সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীতে যেভাবে আলো আসে

নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার নাম শুনে থাকবো নিশ্চয়। সূর্যের কেন্দ্রে অবিরাম সংঘটিত হচ্ছে এই বিক্রিয়া। উৎপন্ন করছে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রা এবং বিপুল শক্তি। মানুষের বেঁচে থাকতে হলে যেমন হার্টের কার্যকারিতা প্রয়োজন, তেমনি সূর্যের তেজ বা জীবন এই ফিউশন বিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।

সূর্য গাঠনিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন: কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিকিরণ অঞ্চল, পরিচলন অঞ্চল ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সূর্যের জ্বালানী ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাকি অঞ্চলগুলো কেন্দ্রে উৎপন্ন ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রাকে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

সূর্যের কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত বিলিয়ন বিলিয়ন পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে চলছে। প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে ৫৬০ মিলিয়ন টন হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে। আর বাকি চার মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে উল্লেখিত শক্তি তৈরি হচ্ছে। ফিউশন বিক্রিয়ায় সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন এই শক্তি সূর্যের বহিরাংশের দিকে ফোটন তথা তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ হিসেবে আলোক কণা সৌর পৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ১৫ গুন বেশি। আবার সূর্যের বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর মোট ব্যাসার্ধ ৬,৯৫,৭০০ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের ১০৯ গুন। সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। যদিও সূর্যের কেন্দ্র থেকে বাইরের অঞ্চলের দিকে ঘনত্ব পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়,তবুও কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে অনেক সময় লাগে। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, বিকিরণ অঞ্চলকে পাড়ি দিতে একটি গামা রশ্মির তথা ফোটন কণার গড়ে ১,৭১,০০০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ বছর সময় লাগে এবং সৌর পৃষ্ঠ হতে পৃথিবীতে আসতে লাগে মাত্র সোয়া আট মিনিট।

সুতরাং চিন্তা করতেও অবাক লাগে, আমরা পৃথিবীতে বসে আজকে যে আলো পাচ্ছি তা কত লক্ষ বছর পূর্বে সূর্যের কেন্দ্রের ফিউশন বিক্রিয়ার ফল? একারণেই বলতে হয়, আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকালে শুধু অতীতকেই দেখতে পাই। আমরা আজ আলোচনা করব কীভাবে তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ এই বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ছে।

সূর্যের কেন্দ্রকে ঘিরে রাখা প্লাজমার ( ইলেকট্রন ও আয়নের মিশ্রণ) ঘনত্ব অনেক বেশি। তাইতো ফিউশন বিক্রিয়ায় নির্গত গামা রশ্মি( ফোটনের সর্বনিম্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য) খুব কম দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার পূর্বে ইলেকট্রন দ্বারা শুষিত হয়। এই ইলেকট্রন সমূহ শোষিত ফোটনকে সকল দিকে পুনরায় নির্গমন করে, কিন্তু এই ঘটনায় কিছু পরিমান শক্তি খোয়া যায়। পরবর্তীতে এই ফোটন সমূহ বিকিরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে।

বিকিরণ অঞ্চল সূর্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জন্য অন্তরকের আবরণ হিসেবে কাজ করে, যাতে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপ ধরে রেখে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়। এই অঞ্চল পাড়ি দিতে একটি ফোটন অসংখ্য বার ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত ও নির্গত হয়, ফলে নেট শক্তি প্রবাহের গতি ধীর হয়ে যায় এবং শক্তির পরিমান কমে যায়। ফলে গামা রশ্মি থেকে এক্সরে তে পরিণত হয়।

চিত্র : সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সমূহ

কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোক শক্তি তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ তথা ফোটন ( প্রধানত এক্সরে) হিসেবে বিকিরণ, তাপীয় পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিকিরণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ অঞ্চলের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা কেন্দ্র থেকে কম কিন্তু পরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি।

কেন্দ্রে উৎপন্ন এক্সরে বাবল তৈরি করে কম তাপমাত্রা, ঘনত্ব, চাপের পথ অনুসরণ করেন সূর্য পৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয়। হাইড্রোজেন, হিলয়াম, অসম্পৃক্ত ইলেকট্রন দ্বারা বিকিরণ অঞ্চল পূর্ণ থাকে। এ অঞ্চলের গভীরে, এক্সরে বিভিন্ন কনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বারবার সংঘর্ষের ফলে এক্সরের দিক বারবার পরিবর্তন হয়। দুটি ধাক্কার মধ্যে এক্স রে মাত্র কয়েক মিলিমিটার পথ অতিক্রম করে।

এভাবে ধাক্কার পর ধাক্কা খেয়ে এক্সরে সৌর পৃষ্ঠের দিকে গমন করে। তাই ফোটন তথা এক্সরের এই অঞ্চল পাড়ি দিতে ১৭১,০০০ থেকে ১ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। ধাক্কার দরুন এক্সরের শক্তি প্লাজমা অনু কর্তৃক শোষিত হওয়ায় এক্সরে এর শক্তি কমে যায় কিন্তু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে এবং পৃষ্ঠে এসে দৃশ্যমান আলোয় পরিনত হয়। একই সাথে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন থেকে ১.৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিনে হ্রাস পায়।

বিকিরণ অঞ্চলকে বেষ্টন কারী পরবর্তী পরিচলন অঞ্চলের ব্যাসার্ধ সূর্যের মোট ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০% হয়ে থাকে। এটি সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলসমূহের মধ্যে সর্ববহিঃস্থস্তর। এর তাপমাত্রা ও ঘনত্ব বিকিরণ অঞ্চল থেকে কম।

প্রথমত, এ আবরণের নিন্ম প্রান্তে অবস্থিত গ্যাসীয় অনুসমুহ বিকিরণ অঞ্চল থেকে বিকিরিত তাপ গ্রহণ করে। ফলে অনুসমুহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরা প্রসারিত হয়ে বেলুনের তথা বাবলের মত ফুলে যায়। ফলে এদের ঘনত্ব কমে যায়। তখন তারা পরিচলন অঞ্চলের উপরে অংশে তুলনামূলক কম তাপমাত্রার দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে।

image source: scienceisntscary.wordpress.com

যখন এই উত্তপ্ত গ্যাসীয় অনুসমুহ পরিচলন অঞ্চলের বহির্ভাগে পৌঁছায়, তখন এরা তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়। ফলে তাদের আয়তন কমে গিয়ে ঘনত্ব বেড়ে যায়। এরা আবার পরিচলন অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে আসে এবং পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এর তাপ পরিবহন দৃশ্য অনেকটা পানির স্ফুটন দৃশ্যের মত, যেখানে বাবল ( bubble) তৈরি হয়। বাবল তৈরির এ প্রক্রিয়াকে গ্রানুলেশন বলা হয়। এখানে তাপ স্থানান্তর প্রক্রিয়া এতই দ্রুত যে, এক গুচ্ছ ফোটনের এ অঞ্চল পাড়ি দিতে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময় লাগে।

চিত্র : সূর্যের পরিচলন অঞ্চল দিয়ে তাপের পরিবহন

আমরা জানি তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গ হলো গামা রশ্মির।তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট বলে গামা রশ্মির শক্তি অনেক বেশি। সূর্যের কেন্দ্র থেকে এই রশ্মি বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে দৃশ্যমান আলোতে পরিনত হয়।

আমরা সূর্যের দিকে তাকালে সূর্যে আলোক মন্ডল নামক অঞ্চল টি দেখতে পাই, কারণ তা দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করে।গামা রশ্মি বিভিন্ন কনার সাথে ধাক্কা খেয়ে কিংবা ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত হয়ে শক্তি হারিয়ে ফেলে। শক্তি হারানোর ফলে ফোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তাইতো দৃশ্যমান আলো সূর্য থেকে পাওয়া যায়। এভাবেই সূর্য থেকে তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর ক্ষুদ্র বর্ণালী থেকে বহৎ বর্ণালী পাওয়া যায়।

উৎস:

১. http://sciexplorer.blogspot.com/2013/03/the-sun-part-5-how-inner-layers-work.html?m=1

২. http://www.astronoo.com

৩. https://www.universetoday.com/40631/parts-of-the-sun/

৪.http://solar.physics.montana.edu/ypop/Spotlight/SunInfo/Radzone.html

featured image: planetfacts.org

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether
প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংঃ আলোর উপর মহাকর্ষের খেলা

মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জন্ম দিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান। মহাবিশ্ব কী দিয়ে গঠিত, কীভাবে গঠিত হয়েছিল, এর সত্যিকার বয়স কত, এর ভবিষ্যৎ কী, কেনইবা মহাবিশ্ব দেখতে এরকম ইত্যাদি দার্শনিকসুলভ প্রশ্নগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চার ফলেই জন্ম নিয়েছে এবং উত্তর পেয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই ধরনের প্রশ্ন করে আসছে কিন্তু কেবলমাত্র গত শতকে আমাদের শক্তিশালী টেলিস্কোপ, কম্পিউটিং দক্ষতা ও নিরলস গবেষণা এই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য উত্তরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান উপলব্ধি নিচের পাই-চার্টটির মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে।

এই চার্টটি সমগ্র মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ ভর-শক্তিকে প্রকাশ করছে। আইনস্টাইনের ভর-শক্তি উপপাদ্য থেকে জানা যায়, ভর ও শক্তি উভয়ে আসলে একই। এই হিসেবে ভর মূলত কোনো বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তিকেই প্রকাশ করে।

যে সকল নিয়মিত ও স্বাভাবিক বস্তু দিয়ে এই মহাবিশ্ব অর্থাৎ ছায়াপথ, গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, ধূলিকণা, শিলা, গ্যাস ইত্যাদি গঠিত তাদেরকে ব্যারিওনিক পদার্থ বলে। এই ব্যারিওনিক পদার্থ সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র ৪ শতাংশকে প্রকাশ করে। উপরের চার্টটির বাকি দুটো অংশ হলো Dark matter এবং Dark energy। এখন পর্যন্ত জানা তথ্য মতে, সমগ্র মহাবিশ্ব এই তিনটি উপাদানে গঠিত।

জ্যোতির্বিদরা যখন লেন্সিং নিয়ে কথা বলেন তখন লেন্সিং বলতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবকে বোঝান। সাধারণ লেন্স যেমন আলোকে বাঁকিয়ে প্রতিসরিত করে এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে সেই আলোকে ফোকাস করে, গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংও অনেকটা তেমনভাবেই কাজ করে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, খুব ভারী কোনো বস্তুর দ্বারা সৃষ্ট শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র এর আশপাশ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। তথাপি অন্য কোনো স্থানে ফোকাস করতে পারে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে এর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত বেশি শক্তিশালী হবে এবং সেই ক্ষেত্র তত বেশি মাত্রায় আলোকে বাঁকাতে পারবে। অনেকটা অপটিক্যাল লেন্সের গঠনের মতো, এর ভেতরে যত ঘন উপাদান ব্যবহার করা হবে এটি তত বেশি আলোর প্রতিসরণ ঘটাতে পারবে।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ছোট থেকে বড় সব মাত্রায়ই হয়। অতি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার থেকে শুরু করে গ্রহের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও আলোকে লেন্সের মতো করে বাঁকাতে পারে। এমনকি আমাদের নিজেদের শরীরের ভরও আমাদের কাছ দিয়ে যাওয়া আলোকে বাঁকাতে পারে। এর মাত্রা খুবই সামান্য। অতি সামান্য বলে আমাদের কাছে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় না।

এখন দেখা যাক গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া কীরূপ হতে পারে। কসমোলজিস্টরা মূলত বড় মাত্রায় সংঘটিত লেন্সিং নিয়ে বেশি আগ্রহী। গ্যালাক্সি কিংবা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং নিয়েই তাদের কাজকারবার।

ডার্ক ম্যাটার দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব আছে এবং ভরও আছে। ডার্ক ম্যাটারের সম্মিলিত ভর সমগ্র মহাবিশ্বের মোট ভরের শতকরা ২১ ভাগ, যা পরিমাণের দিক থেকে অনেক বেশি, যেখানে সাধারণ বস্তুর পরিমাণ ৪%। এ থেকে সহজেই বুঝা যায় যে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি ডার্ক ম্যাটার দ্বারা সৃষ্ট মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝ দিয়ে আসার সময় লেন্সের অনুরূপ বাঁকিয়ে যাবে।

মহাবিশ্বে যেখানে সাধারণ বস্তু পাওয়া যায় সেখানেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। যেমন, একটি বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে অনেক পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার থাকবে। এরা ক্লাস্টারের অভ্যন্তরে ও গ্যালাক্সিগুলোর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করবে। দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি এই ক্লাস্টারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর বিপুল পরিমাণ ভর দ্বারা প্রভাবিত হবে। ফলে সেই আলোর গতিপথ বিকৃত হবে যাকে আমরা বলছি লেন্সিং।

ডার্ক ম্যাটারের ভর সাধারণ বস্তুর থেকে প্রায় ৬ গুন বেশি হবার কারণে আলোর লেন্সিং বেশ ভালোভাবেই হবে। এর ফলে লেন্সিংয়ের প্রতিক্রিয়া একইসাথে শক্তিশালী হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে অদ্ভুতও হবে। যেমন অনেক ক্ষেত্রে লেন্সিংয়ের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি সংকুচিত বা প্রসারিত হয়ে মূল গ্যালাক্সির দৃশ্যমান চেহারাই পরিবর্তন করে দিতে পারে।

এরকম একটি উদাহরণ নিচে দেয়া হলো। এটি Abell 2218 গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, এখানকার গ্যালাক্সিগুলো মূলত উপবৃত্তাকার বা সর্পিলাকার। কিন্তু শক্তিশালী লেন্সিংয়ের কারণে চেহারা এরকম হয়ে গিয়েছে।

চিত্রঃ Abell 2218 ক্লাস্টার; image source: NASA/ESA

এ ধরনের অদ্ভুত আকার বিকৃতির কারণ হলো গ্যালাক্সির বাম পাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি এবং ডানপাশ থেকে আগত আলোকরশ্মি দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে আসে। দুই পাশের দুই আলোকরশ্মি ভিন্ন ভিন্ন ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের দ্বারা পৃথক পৃথকভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে তাদের বেঁকে যাওয়ার প্রকৃতিও হয় ভিন্নরকম। তাই মূল গ্যালাক্সির প্রকৃত চেহারাই পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

লেন্সিংয়ের আরো একটি আকর্ষণীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো একই গ্যালাক্সির একাধিক প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হওয়া। এমনটা হবার কারণ, দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আগত আলোকরশ্মি যা অপসৃত (diverge) হবার কথা ছিল তা লেন্সিংয়ের প্রভাবে অভিসারী (focus) হয়ে আমাদের কাছে ধরা পড়ে। পৃথিবীতে অবস্থানকারী কোনো পর্যবেক্ষকের কাছে তখন মনে হবে, দুটি একই রকমের সোজা আলোকরশ্মি মহাকাশের দুটি ভিন্ন অংশ থেকে আসছে। লেন্সিংয়ের এরকম প্রভাবে অনেক সময় মহাকাশে একই গ্যালাক্সির একাধিক বিম্ব দেখতে পাওয়া যায়।

লেন্সিং অনেক সময় বিবর্ধক হিসেবেও কাজ করতে পরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অতি দূর গ্যালাক্সির ক্ষীণ আলো লেন্সিংয়ের কারণে বিবর্ধিত হয়ে আমাদের টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। লেন্সিং না থাকলে হয়তো সেই গ্যালাক্সিগুলোর অস্তিত্ব খুঁজেই পাওয়া যেতো না।

দুর্বল লেন্সিং (weak lensing)

লেন্সিং প্রভাব যদি খুব শক্তিশালী হয় যা খুব সহজেই কোনো এস্ট্রোনমিক্যাল ইমেজে শনাক্ত করা যায় তাহলে ঐ ধরনের প্রভাবকে বলা হয় দৃঢ় বা শক্তিশালী লেন্সিং। এই ধরনের লেন্সিংয়ের প্রভাব শনাক্ত ও পরিমাপ করা সহজ। কিন্তু এরকম বড় মাপের লেন্সিং ইফেক্ট তৈরি করতে সক্ষম বিশাল ভরের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সংখ্যা মহাকাশে খুব একটা বেশি পরিমাণে নেই। তাই মহাকশে একই গ্যালাক্সির ধনুকের মতো প্রসারিত ছবি অথবা একাধিক প্রতিচিত্রের মতো ঘটনা অহরহ দেখতে পাই না। অন্য কথায় বলতে গেলে মহাকশে শক্তিশালী লেন্সিং এর ঘটনা কিছুটা দুর্লভ।

কিন্তু তারপরও যেকোনো গ্যালাক্সি এবং আমদের দৃষ্টিপথের মাঝে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি রয়েছে। কম হোক বা বেশি হোক আছে। মাত্রা যতই সামান্য বা ক্ষীণ হোক না কেন, যত ধরনের গ্যালাক্সি দেখতে পাই তার সবগুলোই লেন্সিং দ্বারা প্রভাবিত। গাণিতিকভাবে বলতে গেলে প্রায় সব গ্যালাক্সির আকৃতিই লেন্সিংয়ের কারণে মোটামুটি শতকরা ১ ভাগ বিকৃত হয়। এই ধরনের ক্ষীণ লেন্সিং এর ঘটনাকে বলা হয় দুর্বল লেন্সিং।

দুর্বল লেন্সিংয়ের কারণে সৃষ্ট ক্ষুদ্র বিকৃতি খালি চোখের সাহায্যে ধরা যায় না। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বিজ্ঞানীরা এই ধরনের লেন্সিং করেন। দুর্বল লেন্সিং ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি এবং এদের আচরণ ও ভূমিকা অনুধাবন করতে সাহায্য করছে।

লেন্সিং কেন দরকারি

লেন্সিং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকশে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি, পরিমাণ, বিন্যাস ও প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দেয়। আলোর বাঁক নেয়া নির্ভর করে এর যাত্রাপথে বিদ্যমান মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের তীব্রতার উপর। পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্রটি খেয়াল করুন। এটি বুলেট ক্লাস্টার (Bullet Cluster) নামে পরিচিত। এই ক্লাস্টারটিকে দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গ এবং এক্স-রে তরঙ্গ এই দুই মাধ্যমেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এটি থেকে আগত আলোর একটা বড় অংশ আসে উত্তপ্ত এক্স-রে বিকিরণকারী গ্যাস থেকে। ছবিতে দেখানো মাঝের ধোঁয়া সদৃশ অংশটুকু হলো দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশ। মূলত এই ছবিটি এক্স রে এবং দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে দেখা অংশগুলার একটা ওভারলে বা কম্পোজিট চিত্র।

চিত্রঃ বুলেট ক্লাস্টারের কম্পোজিট চিত্র; image source: NASA/STScI

ছবির মেঘের পরিধির কিছু অংশ ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতিকে নির্দেশ করছে। দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা ছবিতে লেন্সিং সিগন্যাল হিসেব করে এই অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে।

ছবির এক্স রে বিকিরণকারী গ্যাস উৎস এবং পরিধির ডার্ক ম্যাটার অঞ্চলের পার্থক্য (offset) প্রকৃতপক্ষে দুটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের মধ্যকার সংঘটিত সংঘর্ষের পরবর্তী অবস্থাকে নির্দেশ করছে। এই সংঘর্ষের সময়, ব্যারিওনিক কণিকাগুলো (সাধারণ বস্তু) একে অপরের সাথে মহাকর্ষ ও স্থির তড়িৎ বল উভয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে এবং ধীর গতির করছে।

কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের কণিকাগুলো একে অপরের সাথে কেবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়েই মিথস্ক্রিয়া করেছে। তাদের এই মিথষ্ক্রিয়ায় স্থির তড়িৎ বলের ক্ষেত্র কোনো প্রভাব বা ভূমিকা রাখেনি। তাই এই সংঘর্ষে এক্স-রে গ্যাস কণিকাগুলো ডার্ক ম্যাটারের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে এবং ছবিতে এই পার্থক্যের সৃষ্টি করেছে। দৃশ্যমান বস্তুর প্রায় পুরোটাই মোটামুটিভাবে ছবির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কিন্তু লেন্সিং ইফেক্ট থেকে আমরা বলতে পারি এই ক্লাস্টারের ভরের বেশিরভাগ অংশই আরো বড় অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা ডার্ক ম্যাটারের প্রভাবগুলোর সবগুলোই মহাকর্ষ সম্পর্কিত। তাই অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা ডার্ক ম্যাটার বা মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বা ধারণা এখনো সম্পূর্ণ নয়। হয়তোবা এমন হতে পারে যে ডার্ক ম্যাটার কোনো নতুন ধরনের বস্তু নয়, বরং মহাকর্ষ সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণায় কোনো ত্রুটি রয়েছে, যার কারণে আমরা ডার্ক ম্যাটারকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি না।

ফলাফলস্বরূপ ডার্ক ম্যাটারের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য মহাকর্ষ তত্ত্বের অনেকগুলো পরিবর্তিত সংস্করণ প্রকাশ পেয়েছে। বুলেট ক্লাস্টারের ছবিটি ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির একটি শক্ত প্রমাণ।

ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব থাকলে আলো এবং ভরের আচরণ যেমন হতো বলে বিজ্ঞানীরা আশা করেছেন, ছবির এই অফসেটটি ঠিক তাই প্রকাশ করে। ডার্ক ম্যাটারের এই অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ থাকলেও বর্তমান মহাকর্ষ তত্ত্ব বা এর বিভিন্ন পরিবর্তিত বা পরিমার্জিত সংস্করণ দিয়েও এর উপস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেন্সিং ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি সম্পর্কেও অনেক ধারণা দেয়। ডার্ক এনার্জির উপস্থিতি গ্যালাক্সি এবং ক্লাস্টারের সৃষ্টি, গঠন এবং সম্প্রসারণে প্রভাব ফেলে। মহাকাশে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের সাহায্যে নির্ণয় করা তাদের দূরত্ব এবং বণ্টন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিখুঁতভাবে ডার্ক এনার্জির পরিমাণ নির্ণয় করেছেন।

দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসন্ন আলো আমাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে। এই আলো আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে আদি মহাবিশ্বের স্বরূপ। বিভিন্ন দূরত্বে গ্যালাক্সির গঠন ও অবস্থানগত পার্থক্য থেকে মহাবিশ্বে ডার্ক এনার্জির পরিমাণের পরিবর্তন (হ্রাস-বৃদ্ধি বা অপরিবর্তনশীলতা) সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং তাই ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জিসহ মহাবিশ্বের প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আইনস্টাইন সর্বপ্রথম তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের জন্য আলোর পথ বিচ্চুতির সম্ভাব্যতার কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে ইংরেজ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন (১৮৮২ – ১৯৪৪) পরীক্ষার সাহায্যে এর সত্যতা নিরূপণ করেন (আগ্রহী পাঠকরা চাইলে বিস্তারিত জানবার জন্য ২০০৮ সালে BBC নির্মিত Einstein and Eddington টেলিভিশন চলচ্চিত্রটি দেখতে পারেন)।

কিন্তু আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রস্তাবনার আগেই আলোর পথ বিচ্চুতি নিয়ে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন, যেখানে প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সম্পর্কিত বিষয়াদির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দূরবর্তী আলোক উৎস থেকে আগত আলোকরশ্মি তার যাত্রাপথে কোনো ভারী বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হলে তখন সেই আলোক রশ্মি দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষকের নিকট পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী চিত্রে যেমনটা দেখানো হয়েছে- দূরবর্তী উৎস S থেকে আগত আলো এর যাত্রা পথে M বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দুটি ভিন্ন পথে পর্যবেক্ষক O এর নিকট পৌঁছায়। ফলে পর্যবেক্ষক O একই বস্তু S এর দুটি ভিন্ন ছবি দেখতে পায়।

গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনার কথা আইনস্টাইন প্রথম তার নোটবুকে উল্লেখ করেন ১৯১২ সালে। সে সময় তিনি বার্লিনে জ্যোতির্বিদ আরভিন ফ্রেনড্লিক (Erwin Freundlich, ১৮৮৫ – ১৯৬৪) এর সাথে এই ধারণার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে বেশ আলোচনা করেন। আইনস্টাইন তার নোটবুকে লেন্সিং নিয়ে কিছু প্রাথমিক ধারণা এবং ফর্মুলা প্রকাশ করেন। তার নোটবুকের লেখার একটি ছবি নিচে দেয়া হলো।

চিত্রঃ আইনস্টাইনের নোটবুকে তার হাতের লেখা।

তবে আইনস্টাইন নিজেই এরকম লেন্সিং ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্যতা নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। কারণ লেন্সিং ইফেক্ট নির্ভর করে আলোক উৎস, মহাকর্ষ ক্ষেত্র তৈরিকারী বস্তুর ভরের তীব্রতা এবং এদের সাথে পর্যবেক্ষকের দূরত্বের উপর। তাই এরকম একটি ঘটনা অর্থাৎ একই বস্তুর দুটি প্রতিচ্ছবির দেখা পাবার সম্ভাবনা নিয়ে আশা করাটা ছিল বেশ কঠিন।

পরবর্তীতে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্বের উন্মোচন হতে থাকে বিজ্ঞানী মহলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোতে। আইনস্টাইন নিজেও ১৫-ই ডিসেম্বর ১৯১৫ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, তার বন্ধু হাইনরিখ জাঙগার (Heinrich Zangger, ১৮৭৪-১৯৫৭) এর নিকট এ বিষয়ের বিস্তারিত নিয়ে একটি চিঠি লিখেন।

চিঠিটি পরবর্তীকালে অলিভার লজ (Oliver Lodge, ১৮৫১-১৯৪০) সম্পাদনা করে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশ করেন। এছাড়াও এডিংটন তার ১৯২০ সালে প্রকাশিত Space, Time and Gravitation গ্রন্থে এবং স্বনামধন্য জার্নাল Astronomische Nachrichten-এ গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের উপর বিস্তারিত আলোচনা করেন। যদিও সে সময় সব বিজ্ঞানীরাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন যে ভূমিতে বসে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাব প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে ১৯৩৬ সালে আইনস্টাইনের আমেরিকার প্রিন্সটনে বসবাসকালীন সময়ে একজন চেক ইঞ্জিনিয়ার, রুডি ম্যান্ডল (Rudi W. Mandl) তার সাথে দেখা করেন এবং গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর উপর বাস্তব পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি ধারণা করেন শক্তিশালী নক্ষত্রের আলোর দ্বারা সৃষ্ট লেন্সিং ক্রিয়া হয়তোবা পৃথিবীতে জৈববৈজ্ঞানিক বিবর্তন এবং জেনেটিক মিউটেশনের সূচনা করেছিল।

কিন্তু ততদিনে আইনস্টাইন নিজেই তার লেন্সিং নিয়ে গবেষণা কাজকারবার বেমালুম ভুলে বসছিলেন এবং অন্যদের গবেষণা সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। পরে ম্যান্ডেলের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আইনস্টাইন আবারো ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু ফর্মুলা প্রকাশ করেন।

চিত্রঃ সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত আইনস্টাইনের গবেষণা প্রবন্ধ।

পেপারটি প্রকাশের পর আরো অনেক জ্যোতির্বিদ এর উপর আরও বিস্তারিতভাবে কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেন। ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ Fritz Zwicky প্রস্তাব করেন, নক্ষত্রের তুলনায় দূরবর্তী নেবুলা এবং গ্যালাক্সির লেন্সিং ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করা বেশি সহজ হবে। কারণ বড় গ্যালাক্সির আকার, ভর, দূরত্ব সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আরো বেশি করে লেন্সিং ক্রিয়া ঘটাবে, যেটা কেবল নক্ষত্রের বেলায় ঘটার সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ।

গত শতকের ষাটের দশকে কোয়াসারের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের নতুন করে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের পর্যবেক্ষণমূলক পরীক্ষায় আগ্রহী করে তুলে। ততদিনে লেন্সিং সংক্রান্ত গবেষণা এবং হিসাব নিকাশগুলো আরো অনেক জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তাত্ত্বিকভাবে বিন্দু উৎস থেকে নির্গত আলোকরশ্মি সুষম সর্পিলাকার লেন্স ভরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলে এর গণনা অনেক সহজ হয়।

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আলোক উৎস এবং লেন্স ভর কোনোটাই সুষম নয় বরং আকারে বিশাল এবং আকৃতিতে অনিয়মিত। এবং একটি বস্তুর একাধিক বিছিন্ন আকৃতির প্রতিচিত্র সৃষ্টিও অসম্ভব নয়। আইনস্টাইনের মূল তত্ত্ব অনুসারে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা এবং নিরীক্ষা বেশ কঠিন ব্যাপার। তাই এধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সাধারণ আপেক্ষিকতার আরো কিছু জটিল মডেল তৈরি করা হয়।

সর্বপ্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স খুঁজে বের করেন Dennis Walsh, Robert F. Carswell এবং Ray J. Weymann ১৯৭৯ সালে। রেডিও তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে তারা Quasar Q0957+561 এর দুটি ভিন্ন প্রতিচিত্র খুঁজে বের করেন যা লেন্সিংয়ের একটি উৎকৃষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। পাশের চিত্রে এর একটি false color image দেয়া হলো।

চিত্রঃ Quasar Q0957+561

পাশে কোয়াসার QSO 2237+0305 এর একটি ছবি দেয়া হলো। এই লেন্সিং সিস্টেমটি আইনস্টাইন ক্রস নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৫ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন ক্রস।

এরকম আরো একটি উদাহরণ হলো MG1131+0456, যা আইনস্টাইন রিং নামে পরিচিত। আবিষ্কার হয় ১৯৮৮ সালে।

চিত্রঃ আইনস্টাইন রিং।

২০০৫ সাল পর্যন্ত অ্যারিজোনা স্পেস অবজারভেটোরি ৬৪ টি নিশ্চিত লেন্সিং সিস্টেম আবিষ্কার করেছে যেগুলার প্রতিটারই একাধিক প্রতিচিত্র রয়েছে। পাশাপাশি আরো ১৮ টি সম্ভাব্য লেন্সিং সিস্টেম এর খোঁজ পেয়েছে।

বর্তমানকালের জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা গবেষণায় লেন্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্সের Liège-এ প্রথম গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং নিয়ে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছরই অনুরূপ বৈজ্ঞানিক সম্মেলন হচ্ছে। লেন্সিং এখন আর কোনো তত্ত্বীয় বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি ব্যবহৃত হচ্ছে মহাবিশ্বতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বাস্তব ও প্রায়োগিক গবেষণায়। এটি এখন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ, কৃষ্ণবস্তু, বিগব্যাং মডেল ইত্যাদি গবেষণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Gravitational_lens
  2. http://www.livescience.com/11064-space-time-distortions-uncover-hidden-galaxies.html
  3. http://w.astro.berkeley.edu/~jcohn/lens.html
  4. http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/galaxies/lensing.html
  5. http://www.livescience.com/23341-farthest-galaxy-discovery-gravitational-lens.html
  6. http://www.scientificamerican.com/podcast/episode/cosmic-gravitational-lensing-reveal-10-11-05/
  7. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  8. http://relativity.livingreviews.org/Articles/lrr-1998-12/download/lrr-1998-12BW.pdf
  9. https://www.youtube.com/watch?v=VeAVmp9MLH4
  10. https://www.youtube.com/watch?v=4Z71RtwoOas
  11. অপূর্ব এই মহাবিশ্ব, এ এম হারুন অর রশীদ ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, প্রথমা প্রকাশন।

featured image: forums.autodesk.com

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আদ্যোপান্ত

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব (থিওরি অব রিলেটিভিটি) সম্ভবত বিংশ শতকে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় আবিষ্কার। যারা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের তেমন কিছুই জানেন না তারাও হালকা গোঁফ, উঁচু কপাল, এলোমেলো চুলের একজন বিজ্ঞানীকে খুব ভালমতো চেনেন, যিনি ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের জগতেও আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গুরুত্ব একটু অন্যরকম। এই একটিমাত্র তত্ত্ব প্রায় ১০০ বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা এখনো শেষ হয়নি।

আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাকে বর্ণনা করেছেন দুই ভাগে। একবার ১৯০৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’, পরের বার ১৯১৫ সালে ‘আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব’। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিশেষ তত্ত্ব নিশ্চয়ই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ করবে, আর সাধারণ তত্ত্ব সাধারণভাবে সকল ঘটনার জন্য কাজ করবে। বিশেষ তত্ত্বের বিশেষ ক্ষেত্র বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে তা বুঝতে হলে প্রসঙ্গ কাঠামো বা রেফারেন্স ফ্রেম নিয়ে একটু ধারণা দরকার হয়। নাম শুনে যতটা কঠিন আর খটমটে মনে হয় সত্যিকার অর্থে প্রসঙ্গ কাঠামোর ধারণা ঠিক ততটাই সহজ আর সরল।

ধরা যাক, ভোরবেলা দুজন মানুষ পার্কে দৌড়াচ্ছে, একজনের চেয়ে অন্যজন একটু দ্রুত। এখন পার্কের বেঞ্চিতে বসে থাকা যে কেউ কোনোরকম যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধুমাত্র দেখেই বলে দিতে পারবে তাদের মধ্যে কে দ্রুত দৌড়াচ্ছে। যখন আমরা শুধু চোখে দেখে কোনো গতি বোঝার চেষ্টা করি তখন নিজের অজান্তেই একটা কাজ করতে থাকি, আশেপাশের কোনো স্থির বস্তুর সাথে সাথে সেই গতিশীল বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করি। যদি আমাদের বস্তুটি স্থির বস্তুটিকে রেখে (আমরা যে বস্তুটিকে মনে মনে স্থির বলে ধরে নেই) সরে যেতে থাকে তবে আমরা বুঝি আমাদের বস্তুটি গতিশীল, যে বস্তুটি যত দ্রুত সরে যাচ্ছে তার গতি তত বেশি। এখানে এই স্থির বস্তুটি, যার সাথে তুলনা করে আমরা গতিশীলতা বুঝতে পারলাম তাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলবেন প্রসঙ্গ কাঠামো।

যেকোনো কিছুই প্রসঙ্গ কাঠামো হতে পারে, যদি কেউ একজন ল্যাবে বসে একটা পরীক্ষা করে তাহলে সে পুরো ল্যাবটাকে প্রসঙ্গ কাঠামো ধরতে পারে, আবার চলন্ত গাড়িতে বসে একই পরীক্ষাটা করতে চাইলে পরীক্ষকের সাপেক্ষে ‘স্থির’ গাড়ির কামরাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আইনস্টাইন দুটি সূত্র দিয়েছিলেন, ১. সকল জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো একইরকম। ২. সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে আলোর গতি সমান। জড় প্রসঙ্গ কাঠামো হলো বিশেষ ধরনের কিছু প্রসঙ্গ কাঠামো যারা একে অন্যের সাপেক্ষে ধ্রুব বেগে গতিশীল।

প্রথম সূত্রটিতে বলা হয়েছে প্রসঙ্গ কাঠামো যদি জড় হয় তবে পদার্থবিজ্ঞানের সব সূত্র একরকম হবে। অর্থাৎ সব জড় প্রসঙ্গ কাঠামোতে সবসময় ভরের সাথে ত্বরণ গুন করে বল বের করে ফেলা যাবে। খুবই সোজা সরল কথা। সে তুলনায় দ্বিতীয় সূত্রটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখি দুজন মানুষ যদি একই দিকে দৌড়াতে থাকে তবে তাদের একজনের সাপেক্ষে আরেকজনের যে গতি, সে তুলনার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কারো সাপেক্ষে তাদের গতি বেশি হবে। আবার তাদের বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসা কারো সাপেক্ষে তাদের গতিবেগ আরো বেশি হবে। এটাই আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতি। একটা গতি থেকে অন্য গতি বিয়োগ করে এই আপেক্ষিক গতিটা বের করে ফেলা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় সূত্রটা বলছে আলোর বেলায় আমাদের পরিচিত আপেক্ষিক গতির ধারণাটা কাজ করবে না।

তার মানে কেউ যদি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে আলোর গতি মাপে তাহলে দেখবে আলো সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যাচ্ছে। আবার কেউ যদি সেকেন্ডে ছিয়াশি হাজার মাইল বেগে ছুটে যেতে যেতে আলোর গতি মাপে তাহলেও কিন্তু আলোর গতিবেগ আমাদের জানাশোনা পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী  সেকেন্ডে একলক্ষ মাইল পাবে না, একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইলই পাবে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে ব্যাপারটা মেনে নিতে কষ্ট হলেও বিজ্ঞানীরা অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরেও সূত্রটাতে কোনো ভুল পাওয়া যায়নি।

এই সূত্র দুটি মেনে নিয়ে যদি এগিয়ে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যায় সময়, দূরত্ব আর ভরকে আমরা যেমন অপরিবর্তনীয় ভাবি, তেমনটা নয়। দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝতে পারি না, তার কারণ আমরা কখনোই আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছোটাছুটি করি না। কিন্তু কেউ একজন যদি স্থির অবস্থায় থেকে আর অন্য একজন যদি আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে ছুটতে ছুটতে দুটি একই ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ের পার্থক্য মাপতে চেষ্টা করেন তাহলে দেখা যাবে ঘটনা দুটির সাপেক্ষে যিনি আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে যাচ্ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্য যিনি স্থির ছিলেন তার মাপা সময়ের পার্থক্যের চেয়ে বেশি হবে!

আবার ধরে নেয়া যাক একজন মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে, গাড়িটার গতিবেগ যদি আলোর কাছাকাছি হয় তাহলে মাটিতে দাঁড়ানো ব্যক্তি দেখবেন গতিশীল গাড়িটা যেন সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। এইটুকুই কিন্তু শেষ না, গাড়িটাতে যদি যাত্রী থাকেন তাহলে তার সাপেক্ষে কিন্তু গাড়িটা স্থির এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আলোর কাছাকাছি বেগে সরে যাচ্ছে, কাজেই যাত্রী দেখবেন মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেছেন!

আইনস্টাইন আরেকটা কাজ করলেন। আমাদের জগতটা ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ সবকিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা এই তিনটা মাত্রা আছে। যেকোনো স্থানে কোনো বস্তুকে যদি কেউ খুঁজে বের করতে চায় তাহলে কোনো একটা প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা বরাবর দূরত্বগুলো জেনে নিতে হবে।

চিত্রঃ প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা জানা থাকলে বস্তুকে চট করে খুঁজে বের করে ফেলা যায়।

আইনস্টাইন যুক্তি দেখালেন কেউ শুধু দূরত্বগুলো জেনে নিলেই সবসময় বস্তুটি খুঁজে বের করতে পারবে না। কারণ বস্তুটি যদি গতিশীল হয় তাহলে কোনো সময়ে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাপেক্ষে বস্তুটির দূরত্ব কত হচ্ছে তা জানতে হবে। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার মতো সময়ও একটা মাত্রা, শুধু পার্থক্য হলো সময়কে আমরা একটু ভিন্নভাবে অনুভব করি। আইনস্টাইন একে বললেন স্পেস-টাইম বাংলায় বললে স্থান-কাল। আগের তিনটা মাত্রার সাথে সময়কে জুড়ে দিলে দেখতে কেমন হয়?

ব্যাপারটা খুব সহজে বোঝার জন্য ধরে নেই স্থানের মাত্রা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এই তিনটা না, স্থানের মাত্রা শুধু একটা যাকে আমরা একটা সুতার সাথে তুলনা করতে পারি। আর সময় তো নিজেই একটা মাত্রা, একেও একটা সুতার সাথে তুলনা করি। এবার যদি এই দুটি সূতা দিয়ে একটা কাপড় বুনে ফেলা হয় তাহলে দেখতে নিচের ছবিটার মতো হওয়ার কথা।

চিত্রঃ হালকা রঙের সুতাগুলো সময়ের জন্য আর গাড় রঙের সুতোগুলো স্থানের জন্য। (সহজে বোঝার জন্য তিনটা মাত্রাকে একটা ধরে নেয়াতে কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা নেই, বিজ্ঞানীরাও হরহামেশাই এভাবে বর্ণনা করেন।)

এই ছিল মোটামুটি ‘আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব’। এতক্ষণে নিশ্চয় অনেকেই ধরে ফেলেছেন বিশেষ তত্ত্ব কেন বিশেষ। কারণ এই তত্ত্বের সূত্রগুলো কাজ করবে শুধুমাত্র যতক্ষণ প্রসঙ্গ কাঠামোগুলোর মধ্যে গতির পরিবর্তন (ত্বরণ) হবে না ততক্ষণ।

কিন্তু প্রকৃতিতে সবসময়ই সবকিছুতেই ত্বরণ হচ্ছে। তার মানে হচ্ছে তত্ত্বটা অসম্পূর্ণ এবং প্রকৃতিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চাইলে আরো বড় পরিসরে চিন্তা করে করে তত্ত্বকে নতুন করে দাঁড় করাতে হবে, সোজা কথায় প্রসঙ্গ কাঠামোর শুধু ধ্রুব বেগের জন্য কাজ করলে হবে না, ত্বরণের জন্যও ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বের করতে হবে। তাই ১৯০৫ সালে বিশেষ তত্ত্ব দেয়ার পর পরই আইনস্টাইন নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন কীভাবে ত্বরণের জন্য আসল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করা যায়।

প্রকৃতিতে ত্বরণের কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই মাথায় আসবে মহাকর্ষজ ত্বরণের কথা। পৃথিবীতে উপর থেকে ফেলে দিলে যেকোনো বস্তুর ত্বরণ হয় বা বেগ বাড়তে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে এই বেগ বাড়াটাই হল মহাকর্ষজ ত্বরণ। এই ব্যাপারটা নিয়ে নিউটন ভাবনা-চিন্তা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যেহেতু বল প্রয়োগ করলে ত্বরণ হয় তার মানে মহাকর্ষজ ত্বরণও নিশ্চয়ই কোনো বলের কারণে হচ্ছে। তিনি এর নাম দিলেন মহাকর্ষ বল। অবশ্য এই বলের উৎস সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

মহাকর্ষ বল কেমন হতে পারে, তার জন্য গাণিতিক সমীকরণ কেমন হতে পারে সব নিউটন ভেবে ভেবে বের করে রেখেছিলেন এবং এসব সমীকরণ দিয়ে প্রকৃতিকে বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল। আইনস্টাইন তার আশেপাশে গেলেন না। একদিন অফিসের জানালা দিয়ে পাশের বিল্ডিঙের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মাথায় এল কেউ যদি হঠাৎ পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় এবং অভিকর্ষের প্রভাবে ত্বরণ নিয়ে নিচে পড়তে থাকে তাহলে মাটিতে পড়ার আগে সে কেমন অনুভব করবে? আইনস্টাইন ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেলেন, ভাবলেন কেউ যদি একটা বাক্সের ভেতর থাকেন এবং তাকে যদি বাক্সটা সহ ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় তখন কী হবে? লিফটের কর্ড ছিঁড়ে গেলে ঠিক এই অবস্থাটাই হয়।

বাক্সটি ফেলে দেয়ার আগ পর্যন্ত লোকটি বাক্সের ভিতরে দাঁড়িয়ে বাক্সের তলায় ওজনের সমান বল প্রয়োগ করছিলেন, তাই বাক্সটিও তার ওজনের সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বল ব্যক্তিটির উপর প্রয়োগ করছিল বলে তিনি তার ওজনটা অনুভব করছিলেন। যখনই বাক্সটাকে ফেলে দেয়া হবে সাথে সাথে বাক্সের ভেতরের মানুষটা মহাকর্ষজ ত্বরণের জন্য নিচে পড়তে থাকবেন এবং প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে। কিন্তু বাক্সটাও মহাকর্ষজ ত্বরণের প্রভাবে পড়ে যাচ্ছে তাই পড়তে পড়তে সেটার বেগও প্রতিসেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড করে বাড়তে থাকবে, অর্থাৎ বাক্সটি মানুষটার পায়ের নিচ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড বেগে সরে যেতে থাকবে। তার মানে কিন্তু মানুষটা আর বাক্সটার তলায় বল প্রয়োগ করতে পারছেন না ফলে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই, তাই তিনি নিজের ওজনটাও অনুভব করতে পারছেন না।

ব্যাপারটা কেমন হলো? বাক্স এবং মানুষ দুজনেরই ত্বরণ হচ্ছে কিন্তু তারা কেউই কোনো বল অনুভব করছে না। মহাকর্ষ বলহীন কোনো স্থানে স্থির অবস্থায় থাকলে যে অনুভূতি হবে, পৃথিবীতে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণে পড়তে থাকলে ঠিক সেই অনুভূতি হবে। ঠিক এই ভাবনাটাকেই একটু উল্টো করে ভাবলে বলা যায় বাক্সটা যদি শূন্যস্থানে কোনোরকম আকর্ষণের আওতায় না থেকে মহাকর্ষজ ত্বরণের সমান ত্বরণ নিয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে তাহলে ভিতরের কোনো মানুষ যেমন অনুভব করবে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্থির অবস্থায় থাকলেও ঠিক তেমনই অনুভব করবে।

আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন মহাকর্ষ বল আর ত্বরণ আসলে একই জিনিষ এবং একে বললেন, “the happiest thought in my life”। এই মহাকর্ষ আর ত্বরণ সমান হওয়াকে নাম দিলেন “equivalence principle”।

এবার উপরের ছবিটা একটু দেখা যাক। আইনস্টাইন ঠিক এই থট এক্সপেরিমেন্টটাই করেছিলেন ভেবে ভেবে। দেখা যাচ্ছে লিফটের বাইরের লোকটা সামনের দিকে একটা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করেছেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির সাপেক্ষে যখন লিফটটা স্থির (চিত্রের প্রথম অংশে) তখন লিফটের ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোক রশ্মিটা একপাশ থেকে এসে সোজা অন্য পাশের দেয়ালে আঘাত করছে। বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটা যখন ধ্রুব বেগে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা চিত্রের মতো বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, সময়ও বেশি লাগছে (ধ্রুব বেগের জন্য যে এমনটা হয় তা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা আগেই জেনে গেছি)।

বাইরের ব্যক্তির সাপেক্ষে লিফটটার যখন উপরের দিকে ত্বরণ হচ্ছে তখন ভেতরের মানুষটা দেখবে আলোকরশ্মিটা বেঁকে যাচ্ছে এবং পাশের দেয়ালে আঘাত করার আগে, আগের চেয়েও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, সময়ও বেশি লাগছে। এর কারণ কী হতে পারে? আইনস্টাইন ভাবলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি যেহেতু আলোক রশ্মিটাকে কখনোই বেঁকে যেতে দেখবেন না কিন্তু লিফটের সাথে ত্বরণে ছুটে চলা মানুষটা যেহেতু দেখবেন, আলোকরশ্মিটা বেশি সময় ধরে বেঁকে গিয়ে গিয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলছে তার মানে নিশ্চয়ই স্থির ব্যক্তির স্থান-কালের তুলনায় ত্বরণে থাকা ব্যক্তির স্থান-কালটাই বেঁকে যাচ্ছে। ত্বরণের জন্য স্থান-কাল বেঁকে যাচ্ছে। আবার “equivalence principle” অনুযায়ী যেহেতু ‘মহাকর্ষ’ আর ‘ত্বরণ’ একই জিনিস সেহেতু অভিকর্ষের জন্যও স্থান-কাল এভাবে বেঁকে যাবে।

অর্থাৎ আমরা যদি বলি, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই কিংবা ‘ভারী বস্তুর মহাকর্ষ বল বেশি, হালকা বস্তুর মহাকর্ষ বল কম- এমনটা সত্য হবে না। ভারী বস্তু আসলে তার চারপাশের স্থান-কালকে বেশি করে বাঁকায় আর হালকা বস্তু কম বাঁকায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। শুনে মনে হতে পারে গালগল্প কিন্তু আইনস্টাইন সত্যি সত্যি এই বাঁকানো স্থান-কালের ধারণা দিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। যেমন সূর্য যদি পৃথিবীকে আকর্ষণ না করে শুধু স্থান-কালকে বাঁকিয়ে বসে থাকে তাহলে পৃথিবী কেন সূর্যের চারিদিক ঘুরবে না?

চিত্রঃ সূর্যের চারিদিকে বাঁকানো স্থান-কালে আটকা পড়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

 

ঠিক যে কারণে পানি গড়িয়ে নিচু জায়গায় পড়ে যেতে চায় সেই একই কারণে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে বাঁকা স্থান-কালের মধ্যে পড়ে ঘুরতে থাকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলে, পরবর্তী ছবির মতো করে একটা টানটান করে রাখা চাদরের মাঝখানে ভারী কিছু রেখে আরেকটু হালকা একটা গোলককে কিছু গতি দিয়ে ছেড়ে দিয়ে দেখতে পারেন। এখানে চাদরটা স্থান-কালের মতো ভারী বস্তুটার ভরের জন্য বেঁকে যাবে। পৃথিবী কেমন করে সূর্যকে ঘিরে ঘুরতে থাকে, হালকা গোলকটার গতি দেখলেই সেটা বুঝে ফেলা সম্ভব।

এখানে অবশ্য চাদরের সাথে গোলকের ঘর্ষণে শক্তি কমতে কমতে একটা সময় গোলকটা মাঝখানের ভারী বস্তুতে গিয়ে আঘাত করবে, কিন্তু পৃথিবী যেহেতু শূন্যস্থানে ঘুরছে তাই তার সাথে কোনোকিছুর ঘর্ষণে গতিশক্তি কমে যায় না, পৃথিবীও সূর্যে গিয়ে আঘাত করে না।

আইনস্টাইন ত্বরণের জন্য আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বের করতে গিয়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করে ফেললেন। নিউটনের পুরনো তত্ত্বকে পাশ কাটিয়ে আইনস্টাইন তার এই নতুন তত্ত্বটি দিয়ে ভরযুক্ত বস্তুর পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়া (Gravitational Lensing), ভরযুক্ত বস্তুর কাছে সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া (time dilation), ঘূর্ণায়মান ভরের দিকে স্থান-কালের টান ইত্যাদি ঘটনা ব্যাখ্যা করে ফেললেন, যেগুলো নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণা দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।

আইনস্টাইন কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই বের করে ফেলেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা অনেকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তত্ত্বের সবগুলো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করেছিলেন। শুধু একটা ছাড়া। সেটি “মহাকর্ষীয় তরঙ্গ”।

আইনস্টাইন তার নতুন তত্ত্বটা দিয়ে অনেক কিছুই ঠিকঠিক ব্যাখ্যা করে ফেললেন কিন্তু ভারী বস্তু যে ভরের জন্য সত্যি সত্যিই চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে তা সরাসরি প্রমাণ করা যায় কীভাবে? আইনস্টাইন আবার ভেবে ভেবে বের করলেন, দুটি ভারী বস্তু যদি একে অন্যকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে কাছাকাছি আসতে থাকে তবে তারা যে তাদের ভরের জন্য স্থান-কালকে বাঁকিয়ে রেখেছিল সেই বাঁকানো ভাবটার খুব দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটবে।

এই দ্রুত পরিবর্তনটার জন্য একটা খুব শক্তিশালী তরঙ্গ উৎপন্ন হয়ে হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা, এই তরঙ্গটাকে তিনি নাম দিলেন ‘মহাকর্ষীয় তরঙ্গ’। কোনোভাবে যদি এইরকম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায় তাহলেই প্রমাণ হয়ে গেল যে ভারী বস্তু আসলেই স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে এত এত লেখালেখি হচ্ছে যে সেগুলো পড়ে পড়ে আমরা সবাই এ সম্পর্কে কমবেশি জানি।

সবাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চিনি। যে তরঙ্গ নিচের ছবির মতো মাধ্যমের কণাগুলোকে উপরে নিচে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকের সাথে সমকোণে এগিয়ে যায় সেটাই অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। যেমন পানির ঢেউ।

চিত্রঃ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ।

আবার যে তরঙ্গ মাধ্যমের কণাগুলোকে সামনে পিছনে কাঁপাতে কাঁপাতে কণার গতির দিকে সমান্তরাল দিকে এগিয়ে যাবে তাকে আমরা বলি অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। যেমন শব্দের তরঙ্গ।

চিত্রঃ অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ।

তবে মহাকর্ষ তরঙ্গ কিন্তু আমাদের পরিচিত অনুপ্রস্থ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ না, একটু বিশেষ ধরনের তরঙ্গ। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কোয়াড্রুপল তরঙ্গ’। এই তরঙ্গ স্থানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে এবং অনুপ্রস্থ আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের মতোই মাধ্যমের সংকোচন প্রসারণ করে আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোয়াড্রুপল তরঙ্গ স্থানের মধ্য দিয়ে ছুটে চলার সময় স্থানকে যদি আনুভূমিক দিকে সংকুচিত করে তবে উলম্ব দিকে সম্প্রসারিত করে। একইভাবে, যদি আনুভূমিক দিকে সম্প্রসারিত করে তবে উলম্ব দিকে সংকুচিত করে, নিচের ছবির মতো। বোঝার সুবিধার জন্য এখানেও ধরে নিলাম স্থানের মাত্রা দুটি, দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ।

চিত্রঃ প্রথম চিত্রে স্থান-কাল আনুভূমিক দিকে প্রসারিত, উলম্ব দিকে সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয় চিত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটা ঘটেছে।

কিন্তু এই কোয়াড্রুপল মহাকর্ষজ তরঙ্গ এত বেশি দুর্বল যে, যত সহজে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্তকরণের কথা বলা হলো, সত্যি সত্যি সনাক্ত করতে গেলে ঠিক ততটাই সূক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার। আইনস্টাইনের সময় এত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কথা চিন্তাও করা যেত না।

বেশ কিছু বছর পরে পদার্থবিজ্ঞানী Ray Weiss মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি বের করলেন। তার পদ্ধতিটা সহজ, এতে থাকবে দুটি সমান দৈর্ঘ্যের টানেল, যেগুলো পরস্পর সমকোণে অবস্থান করবে। প্রত্যেকটি টানেলের শেষ মাথায় লাগানো থাকবে প্রতিফলক আয়না, দুটি টানেলের দৈর্ঘ্য খুব সূক্ষ্মভাবে সমান হতে হবে। টানেলগুলো দিয়ে আলোর ব্যতিচার মাপা হবে কাজেই সূক্ষ্মভাবে সমান করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

একটি লেজার বিমকে বিশেষ কৌশলে দুইভাগে ভাগ করে টানেলগুলো দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলে (নিচের ছবির মতো) লেজার রশ্মিগুলো টানেলের শেষ মাথার প্রতিফলক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরে অনেক খেটেখুটে টানেল দুটিকে খুব সূক্ষ্মভাবে সমান করে তৈরি করেছেন তাই ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচার করে পরস্পরকে নাই করে দিবে।

চিত্রঃ LIGO Interferometer.

এখন যদি পৃথিবীর মধ্য দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছুটে যায় তাহলে স্থানের একবার সংকোচন আরেকবার প্রসারণ হবে। যেহেতু এই যন্ত্রটিও স্থানের মধ্যেই আছে সেহেতু টানেল দুটিতেও নিচের চিত্রের মতো সংকোচন-প্রসারণ হবে।

চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা সংকুচিত আর আনুভূমিক টানেলটা প্রসারিত হচ্ছে।
চিত্রঃ উলম্ব টানেলটা প্রসারিত আর আনুভূমিক টানেলটা সংকুচিত হচ্ছে।

এই সংকোচন প্রসারণের জন্যই আগের মতো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা রশ্মি দুটো ব্যতিচারের মাধ্যমে আর পরস্পরকে নাই করে দিতে পারবে না। রশ্মি দুটো মিলে আরেকটু বেশি শক্তিশালী রশ্মি তৈরি করে শনাক্তকারকে আঘাত করবে (নিচের ছবি)। শনাক্তকারক থেকে এই রশ্মির তীব্রতা মাপা আর মহাকর্ষ তরঙ্গ মাপা আসলে একই কথা।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বেঙ্গলেনসিস (ইমতিয়াজ আহমেদ)।

বাস্তবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে গিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কারণ মহাকাশের অনেক অনেক দূরে পরস্পরকে ঘিরে ঘুরতে থাকা দুটি নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গ পৃথিবীতে স্থানকে এত কম বিচ্যুত করবে যে তা শনাক্ত করতে হলে প্রায় অসাধ্য সাধন করতে হবে। তাই তারা প্রত্যেকটি টানেলকে ৪ কিলোমিটার লম্বা করে তৈরি করলেন (টানেলের দৈর্ঘ্য যত বেশি হবে বিচ্যুতি ধরতে পারার সম্ভাবনাও তত বাড়ে)।

এতটুক পড়ে এসে অনেকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, এতটা সংবেদনশীল করে তৈরি করার একটা অসুবিধাও আছে, যন্ত্রটার কাছাকাছি খুব অল্প কোনো নয়েজও যন্ত্রটাতে প্রভাব ফেলবে। যন্ত্রটার সংবেদনশীলতা এতই বেশি যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে একটা তালি দিলেই একটা বিক্ষেপ দেখা যাবে। এই সমস্যাটা যাতে না হয় এবং পৃথিবীর কোনো নয়েজকে যাতে মহাকর্ষ তরঙ্গ ভেবে ভুল না হয় তাই বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দুটি একইরকম যন্ত্র তৈরি করে রেখে দিয়েছিলেন কারণ দুই জায়গায় দুটি ভিন্ন যন্ত্রে একই সাথে বাইরে থেকে একই পরিমাণ নয়েজ ঢুকে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এই ধরনের ব্যবস্থা আর এত এত সতর্ক পদ্ধতি নিয়ে ২০০১ সালে LIGO প্রকল্প শুরু হয়েছিল। ২০১০ পর্যন্ত এর মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলতা ছিল না। শেষপর্যন্ত ২০৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে এর সংবেদনশীলতা ১০ গুন বাড়িয়ে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আবার চালু করা হয়। নতুন আপগ্রেডেড যন্ত্রপাতি নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে ফেললেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করে শুধুমাত্র আইনস্টাইনের বক্র স্থান-কালের ধারণা প্রমাণ করা হলো কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের সামনে একটা বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারে না। আমরা যেহেতু এতদিন শুধু তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গকেই যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হিসেবে জানতাম তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণাও হালে খুব একটা পানি পায়নি।

আবার বিগ ব্যাং এর পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর থেকে মহাবিশ্ব কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা আমরা জানি। কিন্তু বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত বেশি ছিল যে সেখান থেকে কোনো রকম তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গ বের হতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং এর ঠিক পর পরই মহাবিশ্ব কেমন ছিল তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের আচরণ থেকে তার কোনোরকম তথ্য পাওয়া যায় না।

কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা নেই, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উচ্চ ঘনত্ব যেমন এই তরঙ্গকে আটকে রাখতে পারেনি তেমনি ব্ল্যাক হোলের উচ্চ ঘনত্বেও এই তরঙ্গ আটকা পড়ে থাকবে না। তাই এই সংক্রান্ত গবেষকদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেল। আমাদের জীবদ্দশাতেই হয়ত আমরা জানতে পারবো মহাবিশ্ব একেবারে জন্মের সময়টা কীভাবে পার করেছে অথবা ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কেমন সব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে চলছে।

তথ্যসূত্রঃ

১. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48439/

২. https://blog.mukto-mona.com/2016/02/12/48447/

৩. https://www.youtube.com/watch?v=J9Zs-CjybTc

৪. http://csep10.phys.utk.edu/astr161/lect/history/einstein.html

৫. http://www.ceder.net/def/quadruple.php4?language=usa

৬. http://www.pitt.edu/~jdnorton/Goodies/Chasing_the_light/

৭. http://www.einstein-online.info/spotlights/equivalence_principle

৮. https://www.youtube.com/watch?v=RzZgFKoIfQI

featured image: rsi.ch

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

এমআইটির পদার্থবিদরা ১ম বারের মতো ৩টি ফোটনের আলোর অণু তৈরি করলেন

পাঁচ বছর আগে হার্ভার্ড এবং এমআইটির পদার্থবিদরা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ২টি ফোটনকে এমনভাবে মিথস্ক্রিয়া করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যা আপাতদৃষ্টিতে এক প্রকার অসম্ভব। কিন্তু এমন একটি অসম্ভব কাজ করে ফেলার পর আপনার পরবর্তি লক্ষ্য কী হবে? ৩য় একটি ফোটনকে এদের সাথে জুড়ে দেয়া নয় কি? 

image source: news.mit.edu

পদার্থবিদরা সর্বদাই আলোর কণাগুলোকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে এসেছেন। কিন্তু সাধারণত আলোর এই ভরহীন কণাগুলোকে একে অপরের সাথে তেমন কোনো মিথস্ক্রিয়া করতে দেখা যায় না। আমাদের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারগুলোর মতো বড় বড় কলাইডারগুলোতে বিভিন্ন মৌলিক কণার মাঝে সংঘর্ষ ঘটানো হয় এবং এ সংঘর্ষের ফলাফল থেকে নতুন নতুন জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করা হয়।

এ কথা কিন্তু ফোটনের বেলায় বলতে পারি না। সেখানে দুটি শক্তিশালী এবং বিপরীতমুখী লেজার রশ্মির সংঘর্ষ ঘটিয়েও তেমন কোনো নতুন ফলাফল দেখতে পাওয়া যায় না। কারণ ফোটনগুলো একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না বললেই চলে। বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ফোটনের এই বৈশিষ্ট্যকে নিয়ে তত্ত্বই দাঁড় করিয়েছেন। ফলাফল আর পাওয়া যায়নি। তত্ত্ব অনুসারে বিশেষ পরিস্থিতিতে ফোটনের এই ধর্ম পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। অবশেষে ২০১৩ সালে এর বাস্তবিক রূপ তারা দেখতে পেয়েছিলেন। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ মিখাইল লুকিন সেসময় বলেছিলেন, “আমরা এমন একটি মাধ্যম তৈরি করেছি যেখানে আলোর কণাগুলো একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। তারা এত শক্তিশালিভাবে এটি করে যে, মনে হয় তাদের ভর রয়েছে এবং তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আলোর অণু তৈরি করেছে।”

আলোর কণাগুলোকে ফোটন বলে; image source: newsweek.com

এটি করার জন্য তারা রুবিডিয়াম অণুর তৈরি একটি বিশেষ মাধ্যমের ভেতর দিয়ে কিছু সংখ্যক ফোটনবিশিষ্ট একটি দূর্বল লেজার রশ্মি প্রবেশ করেছিলেন। রুবিডিয়াম পরমাণু থেকে পরমাণুতে ঘোরার সময় ফোটনগুলো কিছু শক্তি পরমাণুগুলোকে দিয়ে দেয়। এরপর এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরমাণু এবং আলোর কণাগুলো মিলিতভাবে একরকম সংকর তৈরি করে। পরমাণু-ফোটনের এই সংকরকে পোলারিটন বলে। পদার্থবিদদের যে দল এই ঘটনাটি ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা সেই একই পদ্ধতি অবলম্বন করে ২টি ফোটনের স্থানে এবার ৩টি ফোটন দ্বারা তৈরি সংকর তৈরির জন্য ৩য় একটি ফোটন এতে ব্যবহার করলেন।

খুব সহজ ভাষায় বললে, আমরা দুটি অক্সিজেন পরমাণু ব্যবহার করে একটি অক্সিজেন অণু তৈরি করতে পারি। আবার, তিনটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে ওজোন অণু তৈরি করতে পারি। কিন্তু চারটি অক্সিজেন পরমাণুর সমন্বয়ে কোনো অণু কিন্তু তৈরি করা সম্ভব না। এমনকি কোনো কোনো মৌলের ক্ষেত্রে তিনটি পরমাণু মিলেও একটি অণু তৈরি সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা এটাই দেখার চেষ্টা করছিলেন যে, ফোটনের ক্ষেত্রেও এরকম সংকর তৈরি করার ক্ষেত্রে ফোটনের সংখ্যার কোনো উর্ধ্ব সীমা রয়েছে কিনা এবং শেষ পর্যন্ত তারা দুটি ফোটনের বদলে তিনটি ফোটনের তৈরি এক ধরনের অণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

তাহলে এরপর কি? এরপর কি তাহলে আমরা চারটি ফোটনের তৈরি এই বিশেষ ধরনের অণু দেখতে যাচ্ছি। নাকি আলোর তৈরি নতুন কোনো কেলাস দেখতে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো অবশ্য ভবিষ্যতের প্রযুক্তি এবং সময়ই বলে দেবে।

featured image: smithsonianmag.com

আলোর গল্প

আলো কী? প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো, আলো হচ্ছে দেবতাদের দেখার ক্ষমতা। যখন মিশরীয়দের দেবতা চোখ খুলত, তখন মহাবিশ্বে আলো আসত। সেই আলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেখতে পেত। সূর্য এবং চাঁদকে মিশরীয়রা তাদের দেবতা ‘রা’ এর দুই চোখ বলে মনে করতো। মিশরীয়দের পর পারস্যে সভ্যতা বেশ উন্নতি সাধন করে। এ পৃথিবীর আদিতম ধর্মগুলোর একটি হচ্ছে জরোআস্ট্রিয়ানিজম। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে জরোআস্ট্রিয়ানিজম ধর্মানুসারী অগ্নিপূজকরা আলোকে তাদের দেবতা ‘আহুরা মাজদা’র মঙ্গল সৃষ্টি বলে মনে করতো। আর অন্ধকারকে মনে করতো অমঙ্গল সৃষ্টি। মঙ্গল আলো দিনের বেলায় পৃথিবীকে আলোকিত করতো আর রাতের বেলায় অমঙ্গল সৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দিতো অন্ধকারের কালো চাদরে।

পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে আগুন এবং আলো ছিল দেবতাদের অধিকারে। জিউসের কাছে থেকে চুরি করে সেই আলো মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন আরেক দেবতা প্রমিথিউস। সেজন্য প্রমিথিউসকে দূর পাহাড়ে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয়। আর ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার কলিজা খেয়ে ফেলতো। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ সভ্যতার লোকজন এভাবেই আলোকে তাদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

চিত্রঃ প্রমিথিউস।

ধর্মের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও মনিষীরাও ধারণা করতে শুরু করেছিল আলো দুই ধরনের- বাইরের আলো এবং মনের আলো। এদের মধ্যে ছিলেন প্লেটো, এমপেডোক্লেস, ইউক্লিড, গ্যালেন ও আরো অনেকে। এ ধরনের চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম চিন্তা করেন মধ্যযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম (আল হ্যাজেন)। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন ক্যামেরা অবস্কিউরা বা অন্ধকুঠুরির ধারণা থেকে। ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা সর্বপ্রথম এসেছিল চীনা বিজ্ঞানী মজি’র সময়কালে (৪৭০~৩৯০

খ্রী.পূ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি অন্ধকার ঘরের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে দিলে বিপরীত পাশে পর্দায় একটি প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

আল হাইথামের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনোকিছু দেখার জন্যে বাইরের আলোর সাথে মনের আলো অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। মনের আলো এবং বাইরের আলো যখন একসাথে মিলে যায়, শুধুমাত্র তখনই আমরা দেখতে পাই। মনের আলো আসে মানুষের খাদ্য থেকে। মানুষ খাদ্য খাওয়ার পর তা আধ্যাত্মিক আলোতে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে থেকে যেতো। মানুষের মৃত্যু হলে এ আধ্যাত্মিক আলো চাঁদে গিয়ে পৌঁছতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে বেড়ে যেতো। যখন বাড়তে বাড়তে পরিপূর্ণ চাঁদ হয়ে যেতো, তখন সেখান থেকে আলো বা আত্মা ধীরে ধীরে দেবতার কাছে চলে যেতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে ক্ষয়ে যেতো। চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে এ আধ্যাত্মিক আলোকে সম্পর্কিত করেছিল ‘ম্যানিকায়িজম’ যা ছিল খ্রীঃ ২৫০ শতকে বর্তমানের বাগদাদে প্রচলিত ধর্ম। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আল-কিন্দী এ ধারণার প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।

আল হাইথামের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে থাকেন বাইরের আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা দেখতে পাই। যদি চোখের আলো গিয়ে বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসলেই কেবলমাত্র আমরা দেখতে পাই, তাহলে দূরের পাহাড় বা আকাশের তারা খুব সহজেই দেখতে পারার কথা নয়। তারপর আলো যদি বাইরে থেকে চোখেই প্রতিফলিত হবে, তাহলে আমাদের ভেতরের আলো বা অন্তরের আলোর আর দরকারই পড়বে না।

আলোর ধারণাকে গণিতের সাথে সম্পর্কিত করার প্রথম চেষ্টা ছিল ধর্মযাজক গ্রোস্তেস্ট এর লেখা ‘অন লাইট’ বা ‘দে লুচে’ বইয়ে। তিনিই প্রথম আলোর বস্তু-ধারণার জন্ম দেন। তারপর আলো নিয়ে মানুষের ধারণার বিশাল পরিবর্তন হয় মধ্য যুগে গ্যালিলিও গ্যালিলির গবেষণার মাধ্যমে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান সেগুলো পাথুরে গোলাকার বস্তু ছাড়া আর কিছু নয়, যেগুলোকে এর আগে মানুষ দেবতার নিখুঁত সৃষ্টি বা দেবতার চোখ বলে মনে করতো।

বিশেষ করে চাঁদ এবং সূর্যকে মানুষ নিখুঁত মনে করত। কিন্তু গ্যালিলিও দেখতে পান, চাঁদে বেশ কিছু গর্ত রয়েছে। একইভাবে সূর্যকে আপাতদৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের কালো দাগ মুক্ত মনে হলে আসলে তা নয়। এছাড়াও তৎকালীন ধারণা ছিল, পৃথিবীর চারপাশে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ঘুরছে। কিন্তু বৃহস্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান, সেই চাঁদগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ না করে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্যালিলিও আরও মনে করতেন, কোনো বস্তুকণাকে অতি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে থাকলে তা আলোক কণায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে নিউটনের প্রিজম পরীক্ষায় দেখা যায়, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের বর্ণালীতে বিভাজিত হচ্ছে। গ্যালিলিওর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিউটনও মনে করতেন, আলো হচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা যা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তার আকার অনুসারে আলাদা হয়েই রঙিন বর্ণালীর সৃষ্টি করছে।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফরাসী গণিতবিদ দেকার্ত মনে করতেন- আলো আর শব্দ একইরকম আচরণ করে। শব্দের যেমন গতি আছে, আলোরও গতি আছে। তিনি মনে করতেন আলোর গতি অসীম। আবার শব্দের চলতে যেমন মাধ্যম লাগে, আলোর চলতেও মাধ্যম লাগে এবং শব্দের মতো আলোও এক ধরনের তরঙ্গ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যম কী? এভাবেই ইথারের ধারণার জন্ম হয়।

আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায় আলোর অপবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারায়। দূরের কোনো আলোক উৎসকে আমরা যদি দেখি, তাহলে তার পাশে আলোকে অনেকটা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা দূরের কোনো ল্যাম্পপোস্ট এর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা এটা দেখতে পারব। ফরাসী প্রকৌশলী অগাস্টিন ফ্রেনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সমীকরণ সমাধান করে প’শন দেখান- আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব সত্যি হলে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে। পরবর্তীতে ফ্রেনেলেরই বন্ধু আর্গো ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। এতে করে আলোর তরঙ্গ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।

চিত্রঃ ল্যাম্পপোস্টে আলোর অপবর্তন।

পরবর্তী সময়ে ফ্যারাডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আলো মূলত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। এটি পূর্ণতা পায় ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে। কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের পর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ইথারের। মাইকেলসন-মর্লী’র পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার অস্তিত্বহীন বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা যা আলোর গতিতে চলছে, তার জন্যে সবকিছুই অতি নিকটে, তার কখনও দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। স্থান সংকোচনের কারণে দূরত্ব অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শুধুমাত্র আমরা যারা স্থির অবস্থায় আছি তাদের কাছেই সেগুলোকে দূরত্ব বলে মনে হয়। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফোটন থিওরী আলোর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গতত্ত্ব উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ আলো এমন কিছু যা একই সাথে কণা হিসেবে এবং তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ কর দেখান যে মহাকর্ষীয় বলের কারণে স্থান বেঁকে যায়। তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আলোও বিশাল মহাকর্ষীয় বস্তুর পাশে দিয়ে আসার সময় বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটনের পরীক্ষায় এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আলো ভারী কোনো নক্ষত্রের পাশে দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায়।

বর্তমানে আমরা আলোকে মনে করি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা একই সাথে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে। আলোর গতি সকল প্রসঙ্গ কাঠামোতে ধ্রুবক এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্থান বা সময় বদলে যায়, কিন্তু আলোর গতি? কখনোই নয়।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।