ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ঘুমের অনিয়মের জন্য দায়ী

তথ্য ও যোগাযোগ বিপ্লবের দুনিয়ায় ২৪ ঘন্টা উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া বেশ বড়সড় সুযোগ। কিন্তু এ সুযোগের অপর পিঠে অনেক কিছু বিসর্জনেরও ব্যাপার জড়িত। নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আধুনিক যুগের জনজীবনে ঘুমের একটি ক্ষতিকারক। নিদ্রাহীনতা এবং নিম্নমানের ঘুমের সাথে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। বিছানায় যাবার নিকট সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবহার এই সমস্যার দিকে সহজে ঠেলে দেয়।

আধুনিক যুগে এসে অপর্যাপ্ত ঘুম খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ইতোমধ্যেই অপর্যাপ্ত ঘুম যে জনস্বাস্থ্য এবং জনগণের মানসিক দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব রাখছে তা স্পষ্ট। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু গবেষণার ফলাফলে তা উঠে এসেছে।

খারাপ খবর হল, এ সমস্যা দিন যত যাচ্ছে আগের চেয়েও গুরুতর হচ্ছে। বহু উন্নত দেশেও মানুষ কম ঘুমের সমস্যার সম্মুখীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ৭ থেকে ৯ ঘন্টার ঘুম দেয়ার সংকট দেখা দিচ্ছে। আর এই ঘুমের ঘাটতির সমস্যা বড় হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

যখন এ ঘুমহীনতা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, একই সাথে বেড়ে চলছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। আমাদের ঘুমের চক্র ভেঙে দিচ্ছে যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এখন পর্যন্ত খুব কমই প্রামাণ্য উপাত্ত রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে ঘুমের সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত দেখানোর ক্ষেত্রে।

ইন্টারনেটের কাছে নাচের পুতুল হয়ে গেলেন না তো? | Image Source: salon.com

ঘুম এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের মধ্যকার সম্পর্ক ও প্রভাব নির্ণয় করতে জার্মান একদল বিজ্ঞানী তাদের দেশের মানুষের উপর একটি জনজরিপ পরিচালনা করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে তুলন্নামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে ঘুমের  সাথে কতটা সম্পর্কিত সেদিকটা খেয়াল রেখে। গবেষণা থেকে উঠে এসেছে যে, যারা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকেন তারা অন্যান্যদের তুলনায় গড়পড়তায় ২৫ মিনিট দেরীতে ঘুমিয়ে থাকেন। আরো উল্লেখ্য, এরা ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রতি খেয়াল রাখতে পারেন না। ফলশ্রুতিতে, ঘুম পরিপূর্ণ হয় না এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। উল্লেখ্য, ২৫ মিনিটের হিসেব একটি গড় মান। আপাতদৃষ্টে বেশ কম মনে হলেও অনেকের ক্ষেত্রেই আশংকার জন্য যথেষ্ঠ।

ইন্টারনেট এমনিতেই একটি বহুমুখী জগৎ। একে তো বহুমুখী, তার পরে আবার এ জগতের কোন শেষ নেই। আবার উচ্চগতির ইন্টারনেট সে বহুমুখী জগতের সবগুলো দুয়ার খুলে দেয়। ফলত, উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রলুদ্ধ করে অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে ভিডিও গেমস, ওয়েবে ঘোরাঘুরি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতে।

মোবাইলের ভিতর কী থাকে? সারাদিন পড়ে থাকে কেন? | Image Source: dailymail.co.uk

ইতিপূর্বের প্রতি প্রজন্মের জন্যই, প্রযুক্তির মোহের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ছিল। টিনেজারদের মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ভিডিও গেমস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার প্রবণতা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা গিয়েছে। তবে, বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের ব্যবহারকে ঘুমের সময়ের সাথে অধিক শক্তিশালীভাবে সম্পর্কিত পাওয়া গিয়েছে।

মিলানের বক্কোনি ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যা তত্ত্বের অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো বিল্লারি ব্যাখ্যা করেন, ব্যক্তি ডিজিটাল দুনিয়ার প্রলোভনে বিছানায় যেতে দেরী করায় ঘুম শুরু করতে দেরী হচ্ছে। যাদের দেরীতে ওঠার সুযোগ নেই তারা সেই ক্ষতিপূরণও করতে পারছে না সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠে। ফলত, ঘুমের দৈর্ঘ্য প্রয়োজনীয় মাত্রার আগেই কেটে যাচ্ছে।

মোটের উপর, গবেষণার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছ থেকে যারা রাতে ঘুমের আগে ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করে থাকে। ফলে সর্বসাধারণের জন্য বিষয়ভিত্তিকভাবে এ তথ্য পরিবেশন করা  যাচ্ছে না।

গবেষণাটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এই মুদ্রার অপর পিঠের অবাক করা ব্যাপার হল টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপরও তথ্য সীমিত। অর্থাৎ ঘুমের আচরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার তথ্যের ফারাক রয়েছে। কারণ, ঘুমের চাহিদার বয়সভেদে ভিন্ন, আবার বয়সভেদে ইন্টারনেট আসক্তির ধরণও ভিন্ন। এর সাথে গবেষণা লক্ষ্য ধরে রেখে ইন্টারেনেটের কারণে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের বৃদ্ধির হার ও এই বহুমাত্রিক রাশির উর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের সাথে ব্যক্তির ঘুমের আচরণের পরিবর্তন যাচাই করতে হচ্ছে।

গবেষকরা ইন্টারনেট আসক্তির ভিত্তিতে টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপর গবেষণা করার আহবান জানাচ্ছেন। যেহেতু ইন্টারনেট জড়িত প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে, তাই এখন প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইন্টারনেটমুখী হয়ে উঠছে পণ্যের মধ্যে সেই ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রাখার দিক থেকে। একটি আরেকটির সম্পূরক হয়ে ক্রেতাকে ঠেলে দিচ্ছে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের দিকে।

ডিজিটাল দুনিয়ার ব্যস্ততা বাড়ছে যেমন হড়হড়িয়ে তেমনি প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সুস্থভাবে টিকে থাকতেও মানুষকে রাখতে হচ্ছে নানান দুনিয়ার খবর। ইন্টারনেটের কাছে যে স্বাস্থ্যের সতর্কতা রাখতে হবে এ আন্দাজ কেউ করেনি। তবে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে এবং একই সাথে আমাদের স্বাস্থ্য এবং কর্মদক্ষতার উপরও নজর রাখতে হচ্ছে।  প্রযুক্তিপণ্যের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির তথ্য যত বেশি পাওয়া যাবে তত সহজে সচেতনতার জন্য, সাবধানতার জন্য পদক্ষেপ নেয়া যাবে।

যন্ত্রের যন্ত্রণায় ঘুমকে বাঁচাতে যা করা যেতে পারে:

  • ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার সন্ধ্যায় সীমিত রাখা।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
  • বিভিন্ন কাজের মধ্যেঅগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে ডিভাইসে বুঁদ হয়ে না যাওয়া। এক্ষেত্রে বারবার সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ঢুঁ না মেরে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করা।
  • যন্ত্রের বাইরে জীবন উচ্ছ্বল– একথা মাথায় রাখা ও নিজের শরীর মনের সুস্বাস্থ্যের জন্য নিজেকে অনুপ্রাণিত করা। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে করতে দেরীতে ঘুমাতে যাবার চেয়ে বরং শীঘ্র ঘুমানোর নিয়ত করা যাতে সকালে উঠে ঢুঁ মেরে দেখে নেয়া যায়।
ইন্টারনেট যুগের সবচেয়ে ক্রমাগত ব্যক্তিগত সমস্যা সবদিকে মন গড়ানো। এটা মাথায় রাখুন, পৃথিবীর সব ঘটনা উপভোগ করার দরকার নেই, বরং সুস্থ থাকা উপভোগ করুন। আনন্দ সর্বোচ্চ উপভোগের জন্য সুস্থতা সবচেয়ে বড় শর্ত। | Image Source: gojessego.com

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইকোনমিক বিহেইভিওর এন্ড অর্গানাইজেশন গবেষণাপত্রে।

 

— ScienceAlert অবলম্বনে।

বেলুন চালিত ইন্টারনেট

সমগ্র বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনে প্রবেশ করতে পারে না। তাদের কথা ভেবে গুগল নিয়ে এলো বেলুন-চালিত নেটওয়ার্ক যা দূরবর্তী এবং ইন্টারনেটের পরিধির বাইরে অবস্থিত অঞ্চলগুলোর জন্য উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করবে।

এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত আছে বেশ কিছু টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, যারা বেলুনগুলোর এলাকায় ফোর-জি বেতার সংকেত প্রেরণ করবে। প্রত্যেকটা বেলুন তখন একেকটা ক্ষুদ্রাকৃতির টাওয়ারের মতো কাজ করবে। এগুলো তাদের চারদিকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত ডিভাইসগুলোতে নেটওয়ার্ক প্রেরণ করবে।

ইতোমধ্যে নিউজিল্যান্ডে সফলভাবে প্রকল্পটির পরীক্ষাকার্য সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে এই প্রকল্প বিস্তারের মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। বেলুনগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের অতিবেগুনী রশ্মিতেও টিকে থাকতে পারে।

featured image: goodtechgo.com

ইন্টারনেটের গতির মূল রহস্য কোথায়?

ধীরগতির ইন্টারনেট সংযোগের মতো হতাশাজনক আর কীইবা হতে পারে! একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে ইন্টারনেট গতির ব্যাপারে আমাদের সহনশীলতা প্রায় শূন্যের কোটায়। অথচ বেশি না, মাত্র ১৫ বছর আগেও ইন্টারনেটের কোনো সুবিধা নিতে গেলে হাতে ঘণ্টা কয়েক সময় নিয়ে বসতে হতো, ফেসবুকের পাতায় অলস সময়ক্ষেপণের চিন্তা তো বাদই দিলাম!

ডায়াল-আপ সংযোগের দিনগুলোয়, কম্পিউটার থেকে সংযোগ রিকোয়েস্ট পাঠাবার পর ঘণ্টাখানেক সময় কেবল সংযোগ স্থাপন হতেই চলে যেত। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিসেবটা এখন ২ – ১০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে নেমে এসেছে সাধারণ ব্যাবহারকারীদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো আসলে কীভাবে ঘটেছে? বেশ কিছু বিষয় আছে। সবচেয়ে বড় প্রভাবক অবশ্যই সংযোগ পদ্ধতির মাঝে ব্যাবহার করা তারের উপাদান অথবা প্রকৃতি।

এ লেখায় এ দিকটিই আলোচনা করা হবে। উল্লেখ্য এই লেখায় মূলত বহুল প্রচলিত ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং ডায়াল আপ সংযোগের মাঝে তুলনা করা হবে, যারা কিনা তারের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। তারবিহীন মাধ্যম যেমন ওয়াইফাই, হটস্পট ইত্যাদি এই লেখার পরিধির বাইরে।

চিত্রঃ আদি ডায়াল আপ সংযোগের ইন্টারফেস।

ডায়াল আপ সংযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ৫৬ কিলোবাইট প্রতি সেকেন্ড ছিল গড় সংযোগ গতি।  ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২-তে। উদাহরণস্বরূপ, একটি অডিও ফাইল নামাতে প্রথম ক্ষেত্রে ১০ মিনিট লাগলে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড লাগবে মাত্র।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে কপার তারের পরিবর্তে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাবহার করবার মাধ্যমে। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্রমশ উন্নতির ফলে দিনকে দিন গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে Technical University Of Denmark–এর একদল গবেষক অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে সেকেন্ডে ৪৩ টেরাবাইট ডাটা পাঠাতে সক্ষম হন। আমাদেরকে এক্ষেত্রে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি সম্পর্কে জানতে হবে। সেই সাথে কপার তারের সমস্যাগুলোও বর্ণনা করা হবে।

কপার তারের মাধ্যমে সংযোগ

আমরা জানি আধুনিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল, যেকোনো কিছুকে ০ এবং ১ এর মাধ্যমে প্রকাশ করে বার্তা পাঠানো হয়। কপার তার সংযোগ কাজ করতো বৈদ্যুতিক পালস পাঠাবার মাধ্যমে। তারের মধ্য দিয়ে যে পালস যেতো তা গ্রাহক প্রান্তে ধারণ করা হত তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন দ্বারা। একটি নির্দিষ্ট মানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “১” পাওয়া এবং একইভাবে নির্দিষ্ট মানের চেয়ে কম ক্ষেত্র ধারণ করার অর্থ “০” পাওয়া।

অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযোগ

অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণাটা বেশ সহজ। পাশাপাশি দুটো দেয়ালের মতো দুটো আয়না কল্পনা করা যাক। এখন একটি লেজার রশ্মি কৌণিকভাবে আয়নায় ফেললে তা বারবার প্রতিফলিত হয়ে সামনে এগোতে থাকবে। অপটিক্যাল ফাইবারে এই কাজটিই করা হয়, চুলের মতো সূক্ষ্ম একটি ফাইবার যা মূলত কাচ দ্বারা তৈরি তার মধ্যে আলো প্রবেশ করানো হয়, সেই আলো ফাইবারের ভেতর বারংবার পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের মাধ্যমে সামনে এগোতে থাকে।

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি, আলোক রশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি কোণে আপতিত হলে আপতিত আলোকরশ্মি আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

অপটিক্যাল ফাইবার কাচ দ্বারা তৈরি। সাধারনভাবে কাচ বলা যায়, কিন্তু আরেকটু ভালোভাবে বলতে গেলে এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যাবহার করা হয়, ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই- অক্সাইড দ্বারা গঠিত, এর বাইরে আরও একটি স্তর আছে। একে বলা হয় cladding। এর উপাদান- সিলিকন ডাই-অক্সাইড, সাথে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ। প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর প্রয়োজন হয় এতে। মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের গঠন।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অপটিক্যাল ফাইবার আকৃতিতে যেমন চুলের মতো সূক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপকতার দিক দিয়েও তাই। যেভাবেই বাঁকানো হোক, ভেতর দিয়ে পরিবাহিত আলোকরশ্মির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

 

সহজ কথায় কপার তারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ইলেকট্রনের প্রবাহ দ্বারা এবং অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তথ্য প্রেরণ করা হচ্ছে ফোটনের প্রবাহ দ্বারা। মূলনীতি ব্যাখ্যা করা শেষ, এবার আমরা কপার তার এবং অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি।

১. ব্যান্ডউইথ

সহজে বলতে গেলে কোনো channel বা মাধ্যম তার মধ্য দিয়ে যেসকল ফ্রিকোয়েন্সির তথ্য পাঠাতে দেয়, তা-ই হলো সেই মাধ্যমের bandwidth। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এটি প্রতি সেকন্ডে ১০ গিগাবাইট সাধারণত। এটি কপার তারের চেয়ে অনেক বেশি। আর যত বেশি bandwidth তত বেশি তথ্য পাঠানো সম্ভব।

কপার তারের ক্ষেত্রে বাহক হলো ইলেকট্রন আর অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে আলো বা ফোটন। কপার তারের মধ্য দিয়ে যে সিগন্যাল পরিবাহিত হবে তার গতি আলোর গতিবেগের ৫০% থেকে ৯৯% পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পার্থক্য-টা হয়ে যায় এই bandwidth এর ক্ষেত্রেই। Multiplexing নামক একটি প্রক্রিয়া দ্বারা ফাইবারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির সিগন্যাল পাঠানো যায়, অর্থাৎ এর bandwidth এর পরিধি অনেক বড়। কপার তারের মধ্য দিয়ে এত বড় bandwidth পাঠাতে গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমান attenuation বা অপচয় হয়। আলোর ক্ষেত্রে এটি হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ০ ফ্রিকোয়েন্সি থেকে শুরু করে প্রায় ১ গিগাহার্জ পর্যন্ত পরিধির bandwidth কপার তারের মধ্য দিয়ে বেশ অবিকৃতভাবে পাঠানো যায়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে এই পরিধি ১৭৫ টেরাহার্জ থেকে ২৫০ টেরাহার্জ পর্যন্ত, যা কপারের তুলনায় প্রায় ১ লক্ষ গুণ।

২. রিপিটারের প্রয়োজনীয়তা

বড় দূরত্ব অতিক্রম করতে গেলে সিগন্যাল অপচয় বা attenuate হবার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্ব পরপর রিপিটার নামক একটি ডিভাইস বসানো হয়। এটি সিগন্যালের নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি শক্তি যা বজায় না রাখলেই নয়, পুরো পথ জুড়ে তা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত সিগন্যাল দুর্বল হয়ে গেলে রিপিটার তা গ্রহণ করে শক্তি কিছুটা বর্ধিত করে একই সিগন্যাল আবার তার গন্তব্যের দিকে ছুঁড়ে দেয়। নিচের চিত্রটি লক্ষণীয়।

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবারের সাথে আরও কিছু মাধ্যমের তুলনা।

দেখা যাচ্ছে যে twisted pair copper cable এর ক্ষেত্রে রিপিটার স্পেসিং ২ কিলোমিটার। অর্থাৎ ২ কিলোমিটার পরপর রিপিটার ডিভাইস বসাতে হয়। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তা ৪০ কিলোমিটার অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটার পরপর রিপিটার বসালেই কাজ হয়ে যাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, এই রিপিটার ডিভাইসগুলোর দাম নেহায়েত কম নয়।

৩. আকৃতি, ওজন এবং দৃঢ়তা

চিত্রঃ অপটিক্যাল ফাইবার এবং কপার ক্যাবল

অপটিক্যাল ফাইবারের আরেকটি বড় সুবিধা হলো কপার তারের তুলনায় যথেষ্ট হালকা অথচ ৮ গুণ বল প্রয়োগ করে টানা হলেও ফাইবার ছিঁড়বে না। কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির আশেপাশে রাখা যাবে না- এরকম বাধ্যবাধকতা নেই আবার তাপমাত্রার প্রভাবও খুব বেশি নেই, সব দিক দিয়েই ইতিবাচক। কেবল দামের ব্যাপারটা ছাড়া, কপার সস্তা, অপটিক্যাল ফাইবার তুলনামুলকভাবে দামি। কিন্তু যত দামিই হোক কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া অন্য কিছুর ব্যাবহার অতটা জনপ্রিয় নয়, যেমন শরীরের ভেতরে কোনো পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে।

চিত্রঃ মেডিক্যাল ক্ষেত্রে ফাইবারের ব্যবহার।

তবে যেসকল ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কপার তারের সংযোগ দেয়া হয়ে গিয়েছে সেখানে নতুন করে অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ দেয়াটা বেশ খরচের। কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে আমরা যখন আরো দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে সামনের দিকে তাকাই, তখন অপটিক্যাল ফাইবার ছাড়া আর কোন শ্রেয় এবং সহজতর মাধ্যম বেছে নেয়ার সুযোগ নেই।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.scienceabc.com/innovation/fibre-optic-copper-faster-better-signal-transmission-bandwidth-speed-cost-fast.html
  2. http://www.abc.net.au/science/articles/2010/10/21/3044463.htm
  3. https://www.quora.com/What-determines-the-bandwidth-of-optical-fiber-versus-copper-wire