পার্কার সোলার প্রোব: ১২ আগস্ট উৎক্ষেপিত যে মহাকাশযান অর্জন করবে মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসের রেকর্ড বেগ

নাসা এবং United Launch Alliance মিলে উৎক্ষেপণ করল সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই স্পেসপ্রোবটি যাত্রা করে সূর্যের দিকে। সম্মিলিত উৎক্ষেপণ জোট বা ইউএলএ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এই কোম্পানির রয়েছে একাধারে ১২০টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করার রেকর্ড এবং উৎক্ষেপণে ১০০% সফলতা। এ প্রকল্পটির আর্থিক খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশযানটি গতকাল (১১ই আগস্ট ২০১৮) উৎক্ষেপণের কথা ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের শেষ মিনিটে ত্রুটি ধরা পড়ায় সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। উৎক্ষেপণের নতুন সূচি ঠিক করা হয় আজ রবিবার (১২ আগস্ট ২০১৮) ফ্লোড়িডার কেপ ক্যানাভারালের স্থানীয় সময় রাত ৩:৩১ এ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে এর উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় এটি উৎক্ষেপিত হয়েছে। পার্কার সোলার প্রোব উৎক্ষেপণের ভিডিও অবলোকন করা যাবে এখানে

এই প্রোবকে মহাকাশে নিয়ে গেছে ইউএলএ এর শক্তিশালী রকেট ডেল্টা IV। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ এর ডিসেম্বরে পার্কার সোলার প্রোব হবে ইতিহাসের দ্রুততম মহাকাশযান। এ ঘটনাটি ঘটবে যখন প্রোবটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছুবে। এ অভিযানের রূটম্যাপ বলছে এটি সূর্য থেকে ৩.৮৩ মিলিয়ন মাইল (৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূর দিয়ে যাবে। ঐ বিন্দুতে গিয়ে প্রোবটির গতি হবে ৬৯২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটারেরও বেশি।

এ দূরত্ব কত বড় আন্দাজ করতে পৃথিবীর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই গতিতে প্রোবটির ওয়াশিংটন ডিসি থেকে টোকিওতে যেতে ১ মিনিটেরও কম সময় লাগত। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যেতে চার সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়!

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে পার্কার সোলার প্রোব টিম প্রোবের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন তাপীয় বায়ুশূন্য চেম্বারে; Image Credit: Ed Whitman/Johns Hopkins APL/Nasa

পার্কার স্পেসপ্রোবের পেছনে কাজ করা দলটি অবশ্য নির্বিকার এই রেকর্ডভাঙা কাজে। তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ অভিযানের খুঁটিনাটিতে। এই প্রজেক্টের ম্যানেজার এন্ড্রু ড্রিসম্যান নিযুক্ত আছেন জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তিনি বলেন, “মহাকাশে কোনো কিছু দ্রুতবেগে ছোটার জন্য সেটার ডিজাইন করা যতটা কঠিন তেমনি ধীরে ছোটার ডিজাইন করাও সমান মাত্রার কঠিন। কারণ হল, মহাশূন্যে তো একটা চালু দশাকে ঠেকানোর মত কিছু নেই।”

এ ব্যাপারগুলো অরবিটাল মেকানিক্সে ধারণা থাকলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। গতি বাড়ানো যেমন সমস্যা, তেমনি মহাকাশযান টিকিয়ে রেখে এমন গতিপথ বাছাই করাও সমস্যা যা ঐ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষের আকর্ষণে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। উল্লেখ্য মহাকাশে কোনো মহাকাশযানের গতিবৃদ্ধির এখনো পর্যন্ত সেরা উপায় হল কোনো গ্রহের বা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণক্ষেত্রকে কাজে লাগানো। ড্রিসম্যান অবশ্য মজা করে বলেন, “মহাকাশযান কেবল জানে না এটি যে দ্রুতগতিতে ছুটছে।”

পার্কার সোলার প্রোবের অভিযানের গতিপথ | Image Credit: HORIZONS System, JPL, NASA

যাই হোক, এটা যে নিতান্ত ঝামেলাবিহীন অভিয়ান নয় তা স্পষ্ট। স্পেসপ্রোব না জানলেও, বিজ্ঞানীদের ঠিকই স্পেসপ্রোবকে সম্মুখীন হতে হবে এমন বিবিধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পার্কার সোলার প্রোব অতিদ্রুতবেগে ছোটার সাথে হিসেবে রাখতে হচ্ছে কোন মহাকাশীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এটি গমন করছে। এটির অভিযানপথে রয়েছে এমন ধুলোময় পরিবেশ যাকে বলা হয় হাইপারভেলোসিটি ডাস্ট এনভায়রনমেন্ট। অর্থাৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বহু ধুলিকণাময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাবে পার্কার।

হাইপারভেলোসিটি অর্থাৎ উচ্চগতি বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয় ৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগকে। এই বেগের ফলে দ্রুত ছোটা কণাগুলোর ভরবেগও যথেষ্ঠ মাত্রায় বেশি। ফলে এরা প্রবল ভরবেগে আঘাত করবে পার্কার সোলার প্রোবকে যার কারণে প্রোবের বেগের দিক বিদিকও হয়ে যেতে পারে। আসলে মহাকাশে অল্প আঘাতই বিশাল দূরত্বে ছোটা বস্তুর জন্য যথেষ্ঠ দিক বিদিকের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এ সমস্যা নিরসণে বিজ্ঞানীরা স্পেসক্রাফটে ব্যবহার করবেন কেভলার কম্বল। এ বিশেষ কম্বল অধিক তাপসহ আর সিন্থেটিক ফাইবারের তৈরি। এ ধরণের ফ্যাব্রিকের বহুল ব্যবহার রয়েছে বুলেট প্রতিরোধী জ্যাকেট, শরীরের বর্ম, বোমার চাদর ইত্যাদি নির্মাণে। অর্থাৎ এই সমাধান বহু আঘাতে টেকসই থাকার সুবিধা দিতে পারছে।

শুক্রের অভিকর্ষকেও পার্কার সোলার প্রোব কাজে লাগাবে। শুক্রের কাছ দিয়ে পার্কার সোলার প্রোব ৭ বার অতিক্রম করবে। সূর্যের দিকে পাঠিয়ে সূর্য ওপাশ দিয়ে প্রোবকে ফেরত আনার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পৃথিবী নিজেই সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে, সে অনুসারে এই আদিবেগ পেয়ে যাচ্ছে প্রোব। কিন্তু এটি সূর্যের দিকের সাথে সমকোণে হলে পথ বেঁকে বড় হয়ে যাবে। ফলে সময় লাগবে আরো বেশি, উদ্দিষ্ট লক্ষ্যও টিকবে না। বেগ সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে দেখতে পারেন এই ভিডিওটি।

 

অভিযানের পথ অনুযায়ী, পার্কার সোলার প্রোব যখন সূর্যের সবচেয়ে নিকট বিন্দু দিয়ে যাবে তখন এর বেগ হবে ভয়েজার ১ এর বেগেরও দশগুণের বেশি। ভয়েজার ১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ এ, পাঁচ বছর আগে এটি সৌরজগতের বাইরে চলে গিয়েছে। প্রক্সিমা সেন্টরাইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬১,০০০ কিলোমিটার বেগে

 

পার্কার সোলার প্রোবের গতিপথে শুক্রের এবং সূর্যের অভিকর্ষ যেভাবে ব্যবহার করে উচ্চগতি অর্জিত হবে; Image Credit: Guardian graphic | Source: The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory

স্বাভাবিক হিসেবে গতি অর্জনের কৌশলের দিক থেকে ভয়েজার ১-ই ইতিহাসখ্যাত। তবে ২০১৬ এর জুলাইতে নাসার জুনো প্রোব বৃহস্পতির অভিকর্ষের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বৃহস্পতির গ্যাসীয় জমিনে পড়ে ধ্বংস হয়। তখন এর বেগ পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় ২৬৬,০০০ কিলোমিটারে। এ গতিবেগ কাজে না লাগলেও কতদূর অর্জনযোগ্য এটার একটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল।

গ্রহের অভিকর্ষকে ব্যবহার না করে, কেবল সূর্যের অভিকর্ষকে ব্যবহার করে রেকর্ডধারী স্পেসক্রাফট দুটি হল হেলিওস I এবং II. ১৯৭০ এর দশকে এরা উৎক্ষেপিত হয়েছিল। বুধ সূর্যের যত কাছে হেলিওস মহাকাশযান-যুগল তার চেয়েও কাছে প্রবেশ করেছিল। এরা অর্জন করেছিল ঘণ্টায় ২৪১,০০০ কিলোমিটার বেগ বা সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার।

পার্কার সোলার প্রোব দৃশ্যমান সৌরপৃষ্ঠ থেকে চার মিলিয়ন মাইল (৬.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার) নিকট দিয়ে যাবে। ফলে হেলিওসের চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেগে দৌঁড়াবে এটি। সূর্যের উত্তাপকে আরেক ধাপ এগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথে অভিযাত্রা শুরু হয়ে গেছে… গতি অর্জন মানে তো আমাদের স্বপ্নে আশার সঞ্চার… বহুদূর ছুটে যেতে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.space.com/41447-parker-solar-probe-fastest-spacecraft-ever.html
  2. https://www.theguardian.com/science/2018/aug/10/mission-to-touch-the-sun-nasa-to-launch-parker-solar-probe
  3. https://blogs.scientificamerican.com/life-unbounded/the-fastest-spacecraft-ever/
  4. https://www.space.com/41461-parker-solar-probe-launch-delayed.html
  5. https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/

নিউটনের কামানে চড়ে কক্ষপথে

সৌরজগতের গ্রহগুলো নিজ নিজ কক্ষপথ ধরে সূর্যকে কেন প্রদক্ষিণ করে? একটি বস্তু কেন অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরবে? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তিত ছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। তিনি এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও বের করেছিলেন। নিউটন দেখালেন গ্রহদের কক্ষপথগুলো মহাকর্ষ বল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

এই মহাকর্ষ বলের কারণেই আম গাছ থেকে পাকা আম পড়লে তা নিচে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে। নিউটনের মহাকর্ষের তত্ত্বটি যখন আলোচিত হয় তখন প্রায় সময়ই তার মাথায় আপেল পড়ার গল্পটি চলে আসে। এটা প্রমাণিত সত্য যে নিউটনের মাথায় আপেল পড়ার কাহিনীটি মিথ্যা।

যাহোক,গ্রহদের কক্ষপথে আবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি খুব উঁচু পর্বতের উপর একটি কামান কল্পনা করলেন। কল্পনায় যে পর্বতের উপরে পরীক্ষাটি করা হচ্ছে সেই পর্বতটি সমুদ্রের পারে অবস্থিত। কামানটির মুখ সমুদ্রের দিকে তাক করা। কামানে গোলা লোড করে দেয়া হোক আগুন। বুম করে গোলা বেরিয়ে যাবে সামনের দিকে।

কামান থেকে প্রচণ্ড গতি নিয়ে বের হবার কারণে গোলাটি ‘সোজা সামনের দিকে’ যাবে। আবার গোলাটির উপরে পৃথিবীর অভিকর্ষীয় আকর্ষণ কাজ করে, যা গোলাটিকে ‘সোজা নিচের দিকে’ নামিয়ে নিতে চায়।

পৃথিবীর টান যেমন আম গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকা আমকে সোজা নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে তেমন। কিন্তু গোলাটিতে একই সাথে দুটি বল কাজ করছে। সামনের দিকে যাবার জন্য প্রদত্ত গতির বল এবং পৃথিবী কর্তৃক আকর্ষণ বল। এই দুই বলের প্রভাবে গোলাটি ‘সোজা’ সামনের দিকেও যায় না,‘সোজা’ নিচের দিকেও নামে না। মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। একটি অধিবৃত্তাকার (Hyperbolic) পথ রচনা করে বক্রভাবে সমুদ্রের বুকে নেমে আসে।

চিত্রঃ উঁচু পর্বতের উপর নিউটনের কাল্পনিক কামান

এখানে একটা জিনিস অনুধাবন করা খুবই জরুরী,গোলাটি হয়তো সোজা নিচের দিকে নামছে না, কিন্তু শুরু থেকেই আকর্ষণের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে এবং শুরু থেকেই নিচের দিকে পড়া শুরু করেছে। পড়াটা হয়তো ঠিক সোজা হয়নি কিন্তু সমস্ত সময়টাতেই নিচের দিকে পড়ছিল। এমনকি একদম শুরুর দিকে গোলাটির গতিপথ যেখানে ‘সোজা’ সামনের দিকে ছিল ঐ সময়টাতেও এটি নিচের দিকে নামছিল।

পরবর্তী চিত্রে খেয়াল করলে দেখা যাবে, একদম শুরুর দিকের সামান্য কিছু অংশের গতিপথ দৃশ্যত সোজা। এর গতিপথ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে নিচের দিক বরাবর নেমে এসেছে। কার্টুনের দৃশ্যগুলোর মতো আকস্মিকভাবে নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে কার্টুনের কাহিনীগুলোতে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের কোনো বালাই নেই। ‘টম এন্ড জেরি’ সহ অন্যান্য চরিত্রে কেউ কোনো অবলম্বন থেকে পড়ে গেলে কিছুক্ষণ শূন্যে আটকে থাকে। পরে ঐ চরিত্র যখন নিচের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করে যে আর রক্ষা নেই,এবার পড়তে হবেই, তখন ধাম করে পড়া শুরু করে!

কামানের গোলাটি নিক্ষিপ্ত হবার পর থেকেই পড়া শুরু করলেও দৃশ্যত তা হয় না। গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গোলাটির শুরুর দিকের গতিপথ সোজা সামনের দিকে। এমনটা হবার কারণ,শুরুর দিকে গোলাটির সামনে যাবার বেগ অত্যন্ত বেশি। প্রথম দিকটায় গোলার বেগ খুব বেশি হবার কারণে পৃথিবীর আকর্ষণ বল এই তুলনায় অনেক কম প্রতিভাত হয়। তবে গতিটি সোজা দেখালেও একদম সোজা নয়। বলা যায় ‘প্রায়’ সোজা।

চিত্রঃ কার্টুন চিত্রে প্রায় সময় পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়

এবার আরো বড় ও আরো শক্তিশালী কামান দিয়ে পরীক্ষাটি করা হোক। বড় ও শক্তিশালী হলে কামান থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা আগের চেয়ে অধিক পথ অতিক্রম করতে পারবে। একদম সমুদ্রের মাঝখানে গিয়ে পড়বে। এবারেও গোলাটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে নিচের দিকে কিছুটা বাক ঠিকই আছে। বাক থাকলেও এটি প্রথমটির মতো এতো বেশি নয়। এই গতিপথটি আগের থেকে তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে বাঁকা হয়ে নিচে এসে নেমেছে।

এবার এটির চেয়েও বেশি শক্তিশালী কামান দিয়ে পরীক্ষাটি করা হোক। এর গোলা নিক্ষিপ্ত হলে সমুদ্র পেরিয়ে অনেক দূরে চলে যাবে। এর গতিপথ খেয়াল করলে দেখা যাবে এটি যেন সোজা পথেই সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। মানে পৃথিবীর পৃষ্ঠের সাথে এর উচ্চতা কমেছে খুব ধীরে ধীরে। স্থূল চোখে দেখলে মনে হবে যেন পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা কমতেই চাচ্ছে না। অনেক অনেক দূর অতিক্রম করে খুব ধীরে ধীরে মাটিতে মিশেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে চিত্রে হয়তো আমরা গতিপথটিকে গোলাকার দেখছি, কিন্তু আদতে এর গতিপথ সোজা বলে বিবেচনা করতে হবে। গোলাটি যদি পৃথিবী পৃষ্ঠের সাথে সমান উচ্চতা বজায় রাখে তাহলে ধরতে হবে এটি সোজা এগোচ্ছে। পৃথিবী পৃষ্ঠের সাথে উচ্চতা কমে গেলে ধরতে হবে এর গতিপথ বেঁকে গিয়েছে। ক্ষুদ্র একটি পাতায় বিশাল পৃথিবীকে অঙ্কন করা হয়েছে বলে গতিপথকে গোল দেখাচ্ছে,বাস্তবে পরীক্ষাটি এমন হলে এবং বাস্তব চোখ দিয়ে দেখলে গোলাটির গতিপথ সোজাই দেখা যেতো।

গোলাটির গতিপথ সোজা দেখালেও সত্যিকার অর্থে এটি প্রতিনিয়তই একটু একটু করে পড়ছে। ঝামেলাটা বাধিয়েছে পৃথিবীর আকৃতি। পৃথিবী ফুটবলের মতো গোলাকার বলে ধীরে ধীরে বলটি নিচের দিকে পড়লেও পৃষ্ঠের সাপেক্ষে গোলাটির দূরত্ব কমছে খুব অল্প করে। যার কারণে গোলাটিকে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। পড়ছেই পড়ছে, সমস্ত পৃথিবী ঘুরে ঘুরে পড়ছে।

এখন আগের দুটির চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কামান কল্পনা করি। এবারের কল্পিত কামানটি আরো অনেক বেশি শক্তিশালী। কাল্পনিক চিন্তন পরীক্ষার জন্য চিন্তা শক্তির কোনো সীমা নেই। কল্পনার শক্তিকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করে যেকোনো মাত্রার শক্তিশালী কামানকে কল্পনা করে নিতে কোনো বাধা নেই।

এই কামান থেকে কোনো গোলা নিক্ষেপ করলে গোলাটি মাটিতে না পড়েই পুরো পৃথিবী চক্কর দিয়ে আগের জায়গাতে ফিরে আসতে পারবে। এই বেলাতেও গোলাটি ধীরে ধীরে পড়তে থাকবে, কিন্তু পৃথিবী গোলাকার হবার কারণে কোনোদিন এই পড়তে থাকা আর শেষ হবে না। এটি তার গতিপথ, পৃথিবীর গোল বক্রতার মতো করে রচনা করেছে, যার কারণে গোলাটির মাটি স্পর্শ করা হচ্ছে না। পড়েই চলছে কিন্তু শেষ হচ্ছে না।

গোলাটির এই গতীয় পরিস্থিতিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়। গোলাটি যে গতিপথ রচনা করছে সেটা তার কক্ষপথ। এটি চাঁদের মতো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কোনো ঝামেলার সৃষ্টি না হলে এটি আজীবন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেই যাবে। যদিও বায়ুমণ্ডলের বাতাস ধীরে ধীরে এর গতি কমিয়ে দিবে। কিন্তু আমাদের চিন্তন পরীক্ষায় বায়ুর বাধাহীন পরিবেশ কল্পনা করে নিয়েছি।

আমরা ‘স্যাটেলাইট’ বলে যে কৃত্রিম উপ-গ্রহের কথা শুনি এগুলো আসলে নিউটনের এই চিন্তন পরীক্ষার উপরে ভিত্তি করেই তৈরি। প্রতিটা স্যাটেলাইট পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে, প্রতিনিয়ত অল্প অল্প করে পড়ছে কিন্তু তাদের পড়ন্ত অবস্থা কখনো শেষ হচ্ছে না।

এই ‘অনন্ত পড়ন্ত অবস্থা’য় এদের আটকে রাখা যাচ্ছে বলেই এদেরকে উপরে ধরে রাখতে আলাদা কোনো খুঁটি বা থামের প্রয়োজন হচ্ছে না। এই স্যাটেলাইটগুলো আছে বলেই আমরা ফোনে কথা বলতে পারছি,টিভি দেখতে পারছি,আবহাওয়ার খবর পাচ্ছি। যদি নিউটনের খুটিবিহীন ঝুলে থাকার এই পরীক্ষাটি যদি কাজ না করতো তাহলে কী ঝামেলাতেই না পড়তে হতো।

চিত্রঃ স্যাটেলাইট, বছরের পর বছর কোনো খুটি ছাড়াই আটকে থাকে আকাশের বুকে

টেলিফোন লাইন কিংবা টেলিভিশন সিগনালের জন্য স্যাটেলাইটগুলোকে ভূ-স্থির কক্ষপথে রাখতে হয়। ‘ভূ-স্থির কক্ষপথ’ এক ধরনের বিশেষ কক্ষপথ। এ ধরনের কক্ষপথে স্যাটেলাইটগুলো প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় একবার করে পৃথিবীকে আবর্তন করে। অন্যদিকে পৃথিবীও প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় নিজের অক্ষের উপর একবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। ফলে হয় কি, পৃথিবীর ভূমির তুলনায় দেখা যায় স্যাটেলাইট তার আগের জায়গাতেই রয়েছে। নড়েনি একটুও।

পৃথিবী ও স্যাটেলাইট একই হারে ঘুরছে বলে আপেক্ষিকভাবে একটির সাপেক্ষে আরেকটিকে স্থির বলে মনে হয়। স্যাটেলাইট চলছে ঠিকই,কিন্তু ভূমির তুলনায় স্থির,এমন ধরনের কক্ষপথকে ভূ-স্থির কক্ষপথ বলে। যে সকল স্যাটেলাইট ভূ-স্থির কক্ষপথে চলে তাদের বলে ভূ-স্থির উপগ্রহ।

এই কক্ষপথের সুবিধাটা কী একটু ভেবে দেখি। যদি এই উপগ্রহগুলো ভূমির সাপেক্ষে স্থির হয় তাহলে ভূমির কোনো একটি স্থান হতে এরা সবসময় একই দিক বরাবর থাকবে। এসকল উপগ্রহ থেকে তথ্য পেতে হলে ভূ-পৃষ্ঠের কোনো একটি স্পট থেকে নির্দিষ্ট দিকে এন্টেনা তাক করলেই হবে। যেহেতু ভূমির সাপেক্ষে এর অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছে না তাই এন্টেনার অবস্থানও পাল্টাতে হবে না,এন্টেনার দিকও পাল্টাতে হবে না। তথ্য আদান-প্রদানের রাস্তা অপেক্ষাকৃত ঝঞ্ঝাটহীন হবে।

নভোচারীদের প্রশিক্ষণ দেবার জন্য তৈরি মহাকাশ স্টেশনগুলোও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। মহাকাশ স্টেশনের মতো কোনো কিছু যখন সর্বদা পড়ন্ত অবস্থায় থাকে তখন এখানে কিছু জিনিসের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ফেললে সুযোগের সঠিক ব্যবহার করা হবে। আমরা মহাকাশ স্টেশনের প্রেক্ষিতে ভর এবং ওজনের মাঝে পার্থক্য সম্বন্ধে আলোচনা করতে পারি।

মহাকাশ স্টেশনের সাথে এর ভেতরের টুকিটাকি জিনিসগুলোও সর্বদা পড়ন্ত অবস্থায় থাকে। স্টেশনের সকল জিনিস ওজনহীন। কিন্তু ওজনহীন হলেও তারা ভরহীন নয়। ভর নির্ভর করে তারা তাদের পরমাণুর ভেতরে কী পরিমাণ প্রোটন ও নিউট্রন বহন করে তার উপর।

ওজন হচ্ছে ভরের উপর পৃথিবীর অভিকর্ষীয় টান বা আকর্ষণ। পৃথিবী-পৃষ্ঠে আমরা ওজন নামক জিনিসটি ব্যবহার করে কোনো কিছু পরিমাপ করতে পারি কারণ কোনো বস্তুর ওজন পৃথিবী-পৃষ্ঠের সব জায়গাতেই প্রায় একরকম। সামান্য এদিক সেদিক হলেও তা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এবার কোনো বস্তুকে যদি অন্য কোনো গ্রহে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তার ওজন কমতে বা বাড়তে পারে।

বস্তুর ওজন কমবে না বাড়বে তা নির্ভর করবে কোন ধরনের গ্রহে এটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার উপর। পৃথিবী থেকে ভারী কোনো গ্রহে নিয়ে গেলে ঐ গ্রহের মহাকর্ষ অধিক শক্তিশালী হবার কারণে বস্তুর ওজন বেড়ে যাবে,আর হালকা কোনো গ্রহে নিলে তুলনামূলক দুর্বল মহাকর্ষের জন্য বস্তুর ওজন কমে যাবে। তবে ওজনের কম-বেশি হলেও ভরের কোনো পরিবর্তন কখনোই হবে না। কক্ষপথে যখন কেউ পুরোপুরি ওজনহীন থাকে তখনও ভর একই থাকে।

নিজেকে মহাকাশচারী হিসেবে স্পেস স্টেশনের ভেতর কল্পনা করা যাক। মহাকাশ স্টেশনের সবকিছু ওজনহীন অবস্থায় আছে। ওজনহীন অবস্থায় চাইলে নিজের ভরকে উপলব্ধি করা যেতে পারে। যদি মহাকাশ স্টেশনের কোনো একটি কামরার মেঝে থেকে পা দিয়ে প্রবলভাবে ধাক্কা দিয়ে উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করা হয় তাহলে মাথা গিয়ে ছাদে ঠেকবে। শরীরটি ভেসে ভেসে ছাদ বরাবর এগিয়ে যাবে। এটা যেহেতু ভাসমান ওজনহীন যান তাই কোনটা মেঝে হবে আর কোনটা ছাদ হবে তা নির্দিষ্ট করা নেই। যেকোনো একটা তলকে মেঝে হিসেবে ধরে নিলেই হবে। ছাদের উচ্চতা খুব বেশি হলেও মাথা গিয়ে ছাদে ঠিকই লাগবে। এবং এতে সামান্য ব্যথাও লাগতে পারে। নিজে ভরহীন পালকের মতো হলে অবশ্য ব্যথা তেমন একটা পাওয়া যেতো না। কিন্তু ঐ স্থানে ওজনহীন হওয়া সত্ত্বেও দেহের ভর ঠিকই আছে, তাই কোথাও ধাক্কা লাগলে ব্যথাও পাওয়া যাবে।

এবার এখানেও কল্পনায় একটি কামানের গোলা নিয়ে আসি। শরীর ওজনহীন ভেসে বেড়াচ্ছে,গোলাটিও ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় কারো মনে হতে পারে, যেহেতু গোলাটি ভেসে বেড়াচ্ছে তাই এটি হালকা ভলিবল বা ফুটবলের মতোই আচরণ করবে। কিন্তু যদি ভাসমান ফুটবল সদৃশ গোলাটিকে কক্ষের অপর প্রান্তে ছুড়ে মারতে চেষ্টা করা হয় তাহলে অনুধাবন করবে এটি হালকা ফুটবলের মতো সহজে সরে যাচ্ছে না। যদি একটু জোর নিয়ে এটিকে ছুড়ে মারা হয় তাহলে দেখা যাবে নিজে বিপরীত দিকে সরে আসা লাগছে। কামানের গোলা ভারী হয়ে থাকে,এটি ওজনশূন্য পরিবেশে গেলেও ভর অক্ষুণ্ণ থাকে এবং যে কেউ চাইলে এই ভর অনুভব করতে পারে।

যদি কোনো একভাবে কামানের গোলাটিকে সামনের দিকে কিছু বেগ নিয়ে ছুড়ে মারতে সক্ষম হওয়া যায় তাহলে এটি যেখানে গিয়ে ঠেকবে সেখানে জোরেশোরেই আঘাত করবে। পথে হালকা কোনো বাধা পড়লে ভারী বস্তুর মতোই আচরণ করে বাধাকে ডিঙিয়ে যেতে পারবে। ছুড়ে মারা গোলা যদি অন্য কোন মহাকাশচারীর মাথায় গিয়ে লাগে তাহলে তার ভালোই আঘাত পাবার সম্ভাবনা আছে।

সোজা কথায়, কোনো বস্তু ওজনহীন হওয়া সত্ত্বেও ঐ পরিবেশে ভারী বস্তুর মতোই আচরণ করবে। আশা করি এই পরীক্ষাগুলোর সাহায্যে ভর ও ওজনের মাঝে পার্থক্য পরিষ্কার হয়েছে।

এই সংখ্যায় বৃত্তাকার কক্ষপথ পর্যন্ত ধারণা নিয়েছি। পরবর্তী সংখ্যায় আরো অধিক বিস্তৃত উপবৃত্তাকার কক্ষপথ, অতি-উপবৃত্তাকার কক্ষপথ এমনকি উপবৃত্তাকার হতে হতে একদম সরল রেখা হয়ে যাওয়া (কক্ষ)পথের কথা আলোচনা করবো। সেখানে ভর, ওজন ও ওজনহীনতার ধারণা দরকার হবে, তাই সুযোগ বুঝে এখানে বলে নিলাম।

তথ্যসূত্রঃ

  1. The Magic of Reality: How we know whats really true, Richard, Free Press, New York, 2011
  2. Wikipedia: Newton’s_cannonball
  3. Sir Isaac Newton: The Universal Law of Gravitation, http://csepphys.utk.edu/astr161/lect/history/newtongrav.html
  4. পদার্থবিদ্যার মজার কথা, ইয়াকভ প্যারেলমান, অনুপম প্রকাশনী

featured image: ap.io