ক্ষমতাধর এক অঙ্গভঙ্গির সাতকাহন

আনন্দ বা খুশির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি। প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখার চেয়ে সুখের কিছু আর হয় না। প্রতিনিয়তই হেসে যাই কিন্তু কখনো কি এটি নিয়ে একটু প্রশ্ন করে দেখেছি? আমরা কেন হাসি? কেনই বা আমরা প্রিয় কারো হাসি দেখে খুশি হই?

যেকোনো ঘটনার পেছনেই থাকে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান হাসিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে?

হাসির আগমন

যখন কোনো প্রাণী তার মুখের মাংসপেশি শক্ত করে দাঁত বের করে, তখন বোঝা যায় সে অন্য কোনো প্রাণীকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। হতে পারে সে ভীত, কিংবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কিংবা সে ফাঁদে পড়েছে কিন্তু বের হতে পারছে না। বেশিরভাগ প্রাণী দাঁত বের করে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায় বা অন্য কোনো প্রাণীকে হুমকি দিতে চায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। যখন কেউ এক পাটি দাঁত বের করে আপনার দিকে তাকাবে, তখন নিঃসন্দেহে বুঝবেন তিনি হাসছেন।

ধারণা করা হয়, এই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি আসলে বিবর্তনের ধারায় এসেছে প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে। জেনিস পোর্টেয়াস নামের একজন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক গবেষণা করেছেন হাস্যরস ও হাসির বিবর্তন নিয়ে। তার মতে, উচ্চতর প্রাণী যেমন রেসাস বানরদের ক্ষেত্রে হাসির উদাহরণ দেখা যায়।

বানরদের কোনো দলের অধস্তন সদস্যরা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের প্রতি এরকম দাঁত প্রদর্শন করে। যখন তারা এমন কোনো স্থান দখল করে যেটা সেই ঊর্ধ্বতন বা প্রভাবশালী প্রাণীরা দখল করতে চায়। এই ভঙ্গি দিয়ে তারা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের মন পরিবর্তন করার চেষ্টা করে যেন কোনো ঝগড়া বা বিবাদ সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ কিছুটা হাসির মতো ভঙ্গিমা দিয়ে তারা একইসাথে কর্তৃত্ব মেনে নেয়া এবং কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বোঝায়। এই উদাহরণ দিয়ে মানুষের হাসির কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

আমাদের মাঝে অনেকেই ভয়ে কিংবা নার্ভাস থাকার সময় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। আবার অনেকসময় বাচ্চারা বকা খাওয়ার পরেও হাসি থামাতে পারে না। রেসাস বানর দলের সেই ঘটনা দিয়ে এই ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যায়। জেনিস পোর্টেয়াসের মতে, এই হাসিও বড়দের কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করে তোলার জন্যই।

চিত্র: প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে হাসির আগমন বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া বিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জিদের মতো উন্নত প্রাণীদের মাঝেও এরকম দাঁত বের করে হাসির মতো ভঙ্গি খুঁজে পেয়েছেন। এতে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় কীভাবে হাসি মানুষের মাঝে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে প্রকাশ পেলো।

হাসি কেউ জন্মের পর শেখে না, বরং এটাকে একটা প্রিপ্রোগ্রামড ব্যবহার বলা যায় যা কিনা বিবর্তনের মাধ্যমেই আমাদের মাঝে এসেছে, এর এক অন্যতম উদাহরণ হল, যেসব মানুষ জন্ম থেকেই অন্ধ, তারাও স্বাভাবিক মানুষের মতোই একই পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে হাসে।

হাসি কেন সংক্রামক?

ঘরভর্তি মানুষের মাঝে যদি কেউ হাসে, তাহলে দেখা যাবে, আশেপাশের প্রত্যেকে কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করছে। প্রতিটা মানুষই যেন চেতনভাবে কিংবা অবচেতনে হাসছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কেউ কারো দিকে তাকিয়ে হাসে তখন অপরপক্ষের ব্যক্তির মুখের কাঠিন্য বজায় রাখা কঠিন। কাউকে হাসতে দেখতে আমাদের মিরর নিউরন উদ্দীপিত হয়। মিরর নিউরন হলো মস্তিষ্কের বিশেষ এক ধরনের কোষ। ব্যক্তি নিজে কোনো কাজ করলে মস্তিষ্ক যেভাবে সাড়া দিতো, ঠিক একইভাবে সাড়া দেয় কাজটি কাউকে করতে দেখলে।

এর সাধারণ কোনো উদাহরণ দিলে দেখানো যায়, কোনো দুঃখী মানুষকে দেখে আমাদের সহানুভূতি তৈরি হয়, কিংবা কাউকে ভয় পেতে দেখলে কিছুটা ভয় আমাদেরকেও স্পর্শ করে। কাউকে হাসতে দেখলে মিরর নিউরনের প্রভাবে আমাদের মুখের পেশীর উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। না চাইলেও আমরা প্রিয় মানুষের হাসি দেখে নিজেদের অজান্তেই হেসে ফেলি। তাই হাসি সংক্রমিত হয়, এই কথাটি একদম বিজ্ঞানসম্মত।

তো এরপর থেকে মন খারাপ থাকলে হাসিখুশি মানুষের সাথে মিশুন। তাদের সাথে সময় কাটান। বিজ্ঞান বলছে, তাদের সংস্পর্শে আপনার মুখেও হাসি ফুটবে।

নেপথ্য বিজ্ঞান

যখন কেউ হাসে তখন কী পরিবর্তন ঘটে তার মস্তিষ্কে? একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। ধরুন, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। দেখলেন আপনার টেবিলের উপর রঙিন কাগজে মোড়া একটা উপহার। উপরে লেখা আছে প্রিয় কোনো মানুষের নাম। মুখের রেখা বদলে গিয়ে হাসি ফুটে উঠবে নিশ্চয়।

অপ্রত্যাশিত বা ভালো লাগার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে মস্তিষ্কের কর্টেক্স থেকে স্নায়ুর সংকেত যায় প্রথমে ব্রেইনস্টেমে। সেখান থেকে প্রক্রিয়া শেষে এই সিগন্যাল যায় মুখের স্মাইলিং মাসলে। মুখে তখন ফুটে ওঠে প্রথম হাসির রেখা। এই কাজটির পেছনে ভূমিকা রাখে এনডরদিন নামক এক উপাদান।

সেই হাসি আবার শুরু করে পজিটিভ ফিডব্যাক চক্র। যখন প্রথম স্মাইলিং মাসল কাজ করে, তখন মস্তিষ্কে আবার সিগন্যাল যায়। এটি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। ফলে আরো বেশি এনডরফিন নিঃসৃত হয়। সেটি আবার কাজ করে স্মাইলিং মাসলে। তারপর আবার সিগন্যাল যায় মস্তিষ্কে। এভাবে একটা চক্র চলতে থাকে। যখন আমরা হাসি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভালো অনুভব করে। ফলে আমরা আরো হাসি, এবং তাতে মস্তিষ্ক আরো সুখী হয়। এভাবে হাসি চলতে থাকে দীর্ঘ সময়।

যেহেতু হাসিতে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম উদ্দীপিত হয়, তাই একে তুলনা দেওয়া যায় হঠাৎ উপহার পাওয়া বা চকলেট খাওয়া কিংবা লটারি পাওয়ার মতো কোনো অনুভূতির সাথে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাসির মাধ্যমে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম ততটা উদ্দীপিত হওয়া সম্ভব যতটা হতে পারে ২ হাজারটি চকলেট কিংবা কয়েক লক্ষ টাকা পেলে।

সুখী হওয়ার জন্য টাকা কিংবা চকলেটের মতো জিনিসের প্রয়োজন নেই। আপনার প্রাণখোলা হাসিই পারে আপনাকে সেই আনন্দ দিতে। ‘কোটি টাকার হাসি’ কথাটার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলা যায়! তাই নিজেকে ভালো রাখতে হাসুন মন খুলে। এমনকি হাসি না পেলেও মিথ্যা হাসি হাসুন। এটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সচল করে আপনাকে এনে দিতে পারে ভালো লাগার অনুভূতি। জীবনে হাসিখুশি মানুষের সঙ্গ তাই খুব জরুরী।

নকল হাসি

আমরা যখন হাসি, তখন প্রধানত মুখের দুই ধরনের পেশী সক্রিয় হয়। একটি হলো জাইগোম্যাটিকাস মেজর মাসল। এটি গালের ঠিক দুই পাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটিই শুধু কাজ করে তখন সেটা আসলে সত্যিকারের হাসি নয়। একে সামাজিক হাসি বলা যায়। যেমন অপ্রিয় কোনো মানুষের সাথে দেখা হলেও ভদ্রতার খাতিরে আমরা যে ধরনের হাসি হেসে থাকি তা।

দ্বিতীয়টি হলো অরবিক্যুলারিস অক্যুলি মাসল, যা আমাদের চোখের চারপাশ ঘিরে থাকে। যখন আমাদের হাসিতে আন্তরিকতা থাকে, কিংবা আমরা সত্যিই খুশি হই, তখন এই মাসল কাজ করে। সেই হাসিই বিশুদ্ধ যে হাসিতে আমাদের চোখও হাসে।

চিত্র: সত্যিকারের হাসি এবং সামাজিক হাসিতে মুখের ভিন্ন ভিন্ন মাংসপেশি কাজ করে।

স্বাস্থ্যের উপর হাসির প্রভাব

গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তিকর অবস্থায় হাসিমুখে কাজ করা ইতিবাচক। কেননা, হাসি ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। আপনি যখন হাসিমুখে কাজ করবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন ভেবে নেবে আপনি ভালো আছেন এবং সুখী আছেন। ফলে আপনার মুড ভালো থাকবে, কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়বে, বাড়বে কর্মদক্ষতা।

বলা হয়ে থাকে, মন খুলে হাসলে শরীর এবং মন দুটোই অনেকটা সতেজ হয়। একে একটা ভালো ঘুমের পরের অবস্থার সাথে তুলনা দেয়া যায়। মানুষ যখন শিশুদের সংস্পর্শে থাকে, তখন অনেক বেশি সুখী অনুভব করে। কারণ বাচ্চারা বড়দের তুলনায় বেশি হাসে। ফলে তারাও হাসে। পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে এটি আমাদের মাঝে আরো পজিটিভ ইমোশন তৈরি করে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪০০ বার হাসে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হাসির সংখ্যা দিনে মাত্র ২০ বার।

বায়োকেমিক্যাল-এর দৃষ্টিকোণ থেকেও এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। ক্লান্তির ফলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। মানসিক অবসাদগ্রস্থতা থেকে শুরু করে স্থূলতা, হার্ট ডিসিসের মতো ভয়ংকর রোগের সূচনা করতে পারে এটি। হাসলে পরে হাসি সেই হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। তাছাড়া হাসি উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির ইতিবাচক কিছু প্রভাব আছে। নিউরোট্রান্সমিটার হলো কিছু শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান। এগুলো আমাদের শারীরিক, মানসিক এবং কগনিটিভ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

ঘুম, ব্যথা, ওজন এমনকি মানসিক অবস্থাও এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নিউরোট্রান্সমিটারের কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে স্থূলতা, অ্যালকোহল, ক্যাফেইন ও নিকোটিনের প্রতি আসক্তি, হতাশা, প্যানিক অ্যাটাক, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো আরো অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যেহেতু নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির কিছু প্রভাব আছে, তাই সাধারণ হাসিখুশি জীবন আপনাকে শারীরিক ও মানসিক অনেক ধরনের জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সব মিলিয়ে আপনার দীর্ঘজীবী হওয়ার পেছনে হাসির একটা বড় ভূমিকা আছে।

আপনার হাসিমুখ আপনাকে অন্যদের কাছে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আন্তরিক এবং আকর্ষণীয় করে তোলে। স্কটল্যান্ডের ফেইস রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক পরীক্ষায় একদল নারী এবং পুরুষকে কিছু মানুষের ছবি দেখিয়ে তাদের আকর্ষণীয়তার উপর রেটিং করতে বলা হয়।

দেখা যায়, ছবিতে যারা হাসিমুখে আছে তারা এগিয়ে আছে। যারা একদমই হাসেনি তাদের থেকে আকর্ষণীয়তার দিক থেকে বেশি রেটিং পেয়েছে। টিভিতে আমরা সেলিব্রিটিদের যেকোনো ইন্টারভিউ কিংবা অনুষ্ঠানে ঘন ঘন হাসতে দেখি। এতে তাদেরকে একইসাথে বেশি তারুণ্যময় ও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

মাদার তেরেসার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি। We shall never know all the good that a simple smile can do”। তাই হাসিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলুন। হাসুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.livescience.com/34056-evolution-smiling.html
  2. https://www.auraortho.com/a-brief-history-of-smiling-laughter/amp/
  3. https://sunwarrior.com/healthhub/15-health-benefits-of-smiling
  4. https://www.scientificamerican.com/article/how-did-the-smile-become-a-friendly-gesture-in-humans/
  5. https://www.pickthebrain.com/blog/the-science-behind-smiling/
  6. https://blog.bufferapp.com/the-science-of-smiling-a-guide-to-humans-most-powerful-gesture
  7. https://www.britishcouncil.org/voices-magazine/famelab-whats-science-behind-smile
  8. http://www.apa.org/monitor/oct05/mirror.aspx
  9. https://www.sciencedaily.com/releases/2016/02/160211140428.htm

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ঃ একজন বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবকের কথা

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট তার জন্ম। বাবা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মা ভুবনমোহিনী দেবী। সকলে তাকে ডাকতো ‘ফুলু’ নামে। প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা যেমন ছিলেন প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ কৃষ্টির অনুরাগী। ফলে ছোটবেলায় ঘরেই যখন প্রফুল্লচন্দ্রের জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় জমিদার ও তথাকথিত উচ্চ হিন্দু বংশের সন্তান হওয়া সত্বেও কখনো কোনরূপ গোঁড়ামি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

বাবার কাছ থেকে শেখা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ঔদার্যই তাকে পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি নিজের গ্রামেই বাবার একটি নিজস্ব লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তার জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণরূপে।

স্থানীয় পড়াশুনোর পাট শেষ হবার পর তাকে ভর্তি করা হলো কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না থাকায় এর দুই বছর পরেই রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হলেন। ফলে বিরতি পড়লো পড়াশোনায়। বিরতির পর তিনি ভর্তি হলেন কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলবার্ট স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদ্যাসাগর কলেজ (তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ) থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

যুবক বয়সে প্রফুল্লচন্দ্র

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি এরপর গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পাড়ি জমান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। সেখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা শীর্ষক একটি রাজনৈতিক গবেষণামূলক বই লেখেন।

এ থেকে দেখা যায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক জ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছয় বছর পর তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি অর্জন করেন। এর আগে মাত্র একজন বাঙালি এই উপাধি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ডাঃ অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে তার জ্ঞানসাধনা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন-

আমি যখন এডিনবরাতে পড়তাম India & British Rule নামে একটি বই লিখেছিলাম। ফলে লর্ড বায়রনের মতো Awoke one fine morning and found myself famous এইরকম ভাবে রাজনীতির চর্চা করেছি, নানা প্রকার বই লেখার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি

দেশে ফিরেই তিনি শুরু করেন তার কর্মযজ্ঞ। প্রথমেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি গবেষণা চালাতে থাকেন। প্রথম গবেষণার ফল বের হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মারকিউরাস নাইট্রাইট।

নাইট্রাইট যৌগসমূহ খুব বেশি একটা স্থায়ী হয় না। এজন্যে তিনি সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী নাইট্রাইট তৈরির উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল। এ কাজের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন এই বলে-

বিসম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

বাঙালির নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত ধাতব নাইট্রাইটের উপর তার গবেষণা বিভিন্ন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতব যৌগ আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। ভৌত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল আমরা দেখতে পাই তার গবেষণাপত্রের মান এবং তার সংখ্যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেশি বিদেশি নামকরা জার্নালে তার মোট গবেষণাপত্র ১০১টি।

একজন গবেষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র যেরকম অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনই শিক্ষক হিসেবেও স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের হৃদয়ে। নিজের ছাত্রদের তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং খুব আনন্দঘন উপায়ে জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলিকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-

গবেষণারত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়


প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানতঃ নিচের ক্লাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমতো আকার দিতে পারে
, হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোনো নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান দিতাম না।

কেবলমাত্র তার নিজের যশ খ্যাতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। পাশাপাশি তৈরি করেছেন এক দল দক্ষ ছাত্র ও সহকারী গবেষক, যারা তার কাজে যুগপৎ সাহায্য করেছেন এবং পরবর্তীতেও নিজেদেরকে স্বাধীন ও প্রকৃষ্ট গবেষক রূপে গড়ে তুলেছেন। নীলরতন ধর, রসিকলাল দত্ত, পঞ্চানন নিয়োগী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নামজাদা বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দ্বারাই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ডিগ্রির দিকে না তাকিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন একজন ছাত্রের গবেষণার প্রবৃত্তি ও উৎসাহের উপর। তার একজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে তিনি এমাইন নাইট্রেট আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ শ্রীযুক্ত রক্ষিত নামের এই সহকারীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার গবেষণার সুপ্ত প্রতিভা প্রফুল্লচন্দ্র ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাকে পরবর্তী গবেষণার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন আর এইখানেই ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের সার্থকতা।

১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অবসর নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যতদিন তিনি অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তিনি এক কপর্দক বেতন নেননি। এ অর্থ সঞ্চিত থাকতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সব সময় তার ছাত্রদের নিজের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করতেন। জাগতিক কোন কিছুর প্রতি তার কোন লোভ ছিল না কখনোই।

চিত্র: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মাঝে উপবিষ্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সর্ব ডানে বসা সত্যেন্দ্র নাথ বসু, সর্ব বামে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ সাহা।

শুধুমাত্র গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখেননি। জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে তার অর্জিত সকল অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিরূপে নিয়োগ করেছিলেন দেশের কাজে। যেখানেই দারিদ্র্য, বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ সেখানেই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমগ্র বিশ্বই ছিল তার সংসার। তাই তিনি বৈরাগ্যের মধ্যেই নিজের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজের স্থান করেনিয়েছিলেন।

তখন ছিল ইংরেজ শাসনামল। শাসকের অধীনস্ত হয়ে কখনো তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। এর স্বরূপ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশকৃত বঞ্চনাকর রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে। ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতা টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র ও যোগদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন-

আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।

এছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুরাগী ছিলেন। দেশজ পণ্য ব্যবহারের জন্য যে আন্দোলন তখন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে প্রফুল্লচন্দ্র ও একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর খাতায় তাকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ নামে ডাকা হতো।

পাশ্চাত্যের অনেক আগে, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন মুনি ঋষির হাত ধরে বিজ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্রকে এ বিষয়টি আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। তাই তিনি সেই বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা হিন্দু রসায়নের ক্রমবিবর্তনকে লিপিবদ্ধ করবার উদ্যোগ নেন।

১৯০২ এবং ১৯১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘আ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ বা ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’। এটি তার অসামান্য কীর্তি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পুঁথিপত্রের উপর বিস্তর গবেষণা করে এ গ্রন্থ টি রচনা করেন। পুরো ভারতবর্ষ, নেপাল ও লন্ডনের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এ গ্রন্থ লেখবার দুষ্প্রাপ্য ও প্রয়োজনীয় পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি সংগ্রহ করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর শোকসভায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধী

বইটির উপর একটি আলোচনা মূলক প্রবন্ধে এক গবেষকগণ মন্তব্য করেন-

In this book he showed from an unbiased scientific standpoint, how much the knowledge of acids, alkali, metals, and alloys proceeded in different epochs of Indian history. He showed that, the science of metallurgy and of medicine had advanced significantly in ancient India; when Europe was practising alchemy, India was not far behind.

বইটির প্রশংসা করে তৎকালীন প্রখ্যাত রসায়নবিদ মারসেলিন বার্থেলো স্বয়ং চিঠি লিখেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। সে সময়ে বিশেষত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধির কথা জানানোর জন্যে বার্থেলো প্রফুল্লচন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান।

চিত্র: আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রির সম্মুখপট

এতক্ষণ যে প্রফুল্লচন্দ্রের কথা বললাম তিনি একজন গবেষক, বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা, ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু তিনি একজন গুণী শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। অসাধারণ বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অধিকারীও ছিলেন।

মাত্র আটশ টাকা মূলধনে আপার সার্কুলার রোডের একটা ছোট ঘরে প্রফুল্লচন্দ্র গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিটিউক্যালস ওয়ার্কস। প্রচণ্ড ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুললেন, যার মূলধন ছিল মাত্র ৮০০ টাকা, তার পরিমাণ আজকে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি টাকার কাছাকাছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সততাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। আজকে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের (বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের) পুঁজি-মূলধন নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায়। এই হতাশায় প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শ আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রফুল্লচন্দ্র অধ্যাপনা থেকে ৭৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। জ্ঞান চর্চাকেই তিনি তার জীবনের সাধনা ও একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি কখনো বিয়ে করেননি। এক হতে বহুত্বে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, উপনিষদের এই বাণীকে তিনি তার জীবনের পাথেয় করেনিয়েছিলেন। তাই সর্বদা মানুষের কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনমানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অধ্যাপক থাকার সময় ডক্টর কুদরত-ই-খোদা এম.এস.সিতে প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে তাকে প্রথম স্থান না দেবার জন্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে সুপারিশ করলে তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জাতিভেদ প্রথায়ও বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রাচীন ভারতে হিন্দু রসায়ন চর্চা তথা বিজ্ঞান সাধনার এত সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনি জাতিভেদ প্রথাকেই দায়ী করেছিলেন।

তার বইতে দেখিয়েছিলেন যাদের কাছে বিজ্ঞানের হাতে-কলমে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে যখন জ্ঞান চর্চা থেকে বিরত রাখা হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানের বিস্তারের দরজা সংকীর্ণ হতে থাকে।

জীবন যাপনে তিনি ছিলেন একদম সাদামাটা। এক পয়সার বেশি সকালের নাশতার পেছনে ব্যয় করলে রেগে যেতেন। জামাকাপড়ও খুবই সাধারণ মানের পরতেন। অনেক মানুষ এত বড় অধ্যাপকের পোশাক দেখে অবাক হয়ে যেতো।

তার অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত বিভিন্ন কলেজ, মানবকল্যান সংস্থা, দরিদ্র তহবিল, বিজ্ঞান সংগঠন প্রভৃতির প্রতি। সে সময় বাংলায় স্থাপিত এরকম কোনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তার অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আর.কে.বি.কে হরিশ চন্দ্র ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল)। নিজের গ্রামে তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। বাগেরহাট পিসি কলেজও তারই কীর্তি।

সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। একাধারে একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, বিপ্লবী দেশপ্রেমিক, অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯৪৪ সালের ১৬ ই জুন ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পুরো জীবনটি এক অনির্বচনীয় প্রেরণার উৎস। তার প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধা অর্থপূর্ণ হবে তখনই যখন আমরা তার জীবন দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাব। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি একজন সত্যিকার জ্ঞানতপস্বীর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

১. আত্মচরিত- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

২. আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র – শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু

৩. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবনবেদ- নন্দলাল মাইতি

৪. পাইকগাছা ও কয়রা থানার স্মরনীয় ও বরণীয় যারা- সম্পাদনা-শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

৫. P. C. Ray, “Life and experiences of a Bengali chemist,” 2 vols. Calcutta: Chuckervertty, Chatterjee & Co. 1932 and 1935

স্বপ্ন : এক রহস্যময় জগত

পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে কীনা স্বপ্ন দেখে না।সব মানুষই স্বপ্ন দেখে।আবার একেকজনের স্বপ্নের ধরনও একেকরকম।আজকে একটা ভালো স্বপ্ন দেখলেন তো কালকে হয়তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখবেন।আজকে যদি দেখেন পাহাড়ে উঠে মাস্তি করতেছেন তাহলে কালকে হয়তো দেখবেন পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছেন।আজকে সালমান খানের সাথে নাচছেন তো কালকে হয়তো ভুতের তাড়া খাচ্ছেন।

এরকম প্রায় প্রতিরাতেই আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি।কোন স্বপ্ন সুখের আবার কোনো স্বপ্ন দুঃখের।স্বপ্ন নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।স্বপ্নের ব্যাপারটা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপরি বুঝে উঠতে পারেননি।এ নিয়ে এখনো চলছে বিস্তর গবেষণা।

স্বপ্ন কী, আমরা কেনো স্বপ্ন দেখি,আজকে এই স্বপ্ন দেখলাম তো কালকে ঐ স্বপ্ন দেখলাম কেনো,ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আমাদের মনে ঘুরপাক খায়।এই লেখাই আমরা চেষ্টা করবো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে।চলুন শুরু করা যাক।স্বপ্ন আসলে জিনিসটা কী?এটা খাই না মাথায় দেই?এই প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রথমে জানবো।আমাদের এনসাইক্লোপিডিয়া অর্থ্যাৎ উইকিপিডিয়া বলে, “স্বপ্ন মানুষের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবেচেতনভাবে অনুভব করে থাকে।”

তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে স্বপ্ন হলো আমাদের কিছু কল্পনার সমষ্টি যা আমরা ঘুমন্ত অবস্থাই দেখে থাকি।অনেকে বলে থাকেন স্বপ্ন হলো আমাদের জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কল্পনা যা আমরা করে থাকি।ক্যালভিন এস হল ১৯৪০-১৯৮৫ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে একটি গবেষণা করেন।এই গবেষণা থেকে তিনি সিদ্বান্তে পৌছেন যে, সমগ্র বিশ্বের মানুষ প্রায় একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং প্রায় সব স্বপ্নের বিষয় গতদিন বা গত সপ্তাহের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকে।

image source: thegood.co

অনেক সময় দেখা যায় সারাদিন আমরা যে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেছি তা নিয়েই স্বপ্ন দেখছি।এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, মানুষ যখন কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভাবতে থাকে তখন সে ভাবনার ক্ষরিত রূপ তার মস্তিষ্কে থেকে যায়।ঘুমালেও এই ভাবনার প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে ও তা স্বপ্ন হিসেবে প্রকাশ পায়।

তো কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি?এটা খুবই কমন প্রশ্ন যে কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি।কিন্তু এর উত্তরটা প্রশ্নের মতো এতটা সহজ নয়।কারণ স্বপ্ন নিয়ে গবেষনা এতটা সহজসাধ্য নয়।স্বপ্ন দেখার কারণ সম্বন্ধে কয়েকটি হাইপোথিসিস রয়েছে।যেমনঃ আমরা স্বপ্ন দেখি আমাদের অজানা ইচ্ছা ও চাওয়া গুলোকে জানার জন্য।আবার অনেকের মতে স্বপ্ন ঘুমের REM (Rapid Eye Movement) স্তরে মস্তিষ্কের অতি সক্রিয়তার কারণে হয়ে থাকে।

স্বপ্ন আমাদের অনেকের ভয়ের কারণ হয়েও দাড়ায়।কারণ আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে থাকি।তবে এই স্বপ্নের কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও হয়েছে।পর্যায় সারণির মূল ভিত্তিটা এসেছে স্বপ্নের মাধ্যমে।পর্যায় সারণির উদ্ভাবক দিমিত্রি ইভানোভিচ মেন্ডেলিফ একদিন পর্যায় সারণি নিয়ে গবেষণা করতে করতে তার ডেস্কেই ঘুমিয়ে পড়েন।তখন তিনি স্বপ্নে মৌলগুলোর বিন্যাস কৌশল দেখতে পান।

ঘুম ভাঙার পর তিনি তা একটি কাগজে লিখে ফেলেন।এটারই সংশোধিত রূপ আজকের পর্যায় সারণি।এ সম্বন্ধে মেন্ডেলিফ বলেন, ‘স্বপ্নে আমি দেখলাম একটা ছকে সবগুলো উপাদান জায়গামতো বসে যাচ্ছে এবং ঘুম ভাঙার সাথে সাথে একটি কাগজে আমি তা লিখে ফেলি’।

আবার বেনজিন চক্রও এসেছিল স্বপ্নের মাধ্যমে।১৮৬৫ সালে বিজ্ঞানী অগাস্ট কালকুলেল গবেষণা করতে করতে তার চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েন।স্বপ্নে তিনি দেখতে পান একটি সাপ চক্রাকারে ঘুরছে ও নিজের লেজ খেয়ে ফেলছে।সাপটির গায়ে তিনি কার্বন ও হাইড্রোজেনের সঠিক অনুপাত দেখতে পান।ঘুম ভাঙার পর এ থেকেই তিনি বের করে ফেলেন বেনজিন চক্র।

image source: dreams.co.uk

বিখ্যাত গণিতবিদ রামানুজান আচার্য দাবি করেন তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে গণিতের নতুন নতুন সুত্র পেয়ে যেতেন।তিনি বলেন, ‘ঘুমানোর সময় আমার অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়।আমি দেখছিলাম রক্তে বয়ে যাওয়া লাল একটি পর্দা যাতে হঠাৎ করে একটি হাত এসে লেখতে শুরু করলো।হাতটি উপবৃত্ত সম্পর্কিত কিছু যোগজও লিখলো।জেগে উঠার পর যত দ্রুত সম্ভব আমি তা একটি কাগজে লিখে ফেললাম’।

এরকমভাবে আমরা স্বপ্নে অনেক সময় অনেক কিছু দেখে থাকি যা আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত।সেসব স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও হয়ে থাকতে পারে।

স্বপ্ন মানুষের কাছে সবসময়ই রহস্যময়।এ নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ সবসময়ই প্রকট ছিল।আগে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা তেমন একটা করা যায়নি।তবে বর্তমানে বিভিন্ন সুবিধার কারণে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা খুবই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।আশা করা যায় খুব দ্রুতই আমরা স্বপ্নের রহস্য উদঘাটন করতে পারবো।

আজকে এই পর্যন্তই।সবাই ভালো থাকবেন এবং জিরো টু ইনফিনিটির সাথেই থাকবেন।

তথ্যসুত্রঃ ১) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dream

২) https://bn.m.wikipedia.org/wiki/স্বপ্ন

৩) https://www.medicalnewstoday.com/articles/284378.php

৪) https://psychologytoday.com/blog/sleep-newzzz/201501/why-we-dream-what-we-dream

৫) https://www.roarbangla.com/tech/science/the-deduction-of-dream/

featured image: viralnovelty.net

ডি ব্রগলীর কণা-তরঙ্গ দ্বৈততাঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে এক বিরাট লাফ

লুই ডি ব্রগলী ভৌতবিজ্ঞানের জগতে যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী প্রদান করে গেছেন, তা যদি আমাদের বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে প্রকাশ করা হতো, তবে শিরোনামটা বোধহয় এমনই হতো। পুরো পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত, বারংবার পরীক্ষিত ও প্রমাণিত তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন তত্ত্ব প্রদানের ঘটনা খুব কমবারই ঘটেছে।

আর যখনই তা ঘটেছে, তা হয়েছে যুগান্তকারী। কিন্তু, ডি ব্রগলী ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে। তিনি যুগান্তকারী তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে আরেক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার লুই ডি ব্রগলী কী করেছিলেন তা জেনে নেয়া যাক।

পরমাণুর বস্ত্রহরণের যে বিপ্লব উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে শুরু হয়েছিল, তাতে ১৯৯৮ সালে জে জে থমসন তার পরমাণুর মডেল প্রস্তাব করেন এবং বলেন, পরমাণুতে একটি ধনাত্বক চার্জিত পাত্রের মাঝে ঋণাত্বক চার্জিত ইলেকট্রন বিক্ষিপ্তভাবে থাকে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে জাপানি পদার্থবিদ হ্যানতারো নাগাওকা সর্বপ্রথম “কক্ষীয়” পরমাণুর ধারণা দেন। ইলেকট্রনগুলো পরমাণুতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থেকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদিক্ষণ করে, এই কথা তিনিই সর্বপ্রথম বলেন।

তবে তার তত্ত্বে নিউক্লিয়াসের ধারণা অনুপস্থিত থাকায় তা বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। কিছুদিনের মাঝেই নাগাওকার অনুরূপ তত্ত্ব প্রদান করে এবং নিউক্লিয়াসের ধারণা দিয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করেন বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড। [1]

রাদারফোর্ডের মডেল অনেক ঘটনার সফল ব্যাখ্যা দিলেও চিরায়ত বলবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল কিছুদিনের মাঝেই বাতিল হয়ে যায়। কারণ চিরায়ত বলবিদ্যারই অন্যতম অনুষঙ্গ “ম্যাক্সওয়েলের তাড়িতচৌম্বকীয় তত্ত্ব” রাদারফোর্ডের মডেলে প্রয়োগ করলে, রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে পরমাণুর স্থায়ীত্বের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

এরপর ১৯১৩ সালে গুরু রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলকে বাঁচানোর জন্য নীলস বোর পরমাণুর অভ্যন্তরে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করেন। এতদিনের প্রতিষ্ঠিত তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলিকেও তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। বলে দেন, ওসব নিয়ম পরমাণুর অভ্যন্তরে খাটবেনা। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব উঠে যায়।

চিত্রঃ শনি গ্রহকে ধনাত্বক আধান ও শনির বলয়কে ইলেকট্রনের কক্ষপথ ধারণা করে সর্বপ্রথম কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা দেন বিজ্ঞানী হ্যানতারো নাগাওকা।

কিন্তু, এই ধন্য ধন্য রব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্ণালীর মিহিগড়ন(Fine structure), জিম্যান ক্রিয়া, স্টার্ক ক্রিয়া ইত্যাদি ব্যাখ্যায় অপারগ হওয়ার পর বোর পরমাণু মডেলকে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হতে হয়। তারপরেও ১৯১৬ সালে ইলেকট্রনকে কণা ধরে কক্ষীয় পরমাণুতে শেষবারের মত হাত দিতে মঞ্চে আসেন বিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফিল্ড।

সমারফিল্ড নতুন দুইটা কোয়ান্টাম সংখ্যা যোগ করলেও তার পক্ষে কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।[2] কক্ষীয় পরমাণুর সব আয়োজন ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী লুই ডি ব্রগলী।

লুই ডি ব্রগলী আসলে যে কাজ করেছিলেন তা এতটাই প্রথাবিরোধী ও সাধারণ চিন্তাবিরোধী ছিল যে, তার গবেষণাপত্র অনুমোদনের জন্য যে ৩ জন অধ্যাপক দায়িত্বে ছিলেন, তারা সেই গবেষণাপত্রের কিছুই বুঝতে পারেন নি।

তার গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নিকট পাঠানো হলে আইনস্টাইন তা স্বীকৃত দেন এবং আইনস্টাইনের স্বীকৃতি লাভের পর লুই ডি ব্রগলী পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।[3] লুই ডি ব্রগলীর কাজটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক শতাব্দী পূর্বে, ‘আলো কি কণা? নাকি তরঙ্গ?’ বিষয়ক ঐতিহাসিক বিতর্কে।

আইজ্যাক নিউটন বললেন আলো হলো কণা, তার সমসাময়িক ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন তা মানলেন না, বললেন আলো তরঙ্গ। টমাস ইয়াং তো তার বিখ্যাত দ্বিচিড় পরীক্ষার মাধ্যমে আলোর ব্যতিচার ঘটিয়ে সুস্পষ্ট দেখিয়ে দিলেন যে, আলো তরঙ্গ। বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলও কিছু ধারণা সংস্কার করে তরঙ্গ পথের অনুসারী হলেন। আবার আলোক তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কিত পরীক্ষার মাধ্যমে হার্জ প্রমাণ করলেন আলো হলো কণা।

বিতর্কের যখন এই অবস্থা, তখন সব পথ – সব মত উপেক্ষা করলেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। প্ল্যাঙ্ক ফিরিয়ে আনলেন আলোর কণা তত্ত্বকে, তবে সংস্কার করে। বলা যেতে পারে আলোর কণা তত্ত্বকে বাদ দিয়ে প্যাকেট তত্ত্ব চালু করলেন, যা আমরা আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে জানি। আইনস্টাইন তা মেনে নিয়ে বললেন, আলোর তরঙ্গমুখ অসংখ্য কণা দ্বারা গঠিত বলে কল্পনা করা যায়। অর্থাৎ, আইনস্টাইন নিয়ে আসলেন আলোক তরঙ্গের কণাধর্ম। এই তত্ত্বটিই বিজ্ঞানী মহলে “The particle nature of light wave” নামে পরিচিত। [4]

আলো কণা নাকি তরঙ্গ বিতর্কের এই অবস্থায় মঞ্চে প্রবেশ করলেন ডি ব্রগলী। তিনি ভাবলেন, তরঙ্গের কণাধর্ম যদি থেকে থাকে তবে কি কণারও তরঙ্গধর্ম থাকতে পারে? প্রথমেই তিনি এই ধারণা প্রকাশ করেন নি। পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রনকে তিনি কোনো কণা কল্পনা না করে স্থির তরঙ্গরূপে কল্পনা করলেন। ব্রগলী বললেন, পরমাণুতে ইলেকট্রনের আবদ্ধ যাত্রাপথের পরিধির মান হবে, ইলেকট্রনের সাথে জড়িত সেই স্থির তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর পূর্ণগুণিতক।

এর ফলে হিসাব করে যা পাওয়া গেল, তা পরীক্ষালব্ধ মানের সাথে একদম মিলে যায়। আবার বোর তার পরমাণু মডেলে যে তথ্যগুলি স্বীকার্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন, সেটার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ডি ব্রগলীর অনুমান থেকে পাওয়া গেছিল। বড় কথা হল ইলেকট্রনকে তরঙ্গরূপে চলমান ধরলে তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলি অস্বীকার করা লাগেনা।

রাদারফোর্ড ও বোর যেভাবে বলেছিলেন যে, ওসব নিয়ম খাটবে না, তা ডি ব্রগলীকে বলতে হয়নি। কারণ চার্জিত কণা শক্তি বিকিরণ করে মন্দনপ্রাপ্ত হলেও তরঙ্গের ক্ষেত্রে শক্তি বিকিরণ করে তার বেগ মন্দনপ্রাপ্ত হয় না। তাই স্থির তরঙ্গের এই মডেল তাড়িতচৌম্বকের নিয়মে আক্রোশ থেকেও মুক্ত ছিল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার বিজ্ঞানী “লুইস ভিক্টর পিয়্যেরে রেইমন্ড ৭ম ডিউক ডি ব্রগলী”

ইলেকট্রনে এমন একটি স্থিরতরঙ্গ জড়িয়ে দিয়ে সফলতা লাভের পর ডি ব্রগলী চলে গেলেন যেকোনো বস্তুতে। বললেন, আমাদের সাথে এমনকি সবকিছুর সাথেই নাকি একটা তরঙ্গ আছে। প্রতিটি জড়বস্তুতে জড়িত এই তরঙ্গকে ডি ব্রগলীর তরঙ্গ বা বস্তু তরঙ্গ বা ম্যাটার ওয়েভ বলা হয়। ডি ব্রগলীর এই বক্তব্য শোনার পর থেকে দর্শনবাদী আর প্রমাণবাদীরা চিৎকার করে উঠলেন, প্রমাণ চাই! প্রমাণ চাই! বলে।

ডি ব্রগলী অঙ্ক কষে দেখালেন যে, যেকোনো গতিশীল বস্তুতে এই স্থিরতরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান হচ্ছে h/p. যেখানে h হচ্ছে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক এবং p হচ্ছে গতিশীল বস্তুটির ভরবেগ। এখানে ব্যবহৃত প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক h এর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা দেখি, যা নিয়ে চলাফেরা করি তাতে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান এতই ছোট যে, জাগতিক কোনো যন্ত্রের সাহায্যে তা পরিমাপ করা সম্ভব না। তাহলে কি পরবর্তীতে ডি ব্রগলীর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি?

অবশ্যই প্রমাণিত হয়েছে। অণু-পরমাণুর ক্ষুদ্র জগতে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান তাদের সাপেক্ষে বৃহৎ হওয়ায় তা অনুভূতিগ্রাহ্য হয়। ডি ব্রগলী তার তত্ত্বের একটি প্রমাণ প্রস্তাব করেছিলেন। তরঙ্গের ধর্ম হচ্ছে সরু ছিদ্র বা তীক্ষ্ণ ধারের পাশ দিয়ে যাবার সময় তরঙ্গের অভিমুখ কিছুটা বিচ্যুত হয়ে যায়। তরঙ্গের এই ধর্মের নাম অপবর্তন। এটা শুধু তরঙ্গের ক্ষেত্রেই হয়, কণাদের ক্ষেত্রে এরকম হয় না। ডি ব্রগলী তাই ইলেকট্রনকে সরু কোনো ছিদ্রের মধ্য দিয়ে পাঠিয়ে তার অপবর্তন হয় কি না তা দেখতে চেয়েছিলেন।

যদি অপবর্তন ঘটে তবে ইলেকট্রন তরঙ্গ; না ঘটলে ইলেকট্রন একটি কণা। এর কিছুদিনের মাঝেই বিজ্ঞানী এলেসার বিভিন্ন কেলাসের অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রন পাঠিয়ে অপবর্তন পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি পরীক্ষা করতে পারেন নি। শেষে ১৯২৭ সালে ডেভিসন ও লেস্টার জারমার এবং স্বতন্ত্রভাবে জর্জ পেজেট থমসন এই পরীক্ষা করে দেখলেন ইলেকট্রন সত্যি সত্যিই অপবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ ইলেকট্রনেরও তরঙ্গধর্ম রয়েছে এবং ডি ব্রগলীর কথাও সঠিক![5]

আইনস্টাইন বলেছিলেন, তরঙ্গ কণার ন্যায় আচরণ করতে পারে। ডি ব্রগলী পরে বললেন, কণাও তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ কণা-তরঙ্গের দ্বৈতাদ্বৈত রূপ ডি ব্রগলীই প্রথম সার্থকভাবে তুলে ধরেছিলেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি মজবুতকরণে তার এই সাহসী পদক্ষেপের তাৎপর্য বিশাল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার পরীক্ষামূলক প্রমাণ দানকারী বিজ্ঞানী ক্লিনটন ডেভিসন(বামে) ও লেস্টার জারমার(ডানে)

ইতিহাস অনেক রসিক। স্যার জে জে থমসন ইলেকট্রন নামক কণা আবিস্কার করেছিলেন এবং গ্যাসের তড়িৎ পরিবাহীতার উপর উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। আবার তারই পুত্র জে পি থমসন ইলেকট্রনকে তরঙ্গ প্রমাণ করে ডেভিসনের সাথে যৌথভাবে ১৯৩৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ইলেকট্রনকে কণা প্রমাণকারী পিতা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯০৬ সালে,[6] ৩০ বছর পর পুত্র নোবেল পুরস্কার পেলেন ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম প্রমাণ করে।[7]

চিত্রঃ লুইস ডি ব্রগলীর তত্ত্ব অনুসারে সংশোধিত নীলস বোরের পরমাণুর মডেলের চেহারা, এটি তরঙ্গ বলবিদ্যা পরমাণু মডেল বলেও পরিচিত।

লুই ডি ব্রগলীও বাদ যাননি! ১৯২৭ সালে প্রমাণিত হবার পরপরই ১৯২৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে তিনি নোবেল লাভ করেন।[8] কণা আর তরঙ্গের মাঝের সকল বিভেদ দূর করে কণা-তরঙ্গকে মিলেমিশে একাকার করে দিয়ে গেছেন লুই ডি ব্রগলী। সাথে সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে ডি ব্রগলী নিজেও একাকার হয়ে গেছেন।

তথ্যসূত্রঃ

[1] 22-23, Atomic model- Nagaoka’s Saturnian Model, Compendium of Quantum Physics, Book 2009. (http://www.link.springer.com)

[2] ৩য় অধ্যায়-উৎকেন্দ্রিক সমারফিল্ড, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[3] ৪র্থ অধ্যায়-দ্বৈততার রূপকার, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[4] http://www.reference.com/science/meant-dual-wave-particle-nature-light-52b1a5ca6b8c8e5c

[5] http://www.en.wikipedia./wiki/Davisson-Germer_experiment

[6] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1906

[7] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1937

[8] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1929

feature image: sciencenews.org

ফটো ফিফটি ওয়ানঃ একের পর এক নোবেল পুরস্কার এসেছে যে ছবির হাত ধরে

যদি বিখ্যাত কোনো স্থিরচিত্র বা ছবির কথা কল্পনা করতে বলা হয় তাহলে আপনার মনে হয়তোবা ছবিই ভাসবে। যেমন সেই আফগান নারীর বিস্ময়কর মায়াবী সবুজ চোখ অথবা খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করা সেই আফ্রিকান শিশুর কথা। কিংবা এমনই আরো অনেক কিছু।

কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোনো একটা ছবির অবদান আধুনিক বিজ্ঞান জগতে কতটুকু হতে পারে? এমনকি সেই ছবির জন্য নোবেল দেওয়ার কথা পর্যন্ত উঠতে পারে? কোনোটার একটাও যদি কখনো কল্পনা করে থাকেন তাহলে আপনাকে এই লেখায় স্বাগতম।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘ফটো ৫১’? বিজ্ঞান জগতে কেন এর এত গুরুত্ব যার জন্য নোবেল পুরষ্কারের কথা পর্যন্ত উঠবে? কেমন দেখতে এই ফটো? এর পেছনে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ ক্ষোভ আর লজ্জা।

অবদানের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই এটুকু অন্তত বলতে পারি, এই ফটো ৫১ যদি ঐ সময়ে তোলা না হতো তাহলে জীববিজ্ঞানের উন্নতি অনেক পিছিয়ে যেতো। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আজ যে মহীয়সী রূপ তা সম্পন্ন হতে আরো অনেক বছর পার হয়ে যেত। কারণ এই ছবি ব্যতীত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের পক্ষে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল দেয়া সম্ভব ছিল না।

এই মডেল প্রদান করেই এরা পরবর্তীতে মরিস উইলকিন্সের সাথে ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে। কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফটো ৫১ এর আসল যে কারিগর, সেই মহীয়সী নারীর ভাগ্যে কী হয়েছিলো? এখানে সে সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করবো।

ফটো ৫১ সম্বন্ধে জানার আগে যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটি তোলা হয়েছিল সে সম্বন্ধে জানা উচিৎ। পদ্ধতিটির নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। সাধারণ ছবি তোলার জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয় এটি তারই মতো তবে এর প্রক্রিয়া খানিকটা জটিল।

নামে যেহেতু এক্স-রে কথাটি আছে তার মানে বুঝতে হবে এখানে এক্স-রে নিয়ে কিছুটা হলেও কারিকুরি আছে। রাদারফোর্ড যে প্রক্রিয়ায় তার পরমাণু মডেলের পরীক্ষা করেছিলেন এটিও অনেকটা সেরকমই। রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় আলোক উৎস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আলোক উৎস হিসেবে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ক্রিস্টালের গঠন নির্ণয় করার জন্য পদার্থের স্ফটিকের উপর উৎস থেকে এক্স-রে ফেলা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের আলোক সংবেদনশীল পদার্থের উপর বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিকে গ্রহণ করা হয়। এর উপরই উৎস থেকে বিক্ষিপ্ত এক্স-রে নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়। এই সজ্জাকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে উক্ত পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

চিত্রঃ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি

ডিএনএ’র একক বা মনোমারের চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। এরপর তার পলিমারের গঠন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন ওয়াটসন ও ক্রিক।

কে এই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন? ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঙ্কলিন ১৯৩৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি লাভ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাথে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে প্রথম মহিলা প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্যারিসের CNRS Lab of Molecular Genetics-এ চার বছর কাজ করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। এই বিষয়ে তিনি এতটাই পারদর্শিতা লাভ করেন যে, তাকে লন্ডনের কিংস কলেজে যোগদান করার জন্য আহ্বান করা হয়। দেশের ডাক উপেক্ষা না করে ১৯৫১ সালে কিংস কলেজে যোগদান করেন।

কিন্তু আহ্বানকারী জন র‍্যানডল একইসাথে একটা সংকটপূর্ণ অবস্থাও তৈরি করলেন। ইতিপূর্বে মরিস উইলকিন্স (পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী) যে পদে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিনকে সেই পদে নিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি মরিসের যে পিএইচডি ছাত্র ছিল, তাকেও ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে দিয়ে দেন। তাছাড়া ফ্রাঙ্কলিন যে সময়টাতে কিংস কলেজে যোগদান করেন তখন মরিস উইলকিন্স ছুটিতে ছিলেন। ফলে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন দেখলেন কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াই প্রথমত, তিনি তার ল্যাবের একক অধিকার হারালেন। তার উপর তিনি তার অধীনস্থ পিএইচডি ছাত্রটিকেও হারালেন।

গবেষণার সাথে যারা জড়িত তারা এ ধরনের ঘটনার গুরুত্ব একজন বিজ্ঞানীর কাছে কতটুকু তা সহজেই অনুমান করতে পারবে। এই ঘটনা আর যাই হোক উইলকিন্সকে অন্তত খুশি করতে পারেনি। তাই প্রথম থেকেই উইলকিন্স এবং ফ্রাঙ্কলিনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং যার ভবিষ্যত ফল খুব একটা ভালো হয়নি।

চিত্র: উইলকিন্স

ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে আসার আগমুহূর্তে উইলকিন্স ডিএনএ’র কিছু ছবি তুলেছিলেন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে। কিন্তু ছবিগুলো অস্পষ্ট ছিল। তিনি ঐ ছবিগুলো ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রদর্শন করেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি পরে উইলকিন্সের সাথে যোগাযোগ করেন তার অধীনে গবেষণা করার জন্য। অবশ্য তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণ হয়নি। ওয়াটসন পরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের অধীনে তার পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৈরি হয় ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল।

অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন তার কঠোর পরিশ্রমে এক বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ডিএনএ’র নমুনায় আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে দেখান যে, A (৭৫%) এবং B দুই প্রকারের ডিএনএ সম্ভব। উপস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রাঙ্কলিন A এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এই দিকটিকেই ওয়াটসন পরবর্তীতে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। কারণ, B ডিএনএ’র ছবি A এর চেয়ে অধিক পরিষ্কার ছিল।

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত B ডিএনএ’র ছবির উপর ভিত্তি করে তাদের ডাবল হেলিক্যাল মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি ফ্রাঙ্কলিনের ব্যক্তিগত নোটের দিকে লক্ষ্য করি, যা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাহলে আমরা চমকপ্রদ কিছু দেখতে পাই। তার নোটে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল গঠন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং কিছুটা কল্পনাও করতে পেরেছিলেন।

চিত্রঃ A এবং B গঠনের ডি এন এ।
চিত্রঃ ডিএনএ’র গঠন সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিনের নোট বইয়ে আঁকা চিত্র।

১৯৫২ সালে ফ্রাঙ্কলিন B প্রকারের ডিএনএ’র যে ছবি তুলেছিলেন সেটিকেই ফটো ৫১ নামে অভিহিত করা হয়। এই পরীক্ষা চালানোর পর ফ্রাল্কলিন কিংস কলেজ ত্যাগ করে লন্ডনের ব্রুক বেক কলেজে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৫৩ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভাইরাস রিসার্চ ল্যাবে ভাইরাস গবেষক হিসাবে অতিবাহিত করেন। ঐ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণাপত্র বের করতে সমর্থ হন যেখান তার সঙ্গী ছিলেন পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ।

ইতোমধ্যে ফ্রাঙ্কলিনের পুরোপুরি অজান্তে ফটো ৫১ ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু ফটো ৫১ ই নয়, ফ্রাঙ্কলিনের কাজের সমস্ত নথিপত্র উইলকিন্স, ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে দিয়ে দেন। যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং একই সাথে গবেষণা নীতির বিরোধী।

ফটো ৫১ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক দ্রুত গতিতে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেননা, তখনকার সময় ওয়াটসন ও ক্রিক ব্যতীত আরো অনেক বিজ্ঞানী ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পলিং। কিন্তু পলিং তার সাফল্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছালেও সামান্য কিছু ভুলের জন্য ডিএনএ এর গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর তাই হয়তবা তিনি তার তৃতীয় নোবেল পুরষ্কারটাও হাতছাড়া করলেন!

ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তারা তাদের মডেল দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের মডেল যে সঠিক সেটার জন্য অবশ্যই কোনো বিদগ্ধ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতির প্রয়োজন। কিন্তু কাকে তারা দেখাবেন? অবশেষে তারা স্বয়ং রোজালিন্ড ফ্রঙ্কলিনকেই আমন্ত্রণ জানান!

ফ্রাঙ্কলিন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তাদের মডেল দেখেন এবং সাথে সাথে তিনি ঐ মডেলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার স্বীকৃতি দান করেন। ফ্রাঙ্কলিন তখনও জানতেন না যে তার পরিশ্রমের ফটো ৫১ এর উপর ভিত্তি করেই তারা ঐ মডেলটি তৈরি করেছেন। ওয়াটসন এই ঘটনা সম্পর্কে তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’-এ লিখেছেন “ত্বরিত স্বীকৃতি আমাকে অবাক করেছে”।

চিত্র: ডিএনএ মডেলের রেপ্লিকার সামনে ওয়াটসন ও ক্রিক।

ওয়াটসন ও ক্রিক ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির প্রধান স্যার লরেন্স ব্রাগকে অবহিত করেন এবং অনুরোধ করেন তাদের গবেষণাপত্র যেন দ্রুত প্রকাশ করা হয়। স্যার লরেন্স ব্রাগ এর পরই ‘নেচার’ সাময়িকীতে অতিদ্রুত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন। ইতিহাসে আর মাত্র একবারই নেচার এমন কাজ করেছে, হরগোবিন্দ খোরানা এবং তার সহকারীদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

কিন্তু নেচার যে ঘটনার জন্ম দেয় তা অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়। নেচার তার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল ইস্যুতে প্রথমে ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্র এবং তারপর উইলকিন্স ও তার সহকারীবৃন্দের এবং সবশেষে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্রমটা কি আসলেই সঠিক? এর দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বোঝানো হচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্রের অবদান ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্রে খুব কম বা নেই বললেই চলে।

এরপর যা হয় আর কি, তাবৎ দুনিয়া ফ্রাঙ্কলিনকে ভুলেই গেল আর ওয়াটসন ও ক্রিককে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিল। আর অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ ছেড়ে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে মেতে উঠলেন আর তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন যার জন্য তিনি মূলত ভাইরাস গবেষক হিসেবেই বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হতে লাগলেন।

কিন্তু স্বীকৃতি আর বেশি দিন তার ভাগ্যে সহ্য হলো না। ১৯৫৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বিষয়ক কিছু ভ্রমণের পরপরই উদরের ব্যথা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

চিত্রঃ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত পরিমাণ এক্স-রে তার শরীরের উপর পড়ার কারণেই তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। ইতিহাসে আর মাত্র একজন বিজ্ঞানীই এরকম অতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পদার্থ ও রসায়নে দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মহীয়সী নারী মাদাম কুরী। ১৬ ই এপ্রিল ১৯৫৮, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন মৃত্যুবরণ করেন। মানবসমাজ তার অন্যতম এক কৃতি সন্তানকে হারায়।

তার সমাধির উপর লেখা আছে, তিনি একজন ভাইরাস গবেষক। কিন্তু হায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি জেনে যেতে পারলেন না মানব সমাজকে তিনি কী উপহার দিয়ে গেলেন। নেচার যা করেছে সেটা না হয় কাকতালীয় হতে পারে কিন্ত নোবেল কমিটি কী করলো? ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় molecular structure of nucleic acids and its significance for information transfer in living material”

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘molecular structure of nucleic acids’ এর এই কাজটি কার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল? এমন দাবী করা হচ্ছে না যে নোবেল কমিটি তাদের নিয়ম ভঙ্গ করে একজন মৃত ব্যক্তিকে পুরষ্কার দিক। কিন্তু ন্যূনতম যে মর্যাদা সেটা তো ফ্রাঙ্কলিনের প্রাপ্য হতেই পারতো। অবশ্য তিনি মৃত্যুবরণ করে নোবেল কমিটিকে তাদের কাজ অনেকটা সহজই করে দিলেন।

আরেকটি ঘটনার অবতারণা এখানে না করলেই নয়। সেটা হলো ওয়াটসন তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এ ফ্রাঙ্কলিনকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপিত করেছেন এবং ওয়াটসন যখন তার বইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য পাঠান তখন ক্রিক ও উইল্কিন্সের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ তা প্রত্যাখান করে।

উপায় না দেখে তিনি অন্য প্রকাশনা থেকে দ্রুত তার বইটি প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে উইলকিন্স বলেছেন If there was one of thing that was objectionable in the book, it was his portrayal of Rosalind, it was always silly matter about clothing or something, I thought it was pretty inane and they’re not true to say the least was a very presentable person। বুঝুন তাহলে অবস্থাটা।

কিছু কিছু মানুষ হয়তোবা সারাটা জীবন দেওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন, গ্রহণের জন্য নয়।

“In my view, all that necessary for faith, is the belief that doing our best we should success in our aims. The improvement of mankind.” – Franklin.

তথ্যসূত্র

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at Kings College, London).
  3. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  4. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  5. Klug, A., (2004) The Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  6. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  7. PBS: The Secret of Photo 51
  8. PBS: The Secret of Life

জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক দুর্ভাগা

খুব কাছের এক বন্ধু। নানা কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছাত্রজীবনের আপাত ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছে না। তার মতে সে যা-ই করে তাতেই বিপত্তি বাঁধে। ‘সাফল্য’ শব্দটা নাকি তার অভিধানেই নেই। এই দুঃখে কিছু করতেও চায় না। কিছুদিন আগে পথ চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসেছে। হাসপাতালের বেডে বসে ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে দিয়ে কবিতা লিখে।

সেদিন তাকে দেখতে গেলাম। একথা সেকথা বলার পর বন্ধু আমার জিগ্যেস করে বসল- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে অভাগা কে বলতে পারিস?’। জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেই বললো- ‘এই যে মূর্তিমান আমি।’ হেসে মাথা নাড়লাম, ‘উহু। তোর চেয়েও অভাগা আছে রে।’ এই বলে তাকে এক দুর্ভাগা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাহিনী বললাম। শুনে তার মুখে আর রা কাড়ে না।

গুইলিয়াম জোসেফ হায়াসিন্থ জাঁ বাপটিস্ট লে জেন্টিল ডে লা গ্যালাইসিয়েরে। এই ইয়া বড় নামখানা আমাদের আলোচ্য ভদ্রলোকের। আমরা তাকে লে জেন্টিল সাহেব বলবো। জন্ম ১৭২৫ সালে। জাতে ফরাসী। কাজ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা আর অংক কষা। মানে জ্যোতির্বিদ। এগারোটি বছর বেচারা এমন এক কাজের পিছনে সারা দুনিয়া জুড়ে দৌড়েছেন যেটা সম্পন্ন করতে পারলে অন্যভাবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হতো।

চিত্রঃ জ্যোতির্বিদ লে জেন্টিল।

এই ট্রানজিটগুলো খুবই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা। একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় পর পর ট্রানজিট ঘটে থাকে। শুক্র গ্রহের ক্ষেত্রে এ ক্রমটিকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে- একটি শুক্র সরণের ঠিক ১০৫.৫ বছর পর আরেকটি শুক্র সরণ হয় যার ঠিক আট বছর পর আরো একটি শুক্র সরণ হয় আবার এই শুক্র সরণটির ১২১.৫ বছর পর একটি শুক্র সরণ হয় এবং এর আট বছর পর আবার একটি শুক্র সরণ ঘটে এভাবে প্রতি ২৪৩ বছরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।সেটা বলার আগে কিছু ভারী কথা বলে নেই।

১৫৪৩ সালে কোপার্নিকাসের এবং ১৫৮৮ সালে টাইকো ব্রাহের কোপার্নিকাসকে সমর্থন করে দেয়া সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করলেন, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী গ্রহ দুটির (বুধ ও শুক্র) ট্রানজিট ঘটে। ট্রানজিট মানে অতিক্রম। সূর্যকে পরিক্রমণ করতে করতে এই গ্রহগুলো এক সময় পৃথিবীর সামনে দিয়ে যাবে। তখন সূর্য থেকে আসা আলোর কিছু অংশ এই গ্রহ বা জ্যোতিষ্ক ঢেকে দিবে যার ফলে পৃথিবী থেকে এদের স্পষ্ট দেখা যাবে এবং শনাক্ত করা যাবে।

কেপলার সর্বপ্রথম ১৬৩১ সালে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করলেও তার পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। এর চেয়ে বড় কথা হলো তিনি এর আট বছর পরের শুক্র সরণটি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশকে সংশোধন করে পরবর্তী শুক্র সরণের দিন তারিখ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সমর্থ হন আরেক প্রতিথযশা মেধাবী জ্যোতির্বিদ জেরেমিয়াহ হরকস্‌। তিনি সূর্য আর শুক্রের আকারের উপর ভিত্তি করে একটি প্যারালাক্স বা লম্বন পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং তা থেকে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে সমর্থ হন।

চিত্রঃ শুক্রের ট্রানজিট। সূর্যের সামনে শুক্রকে একটি বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তার ধারণা সঠিক ছিল না। এখন কী করা যায়? আমাদের তো সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব জানতে হবে। সেই লক্ষ্যে আরেক বিজ্ঞানী জেমস গ্রেগরি তার ‘Optica promota’ গ্রন্থে একটা ট্রানজিট শুরু ও শেষ হবার সময়কে হিসেবে ধরে আর সেই সাথে ত্রিকোণমিতির সূত্রকে কাজে লাগিয়ে একটা প্যারালাক্সের স্কেচ আঁকেন। এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভুবন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালি ১৫৭৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বুধের ট্রানজিট নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি ১৭১৬ সালে এক সম্মেলনে এই ধরনের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য সকল জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করেন। কারণ এ থেকে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব আরো নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে। এবং আশা করেন যে, পৃথিবীর সকল জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করা হবে। হ্যালি যদিও অনেকদিন বেঁচে ছিলেন কিন্তু তিনি ১৭৬১ সালে সংঘটিত শুক্রের ট্রানজিট দেখে যেতে পারেননি।

১৭৫০ সালের দিকে জ্যোতির্বিদ মিখাইল লোমোনোসভ প্রায় শ’খানেক বিজ্ঞানীকে ১৭৬১ সালের শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের সেরা সেরা টেলিস্কোপ আর অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন।

আমাদের লে জেন্টিল সাহেব French Academy of Science থেকে শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচিত হলেন। তিনি ঠিক করলেন এই পর্যবেক্ষণের কাজ করার জন্য ভারতের ফরাসী উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে যাবেন। সেই লক্ষ্যে জাহাজে উঠলেন ১৭৬০ সালে। যেহেতু তখন সুয়েজ খাল বলে কিছু ছিল না তাই তাকে আফ্রিকা ঘুরে অনেক পথ অতিক্রম করে ভারতের পথে যেতে হবে। প্রায় পনের মাসের জাহাজ ভ্রমণ। ট্রানজিট হবে ১৭৬১ সালের জুন মাসে। তার আগেই তাকে পন্ডিচেরি পৌঁছতে হবে।

যাত্রাপথে তিনি থামলেন তখনকার Isle De France-এ, বর্তমানে যা Mauritis নামে পরিচিত। ১৭৬০ সালের মার্চে ফ্রান্স ছাড়েন আর মরিশাসে এসে পৌঁছেন জুলাইতে। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে পন্ডিচেরির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেন।

এই সময়ে তিনি জানতে পারেন, পন্ডিচেরিতে ব্রিটিশ আর ফরাসীদের মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে। ওখানে যাওয়া নিরাপদ নয়। অনেক চিন্তা ভাবনা করে এবার তিনি একটা ফরাসী রণতরীতে উঠলেন যেটা যাচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের করোমানডেলে। হাতে আছে মাত্র তিন মাস।

কিন্তু এই না শুরু ভাগ্যের খেল। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেন ব্রিটিশদের সাথে ফরাসীদের যুদ্ধের উন্নতির খবর পেয়ে জাহাজের নাক ঘুরিয়ে দিলেন আবার মরিশাসের দিকে। আর জেন্টিলকে জাহাজের উপর থেকেই শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের মহামূল্যবান উপদেশ দিলেন। বেচারা জেন্টিল আর কী করবে! জাহাজের উপর থেকেই কাজ চালালেন। কিন্তু জাহাজ তো নড়ছিল সবসময়ই। মাপজোখ সঠিক হলো না। তার পর্যবেক্ষণ বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো কাজেই আসবে না। হতাশ মনোরথে তিনি ফিরে এলেন মরিশাসে।

এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, আট বছর পরে আবার যে ট্রানজিট হবে তা তিনি এশিয়াতে থেকেই পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময় আর কোথাও যাবেন না। আট বছর থেকে যাবেন পন্ডিচেরির আশেপাশে। আবিষ্কারের নেশায় মানুষ কত কিছুই না করে। ১৭৬৯ সালের পর শুক্রের ট্রানজিট হবে আবার ১৮৬৯ সালে। মানে ঠিক একশ বছর পর। জেন্টিলের হাতে আর একবারই সুযোগ আছে।

সময় যেতে থাকলো। জেন্টিলও বসে রইলেন না। ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত, প্রাণীদের নমুনা এইসব সংগ্রহ করতে লাগলেন। মাটি, জোয়ার-ভাটা, চুম্বকত্ব, বায়ু ইত্যাদি সম্পর্কেও পড়াশুনা চালালেন। সাথে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যাটাও ঝালিয়ে নিলেন। বিখ্যাত মাদাগাস্তার দ্বীপে ঘুরাঘুরি করলেন এইসব কাজে।

চিত্রঃ জেন্টিলের গমনপথ।

সময় যায় আর শুক্রের সাথে তার অ্যাপয়নমেন্টও এগিয়ে আসে। এদিকে একাডেমী ঘোষণা দিলো যে, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শুক্রের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করার জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হবে। ম্যানিলা তখন ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ।

তিনি শেষমেশ ম্যানিলা যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৭৬৬ সালে একটা স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে চলে এলেন ফিলিপাইনে। কিন্তু ফিলিপাইনে দিন খুব একটা ভালো কাটলো না। সেখানকার স্প্যানিশ গভর্নর তার সাথে বাজে ব্যবহার করলো এবং তাকে স্পাই ভেবে বসলো। ফলস্বরূপ ম্যানিলা থেকে বিতাড়িত জেন্টিল কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেন আবার সেই পন্ডিচেরিতে।

ভালো খবর এই যে, ইতোমধ্যে ফরাসী এবং ব্রিটিশদের মধ্যে একটা শান্তি চুক্তি হয়েছে। ব্রিটিশরাও তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো, এমনকি তাকে উন্নতমানের একটি টেলিস্কোপ ও পর্যবেক্ষণের অন্যান্য সব ব্যবস্থাও করে দিলো। তার হাতে এক বছর সময়। তিনি বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আবহাওয়ার প্রতিও নজর রাখছেন।

১৭৬৯ সালের জুনের তিন তারিখ। ট্রানজিটের আগের দিন। ব্রিটিশ গভর্নরকে বৃহস্পতির দারুণ সব ভিউ দেখিয়ে সন্তষ্ট করালেন তিনি। পর্যবেক্ষণের জন্য মোটামুটি সবকিছুই তার অনুকূলে। ঐদিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। কোনোমতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই চোখ বন্ধ করতে পারছিলাম না।’

পরদিন ট্রানজিটের সময়কাল জুড়ে হঠাৎ করেই সূর্যের সামনে কালো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে কুয়াশা আর মেঘে ঢেকে গেল পুরো আকাশ। ট্রানজিট শেষ হলো আর আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। জেন্টিল হতাশায় নিমগ্ন হয়ে গেলেন। আট বছরের অপেক্ষা পুরো মাটি হয়ে গেল। কাটা গায়ে নুনের ছিটা হিসেবে সেদিন ম্যানিলার আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল। ঐ জায়গা ছিল ট্রানজিট পর্যবেক্ষণের জন্য পারফেক্ট।

জেন্টিল তার জার্নালে লিখেন ‘আমি প্রায় দশ হাজার লিগ (এক লিগ প্রায় তিন মাইলের সমান) অতিক্রম করেছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের মাতৃভূমি থেকে এতদূরে এসে রইলাম শুধু পর্যবেক্ষণের সময় সূর্যের সামনে এক টুকরো মেঘ দেখার জন্য? আমার কষ্ট আর ধৈর্য্যের ফলটাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যই যেন এই মেঘের আবির্ভাব হয়েছিল।’

এখানেই শেষ না। হতাশ, ক্লান্ত এবং ব্যর্থ জেন্টিল নয় বছর আগে ছেড়ে আসা নিজ ভূমিতে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিলেন। এখানে বলে নেই, রওনা হবার আগে তিনি ডায়রিয়াতে ভুগছিলেন। ফ্রান্সে যাবার পথে থামলেন মরিশাসে। সাল ১৭৭০। এখানে কিছুদিন থেকে আবার রওনা হলেন। এবার জাহাজ ‘কেপ অব গুড হোপ’ দ্বীপের কাছাকাছি জায়গায় ঝড়ের কবলে পড়ল। এবং ভাঙ্গা নড়বড়ে জাহাজ আবার ফিরে এলো মরিশাসে। সাল ১৭৭১।

এদিকে এখানে এসে ইউরোপে ফিরে যাবার জন্য কোনো জাহাজ পাচ্ছেন না। অনেক চেষ্টা আর খোঁজাখুঁজির পরে এক স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন তাকে ইউরোপে নিতে রাজি হলো। এরপর কাডিজ নামক একটা বন্দর হয়ে ফ্রান্সে ফিরে এলেন ১৭৭১ সালের ৮ই আগস্ট। ১১ বছর পর।

কিন্তু না। এখানেই শেষ নয়। কাহিনীর নাটকীয়তা এবার চরমে। বহুদিন জেন্টিলের কোনো খবর না পাওয়ায় তার আত্মীয় স্বজনরা ধরে নিয়েছিল সে মারা গেছে। সে এসে জানল তার স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বজনরা তার সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছে। অন্যদিকে একাডেমীতে তার সদস্যপদও অন্য একজনকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্পত্তি ফিরে পেতে জেন্টিল আত্মীয়দের বিরুদ্ধে মামলা করল। তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে সে এখনো জীবিত! এই মামলা পরিচালনার জন্য যে টাকা দরকার তা ছিল মামলা পরিচালনা করার জন্য যে অ্যাটর্নি নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তার কাছে। অ্যাটর্নি আবার তার সাথে দেখা করতে আসার সময় ডাকাতদের কবলে পড়ে টাকা-পয়সা সব খোয়ায়।

মামলা পরিচালনার টাকা না থাকায় জেন্টিল হেরে যান। সম্পত্তি আর একাডেমীর সদস্যপদ হাতছাড়া হয়েই রইলো। বরং উল্টো তাকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত করা হয়। তবে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে মামলাটা একাডেমির বিরুদ্ধে ছিল। অবশ্য একাডেমি কিংবা আত্মীয় স্বজনদের দোষ ছিল না। তার এতদিনের বাইরে সফরকালে কোনো চিঠিই এসে ফ্রান্সে তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছায়নি।

তিনি আবার বিচারের জন্য আবেদন করেন। এবার রাজার সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনি তার সদস্যপদ আর সহায়-সম্পত্তি ফিরে পান। কাহিনী শেষটুকু ভালোই। তিনি আবার বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে তার একটা কন্যাসন্তান হয়। শেষজীবনে এই কন্যার সেবা পেয়েই কাটে তার।

তবে আরো একটু দুঃখের খবর দেই। তার সংগৃহীত সকল প্রাকৃতিক নমুনা মরিশাস থেকে প্রথমবার ফ্রান্সে আসার সময় জাহাজ ঝড়ে কবলিত হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ১৯৩৫ সালে, বিজ্ঞানীরা তার নামে একটা লুনার ক্রেটারের নামকরণ করেন ‘লে জেন্টিল’। লুনার ক্রেটার হলো চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন গর্ত। জেন্টিলের নিজেরও কিছু অবদান আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানিক একশটি বস্তুর সেট- মেজার বস্তু, এম-৩২, এম-৩৬ এবং এম-৩৮ আবিষ্কার করেন। পাশাপাশি একটি নীহারিকার ক্যাটালগও তৈরি করেন তিনি।

তথ্যসূত্র

১. https://princetonastronomy.wordpress.com/2012/02/06/the-ordeal-of-guillaume-le-gentil

২. http://www.astroevents.no/venushist2aen.html

৩. https://thonyc.wordpress.com/2010/09/13/born-under-a-bad-sign

৪. https://www.youtube.com/watch?v=Qa8hFCoxx2E

featured image: astroevents.no

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com