কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

শরতের পাতার রঙের রসায়ন

শরতের আগমনের সাথে সাথেই গাছের পাতার রঙের মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। এ বিচিত্রতা যদিও আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে চোখে পড়ে, কিন্তু এর মধ্যে যে রসায়নের খেলা চলে তা নিয়ে আমরা হয়তো খুব কমই মাথা ঘামাই।

পাতায় বিভিন্ন রঙ প্রদানকারী যৌগ সম্পর্কে জানার আগে করার আগে প্রাথমিক অবস্থায় এদের উৎপত্তি বিষয়ে জেনে নেই। এ উদ্দেশ্যে যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বন্ধনের উদ্ভব ঘটে। শরতের পাতার রঙ পরিবর্তনের পিছনে একক ও দ্বি-বন্ধনের মিশ্রিণ এবং কনজুগেশন বন্ধনেরও ভূমিকা আছে। কজুগেশন বন্ধনের কারণে পাতায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের দৃশ্যমান আলো শোষিত হতে পারে। চোখে আপতিত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ভিন্নতার কারণে পাতার রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়।

ক্লোরোফিল

পাতার সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল নামের উপাদানটি। পাতার কোষের ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকে এ ক্লোরোফিল, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ক্লোরোফিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক।

গ্রীষ্ম শেষ হবার সাথে সাথে যেহেতু উষ্ণতা ও সূর্যালোক উভয়ই প্রতিকূলে যেতে থাকে তাই তখন ক্লোরোফিল উৎপাদনের হারও কমতে থাকে। অন্যদিকে পাতার মাঝে সঞ্চিত ক্লোরোফিল বিয়োজিত হতে থাকে। এ অবস্থায় পাতার রঙ সবুজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আদি হলদেটে রূপ ধারণ করে।

ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড

রাসায়নিক যৌগের পরিবারের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড বিশাল স্থান দখল করে আছে। এরা লাল ও হলুদ রঙের জন্য দায়ী। ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্যাভিনয়েড ক্লোরোফিলের সাথে উপস্থিত থাকে। এমনকি এমনকি গ্রীষ্মেও। তবে গ্রীষ্মে ক্লোরোফিল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে বিধায় পাতার মাঝে এদের প্রভাব দেখা যায় না। ফলে পাতা সবুজ দেখায়।

তবে শরতের আগমনের সাথে সাথে আবার ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি প্রকট হতে থাকে ফলে হলুদ রঙের উদ্ভব ঘটে। এদের মাঝে ক্যারোটিনয়েড লাল আর ফ্যাভিনয়েড কমলা রঙের আবির্ভাব ঘটায়। শরত শেষ হবার সাথে সাথে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি কমতে থাকে।

ক্যারোটিনয়েডের আরো কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিন (গাজরে থাকে), লুটেইন (ডিমের কুসুমের হলুদ রঙের জন্য দায়ী), লাইকোপিন (টমেটোর টকটকে লাল রঙের জন্য দায়ী)।

অ্যান্থোসায়ানিন

ফ্যাভিনয়েড শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত অ্যান্থোসায়ানিন। কিন্তু ফ্যাভিনয়েডের মতো অ্যান্থোসায়ানিন সারা বছর জুড়ে পাতার মধ্যে থাকে না। বেলা নামার সাথে সাথে পাতার মাঝে অবশিষ্ট শর্করা সূর্যালোকের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন ঘটায়।

যদিও পাতার মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রকৃত ভূমিকা জানা যায়নি, ধারণা করা হয় অ্যান্থোসায়ানিন আলোক নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। অর্থাৎ পাতাকে অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। আর পাতাকে রঙ দানের ক্ষেত্রে অ্যান্থোসায়ানিন লাল, বেগুনি ও অন্যান্য মিশ্রিত রঙের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকে। পাতার রসের মধ্যে অম্লের উপস্থিতির কারণেও রঙের আবির্ভাবের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ কম্পাউন্ড কেমিস্ট্রি, http://www.compoundchem.com/2014/09/11/autumnleaves/

featured image: turningstar.com

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন?

এক মাইলকে অর্ধেক করুন। আধেক আধেক পেলেন তো? আধেককেও সমান ভাগে অর্ধেক করুন। চতুর্থাংশ পেলেন। এমন করে চলতে দিলাম, যতক্ষণ না একটা পরমাণুর ব্যাসের দৈর্ঘ্য পর্যন্ত পৌঁছানো গেল। কিন্তু, এরপর? আমরা কি অসীম পর্যন্ত এটা চালিয়ে যেতে পারব? নাকি একটা সীমায় গিয়ে থমকে যেতে হবে? প্রশ্নটি হচ্ছে আসলে কতটুকু সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব? আবার তার সীমা আছে কিনা?

2চিত্রঃ কত ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব?

সমকালীন কিছু তত্ত্বের সাফল্য একে ব্যাখ্যার আওতায় ফেলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই ধাঁধাঁটি আড়াই হাজার বছর আগের। গ্রীক দার্শনিক জেনোর বিখ্যাত এক প্যারাডক্স। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী থেকে এ রহস্যজনক ধাঁধাঁটির বিরাজ শুরু। এই কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এর জট খুলতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সমাধানের পর আরেক প্রশ্ন এসে হাজির, ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য কি আছে, যার পর আর ভাগ করা যাবে না? প্যারাডক্সটি সমাধান হয়েও এই আঙুল তোলা প্রশ্নটি সেঁটে আছে। জেনোর প্যারাডক্সটি সংক্ষেপে এমনঃ গ্রীক বীর একিলিস আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা। একিলিস সেরা দৌড়বিদ, আর কচ্ছপ তো কচ্ছপের মতোই।

জেনো বললেন,কচ্ছপকে যদি সামান্য সামনে থেকেও শুরু করতে দেয়া হয় একিলিস কখনো কচ্ছপকে পিছনে ফেলতে পারবে না। বাস্তবিক দৃষ্টিতে,একিলিসের টপকে যাওয়া কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু জেনোর যুক্তি প্রদর্শনের দৃষ্টিকোণই একে দীর্ঘায়ু দান করেছে। জেনো দেখালেন,কচ্ছপ সামনে থাকার কারণে ধীরগতির হলেও একিলিস যখন এসে কচ্ছপকে ধরে ফেলবেন ততক্ষণে কচ্ছপ আরেকটু এগিয়ে যাবে। এভাবে আসলে কচ্ছপটা এগিয়েই থাকছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবধানে।

3 চিত্রঃ জেনোর যুক্তি বলছে,একিলিস কচ্ছপ থেকে দূরত্ব কমাতে থাকবে কিন্তু তারপরেও পিছিয়েই থাকবে।

অবাক করা দিকটি হলো, জেনোর এই প্যারাডক্সের সমাধান করতে দীর্ঘ সময় ধরে গণিতকে উন্নয়ন করতে হয়েছে। এখন আমরা জানি জেনোর যুক্তি স্পষ্টভাবে ভুল ছিল। গণিতবিদেরা অসীম সংখ্যাকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে যোগফল বের করা শিখে যাওয়ার পর এখন ঠিক কোন সময়টাতে একিলিস কচ্ছপকে পার করে ফেলবে তার গণিতও বের করে ফেলেছেন। বর্তমান পর্যায়ে এসে পদার্থবিদেরা ন্যূনতম পরম দৈর্ঘ্য থাকার অস্তিত্ব থাকাকে আরেক তত্ত্বের সহায়ক বলে মনে করছেন। যখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোয়ান্টাম ভার্সনে প্রবেশ করা হয় অসীমের ব্যাপার স্যাপার চলে আসে। এর আদুরে নাম ‘কোয়ান্টাম গ্রাভিটি’।

জেনোর বিশ্বাসের মতো করে ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যকে মেনে নিলে তত্ত্ববিদেরা অসীমতা সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটিকে সসীম সংখ্যায় দেখাতে পারেন। আর সসীম দৈর্ঘ্য পাওয়ার এক উপায় স্থান-কালকে কেটে কুঁচি কুঁচি করে হিসাব করা। মানে একে বিচ্ছিন্নতায় ফেলে দেয়া। এ পর্যায়ে এসে জেনোও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বেন। কারণ,কোয়ান্টাম গ্রাভিটিকে যৎসামান্য দৈর্ঘ্যের ধারণায় আনা গেলেও,বিচ্ছিন্নতা দিয়ে সর্বোপরি এটাকে ধরে রাখা যায় না। মানে স্থান এবং কালকে আলাদা করে তো আর এটা করা সম্ভব না। কোয়ান্টাম গ্রাভিটির কিছু তত্ত্ব বলে,ন্যূনতম দৈর্ঘ্যের কথা আসে রেজুলেশন লিমিট থেকে,যেখানে রেজুলেশন লিমিট বিচ্ছিন্নতার ধার ধারে না।

মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোনো নমুনা পর্যবেক্ষণ করার কথা কল্পনা করা যাক। বিবর্ধন করতে করতে মাইক্রোস্কোপের রেজুলেশন লিমিট অতিক্রম করে ফেললে ছবিটি ঘোলা হয়ে যাবে। এটা যদি ডিজিটাল ফটোর মতো জুম করা হয়,আমরা দেখতে পাব আলাদা আলাদা একেকটা পিক্সেল। কিন্তু আরো জুম করলেও সেই পিক্সেলের থেকে নতুন কোনো তথ্য আমরা পাব না। উভয় ক্ষেত্রেই রেজুলেশনের একটা বাধাধরা ব্যাপার বা সীমা আছে।

স্ট্রিং থিওরিতে স্ট্রিং এর সম্প্রসারণ সীমাবদ্ধ বলে বিশ্লেষণ করা হয়। একারণে নয় যে,সব বস্তুই চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এখানে লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি নামে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের কথা এসে যায়, যেখানে বলা হচ্ছে স্থান ও কাল পৃথক পৃথক ব্লকে বিচ্ছিন্ন। প্ল্যাংকের ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যের (১০–৩৫ মিটার) তথ্যটিও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আইনস্টাইন বলেছেন স্থান এবং কাল হচ্ছে যুগ্ম-একক সত্তা, একে বলে ‘স্থান-কাল’। অধিকাংশ পদার্থবিদই আইনস্টাইনের এ দৃষ্টিভঙ্গীকে মেনে নেন। তাই বেশিরভাগ প্রস্তাবনা বা অগ্রসরতাই কোয়ান্টাম গ্রাভিটির স্থান এবং কালকে হয় অবিচ্ছিন্ন না হয় উভয়কেই বিচ্ছিন্ন হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু কিছু ভিন্ন মতাবলম্বী কেবল স্থান বা কেবল কালকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে ধরার পক্ষে।

কেমন করে পদার্থবিদেরা ঠিক করবেন,স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন? বিচ্ছিন্ন গঠন এত ক্ষুদ্র যে, পরিমাপ করা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু কিছু মডেল অনুযায়ী বিচ্ছিন্নতা কণাসমূহ কীভাবে স্থান দিয়ে চলে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রভাব,কিন্তু কণাদের যোগফল অনেক বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করায়। এটা যদি সত্য হয় তবে দূর নাক্ষত্রিক বস্তু থেকে পাওয়া ছবি আমাদের ভুল তথ্য দিতে পারে। ছবির ওপর ছবি উপরিপাতিত বা ছবি বিচ্ছিন্ন হয়ে আসতে পারে। বিভিন্ন সময়ে নির্গত কণা একই সময়ে পৃথিবীতে আসায় অথবা একই সময়ে নির্গত হওয়া কণার বিভিন্ন সময়ে গন্তব্যে আসায় এমন হতে পারে। জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানীরা দুই ধরনের সিগনালের জন্যই অনুসন্ধান চালিয়েছেন,কিন্তু সেই সোনার হরিণরূপী সিগনালের কোনো নজির খুঁজে পাননি। তাই সিদ্ধান্তও নেয়া যায়নি।

এমনকি যদি কণাদের গতির ওপর সরাসরি প্রভাব অপরিমাপযোগ্য হয়, বিচ্ছিন্ন স্ট্রাকচারে ত্রুটি ধরে ফেলা যাবে। একটি হীরক খণ্ড কল্পনা করা যাক। হীরক খণ্ডে আণবিক স্ফটিকে সামান্যতম ভেজাল থাকলে স্ফটিকের নির্দিষ্ট পথে আলো পরিবহনই নষ্ট হয়ে যায়। এটা হীরকের স্বচ্ছতা ধ্বংস করে। যদি আপনি অলংকারের দোকান থেকে হীরের দাম থেকে কিছু বুঝতে চান সেটা হল হীরেটা কতটা নিখুঁত তার হার! স্থান-কালের ব্যাপারটাও তেমন, যদি বিচ্ছিন্ন হয় তবে ত্রুটি থাকবে, সেই ত্রুটি আলোর পরিবহনে বাধা দিবে।

স্থান-কালের বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ খোঁজা ভবিষ্যতের আধুনিক প্যারাডক্স হতে যাচ্ছে। ব্ল্যাক হোলের তথ্য হারানোর সমস্যা তার মধ্যে একটি। স্টিফেন হকিং যেটা ১৯৭৪ সালে বিবৃত করেছেন। আশা করি জেনোর অসন্তোষজনক প্যারাডক্স এর মত স্থান-কালের প্যারাডক্স সমাধান করতে আমাদের ২০০০ বছর লাগবে না!

তথ্যসূত্রঃ

http://www.pbs.org/wgbh/nova/blogs/physics/2015/10/are-space-and-time-discrete-or-continuous/

 

শাহরিয়ার কবির পাভেল
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনের আয়না এবং স্পেশাল রিলেটিভিটির দুইটি স্বীকার্য

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। সবচেয়ে আলোচিত এবং মেধাবীও বলা চলে। বিজ্ঞানী মাইকেলসন আর মর্লি আলোর বেগের আপেক্ষিকতার পরীক্ষা করেছিলেন পরীক্ষাগারের, যন্ত্র পাতির সাহায্য নিয়ে। আর কিশোর আইনস্টাইন সেটা করেছিলেন তার মাথার পরীক্ষাগারে, একটি ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে। আজ আমরা সেই পরীক্ষার কথায় জানবো। তার সাথে সাথে জানবো এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে কিভাবে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে যাই।

Image result for albert einstein wallpaper

তখন ১৮৯৬ সাল। আইনস্টাইনের বয়স কেবল ষোল। আইনস্টাইন তখনও মাইকেলসন আর মর্লির ইথারের পরীক্ষার বিষয়ে একদমই জানতেন না। ইথারের অস্তিত্ব যে কিছুটা সন্দেহের মুখে পড়ে গেছে তা না জেনেই আইনস্টাইন তার জীবন্ত পরীক্ষাগার, নিজের মাথায় একটি থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। আইনস্টাইন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন, “কি ঘটবে যদি আমি এখন আমার দুই হাতে একটি আয়না ধরে আলোর বেগে দৌড়াতে শুরু করি। আমি নিজে কি নিজের প্রতিচ্ছবি সেই আয়নায় দেখতে পাবো?” বলে রাখা ভাল যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতায় শুধু আলোর বেগ কেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে যাওয়ার বিষয়েও কোন রকম বিধি নিষেধ ছিল না।

বিজ্ঞানীরা আরো আগে থেকেই জানতেন যে, আলোর বেগ ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ড। কিন্তু কার সাপেক্ষে আলোর এই বেগ? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য তারা ইথারের ধারণার অবতারণা করেছিলেন। অর্থাৎ, আইনস্টাইন যখন আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেবেন তখন আলো ইথার মাধ্যমে ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আইনস্টাইনের হাতে ধরে রাখা আয়নাটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইনস্টাইন নিজেও আলোর বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে আলো আর আইনস্টাইনের বেগ সমান বলে আলো কখনই আইনস্টাইনের মুখমন্ডল থেকে আয়নায় পৌঁছাতে পারবে না।

এ পর্যন্ত বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার আমরা মনে করি দেখি যে, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটিতে কি বলা হয়েছিল। এই স্বীকার্য আমাদের বলেছিল যে, “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”। যার অর্থ আমরা যদি একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি বস্তু বিবেচনা করি তাহলে আমরা কোনভাবেই বলতে পারব না যে কে গতিশীল আছে আর কে স্থির আছে।

চলুন, এখন আবার আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্টে ফিরে যাই। আইনস্টাইনের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে এই বিষয়টি নিশ্চিত যে, আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড়ালে আসলে আমাদের প্রতিবিম্ব আয়নাতে আমরা দেখতে পারবো না। ফলে নিজেদের মুখ আমরা আয়নায় দেখতে পাবো না। তাহলে কি দাঁড়ালো? একজন যদি আলোর বেগে আয়না নিয়ে দৌড় দেয় এবং আয়নায় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব সেখানে পরছে না তখনই সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে, সে আসলেই আলোর বেগে গতিশীল আছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার স্বীকার্য আমাদের বলেছিল কোন একটি পরীক্ষা স্থির অবস্থায়ই করা হোক বা, সমবেগে গতিশীল থাকা অবস্থায়ই করা হোক না কেন একই ফলাফল দেবে। কিন্তু এই থট এক্সপেরিমেন্টে এই স্বীকার্যটি তো ভুল প্রমাণ হয়ে গেল!! তাহলে?

Image result for looking in mirror

আইনস্টাইন তার এই থট এক্সপেরিমেন্টে ইথার ধারণাটিকে প্রথমে সত্য বলে ধরে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আলোর বেগ শুধু ইথারের সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড থাকে। অর্থাৎ, ইথার ধারণা সঠিক হলে গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটি ভুল হয়ে যায়।

যদি গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যকে সত্য হতে হয় তাহলে নিজের প্রতিবিম্ব আয়নায় দেখা যেতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। আর সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই ধ্রুব বা, একই হবে। তাহলে আইনস্টাইন যদি আলোর বেগেও যান তাহলেও আলো তার সাপেক্ষে আলোর বেগেই চলবে। ফলে আলো স্বাভাবিকভাবেই আয়নায় পৌঁছাবে আর আইনস্টাইন তার মুখমন্ডল দেখতে পাবেন।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কারভাবে বলা যাক। ধরি, আইনস্টাইন একটি আয়না নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে তিনি যদি এখন তার ডান হাতটি হালকা নাড়ান তবে খুব কম সময়ের মাঝে সামনের আয়নাতে তিনি তার ডান হাত নাড়ানোটি দেখতে পাবেন। এখন যদি তিনি আলোর কাছাকাছি বেগে আয়নাটি নিয়ে দৌড় দেন তবে গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা অনুসারে তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাবে (যদি কোন গাড়ি ১০ মি./সেকেন্ড বেগে যায় আর আপনি ৫ মি./সেকেন্ড বেগে সেই একই দিকে দৌড়ান তাহলে আপনার কাছে মনে হবে গাড়ির বেগ কমে ৫ মি./সেকেন্ড হয়ে গিয়েছে। একই যুক্তিতে আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে গেলে আপনার সাপেক্ষে আলোর বেগ কমে যাওয়ার কথা)। তাহলে ডান হাত নাড়ানোর অনেক পরে তিনি আয়নাতে তার হাত নাড়ানো দেখতে পাবেন। সময়ের এ পার্থক্য দিয়েও যে কেউ বলে ফেলতে পারবেন যে তিনি আসলে স্থির নয় বরং গতিশীল আছেন। অর্থাৎ, আপনি স্থির থাকলে আলোর বেগ আপনার কাছে যত হবে আপনি যদি আলোর কাছাকাছি বেগেও দৌড়ানো শুরু করেন তবেও আলোর বেগ আপনার সাপেক্ষে ৩,০০,০০ কি.মি./সেকেন্ডই থাকতে হবে। তবেই শুধুমাত্র গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আর এটি সত্য হলে আলোর বেগের ওপড় ইথারের আর কোন প্রভাব থাকে না। সুতরাং ইথার ধারণাটিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

অর্থাৎ, গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্য এবং ইথার ধারণা এ দুটোই একই সাথে সত্য হতে পারেনা। এদের যেকোন একটাকে মিথ্যা হতেই হবে। এর আগেই মাইকেলসন-মর্লির এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা দেখেছি ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হয় নি। আইনস্টাইনও দেখলেন আলোর বেগকে যদি সব কিছুর সাপেক্ষে সর্বদা একই ধরে নেয়া হয় তাহলে ইথারের আর প্রয়োজন পড়ে না। এভাবেই ইথার ধারণাটি আইনস্টাইন বাতিল করে দিলেন আর গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যটিকেই নিজের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিরও প্রথম স্বীকার্য বানিয়ে নিলেন। আর দ্বিতীয় স্বীকার্যতে বললেন, আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব যা আমরা উপড়ের থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখলাম।

আলোর বেগ সব কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব এই কথাটি মেনে নিতে অনেকেরই প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হয়। তাই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাক। ধরুন, পৃথিবীর মানুষ আর এলিয়েনদের মাঝে একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি একটি স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে গেলেন। একজন এলিয়েনও তাদের স্পেস শিপ নিয়ে মহাকাশে চলে গেলো। দুজনের স্পেস শিপেই কিন্তু হেডলাইটের মতো লাইট জ্বলার ব্যবস্থা আছে। হঠাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াই আপনি আপনার স্পেস শিপটি নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। তখনই এলিয়েন স্পেস শিপটি ২,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ছুঁটে আসল। আর আসতে আসতে ১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে গুলি ছুঁড়তে পারে এমন একটি বন্দুক থেকে আপনার দিকে গুলি ছুঁড়তে লাগলো। তাহলে আপনি গুলিগুলোর বেগ কত দেখবেন? নিশ্চয় উত্তর দেবেন যে, আপনি দেখবেন গুলিগুলো ২,০০,০১০ কি.মি./সেকেন্ড বেগে আপনার দিকে ধেয়ে আসছে। কারণ গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা বলে যে, গুলির বেগের সাথে স্পেস শিপের বেগ যোগ হয়ে যাবে। এখন স্পেস শিপটি যদি হঠাৎ করে তার তার হেড লাইটটি জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি দেখবেন? আলোর বেগ কত হবে? স্পেস শিপের বেগ + আলোর বেগ? মানে ৫,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড? গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা তো তাই বলে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না। তখনও আপনি দেখবেন আলোর বেগ শুধু আলোর বেগের সমানই। মানে সর্বদাই ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ড। এক ফোঁটা কমও নয় আবার এক ফোঁটা বেশিও নয়। এটাই আইনস্টাইনের দ্বিতীয় স্বীকার্য। এটাই সত্য!

আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যায়। এ কারণেই মাইকেলসন-মর্লি যখন তাদের পরীক্ষাটি করেন তখন তাদের পরীক্ষায় সোজা পাঠানো আলো আর সমকোণে পাঠানো আলোর বেগের মাঝে কোন পার্থক্য ধরা পড়েছিলো না। পরবর্তিতেও অনেক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে।

অর্থাৎ, দেখা গেলো আইনস্টাইনের এই ছোট্ট থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে আমরা স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি পেয়ে গেলাম। এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব। তাই চলুন এ স্বীকার্য দুটি আরেকবার সুন্দর করে আমরা লিখে ফেলি। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি হলঃ

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

এ দুটি স্বীকার্যের উপড় ভিত্তি করে আমরা কাল দীর্ঘায়ন সম্বন্ধেও বুঝতে পারি। গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় স্বীকার্য, যেখানে সময়কে পরম হিসেবে ধরা হয়েছিল তা যে ভুল তা আমরা আইনস্টাইনের উপড়ের দুটি স্বীকার্য থেকে পাই। অর্থাৎ, গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্য ঠিক হলেও দ্বিতীয় স্বীকার্যে পরম সময়ের বদলে পরম আলোর বেগ ব্যবহার করলেন আইনস্টাইন। এছাড়াও আমরা দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, ভর বা, ভরের আপেক্ষিকতা এবং ভর আর শক্তি যে একই জিনিস এমন অনেক কিছু আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি থেকে পরবর্তিতে জানতে এবং বুঝতে পারি। এ বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তি কোন এক লেখায় কথা বলা যাবে। আজ এ পর্যন্তই। কষ্ট করে এতদূর পড়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।