কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

মাইকেলসন থেকে আইনস্টাইন- পদার্থবিজ্ঞানের পুনর্জাগরণ

ঊনিশ শতকের শেষের দিকে এসে বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত হলেন যে তারা বোধহয় পদার্থবিজ্ঞানের বেশিরভাগ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। বিদ্যুৎ, চুম্বকত্ব, গ্যাস, আলোকবিদ্যা, গতিবিদ্যা আর বলবিদ্যার মতো বিষয়াবলি ততদিনে বিজ্ঞানীদের জানা হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া ক্যাথোড রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি, ইলেকট্রন, তেজস্ক্রিয়তা এসব কিছুও সেসময়েই আবিষ্কৃত হয়।

জানা হয়ে গেছে ওয়াট, ওহম, কেলভিন, জুল, আয়ম্পিয়ার ইত্যাদি এককের নাম ও ব্যবহার। বিখ্যাত সব সূত্রাবলীও বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছিলেন। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবে বসলেন যে বিজ্ঞানের পক্ষে আর তেমন কিছুই নেই যা আবিষ্কার করা যায়।

১৮৭৫ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নামে জার্মানির কিয়েল শহরের এক তরুণ তখন ভাবছিল পরবর্তী জীবনে গণিত নাকি পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করবে। যদিও তার উপর চাপ ছিল পদার্থবিজ্ঞান না নেয়ার জন্য। কেননা এর মধ্যেই এই বিষয়ে বড় বড় সব গবেষণা হয়ে গেছে। সেগুলোতে সাফল্যও এসেছে। প্ল্যাঙ্ককে বলা হলো, ‘বাছা, সামনের বছরগুলোতে নতুন কিছুই আবিষ্কার হবে না। বরং আগের আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর সমন্বয় সাধন আর সংশোধন হতে পারে।’

কিন্ত সে কারো কথা শুনলো না। পড়াশুনা করলো তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে আর মনপ্রাণ উজাড় করে দিলো এনট্রপি তথা বিশৃঙ্খলা নিয়ে গবেষণার কাজে।

১৮৯১ সালে সে নিজের গবেষণার ফলাফল পেলো আর দুঃখজনকভাবে জানতে পারলো যে তার আগেই আরেক বিজ্ঞানী এই কাজ করে ফেলেছেন। যিনি কাজটা করেছেন তার নাম যে উইলার্ড গিবস। তিনি ছিলেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের কাতারে যাদের নাম খুব বেশি মানুষ জানে না। খোলাসা করে বললে বলতে হয় তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন।

ইউরোপে তিন বছর পড়াশুনার সময়টুকু বাদে বাকি জীবন তিনি তার তিন ব্লকের সীমানা ঘেরা বাড়ি আর ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটিয়েছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দশ বছর তিনি বেতন নিয়েও তেমন মাথা ঘামাননি। ১৮৭১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান থেকে শুরু করে ১৯০৩ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত এই সময়কালে তার কোর্সে প্রতি সেমিস্টারে মাত্র এক কি দুই জন ছাত্র আগ্রহ দেখাতো।

তার লিখিত কাজগুলো অনুসরণ করা ছিল বেশ কঠিন আর দুর্বোধ্য। কিন্তু এই রহস্যময় দুর্বোধ্য বর্ণনাগুলোতেই লুকিয়ে ছিল অতি উচ্চমানের তথ্যাবলী। উইলিয়াম ক্রপারের মতে, ‘১৯৭৫-৭৮ সালে গিবসের প্রকাশিত গবেষণাপত্রগুলোতে ভিন্নধর্মী পদার্থের ভারসাম্য শিরোনামে তাপগতীয় নীতির প্রায় সবকিছু যেমন- গ্যাস, মিশ্রণ, পৃষ্ঠতল, দশা পরিবর্তন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, তড়িৎ-রাসায়নিক কোষ, অধঃক্ষেপণ, অভিস্রবণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা রয়েছে।’

গিবসের এই ভারসাম্যতাকে বলা হতো ‘প্রিন্সিপিয়া অব থার্মোডাইনামিক্স’। কিন্তু তিনি তার এই গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করেন ‘কানেকটিকাট একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সেস’-এর জার্নালে যা তেমন পরিচিত ছিল না। এ কারণে প্ল্যাঙ্ক তার নিজের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত গিবসের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে আর কিছুটা পারিবারিক কারণে প্ল্যাঙ্ক অন্যদিকে মনোযোগ দেন।

চিত্র: উইলার্ড গিবস

আমরাও এবার আমাদের মনোযোগ নিয়ে যাবো সে সময়ের ওহাইওর একটি প্রতিষ্ঠানে যেটির তৎকালীন নাম ছিল ‘দ্য কেইস স্কুল অব সায়েন্স’। এখানে ১৮৮০ এর দশকে আলবার্ট মাইকেলসন এবং তার বন্ধু রসায়নবিদ এডওয়ার্ড মর্লি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। সেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। নিজেদের অজান্তেই যেন তারা এক নতুন জ্ঞানের দুয়ার খুলে ফেলেছিলেন।

মাইকেলসন আর মর্লির এই পরীক্ষা দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা একটা বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। তাদের পরীক্ষায় জানা গেলো যে, আলোকবাহী ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রসঙ্গত, ইথার হলো একটি কাল্পনিক মাধ্যম। যা বর্ণহীন, মানে অদৃশ্য, সান্দ্রতাহীন এবং ভরহীন এবং এটি সমস্ত মহাবিশ্ব জুড়ে বিদ্যমান।

দেকার্ত কর্তৃক প্রবর্তিত এই ইথারের ধারণা পরবর্তীতে নিউটন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সমর্থন করেন। মূলত ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানের পটভূমিতে এই ধারণাটির প্রয়োজন ছিল। কেননা আলো শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে কীভাবে গমন করে তা জানার নিমিত্তেই এই ইথারের ধারণা অনেক জনপ্রিয়তা পায়।

১৮ শতকের দিকে আলো এবং তাড়িতচৌম্বককে দেখা হতো তরঙ্গ হিসেবে। আর তরঙ্গের কথা হলেই চলে আসে কম্পাংকের কথা। কিন্তু কম্পাংকের জন্য প্রয়োজন একটি মাধ্যম। আর সেই মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এসেছে ইথারের ধারণা।

চিত্র: বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক

পরে ১৯০৯ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জে জে থমসন জোর দিয়ে বলেন, ‘ইথার শুধুমাত্র কোনো এক খ্যাতনামা দার্শনিকের চমৎকার এক আবিষ্কার নয়; এটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অপরিহার্য বায়ুর মতোই গুরুত্বপূর্ণ’। এই উক্তিটি তিনি করেন ইথারের অস্তিত্ব নেই তা প্রমাণ হবার চার বছর পরে। এ থেকে বোঝা যার, বিজ্ঞানীদের মনেও ইথারের ধারণা বেশ পাকাপোক্তভাবে গেঁথে গিয়েছিল।

ঊনিশ শতকের আমেরিকাকে অপার সুযোগের পীঠস্থান হিসেবে ভাবতে চাইলে আমাদেরকে আলবার্ট মাইকেলসনকে বাদ দিয়েই ভাবতে হবে। ১৮৫২ সালে জার্মান-পোলিশ সীমান্তে জন্মগ্রহণ করা মাইকেলসন বাবা-মা’র সাথে অল্প বয়সে চলে আসেন আমেরিকাতে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কয়লা খনির ক্যাম্পে বেড়ে উঠেন তিনি। বাবা ছিলেন শুষ্ক পণ্যের (সুতা, ফ্রেব্রিক ইত্যাদি) ব্যবসায়ী।

দারিদ্রের কারণে কলেজের খরচ জোগাতে না পেরে মাইকেলসন চলে আসেন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। সেখানে তিনি প্রতিদিন হোয়াইট হাউজের সামনের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতেন এই আশায় যে হয়তো তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের সাথে দেখা হয়ে যাবে এবং তিনি তার পড়াশুনা করার একটা বিহিত করবেন। পরে মিঃ গ্রান্ট তাকে ‘ইউ এস নেভাল একাডেমি’তে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দেন। সেখানেই মাইকেলসন পদার্থবিজ্ঞানের উপর জ্ঞানার্জন করেন।

দশ বছর পরে, ক্লিভল্যান্ডের কেস স্কুলের প্রফেসর হিসেবে মাইকেলসন ইথারের প্রবাহ নির্ণয় করতে আগ্রহী হলেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা অনুসারে, কোনো পর্যবেক্ষক আলোর উৎসের দিকে যাচ্ছে না বিপরীত দিকে যাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে আলোর বেগের তারতম্য বের করা যাবে। যদিও তখন পর্যন্ত কেউ এই বেগ মাপার কোনো উপায় বের করতে পারেনি। তবে ইথারের প্রবাহ বের করতে এই আলোর বেগকে কাজে লাগানো যাবে বলে মনে করলেন মাইকেলসন।

তিনি ভাবলেন, পৃথিবী যদি বছরের অর্ধেক সময় সূর্যের অভিমুখে যায় এবং বাকি অর্ধেক সময় সূর্য থেকে দূরে সরে যায় তাহলে এই দুই সময়ে পৃথিবীর বেগ নির্ণয় করে এই দুই সময়ে আলোর বেগের তুলনা করলে যদি তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের প্রবাহ বের করা যাবে। এবং ইথারের অস্তিত্ব যে আসলেই আছে তা প্রমাণ করা যাবে।

মাইকেলসন তার উদ্ভাবনী প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ইন্টারফেরোমিটার নামের এক সংবেদনশীল ও কার্যকরী যন্ত্রের নকশা করেন যা দিয়ে সঠিকভাবে আলোর বেগ মাপা সম্ভব হবে। এটা বানানোর অর্থ জোগান পাবার জন্য তিনি সদ্য টেলিফোন আবিষ্কার করা বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে কথা বললেন। পরে বন্ধু ও সহকর্মী মর্লিকে নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাপ করলেন।

এই কাজটা এতোটাই ক্লান্তিকর আর পরিশ্রমের ছিল যে তারা একটা সময় নার্ভাস ব্রেক ডাউনের শিকার হয়ে হাল ছেড়ে দিতে বসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ১৮৮৭ সালের দিকে তাদের কাজের ফলাফল বেরলো। কিন্তু এ কী! এ যে তারা যা ভেবেছিলেন তার একেবারে বিপরীত ফলাফল!

চিত্রঃ বিজ্ঞানী মাইকেলসন ও বিজ্ঞানী মর্লি

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে উইলিয়াম এইচ ক্রপার বলেন, ‘এটা সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে নেতিবাচক ফলাফল’। তবে মাইকেলসনকে এজন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। তিনিই প্রথম আমেরিকান যিনি এই বিরল সম্মান লাভ করেছেন। তবে এরপর মাইকেলসনও বিখ্যাত ‘নেচার’ সাময়িকীতে জানান যে তিনি সেসব বিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত যারা মনে করেন বিজ্ঞানে আবিষ্কার ও গবেষণা করার মতো আর তেমন কিছু নেই।

এরপর এলো বিংশ শতাব্দী তার চমকপ্রদ সব ঘটনাবলী নিয়ে। বিজ্ঞানের জগতে আর কিছুদিনের মধ্যে এমন সব আবিষ্কার হবে যা মানুষকে হতবাক করে দেবে। পরিবর্তন করে দেবে মানুষের ভাবনার জগত। যার কিছু কিছু ব্যাপার সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না।

বিজ্ঞানীরাও অল্পদিনের মাঝেই কণা ও প্রতিকণার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবেন। বিজ্ঞান তখন ম্যাক্রোপদার্থবিজ্ঞান থেকে আস্তে আস্তে মাইক্রোপদার্থবিজ্ঞানের দিকে এগুচ্ছে। আর সেই সাথে জগত প্রবেশ করতে লাগলো কোয়ান্টাম যুগে যার প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক।

১৯০০ সাল। ৪৫ বছর বয়স্ক ‘ইউনিভার্সিটি অব বার্লিন’-এর তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক নতুন একটা থিওরি দিলেন যার নাম ‘কোয়ান্টাম থিওরি’। থিওরিতে তিনি বলেন, ‘আলো পানির মতো প্রবাহিত হয় না বরং এটি প্যাকেট আকারে বা গুচ্ছাকারে প্রবাহিত হয়’। আর এই প্যাকেটের গুচ্ছকে তিনি অভিহিত করেন ‘কোয়ান্টা’ হিসেবে। এই ধারণাটি বেশ যুক্তিযুক্ত ছিল।

আর কিছুদিনের মাঝেই এটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত ‘আলোর গতি নির্ধারক পরীক্ষা’র ধাঁধার জট খুলতে সাহায্য করলো। আলোর তরঙ্গ হবার ধারণাকেও বদলে দিলো এই থিওরি। এরপর প্রায় অনেক বছর ধরে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মূল অংশে রাজত্ব করে বেড়ালো এই কোয়ান্টাম থিওরি। তাই এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের বদলে যাবার প্রথম ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু সত্যিকারের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটলো ১৯০৫ সালে। সে সময় এক তরুণ যার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো পরীক্ষাগারে যাতায়াতের সুবিধা, যে ছিল প্যাটেন্ট অফিসের তৃতীয় শ্রেণির এক কেরানি— সে ‘অ্যানালেন ডের ফিজিক’ নামে একটি জার্মান জার্নালে কিছু গবেষোণাপত্র প্রকাশ করলো। তরুণের নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। সে বছর ওই জার্নালে সে পাঁচটি গবেষণাপত্র দাখিল করে যার তিনটিই ছিল পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

এই তিনটির প্রথমটি ছিল, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম থিওরি অনুসারে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার প্রভাব ব্যাখ্যা নিয়ে। দ্বিতীয়টি, সাসপেনশনে ছোট ছোট কণার গতিপ্রকৃতি (ব্রাউনীয় গতি) নিয়ে এবং তৃতীয়টি ছিল আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে। এর মধ্যে প্রথমটির জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান যা আলোর প্রকৃতি কেমন তা বুঝতে মূল ভূমিকা রাখে। পরেরটি প্রমাণ করে যে, পরমাণুর অস্তিত্ব আছে এবং এরা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। আর সব শেষেরটি সম্ভবত আমাদের এই দুনিয়াটাকেই বদলে দিয়েছিল।

আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব

১৮৭৯ সালে জার্মানির উলম শহরে জন্মগ্রহণ করলেও বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বেড়ে ওঠেন মিউনিখ শহরে। ভবিষ্যতে তিনি যে বিখ্যাত একজন পদার্থবিদ হবেন তার আভাস কিন্তু ছোটবেলায় পাওয়া যায়নি। এটা বোধহয় প্রায় সবাই জানে যে তিন বছর বয়স পর্যন্ত তার মুখে কথা ফুটেনি।

১৮৯০ এর দশকে আইনস্টাইনের বাবার ইলেক্ট্রিক ব্যবসায় লস হলে তাদের পরিবার মিলান শহরে চলে আসে। কিশোর আইনস্টাইন পড়াশুনার জন্য চলে যান সুইজারল্যান্ড। কিন্তু প্রথমবারের চেষ্টাতে কলেজ এন্ট্রাস (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন। ১৮৯৬ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন যাতে মিলিটারিতে যোগদান করা না লাগে।

এরপর জুরিখ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চার বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হন। এটি ছিল স্কুলের বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষক তৈরি করার উদ্দেশ্যে প্রণয়িত একটি কোর্স। এই কোর্সে আইনস্টাইন ছিলেন মোটামুটি মানের একজন ছাত্র।

১৯০০ সালে স্নাতক পাশ করার কয়েকমাসের মধ্যেই তিনি জার্নালে নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। তার প্রথম গবেষণাপত্রটি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের ‘কোয়ান্টাম থিওরি’র সাথে একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৪ সালের মাঝে তিনি কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেগুলো কানেকটিকাটের বিজ্ঞানী জে উইলার্ড গিবসের ‘পরিসংখ্যান বলবিদ্যার মৌলিক নীতি’কে সমর্থন করে এবং বোঝায় যে বিজ্ঞানী গিবসের কাজ ফেলনা ছিল না।

চিত্র: বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন

একই সময়ে আইনস্টাইন তার এক হাঙ্গেরিয়ান ছাত্রী মিলেভা মারিকের প্রেমে পড়েন। বিয়ের আগেই তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয় এবং বাচ্চাটিকে দত্তক দিয়ে দেয়া হয়। আইনস্টাইন তার মেয়েকে দেখার সুযোগ পাননি। এর দুই বছর পর তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই সময়ের মধ্যে ১৯০২ সালে আইনস্টাইন সুইস প্যাটেন্ট অফিসে চাকরি নেন এবং পরবর্তী সাত বছর এই চাকরিতেই কাটিয়ে দেন।

আইনস্টাইন তার এই কাজ বেশ উপভোগ করতেন। যদিও এই কাজ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল তবুও তা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তার ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি। বরং বলা চলে ১৯০৫ সালে তার দেয়া বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পটভূমি এই প্যাটেন্ট অফিসের কাজে থাকতেই রচিত হয়েছিল।

তার গতিশীল বস্তুর তড়িৎগতিবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটিকে এযাবতকালের সবচেয়ে অসাধারণ গবেষণাপত্র বলে বিবেচনা করা হয়। এর উপস্থাপনার ভঙ্গি কিংবা ভেতরের তথ্যাবলী দুটোই ছিল অন্যান্য গবেষণাপত্র থেকে ভিন্ন। এতে কোনো পাদটিকা, উদ্ধৃতি কিংবা পূর্ববর্তী কোনো গবেষণাপত্রের উল্লেখ ছিল না। ছিল না তেমন কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা। তবে তার প্যাটেন্ট অফিসের একজন সহকর্মী, মিচেল বেসো’র সহায়তার কথা বলা হয়েছিল।

সি পি স্নো এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আইনস্টাইন কারো সহায়তা ছাড়াই শুদ্ধ চিন্তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। অন্য কারো মতামত না শুনেই তিনি বিশাল এক পরিসরের চিন্তা ভাবনা একাই করে ফেলেছিলেন।”

এই গবেষণাপত্রে তার ভুবন বিখ্যাত E = mc2 সমীকরণটি ছিল না। তবে এর কয়েক মাস পরেই তিনি এটি প্রকাশ করেন। সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে এই সমীকরণ বলছে, বস্তুর ভর এবং শক্তি একটা ভারসাম্য অবস্থায় থাকে। মূলত প্রতিটি জিনিসই দুটি রূপে থাকে। একটি হলো শক্তি আর অন্যটি হলো বস্তু বা ভর। শক্তি হলো মুক্ত হয়ে যাওয়া বস্তু। আর বস্তু হলো যা শক্তিতে রূপান্তরের অপেক্ষায় আছে।

আলো বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার, যেহেতু আলোর বেগের বর্গ একটা বিশাল বড় সংখ্যা সেহেতু বলা যায় প্রতিটা বস্তুতেই একটা বিশাল পরিমাণ শক্তি মজুদ আছে। একজন পরিণত মানুষের শরীরে প্রায় 7 × 1018 জুল পরিমাণ শক্তি রয়েছে যা ত্রিশটা বড় আকারের হাইড্রোজন বোমার শক্তির সমান। আসলে প্রত্যেক বস্তুতেই শক্তি সঞ্চিত আছে। আমরা শুধু তা ব্যবহার করার সঠিক উপায় এখনো জানতে পারিনি।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে এমন জিনিস হলো ইউরেনিয়াম বোমা। এটি এর মূল শক্তির মাত্র এক শতাংশেরও কম শক্তি উৎপন্ন করে। আমরা আরো একটু চতুর হতে পারলে এর পুরোটাই শক্তিতে পরিণত করতে পারতাম।

চিত্রঃ ইউরেনিয়াম বোমা।

অন্যান্য আরো অনেক তত্ত্বের মধ্যে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব তরঙ্গের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা দেয়। কীভাবে একটি ইউরেনিয়াম পিণ্ড বরফের মতো গলে না গিয়ে উচ্চ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। এই সমীকরণের কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি যে আলোর বেগ সবসময় একই থাকে অর্থাৎ ধ্রুব। কোনো কিছুই আলোকে অতিক্রম করতে পারে না।

সাথে সাথে আলোকবাহী ইথারের প্রকৃতি এবং এর অনস্তিত্বের কথাও জানা যায়। এর মাধ্যমে আমরা এই মহাবিশ্বের স্বরূপ সম্পর্কেও জানতে পারি। কীভাবে নক্ষত্রগুলো বিলিয়ন বছর ধরে জ্বলছে কিন্তু নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে না তাও আমরা এর মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। আইনস্টাইন এই তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের নিকট এক নতুন মহাবিশ্বের দুয়ার খুলে দিয়েছেন।

নিয়ম অনুসারেই পদার্থবিদরা একজন প্যাটেন্ট অফিসের কেরানির প্রকাশিত গবেষণাপত্রের দিকে তেমন কোনো লক্ষপাত করেননি। যার কারণে আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত আবিষ্কার খুব কম সাড়া ফেলে প্রথমদিকে। মহাবিশ্বের অল্পকিছু রহস্যের সমাধান করার পর আইনস্টাইন ইউনিভার্সিটির লেকচারার পদে যোগদানের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এরপর স্কুল শিক্ষক হিসেবে আবেদন করলে সেখানেও মনোনীত হননি।

শেষমেশ তিনি আগের সেই ছাপোষা তৃতীয় শ্রেণীর কেরানী পদে ফিরে যান। কিন্তু চিন্তা-ভাবনা করা থামাননি। মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনের কাজের শেষ যে তিনি এখনো করে উঠতে পারেননি।

কবি পল ভালেরি আইনস্টাইনকে জিগ্যেস করেছিলেন তিনি তার আইডিয়াগুলো কোনো নোটবুকে লিখে রাখেন কিনা। জবাবে স্মিত হেসে আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘তার প্রয়োজন হবে না। তেমন কোনো আইডিয়া আমার মাথায় নেই’। কিন্তু আসলে এর পরে আইনস্টাইনের মাথায় যে চিন্তা ভাবনা এসেছিল তা ছিল জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সাড়া জাগানো এক আইডিয়া যা আমাদের চেনা জগতের চেহারা বদলে দিয়েছিল।

কোথাও কোথাও বলা হয় যে, ১৯০৭ সালের দিকে আইনস্টাইন একজন শ্রমিককে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেন এবং তখন থেকেই অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তার নিজের মত হচ্ছে, চেয়ারে বসে থাকার সময়ে তিনি অভিকর্ষের সমস্যা নিয়ে অবগত হন!

আইনস্টাইনের এই আইডিয়া অভিকর্ষের সমস্যা সমাধানের পথে প্রথম পদক্ষেপ বলা চলে। এমনিতেও আইনস্টাইনের মাথায় এটা ছিল যে তার বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে কিছু একটা নেই। আর তা ছিল অভিকর্ষ। ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ সম্পর্কে বিশেষ ব্যাপার হলো এটি অভিকর্ষের প্রভাবে চলন্ত বস্তু নিয়ে কাজ করে।

কিন্তু যদি কোনো বস্তু অভিকর্ষের বাইরে থেকে গতিশীল হয় (যেমন-আলো) তখন কী ঘটবে? এই প্রশ্নটিই পরবর্তী এক দশক ধরে তার চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল এবং অবশেষে ১৯১৭ সালের শুরুতে তিনি প্রকাশ করেন তার ‘সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ শিরোনামে বিখ্যাত গবেষণাপত্র।

১৯০৫ সালে দেয়া ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’ বেশ গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ হলেও সি পি স্নো এর মতে, “আইনস্টাইন যদি এই বিশেষ তত্ত্ব না দিতেন তবে পরের পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ না কেউ তা ঠিকই প্রকাশ করতেন। কিন্তু আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের ব্যাপার আলাদা। আইনস্টাইন এই তত্ত্ব না দিলে আমাদের হয়তো এখনো এর জন্য অপেক্ষা করতে হতো।”

তথ্যসূত্র

  1. Einstein’s Universe/A short History of nearly everything
  2. http://z2i.co/astronomy/aether-an-imaginary-medium/
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Max_Planck
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Albert_A._Michelson

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আদ্যোপান্ত

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (থিওরি অব রিলেটিভিটি) সম্ভবত বিংশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার। যারা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তেমন কিছুই জানেন না তারাও হালকা গোঁফ, উঁচু কপাল, এলোমেলো চুলের একজন বিজ্ঞানীকে খুব ভালমতো চেনেন, যিনি ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্ব একটু অন্যরকম। এই একটিমাত্র তত্ত্ব প্রায় ১০০ বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখনো শেষ হয়নি।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাকে বর্ণনা করেছেন দুই ভাগে। একবার ১৯০৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’, পরের বার ১৯১৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব’। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ তত্ত্ব নিশ্চয়ই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করবে, আর সাধারণ তত্ত্ব সাধারণভাবে সকল ঘটনার জন্য কাজ করবে। বিশেষ তত্ত্বের বিশেষ ক্ষেত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে তা বুঝতে হলে প্রসঙ্গ কাঠামো বা রেফারেন্স ফ্রেম নিয়ে একটু ধারণা দরকার হয়। নাম শুনে যতটা কঠিন আর খটমটে মনে হয় সত্যিকার অর্থে প্রসঙ্গ কাঠামোর ধারণা ঠিক ততটাই সহজ আর সরল।

ধরা যাক, ভোরবেলা দুজন মানুষ পার্কে দৌড়াচ্ছে, একজনের চেয়ে অন্যজন একটু দ্রুত। এখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা যে কেউ কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধুমাত্র দেখেই বলে দিতে পারবে তাদের মধ্যে কে দ্রুত দৌড়াচ্ছে। যখন আমরা শুধু চোখে দেখে কোনো গতি বোঝার চেষ্টা করি তখন নিজের অজান্তেই একটা কাজ করতে থাকি, আশেপাশের কোনো স্থির বস্তুর সাথে সাথে সেই গতিশীল বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করি। যদি আমাদের বস্তুটি স্থির বস্তুটিকে রেখে (আমরা যে বস্তুটিকে মনে মনে স্থির বলে ধরে নেই) সরে যেতে থাকে তবে আমরা বুঝি আমাদের বস্তুটি গতিশীল, যে বস্তুটি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে তার গতি তত বেশি। এখানে এই স্থির বস্তুটি, যার সাথে তুলনা করে আমরা গতিশীলতা বুঝতে পারলাম তাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলবেন প্রসঙ্গ কাঠামো।

যেকোনো কিছুই প্রসঙ্গ কাঠামো হতে পারে, যদি কেউ একজন ল্যাবে বসে একটা পরীক্ষা করে তাহলে সে পুরো ল্যাবটাকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরতে পারে, আবার চলন্ত গাড়িতে বসে একই পরীক্ষাটা করতে চাইলে পরীক্ষকের সাপেক্ষে ‘স্থির’ গাড়ির কামরাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন দুটি সূত্র দিয়েছিলেন, ১. সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরকম। ২. সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতি সমান। জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হলো বিশেষ ধরনের কিছু প্রসঙ্গ কাঠামো যারা একে অন্যের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল।

প্রথম সূত্রটিতে বলা হয়েছে প্রসঙ্গ কাঠামো যদি জড় হয় তবে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একরকম হবে। অর্থাৎ সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে সবসময় ভরের সাথে ত্বরণ গুন করে বল বের করে ফেলা যাবে। খুবই সোজা সরল কথা। সে তুলনায় দ্বিতীয় সূত্রটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি দুজন মানুষ যদি একই দিকে দৌড়াতে থাকে তবে তাদের একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের যে গতি, সে তুলনার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কারো সাপেক্ষে তাদের গতি বেশি হবে। আবার তাদের বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসা কারো সাপেক্ষে তাদের গতিবেগ আরো বেশি হবে। এটাই আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতি। একটা গতি থেকে অন্য গতি বিয়োগ করে এই আপেক্ষিক গতিটা বের করে ফেলা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটা বলছে আলোর বেলায় আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতির ধারণাটা কাজ করবে না।

তার মানে কেউ যদি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আলোর গতি মাপে তাহলে দেখবে আলো সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যাচ্ছে। আবার কেউ যদি সেকেন্ডে ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যেতে যেতে আলোর গতি মাপে তাহলেও কিন্তু আলোর গতিবেগ আমাদের জানাশোনা পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী  সেকেন্ডে একলক্ষ মাইল পাবে না, একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলই পাবে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও বিজ্ঞানীরা অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরেও সূত্রটাতে কোনো ভুল পাওয়া যায়নি।

এই সূত্র দুটি মেনে নিয়ে যদি এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যায় সময়, দূরত্ব আর ভরকে আমরা যেমন অপরিবর্তনীয় ভাবি, তেমনটা নয়। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি না, তার কারণ আমরা কখনোই আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছোটাছুটি করি না। কিন্তু কেউ একজন যদি স্থির অবস্থায় থেকে আর অন্য একজন যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে ছুটতে দুটি একই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য মাপতে চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যিনি আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যাচ্ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্য যিনি স্থির ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি হবে!

আবার ধরে নেয়া যাক একজন মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে, গাড়িটার গতিবেগ যদি আলোর কাছাকাছি হয় তাহলে মাটিতে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখবেন গতিশীল গাড়িটা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। এইটুকুই কিন্তু শেষ না, গাড়িটাতে যদি যাত্রী থাকেন তাহলে তার সাপেক্ষে কিন্তু গাড়িটা স্থির এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আলোর কাছাকাছি বেগে সরে যাচ্ছে, কাজেই যাত্রী দেখবেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন!

আইনস্টাইন আরেকটা কাজ করলেন। আমাদের জগতটা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ সবকিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা এই তিনটা মাত্রা আছে। যেকোনো স্থানে কোনো বস্তুকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কোনো একটা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বরাবর দূরত্বগুলো জেনে নিতে হবে।

চিত্রঃ প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা জানা থাকলে বস্তুকে চট করে খুঁজে বের করে ফেলা যায়।

আইনস্টাইন যুক্তি দেখালেন কেউ শুধু দূরত্বগুলো জেনে নিলেই সবসময় বস্তুটি খুঁজে বের করতে পারবে না। কারণ বস্তুটি যদি গতিশীল হয় তাহলে কোনো সময়ে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দূরত্ব কত হচ্ছে তা জানতে হবে। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার মতো সময়ও একটা মাত্রা, শুধু পার্থক্য হলো সময়কে আমরা একটু ভিন্নভাবে অনুভব করি। আইনস্টাইন একে বললেন স্পেস-টাইম বাংলায় বললে স্থান-কাল। আগের তিনটা মাত্রার সাথে সময়কে জুড়ে দিলে দেখতে কেমন হয়?

ব্যাপারটা খুব সহজে বোঝার জন্য ধরে নেই স্থানের মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই তিনটা না, স্থানের মাত্রা শুধু একটা যাকে আমরা একটা সুতার সাথে তুলনা করতে পারি। আর সময় তো নিজেই একটা মাত্রা, একেও একটা সুতার সাথে তুলনা করি। এবার যদি এই দুটি সূতা দিয়ে একটা কাপড় বুনে ফেলা হয় তাহলে দেখতে নিচের ছবিটার মতো হওয়ার কথা।

চিত্রঃ হালকা রঙের সুতাগুলো সময়ের জন্য আর গাড় রঙের সুতোগুলো স্থানের জন্য। (সহজে বোঝার জন্য তিনটা মাত্রাকে একটা ধরে নেয়াতে কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা নেই, বিজ্ঞানীরাও হরহামেশাই এভাবে বর্ণনা করেন।)

এই ছিল মোটামুটি ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’। এতক্ষণে নিশ্চয় অনেকেই ধরে ফেলেছেন বিশেষ তত্ত্ব কেন বিশেষ। কারণ এই তত্ত্বের সূত্রগুলো কাজ করবে শুধুমাত্র যতক্ষণ প্রসঙ্গ কাঠামোগুলোর মধ্যে গতির পরিবর্তন (ত্বরণ) হবে না ততক্ষণ।

কিন্তু প্রকৃতিতে সবসময়ই সবকিছুতেই ত্বরণ হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ এবং প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চাইলে আরো বড় পরিসরে চিন্তা করে করে তত্ত্বকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে, সোজা কথায় প্রসঙ্গ কাঠামোর শুধু ধ্রুব বেগের জন্য কাজ করলে হবে না, ত্বরণের জন্যও ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বের করতে হবে। তাই ১৯০৫ সালে বিশেষ তত্ত্ব দেয়ার পর পরই আইনস্টাইন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ত্বরণের জন্য আসল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করা যায়।

প্রকৃতিতে ত্বরণের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মহাকর্ষজ ত্বরণের কথা। পৃথিবীতে উপর থেকে ফেলে দিলে যেকোনো বস্তুর ত্বরণ হয় বা বেগ বাড়তে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে এই বেগ বাড়াটাই হল মহাকর্ষজ ত্বরণ। এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ হয় তার মানে মহাকর্ষজ ত্বরণও নিশ্চয়ই কোনো বলের কারণে হচ্ছে। তিনি এর নাম দিলেন মহাকর্ষ বল। অবশ্য এই বলের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

মহাকর্ষ বল কেমন হতে পারে, তার জন্য গাণিতিক সমীকরণ কেমন হতে পারে সব নিউটন ভেবে ভেবে বের করে রেখেছিলেন এবং এসব সমীকরণ দিয়ে প্রকৃতিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল। আইনস্টাইন তার আশেপাশে গেলেন না। একদিন অফিসের জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় এল কেউ যদি হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় এবং অভিকর্ষের প্রভাবে ত্বরণ নিয়ে নিচে পড়তে থাকে তাহলে মাটিতে পড়ার আগে সে কেমন অনুভব করবে? আইনস্টাইন ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন, ভাবলেন কেউ যদি একটা বাক্সের ভেতর থাকেন এবং তাকে যদি বাক্সটা সহ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় তখন কী হবে? লিফটের কর্ড ছিঁড়ে গেলে ঠিক এই অবস্থাটাই হয়।

বাক্সটি ফেলে দেয়ার আগ পর্যন্ত লোকটি বাক্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাক্সের তলায় ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছিলেন, তাই বাক্সটিও তার ওজনের সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল ব্যক্তিটির উপর প্রয়োগ করছিল বলে তিনি তার ওজনটা অনুভব করছিলেন। যখনই বাক্সটাকে ফেলে দেয়া হবে সাথে সাথে বাক্সের ভেতরের মানুষটা মহাকর্ষজ ত্বরণের জন্য নিচে পড়তে থাকবেন এবং প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে। কিন্তু বাক্সটাও মহাকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে তাই পড়তে পড়তে সেটার বেগও প্রতিসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ বাক্সটি মানুষটার পায়ের নিচ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরে যেতে থাকবে। তার মানে কিন্তু মানুষটা আর বাক্সটার তলায় বল প্রয়োগ করতে পারছেন না ফলে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, তাই তিনি নিজের ওজনটাও অনুভব করতে পারছেন না।

ব্যাপারটা কেমন হলো? বাক্স এবং মানুষ দুজনেরই ত্বরণ হচ্ছে কিন্তু তারা কেউই কোনো বল অনুভব করছে না। মহাকর্ষ বলহীন কোনো স্থানে স্থির অবস্থায় থাকলে যে অনুভূতি হবে, পৃথিবীতে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণে পড়তে থাকলে ঠিক সেই অনুভূতি হবে। ঠিক এই ভাবনাটাকেই একটু উল্টো করে ভাবলে বলা যায় বাক্সটা যদি শূন্যস্থানে কোনোরকম আকর্ষণের আওতায় না থেকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণ নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ভিতরের কোনো মানুষ যেমন অনুভব করবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্থির অবস্থায় থাকলেও ঠিক তেমনই অনুভব করবে।

আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ বল আর ত্বরণ আসলে একই জিনিষ এবং একে বললেন, “the happiest thought in my life”। এই মহাকর্ষ আর ত্বরণ সমান হওয়াকে নাম দিলেন “equivalence principle”।

এবার উপরের ছবিটা একটু দেখা যাক। আইনস্টাইন ঠিক এই থট এক্সপেরিমেন্টটাই করেছিলেন ভেবে ভেবে। দেখা যাচ্ছে লিফটের বাইরের লোকটা সামনের দিকে একটা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির সাপেক্ষে যখন লিফটটা স্থির (চিত্রের প্রথম অংশে) তখন লিফটের ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোক রশ্মিটা একপাশ থেকে এসে সোজা অন্য পাশের দেয়ালে আঘাত করছে। বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটা যখন ধ্রুব বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা চিত্রের মতো বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে (ধ্রুব বেগের জন্য যে এমনটা হয় তা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা আগেই জেনে গেছি)।

বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটার যখন উপরের দিকে ত্বরণ হচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে, আগের চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, সময়ও বেশি লাগছে। এর কারণ কী হতে পারে? আইনস্টাইন ভাবলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি যেহেতু আলোক রশ্মিটাকে কখনোই বেঁকে যেতে দেখবেন না কিন্তু লিফটের সাথে ত্বরণে ছুটে চলা মানুষটা যেহেতু দেখবেন, আলোকরশ্মিটা বেশি সময় ধরে বেঁকে গিয়ে গিয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলছে তার মানে নিশ্চয়ই স্থির ব্যক্তির স্থান-কালের তুলনায় ত্বরণে থাকা ব্যক্তির স্থান-কালটাই বেঁকে যাচ্ছে। ত্বরণের জন্য স্থান-কাল বেঁকে যাচ্ছে। আবার “equivalence principle” অনুযায়ী যেহেতু ‘মহাকর্ষ’ আর ‘ত্বরণ’ একই জিনিস সেহেতু অভিকর্ষের জন্যও স্থান-কাল এভাবে বেঁকে যাবে।

অর্থাৎ আমরা যদি বলি, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই কিংবা ‘ভারী বস্তুর মহাকর্ষ বল বেশি, হালকা বস্তুর মহাকর্ষ বল কম- এমনটা সত্য হবে না। ভারী বস্তু আসলে তার চারপাশের স্থান-কালকে বেশি করে বাঁকায় আর হালকা বস্তু কম বাঁকায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। শুনে মনে হতে পারে গালগল্প কিন্তু আইনস্টাইন সত্যি সত্যি এই বাঁকানো স্থান-কালের ধারণা দিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। যেমন সূর্য যদি পৃথিবীকে আকর্ষণ না করে শুধু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে বসে থাকে তাহলে পৃথিবী কেন সূর্যের চারিদিক ঘুরবে না?

চিত্রঃ সূর্যের চারিদিকে বাঁকানো স্থান-কালে আটকা পড়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

 

ঠিক যে কারণে পানি গড়িয়ে নিচু জায়গায় পড়ে যেতে চায় সেই একই কারণে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বাঁকা স্থান-কালের মধ্যে পড়ে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে, পরবর্তী ছবির মতো করে একটা টানটান করে রাখা চাদরের মাঝখানে ভারী কিছু রেখে আরেকটু হালকা একটা গোলককে কিছু গতি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে দেখতে পারেন। এখানে চাদরটা স্থান-কালের মতো ভারী বস্তুটার ভরের জন্য বেঁকে যাবে। পৃথিবী কেমন করে সূর্যকে ঘিরে ঘুরতে থাকে, হালকা গোলকটার গতি দেখলেই সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব।

এখানে অবশ্য চাদরের সাথে গোলকের ঘর্ষণে শক্তি কমতে কমতে একটা সময় গোলকটা মাঝখানের ভারী বস্তুতে গিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু পৃথিবী যেহেতু শূন্যস্থানে ঘুরছে তাই তার সাথে কোনোকিছুর ঘর্ষণে গতিশক্তি কমে যায় না, পৃথিবীও সূর্যে গিয়ে আঘাত করে না।

আইনস্টাইন ত্বরণের জন্য আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করতে গিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। নিউটনের পুরনো তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে আইনস্টাইন তার এই নতুন তত্ত্বটি দিয়ে ভরযুক্ত বস্তুর পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়া (Gravitational Lensing), ভরযুক্ত বস্তুর কাছে সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া (time dilation), ঘূর্ণায়মান ভরের দিকে স্থান-কালের টান ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করে ফেললেন, যেগুলো নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

আইনস্টাইন কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই বের করে ফেলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিলেন। শুধু একটা ছাড়া। সেটি “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ”।

আইনস্টাইন তার নতুন তত্ত্বটা দিয়ে অনেক কিছুই ঠিকঠিক ব্যাখ্যা করে ফেললেন কিন্তু ভারী বস্তু যে ভরের জন্য সত্যি সত্যিই চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে তা সরাসরি প্রমাণ করা যায় কীভাবে? আইনস্টাইন আবার ভেবে ভেবে বের করলেন, দুটি ভারী বস্তু যদি একে অন্যকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি আসতে থাকে তবে তারা যে তাদের ভরের জন্য স্থান-কালকে বাঁকিয়ে রেখেছিল সেই বাঁকানো ভাবটার খুব দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটবে।

এই দ্রুত পরিবর্তনটার জন্য একটা খুব শক্তিশালী তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা, এই তরঙ্গটাকে তিনি নাম দিলেন ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ’। কোনোভাবে যদি এইরকম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে ভারী বস্তু আসলেই স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে এত এত লেখালেখি হচ্ছে যে সেগুলো পড়ে পড়ে আমরা সবাই এ সম্পর্কে কমবেশি জানি।

সবাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চিনি। যে তরঙ্গ নিচের ছবির মতো মাধ্যমের কণাগুলোকে উপরে নিচে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকের সাথে সমকোণে এগিয়ে যায় সেটাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। যেমন পানির ঢেউ।

চিত্রঃ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

আবার যে তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোকে সামনে পিছনে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকে সমান্তরাল দিকে এগিয়ে যাবে তাকে আমরা বলি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। যেমন শব্দের তরঙ্গ।

চিত্রঃ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

তবে মহাকর্ষ তরঙ্গ কিন্তু আমাদের পরিচিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ না, একটু বিশেষ ধরনের তরঙ্গ। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কোয়াড্রুপল তরঙ্গ’। এই তরঙ্গ স্থানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে এবং অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতোই মাধ্যমের সংকোচন প্রসারণ করে আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোয়াড্রুপল তরঙ্গ স্থানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলার সময় স্থানকে যদি আনুভূমিক দিকে সংকুচিত করে তবে উলম্ব দিকে সম্প্রসারিত করে। একইভাবে, যদি আনুভূমিক দিকে সম্প্রসারিত করে তবে উলম্ব দিকে সংকুচিত করে, নিচের ছবির মতো। বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও ধরে নিলাম স্থানের মাত্রা দুটি, দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ।

চিত্রঃ প্রথম চিত্রে স্থান-কাল আনুভূমিক দিকে প্রসারিত, উলম্ব দিকে সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় চিত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটা ঘটেছে।

কিন্তু এই কোয়াড্রুপল মহাকর্ষজ তরঙ্গ এত বেশি দুর্বল যে, যত সহজে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণের কথা বলা হলো, সত্যি সত্যি সনাক্ত করতে গেলে ঠিক ততটাই সূক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার। আইনস্টাইনের সময় এত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কথা চিন্তাও করা যেত না।

বেশ কিছু বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানী Ray Weiss মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করলেন। তার পদ্ধতিটা সহজ, এতে থাকবে দুটি সমান দৈর্ঘ্যের টানেল, যেগুলো পরস্পর সমকোণে অবস্থান করবে। প্রত্যেকটি টানেলের শেষ মাথায় লাগানো থাকবে প্রতিফলক আয়না, দুটি টানেলের দৈর্ঘ্য খুব সূক্ষ্মভাবে সমান হতে হবে। টানেলগুলো দিয়ে আলোর ব্যতিচার মাপা হবে কাজেই সূক্ষ্মভাবে সমান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

একটি লেজার বিমকে বিশেষ কৌশলে দুইভাগে ভাগ করে টানেলগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলে (নিচের ছবির মতো) লেজার রশ্মিগুলো টানেলের শেষ মাথার প্রতিফলক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে অনেক খেটেখুটে টানেল দুটিকে খুব সূক্ষ্মভাবে সমান করে তৈরি করেছেন তাই ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচার করে পরস্পরকে নাই করে দিবে।

চিত্রঃ LIGO Interferometer.

এখন যদি পৃথিবীর মধ্য দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে যায় তাহলে স্থানের একবার সংকোচন আরেকবার প্রসারণ হবে। যেহেতু এই যন্ত্রটিও স্থানের মধ্যেই আছে সেহেতু টানেল দুটিতেও নিচের চিত্রের মতো সংকোচন-প্রসারণ হবে।

চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা সংকুচিত আর আনুভূমিক টানেলটা প্রসারিত হচ্ছে।
চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা প্রসারিত আর আনুভূমিক টানেলটা সংকুচিত হচ্ছে।

এই সংকোচন প্রসারণের জন্যই আগের মতো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচারের মাধ্যমে আর পরস্পরকে নাই করে দিতে পারবে না। রশ্মি দুটো মিলে আরেকটু বেশি শক্তিশালী রশ্মি তৈরি করে শনাক্তকারকে আঘাত করবে (নিচের ছবি)। শনাক্তকারক থেকে এই রশ্মির তীব্রতা মাপা আর মহাকর্ষ তরঙ্গ মাপা আসলে একই কথা।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বেঙ্গলেনসিস (ইমতিয়াজ আহমেদ)।

বাস্তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কারণ মহাকাশের অনেক অনেক দূরে পরস্পরকে ঘিরে ঘুরতে থাকা দুটি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ পৃথিবীতে স্থানকে এত কম বিচ্যুত করবে যে তা শনাক্ত করতে হলে প্রায় অসাধ্য সাধন করতে হবে। তাই তারা প্রত্যেকটি টানেলকে ৪ কিলোমিটার লম্বা করে তৈরি করলেন (টানেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে বিচ্যুতি ধরতে পারার সম্ভাবনাও তত বাড়ে)।

এতটুক পড়ে এসে অনেকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, এতটা সংবেদনশীল করে তৈরি করার একটা অসুবিধাও আছে, যন্ত্রটার কাছাকাছি খুব অল্প কোনো নয়েজও যন্ত্রটাতে প্রভাব ফেলবে। যন্ত্রটার সংবেদনশীলতা এতই বেশি যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে একটা তালি দিলেই একটা বিক্ষেপ দেখা যাবে। এই সমস্যাটা যাতে না হয় এবং পৃথিবীর কোনো নয়েজকে যাতে মহাকর্ষ তরঙ্গ ভেবে ভুল না হয় তাই বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দুটি একইরকম যন্ত্র তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন কারণ দুই জায়গায় দুটি ভিন্ন যন্ত্রে একই সাথে বাইরে থেকে একই পরিমাণ নয়েজ ঢুকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই ধরনের ব্যবস্থা আর এত এত সতর্ক পদ্ধতি নিয়ে ২০০১ সালে LIGO প্রকল্প শুরু হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত এর মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলতা ছিল না। শেষপর্যন্ত ২০৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংবেদনশীলতা ১০ গুন বাড়িয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার চালু করা হয়। নতুন আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে ফেললেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে শুধুমাত্র আইনস্টাইনের বক্র স্থান-কালের ধারণা প্রমাণ করা হলো কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের সামনে একটা বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারে না। আমরা যেহেতু এতদিন শুধু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকেই যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে জানতাম তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণাও হালে খুব একটা পানি পায়নি।

আবার বিগ ব্যাং এর পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সেখান থেকে কোনো রকম তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্ব কেমন ছিল তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের আচরণ থেকে তার কোনোরকম তথ্য পাওয়া যায় না।

কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উচ্চ ঘনত্ব যেমন এই তরঙ্গকে আটকে রাখতে পারেনি তেমনি ব্ল্যাক হোলের উচ্চ ঘনত্বেও এই তরঙ্গ আটকা পড়ে থাকবে না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষকদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়ত আমরা জানতে পারবো মহাবিশ্ব একেবারে জন্মের সময়টা কীভাবে পার করেছে অথবা ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কেমন সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48439/

২. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48447/

৩. https://www.youtube.com/watch?v=J9Zs-CjybTc

৪. http://csep10.phys.utk.edu/astr161/lect/history/einstein.html

৫. http://www.ceder.net/def/quadruple.php4?language=usa

৬. http://www.pitt.edu/~jdnorton/Goodies/Chasing_the_light/

৭. http://www.einstein-online.info/spotlights/equivalence_principle

৮. https://www.youtube.com/watch?v=RzZgFKoIfQI

featured image: rsi.ch

“হাল ছেড়ো না বন্ধু”- আইনস্টাইন যেভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন

ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ, যেদিন মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, অনেকের মতো আমিও এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠি। মহাকর্ষ তরঙ্গ বলে একটা জিনিস যে আছে তা প্রায় একশ বছর আগে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলে গেছেন। আবদুল গাফফার রনির “থিওরি অব রিলেটিভিটি” (অন্বেষা, ২০১৬) বইটি পড়ে ফেলি। লেখক সাবলীল ভাষায় এ তত্ত্বটির মূল ধারণাগুলোর সহজবোধ্য বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি পদার্থবিজ্ঞানের বই হলেও বেশ উপভোগ্য, গাণিতিক সূত্রের ছড়াছড়ি নেই। এই জটিল বিষয়ে প্রাথমিক সাক্ষরতা লাভের জন্য বইটি বেশ চমৎকার।

আইনস্টাইন, যাকে বলা হয় বিজ্ঞানের পোস্টারবয়, বিজ্ঞানের রঙিন জগতের একজন তারকা, তিনি আরেকবার জিতলেন। তার তত্ত্বটিতে কী বলা হয়েছে, কিংবা মহাকর্ষ তরঙ্গ জিনিসটা আসলে কী- এসব বিষয় নিয়ে আমি কিছুই লিখবো না। কারণ বাংলা ভাষায় অনেকেই এ বিষয়গুলো নিয়ে খুব ভালো লিখছেন। আমার আগ্রহ হলো অন্য জায়গায়: আইনস্টাইন কীভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন, তার উপর।

আমরা যে শুনি, তিনি তৎকালীন নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভিত নড়িয়ে দিয়ে নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান চালু করেছেন- এরকম বিদ্রোহী কি একেবারে শুরু থেকেই ছিলেন? তিনি কাজ করতেন কীভাবে? তার কাছ থেকে তরুণরা কী শিখতে পারেন?

শৈশবের আইনস্টাইন; image source: biography.com

যে কোনো বড়সড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কিংবা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে একটি প্রস্তুতির বিষয় থাকে। আমরা সেই বিরাট আবিষ্কার বা পরিবর্তন দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়ে যাই, ঘটনার নায়কের প্রচলিত জীর্ণ-নিয়ম ভেঙে ফেলা বিদ্রোহের সাফল্যে এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে পড়ি যে, পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিশ্রমটা চোখেই পড়ে না। আর সে প্রস্তুতি যে প্রচলিত রীতিমাফিকই হয়ে থাকে, সে কথাটাও ভুলে যাই।

অনেক দিন আগে কাল নিউপোর্টের ব্লগে এ প্রসঙ্গে একটি লেখা পড়ি যেখানে তিনি আইনস্টাইনের প্রস্তুতির উপর আলো ফেলেছিলেন। সেখান থেকে একটা গল্প এখানে বলবো।

আইনস্টাইনের এই কাহিনীটা প্রায় সবাই শুনেছেন। গল্পটা এরকম-আইনস্টাইন শিক্ষাগত জীবনে বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেনগতানুগতিক পড়াশুনা তার ভালো লাগতো নাফলে পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার পেতেনবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ হয়ে গেলোকিন্তু তখনকার শিক্ষায়তন তার প্রতিভা উপেক্ষা করে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেফলে বেকার আইনস্টাইন অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা সর্বস্বান্ত হয়ে প্যাটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে নিচু পদের চাকরীতে যোগ দেন তবে চাকরী তার জন্য হিতেবিপরীত হয়ে দাঁড়ায়গতানুগতিক জ্ঞানচর্চার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সাহসী ও মৌলিক চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পানপরবর্তীতে চিন্তাভাবনা তাবৎ পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানকে বদলে দেয়

তবে বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল ছিল আইনস্টাইন বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি স্কুলে ও এন্ট্রান্স পরীক্ষায় গণিত ও পদার্থবিদ্যায় সব সময়েই উচ্চ নাম্বার পেতেন। কলেজের পর আইনস্টাইনকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। তবে অধ্যাপনার আবেদন করায় তাকে সেখানে নেয়া হয়নি- ঘটনা এমন নয়। তিনি গ্রাজুয়েশনের পর ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ পদে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পাননি।

ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ মূলতঃ গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীর ডক্টরাল গবেষণা চালানোর সময় জীবিকা নির্বাহের আর্থিক উৎস হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাজুয়েট শিক্ষার ক্ষেত্রে যাকে বলা হয় গবেষণা সহযোগী বা রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট।

এমন না আইনস্টাইনের প্রতিভা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। বরং আইনস্টাইন ‘অসামান্য প্রতিভার ছাপ’ রাখার মতো কোনো কাজই তখনো করেননি, তার কর্মজীবনের মাত্র শুরু তখন। গ্রাজুয়েশনের পর কৈশিক প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি যে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন সেটাও ছিল মাঝামাঝি মানের। বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী হিসেবে কাজ না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল একজন অধ্যাপকের নেতিবাচক সুপারিশ; যিনি আবার আইনস্টাইনকে পছন্দ করতেন না।

এই গল্পে যে কথা অনুপস্থিত তা হলো প্যাটেন্ট অফিসের ক্লার্ক থাকা অবস্থাতেও আইনস্টাইন তার ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার একজন উপদেষ্টাও ছিলেন। ডক্টরাল-উপদেষ্টার সাথে আইনস্টাইন নিয়মিত একটি পাঠচক্রে দেখা করতেন, লেখালেখিও করতেন একে অপরকে (ছবি দ্রষ্টব্য)।

যে বছর আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন (১৯০৫), এই বছরেও তিনি অভিসন্দর্ভ জমা দেন এবং PhD ডিগ্রী পেয়ে যান। এর পরেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য সুযোগ পেয়ে যান ও তার একাডেমিক কর্মজীবন শুরু হয়।

অন্যভাবে বলা যায়, আইনস্টাইনকে পিএইচডি গবেষণা চালানোর পাশাপাশি একটা চাকরী করতে হতো জীবিকা নির্বাহের জন্য। পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি চাকরী করা খুবই ঝামেলার একটা ব্যাপার এবং গবেষকের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তবুও আইনস্টাইনের স্নাতক পড়াশুনা থেকে শুরু করে অধ্যাপনার কাজে নিয়োগ হওয়ার সময়টা মোটামুটি রীতিমাফিক পথ ও প্রতিষ্ঠিত সময়সীমা ধরেই চলেছে।

এই গল্প বলার পেছনে কারণ হলো এখান থেকে আমাদের একটা (বদ)অভ্যাস ধরা পড়ে, আমরা উদ্ভাবক-আবিষ্কারকদের আগন্তুক হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। আগন্তুক, কারণ তারা প্রথাকেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানের বাঁধন ছিড়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন, পৃথিবীকে বদলে দেন। আগন্তুক, কারণ তারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙেন, অনেকটা হঠাৎ করেই নতুন কিছু তৈরি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বৈপ্লবিক আবিষ্কার বা ভিন্ন ধর্মী কাজ করতে হলে এর আগে রীতিমাফিক প্রশিক্ষণ বা তালিমের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে আসতে হয়।

আইনস্টাইন মেধাবী ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ গ্রাজুয়েট শিক্ষা সম্পূর্ণ করার আগ পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট পদার্থবিজ্ঞান জানতেন না; পদার্থবিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নেয়া ছিল আরো পরের ব্যাপার। অন্যান্য আবিষ্কারকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্টিভ জবস প্রথমে অ্যাপল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন, দশ বছর অন্যান্য ব্যবসা করে আবার অ্যাপলে ফিরেন।

দ্বিতীয়বার অ্যাপলে ফিরে আসা ছিল তার ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়ার ঘটনা- এর পর থেকে তিনি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠতে থাকেন। কারণ মাঝখানের দশ বছর তিনি কঠিন সময় পার করেছেন ব্যবসা বিষয়ে ওস্তাদ হতে, দরকারি বিভিন্ন দক্ষতা শানিয়ে নিতে। এ দীর্ঘ সময় রূঢ় বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে তৈরি করার পরেই কেবল অ্যাপল-২ তে তার মেধা প্রযুক্তির বাজার বদলে দেয়ার একটি ক্ষেত্র পায়।

আইনস্টাইন প্রথমেই বিপ্লবী বিজ্ঞানী হিসেবে আবির্ভূত হননি। তাকে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়েছে, স্নাতকের পর পিএইচডি করতে হয়েছে প্রচলিত রীতি অনুসারেই। যে কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে এটা তিক্ত সত্য। আমরা যদি অন্যান্যদের পৃথিবী বদলানোর জন্য উৎসাহিত করতে চাই, প্রথমে তাদেরকে ভেতর থেকে ভিত শক্ত করার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচাইতে কৌশলের জায়গা হলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা, রীতি বা ঐতিহ্যমতো প্রশিক্ষণ বা তালিম নিয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নিজের মধ্যে ভিন্নভাবে ভাবার স্ফুলিঙ্গ বাঁচিয়ে রাখা। নতুন কিছু করা, নতুনভাবে চারপাশকে দেখার ইচ্ছেটা একটি দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখা, যতক্ষণ না সেই ভিন ধারার কাজটি করার জন্য ‘যথেষ্ট-ভালো’ একটি পর্যায়ে যাওয়া না যায়। কবীর সুমনের গানের কলি মনে পড়ে-

বন্ধু তোমার ভালোবাসার স্বপ্নটাকে রেখো,/ বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে জাপটে ধরে থেকো,

দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না,/ পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনো গেলো না,

…হাল ছেড়ো না…

featured image: nytimes.com 

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- ছোট যদি হতে চাও, বড় হও আগে

আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা ইতোমধ্যেই টুক টাক জানতে শুরু করে দিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যেই কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধে কিছুটা জানি, আর এবার জানবো দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন সম্বন্ধে।

প্রথমেই আমরা জেনে নেই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি অনুসারে যদি কোন বস্তু তোমার সাপেক্ষে স্থির অবস্থায় থাকে তখন তার দৈর্ঘ্য মাপলে তুমি যে মান পাবে যদি, বস্তুটি তোমার সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল হয় তবে তার দৈর্ঘ্য মাপতে গেলে দেখবে যে বস্তুটির দৈর্ঘ্য কমে গেছে। বস্তুটি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাক বা, কাছেই আসতে থাকুক না কেন সবসময়ই দেখবে যে বস্তুটি বড় থেকে সমবেগে গতিশীল হওয়ার পরপরই ছোট হয়ে গেছে। আমরা আগেও দেখেছি ইথার ধারণাকে বাঁচানোর জন্য ফিটজগোরাল্ড প্রথম এই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। আর লরেন্টজ সেই সঙ্কোচনের পরিমাণটিকে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন।

length_cont2

আমরা কাল দীর্ঘায়নের বাস্তব উদাহরণে দেখেছি যে, বায়ুমন্ডলে মহাজাগতিক রশ্মির সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট হওয়া মিউওন মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড টিকে থাকে। সেই মিউওনগুলোর বেগ অনেক বেশি হয়ে থাকে, প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি। কিন্তু এত বেগ নিয়েও ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের যাওয়ার কথা মাত্র ৬৬০ মিটারের মত। কিন্তু এরপরও মিউওন কিন্তু অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসে। এর কারণ হল মিউওনের বয়স মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও আমাদের কাছে তা কাল দীর্ঘায়নের ফলে আমাদের কাছে ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড। এই বেগে মিউওন অতিক্রম করবে প্রায় ১৯ কি.মি. পথ। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে চলে আসার জন্য যথেষ্ট দূরত্ব।

Image result

কিন্তু কাল দীর্ঘায়নের হিসেব মতে মিউওন নিজে কিন্তু তার সময় ঠিকই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড দেখবে। এ সময়ে যদি সে ১৯ কি.মি. দূরত্ব অতিক্রম করে তবে তার বেগ আলোর বেগের প্রায় ২৯ গুন হতে হবে। কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে তো কিছু যেতে পারে না। তাহলে এই ১৯ কি.মি. দূরত্ব মিউওন অতিক্রম করল কিভাবে? একটা অসাধারণ প্যারাডক্স বা, ধাঁধা তৈরি হয়ে গেল দেখা যাচ্ছে। তাহলে এখন চলো এই প্যারাডক্সটির সমাধান করে ফেলা যাক।

পৃথিবী থেকে আমরা দেখব মিউওনের আসতে সময় লেগেছে t=৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড(কাল দীর্ঘায়নের ফলে)। বায়ুমন্ডল থেকে পৃথিবী পৃষ্ঠের দূরত্ব কিন্তু বিজ্ঞানীরা মেপে রেখেছেন। যদি ধরে নেই মিউওন কোনভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠে এসেই রুপান্তরিত হয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে পারি এ দূরত্ব হল  =১৯ কি.মি.।

তাহলে মিউওনের বেগ v হলে বেগ=দূরত্ব/সময় অনুসারে আমরা লেখতে পারি,

v= /t ………………………………………………(1)

আবার মিউওন দেখবে পৃথিবীটাই মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের কাছে চলে গেছে। তাহলে মিউওন তার সময় মাপবে,
মাইক্রোসেকেন্ড। এই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে মিউওনের মনে হবে পৃথিবীটা v বেগে (পৃথিবীর কাছে মিউওনের বেগ

যত, মিউওনের কাছেও পৃথিবীর বেগ তত! আপেক্ষিকতা!) তার কাছে চলে গেছে। এ সময় পৃথিবী অতিক্রম করেছে L দূরত্ব। তাহলে,

v=L/vbn(2)

আমরা লক্ষ্য করি যে, দুবার আমরা দৈর্ঘ্যের জন্য দুইরকম সঙ্কেত ব্যবহার করেছি। একবার  আরেকবার L. কারণ আমরা আগেই দেখেছি রিলেটিভিটির হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সময়ই আপেক্ষিক হয়ে যায়। তাই দৈর্ঘ্যও আপেক্ষিক হতে পারে এই সন্দেহ থেকেই এই কাজটি করা। দৈর্ঘ্য যদি আপেক্ষিক না হয় তাহলে একটু পরেই আমরা হয়ত দেখব যে,  ।

তাহলে এখন, (1) এবং (২) নং সমীকরণ থেকে পাই,

                                                                                                                 ……………………………………………..….(3)

আমরা কাল দীর্ঘায়নের সূত্র থেকে জানি,

                                                                                                                   ..…………………………………….………..(4)

 

(3) এবং (4) নং সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়,

বা,

বা,

এটিই দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র।  হল স্থির অবস্থায় মাপা কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, আর L হল সেই কোন কিছুর গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্য। কোন কিছুই আলোর বেগে চলতে পারেনা। তাই এই সমীকরণের  এর মান সর্বদাই ১ এর চেয়ে বেশি হবে (লব ছোট আর হর বড় হওয়ার কারণে)। আবার  এর মানও ১ এর চেয়ে ছোট কিন্তু ধনাত্মক একটি দশমিক সংখ্যা হবে। স্থির অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যকে এই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করলে আমরা যে গুনফল পাব সেটিই হবে গতিশীল অবস্থায় মাপা দৈর্ঘ্যের সমান।  সবসময় ১ এর চেয়ে ছোট বলে এই গুনফলও সর্বদাই  এর চেয়ে কম হবে। তাই গতিশীল অবস্থায় আমাদের কাছে মনে হবে সবকিছুই তার দৈর্ঘ্যের দিক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। মিউওনের কাছেও পৃথিবীর দূরত্ব সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়াই সে ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডেই পৃথিবীতে এসে পৌঁছে গেছে বা, পৃথিবী তার কাছে পৌঁছে গেছে। সুতরাং দৈর্ঘ্য সঙ্কুচিত করে ফেললেই কিন্তু মিউওনের প্যারাডক্সটি সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে যায়।

 এই সূত্রটিই হল দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র। এর আগেও ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টজ যে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের সূত্র দিয়েছিলেন সেই সূত্র আর এটি কিন্তু হুবুহু এক। শুধু পার্থক্য হল তারা পদার্থের নিজেদের সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন আর আইনস্টাইন তার স্পেশাল রিলেটিভিটিতে স্পেস বা, স্থানের নিজেরই সঙ্কোচনের কথা বললেন।

Image result

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন দেখতে পাইনা। এর কারণ হল, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু এর প্রভাবটা আমাদের চোখে পরে। তখন এ সঙ্কোচনের মান অনেক বেশি হয়ে যায়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বেগ দেখি তা আলোর বেগের তুলনায় এতই কম যে এর ফলে দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন ঘটলেও তা আমাদের সূক্ষাতিসূক্ষ যন্ত্র দিয়েও আমরা তা ধরতে পারবো না। তাই আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিষয়টি আসলে বুঝতেও পারবো না। আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলেই শুধু বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব। যদি কোন কিছু আলোর ৮৭% গতিতে চলত তাহলে আমরা দেখতাম স্থির অবস্থার চেয়ে তার দৈর্ঘ্য একদম অর্ধেক হয়ে গেছে!! আর যদি তা আলোর গতিতে চলতে পারতো তবে তা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখতাম! কিন্তু কোন কিছু একদম শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া তো আর সম্ভব নয়। আর এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, কোন কিছুই আসলে আলোর বেগে চলতে পারে না।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব

গ্যালিলিও ছিলেন আপেক্ষিকতার জনক। আগের লেখায় আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি সম্বন্ধে জেনেছি। তার এ তত্ত্বের আরো একটি স্বীকার্য রয়েছে। গ্যালিলিও তার দ্বিতীয় স্বীকার্যে সময়কে পরম হিসেবে ধরে নিলেন। অর্থাৎ, সকাল বেলা যদি আপনি এবং আপনার এক বন্ধু একদম ঠিক ঠিক দুজনের ঘড়ি একই সময়ে মিলিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দুদিকে নিজেদের কাজের জন্য চলে যান, তবে রাতে ফিরে এসে আপনারা দুজন আবার একে অপরের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিলে দেখবেন দুজনের ঘড়ি এখনও একই সময় দেখাচ্ছে। বিষয়টা এতই অবশ্যম্ভাবী এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িত যে গ্যালিলিওর এ ২য় স্বীকার্য সম্বন্ধে মনে হয় কারো কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাই এ স্বীকার্যটি নিয়ে আর বেশি কিছু বলার মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমরা গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতাটাকে এখন বুঝতে চেষ্টা করি।

Image result for galileo
আপেক্ষিকতার জনক গ্যালিলিও গ্যালিলি

ধরুন, আপনি একটি ট্রেনে করে ভ্রমণ করছেন। জানালার পাশে আপনার বসার জায়গা। আপনার ট্রেনটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রতি সেকেন্ডে ২০ কি.মি. বেগে ছুটে চলেছে। তাহলে আপনার বেগ হবে ২০ কি.মি. প্রতি সেকেন্ড বা, ২০ কি.মি./সেকেন্ড। এখন বাইরে একজন লোক ঠিক পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার বরাবর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। লোকটির কাছে কিন্তু মনে হবে আপনার ট্রেনের বেগ আসলে,

আপনার ট্রেনের বেগ-লোকটির গাড়ির বেগ= (২০ কি.মি./সেকেন্ড-১০ কি.মি./সেকেন্ড)= ১০ কি.মি./সেকেন্ড।

আবার আপনার কাছে মনে হবে লোকটির গাড়ির বেগ= লোকটির গাড়ির বেগ-আপনার ট্রেনের বেগ= (১০ কি.মি./সেকেন্ড-২০কি.মি./সেকেন্ড)= – ১০ কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, মাইনাস বা, ঋণাত্মক দিকে ১০কি.মি./সেকেন্ড। অর্থাৎ, আপনি দেখবেন লোকটি ১০কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন কিন্তু ঠিকই আপনার ট্রেনকে ২০ কি.মি./সেকেন্ড এবং লোকটির গাড়িকে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুঁটে যেতে দেখবে।

এই বিষয়টিই আপেক্ষিকতা এক একজন দর্শকের সাপেক্ষে একই ট্রেন বা, গাড়ির বেগ একেক রকম মনে হওয়া। এখন লোকটি যদি গাড়িটি ট্রেনের সমান বেগে অর্থাৎ। ২০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যেত তাহলে কি হত? আপনি লোকটিকে সব সময় আপনার পাশে দেখতেন। আপনার কাছে মনে হত লোকটি যেনো স্থির। অর্থাৎ, লোকটির বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আবার লোকটিও দেখত আপনার ট্রেনটি তার গাড়িকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে না। আপনিও সবসময় তার পাশেই ট্রনে স্থির হয়র বসে আছেন। গাড়ির লোকটির কাছে মনে হত আপনি আসলে স্থির। আপনার বেগ ০ কি.মি./সেকেন্ড। আমি আশা করছি এই লেখাটির পাঠকরা অবশ্যই আপেক্ষিকতার এই মূল বিষয়গুলো সম্বন্ধে আগে থেকেই কিছুটা জ্ঞান রাখেন বা, লেখাটি পড়ার পর বিষয়টা মোটামুটিভাবে বুঝে গেছেন। তাই এ বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কথা না বাড়িয়ে আমরা স্পেশাল রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার দিকে অগ্রসর হতে থাকি।

বিজ্ঞানীরা এক সময় আলোর বেগ অসীম নাকি এর কোন নির্দিষ্ট বেগ আছে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একেক মুনীর একেক মত ছিল তখন। তবে বিজ্ঞানী রোমার প্রথম প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে আলোর বেগ আসলে সসীম, কোনভাবেই অসীম নয়। তিনি আলোর বেগ মেপেছিলেন ১ লক্ষ ৯০ হাজার কি.মি./সেকেন্ড। পরবর্তিতে ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে আলো আসলে এক ধরনের তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। শব্দও কিন্তু এক রকমের তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা তাদের আশে পাশের পর্যবেক্ষণ থেকে জানতেন কোন তরঙ্গই মাধ্যম ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে না। আলোর ক্ষেত্রেও কি কথাটি সত্য? আলো কিভাবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে? সূর্য থেকে পৃথিবীর মাঝে কি কোন মাধ্যম রয়েছে? এ বিষয়ে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলি।

File:Ole Rømer (Coning painting).jpg
ওলে রোমার, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন আলোর বেগ অসীম নয়।

আলোর চলাচলের জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন আছে কিনা তা বোঝার জন্য পরীক্ষাটি করেছিলেন বিজ্ঞানী ভন গুইরিকে। তিনি একটি কাঁচের জার নিলেন। এ কাঁচের জারের মাঝে একটি ঘন্টা ছিল যা অনবরত শব্দ করছিল। এবার জারটি থেকে সব বাতাস একদম বের করে নেয়া হল। জারের মধ্যে শুধু থাকল ফাঁকা স্থান। ফলে যারা এ পরীক্ষাটি দেখতে এসেছিল সেই দর্শকরা আর কোন ঘন্টা বাজার শব্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি তখনও ঘন্টার সাথে ধাক্কা খেয়েই চলেছে।

Image result for ringing bell vacuum
জারের মাঝে রিঙ্গিং বেল

প্রমাণ হয়ে গেল যে শূন্য মাধ্যমে শব্দ চলাচল করতে না পারলেও আলো চলাচল করতে পারে। তা না হলে আমরা ঘন্টাটিতে ঘন্টা বাজানোর দন্ডটি ধাক্কা খেতে দেখতাম না বরং ঘন্টাটিও শব্দের সাথে অদৃশ্য হয়ে যেত এবং জারটি সম্পূর্ণ কালো হয়ে যেত। সুতরাং শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা মানতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তি কোন লেখায় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।