্যর্থ’ পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের বিপ্লব

ক্যাফেইন আসক্তির কারণ