ত্বকের কোষ থেকে সন্তান উৎপাদন

বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বসে নেই। তারা নিত্যনতুন চিন্তা ভাবনা করে চলেছেন। বিজ্ঞানীদের নানা কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয় যা আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক জীবেরই প্রজনন হয়। প্রাণীদের ক্ষেত্রে সেই প্রজনন ঘটে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে। যৌনক্রিয়ার সময় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু মিলিত হয় এবং নিষেকের পর ভ্রূণ গঠিত হয়। সেই ভ্রূণ পরিণত হয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এটাই প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজননের সরল একটি বর্ণনা।

কিন্তু বিজ্ঞান তো এতটুকুতেই থেমে নেই। তারা মানবদেহের প্রজনন ক্রিয়া বোঝার জন্য অনরবত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার ফলস্বরূপ ১৯৯৭ সালে আমরা পেয়েছি ‘ডলি’কে। ডলি ভেড়ার কথা আমরা সবাই জানি। ডলির মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা প্রথম কোনো স্তন্যপায়ীকে ক্লোন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর আগে ব্যাঙের ক্লোন করা হয়েছিল।

ডলির ক্লোন করা ছিল প্রজনন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ। তারপর আমরা দেখেছি টেস্টটিউব শিশু। এখানে নারী ও পুরুষের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দেহের বাইরে মিলিত করা হয়। কিন্তু ত্বকের কোষ? এটি নিশ্চয় পরোক্ষ হোক আর প্রত্যক্ষ হোক প্রজননের মতো কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যদি বলা হয় ত্বকের কোষ থেকে শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণু তৈরি সম্ভব তাহলে হতবাক হতেই হয়।

চিত্র: ল্যাবরেটরিতে তৈরি ডিম্বাণু

বিজ্ঞানী হাইয়াশি ইঁদুরের ত্বক কোষ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তা থেকে ইঁদুরের সন্তানের জন্ম হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষেত্রেও এটি সম্ভব হবে। এমন অনেক দম্পতি আছেন যাদের সন্তান হয় না। অনেক সময় দেখা যায় পুরুষের শুক্রাণুতে সমস্যা রয়েছে। আবার অনেক সময় নারীর ডিম্বাণুতেও সমস্যা দেখা দেয়। আবার বয়স হয়ে গেলে নারীরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে যায়, কারণ তখন তাদের ডিম্বাণু তৈরি হয় না।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ল্যাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব। তাই তখন যেকোনো নারী অথবা পুরুষ শুধুমাত্র একটু রক্ত দিলেই তা থেকে তৈরি হতে পারে তাদের সন্তান। এমনকি যারা সমলিঙ্গ বিবাহিত তারাও তাদের জৈবিক সন্তান পেতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত মানুষের উপর এটি প্রয়োগ করা হয়নি।

হাইয়াশি এই পদ্ধতিটির মূল কঠামো পেয়েছিলেন ইয়ামানাকার গবেষণা থেকে। জাপানের কয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ামানাকা গবেষণা করে বের করেছিলেন কীভাবে যেকোনো কোষকে স্টেম কোষে রূপান্তরিত করা যায়। এ আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

প্রথমে হাইয়াশি একটি পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের লেজ থেকে কোষ নেন। তারপর সেই কোষকে রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে মেশান। সেই রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে থাকে চার ধরনের জিন। এগুলো ঐ কোষকে স্টেম কোষে পরিণত করে। স্টেম কোষ ডিম্বাণু তৈরিতে সক্ষম।

এই ডিম্বাণুকে পরিণত হিসেবে করার জন্য সঠিক পরিবেশ দরকার। বিজ্ঞানীরা এজন্য ডিম্বাণু তৈরিতে প্রস্তুত সেই স্টেম কোষকে জীবিত ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করান। কিন্তু তাতে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ডিম্বাণুটি পুরোপুরি তৈরি করতে ডিম্বাশয়েরর উপর নির্ভর করইতে হচ্ছে। এবার তারা ইঁদুরেরে ডিম্বাশয়ের কোষ নিয়ে তা সেই স্টেম কোষটির সাথে রাখলেন যেন স্টেম কোষটি মনে করে সে ডিম্বাশয়ে আছে।

পাঁচ সপ্তাহে ডিম্বাণুটি পরিণত হলে এটিকে একটি স্বাভাবিক শুক্রাণুর সাথে মিলিত করেন। উৎপন্ন ভ্রূণ একটি ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করান। এই গবেষণায় আটটি ইঁদুর টিকে থাকে। পরবর্তীতে এই ইঁদুরগুলো নিজেরা বংশবৃদ্ধি করে।

চিত্র: কৃত্রিম ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়া ইঁদুর

আমেরিকার ১০% নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম। অনেকে তখন আইভিএফ তথা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের শরণাপন্ন হন। আইভিএফকে আমরা সবাই টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি নামে চিনি। এই পদ্ধতিটি অনেক ব্যয়বহুল। এতে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে। তার উপর শতকরা ৬৫ ভাগ সময় এটি ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রীর যেকোনো একজনের জনন কোষ সুস্থ না থাকলে তখন শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণুদাতা খুঁজতে হয়। যা সকলে গ্রহণ করতে চান না। কারণ এতে যেকোনো একজন (পুরুষ কিংবা নারী) সন্তানটির জৈবিক অভিভাবক হওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে বাবা মা উভয়ই সন্তানের জৈবিক অভিভাবক হতে পারেন। এতে নারীদের কৃত্রিমভাবে হরমোন দেয়া হয় যেন তিনি পরিমাণে ডিম্বাণু তৈরি করে। তবে এই অতিরিক্ত হরমোন প্রদানে নারীদেহে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হয় কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে এটি করা সহজ হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এত সহজ নয়। কারণ ইঁদুরের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে পাঁচ দিন। আর মানুষের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে ৩০ দিন। এতদিন ধরে ডিম্বাণুটিকে ঠিক রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা করা শুরু করে দিয়েছেন। মারমোসেট বানর নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এই বানরের গর্ভ ধারণে ১৪০ দিন সময় লাগে। তবে এখন বানরের পরিবর্তে শুকরও ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ শুকরের ভ্রূণের গঠনের ধাপ মানুষের সাথে মিলে। আর শুকর বানরের চেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ডিম্বাণুকে পরিণত করার জন্য ডিম্বাশয়ের কোষ লাগে। বিজ্ঞানী হায়াসী চাইছেন ভিন্ন কিছু। যে কোষটি ডিম্বাণু পরিণত করার সিগন্যাল দেয় সেটিকে শনাক্ত করতে চাইছেন। স্টেম কোষ থেকে সেই কোষটি তৈরি করার পদ্ধতিও তিনি বের করতে চান। যেন ডিম্বাণু তৈরি থেকে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়াটি গবেষণাগারে সম্পন্ন করা যায়। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন ডিম্বাণুগুলোকে গবেষণাগারে পরিণত করলে কিছু সমস্যা থেকে যাবে। এতে হয়তো দুর্বল শুক্রাণু তৈরি হতে পারে।

চিত্র: সবকিছু সম্পূর্ণরূপে গবেষণাগারে তৈরি করলে দেখা দিতে পারে সমস্যা।

শুক্রাণু তৈরিতে সক্ষম স্টেম সেলকে সরাসরিই যদি শুক্রাশয়ে স্থানান্তর করা যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের প্রজননের সময় যে শুক্রাণুগুলো সুস্থ শুধু সেগুলোই নির্বাচিত হয় এবং নিষিক্ত হয়। গবেষণাগারে অযোগ্য শুক্রাণু দ্বারা নিষেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তারা কৃত্রিমভাবে তৈরি শুক্রাণু শুক্রাশয়ে স্থাপনের পক্ষপাতী।

অনেকে এই কৃত্রিম ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরিতে সম্মতি দেন না। কারণ এতে বিকলাঙ্গ ও দুর্বল সন্তান জন্ম নিতে পারে। শিশু হয়তো পরবর্তীতে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এতে মূল্যবোধজনিত কিছু সমস্যাও থেকে যায়। কারণ এই পদ্ধতিতে যেকোনো ব্যক্তির কোষ নিয়ে তার সম্মতি ছাড়াই সন্তান তৈরি করা যায়। নিজের অজান্তেই মানুষ হয়ে যেতে পারে সন্তানের পিতা-মাতা।

এভাবে অতি সহজে মানুষ তৈরি মানুষের জীবনের গুরুত্ব কমিয়ে দিবে। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান কমে যেতে পারে সহজে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো এতে একজন মানুষের কোষ থেকেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করে সন্তান তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সে সন্তানের মা ও বাবা একজনই হবে।

এসব দিক চিন্তা করে ভ্রূণ গবেষণায় টাকার অনুদান কমিয়ে দেয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসন এটাকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এটিকে আবারো কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে দেশ ভেদেও গবেষণা নির্ভর করে। যেমন জাপানে ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা নিষেধ। কিন্তু ইজারাইলে এ নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই বরং এতে উৎসাহ দেয়া হয়।

তবে এই গবেষণার ভালো ফলগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সন্তান জন্মদানে অক্ষম স্বামী-স্ত্রী এই পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে পারে। আবার এপিজেনেটিক্সে পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নানা রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। \

তাই সকল পক্ষের সাথে বসে এই গবেষণা নিয়ে গভীর আলোচনা করা দরকার। এই গবেষণার সুফল যেন আমরা ভোগ করতে পারি এবং এর খারাপ দিক থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারি, এগুলোই যেন হয় এ সংক্রান্ত গবেষণার ভবিষ্যৎ।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান, মার্চ ২০১৮

featured image: truthpraiseandhelp.wordpress.com

যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারণা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। তবে ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতো যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারণা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতো না। তখন তারা ভেবে নিতো হয়তো অ্যান্টিবডি সম্পর্কেই এখনো তারা অনেক কিছু জানেন না, তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রম ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, আর উপেক্ষা করা গেল না। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ দানকৃত অঙ্গটি গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীরে লাগানো হয়, তখন সে অঙ্গের কোষকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় গ্রহীতার দেহে।

দেহে কোনো এন্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ঐ অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ গ্রহণ করে, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই, তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন যেন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইঁদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটি প্রত্যাখ্যান (Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবলো ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোনো আত্নীয়ের দেহে প্রবেশ করানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখে না। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটি একটি বড় সমস্যা ছিল বহু বছর। এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কিনা।

কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোনো পদ্ধতি খুঁজতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ কেউই জানতো না যে আসলে কী খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী! ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মুরগীর পরিপাকতন্ত্রের নীচের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। থলেটির নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস।

এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বোঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো। এ জিনিসটির প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস। আর পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

ব্রুস গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন (Bursectomy) এবং অপেক্ষা করলেন কী হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোনো পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন। যেহেতু মুরগিগুলোতে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নেই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গ-এর কিছু মুরগি দরকার পড়লো সে সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের অঙ্গ কর্তিত মুরগিগুলোই নিলেন।

কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করলো না। এ পর্যায়ে যে কেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কিন্তু এ দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরো কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথমবারের মতো বোঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতো না। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটি ইমিউনলজির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটির জন্য তৈরি ছিল না তখন।

স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স-এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এর খোজ পেলেন, সেটি হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

তাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখল যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ব্যতীত দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো।

অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মতো থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিল ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সির কেসগুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলেন। এক ধরনের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তবে তারা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে।

তাদের অবস্থা বার্সার ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয়, এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এসবকিছু অবশেষে বুঝালো যে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ (B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ।

মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো। এমন নামের ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

চা পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।

২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
  2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
  3. http://bn.wikipedia.org/
  4. Pean university recerch center.

featured image: vitalerstoffwechsel.de

সৌর কোষের গঠন ও ব্যবহার

জ্বালানী ছাড়া এ গতিশীল বিশ্ব ফিরে যাবে সেই আদিম যুগে। যখন পায়ে হেঁটে যেতে হতো দেশান্তরে,পাথরে পাথর ঘষে তৈরি আগুনে করতে হতো রান্নাবান্না,গাছের বাকল গায়ে জড়ালে প্রকাশ পেতো শালীনতা আর বৃষ্টির দিনে কোনো এক গাছের নিচে খুঁজতে হতো মাথা গুঁজবার জন্য একটুখানি আশ্রয়।

এতো প্রয়োজনীয় এ জ্বালানিগুলো কী কী? তেল,গ্যাস আর কয়লাই তো। একবিংশ শতাব্দীতে যে সভ্যতার বিকাশ আমরা দেখছি,এর পেছনে মুখ্য অবদান এ তিন প্রকারের জৈব বস্তুর। ভাবছেন এ বস্তুত্রয় মানব সভ্যতার বিকাশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরো কয়েক শতাব্দী ধরে? নিশ্চিত করে বলতে পারি, ভুল ভাবছেন আপনি! সারা বিশ্বে জ্বালানী ব্যবহারের বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে তেলের মজুদ ফুরোতে সময় লাগবে মাত্র ৩৫ বছর। গ্যাস আরো দু’বছর বেশি টিকবে। আর কয়লা টিকবে সর্বসাকুল্যে আর ১০৭ বছর। ততদিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা কতো হবে ভেবেছেন একবার। ২১২২ সালে কেমন পৃথিবী আমরা রেখে যাব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য?

বিজ্ঞানী আর সচেতন মানুষের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠতে এটুকুই যথেষ্ট। তাই সময়ের প্রয়োজনে গবেষণা চলছে বিকল্প জ্বালানী সন্ধানের। এ পর্যন্ত যতোগুলো বিকল্প আমরা খুঁজে পেয়েছি,তার মাঝে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হলো সৌর শক্তির ব্যবহার।

২০১২ সালে পৃথিবীতে মোট শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১,৫৫,৫০৫ টেরা ওয়াট-আওয়ার (TWh)। একটি রোদ্রৌজ্জ্বল দিনে প্রতি বর্গমিটারে সৌর শক্তির অপচয় হয় প্রায় ১০০০ ওয়াট,যা শক্তির চাহিদার তুলনায় বহুগুণে বেশি। এ বিপুল পরিমাণ শক্তির পুরোটাই প্রাকৃতিক এবং পাওয়া যায় বিনামূল্যে। অফুরন্ত শক্তির উৎস তাই আমাদের চারপাশেই আছে। শুধু উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের অপেক্ষা মাত্র।

আলো থেকে তড়িৎ শক্তির রূপান্তর

তড়িৎ শক্তি হলো পরিবাহীর ভেতর দিয়ে কোনো চার্জের প্রবাহ। সাধারণত ইলেকট্রনের প্রবাহকে আমরা তড়িৎ প্রবাহ বলি। ইলেকট্রন যখন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারিদিকে আবদ্ধ থাকে তখন এর কোনো প্রবাহ থাকে না। তড়িৎ প্রবাহ পেতে হলে তাই প্রথমে ইলেকট্রনকে নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে মুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন শক্তির, যা আমরা পেতে পারি আলো থেকে।

শক্তির ধ্বংস বা সৃষ্টি নেই,শুধু তার রূপের বদল হয়। আলোক শক্তি থেকে তড়িৎ শক্তির এ রূপান্তর যে যন্ত্রে ঘটে,তাকে সৌর কোষ (Photovoltaic Cell) বলে। ফটো মানে আলো,আর ভোল্টেইক মানে তড়িৎ শক্তি। অর্থাৎ আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরির কোষই হলো সৌর কোষ।

সৌর কোষ তৈরি করা হয় বিশেষ ধরনের অর্ধপরিবাহী দিয়ে, যেমন- সিলিকন। যখন আলো এ কোষের উপর পড়ে,তখন এর কিছু অংশ এ অর্ধপরিবাহী শুষে নেয়। এই শক্তিই নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ থেকে ইলেকট্রনকে মুক্ত করে। ইলেকট্রনগুলো তখন প্রবাহিত হতে শুরু করে। আর ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকেই আমরা পাই তড়িৎ শক্তি।

সিলিকন-এ তড়িৎ প্রবাহ

সিলিকনের ১৪ টি ইলেকট্রন একটি সিলিকন পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ঘিরে থাকে। তিনটি আলাদা শক্তিস্তরে এ ইলেকট্রনগুলো অবস্থান করে। প্রথমটিতে ২ টি,দ্বিতীয়টিতে ৮ টি আর শেষ শক্তিস্তরে ৪ টি। অষ্টক পূর্ণ করতে হলে সিলিকনের আরো চারটি ইলেকট্রন প্রয়োজন। এ ঘাটতি পূরণে দুটি সিলিকন পরমাণু একে অপরের সাথে বন্ধন তৈরির করে। এতে প্রতিটি সিলিকন পরমাণু ৪ টি করে ইলেকট্রন শেয়ার করে। তড়িৎ প্রবাহ পেতে হলে চাই মুক্ত ইলেকট্রন। কিন্তু বন্ধনে আবদ্ধ ইলেকট্রনগুলো মুক্ত নয়। এ ঘাটতি পূরণ করতে কিছু অংশে এমন একটি মৌল মেশানো হয় যার বাইরের শক্তিস্তরে ইলেকট্রনের সংখ্যা ৪ টির চেয়ে বেশি (ধরা যাক ৫ টি)। এতে ১ টি ইলেকট্রন বন্ধনে অংশ নেয় না। এ ইলেকট্রনটিকে আলো থেকে শোষিত শক্তি দিয়ে সহজেই মুক্ত করা যায়।

ইলেকট্রনের চার্জ ঋণাত্মক বলে এর আধিক্য থাকা অংশকে বলা হয় negative type বা সংক্ষেপে n-type। একইভাবে ইলেকট্রনের ঘাটতি অংশের নাম দেয়া হয়েছে positive type বা p-type।

সৌর কোষের গঠন

p-type ও n-type সেমিকন্ডাক্টরকে একসাথে করলে একটি জাংশন তৈরি হয় যাকে বলে p-n junction। তখন n-type অংশ থেকে ইলেকট্রন p-type অংশের দিকে প্রবাহিত হয়। এতে p-type অংশে ইলেকট্রনের শূন্যতা (hole) পূরণ হতে থাকে। p ও n জাংশন সংলগ্ন হোলগুলো এভাবে খুব দ্রুতই ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ হয়। হোলগুলো ইলেকট্রন দিয়ে পূর্ণ হওয়ায় নতুন করে ইলেকট্রন প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে। এ ডিপ্লেশন লেয়ারে তখন তৈরি হয় একটি তড়িৎ ক্ষেত্র।

তড়িৎ ক্ষেত্রটি কাজ করে একটি ডায়োড হিসেবে। এর কাজ হলো ইলেকট্রনকে p-type অংশ থেকে n-type অংশের দিকে প্রবাহিত হতে দেয়া। কিন্তু এটি n-type অংশ থেকে p-type অংশে ইলেকট্রনের প্রবাহকে বাধা দেয়। অর্থাৎ ডায়োড তড়িৎ প্রবাহকে একটি নির্দিষ্ট দিকেই শুধু প্রবাহিত হতে দেয়। সেমিকন্ডাক্টরের উপর যখন আলো আপতিত হয়, তখন যথেষ্ট শক্তি সম্পন্ন ফোটন কণা ইলেকট্রন আর ফোটনকে আলাদা করে। এরপর তড়িৎ ক্ষেত্র ইলেকট্রনকে n-type অংশে ও হোলকে p-type অংশে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে এদের মাঝে বিভব পার্থক্যের (potential difference) সৃষ্টি হয়। এখন যদি দুটি অংশকে পরিবাহী দিয়ে যুক্ত করা হয়, তবে তড়িৎ প্রবাহ পাওয়া যাবে।

সিলিকন দেখতে খুব চকচকে। তাই এর উপর আলো পড়লে বেশিরভাগ অংশই প্রতিফলিত হয়। এজন্য প্রতিফলনরোধী একটি বিশেষ আবরণ দেয়া হয় এর উপর। সবশেষে একটি কাচের প্লেট দিয়ে সুরক্ষিত করা হয় সৌর কোষকে। শক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো একাধিক সৌর কোষকে একসাথে ব্যবহার করা হয়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত সৌর কোষের কর্মদক্ষতা অর্থাৎ আলোক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করার হার ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৮ শতাংশ। বর্তমানে এই হার বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

p-type ও n-type সেমিকন্ডাক্টর ও p-n জংশন

সৌর কোষে শক্তির অপচয়

সৌর কোষে যে আলো আপতিত হয়,তা একবর্ণী নয়। আপতিত আলোতে ভিন্ন ভিন্ন শক্তির ফোটন পাওয়া যায়। তড়িৎ শক্তি উৎপাদনের জন্য ফোটন কণার একটি নূন্যতম শক্তি থাকা চাই। যেসব কণার শক্তি এর চেয়ে কম,সেগুলো সৌর কোষ দিয়ে প্রতিসরিত হয়। আর যেসব কণার শক্তি নূন্যতম শক্তির চেয়ে বেশি,সেগুলোর বাড়তি শক্তিটুকুর অপচয় হয়। এ নূন্যতম শক্তিকে বলা হয় ব্যান্ড পার্থক্য। বিশুদ্ধ সিলিকনের জন্য ব্যান্ড পার্থক্য হলো ১.১ ইলেকট্রন-ভোল্ট (eV)। ব্যান্ড পার্থক্যকে ইচ্ছামতো কমানো কিংবা বাড়ানো যায়। এটি কমালে শক্তির অপচয় কমে যাবে। কিন্তু ব্যান্ড পার্থক্যের সাথে সৃষ্ট বিভব পার্থক্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। এটি কমালে বিভব পার্থক্যও কমে যাবে। এতে শক্তি উৎপাদনের হার কমে যাবে। তাই ব্যান্ড পার্থক্যকে একটি সুবিধাজনক মানে স্থির করা হয়। সিলিকনের জন্য এটি ১.৪ ইলেকট্রন-ভোল্ট।

বাসার ছাদে স্থাপিত সৌর কোষ

শক্তির অপচয় রোধে আরো কিছু পরিবর্তন আনা হয় সৌর কোষে। উপরের দিকের অংশের পরিবাহী তারকে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ রাখা হয়। এতে আলো সহজে কোষে প্রবেশ করতে পারে। তবে নিচের অংশের পরিবাহীকে রাখা হয় অস্বচ্ছ। এভাবে আলোক শক্তির উল্লেখযোগ্য অংশকে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে সেমিকন্ডাক্টরের মধ্যকার সংযোগগুলো যেন কাছাকাছি থাকে। কারণ সেমিকন্ডাক্টরের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রোধ থাকে। রোধ বাড়লে শক্তির অপচয় বেড়ে যাবে।

বাড়িতে সৌর শক্তির ব্যবহার

বাড়ির ছাদে কিংবা টিনের চালে সৌর কোষ এমনভাবে বসাতে হবে যেন সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যের আলো এর উপর আপতিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া আর জলবায়ু অনুযায়ী ছাদের সাথে উপযুক্ত কোণ করে স্থাপন করতে হবে। ধরা যাক, আপনার বাসা পৃথিবীর উত্তর মেরুর কাছাকাছি। তাহলে বাসার ছাদে সৌর কোষ স্থাপন করতে হবে দক্ষিণ দিকে মুখ করে। এতে সর্বোচ্চ পরিমাণ সূর্যালোক পাওয়া যাবে। আবার ধরুন, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনার শক্তির প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। তাহলে ঠিক ঐ সময়টাতে সূর্যের অবস্থান অনুসারে বসাতে হবে সৌর কোষটিকে। সহজ কথায়,সৌর

কোষকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো দিতে হবে। তবেই চাহিদামতো শক্তির উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে।

আইল্যান্ডিং


ধরুন আপনার বাসার সৌর কোষটি বাইরের সাপ্লাই লাইনের সাথে যুক্ত। হঠাৎ একদিন লাইনে কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তাই স্টেশন থেকে পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিক এ সময়েও আপনি ও আপনার প্রতিবেশি ঠিকই বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তবে যদি কোনো ইলেক্ট্রিশিয়ান এ লাইনে কাজ করতে আসেন, তবে তার পরিণতি কী হবে ভেবেছেন! যখন চারিদিকে ব্ল্যাক-আউট (blackout) অথচ আপনার বাসায় বিদ্যুৎ আছে, তখন এ অবস্থাকে বলে আইল্যান্ডিং। বিষয়টা অনেকটা সাগরের মাঝে হঠাৎ একটা দ্বীপ জেগে ওঠার মতোই। আর এর সম্ভাব্য পরিণতি বেচারা ইলেক্ট্রিশিয়ানের মৃত্যু! এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাকে বলে এন্টি-আইল্যান্ডিং।

নিয়ন্ত্রিত চার্জিং- চার্জ কন্ট্রোলারের ব্যবহার 

সৌর কোষের উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তি সঞ্চয়ের জন্য যে ব্যাটারি ব্যবহার করা হয় তা অনিরাপদ চার্জিং এর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য ব্যাটারির সাথে চার্জ কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হয়। পুরোপুরি চার্জ হলে,চার্জ কন্ট্রোলার নতুন উৎপন্ন বিদ্যুৎকে আর ব্যাটারিতে জমা হতে দেবে না। এছাড়াও এটি ব্যাটারিকে চার্জ-শূন্য হওয়া থেকে রক্ষা করে। চার্জ কন্ট্রোলার ব্যবহারে উৎপন্ন বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এতে ব্যাটারির স্থায়িত্বও বাড়ে।

ডিসি প্রবাহকে এসি প্রবাহে রূপান্তর- ইনভার্টারের ব্যবহার

সৌর কোষে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়,তা একমুখী (dc)। বাড়িতে ব্যবহার উপযোগী করা জন্য একে দিক পরিবর্তী প্রবাহে (ac) রূপান্তরিত করতে হয়। ইনভার্টারের মাধ্যমে এই কাজটি করা হয়। ইনভার্টার ডিসি তড়িৎকে এসি তড়িতে রূপান্তরিত করে। কখনো কখনো ইনভার্টারকে আইল্যান্ডিং প্রতিরোধেও ব্যবহার করা হয়। কিছু কিছু উন্নত সৌর কোষে ইনভার্টার যুক্ত থাকে। এতে সরাসরি এসি তড়িৎ পাওয়া যায়।

সৌর কোষ প্রযুক্তির অগ্রগতি

স্বল্পমূল্যের সৌর কোষ উৎপাদনঃ সৌর কোষ ব্যবহারের প্রধান অসুবিধা হলো এর উচ্চমূল্য। একই উৎপাদন ক্ষমতার প্রচলিত যেকোনো তড়িৎ শক্তি উৎপাদনকারী ব্যবস্থা থেকে সৌর কোষ পদ্ধতির ব্যবহার বেশি ব্যয়বহুল। তবে এর সুবিধা হলো, একবার স্থাপন করতে পারলে বিনামূল্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। গবেষকেরা প্রাথমিক পর্যায়ে এর মূল্য কমানোর জন্য একক ক্রিস্টাল সিলিকনের পরিবর্তে পলিক্রিস্টালাইন সিলিকন ব্যবহার করতেন। এর কর্মদক্ষতা ছিল বেশ কম। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন পাতলা ফিল্মের সৌর কোষ ব্যবহার করা হয় যার কর্মদক্ষতা পলিক্রিস্টালাইন সিলিকন থেকে বেশি এবং উৎপাদন খরচ বেশ কম। অ্যামোরফাস সিলিকন,Ga-As, Cu-In-Se2, Cd-Te ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় এ সৌর কোষ তৈরিতে।

কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিঃ সৌর কোষে একটি স্তরের পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন ব্যান্ড পার্থক্যের একাধিক স্তর ব্যবহার করে কর্মদক্ষতা বাড়ানো যায়। সবচেয়ে বেশি ব্যান্ড পার্থক্যের স্তরকে উপরে রেখে,ক্রমান্বয়ে ছোট ব্যান্ড পার্থক্যের স্তরগুলো একে একে সাজালে বিভিন্ন শক্তির ফোটন শোষিত হবে। এতে কর্মদক্ষতা অনেক গুণে বেড়ে যায়।

সূর্যালোকের পরিমাণ বৃদ্ধিঃ শুধুমাত্র আপতিত আলোর উপর নির্ভর না করে বরং লেন্স আর আয়না ব্যবহার করে সূর্যের আলোকে ঘনীভূত করা হয়। এতে তড়িৎ শক্তির উৎপাদন অনেকখানি বেড়ে যায়।

সৌর কোষ ব্যবহারে ব্যয়

সৌর কোষের জ্বালানী সূর্যের আলো,যা বিনামূল্যে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র স্থাপনের খরচটুকু যোগাতে পারলে দীর্ঘদিন এর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য সৌর কোষ অনেক সাশ্রয়ী।

প্রাথমিকভাবে স্থাপনের জন্য সৌর কোষের খরচ অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি থেকে কিছুটা বেশি। প্রতিটি ১০০০ ওয়াট সৌর প্যানেলের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা। তবে আশার কথা হলো, সৌর কোষ নিয়ে ক্রমবর্ধমান গবেষণার ফলে এর বাজারমূল্য কমে আসছে। এর সাথে বাড়ছে কর্মদক্ষতাও। বাসা বাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে সৌর কোষের ব্যবহার দ্রুতই বেড়ে চলেছে। তবে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটাই আবহাওয়া নির্ভর। মেঘলা দিনে কিংবা রাতের বেলায় এটি কাজ করে না। তাই সৌর কোষের সাথে ব্যাটারি যুক্ত করা হয়। এতে চার্জ সঞ্চয় করে রাখা যায়। প্রচলিত পাওয়ার সাপ্লাইয়ের সহায়ক হিসেবেও সৌর কোষ ব্যবহার করা যায়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা- সূর্য আরো প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীকে আলোকিত করে যাবে। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে একদিন হয়তো পুরো পৃথিবীর জ্বালানী চাহিদা পূরণ হবে সৌর শক্তি দিয়ে। সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://science.howstuffworks.com/environmental/energy/solar-cell.htm
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/World_energy_consumption
  3. http://cleantechnica.com/2013/06/19/forecast-cost-of-pv-panels-to-drop-to-0-36watt-by-2017

featured image: solarpowerportal.co.uk

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center

 

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center