ফটো ফিফটি ওয়ানঃ একের পর এক নোবেল পুরস্কার এসেছে যে ছবির হাত ধরে

যদি বিখ্যাত কোনো স্থিরচিত্র বা ছবির কথা কল্পনা করতে বলা হয় তাহলে আপনার মনে হয়তোবা ছবিই ভাসবে। যেমন সেই আফগান নারীর বিস্ময়কর মায়াবী সবুজ চোখ অথবা খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করা সেই আফ্রিকান শিশুর কথা। কিংবা এমনই আরো অনেক কিছু।

কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোনো একটা ছবির অবদান আধুনিক বিজ্ঞান জগতে কতটুকু হতে পারে? এমনকি সেই ছবির জন্য নোবেল দেওয়ার কথা পর্যন্ত উঠতে পারে? কোনোটার একটাও যদি কখনো কল্পনা করে থাকেন তাহলে আপনাকে এই লেখায় স্বাগতম।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘ফটো ৫১’? বিজ্ঞান জগতে কেন এর এত গুরুত্ব যার জন্য নোবেল পুরষ্কারের কথা পর্যন্ত উঠবে? কেমন দেখতে এই ফটো? এর পেছনে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ ক্ষোভ আর লজ্জা।

অবদানের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই এটুকু অন্তত বলতে পারি, এই ফটো ৫১ যদি ঐ সময়ে তোলা না হতো তাহলে জীববিজ্ঞানের উন্নতি অনেক পিছিয়ে যেতো। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আজ যে মহীয়সী রূপ তা সম্পন্ন হতে আরো অনেক বছর পার হয়ে যেত। কারণ এই ছবি ব্যতীত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের পক্ষে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল দেয়া সম্ভব ছিল না।

এই মডেল প্রদান করেই এরা পরবর্তীতে মরিস উইলকিন্সের সাথে ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে। কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফটো ৫১ এর আসল যে কারিগর, সেই মহীয়সী নারীর ভাগ্যে কী হয়েছিলো? এখানে সে সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করবো।

ফটো ৫১ সম্বন্ধে জানার আগে যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটি তোলা হয়েছিল সে সম্বন্ধে জানা উচিৎ। পদ্ধতিটির নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। সাধারণ ছবি তোলার জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয় এটি তারই মতো তবে এর প্রক্রিয়া খানিকটা জটিল।

নামে যেহেতু এক্স-রে কথাটি আছে তার মানে বুঝতে হবে এখানে এক্স-রে নিয়ে কিছুটা হলেও কারিকুরি আছে। রাদারফোর্ড যে প্রক্রিয়ায় তার পরমাণু মডেলের পরীক্ষা করেছিলেন এটিও অনেকটা সেরকমই। রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় আলোক উৎস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আলোক উৎস হিসেবে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ক্রিস্টালের গঠন নির্ণয় করার জন্য পদার্থের স্ফটিকের উপর উৎস থেকে এক্স-রে ফেলা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের আলোক সংবেদনশীল পদার্থের উপর বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিকে গ্রহণ করা হয়। এর উপরই উৎস থেকে বিক্ষিপ্ত এক্স-রে নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়। এই সজ্জাকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে উক্ত পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

চিত্রঃ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি

ডিএনএ’র একক বা মনোমারের চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। এরপর তার পলিমারের গঠন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন ওয়াটসন ও ক্রিক।

কে এই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন? ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঙ্কলিন ১৯৩৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি লাভ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাথে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে প্রথম মহিলা প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্যারিসের CNRS Lab of Molecular Genetics-এ চার বছর কাজ করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। এই বিষয়ে তিনি এতটাই পারদর্শিতা লাভ করেন যে, তাকে লন্ডনের কিংস কলেজে যোগদান করার জন্য আহ্বান করা হয়। দেশের ডাক উপেক্ষা না করে ১৯৫১ সালে কিংস কলেজে যোগদান করেন।

কিন্তু আহ্বানকারী জন র‍্যানডল একইসাথে একটা সংকটপূর্ণ অবস্থাও তৈরি করলেন। ইতিপূর্বে মরিস উইলকিন্স (পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী) যে পদে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিনকে সেই পদে নিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি মরিসের যে পিএইচডি ছাত্র ছিল, তাকেও ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে দিয়ে দেন। তাছাড়া ফ্রাঙ্কলিন যে সময়টাতে কিংস কলেজে যোগদান করেন তখন মরিস উইলকিন্স ছুটিতে ছিলেন। ফলে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন দেখলেন কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াই প্রথমত, তিনি তার ল্যাবের একক অধিকার হারালেন। তার উপর তিনি তার অধীনস্থ পিএইচডি ছাত্রটিকেও হারালেন।

গবেষণার সাথে যারা জড়িত তারা এ ধরনের ঘটনার গুরুত্ব একজন বিজ্ঞানীর কাছে কতটুকু তা সহজেই অনুমান করতে পারবে। এই ঘটনা আর যাই হোক উইলকিন্সকে অন্তত খুশি করতে পারেনি। তাই প্রথম থেকেই উইলকিন্স এবং ফ্রাঙ্কলিনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং যার ভবিষ্যত ফল খুব একটা ভালো হয়নি।

চিত্র: উইলকিন্স

ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে আসার আগমুহূর্তে উইলকিন্স ডিএনএ’র কিছু ছবি তুলেছিলেন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে। কিন্তু ছবিগুলো অস্পষ্ট ছিল। তিনি ঐ ছবিগুলো ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রদর্শন করেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি পরে উইলকিন্সের সাথে যোগাযোগ করেন তার অধীনে গবেষণা করার জন্য। অবশ্য তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণ হয়নি। ওয়াটসন পরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের অধীনে তার পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৈরি হয় ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল।

অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন তার কঠোর পরিশ্রমে এক বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ডিএনএ’র নমুনায় আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে দেখান যে, A (৭৫%) এবং B দুই প্রকারের ডিএনএ সম্ভব। উপস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রাঙ্কলিন A এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এই দিকটিকেই ওয়াটসন পরবর্তীতে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। কারণ, B ডিএনএ’র ছবি A এর চেয়ে অধিক পরিষ্কার ছিল।

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত B ডিএনএ’র ছবির উপর ভিত্তি করে তাদের ডাবল হেলিক্যাল মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি ফ্রাঙ্কলিনের ব্যক্তিগত নোটের দিকে লক্ষ্য করি, যা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাহলে আমরা চমকপ্রদ কিছু দেখতে পাই। তার নোটে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল গঠন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং কিছুটা কল্পনাও করতে পেরেছিলেন।

চিত্রঃ A এবং B গঠনের ডি এন এ।
চিত্রঃ ডিএনএ’র গঠন সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিনের নোট বইয়ে আঁকা চিত্র।

১৯৫২ সালে ফ্রাঙ্কলিন B প্রকারের ডিএনএ’র যে ছবি তুলেছিলেন সেটিকেই ফটো ৫১ নামে অভিহিত করা হয়। এই পরীক্ষা চালানোর পর ফ্রাল্কলিন কিংস কলেজ ত্যাগ করে লন্ডনের ব্রুক বেক কলেজে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৫৩ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভাইরাস রিসার্চ ল্যাবে ভাইরাস গবেষক হিসাবে অতিবাহিত করেন। ঐ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণাপত্র বের করতে সমর্থ হন যেখান তার সঙ্গী ছিলেন পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ।

ইতোমধ্যে ফ্রাঙ্কলিনের পুরোপুরি অজান্তে ফটো ৫১ ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু ফটো ৫১ ই নয়, ফ্রাঙ্কলিনের কাজের সমস্ত নথিপত্র উইলকিন্স, ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে দিয়ে দেন। যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং একই সাথে গবেষণা নীতির বিরোধী।

ফটো ৫১ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক দ্রুত গতিতে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেননা, তখনকার সময় ওয়াটসন ও ক্রিক ব্যতীত আরো অনেক বিজ্ঞানী ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পলিং। কিন্তু পলিং তার সাফল্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছালেও সামান্য কিছু ভুলের জন্য ডিএনএ এর গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর তাই হয়তবা তিনি তার তৃতীয় নোবেল পুরষ্কারটাও হাতছাড়া করলেন!

ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তারা তাদের মডেল দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের মডেল যে সঠিক সেটার জন্য অবশ্যই কোনো বিদগ্ধ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতির প্রয়োজন। কিন্তু কাকে তারা দেখাবেন? অবশেষে তারা স্বয়ং রোজালিন্ড ফ্রঙ্কলিনকেই আমন্ত্রণ জানান!

ফ্রাঙ্কলিন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তাদের মডেল দেখেন এবং সাথে সাথে তিনি ঐ মডেলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার স্বীকৃতি দান করেন। ফ্রাঙ্কলিন তখনও জানতেন না যে তার পরিশ্রমের ফটো ৫১ এর উপর ভিত্তি করেই তারা ঐ মডেলটি তৈরি করেছেন। ওয়াটসন এই ঘটনা সম্পর্কে তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’-এ লিখেছেন “ত্বরিত স্বীকৃতি আমাকে অবাক করেছে”।

চিত্র: ডিএনএ মডেলের রেপ্লিকার সামনে ওয়াটসন ও ক্রিক।

ওয়াটসন ও ক্রিক ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির প্রধান স্যার লরেন্স ব্রাগকে অবহিত করেন এবং অনুরোধ করেন তাদের গবেষণাপত্র যেন দ্রুত প্রকাশ করা হয়। স্যার লরেন্স ব্রাগ এর পরই ‘নেচার’ সাময়িকীতে অতিদ্রুত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন। ইতিহাসে আর মাত্র একবারই নেচার এমন কাজ করেছে, হরগোবিন্দ খোরানা এবং তার সহকারীদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

কিন্তু নেচার যে ঘটনার জন্ম দেয় তা অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়। নেচার তার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল ইস্যুতে প্রথমে ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্র এবং তারপর উইলকিন্স ও তার সহকারীবৃন্দের এবং সবশেষে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্রমটা কি আসলেই সঠিক? এর দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বোঝানো হচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্রের অবদান ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্রে খুব কম বা নেই বললেই চলে।

এরপর যা হয় আর কি, তাবৎ দুনিয়া ফ্রাঙ্কলিনকে ভুলেই গেল আর ওয়াটসন ও ক্রিককে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিল। আর অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ ছেড়ে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে মেতে উঠলেন আর তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন যার জন্য তিনি মূলত ভাইরাস গবেষক হিসেবেই বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হতে লাগলেন।

কিন্তু স্বীকৃতি আর বেশি দিন তার ভাগ্যে সহ্য হলো না। ১৯৫৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বিষয়ক কিছু ভ্রমণের পরপরই উদরের ব্যথা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

চিত্রঃ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত পরিমাণ এক্স-রে তার শরীরের উপর পড়ার কারণেই তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। ইতিহাসে আর মাত্র একজন বিজ্ঞানীই এরকম অতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পদার্থ ও রসায়নে দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মহীয়সী নারী মাদাম কুরী। ১৬ ই এপ্রিল ১৯৫৮, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন মৃত্যুবরণ করেন। মানবসমাজ তার অন্যতম এক কৃতি সন্তানকে হারায়।

তার সমাধির উপর লেখা আছে, তিনি একজন ভাইরাস গবেষক। কিন্তু হায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি জেনে যেতে পারলেন না মানব সমাজকে তিনি কী উপহার দিয়ে গেলেন। নেচার যা করেছে সেটা না হয় কাকতালীয় হতে পারে কিন্ত নোবেল কমিটি কী করলো? ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় molecular structure of nucleic acids and its significance for information transfer in living material”

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘molecular structure of nucleic acids’ এর এই কাজটি কার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল? এমন দাবী করা হচ্ছে না যে নোবেল কমিটি তাদের নিয়ম ভঙ্গ করে একজন মৃত ব্যক্তিকে পুরষ্কার দিক। কিন্তু ন্যূনতম যে মর্যাদা সেটা তো ফ্রাঙ্কলিনের প্রাপ্য হতেই পারতো। অবশ্য তিনি মৃত্যুবরণ করে নোবেল কমিটিকে তাদের কাজ অনেকটা সহজই করে দিলেন।

আরেকটি ঘটনার অবতারণা এখানে না করলেই নয়। সেটা হলো ওয়াটসন তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এ ফ্রাঙ্কলিনকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপিত করেছেন এবং ওয়াটসন যখন তার বইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য পাঠান তখন ক্রিক ও উইল্কিন্সের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ তা প্রত্যাখান করে।

উপায় না দেখে তিনি অন্য প্রকাশনা থেকে দ্রুত তার বইটি প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে উইলকিন্স বলেছেন If there was one of thing that was objectionable in the book, it was his portrayal of Rosalind, it was always silly matter about clothing or something, I thought it was pretty inane and they’re not true to say the least was a very presentable person। বুঝুন তাহলে অবস্থাটা।

কিছু কিছু মানুষ হয়তোবা সারাটা জীবন দেওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন, গ্রহণের জন্য নয়।

“In my view, all that necessary for faith, is the belief that doing our best we should success in our aims. The improvement of mankind.” – Franklin.

তথ্যসূত্র

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at Kings College, London).
  3. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  4. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  5. Klug, A., (2004) The Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  6. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  7. PBS: The Secret of Photo 51
  8. PBS: The Secret of Life

ডিএনএ’র গল্প

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না।

মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি।

সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি, তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়।

মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ মিশার

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন।

প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়।

তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন।

বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে।

তিনি আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

ওয়াটসন ও ক্রিক

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

Rosalind Franklin কর্তৃক গৃহীত ডিএনএ’র ঐতিহাসিক এক্স রে চিত্র।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

ডিএনএ চরিত

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।2

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি। সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি,
তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। 3
প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়। মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়। তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

4

 চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ।

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে। আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

4

 চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন।

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান5 সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!

 

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ6 করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

 

লেখকঃ

চিন্ময় সেন
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

ডিএনএ চরিত

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।2

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি। সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি,
তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। 3
প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়। মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়। তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

4

 চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ।

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে। আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

4

 চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন।

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান5 সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!

 

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ6 করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

 

লেখকঃ

চিন্ময় সেন
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়