ডি ব্রগলীর কণা-তরঙ্গ দ্বৈততাঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে এক বিরাট লাফ

লুই ডি ব্রগলী ভৌতবিজ্ঞানের জগতে যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী প্রদান করে গেছেন, তা যদি আমাদের বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে প্রকাশ করা হতো, তবে শিরোনামটা বোধহয় এমনই হতো। পুরো পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত, বারংবার পরীক্ষিত ও প্রমাণিত তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন তত্ত্ব প্রদানের ঘটনা খুব কমবারই ঘটেছে।

আর যখনই তা ঘটেছে, তা হয়েছে যুগান্তকারী। কিন্তু, ডি ব্রগলী ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে। তিনি যুগান্তকারী তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে আরেক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার লুই ডি ব্রগলী কী করেছিলেন তা জেনে নেয়া যাক।

পরমাণুর বস্ত্রহরণের যে বিপ্লব উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে শুরু হয়েছিল, তাতে ১৯৯৮ সালে জে জে থমসন তার পরমাণুর মডেল প্রস্তাব করেন এবং বলেন, পরমাণুতে একটি ধনাত্বক চার্জিত পাত্রের মাঝে ঋণাত্বক চার্জিত ইলেকট্রন বিক্ষিপ্তভাবে থাকে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে জাপানি পদার্থবিদ হ্যানতারো নাগাওকা সর্বপ্রথম “কক্ষীয়” পরমাণুর ধারণা দেন। ইলেকট্রনগুলো পরমাণুতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থেকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদিক্ষণ করে, এই কথা তিনিই সর্বপ্রথম বলেন।

তবে তার তত্ত্বে নিউক্লিয়াসের ধারণা অনুপস্থিত থাকায় তা বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। কিছুদিনের মাঝেই নাগাওকার অনুরূপ তত্ত্ব প্রদান করে এবং নিউক্লিয়াসের ধারণা দিয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করেন বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড। [1]

রাদারফোর্ডের মডেল অনেক ঘটনার সফল ব্যাখ্যা দিলেও চিরায়ত বলবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল কিছুদিনের মাঝেই বাতিল হয়ে যায়। কারণ চিরায়ত বলবিদ্যারই অন্যতম অনুষঙ্গ “ম্যাক্সওয়েলের তাড়িতচৌম্বকীয় তত্ত্ব” রাদারফোর্ডের মডেলে প্রয়োগ করলে, রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে পরমাণুর স্থায়ীত্বের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

এরপর ১৯১৩ সালে গুরু রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলকে বাঁচানোর জন্য নীলস বোর পরমাণুর অভ্যন্তরে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করেন। এতদিনের প্রতিষ্ঠিত তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলিকেও তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। বলে দেন, ওসব নিয়ম পরমাণুর অভ্যন্তরে খাটবেনা। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব উঠে যায়।

চিত্রঃ শনি গ্রহকে ধনাত্বক আধান ও শনির বলয়কে ইলেকট্রনের কক্ষপথ ধারণা করে সর্বপ্রথম কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা দেন বিজ্ঞানী হ্যানতারো নাগাওকা।

কিন্তু, এই ধন্য ধন্য রব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্ণালীর মিহিগড়ন(Fine structure), জিম্যান ক্রিয়া, স্টার্ক ক্রিয়া ইত্যাদি ব্যাখ্যায় অপারগ হওয়ার পর বোর পরমাণু মডেলকে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হতে হয়। তারপরেও ১৯১৬ সালে ইলেকট্রনকে কণা ধরে কক্ষীয় পরমাণুতে শেষবারের মত হাত দিতে মঞ্চে আসেন বিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফিল্ড।

সমারফিল্ড নতুন দুইটা কোয়ান্টাম সংখ্যা যোগ করলেও তার পক্ষে কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।[2] কক্ষীয় পরমাণুর সব আয়োজন ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী লুই ডি ব্রগলী।

লুই ডি ব্রগলী আসলে যে কাজ করেছিলেন তা এতটাই প্রথাবিরোধী ও সাধারণ চিন্তাবিরোধী ছিল যে, তার গবেষণাপত্র অনুমোদনের জন্য যে ৩ জন অধ্যাপক দায়িত্বে ছিলেন, তারা সেই গবেষণাপত্রের কিছুই বুঝতে পারেন নি।

তার গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নিকট পাঠানো হলে আইনস্টাইন তা স্বীকৃত দেন এবং আইনস্টাইনের স্বীকৃতি লাভের পর লুই ডি ব্রগলী পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।[3] লুই ডি ব্রগলীর কাজটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক শতাব্দী পূর্বে, ‘আলো কি কণা? নাকি তরঙ্গ?’ বিষয়ক ঐতিহাসিক বিতর্কে।

আইজ্যাক নিউটন বললেন আলো হলো কণা, তার সমসাময়িক ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন তা মানলেন না, বললেন আলো তরঙ্গ। টমাস ইয়াং তো তার বিখ্যাত দ্বিচিড় পরীক্ষার মাধ্যমে আলোর ব্যতিচার ঘটিয়ে সুস্পষ্ট দেখিয়ে দিলেন যে, আলো তরঙ্গ। বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলও কিছু ধারণা সংস্কার করে তরঙ্গ পথের অনুসারী হলেন। আবার আলোক তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কিত পরীক্ষার মাধ্যমে হার্জ প্রমাণ করলেন আলো হলো কণা।

বিতর্কের যখন এই অবস্থা, তখন সব পথ – সব মত উপেক্ষা করলেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। প্ল্যাঙ্ক ফিরিয়ে আনলেন আলোর কণা তত্ত্বকে, তবে সংস্কার করে। বলা যেতে পারে আলোর কণা তত্ত্বকে বাদ দিয়ে প্যাকেট তত্ত্ব চালু করলেন, যা আমরা আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে জানি। আইনস্টাইন তা মেনে নিয়ে বললেন, আলোর তরঙ্গমুখ অসংখ্য কণা দ্বারা গঠিত বলে কল্পনা করা যায়। অর্থাৎ, আইনস্টাইন নিয়ে আসলেন আলোক তরঙ্গের কণাধর্ম। এই তত্ত্বটিই বিজ্ঞানী মহলে “The particle nature of light wave” নামে পরিচিত। [4]

আলো কণা নাকি তরঙ্গ বিতর্কের এই অবস্থায় মঞ্চে প্রবেশ করলেন ডি ব্রগলী। তিনি ভাবলেন, তরঙ্গের কণাধর্ম যদি থেকে থাকে তবে কি কণারও তরঙ্গধর্ম থাকতে পারে? প্রথমেই তিনি এই ধারণা প্রকাশ করেন নি। পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রনকে তিনি কোনো কণা কল্পনা না করে স্থির তরঙ্গরূপে কল্পনা করলেন। ব্রগলী বললেন, পরমাণুতে ইলেকট্রনের আবদ্ধ যাত্রাপথের পরিধির মান হবে, ইলেকট্রনের সাথে জড়িত সেই স্থির তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর পূর্ণগুণিতক।

এর ফলে হিসাব করে যা পাওয়া গেল, তা পরীক্ষালব্ধ মানের সাথে একদম মিলে যায়। আবার বোর তার পরমাণু মডেলে যে তথ্যগুলি স্বীকার্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন, সেটার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ডি ব্রগলীর অনুমান থেকে পাওয়া গেছিল। বড় কথা হল ইলেকট্রনকে তরঙ্গরূপে চলমান ধরলে তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলি অস্বীকার করা লাগেনা।

রাদারফোর্ড ও বোর যেভাবে বলেছিলেন যে, ওসব নিয়ম খাটবে না, তা ডি ব্রগলীকে বলতে হয়নি। কারণ চার্জিত কণা শক্তি বিকিরণ করে মন্দনপ্রাপ্ত হলেও তরঙ্গের ক্ষেত্রে শক্তি বিকিরণ করে তার বেগ মন্দনপ্রাপ্ত হয় না। তাই স্থির তরঙ্গের এই মডেল তাড়িতচৌম্বকের নিয়মে আক্রোশ থেকেও মুক্ত ছিল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার বিজ্ঞানী “লুইস ভিক্টর পিয়্যেরে রেইমন্ড ৭ম ডিউক ডি ব্রগলী”

ইলেকট্রনে এমন একটি স্থিরতরঙ্গ জড়িয়ে দিয়ে সফলতা লাভের পর ডি ব্রগলী চলে গেলেন যেকোনো বস্তুতে। বললেন, আমাদের সাথে এমনকি সবকিছুর সাথেই নাকি একটা তরঙ্গ আছে। প্রতিটি জড়বস্তুতে জড়িত এই তরঙ্গকে ডি ব্রগলীর তরঙ্গ বা বস্তু তরঙ্গ বা ম্যাটার ওয়েভ বলা হয়। ডি ব্রগলীর এই বক্তব্য শোনার পর থেকে দর্শনবাদী আর প্রমাণবাদীরা চিৎকার করে উঠলেন, প্রমাণ চাই! প্রমাণ চাই! বলে।

ডি ব্রগলী অঙ্ক কষে দেখালেন যে, যেকোনো গতিশীল বস্তুতে এই স্থিরতরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান হচ্ছে h/p. যেখানে h হচ্ছে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক এবং p হচ্ছে গতিশীল বস্তুটির ভরবেগ। এখানে ব্যবহৃত প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক h এর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা দেখি, যা নিয়ে চলাফেরা করি তাতে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান এতই ছোট যে, জাগতিক কোনো যন্ত্রের সাহায্যে তা পরিমাপ করা সম্ভব না। তাহলে কি পরবর্তীতে ডি ব্রগলীর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি?

অবশ্যই প্রমাণিত হয়েছে। অণু-পরমাণুর ক্ষুদ্র জগতে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান তাদের সাপেক্ষে বৃহৎ হওয়ায় তা অনুভূতিগ্রাহ্য হয়। ডি ব্রগলী তার তত্ত্বের একটি প্রমাণ প্রস্তাব করেছিলেন। তরঙ্গের ধর্ম হচ্ছে সরু ছিদ্র বা তীক্ষ্ণ ধারের পাশ দিয়ে যাবার সময় তরঙ্গের অভিমুখ কিছুটা বিচ্যুত হয়ে যায়। তরঙ্গের এই ধর্মের নাম অপবর্তন। এটা শুধু তরঙ্গের ক্ষেত্রেই হয়, কণাদের ক্ষেত্রে এরকম হয় না। ডি ব্রগলী তাই ইলেকট্রনকে সরু কোনো ছিদ্রের মধ্য দিয়ে পাঠিয়ে তার অপবর্তন হয় কি না তা দেখতে চেয়েছিলেন।

যদি অপবর্তন ঘটে তবে ইলেকট্রন তরঙ্গ; না ঘটলে ইলেকট্রন একটি কণা। এর কিছুদিনের মাঝেই বিজ্ঞানী এলেসার বিভিন্ন কেলাসের অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রন পাঠিয়ে অপবর্তন পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি পরীক্ষা করতে পারেন নি। শেষে ১৯২৭ সালে ডেভিসন ও লেস্টার জারমার এবং স্বতন্ত্রভাবে জর্জ পেজেট থমসন এই পরীক্ষা করে দেখলেন ইলেকট্রন সত্যি সত্যিই অপবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ ইলেকট্রনেরও তরঙ্গধর্ম রয়েছে এবং ডি ব্রগলীর কথাও সঠিক![5]

আইনস্টাইন বলেছিলেন, তরঙ্গ কণার ন্যায় আচরণ করতে পারে। ডি ব্রগলী পরে বললেন, কণাও তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ কণা-তরঙ্গের দ্বৈতাদ্বৈত রূপ ডি ব্রগলীই প্রথম সার্থকভাবে তুলে ধরেছিলেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি মজবুতকরণে তার এই সাহসী পদক্ষেপের তাৎপর্য বিশাল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার পরীক্ষামূলক প্রমাণ দানকারী বিজ্ঞানী ক্লিনটন ডেভিসন(বামে) ও লেস্টার জারমার(ডানে)

ইতিহাস অনেক রসিক। স্যার জে জে থমসন ইলেকট্রন নামক কণা আবিস্কার করেছিলেন এবং গ্যাসের তড়িৎ পরিবাহীতার উপর উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। আবার তারই পুত্র জে পি থমসন ইলেকট্রনকে তরঙ্গ প্রমাণ করে ডেভিসনের সাথে যৌথভাবে ১৯৩৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ইলেকট্রনকে কণা প্রমাণকারী পিতা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯০৬ সালে,[6] ৩০ বছর পর পুত্র নোবেল পুরস্কার পেলেন ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম প্রমাণ করে।[7]

চিত্রঃ লুইস ডি ব্রগলীর তত্ত্ব অনুসারে সংশোধিত নীলস বোরের পরমাণুর মডেলের চেহারা, এটি তরঙ্গ বলবিদ্যা পরমাণু মডেল বলেও পরিচিত।

লুই ডি ব্রগলীও বাদ যাননি! ১৯২৭ সালে প্রমাণিত হবার পরপরই ১৯২৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে তিনি নোবেল লাভ করেন।[8] কণা আর তরঙ্গের মাঝের সকল বিভেদ দূর করে কণা-তরঙ্গকে মিলেমিশে একাকার করে দিয়ে গেছেন লুই ডি ব্রগলী। সাথে সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে ডি ব্রগলী নিজেও একাকার হয়ে গেছেন।

তথ্যসূত্রঃ

[1] 22-23, Atomic model- Nagaoka’s Saturnian Model, Compendium of Quantum Physics, Book 2009. (http://www.link.springer.com)

[2] ৩য় অধ্যায়-উৎকেন্দ্রিক সমারফিল্ড, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[3] ৪র্থ অধ্যায়-দ্বৈততার রূপকার, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[4] http://www.reference.com/science/meant-dual-wave-particle-nature-light-52b1a5ca6b8c8e5c

[5] http://www.en.wikipedia./wiki/Davisson-Germer_experiment

[6] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1906

[7] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1937

[8] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1929

feature image: sciencenews.org

অ্যান্টিবডির ইতিহাস ও গাঠনিক বৈচিত্র্য

প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং সেনাপতি ছিলেন থুসিডাইডেস। স্পার্টান এবং এথেনিয়ানদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন History of the Peloponnesian War নামে একটি বই। এই বইয়ের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কী সেটা জানার অনেক অনেক আগেই মানুষ জানতো মানবদেহে এই জিনিসটা রয়েছে।

খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে থুসিডাইডেসের পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ নিয়ে লেখা বইতেও আমরা সেই উদাহরণ খুঁজে পাই। উনি লক্ষ্য করেছিলেন, যেসব সৈন্যেরা কোনো রোগে অসুস্থ হবার পর আবার সুস্থ হয়, তারাই নতুন আক্রান্ত সৈন্যদের সেবা দেয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ তারা সাধারণত ঐ রোগে পুনরায় আক্রান্ত হয় না। হলেও সেটা আর মারাত্নক আকার ধারণ করে না। থুসিডাইডেস নিজের অজান্তেই বর্ণনা করছিলেন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম চমকপ্রদ একটা বৈশিষ্ট্য, যাকে বলে ইমিউনোলজিক্যাল মেমরি।

এরকম নিজের অজান্তেই বিশাল কিছু করে ফেলা আরেক অমর ব্যক্তিত্ব ব্রিটিশ সার্জন এডওয়ার্ড জেনার। ১৭০০ সালের দিকে স্মলপক্স ছিল মানুষের জন্য এক বিভিষীকা। এই স্মলপক্সেরই আরেক মৃদুরূপ দেখা যেত গরুতে। এর নাম কাউপক্স। এডওয়ার্ড সাহেব মানুষকে কাউপক্সে আক্রান্ত করার চেষ্টা করে দেখতে পান তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মারাত্নক স্মলপক্স থেকে সুরক্ষিত থাকছে।

উনি যেধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন এ যুগে সেটা হতো ঘৃণ্য অপরাধ। তবে তখন সময় ছিল অন্যরকম আর তার টার্গেট ছিল প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর মানুষ তাই আইনের চোখ হয়তোবা রয়েল সোসাইটির সদস্য এডওয়ার্ড জেনারের প্রতি সহনশীল ছিল। সেই এক্সপেরিমেন্টগুলোতে গরু থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার হতো। আর গরুর ল্যাটিন নাম হচ্ছে Vacca, সেখান থেকেই এসেছে Vaccination যাকে আমরা বাংলায় টিকা বলে থাকি।

চিত্র: এডওয়ার্ড জেনার

জেনার কিংবা অন্য কারো বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে, জিনিসটা কেন কাজ করছে। তবে দার্শনিক না হয়ে বাস্তববাদী মানুষ হওয়ায় তিনি সেটা খুব একটা গায়ে মাখেননি। যে রোগে প্রতি বছর শুধু ইউরোপেই অর্ধলক্ষাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে এবং তার প্রায় ৪ গুণ মানুষ বাকি জীবন বিকৃত চেহারা নিয়ে কাটাচ্ছে সেরকম একটা যুগেটিকার কার্যকরণ খুঁজে সময় নষ্ট করাটা ছিল বিলাসিতা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, রোগটা কেন হচ্ছে সেটাই তখন কেউ বুঝতো না। বেশিরভাগই মানুষই ভাবতো রোগব্যাধী স্রেফ দূর্ভাগ্য। পাদ্রীরা বলতো সৃষ্টিকর্তার দ্বারা মানুষকে শাস্তি দেয়ার পন্থা হচ্ছে রোগ। এডওয়ার্ড জেনারেরটিকা আবিষ্কারের প্রায় এক শতক পরে বিজ্ঞানীরা অণুজীবের অস্তিত্ব এবং ছোঁয়াচে রোগের সাথে এর সম্পর্কের কথা প্রমাণ করেন। তবে যাদেরকে চোখেই দেখা যায় না তারা নাকি জ্যান্ত আবার তারাই নাকি এমন সর্বনাশ ঘটাতে পারে সেটা সাধারণ মানুষকে বুঝাতে অবশ্যই আরো অনেক সময় লেগেছিল।

তবে আপাত অদৃশ্য জিনিসগুলো যে আসলেই রোগ সৃষ্টি করতে পারে সেটার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যায় ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে। না, এবার কোন মানুষ নয় বরং রেশম পোকা হচ্ছে ভুক্তভোগী। সে সময় ফ্রান্সে দেখা গেল মুলবেরী পাতা খেয়ে কিছু পোকা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর তার পরপরই পুরো পোকার পাল বিনাশ হয়ে গেলো।

অনেকেই ধারণা করলেন হয়তো মুলবেরি পাতায় থাকা বিষাক্ত কোনোকিছুর কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু লুই পাস্তুর এগিয়ে আসেন ভিন্ন ধারণা নিয়ে। তিনি দেখান যে মারা যাওয়া পোকাগুলোর ভেতরে এক ধরনের অণুজীব কিলবিল করছে যাদের মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যাচ্ছে। সে অণুজীবগুলো পৃথক করে সুস্থ পোকার দেহে ঢুকালে সেটিও আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এটাই ছিল রোগের জীবাণুতত্ত্বের (Germ Theory of Disease) জন্ম। কিছুদিনের মধ্যেই পাস্তুর আবার দেখান যে একই ঘটনা ভেড়ার এনথ্রাক্স-এর ক্ষেত্রেও সত্য।

রোগের জীবাণুতত্ত্বের অন্বেষণে ছিলেন ফ্রান্সে লুই পাস্তুর এবং জার্মানিতে রবার্ট কচ। রোগের কারণ হিসেবে অন্য কোনো ধারণার পেছনে সারাজীবন ব্যয় করা অনেক রথী মহারথীরা এই তত্ত্বকে প্রচণ্ডভাবে নাকচ করে দেয়। তবে ১৮৯১ সালে কচ যক্ষ্মার পেছনে অণুজীবের তৎপরতার শক্তিশালী প্রমাণ নিয়ে আসেন। কীভাবে এদের খুঁজে পেতে হয় তা বুঝতে পারার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুদিনের মধ্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন মারাত্মক রোগের সাথে জড়িত অণুজীবদের কাহিনী একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে।

এটা মেনে নেয়া কষ্টকর আর মেনে নিলে তো চিন্তা আরো বেড়ে যায়। যাদের দেখাই যায় না তাদের থেকে আমরা কীভাবে নিরাপদে থাকবো? সবাই কি তবে মাইক্রোস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো আর কোনো কিছু ধরা বা ছোঁয়ার আগে দেখে নিতে হবে অণুজীব মুক্ত কি না? জীবন তো তাহলে তেজপাতা হয়ে যাবে।

চিত্র: রবার্ট কচ

এবারও ত্রানকর্তা হিসেবে আসেন রবার্ট কচ। ১৮৯০ সালের দিকে জানা গিয়েছিল ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণের মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। কচের ল্যাবরেটরির ছাত্ররা করলো কি, ব্যাকটেরিয়া থেকে ধনুষ্টংকারের জন্য দায়ী এই বিষাক্ত পদার্থ সংগ্রহ করে অল্প মাত্রায় খরগোশের দেহে ঢুকিয়ে দিলো। মাত্রাটা এমন ছিল যে খরগোশটি অসুস্থ হবে কিন্তু মারা যাবে না। এরপরে তারা ঐ খরগোশের রক্ত থেকে রক্তরস (Serum) আলাদা করার পর পরীক্ষা করে পেল যে এর মধ্যে এমন কিছু আছে যা ওই ব্যাকটেরিয়াকে মারতে এবং তার বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

আরেকটি অজান্তেই আবিষ্কারের খবর, এবারের আবিষ্কার অ্যান্টিবডি! অল্পদিনেই রবার্ট কচ এবং তার দল বুঝতে পারেন এই পদ্ধতিতে শুধু প্রতিরোধই নয়, প্রতিকারও সম্ভব। ১৮৯১ সালের ক্রিসমাসে বার্লিনের বার্গম্যান ক্লিনিকে ডিপথেরিয়া আক্রান্ত এক মেয়ের দেহে প্রথম অ্যান্টিসিরাম (যে সিরামে অ্যান্টিবডি রয়েছে) দেয়া হয়।

ডিপথেরিয়া তখন একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ ছিল যা প্রায়ই বিভিন্ন শহরের হাঁসিখুশি শিশুদের খেলার মাঠকে গোরস্থান বানিয়ে দিতো। সেই মেয়েটি বেঁচে গিয়েছিল। এই চমৎকারীত্বের অন্যতম কারিগর এমিল ভন বেহরিং পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রথম নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করেন। অ্যান্টিসিরাম দেয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ্য করে তোলা এখনো কার্যকর। বায়োটেররিজম, সাপের দংশনে কিংবা এধরনের জরুরী অবস্থায় অ্যান্টিসিরাম বহুল ব্যবহৃত।

এই সবকিছুই ছিল শুরুর কথা। জ্ঞানের নতুন একটি ক্ষেত্রের আবির্ভাব হলো, যার নাম রোগপ্রতিরোধবিদ্যা (Immunology)। এমিল ভন বেহরিং দিয়ে শুরু করে এই ফিল্ডের গবেষকরা এখন পর্যন্ত আরো ২২টি নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

ইমিউনোলজি নামের বিজ্ঞানের এই নব্য শাখাটির নবীন বিজ্ঞানীদের ডাকা হয় ইমিউনোলজিস্ট বলে। প্রথম প্রজন্মের ইমিউনোলজিস্টদের মাথাব্যথাই ছিল এন্টিবডি কী সেটা আয়ত্ব করা। এই যে রক্তের মধ্যে থাকা সুরক্ষাদানকারী বস্তু যেটা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় কিংবা কৃত্রিমভাবে প্রয়োগ করা যায় সেটা যে আসলে কী তা বুঝতে মেলাদিন সময় লেগেছিল। ৩০ বছর কাঠখড় পোড়ানোর পর জানা গেল এটা আর কিছুই না, গামা গ্লোবিউলিন শ্রেণীরই অন্তর্গত একগুচ্ছ প্রোটিন।

তবে এন্টিবডি সম্পর্কে কাজের কিছু বুঝার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। সে বছর রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরার্ড এডেলম্যান এবং লন্ডনের রডনি পোর্টার অ্যান্টিবডির গঠন বর্ণনা করেন। জেনে রাখুন এরা সেই ২২টি নোবেল পুরষ্কারের একটির যৌথ মালিক। অ্যান্টিবডি দেখতে ঠিক এরকম

চিত্রঃ অ্যান্টিবডির গঠন

এন্টিবডি Y আকৃতির। দ্বিপ্রতিসম এই জিনিসটির প্রতি অংশে রয়েছে একটি করে ভারী চেইন আর একটি হালকা চেইন। যে অংশ দুটিতে হালকা এবং ভারী চেইন পাশাপাশি রয়েছে সেই অংশটিই অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করে। কোন জিনিসটা কার জন্যে অ্যান্টিজেন হবে সেটা প্রত্যেক প্রাণীতে আলাদা।

আমার রক্ত আমার জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু সেটা আপনার কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য অ্যান্টিজেনস্বরূপ। যেকোনো জৈব বস্তু যা আপনার দেহে সচরাচর দেখা যায় না কিংবা বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করে তা-ই আপনার সাপেক্ষে অ্যান্টিজেন।

বিজ্ঞানীদের অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অংশটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি উৎস যা থেকে প্রচুর অ্যান্টিবডি পাওয়া যাবে এবং ল্যাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ হবে। তারা এজন্য বি-সেল লিম্ফোমা (B Cell Lymphoma) নামের এক ধরনের টিউমারকে বেছে নিলেন।

এই টিউমারে যত বি-সেল রয়েছে তারা সবাই একই রকম অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কারণ টিউমারের সব বি-সেল একই রকম। এরা প্রত্যেকেই একটি কোষের ক্লোন যেটার স্বাভাবিক কোষীয় চক্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং এরপর থেকে উপর্যুপরি কোষ বিভাজিত হতে থাকছে।

দিনে দিনে নতুন নতুন এরকম টিউমার এবং তাদের থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিকে বিজ্ঞানীরা চিনতে পারলেন। একটি একটি নতুন টিউমারের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয় আর তাদের কপালে চিন্তার রেখা মোটা হয়। কারণ কোনো একটা অ্যান্টিবডিই অন্যটির মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা।

কখনো কখনো এদের কয়েকটিকে দেখে মনে হয় এরা হয়তো কোনোভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু তবুও আলাদা। দুটি অ্যান্টিবডি, যারা একই অ্যান্টিজেনের প্রতি সাড়া দেয়, এমনকি একই প্রাণীর দেহেই তৈরি হয়, তবুও কখনোই তারা সম্পূর্ণ একরকম না।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল টিউমার হয়তো সুস্থ্ স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে দ্রুতই সেই ধারণা উবে গিয়েছিল। তারা যে হাজার হাজার আলাদা বি-সেল লিম্ফোমা দেখছেন তা প্রকৃতপক্ষেই দেহের মধ্যে হাজার হাজার ভিন্ন বি-সেল থাকার প্রতিফলন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিটি আলাদা বি-সেল আলাদা অ্যান্টিবডিই তৈরি করে।

জিরো টু ইনফিনিটির জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত আমার লেখাটিতে বলেছিলাম অণুজীবদের প্রজনন অসম্ভব রকমের দ্রুত গতি সম্পন্ন। সংখ্যাবৃদ্ধি ও মিউটেশন আমাদের লড়াইয়ে তাদেরকে সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। অ্যান্টিবডির মাধ্যমেই জীণুদের শনাক্তকরণ এবং নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অনুমান করা হয় মানুষ কিংবা ইঁদুর একশ মিলিয়ন কিংবা তারও বেশি সংখ্যক আলাদা আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে, যা আলাদা আলাদা অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করতে পারে। এই অ্যান্টিজেনদের মধ্যে এসব জীবাণু তো রয়েছেই।

প্রশ্ন আসতে পারে এত ভিন্ন ভিন্ন অ্যান্টিবডি তৈরি করা কীভাবে সম্ভব? এর উত্তর দিতে দুই ধরনের তত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছিল। একটা হলো জার্মলাইন থিওরি। এর মতে প্রচুর সংখ্যক অ্যান্টিবডির আগে থেকে বিদ্যমান জিন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিচালিত হয়।

অন্যটি সোমাটিক মিউটেশন থিওরি। কয়েক বছরের টানাহেঁচড়ার পর শেষ পর্যন্ত সোমাটিক মিউটেশন থিওরিই বিতর্কে টিকে যায় এবং আরেকটি নোবেল প্রাইজ ইমিউনোলজিস্টদের দখলে যায়। এবারের বিজয়ী জাপানের তরুণ বিজ্ঞানী সুসুমু তোনেগাওয়া।

দুটি অ্যান্টিবডির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে মূলত তার পরিবর্তনশীল অংশটি। হালকা এবং ভারী চেইনের এই পরিবর্তনশীল অংশটি মিলে তৈরি হয় অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চল। এর বৈচিত্র্যের কারণেই অ্যান্টিবডিগুলো বিচিত্র সব অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে পারে।

বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমরা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার জিন পেয়ে থাকি, এসব জিনকে একসাথে বলে জিনোম। দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই এই জিনোম রয়েছে। জিনোমের মধ্যে কিছু জিন চামড়া তৈরি করে, কিছু পেশী তৈরি করে, কিছু হাড় তৈরি করে এভাবে এদের কাজ ভাগ করে দেয়া। তেমনই কিছু জিন অ্যান্টিজেন গ্রাহক তৈরি করে।

যদিও সহজ করে বুঝার জন্য আমরা বলে থাকি এই জিনটা দেহের ওই অংশটা তৈরি করে। কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজ না। যদি অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের কথাই চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে, শুধু এতটুকুর জন্যই অনেকগুলো জিন কাজ করে। সেই জিনগুলো আবার জিনোমের একেক জায়গায় থাকে। পাজলের মতো।

আগেই বলেছি জিনোম দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই থাকে। কিন্তু সব জিন সব কোষে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। শুধুমাত্র লিম্ফোসাইটের মধ্যেই এই জিনগুলো বিভিন্ন বিন্যাসে সাজিয়ে অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়। এটাই সোমাটিক মিউটেশন থিওরি।

এবার অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্যের একটু ক্রিটিকাল বর্ণনা দিতে চাই। তাই পাঠকের বিশেষ মনোযোগ আশা করছি। অ্যান্টিবডির চিত্রটি খেয়াল করুন, দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। V (Variable) পরিবর্তনশীল অঞ্চল এবং C (Constant) অপরিবর্তনশীল অঞ্চল।

C অঞ্চলটি একই শ্রেণীভুক্ত বিভিন্ন অ্যান্টিবডির মধ্যে স্থির থাকে আর এর কাজ মূলত অ্যান্টিবডির গাঠনিক সংযুক্তি বজায় রাখা। কিন্তু V অঞ্চল C এর তুলনায় বেশ ছোট হলেও তিন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন সেটের থেকে আসা জিনখণ্ড (Gene fragment) নিয়ে একটি কার্যকর পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরি হয়। তিনটি সেটকে আবার বলা হয় V, D এবং J।

এখন যদি একটি ভারী চেইন তৈরি করতে হয় তাহলে প্রথমে J সেটের অনেকগুলো জিনখণ্ড থেকে একটা পছন্দ করা হয়, তারপর তার সাথে D সেট থেকে একটা জুড়ে দেয়া হয়। এই জোড়ার সাথে তারপর যুক্ত হয় V সেট থেকে আসা আরেকটি জিনখণ্ড। এখন পর্যন্ত তাহলে পরিবর্তনশীল অঞ্চলটি প্রস্তুত হলো। এবার এর সাথে C অর্থাৎ অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ডটি লাগিয়ে দিলেই একটা ভারী চেইনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনটা তৈরি হলো।

এবার জেনে রাখুন V, D ও J সেটের ভেতর যথাক্রমে ৫০, ৬ এবং ২৭টি জিনের টুকরা শনাক্ত করা গেছে। তাই এদের থেকে দৈবভাবে একটা করে নিয়ে ৫০ × ৬ × ২৭ = ৮১০০টি ভিন্ন পরিবর্তনশীল অঞ্চল সম্ভব যার সাথে অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ড যুক্ত হয়ে তৈরি হবে ভারী চেইন।

প্রায় একই উপায়ে প্রায় ৪৩৩ রকমের হালকা চেইন তৈরি সম্ভব। কিন্তু অ্যান্টিজেন গ্রাহকে তো পাশাপাশি একটা হালকা ও ভারী চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল থাকে। আর ভারী আর হালকা চেইনও যেহেতু দৈবভাবেই মিলিয়ে দেয়া হয় তাই এখানেও ৪৩৩ × ৮১০০ = ৩৫০৭৩০০ আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব শুধুমাত্র দৈবচয়নের ভিত্তিতে।

এখানেই শেষ হয় প্রতিটা চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরির সময় যখন আলাদা আলাদা সেট থেকে আসা জিনখণ্ড যুক্ত করা হয় তখন প্রায় সময়েই বাড়তি কিছু সিকোয়েন্স চলে আসে কিংবা কিছু সিকোয়েন্স হারিয়ে যায়। তাহলে শেষ পর্যন্ত বলা যায় যে আসলে অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্য সংখ্যায় অনুমান করা কষ্টকর।

এই মহাবিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবাণুদের সাথে পাল্লা দিতে এর চেয়ে চমৎকার সমাধান আর কী হতে পারে? হ্যাঁ, স্বাভাবিক প্রজননে জিনের গুচ্ছে অদলবদল হয়। কিন্তু তা যথেষ্ট ধীর। সেভাবে হয়তো প্রতি প্রজন্মে হাজার খানেক নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হতো। কিন্তু সোমাটিক মিউটেশনের মাধ্যকে প্রত্যেক ঘণ্টাতেই শত শত মিলিয়ন নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে আমাদের সুরক্ষায়।

অ্যান্টিবডির ইতিহাস, গঠন ও গাঠনিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার পর এবার ছোট্ট করে বলতে চাই সত্যিকারের জীবন্ত প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবডি কীভাবে কাজ করে। অ্যান্টিবডি তৈরি করে বি সেল। এই বি সেল তৈরি হয় অস্থিমজ্জায়। এরা পরিণত হবার পর লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় অবস্থান নেয়। পরিণত হবার সময়ে প্রতিটা বি সেলের মধ্যেই ভারী চেইন এবং হালকা চেইনের জিনখণ্ডগুলোর মধ্যে উপরের বর্ণনার মতো সমন্বয় ঘটে আর সেই অনুযায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।

বি সেল একটি অ্যান্টিবডি তার কোষদেহের বাইরের দিকে সবসময় রেখে দেয়। এটা বলা যায় তার পরিচিতির মতো যে সে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। আবার এটার মাধ্যমেই সে কিন্তু সব অ্যান্টিজেনকে যাচাই করে থাকে। তাই এটাকে বলা হয় বি সেলের অ্যান্টিজেন গ্রাহক (Antigen receptor)।

যে সকল বি সেল কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা পায়নি তারা লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় বসবাস শুরু করে এবং অ্যান্টিজেনের জন্য অপেক্ষায় থাকে। প্রতিটা বি সেল জন্মের সময়ই তার ভেতরে কিছু আত্নবিধ্বংসী যন্ত্রপাতি নিয়ে জন্মায় এবং যদি প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সে কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা না পায় তখন এই যন্ত্রপাতিগুলো চালু হয়ে বি সেলটি মারা যায় এবং নতুন নতুন বি সেল তার জায়গা দখল করে।

কিন্তু যখন কোনো বি সেল অ্যান্টিজেনের দেখা পায় মানে আসলে কোনো অ্যান্টিজেন যখন সেলটির গ্রাহকের সাথে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় তখনই সে সক্রিয় হয় এবং ভুর ভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু করে। সেই অ্যান্টিবডিগুলো রক্ত ও লসিকায় ঘুরে ঘুরে সেই অ্যান্টিজেনের অন্য কপিগুলো খুঁজে।

আরেকটি ঘটনা ঘটে, তা হলো বি সেল সক্রিয় হবার পর নিজের অনেক ক্লোন তৈরি করে। ক্লোনগুলো আবার এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যেন তারা অনেকদিন টিকে থাকে এবং স্বাভাবিক বি সেলের চেয়ে অনেক দ্রুত সাড়া দিয়ে ভুরভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। এভাবেই আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো সংক্রমণকে চিনে রাখে যাকে বলা হয় ইমিউনোলজিক্যাল মেমরী।

এটাই সেই শত বছর আগে থুসিডাইডেস বর্ণনা করেছিলেন। আর যে পদ্ধতিতে সক্রিয় বি সেল নিজের কপি তৈরি করে তাকে বলে ক্লোনাল এক্সপানশন এবং এই তত্ত্বের জন্য ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকফার্লেন বার্নেট… বাকিটা ধরতেই পারছেন আশা করি।

চিত্রঃ বি সেলের ক্লোনাল এক্সপ্যানশন

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Roitt’s Essential Immunology; P. Delves

featured image: bioradiations.com

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

ঋতুস্রাবের কারণ ও বিচিত্র ইতিহাস

মেয়েটির বয়স যখন কেবল এগারো তখনই হয়তো তার পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব (menstruation) এর অভিজ্ঞতা হয়। তারপরের কয়েক বছর তা শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণই হয়ে দাঁড়ায় না, সাথে তাকে সহ্য করতে হয় অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা। এসময়টা হট ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে তাকে কুঁকড়ে থাকতে হয় বিছানায়, সামান্য নড়াচড়া করাটাও যেন হয়ে ওঠে বিশাল যন্ত্রণা। অধিকাংশ মেয়েদেরকেই এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো একদমই অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য প্রাণীদের এই পিরিয়ডের ঝামেলা নেই। তাই এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা রহস্যজনকও বটে। ঋতুস্রাব কেন হয়? কেন শুধু মানুষের মাঝেই এটি দেখা যায়? এটি দরকারি হয়ে থাকলে অন্যান্য প্রাণীদের বেলায় কেন নেই?

ঋতুচক্র প্রজননের একটি অংশ। নারীর প্রজনন প্রক্রিয়া প্রতি মাসে দুটি হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের প্রতি সাড়া দেয়। প্রতিমাসে জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তর, এন্ডোমেট্রিয়াম গর্ভধারণের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে ঋতুস্রাবের সাহায্যে।

এন্ডোমেট্রিয়াম কতগুলো স্তরে সজ্জিত এবং রক্তনালিকা সমৃদ্ধ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ না করলে প্রোজেস্টেরন লেভেল কমতে থাকে। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং রক্তনালিকাগুলো তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং যোনিপথে বেরিয়ে যায়। এই রক্তপাতকেই বলে ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড। সাধারণত প্রতি ২৮ দিন পর পর এই চক্র সম্পন্ন হয়ে থাকে।  এই চক্রকে বলে ঋতুচক্র।

একজন নারীর ঋতুস্রাবের সময় গড়পড়তা ৩  থেকে ৭ দিন। এই সময়ে মোটামুটি ৩০ থেকে ৯০ মিলিলিটার  ফ্লুইড দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। এই ফ্লুইডে থাকে রক্ত, মিউকাস ও এন্ডোমেট্রিয়ামের ভাঙা অংশ। এই পরিমাণটা জানা খুব সহজ, ব্যবহার করার আগের ও পরের স্যানিটারী ন্যাপকিনের ভরের পার্থক্য থেকেই বের করা যায়।

অনেকেই এই প্রক্রিয়াটিকে অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় বলে মনে করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন এটা হয়? আগে মনে করা হতো ঋতুস্রাব হয়ে থাকে নারীদেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেবার জন্য। ১৯০০ সালের দিকের বেশিরভাগ গবেষণা মেয়েদের ঋতুস্রাবকে ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধারণা এখনো রয়ে গেছে।

১৯২০ সালে Bela Schick নামের একজন বিখ্যাত শারীরতত্ত্ববিদ ‘Menotoxin’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একটি গবেষণা করেছিলেন যেখানে দুইজন মহিলা হাতে কিছু ফুল নিয়ে ধরে থাকেন। একজনের পিরিয়ড চলছিল এবং আরেকজন স্বাভাবিক ছিলেন। schick প্রস্তাব করেন, পিরিয়ড চলাকালীন মহিলার চামড়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ (menotoxin) নিঃসৃত হয় যার কারণে ফুল নেতিয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, পিরিয়ডকালীন এই বিষাক্ত পদার্থ ইস্টের বংশবৃদ্ধিও রহিত করে দেয়। তার ধারণা ছিল এই বিষাক্ত পদার্থটি পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে নারীর ঘামের সাথে নিঃসৃত হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী আবার তাকে সমর্থনও জানালেন। তারা বললেন, পিরিয়ড চলাকালীন একজন মহিলা তার গা থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গাছের বৃদ্ধি রহিত করে ফেলতে পারে, এমনকি বিয়ার, ওয়াইন, পিকেলসও নষ্ট করে ফেলতে পারে।

চিত্রঃ না, ঋতুস্রাব চলাকালীন নারী ফুলের নেতিয়ে পড়ার কারণ নয়

ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা

গবেষক Clancy আবার মত প্রকাশ করেন, এসব গবেষণা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এগুলো করা হয়েছিল সেই সময়ে যখন সমাজে মেয়েদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচের দিকে। বলা যায় অনেকটা পরিকল্পতভাবেই এমন ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা করা হয়েছিল। এসব গবেষণার সাহায্যে এটি কখনোই প্রমাণ হয় না যে, আসলেই মেনোটক্সিন নামক কোনো বিষাক্ত কিছু পিরিয়ডের সময় নিঃসৃত হয়।

১৯২৩ সালে ঋতুস্রাব নিয়ে আরেকটি অনুমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার Margie Profet প্রস্তাব করেন, নারীদেহে শুক্রাণুর সাথে যে রোগজীবাণু প্রবেশ করে তাদের থেকে রক্ষার জন্যই ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। Clancy আবার এসময় বলেন যে, “আসলে পুরুষেরাই হলো অপরিচ্ছন্ন, পুরুষের এই অপরিচ্ছন্নতার জন্য প্রবেশকৃত রোগ জীবাণু দূর করার জন্যই মেয়েদের ঋতুস্রাব হয়।”

চিত্রঃ শুক্রাণুই কি নারীর ঋতুস্রাবের কারণ?

উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে profet এর ধারণার খুব তাড়াতাড়িই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা তার ধারণা সঠিক হলে ঋতুস্রাবের আগে জরায়ুতে অনেক রোগজীবাণু থাকার কথা ছিল, কিন্তু এমনটা হয় না। এমনকি কিছু কিছু গবেষণা এটাও বলে যে ঋতুস্রাব ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। সেখানে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ভালো বংশবিস্তার করতে পারে। এখানে আয়রন, প্রোটিন, সুগার সবই থাকে। আবার ঋতুস্রাবের সময় যোনিপথের আশেপাশে মিউকাসের পরিমাণ কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়ার জন্য বেঁচে থাকা খুবই সুবিধাজনক হয়।

শক্তির ব্যবহার

Profet এর সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মিশিগান ইউনিভার্সিটির Beverly Strassmann. ১৯৯৬ সালে তিনি নিজের ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন ঋতুস্রাব বোঝার জন্য শুধু মানুষের উপর গবেষণা করলেই চলবে না,অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের বংশবিস্তার সমন্ধেও গবেষণা দরকার। তাদের প্রক্রিয়াও আলোচনায় আনা জরুরী। তার মতে, জরায়ুর মধ্যকার একটি পুরু রক্তনালিকা সমৃদ্ধ স্তরকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রেও জরায়ুর ভেতরের স্তরটি থাকে। গর্ভধারণ না করলে স্তরটির ভেতরের পদার্থগুলো শোষিত হয়ে যায় অথবা ভেঙে বেরিয়ে যায়। স্ট্রেসম্যানের মতে,স্তরটি ভেঙে আবার তৈরি করতে কম শক্তির প্রয়োজন হয়।

তিনি আসলে এখানে শক্তির মিতব্যয়ীতা বোঝাতে চেয়েছেন,রক্তপাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে চাননি। অবশ্য নারীদেহ সম্পূর্ণ রক্ত শোষণ করতে পারবে কিনা এটাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত হলে ঋতুস্রাবই ভালো পন্থা। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের রক্তপাত অভিযোজন নয় বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মায়ের সাথে গভীরভাবে প্রোথিত

লিভারপুল ইউনিভার্সিটির Colin Finn এমনই আরেকটি ধারণা দেন ১৯৯৮ সালে। তার মতে শক্তি সংরক্ষণের জন্য নয় বরং ডিম্বাণুর বেড়ে ওঠার জন্য ঋতুস্রাব প্রয়োজনীয়। ফিনের মতে ভ্রুণ বিভিন্ন স্তরের সাহায্যে মায়ের শরীরের সাথে খুব গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। যার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর কিছু সময়ের জন্য জরায়ু গর্ভধারণের জন্য যথাযথভাবে তৈরি থাকে। সময়মতো গর্ভধারণ না করলে উপরের স্তর আবার ভেঙে যায়।

উপরের দুটি ধারণাই সঠিক হতে পারে। সত্য অনুসন্ধানের জন্য আমাদের তুলনা করতে হবে অন্যান্য প্রজাতির সাথে যাদের ঋতুস্রাব হয় আর যাদের হয় না। মানুষ ছাড়া আর যেসব প্রাণীর ঋতুস্রাব হয় তাদের অধিকাংশই প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত। বানর, এপ, মানুষ সবাই আছে এর মাঝে।

ঋতুস্রাব হয় এমন একটি প্রজাতি হলো rhesus macaques. বড় আকারের এপের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়। এছাড়া শিম্পাঞ্জি আর গিবনের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই দেখা যায়। গরিলা আর ওরাং-ওটাং এর মধ্যে অবশ্য বহুলভাবে দেখা যায় না। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে টারশিয়ারের ঋতুস্রাব দেখা যায়, তবে খুব বিরল।

চিত্রঃ rhesus macaques, এদের মানুষের মতো ঋতুস্রাব হয়

পরিচিত প্রাণীদের মধ্যে হাতি আর বাদুরের ঋতুস্রাবীয় রক্তপাত হয়ে থাকে। নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির John Rasweiler এর মতে বাদুরের দুইটি গোত্র, free tailed bats এবং leaf-nosed bats এর পিরিয়ড হয়ে থাকে।

ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণী খুবই অল্প

উপরে উল্লেখিত প্রজাতিদের ঋতুস্রাব মোটামুটি মানুষের মতোই। শর্ট টেইলড ফ্রুট বাদুরের রজঃচক্র ২১–২৭ দিনের যেমনটা হয় মানুষের। বাদুরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানুষের মতো তেমন স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এটি বোঝা যায় কারণ এই বাদুরগুলোর জরায়ুকে ঘিরে ছোট ছোট রক্তনালিকা থাকে। দেখা যাচ্ছে ঋতুস্রাব হয় এমন প্রজাতি হাতে গোনা যায়। মানুষ, এপ, বানর, বাদুর এবং হাতী।

ভ্রুণ হতে আসা সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে জরায়ুর পরিবর্তন

ইয়েল ইউনিভার্সিটির Deena Emera’র মতে, একজন মায়ের তার জরায়ুর উপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে সেটি তার নিজের উপরই নির্ভর করে। ২০১১ তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইমেরা এবং তার সহকর্মীগণ উল্লেখ করেন, ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণীদের জরায়ুর ভেতরের স্তরটি সম্পূর্ণরূপে মায়ের দেহের প্রোজেস্টেরন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভ্রুণ শুধুমাত্র তখনই জরায়ুতে স্থাপিত হয় যখন জরায়ুর ভেতরের দেয়াল পুরু আর বড় বিশেষায়িত কোষযুক্ত হয়। একজন মহিলা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি গর্ভবতী হবেন কিনা। এই ক্ষমতাকে বলে ‘spontaneous decidualisation.

অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ভ্রুণ হতে আসা সংকেত জরায়ুর পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গর্ভাবস্থার প্রতি সাড়া দিতেই জরায়ুর পরিবর্তন হয়ে থাকে। ইমেরার মতে, “যেসব প্রজাতির ঋতুস্রাব হয় এবং যারা spontaneous decidualisation ক্ষমতা প্রদর্শন করে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।”

এর উপর ভর করেই তিনি মূল জিজ্ঞাসা খুঁজে বের করেন- “কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে কেন গর্ভাবস্থা মা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে আর কিছু প্রজাতির তা নিয়ন্ত্রিত হয় ভ্রুণ দ্বারা?” তিনি মত প্রকাশ করেন spontaneous decidualisation ক্ষমতাটা তৈরি হয়েছে মা এবং ভ্রুণের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য।

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে এবার দুটি সম্ভাবনা দেখানো যায়। প্রথমটি হলোঃ spontaneous decidualisation (গর্ভাবস্থা নিয়ন্ত্রণে মায়ের ক্ষমতা), যা আক্রমণাত্মক ফিটাস হতে মাকে রক্ষা করার জন্য বিকশিত হয়েছে।

সকল ভ্রুণই মায়ের জরায়ুতে গভীর পরিচর্যার জন্য আশ্রয় নেয়। ঘোড়া,গরু,শূকর এদের ক্ষেত্রে ভ্রুণ আলতোভাবে জরায়ুর উপরে স্থান নেয়। বিড়াল,কুকুরের ক্ষেত্রে ভ্রুণটি আরেকটু গভীরে প্রবেশ করে। কিন্তু মানুষ সহ অন্যান্য প্রাইমেটদের ভ্রুণ অত্যন্ত গভীরভাবে জরায়ু প্রাচীরে প্রোথিত হয়। কেউ কেউ এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, মা আর শিশু যেন একটি “চিরায়ত রশি টানাটানি” যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

মা চায় তার প্রত্যেক সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি বরাদ্দ রাখতে যাতে করে তার শক্তি কিছুটা বাঁচে এবং তা অন্য সন্তানকে দিতে পারে। অপরদিকে বেড়ে উঠতে থাকা বাচ্চাটি চায় তার মা থেকে যতটা সম্ভব বেশি শক্তি ব্যবহার করতে। ইমেরার মতে, “বাচ্চাটি যত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মা ততই সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে থাকে বাচ্চার আক্রমণ ঠেকানোর জন্য।”

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, spontaneous decidualisation ব্যবস্থাটি উন্নতি লাভ করেছে অনাকাঙ্খিত ভ্রুণ প্রতিরোধ করার জন্য। জীনগত অস্বাভাবিকতা ভ্রুণের ক্ষেত্রে খুব বেশি দেখা যায়। যার কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই অনেকের গর্ভপাত হয়। এটা হতে পারে অস্বাভাবিক যৌন ক্রিয়াকলাপের কারণে।

ভ্রুণে পরিণত হওয়া ডিম্বাণুটির বয়স বেশিও হতে পারে

মানুষ যেকোনো সময় যৌন সঙ্গমে মিলিত হতে পারে যেখানে অন্যান্য প্রাণীরা শুধুমাত্র ডিম্বপাতের সময় অর্থাৎ প্রজননকালে যৌন সঙ্গম করে। এটিকে বলে সম্প্রসারিত যৌন কাল।

অন্যান্য কিছু ঋতুস্রাবীয় প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেও এই সম্প্রসারিত যৌনকাল দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে অনেক সময় নিষিক্ত ডিম্বাণুর বয়স বেশ বেশি থাকে, যার কারণে এতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। জরায়ু পুরু হয়ে পরিবর্তিত হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক ভ্রুণের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। spontaneous decidualisation মাকে বাঁচানোর একটি পদ্ধতি হতে পারে। এটি মাকে অস্বাভাবিক ভ্রুণ হতে রক্ষা করে এবং নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করে।

এ থেকে একটি বিষয়ে ধারণা লাভ করা যায়, অধিকাংশ ঋতুস্রাবীয় স্তন্যপায়ীদের গর্ভকাল একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী হয়ে থাকে এবং তারা সন্তান ভূমিষ্ঠ করতে অধিক শক্তি বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়। ঝামেলাজনক গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্যই তারা বিবর্তিত হয়েছে।

সুতরাং ঋতুস্রাব বিবর্তনের একটি পার্শ্বক্রিয়া

২০০৮ সালে রেসাস বানরের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এদের ভ্রুণের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে এরকম তথ্য না পাওয়ার কারণে এই গবেষণা বেশি দূর এগোয়নি। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা spontaneous decidualisation এর কারণ খুঁজে বের করতে পারছি,ততক্ষণ ঋতুস্রাবের ধাঁধার জট খুলতে পারবো না।

স্ট্রেসম্যান,ফিন,ইমিরা সহ সকলের গবেষণা একটি দিক নির্দেশ করছে যে,ঋতুস্রাব প্রজননজনিত কারণে বিবর্তনের একটি আকস্মিক ঘটনা। যেসব প্রজাতি অন্যভাবে প্রজনন ঘটিয়ে থাকে তাদের ঋতুস্রাবের প্রয়োজন হয় না। বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ঋতুস্রাব খুব বিরল হয়ে থাকে।

মানুষের ক্ষেত্রে,যেসকল সমাজে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা কম,তাদের ঋতুস্রাবও কম হয়। এমনকি সেসব স্থানে মানুষ এখনো প্রাকৃতিক জন্মদানের উপর নির্ভরশীল। সেখানকার মহিলারা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটায় সন্তান জন্ম দিয়ে অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে।

মালির ডগন সম্প্রদায়ে গবেষণা করে স্ট্রেসম্যান আবিষ্কার করেছেন সেখানের মহিলারা জীবনে ১০০ টি পিরিয়ড পেয়ে থাকেন যেটা আমাদের প্রজাতির ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাভাবিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্বাভাবিক বিশ্বের মহিলারা ৩০০–৫০০ টি পিরিয়ড পান।

চিত্রঃ ডগন নারীরা নারীত্বের বেশিরভাগ সময়েই গর্ভবতী কিংবা দুগ্ধদানরত অবস্থায় থাকেন

Clancy বলেন, “এমন অনেক মহিলা আছেন যারা পিরিয়ড না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু আসলে আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বিশাল। সুতরাং প্রতিটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে বরং একটু সময় নেওয়াই ভাল।”

যাহোক এত বিশাল আলোচনা হয়তো একটি ১১ বছর বয়সী মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবের যন্ত্রণাকে কমাতে পারবে না। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ঠেলে দিয়ে আমাদের সকলের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীই পারে এই কষ্টকে ঘুচাতে। হাজার হোক একজন মানুষ, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তার জন্ম তো হয় এই ঋতুস্রাব প্রক্রিয়ার কারণেই।

তথ্যসূত্রঃ BBC Earth, http://www.bbc.co.uk/earth/story/20150420-why-do-women-have-periods

ডিএনএ চরিত

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।2

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি। সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি,
তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। 3
প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়। মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়। তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

4

 চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ।

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে। আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

4

 চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন।

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান5 সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!

 

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ6 করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

 

লেখকঃ

চিন্ময় সেন
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই। ১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে। যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে। ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’ পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই। ১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে। যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে। ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’ পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

ডিএনএ চরিত

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।2

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি। সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি,
তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। 3
প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়। মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়। তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

4

 চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ।

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে। আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

4

 চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন।

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান5 সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!

 

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ6 করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

 

লেখকঃ

চিন্ময় সেন
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়