পৃথিবীর আদি রঙ ছিল গোলাপি

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে
প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে–

জীবনানন্দ দাশ সাগরের নীলে প্রেম খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু জীবনানন্দ কেন, এমন শত কবি সহস্রবার যে নীলে উদাস হয়েছেন… সে নীলে আমরাও হারিয়েছি। আকাশ আর সাগরময় পৃথিবী নীল হয়েছে এ দুইয়ে। কিন্তু এই নীলই কি আদি রঙ? পুরোটা অতীত কি নীল পৃথিবীরই?

প্রাগৈতিহাসিক সাগরও কি নীল ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাচীন সাগর ছিল গোলাপী রঙের। সে হিসেবে গোলাপী হবে মানুষের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে আদি রঙ। নীল পৃথিবী আজ গোলাপি পৃথিবীর ভবিষ্যত।

গবেষকরা এই গোলাপি রঙের হদিস পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়, সাহারা মরুভূমিতে ব্যাকটেরিয়ায় ফসিলে। প্রাপ্ত ফসিল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার, মনে করা হচ্ছে এরা ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগের। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেঁচে থাকত। দীর্ঘসময় ধরে সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সাগরে সাগরে রাজত্ব করেছে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বরং শৈবালের থেকেও আদিম। বিবর্তনীয় ধারায় জীবনের বিকাশে সায়ানোব্যাকটেরিয়া আদি উৎসদের মধ্যে অন্যতম। বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যত বিবর্তনীয় ইতিহাস ধরে পিছনে যাওয়া যাবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কাছে পৌঁছে যেতে হবে। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে এবছরের ৯ই জুলাই।

এই অণুজীবদের গোলাপি হওয়ার পেছনের কারণ কী? অন্য রঙ না হয়ে গোলাপিই কেন হল। ফসিল অবস্থায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ক্লোরোফিলকে পাওয়া যাচ্ছে গাঢ় লাল এবং বেগুনি রঙে, অধিক ঘনমাত্রার দশায়। অর্থাৎ, যখন মাটি পানির সাথে মিশে এর ঘনমাত্রা কমে যাবে তখন এটি গোলাপি রঙ দিবে পানিতে। অর্থাৎ, উপসংহার টেনে বললে সাগরের ক্ষেত্রেও রঙের প্রভাব তাই হওয়ার কথা।

ক্লোরোফিল বলতেই সবুজ রঙ মাথায় খেলে যায়। কিন্তু ক্লোরোফিল আজকের জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অস্ত্র, আদিম পৃথিবীর প্রাণ এত উন্নত ছিল না, শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাও এতটা দক্ষ ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার পূর্বে ছিল বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব। অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণ তখনকার জন্য বহুদূরের গল্প, পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন সালফারময় পরিবেশে। এজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কাজ ছিল ইলেকট্রন আলাদা করে ফেলা। এদের ছিল বেগুনী কণিকা যা সবুজ আলো শোষণ করত এবং লাল ও নীল রঙের আলো ছেড়ে দিত।

৪,৪০০ গুণ বিবর্ধিত বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া। স্বাদু এবং নোনা উভয় জলাশয়েই এদের অস্তিত্ব ছিল; Image Credit: Dennis Kunkel /Science Photo Library

অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণে সায়ানোব্যাকটেরিয়া একেবারেই আদি, শুরুটা হয় বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার পরিত্যক্ত শক্তি ব্যবহার করে। বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার ত্যাগ করা লাল এবং বেগুনী রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তি কাজে লাগাত আদি সায়ানোব্যাকটেরিয়া। প্রাচীন ক্লোরোফিলের উপর ব্যাকটেরিয়ার ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

৬৫ কোটি বছরের ব্যবধানে যখন আমরা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা করছি, তাদের চেহারা একই রকম হওয়ার কথা নয়। ; Image Credit: River Dell High School | Slideplayer.com

এই প্রাচীন ক্লোরোফিল ধরা পড়ার জন্য উপযুক্ত ঘটনারও তো দরকার রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই নমুনা সম্ভবত কোনো কারণে দ্রুত সাগরগর্ভে চাপা পড়ে যায়। এজন্য অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশের দরকার ছিল। আর একবার চাপা পড়ার পর অণুজীবেরা একে ফসিলে পরিণত করেছে, ফলে এরা স্থবির হয়ে রয়ে গেছে তাদের চাপা পড়া স্থানেই।

 

— HowStuffWorks অবলম্বনে।

ভয়েজার মহাকাশযানের আদি-অন্ত

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে অবস্থান করেই শত আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। কিন্তু মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তু সেই তুলনায় খুব অল্প দূরত্বই অতিক্রম করতে পেরেছে। মানুষের প্রেরিত কোনো বস্তুর মাঝে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে মহাকাশযান ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২। এ দুটি যান সৌরজগতের সীমানা শেষ করে এখন অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ভয়েজার আজ সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শুরুতে এর উদ্দেশ্য একদমই এরকম ছিল না। বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভয়েজার-১ কে আগস্ট ১৯৭৭ সালে ও ভয়েজার-২ কে একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উৎক্ষেপণ করা হয়।

মার্চ ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-১ বৃহস্পতি গ্রহ ও নভেম্বর ১৯৮০ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। জুলাই ১৯৭৯ সালে ভয়েজার-২ বৃহস্পতি গ্রহ ও আগস্ট ১৯৮১ সালে শনি গ্রহ অতিক্রম করে। পরবর্তীতে এটি প্রথম মহাকাশযান হিসেবে ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরেনাস এবং ১৯৮৯ সালের আগস্টে নেপচুন পর্যবেক্ষণ করে।

মিশন দুটির সাফল্যও অনেক। এ পর্যন্ত তাদের যাত্রাপথে ২৫ টি নতুন উপগ্রহ শনাক্ত করেছে, বৃহস্পতির চাঁদে আগ্নেয়গিরি আবিষ্কার করেছে, চারটি গ্রহের (বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন) বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক ও ভূত্বাত্তিক গঠনের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছে এবং সূর্য হতে নির্গত চার্জিত কণা যা সোলার উইন্ড নামে পরিচিত, সেটির বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছে। এসকল তথ্য আমাদের নতুন ধারণা দেয়।

এতো সাফল্যের পরও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যটি এখনো আসেনি। সেটি হলো ভিন গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। ১৯৯০ সালে ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ কে সৌরজগতের বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন মিশনে যুক্ত করা হয়। দুটি মহাকাশযানকে দুই ভিন্ন দিকে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য আমরা যেন সৌরজগতের বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারি এবং যদি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে তাদেরকে যেন আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে জানাতে পারি।

দুটো মহাকাশযানের ভেতরেই স্বর্ণের ডিস্কের ভেতর সুরক্ষিত গ্রামোফোন রেকর্ড আছে। এতে বাংলা সহ ৫৪ টি ভাষায় শুভেচ্ছা, বিভিন্ন সংষ্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন যুগের কিছু গানের নমুনা এবং পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট শব্দ অন্তর্ভূক্ত করা আছে। এছাড়াও ১১৭ টি ছবি সংযুক্ত আছে যেখানে পৃথিবী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেয়া আছে। এই ডিস্কে কিছু ইলেকট্রনিক তথ্যও দেয়া আছে যেন উন্নত প্রযুক্তির প্রাণী থাকলে তারা সেগুলোকে ডায়াগ্রাম ও ছবিতে রূপান্তর করতে পারে।

চিত্রঃ ভয়েজারে স্বর্ণের আবরণ; image source: smithsonianmag.com

ডিস্কগুলো স্বর্ণের প্রলেপ যুক্ত এলুমিনিয়ামের আবরণে সুরক্ষিত। মহাকাশের ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাতে যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা। এছাড়াও আবরণের ভেতর ও বাইরে রেকর্ড বাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডায়াগ্রাম অংকিত আছে। বাইরের ডায়াগ্রাম সময়ের সাথে ক্ষয় হয়ে যেতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। চাইলে ভয়েজারে প্রদত্ত ছবি ও রেকর্ডগুলো সকলেই দেখতে ও শুনতে পারবে। তার জন্য এই ঠিকানায় যেতে হবে http://voyager.jpl.nasa.gov/

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভয়েজার-১ সূর্য হতে ১০.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। এটি মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর জন্য প্রথম অতিক্রান্ত সর্বোচ্চ দূরত্ব। মগায়াজিনটি হাতে নিয়ে আমরা ১ থেকে ৩ বলার সাথে সাথে ভয়েজার-১ প্রায় ৫২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেলছে।

এটি সূর্যের সাপেক্ষে সেকেন্ডে প্রায় ১৭.৩ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ভয়েজার-২ সূর্য হতে প্রায় ১৬.৮২ বিলিয়ন কিলোমিটার এবং ভয়েজার-১ প্রায় ২০.৪১ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। সৌরজগৎ থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারিতে পৌছাতে ভয়েজার-১ এর ৭০ হাজার বছর সময় লাগবে!

সৌরজগতে যতদূর পর্যন্ত সূর্যের প্রভাব আছে সেই অঞ্চলকে বলা হয় Heliosphere। এই অঞ্চল প্লুটোর কক্ষপথ থেকেও আরো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে নাসা ঘোষণা করে, ভয়েজার-১ Heliosphere থেকে বের হয়ে গেছে। সেই থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত নক্ষত্রবীথির পাণে ধাবমান। মানবজাতির জন্য এটি অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।

তথ্যসূত্র

  1. http://voyager.jpl.nasa.gov/
  2. http://www.heavens-above.com
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Heliosphere

featured image: irishtimes.com