E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।