আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ঃ একজন বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবকের কথা

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট তার জন্ম। বাবা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মা ভুবনমোহিনী দেবী। সকলে তাকে ডাকতো ‘ফুলু’ নামে। প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা যেমন ছিলেন প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ কৃষ্টির অনুরাগী। ফলে ছোটবেলায় ঘরেই যখন প্রফুল্লচন্দ্রের জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় জমিদার ও তথাকথিত উচ্চ হিন্দু বংশের সন্তান হওয়া সত্বেও কখনো কোনরূপ গোঁড়ামি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

বাবার কাছ থেকে শেখা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ঔদার্যই তাকে পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি নিজের গ্রামেই বাবার একটি নিজস্ব লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তার জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণরূপে।

স্থানীয় পড়াশুনোর পাট শেষ হবার পর তাকে ভর্তি করা হলো কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না থাকায় এর দুই বছর পরেই রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হলেন। ফলে বিরতি পড়লো পড়াশোনায়। বিরতির পর তিনি ভর্তি হলেন কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলবার্ট স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদ্যাসাগর কলেজ (তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ) থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

যুবক বয়সে প্রফুল্লচন্দ্র

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি এরপর গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পাড়ি জমান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। সেখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা শীর্ষক একটি রাজনৈতিক গবেষণামূলক বই লেখেন।

এ থেকে দেখা যায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক জ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছয় বছর পর তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি অর্জন করেন। এর আগে মাত্র একজন বাঙালি এই উপাধি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ডাঃ অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে তার জ্ঞানসাধনা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন-

আমি যখন এডিনবরাতে পড়তাম India & British Rule নামে একটি বই লিখেছিলাম। ফলে লর্ড বায়রনের মতো Awoke one fine morning and found myself famous এইরকম ভাবে রাজনীতির চর্চা করেছি, নানা প্রকার বই লেখার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি

দেশে ফিরেই তিনি শুরু করেন তার কর্মযজ্ঞ। প্রথমেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি গবেষণা চালাতে থাকেন। প্রথম গবেষণার ফল বের হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মারকিউরাস নাইট্রাইট।

নাইট্রাইট যৌগসমূহ খুব বেশি একটা স্থায়ী হয় না। এজন্যে তিনি সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী নাইট্রাইট তৈরির উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল। এ কাজের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন এই বলে-

বিসম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

বাঙালির নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত ধাতব নাইট্রাইটের উপর তার গবেষণা বিভিন্ন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতব যৌগ আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। ভৌত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল আমরা দেখতে পাই তার গবেষণাপত্রের মান এবং তার সংখ্যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেশি বিদেশি নামকরা জার্নালে তার মোট গবেষণাপত্র ১০১টি।

একজন গবেষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র যেরকম অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনই শিক্ষক হিসেবেও স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের হৃদয়ে। নিজের ছাত্রদের তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং খুব আনন্দঘন উপায়ে জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলিকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-

গবেষণারত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়


প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানতঃ নিচের ক্লাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমতো আকার দিতে পারে
, হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোনো নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান দিতাম না।

কেবলমাত্র তার নিজের যশ খ্যাতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। পাশাপাশি তৈরি করেছেন এক দল দক্ষ ছাত্র ও সহকারী গবেষক, যারা তার কাজে যুগপৎ সাহায্য করেছেন এবং পরবর্তীতেও নিজেদেরকে স্বাধীন ও প্রকৃষ্ট গবেষক রূপে গড়ে তুলেছেন। নীলরতন ধর, রসিকলাল দত্ত, পঞ্চানন নিয়োগী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নামজাদা বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দ্বারাই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ডিগ্রির দিকে না তাকিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন একজন ছাত্রের গবেষণার প্রবৃত্তি ও উৎসাহের উপর। তার একজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে তিনি এমাইন নাইট্রেট আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ শ্রীযুক্ত রক্ষিত নামের এই সহকারীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার গবেষণার সুপ্ত প্রতিভা প্রফুল্লচন্দ্র ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাকে পরবর্তী গবেষণার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন আর এইখানেই ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের সার্থকতা।

১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অবসর নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যতদিন তিনি অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তিনি এক কপর্দক বেতন নেননি। এ অর্থ সঞ্চিত থাকতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সব সময় তার ছাত্রদের নিজের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করতেন। জাগতিক কোন কিছুর প্রতি তার কোন লোভ ছিল না কখনোই।

চিত্র: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মাঝে উপবিষ্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সর্ব ডানে বসা সত্যেন্দ্র নাথ বসু, সর্ব বামে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ সাহা।

শুধুমাত্র গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখেননি। জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে তার অর্জিত সকল অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিরূপে নিয়োগ করেছিলেন দেশের কাজে। যেখানেই দারিদ্র্য, বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ সেখানেই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমগ্র বিশ্বই ছিল তার সংসার। তাই তিনি বৈরাগ্যের মধ্যেই নিজের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজের স্থান করেনিয়েছিলেন।

তখন ছিল ইংরেজ শাসনামল। শাসকের অধীনস্ত হয়ে কখনো তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। এর স্বরূপ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশকৃত বঞ্চনাকর রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে। ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতা টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র ও যোগদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন-

আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।

এছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুরাগী ছিলেন। দেশজ পণ্য ব্যবহারের জন্য যে আন্দোলন তখন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে প্রফুল্লচন্দ্র ও একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর খাতায় তাকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ নামে ডাকা হতো।

পাশ্চাত্যের অনেক আগে, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন মুনি ঋষির হাত ধরে বিজ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্রকে এ বিষয়টি আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। তাই তিনি সেই বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা হিন্দু রসায়নের ক্রমবিবর্তনকে লিপিবদ্ধ করবার উদ্যোগ নেন।

১৯০২ এবং ১৯১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘আ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ বা ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’। এটি তার অসামান্য কীর্তি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পুঁথিপত্রের উপর বিস্তর গবেষণা করে এ গ্রন্থ টি রচনা করেন। পুরো ভারতবর্ষ, নেপাল ও লন্ডনের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এ গ্রন্থ লেখবার দুষ্প্রাপ্য ও প্রয়োজনীয় পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি সংগ্রহ করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর শোকসভায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধী

বইটির উপর একটি আলোচনা মূলক প্রবন্ধে এক গবেষকগণ মন্তব্য করেন-

In this book he showed from an unbiased scientific standpoint, how much the knowledge of acids, alkali, metals, and alloys proceeded in different epochs of Indian history. He showed that, the science of metallurgy and of medicine had advanced significantly in ancient India; when Europe was practising alchemy, India was not far behind.

বইটির প্রশংসা করে তৎকালীন প্রখ্যাত রসায়নবিদ মারসেলিন বার্থেলো স্বয়ং চিঠি লিখেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। সে সময়ে বিশেষত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধির কথা জানানোর জন্যে বার্থেলো প্রফুল্লচন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান।

চিত্র: আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রির সম্মুখপট

এতক্ষণ যে প্রফুল্লচন্দ্রের কথা বললাম তিনি একজন গবেষক, বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা, ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু তিনি একজন গুণী শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। অসাধারণ বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অধিকারীও ছিলেন।

মাত্র আটশ টাকা মূলধনে আপার সার্কুলার রোডের একটা ছোট ঘরে প্রফুল্লচন্দ্র গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিটিউক্যালস ওয়ার্কস। প্রচণ্ড ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুললেন, যার মূলধন ছিল মাত্র ৮০০ টাকা, তার পরিমাণ আজকে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি টাকার কাছাকাছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সততাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। আজকে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের (বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের) পুঁজি-মূলধন নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায়। এই হতাশায় প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শ আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রফুল্লচন্দ্র অধ্যাপনা থেকে ৭৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। জ্ঞান চর্চাকেই তিনি তার জীবনের সাধনা ও একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি কখনো বিয়ে করেননি। এক হতে বহুত্বে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, উপনিষদের এই বাণীকে তিনি তার জীবনের পাথেয় করেনিয়েছিলেন। তাই সর্বদা মানুষের কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনমানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অধ্যাপক থাকার সময় ডক্টর কুদরত-ই-খোদা এম.এস.সিতে প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে তাকে প্রথম স্থান না দেবার জন্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে সুপারিশ করলে তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জাতিভেদ প্রথায়ও বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রাচীন ভারতে হিন্দু রসায়ন চর্চা তথা বিজ্ঞান সাধনার এত সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনি জাতিভেদ প্রথাকেই দায়ী করেছিলেন।

তার বইতে দেখিয়েছিলেন যাদের কাছে বিজ্ঞানের হাতে-কলমে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে যখন জ্ঞান চর্চা থেকে বিরত রাখা হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানের বিস্তারের দরজা সংকীর্ণ হতে থাকে।

জীবন যাপনে তিনি ছিলেন একদম সাদামাটা। এক পয়সার বেশি সকালের নাশতার পেছনে ব্যয় করলে রেগে যেতেন। জামাকাপড়ও খুবই সাধারণ মানের পরতেন। অনেক মানুষ এত বড় অধ্যাপকের পোশাক দেখে অবাক হয়ে যেতো।

তার অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত বিভিন্ন কলেজ, মানবকল্যান সংস্থা, দরিদ্র তহবিল, বিজ্ঞান সংগঠন প্রভৃতির প্রতি। সে সময় বাংলায় স্থাপিত এরকম কোনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তার অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আর.কে.বি.কে হরিশ চন্দ্র ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল)। নিজের গ্রামে তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। বাগেরহাট পিসি কলেজও তারই কীর্তি।

সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। একাধারে একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, বিপ্লবী দেশপ্রেমিক, অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯৪৪ সালের ১৬ ই জুন ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পুরো জীবনটি এক অনির্বচনীয় প্রেরণার উৎস। তার প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধা অর্থপূর্ণ হবে তখনই যখন আমরা তার জীবন দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাব। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি একজন সত্যিকার জ্ঞানতপস্বীর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

১. আত্মচরিত- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

২. আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র – শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু

৩. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবনবেদ- নন্দলাল মাইতি

৪. পাইকগাছা ও কয়রা থানার স্মরনীয় ও বরণীয় যারা- সম্পাদনা-শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

৫. P. C. Ray, “Life and experiences of a Bengali chemist,” 2 vols. Calcutta: Chuckervertty, Chatterjee & Co. 1932 and 1935

চুম্বকের ভেতরের কথা

গল্পটা শুরু করা যাক। ছোটবেলায় সবচেয়ে পছন্দের খেলনা ছিল চুম্বক। কোথা থেকে কি ভেঙ্গে একবার কীভাবে যেন একটা চুম্বক পেলাম। আমার নির্মমতায় তা কয়েকখণ্ড হয়ে গেল। খণ্ডগুলো দেখলাম দুষ্ট ছেলেপিলের মত একটা আরেকটাকে লাথি মারে, কখনও আবার কী ভাব তাদের! দূর থেকে দেখলেই ছুটে যায়, ধরে রাখা যায়না হাতে।

বুঝলামনা মাথামুণ্ডু কিছুই, তাড়িয়ে দেয় কীভাবে, কাছেই বা টানে কীভাবে! যেদিককে যে দিক লাথি মারে তারা আবার কখনোই নিজেদের টানেনা কাছে! পড়লাম মহা মুশকিলে।বইপত্র ঘেঁটে দেখি রাবার ব্যান্ডের মত চৌম্বকবলরেখা না কী সব যেন আঁকা, সব বস্তুর নাকি ও রেখা উৎপন্ন করার সাধ্য নেই! যাইহোক, ব্যাপারটার তল খতিয়ে দেখার স্পৃহা থেকে যতটুকু সম্ভব গভীরে গেলাম।

যে যুগে পদার্থের ভেতরের পারমাণবিক বা আণবিক বৈশিষ্ট্য জানার কোনো সুযোগ ছিলনা, বিজ্ঞানীরা তখনও মানতেন যে চুম্বক এবং চৌম্বকপদার্থ যে খেল দেখাচ্ছে তার সাথে তড়িতের কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে। চৌম্বকবলরেখা সম্পর্কে সবচেয়ে পরিচিত ছবিটির ব্যাখ্যা দেয়া যাক।

একটি দণ্ড চুম্বক। এর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু নামক দুটি মেরু রয়েছে। সর্বজনস্বীকৃত বিধান অনুযায়ী বলবো উত্তর মেরু থেকে চৌম্বকবলরেখা নামক কিছু রেখা বেরিয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করছে। তড়িতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বদা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত থেকে ঋণাত্মক প্রান্তের দিকে প্রবাহের দিক ধরা হয় তেমনই একটি ব্যাপার।

এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথমত এই রেখাগুলো হচ্ছে বলরেখা বা শক্তিরেখা অর্থাৎ কোনো এক প্রকার শক্তির সূচনা হচ্ছে একটি প্রান্তে এবং সমাপ্তি অপর প্রান্তে। দ্বিতীয়ত, শক্তিরেখাগুলো এলোমেলোভাবে না ছড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করছে। কিন্তু গতিপথের চেহারা ঠিক এরূপই কেন? উত্তর দেবার আগে একটু পরমাণু জগতে ঢুঁ মারি।

বেশ, একটি ইলেকট্রন এবং একটি প্রোটন এরুপ দূরত্বে থাকলে একে অপরকে আকর্ষণ করবে, এবার চুম্বকের পোলের দিকে খেয়াল করিঃ-

একটি উত্তর মেরু এবং একটি দক্ষিণ মেরু এর মধ্যে ঠিক একই রূপ আকর্ষণ বিদ্যমান। এখনঃ-

চার্জ দুটির আশেপাশে কোথাও একটি ধনাত্মক আধান রেখে আমরা তার ওপর চার্জ দুটির প্রভাব যদি খেয়াল করি তবে দেখব ধনাত্মক আধানটি প্রোটনের বিকর্ষণ বলের দিক এবং ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল,দুই বলের লব্ধি বলের দিকে ভ্রমন করছে।

এখন একটি শক্তিশালী দণ্ড চুম্বকের পাশে আমরা যদি বিভিন্ন অবস্থানে একটি চুম্বক শলাকাকে স্থাপন করি তবে স্বাভাবিকভাবেই শলাকা এবং চুম্বকের সম পোলগুলোর মধ্যে আকর্ষণ এবং বিপরীত পোলগুলোর মধ্যে বিকর্ষণের ফলে লব্ধি বলের দিকে শলাকা অবস্থান নেবে। এখন শলাকার যে কোনো একটি পোলের অবস্থানের গতিপথ যদি আমরা যোগ করে দিই তবে সেই আকাঙ্ক্ষিত বলরেখার পথটিই পাবো।

ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে যদি আমরা বলরেখা বা magnetic line of flux বা magnetic line of force এর তাত্ত্বিক সংজ্ঞাটি খেয়াল করিঃ-

“যখন একটি বিচ্ছিন্ন একক চুম্বক মেরু(হয় উত্তর অথবা দক্ষিণ) একটি চুম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয়, এটি আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ উভয় বল অনুভব করে, বিপরীত এবং সমমেরুর প্রভাবে, দুটি বলের লব্ধি বলের কারণে মেরুটি একটি পথে ভ্রমন করবে, সেই পথের নামই চৌম্বকবলরেখা। এরকম অসংখ্য পথকে সম্মিলিতভাবে magnetic flux বলা যায়।”

এই সংজ্ঞার মধ্যে একটু ঘাপলা আছে যা পরে ব্যাখ্যা করছি।

আমরা যদি উপরের ছবির প্রতিটা অবস্থানে একক মেরুটি বসিয়ে তার গতিপথ গাণিতিকভাবে নির্ণয় করতাম তবে ছোট ছোট যেই অভিক্ষেপগুলো পেতাম তার যোগফল হল একটি রেখা। তাই বলা যায় মেরুটি রেখা বরাবর যাত্রা করেনা বরং তার যাত্রাপথের ওপর লক্ষ করেই রেখাটি আঁকা হয়েছে।

এই বলরেখাগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ-

(১)বলরেখার দিক ধরা হয় উত্তর মেরু থেকে দক্ষিনের দিকে।

(২)বলরেখাগুলো একে অপরকে ছেদ করেনা।

(৩)বলরেখাগুলো বদ্ধ লুপ বা প্যাঁচ তৈরি করে। ইলেকট্রন-প্রোটনের সাথে তুলনা বা analogy দেয়ার সময় আমরা একটি একক মেরুর সাথে একক চার্জের মিল পেলেও চার্জ এবং পোলের মধ্যে যেই সুস্পষ্ট পার্থক্যটি রয়েছে তা হল একক অস্তিত্ব। একক চার্জ খুবই সাধারণ একটি বিষয় হলেও বাস্তবজগতে একক মেরু বলে কিছু নেই, এটি একটি গাণিতিক ধারণামাত্র। ফলস্বরূপ একটি একক চার্জের চারিদিকে তার যে শক্তিরেখা তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।যেমনঃ-

কিন্তু একক মেরু বলতে যেহেতু কিছুর অস্তিত্বই নেই তাই চুম্বকের শক্তিরেখা আবদ্ধ। প্রশ্ন হতে পারে চুম্বককে দুভাগ করলেই তো হয়? তখন যা হয়ঃ-

অর্থাৎ ভগ্ন অংশ নিজেই আরেকটি স্বকীয় চুম্বকে পরিণত হয়। তখন এক মেরু থেকে যেই শক্তিরেখা বের হয় তা চারিদিকে না ছড়িয়ে বিপরীত মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। একারণে চৌম্বকবলরেখা বদ্ধ হয়।

(৪) বলরেখাগুলো স্থিতিস্থাপক ইলাস্টিকের মত আচরণ করে।মোট কথা,বলরেখার স্থিতিস্থাপক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিপরীত মেরুর মধ্যে আকর্ষণ আর সমমেরুর বিকর্ষণের ব্যাখ্যা দেয়া যায় এইভাবেঃ-

ধরা যাক উত্তর মেরু থেকে কিছু রেখা দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করল। স্থিতিস্থাপক বস্তুর ধর্ম হল টানলে সরণের বিপরীত দিকে একটি বলের সৃষ্টি হয়, তাই পোল দুটি দূরত্ব কমিয়ে স্থিত অবস্থা লাভের চেষ্টা করে।

যেহেতু সমপোল হতে বলরেখা সমপোলে প্রবেশ করবেনা এবং একটি রেখা আরেকটিকে ছেদ করবেনা বা আরেকটির অভ্যন্তরে ঢুকে যাবেনা তাই দুটি বিপরীত পোল কাছাকাছি আনলে অনেকটা সঙ্কুচিত রাবার ব্যান্ডের মত অবস্থা সৃষ্টি হয় যা প্রসারিত হয়ে স্থিত অবস্থায় আসতে চায়, ফলে বিকর্ষণ বলের সৃষ্টি হয়।

চলমান চার্জের চৌম্বকীয় ধর্মঃ-

চৌম্বকবলরেখা ব্যাখ্যা করার সময় একটি দণ্ড চুম্বকের চারপাশে বিভিন্ন অবস্থানে রেখে চুম্বক শলাকা রেখে প্রভাব দেখা হয়েছিল। দণ্ড চুম্বকের বদলে যদি ওখানে কিছু চার্জ রাখা হত তবে শলাকায় কোনো বিক্ষেপ হতনা। তবে সেই চার্জগুলোই চলমান অবস্থায় থাকলে তার চারপাশে একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হত যার কারণে শলাকা বিক্ষেপ দেবে। আমরা চৌম্বকক্ষেত্রকে সংক্ষেপে B বলব। এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যাসহ প্রমান করেন Oersted নামক একজন অসাধারণ বিজ্ঞানী।

চিত্রঃ একটি বর্তনীতে প্রবাহের দরুন সৃষ্ট B শলাকার বিক্ষেপ ঘটাচ্ছে।

এখানে দুটো জিনিস রয়েছে, একটি বদ্ধ বর্তনী এবং একটি চুম্বক। এইযে তড়িৎ প্রবাহের ফলে একধরনের চৌম্বকত্ব সৃষ্টি হল,একেই বলে তড়িৎচুম্বক বা electromagnet। যদি পরিবর্তনশীল বা alternating current(A.C) ব্যবহার করা হয় তবে B এর মান এবং দিক দুটিই পরিবর্তিত হবে।

তার ১২ বছর পর বিজ্ঞানের আরেক দিকপাল মাইকেল ফ্যারাডে বলেনঃ-

“যখন কোনো বদ্ধ তার কুণ্ডলীতে আবদ্ধ চৌম্বক আবেশরেখার সংখ্যা বা ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটে তখন উক্ত বর্তনীতে একটি তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট হয়।”

এটি তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের প্রথম সূত্র হিসেবে বিখ্যাত।

উপরের সূত্র দুটির সম্পর্কের ব্যাপারে বলা যায়, অনেকটা এরকম, দিনের শেষে রাত আসবে আর রাতের শেষে দিন। তড়িৎ প্রবাহ থেকে চুম্বক পাব আর চুম্বক থেকে তড়িৎ। ফ্যারাডের প্রথম সূত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বর্তনী ও চুম্বকের মধ্যে আপেক্ষিক গতি থাকতে হবে তবেই তড়িৎ উৎপন্ন হবে, গতির ফলে প্রতি মুহূর্তে কুণ্ডলী দিয়ে অতিক্রান্ত ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটবে, গতি যদি না থাকে তবে অন্য কোনো উপায়ে প্রতি মুহূর্তে ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটাতে হবে(সেটি কি হতে পারে?!)। উৎপন্ন তড়িচ্চালক শক্তি ফ্লাক্সের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক হবে। এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বিতীয় সূত্র।

বেশ পরিচিত এই সূত্র দুটি উল্লেখ করলাম যেই কারণে সেখানে এখন আসছি।

বেশ বহুল পরিচিত একটি সূত্র এটি, তড়িৎ প্রবাহের দিকে ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল দিলে বাকি আঙ্গুলগুলো উৎপন্ন B এর দিক নির্দেশ করে।

যদি একটা কাগজের তল বরাবর ওপরের দিকে তড়িৎ প্রবাহিত হয় তবে উৎপন্ন B এর দিক এমন হবে যেন পরিবাহীর ডান পাশের কাগজ ফুঁড়ে উপরে উঠছে এবং বাম পাশের কাগজে ঢুকে যাচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে ডান হাতের প্যাঁচ অনুসরন করে B উৎপন্ন হয়নি কাকতালীয়ভাবে দেখা গিয়েছে যে একটি পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে যেভাবে B উৎপন্ন হয় তা আঙ্গুলের ওরকম অবস্থানের সাথে মিলে যাচ্ছে।

বেশ, আমরা এখন বিপরীত দৃশ্যটি দেখার চেষ্টা করি।একটি বদ্ধ বর্তনীতে B প্রয়োগ করা হবে এবং প্রবাহের দিক কোনো দিকে হওয়া উচিত তা দেখবঃ-

উপরের চিত্রে কুণ্ডলীর ভেতরে B প্রয়োগ করা হচ্ছে(কাগজের তলের ভেতর থেকে আমাদের দিকে), কুণ্ডলীটি পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক কাগজ তলে অবস্থিত, যে কোনো একদিকে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হবে, তার দরুন পরিবাহীর নিজস্ব একটি ক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে।

যদি প্রথম কেসটি সত্য হয় তবে প্রবাহের দরুন প্রয়োগকৃত B এর মতই উৎপন্ন B এর দিক হবে প্রথমত কাগজ ফুঁড়ে আমাদের দিকে, ঠিক তখন দুটি ক্ষেত্র একই দিকে ক্রিয়াশীল, সম্মিলিত ক্ষেত্র প্রবাহ আরও বাড়াবে, প্রবাহ আবার নিজস্ব B বাড়াবে এভাবে কুণ্ডলীর মধ্যে একটি সর্বদা চলমান অস্থিতিশীল সিস্টেমের উদ্ভব ঘটবে যা শক্তির নিত্যতার সূত্রকে ভাঙবে।

তাই এমন একদিকে প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন যার নিজস্ব ক্ষেত্র প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রকে কমানোর চেষ্টা করবে, দ্বিতীয় চিত্রটি সঠিক কিনা তা পাঠক বিচার করুন।

লেনজ নামক অসাধারণ এক বিজ্ঞানী এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যা করেন। লেঞ্জের সূত্রটি হলঃ

“আবিষ্ট তড়িচ্চালক শক্তি বা তড়িৎ প্রবাহের দিক এমন হয় যে এটি উৎপন্ন হবার মুল কারণের বিরোধিতা করে।”

ভেক্টরের ক্রস গুননের ব্যাপারটি আমরা জানি, দুটি ভেক্টর রাশির ক্রসগুননের ফলে উভয়ের লম্ব বরাবর আরেকটি ভেক্টর উদয় হয়। প্রথম ভেক্টর থেকে দ্বিতীয় ভেক্টরের দিকে একটি স্ক্রু ঘুরালে সেটি যেদিকে যায়, উৎপন্ন ভেক্টরের দিক সেদিকে।

এখানে ডান হস্ত সূত্র নামক একটি ব্যাপার আছে, যদি ডান হাতের তর্জনী প্রথম ভেক্টর, মধ্যমা দ্বিতীয়টি হয় তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি লব্ধি ভেক্টরের দিক বলবে, যে কোনো ভাবে আমরা দিকটি বের করতে পারি।

এতক্ষণ আমরা হয় তড়িতের প্রয়োগে চুম্বক বা চুম্বকের কারণে তড়িৎ এরূপ ব্যাপার দেখছিলাম।তড়িৎ হল চার্জের প্রবাহ যা একটি ভেক্টর রাশি আবার চুম্বকক্ষেত্রের নির্দিষ্ট দিক থাকায় সেটিও ভেক্টর রাশি,ফলস্বরূপ দুটি একসাথে কাজ করলে আরেকটি ভেক্টর রাশির উদয় ঘটবে উভয়ের লম্ব বরাবর। যা একটি বল, প্রকাশ করা হয়ঃ-

F=qVxB=qVBsin(angle)

এখানে q একটি ধনাত্মক চার্জ, যার বেগ v,B হল প্রয়োগকৃত ক্ষেত্র। ব্যাপারটি হল একটি চুম্বকক্ষেত্রে একটি আধান ক্রিয়াশীল থাকলে তা একটি বল অনুভব করবে, বলের দিক পাব ডান হস্ত সূত্র থেকে। অবশ্য চার্জটি যদি ঋণাত্মক হয় তবে ডান হস্তের বদলে বাম হস্ত সূত্র ব্যবহার হবে।তখন বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে। চিত্রে কাগজের বাইরে বেরিয়ে আসা ক্ষেত্র ও ভেতরে প্রবেশ করা ক্ষেত্রের জন্য উদ্ভূত বল F এর দিক দেখানো হয়েছে।

ফ্লেমিঙ্গের বাম হস্ত নিয়ম এবং কিছু কথাঃ-

বেশি কথা না বলে প্রথমেই চিত্রটি দিয়ে দিলাম, যদি বাম হাতের তর্জনী প্রয়োগকৃত চুম্বকক্ষেত্রের দিক, মধ্যমা কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে তবে ঐ পরিবাহী তারটি উপরের দিকে একটি বল অনুভব করবে, এক্ষেত্রে ভেক্টরের হিসেব করে দিক বের করতে হচ্ছেনা। কেবল চৌম্বকক্ষেত্র এবং প্রবাহের দিক বরাবর হাত বসালেই উদ্ভূত বলের দিক পাওয়া যাবে।

এক্ষেত্রে কিছু ছোট্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তা হলো, বিদ্যুতের প্রবাহ তো আসলে চার্জেরই প্রবাহ তাহলে ভেক্টরের বেসিক ডান হস্ত সূত্র ব্যবহার করলেই হতো আবার নতুন সূত্রের দরকার কি? দ্বিতীয়ত, ডান হস্ত সূত্রে তর্জনী বরাবর চার্জের প্রবাহ এবং মধ্যমা বরাবর B এর দিক ছিল কিন্তু এখানে উল্টো কেন?

প্রথম উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ,বিদ্যুৎ প্রবাহ আসলে চার্জেরই প্রবাহ, কোনো একটি তড়িৎ কোষে যেদিকে ইলেকট্রনের প্রবাহ ধরা হয় তার উল্টো দিকে ধরা হয় বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক।অনেকটা এরকম যেন ইলেকট্রনের বিপরীত চার্জের আরেকটি কণার প্রবাহ(কেবল দিক বোঝার সুবিধার্থে বলা হচ্ছে), এক্ষেত্রে তাই পূর্বের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধনাত্মক চার্জের জন্য বলের দিকের নিয়মটিই ব্যবহার করা যেত, কিন্তু এটি আসলে ঐ সূত্রেরই আরও সহজ রূপ। এখানে আঙ্গুল আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয় নির্দিষ্ট দিকটি বোঝাটাই আসল ব্যাপার।

ফ্লেমিঙ্গের সূত্রের সাথে তুলনা করি, ডান হাতের মধ্যমা যা আগে B বোঝানোর জন্য ব্যবহার হচ্ছিল তা উপরের চিত্রের B এর দিক বরাবর এবং তর্জনী প্রবাহের দিক বরাবর রাখলে দেখবো বল আসলে উপর দিকেই নির্দেশিত হচ্ছে তবে হাত একটু বেশি মোচড়ানো লাগছে এই আরকি!

ডান হস্ত সূত্রে একটি ব্যাপার আসলে একদম নির্দিষ্ট যে ক্রস গুননের যেই সূত্র, এক্ষেত্রে F=qV x B সেই সূত্রের প্রথম রাশি, তর্জনী বরাবর এবং দ্বিতীয় রাশি মধ্যমা বরাবর হলেই বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে।কিন্তু ঐ যে উপরের চিত্রানুযায়ী আঙ্গুল স্থাপন করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাম হস্ত সূত্র তুলনামুলকভাবে প্রয়োগ করা সহজ।bঅর্থাৎ সূত্র যাই হোক, ফলাফল আসলে একই!

আর এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করা হয়।সহজভাবে বলতে গেলে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরবরাহ করা হয়, চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন একটি ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, এভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। বিস্তারিত পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস থাকবে।

উদ্ভূত বলের বিষয়টি বাস্তবিকভাবেও অনুধাবন করা যায়, পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহ চলার সময় তার নিজের প্রবাহের কারণেই চারদিকে একটি চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়।তারপরে আবার যখন বাইরে থেকে চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন পরিবাহীর একদিকে একই দিকে নির্দেশক ক্ষেত্ররেখা এবং আরেকদিকে বিপরীতমুখী ক্ষেত্ররেখা একে অপরের মুখোমুখি হয়।ফলস্বরূপ ভেক্টর বিয়োগের সূত্রানুযায়ী ঐ দিকে ক্ষেত্ররেখা দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষেত্ররেখার যেহেতু আবার স্থিতিস্থাপক ধর্ম রয়েছে তাই তখন বেশি ঘনত্বের দিক থেকে কম ঘনত্বের দিকে একটি বল অনুভূত হয়, রাবার ব্যান্ডের মতই। এটিই আসলে টর্ক বা বল সৃষ্টির কারণ।

ডোমেইন তত্ত্ব,চৌম্বকপদার্থ এবং অন্যান্যঃ-

চৌম্বক-পদার্থ এবং চুম্বকের মধ্যে একটা পরিষ্কার পার্থক্য রয়েছে তা হল একটি চুম্বক তার সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে। অপরদিকে চৌম্বকপদার্থের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভের ক্ষমতা রয়েছে তবে তার পূর্বে একে চৌম্বকীকরন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।

আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি চুম্বক আরেকটি চুম্বকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে, একটি চৌম্বকপদার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারবে কিন্তু একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হবার পূর্বে আরেকটি চৌম্বকপদার্থের ওপর কোনোও প্রভাব ফেলতে পারবেনা।

এই আলোচনার সূত্র ধরে যেই প্রশ্নটি আসে সেটি হল ঠিক কোনো কোনো মৌলগুলো চুম্বকে পরিণত হবার ক্ষমতা রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সকল পদার্থকে তিনটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছেঃ-

(১)ডায়াচৌম্বক পদার্থ (diamagnetic substance)

(২)প্যারাচৌম্বক পদার্থ (paramagnetic substance)

(৩)ফেরোচৌম্বক পদার্থ(ferromagnetic substance)

পদার্থ অণু-পরমাণু দ্বারা গঠিত। পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে এবং ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রের চতুর্দিকে বিভিন্ন কক্ষপথে পরিভ্রমন করে। আবার নিজ নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ইলেকট্রনগুলোর ঘূর্ণন বা spin motion রয়েছে। ফলস্বরূপ আমরা দু’ধরনের গতি ভ্রামক পাচ্ছিঃ-

১/ কক্ষীয় গতি ভ্রামক(orbital motion moment)

২/ স্পিন গতি ভ্রামক(spin motion moment)

এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ভ্রামক রয়েছে যার নাম nuclear magnetic moment। এসকল মোমেন্টের সমষ্টিগত ক্রিয়ার ফলে পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন চৌম্বকবৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি প্রকাশ পায়।

প্রথম প্রকার পদার্থকে চুম্বকে পরিণত করা সম্ভব নয়, হতাশার গল্প দিয়েই শুরু করছি।

ডায়াচৌম্বক পদার্থঃ-

ঘূর্ণায়মান প্রতিটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে। কিন্তু একেকটি ইলেকট্রনের ঘোরার দিকভঙ্গি বা orientation এর ভিন্নতার কারণে একটি আরেকটির চৌম্বকীয় প্রভাবকে বিলীন করে দেয়।ফলে নীট চৌম্বক প্রভাব হয় শূন্য।

এখন বাইরে থেকে কোনো ক্ষেত্র B প্রয়োগ করা হলে পরমাণুর কক্ষীয় গতির পরিবর্তন ঘটে কারণ কৌণিক গতি বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করবে প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রের দিক কোনো দিকে এবং ঘূর্ণনের দিক সেদিকেই বা তার বিপরীতে কিনা তার ওপর।

কৌণিক বেগ পরিবর্তিত হলে কক্ষীয় গতি ভ্রামক এর পরিবর্তন হবে।বেগ বাড়লে ভ্রামক বাড়ে, কমলে কমে। ফলস্বরূপ যা ঘটে তা হল একটি মোট ভ্রামকের সৃষ্টি হয় যা সাধারন অবস্থায় শূন্য ছিল। কিন্তু এই দিক আবার প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর বিপরীত দিকে। তাই যখন চৌম্বকক্ষেত্রে রাখা হয়, এসমস্ত পদার্থ তখন ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যায়। চৌম্বকক্ষেত্র এসব পদার্থের ওপর প্রভাব ফেলছে ঠিকই কিন্তু চুম্বকীকরন প্রক্রিয়ার দ্বারা চুম্বকে পরিণত করতে পারছেনা।তাই একটুকরো সোনা কখনই চুম্বকে পরিণত হবেনা।

এখন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যাক। প্রথমত, ডায়াচৌম্বকত্ব একটি বৈশিষ্ট্য এবং এর উদ্ভব ঘটে কক্ষীয় গতি ভ্রামক থেকে। যেহেতু সকল পদার্থের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে সেহেতু সকল পদার্থের ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য রয়েছে কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত দুর্বল। যে সকল পদার্থে মোট চৌম্বক ভ্রামক শূন্য হয়না এবং নির্দিষ্ট শর্তে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর দিক বরাবর ভ্রামকের অভিমুখ হয় তাদের মাঝে প্যারাচৌম্বকত্ব অথবা ফেরোচৌম্বকত্ব প্রকাশ পায় ফলে ডায়াচৌম্বকত্ব থাকা সত্ত্বেও তা ঢাকা পরে যায়।

এইটুকু আলোচনা থেকে যেই সারাংশ টানা যায় তা হল প্যারাচৌম্বক বা ফেরোচৌম্বক বৈশিষ্ট্য যদি উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্ভব না হয় তবে যে কোনো পদার্থই ডায়াচৌম্বক এবং ঠিক এই কারণেই পৃথিবীতে ডায়াচৌম্বক পদার্থ সবচেয়ে বেশি। যথা- বিসমাথ, এন্টিমনি, তামা, সোনা, কোয়ার্টজ, মার্কারি, পানি, বাতাস, হাইড্রোজেন, বেশিরভাগ জৈব পদার্থ তার মানে যে কোনো জীবন্ত দেহও ডায়াচৌম্বকপদার্থ আর এই ব্যাপারটি কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছেঃ-

ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যাঙটির দেহ বিকর্ষণ করছে তাই এটি ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, ছোটখাটো আরও কয়েকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি করা হয়েছে এবং সেইদিন হয়ত আর বেশি দূরে নয় যখন মানুষ নিজেরা এই ব্যাপারটি উপভোগ করতে পারবে।

প্যারাচৌম্বক পদার্থঃ-

ডায়াচৌম্বক নিয়ে আলোচনার সময় আমরা চিন্তাভাবনা কক্ষীয় গতি ভ্রামক –এ সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছিলাম।প্যারাচৌম্বক পদার্থে যেটি ঘটে তা হল কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর ক্রিয়ায় নতুন একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হয়।

চিত্রে ভ্রামককে কতগুলো চৌম্বক দ্বি-পোল এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছেঃ-

এ ব্যাপারটি আগে ঘটেনি। যাই হোক, উদ্ভূত এই ভ্রামক এর একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ থাকা উচিত হলেও সাধারন তাপমাত্রাতেই তাপজনিত কম্পন বেশি হওয়ায় দ্বিপোলগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। ফলে বহিস্থ চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ না করা হলে পদার্থের কোনো একদিকে নীট চৌম্বকত্ব থাকেনা।

ফলস্বরূপ যতক্ষণ বহিঃস্থ কোনো চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় ততক্ষণ এদের নির্দিষ্ট চৌম্বক ভ্রামক থাকে এবং এরা চুম্বক হিসেবে কাজ করে।ক্ষেত্রটি সরিয়ে নিলেই এরা চুম্বকত্ব হারিয়ে ফেলে।

ফেরোচৌম্বক পদার্থঃ-

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম স্থায়ী ভ্রামকের অভিমুখ সাধারন অবস্থায়(তাপমাত্রায়) নির্দিষ্ট দিকে থাকছেনা। ফেরোচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল স্থায়ী ভ্রামকের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ রয়েছে। একদম প্রথম থেকে ব্যাখ্যা করছি, একটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর সমষ্টিগত ক্রিয়ায় প্রথমত ধরি একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হল।

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে একেকটি ইলেকট্রনের ভ্রামকের অভিমুখ ছিল একেকদিকে। কিন্তু ফেরোচৌম্বকের ক্ষেত্রে পরমাণুসমূহের ভ্রামক অনেকটা জায়গা জুড়ে সংঘবদ্ধ বা locked অবস্থায় থাকে।এই যে অনেকটা জায়গা বা অঞ্চলের কথা বললাম, এর নাম হচ্ছে ডোমেইন।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জায়গার নাম আমরা দিলাম ডোমেইন। একেকটি ডোমেইনে প্রায় 10^16 – 10^19 সংখ্যক পরমাণু থাকে যাদের চৌম্বক মোমেন্ট(স্থায়ী ভ্রামক বোঝানো হচ্ছে)পরস্পর সমান্তরাল থাকে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের সাহায্যে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব না হলেও কোয়ান্টাম ফিজিক্স এখানে কার্যকর এবং এই ক্ষেত্রে “বিনিময় যুগলায়ন” বা exchange integral নামক একটি কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া ঘটে যা ডোমেইনের মধ্যে ক্রিয়াশীল।

কিন্তু একটি ফেরোচৌম্বক পদার্থের কেলাসে বা ত্রিমাত্রিক ক্ষুদ্র গঠনে অসংখ্য ডোমেইন থাকে যাদের একেকজনের মোমেন্টের অভিমুখ একেকদিকে। ফলস্বরূপ নীট ভ্রামক আবারও শূন্য!

কিন্তু এই ক্ষেত্রে যখন চৌম্বক খণ্ডটিকে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় তখন ডোমেইনগুলো নির্দিষ্ট দিক বরাবর বিন্যস্ত হয়। মূলত তখনই খণ্ডটি বহিঃচৌম্বকত্ব প্রকাশ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল ডোমেইনগুলো বিন্যস্ত হবার পর বহিঃস্থ চৌম্বকক্ষেত্র সরিয়ে নিলেও এই বিন্যাস নষ্ট হয়না যদিনা একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর গরম করা হয় অথবা মেকানিক্যাল স্ট্রেস(যেমনঃ হাতুড়ির আঘাত) দেয়া হয়। এভাবে একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হয়।

উচ্চতর ভাবে চিন্তা করতে গেলে ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম, ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে একটি ইলেকট্রনের প্রভাব আরেকটির ওপর পারমাণবিক গণ্ডিতে ক্রিয়াশীল যা আমরা দেখিনা বা অনুভব করিনা। কিন্তু এরকম অসীমসংখ্যক ইলেকট্রন যখন একত্র হয়ে নির্দিষ্ট একটি দিকে প্রভাব বিস্তার করতে চায় তখন তা আর পারমাণবিক গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বাস্তবিক চোখে ধরা পরে এবং কোনো এক অদৃশ্য শক্তির মত উদয় ঘটে চুম্বকশক্তির!

তথ্যসূত্র :-

/ https://www.electrical4u.com/fleming-left-hand-rule-and-fleming-right-hand-rule/

/ http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/magnetic/magfor.html

/ http://www.physics.ucla.edu/marty/diamag/

/ https://en.wikipedia.org/wiki/Diamagnetism

featured image: nasa.gov

কান্না নিয়ে যত কথা

জীবন শুরু হয় কান্না দিয়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সমস্ত উপলক্ষে জড়িয়ে আছে কান্না। কখনো কাঁদি বিষাদে, কখনো বা আনন্দে, কখনো বা কারণ ছাড়াই। কান্না নিয়ে কত গল্পগাথা, কত কবিতা, কত গান। কখনো কি ভেবে দেখেছি আমরা কীভাবে কাঁদি? কেন কাঁদি? পেঁয়াজ কান্নার সাথে আনন্দে কান্না বা বিষাদে কান্নার পার্থক্য কিসে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা নিয়েই আজকের লেখাটি।

কান্না হচ্ছে আবেগের প্রতি সাড়া দিয়ে চোখের মাধ্যমে জল পড়া। চোখের উপরের পাতায় অশ্রুগ্রন্থির অবস্থান। এখানেই অশ্রুর উৎপত্তি হয়। চোখের উপরের অংশের কর্নিয়া এবং শ্বেত-তন্তুতে অনেকগুলো ছোট ছোট অশ্রুনালী (tear ducts) থাকে। এই নালী পথে অশ্রু পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। অশ্রু এই প্রক্রিয়ায় চোখকে আর্দ্র রাখে।

অশ্রুনালী ছড়িয়ে থাকে নাসাগহ্বরেও। যখন কোনো শক্তিশালী আবেগ আমাদের নাড়া দেয় অর্থাৎ আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে তখন চোখ দিয়ে তো অঝোরে জল ঝরেই, নাক দিয়েও ঝরে। একেই বলে ‘নাকের জলে চোখের জলে এক হওয়া’।

ভালো কাঁদতে পারা বা না পারা মনোশারীরিক কোনো মেধার স্বাক্ষর বহন করে কিনা, কিংবা সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভেদে কান্নার ধরণ আলাদা কিনা মনোবিজ্ঞীরা এইসব প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণা আমাদের সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কান্নাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।

নারীরা অবশ্যই পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন। জার্মান সোসাইটি অব অপথ্যালমোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে বছরে নারীরা গড়ে ৩০ থেকে ৬৪ বার আর পুরুষেরা গড়ে ৬ থেকে ১৭ বার কাঁদেন। শব্দ করে কান্নার ক্ষেত্রে নারীদের হার ৬৫%। পুরুষরা এদিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে! মাত্র ৬% পুরুষ শব্দ করে কাঁদেন।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন হয়?

শারীরতাত্ত্বিক দিক থেকে বলতে গেলে পুরুষের শরীরে থাকা টেস্টোস্টেরণ হরমোনই কান্নাকে দমিয়ে রাখে। অন্যদিকে, নারীদের শরীরে থাকে প্রোল্যাক্টিন। প্রোলাক্টিনের উপস্থিতির কারণেই নারীর কান্নার প্রবণতা বেশি। কিন্তু এই দুটি হরমোনের উপস্থিতিই যে আপনার কান্না বা কান্নাহীনতার জন্য সর্বাংশে দায়ী তা কিন্তু নয়। কান্না মূলত তিন প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকার কান্নার ধরণ ও কান্নায় জড়িত রাসায়নিক পদার্থগুলো আলাদা।

কান্নার প্রকারভেদ

চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ, ব্যাকটেরিয়ানাশক এক প্রকার তরল পদার্থ নির্গত হয়। চোখ মিটমিট করলে এই তরল পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। এই ধরনের কান্নাকে বলে বেসাল কান্না (basal tears)। এর ফলে আমাদের চোখ সবসময় আর্দ্র এবং সুরক্ষিত থাকে।

পেঁয়াজ কাটার সময়ের কান্না। এই কান্নাকে বলে রিফ্লেক্স কান্না (reflex tears)। রিফ্লেক্স কান্না চোখকে ক্ষতিকর পদার্থ যেমন বাতাস, ধোঁয়া এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ থেকে রক্ষা করে। এর ফলে চোখে হঠাৎ করে পড়া ময়লা, পোকামাকড় চোখ থেকে বেরিয়ে যায়।

তৃতীয় প্রকার কান্না হচ্ছে প্রাকৃতিক কান্না (physic tears)। এটা হলো আবেগজনিত কান্না। এই ধরনের কান্নার ফলে চোখ থেকে ঝর ঝর বাদল ধারার মতো অশ্রুধারা নামতে থাকে! মানসিক চাপ, হতাশা, বিষন্নতা থেকে এই কান্নার সৃষ্টি। এমনকি অনেক সময় অতিরিক্ত হাসলেও আমাদের চোখ থেকে পানি পড়ে। এটাও আবেগজনিত কান্না।

বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, আনন্দের ফলে চোখ থেকে অশ্রু ঝরা শরীরের আবেগীয় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এক পরীক্ষায় দেখেন, যারা ইতিবাচক সংবাদে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান তারা দ্রুত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

আচ্ছা, এসব নানা প্রকার চোখের জল কি একই রকম দেখতে? উত্তর হচ্ছে- না। ফটোগ্রাফার রোজলিন ফিশার তার নতুন প্রজেক্ট ‘টপোগ্রাফি অব টিয়ারস’ নিয়ে কাজ করার সময় চোখের জলের ব্যাপারে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন। তার নিজের চোখের জলকে একটি স্লাইডে রেখে শুকিয়ে ফেলেন। তারপর আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণের পর তার অনুভুতি প্রকাশ করেছেন- “এটা সত্যিই মজার ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্লেন থেকে দেখা নিচের কোনো দৃশ্য।”

ফিশার বিভিন্নরকম অশ্রু একই রকম দেখতে কিনা তা জানার জন্য কয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফি প্রজেক্টটি করেন। নিজের এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে একশয়েরও বেশি চোখের জলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এগুলো পরীক্ষা করেন এবং ছবি তোলেন। এর মধ্যে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর অশ্রুও ছিল। তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখের জলের যে গঠন দেখেন সাধারণভাবে তা ছিল স্ফটিকাকার লবণ।

কিন্তু, বিভিন্ন আবেগীয় অবস্থায় ঝরা জলের আণুবীক্ষনিক পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় এদের আকার এবং গঠন ভিন্ন। একই রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত দুটি প্রাকৃতিক কান্নার ছবি ছিল ভিন্ন। মানে আপনি আনন্দে কাঁদলেন আর আপনার বন্ধু দুঃখ পেয়ে কাঁদলেন, এই দূরকম চোখের জল দেখতে আলাদা হবে। এদের সান্দ্রতা, গঠন, বাষ্পীভবনের হার সহ আরো অনেক কিছুতেই পার্থক্য থাকবে।

চিত্রঃ বিভিন্ন সময়ের কান্নার আণুবীক্ষণিক গঠন।

ফিশারের গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় বিভিন্ন দৃষ্টকোণ থেকে দেখা চোখের শুকনো জলের স্লাইড আকাশ থেকে দেখা বিশাল কোনো দৃশ্যের মতো। তাই তিনি একে বলেন, ‘মনোভূখন্ডের অন্তরীক্ষ দৃশ্য’।

কান্নার সাথে জড়িত হরমোন

প্রোল্যাক্টিন এবং টেস্টোস্টেরণ ছাড়াও কান্নায় আরো কিছু হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। সেরকম একটি হরমোন হচ্ছে সেরেটোনিন। গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চা জন্মদানের পরে শরীরে ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। ট্রিপটোফ্যান সেরেটোনিনের ক্ষরণ ত্বরান্বিত করে। ট্রিপটোফ্যান কমে গেলে আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং কান্নার প্রবণতা বাড়ে। প্রেমে পড়লেও ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। এজন্যই দেখা যায় প্রেমাক্রান্ত নারী বেশি কাঁদে।

কান্না কি উপকারী?

হ্যাঁ, উপকারী। চলুন দেখি কান্না আমাদের কী কী উপকার করে। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ATCH (Adrenocorticotropic hormone) ক্ষরিত হয়। এর প্রভাবে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল উৎপন্ন হয়। কর্টিসল রক্তচাপ বাড়ায়। রক্তে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে তোলে। আরো বিভিন্ন শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন আমাদেরকে কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপ কমানোর মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে কান্না।

কান্নাকাটির পর শান্ত অনুভব করার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই আছে। এর কারণ হলো, কাঁদলে অতিরিক্ত ATCH বের হয়ে যায় এবং কর্টিসোলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে চাপ কমে যায়। আমাদের শরীরে থাকা চাপ নিবারক আরেকটি উপাদান হচ্ছে লিউসিন এনকেফালিন (leucine enkephalin)। আবেগজনিত অশ্রুর সাথে এটি নিঃসৃত হয়। এটি ব্যথা কমায় এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়। পেইনকিলার হিসেবে আমরা যে ওষুধগুলো খাই লিউ এনকেফালিন অনেকটা সেরকম কাজ করে।

বিভিন্ন বয়সে কান্না

প্রথমেই তাকাই শৈশবে। নতুন জন্মানো শিশুর কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। পানি পড়ে আরেকটু বড় হলে। কান্না আসলে শিশুদের যোগাযোগের মাধ্যম। ক্ষুধা লাগলে বা ঘুম পেলে কিংবা ব্যথা পেলে তারা কাঁদে। শিশু আরেকটু বড় হলে ধরা যাক ১০ মাস বয়সে কাঁদে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। দক্ষ অভিনেতার মতো এ কান্নাকে বলে মায়াকান্না (crocodile tears)।

বয়সন্ধীকালে টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণ ক্ষরিত হয়। এসময় মেয়েরা বেশি কাঁদে। ছেলেরা লক্ষ্যণীয়ভাবে কম কাঁদে। মেয়েদের বেশি কাঁদার আরেকটা কারণ তাদের অশ্রুনালী ছেলেদের তুলনায় কম দীর্ঘ। এজন্য দ্রুত চোখে পানি আসে। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার সাথে সাথে কান্নার ধরণ বদলাতে থাকে। কারণ টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণের মাত্রায় পরিবর্তন আসে তখন। পুরুষেরা বেশি কাঁদতে থাকে, নারীরা কম।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কান্না

সংস্কৃতি ভেদে কান্না ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন পশ্চিমা সমাজে কান্নাকে ইতিবাচকভাবে নেয়া হলেও এশীয় সমাজে বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকা এবং ইতালির লোকজন চীন এবং ঘানার লোকজনের চেয়ে বেশি কাঁদে।

পার্থক্য আছে শেষকৃত্যে কান্নার ধরণেও। যেমন ফিজিতে আপনি মরদেহ দাফন করার আগে পর্যন্ত কাঁদতে পারবেন না। ইরানে আবার জোরে জোরে কাঁদলে সমস্যা নাই। ধর্মভেদেও কান্না আলাদা হয়। যেমন ইসলামে কান্নাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আবার বুদ্ধধর্মে কান্না অনুমোদিত নয়।

কতটুকু কান্না স্বাভাবিক?

শিশুদের জন্য প্রতিদিন তিন ঘন্টা কাঁদা স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি কাঁদলে বুঝতে হবে তাদের চিকিৎসা দরকার। ঠান্ডা লাগা বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্কদের কান্নার ক্ষেত্রে কোনো সময় আসলে নাই। কান্নার পরিমাণ অনেকাংশেই প্রভাবিত হয় মানুষের পরিবেশ দ্বারা।

আপনি কতটুকু কাঁদছেন তা বলে দেয় আপনি মানসিকভাবে কতটুকু সুস্থ। অতিরিক্ত কান্নাকাটি ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। আবার একেবারে না কাঁদা বা কম কাঁদাটাও তীব্র ডিপ্রেসনের উপসর্গ হতে পারে। এই ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন, নেদারল্যান্ডসের গবেষকরা বেশি কান্না বা কম কান্না ডিপ্রেসনের লক্ষণ এই দাবীর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাননি।

কান্না যখন আবেগ ছাড়াও বেশি কিছু

আপনাকে কেউ অশ্রুসজল চোখে দেখার মানে এই নয় যে আপনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন! শরীরের অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। অশ্রুনালী বন্ধ হয়ে গেলেও আপনার চোখ প্লাবিত হতে পারে। বার্ধক্য, আঘাত, সংক্রমণ, প্রদাহের কারণে এমন হতে পারে। এই ধরনের কান্নার প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে বলে প্যাথলজিক্যাল কান্না। আবার কিছু কিছু রোগ যেমন, স্ট্রোক, আলঝেইমার, মাল্টিপল সেরোসিস ইত্যাদির কারণেও চোখ থেকে পানি পড়তে পারে।

গবেষকরা বলেন, এরকম অতিরিক্ত কান্নাকাটি বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা ছাড়াও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সেরেটোনিনের পরিমাণ কমে যাওয়ার উপর দোষ চাপানো যেতে পারে। সর্বোপরি, কান্না যতক্ষণ না প্যাথলজিক্যাল হচ্ছে এর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

সবশেষে বলা যায়, মানুষ একমাত্র প্রাণী যে আবেগে কাঁদতে পারে। কান্না শুধু মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্যেই নয়, এর আছে মানিসকভাবে মানুষকে সুস্থ রাখার বিশাল শক্তি। মন খুলে কাঁদা আমাদের সুস্থ এবং চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করে। কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, এটা একটা শক্তি। তাই, কান্না পেলে মন খুলে কাঁদুন। সুস্থ থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. wikipedia.org/wiki/crying

২. www.apa.org/monitor/2014/02/cry.apx

৩. http://www.telegraph.co.uk/news/science/science-news/11227082/Why-do-we-cry-tears-of-joy.html

৪. Microscopic view of dried human tears, joseph stromberg, smithsonian magazine

featured image: istockphoto.com

নিজে নিজে কথা বলা পাগলামী নয়, প্রতিভা!

‘আত্মকথন’ অর্থাৎ একা একা কথা বলার কারণে অনেকের নামের সাথেই ‘পাগল’ তকমাটা পাকাপাকীভাবে জুড়ে যায়। অনেকেই হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, কিছু মানুষ মাঝে মাঝে শূন্যে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে একা একা আপনমনে বিড়বিড় করে যাচ্ছে। আলবার্ট আইনস্টাইনও কিন্তু নিজের সাথে কথা বলতেন। এমন অদ্ভুত স্বভাবের যেসব মানুষ দেখলেই তাদের পাগলের তালিকায় ফেলে দেয়া হয়, তাদের জন্য একটা সুখবর আছে। একা একা কথা বলা সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতার লক্ষণ না হলেও এটা একটা প্রতিভা!

‘দ্য কোয়ার্টারলি জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সুইগলি এবং গ্যারি লুপ্‌য়্যা মনে করেন, একা একা কথা বলা প্রকৃতপক্ষে উপকারী। তারা এর কিছু উপকারিতা সম্পর্কে বলেছেন, এগুলোর সামান্য আলোকপাত করছি।

নিজের সাথে কথা বলার ফলে মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়

যখন কোনো মানুষ একটা কিছু চিন্তা করে এবং আপনমনেই বিড়বিড় করে, তখন তার চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়, যার ফলে স্মৃতি অধিকতর কর্মক্ষম হয়। চিন্তা করা এবং চিন্তার বিষয়বস্তু আপনমনে বিড়বিড় করা- এই অনবরত চর্চার কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ করার সামর্থ্য বাড়ে যা ব্যক্তিকে প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন হতে সাহায্য করে।

image source: slate.com

এ অভ্যাস প্রয়োজনীয় বস্তু দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করে

গবেষণা চালানোর সময় মনোবিজ্ঞানীরা কিছু মানুষকে বলেছিলেন সুপার মার্কেট থেকে দুটি জিনিস নিয়ে আসতে। পরীক্ষার প্রথম ধাপে তারা অংশগ্রহণকারীদের বলেছিলেন মার্কেটে নির্দেশিত জিনিসগুলো খোঁজার সময় তারা যেন মুখ দিয়ে কোনো শব্দ না করে নীরবে খুঁজতে থাকে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে তাদেরকে বলেছিলেন খোঁজার সময় তারা যেন আওয়াজ করে জিনিসগুলোর নাম বলতে থাকে। এর ফলাফল, দ্বিতীয়বারে তারা প্রথমবারের চেয়ে কম সময়ের মধ্যে জিনিসগুলো খুঁজে পেয়েছিল।

এই গবেষণা আরো বলে ‘আত্ম-কথন’ ব্যক্তিকে তার চিন্তাভাবনার সুষ্ঠু বিন্যাস ঘটাতে সাহায্য করে। একজন মানুষ সারাদিন অজস্র বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে। নিজের সাথে কথা বলার ফলে একজন একটা নির্দিষ্ট ব্যাপারে স্পষ্টভাবে চিন্তা করতে পারে এবং গুরুত্ব অনুযায়ী চিন্তাভাবনাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, এ অভ্যাস ব্যক্তিকে তার লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে। প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং সুবিন্যস্ত চিন্তাভাবনা একজন মানুষকে তার পরিকল্পিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

image source: ngozionwukwe.blogspot.com/

তাহলে এখন বলা যায়, ‘আত্মকথক’দের আসলে পাগল বলা উচিত নয়। যাদের এমন অভ্যাস আছে, তাদের মন খারাপ করার কিছু নেই। তার উপরে এটা তো ‘প্রতিভা’ বলে সনদ দিচ্ছে!

featured image: krxmedia.com