চা পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।

২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
  2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
  3. http://bn.wikipedia.org/
  4. Pean university recerch center.

featured image: vitalerstoffwechsel.de

ক্যান্সারের কারণ ও এর প্রতিরোধ

যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে হিপোক্রিটাস বলেছিলেন,আমাদের দেহ চার ধরনের তরলে গঠিত। এ চার ধরনের তরলের মধ্যে সবসময় ভারসাম্য বজায় থাকে,যা নষ্ট হলেই নানাবিধ অসুখ হয়। এর মাঝে ব্ল্যাক বাইল নামক তরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে যেটা হয় তাকে কার্সিনোস এবং কার্সিনোমা বলে বলে ডাকতেন তিনি। যার উৎপত্তি গ্রীক ‘Karkinos’ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে কাঁকড়া। আক্রান্ত টিস্যু থেকে চারপাশে রক্তনালীগুলোর ছড়িয়ে পড়া দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার থাবার মতো বলেই এ নামকরণ। ধীরে ধীরে একসময় ক্যান্সার নামটি প্রচলিত হয়।

এখন ২০১৫ সালে এসে এতগুলো বছরের গবেষণা,এতগুলো মলাটবদ্ধ প্রকাশনা, এতগুলো পরীক্ষা-নীরিক্ষা, বস্তা বস্তা টাকা ঢালার পরও কেন ক্যান্সারের কোনো প্রতিষ্ঠিত নিরাময় নেই? কারণ ক্যান্সারকে কোনো সূত্রে বাধা সম্ভব নয়। সকাল বিকাল আমরা এক নামে একে ডাকলেও প্রতিটি ক্যান্সার আলাদা,প্রতিটি ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর গল্প আলাদা।

ক্যান্সার এতটাই রহস্যময় যে,প্রায়ই দেখা যায়, যে চিকিৎসায় একজন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন,সেই একই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত আরেকজনের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা আর কাজ করে না। দেহের যেকোনো টিস্যুকে আক্রান্ত করতে সক্ষম এ ক্যান্সারের কারণ হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শুরু করে সূর্য রশ্মি পর্যন্ত হাজার হাজার এজেন্ট ছড়িয়ে আছে।

আগেই বলেছি,ক্যান্সারকে যেহেতু আমরা এক নামে চিনি সেই কারণে একে একক কিছু ভাবলে ভুল হবে। ক্যান্সার আসলে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি যাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন যা শুরু হয় কিছু জিনের মাঝে আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে।

আমাদের দেহের গঠন ও অন্যান্য কারিগরিতে জড়িত থাকে নানা ধরনের প্রোটিন। প্রতিনিয়ত এসব প্রোটিন তৈরি হচ্ছে,আবার কাজ শেষে নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। কোন প্রোটিন কেমন হবে সেই তথ্য থাকে আমাদের জিনগুলোতে। তাই জিনের পরিবর্তন প্রোটিনকেও প্রভাবিত করে। এ পরিবর্তনের ফলে যে বাটারফ্লাই ইফেক্ট শুরু হয়ে যায়,শেষ পর্যন্ত তার ফলাফল মোটামুটি একই। লাগামছাড়াভাবে কিছু কোষ বিভাজিত হচ্ছে, দেহের বিভিন্ন প্রান্তে দুষ্ট কোষগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে,অন্যান্য টিস্যুকে আক্রমণ করছে এবং পুরো ব্যাপারটিই খুব ভয়ংকর।

জিনের এ পরিবর্তনকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে মিউটেশন। দুই ধরনের জিনে মিউটেশনের কারণে ক্যান্সার হয়। একটিকে বলে অনকোজিন,আরেকটিকে বলে টিউমার সাপ্রেসর জিন। তবে আসলে মিউটেশন হবার পরে একে অনকোজিন বলে,এর আগে এর নাম প্রোটো-অনকোজিন। প্রোটো-অনকোজিন থাকা অবস্থায় এরা স্বাভাবিক জিনের মতোই আচরণ করে। যাদের কাজ হচ্ছে এমন প্রোটিন তৈরি করা যা কোষের বিকাশ ও বিভাজনে সাহায্য করে। কিন্তু একটি মিউটেশন এদেরকে এতটাই পাগল করে দেয় যে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যায় না। কোষের মাঝে এরা ক্রমাগত চেচামেচি করতে থাকে, “বড় হ,বিভাজিত হ! বড় হ,বিভাজিত হ!”

মিউটেশনের ফলে এ জিন যে প্রোটিন তৈরি করার কথা তার আকৃতি যায় বদলে। সে এমন একটি অবস্থায় আটকে যায় যে ক্রমাগত কোষে বড় হবার সংকেত দিতে থাকে। এ নতুন আকৃতির কারণে অন্যান্য যেসব প্রোটিনের কথা ছিল কাজ শেষ হলে এদের আটকানোর তারাও চিনতে পারে না। তাই কোষগুলো ক্রমগত বড় হয়ে বিভাজিত হতে হতে একটি টিউমারে পরিণত হয়।

‘টিউমার সাপ্রেসর’ নাম থেকেই বোঝা যায় এর কাজ হলো বিপথে যাওয়া কোষগুলোকে রুখে দেয়া। সকল জিনের মতো আমাদের প্রতিটি কোষেও দুই কপি করে টিউমার সাপ্রেসর জিন থাকে। যদি এক কপিতে কোনো কারণে মিউটেশন হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনো অন্য কপি ঠিকই কাজ করতে থাকে। দেখা গেছে যে,একই লোকাসে অবস্থিত দুটি টিউমার সাপ্রেসরের যেটিতে মিউটেশন হয় সেটি প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে,কিন্তু একই লোকাসে অবস্থিত অনকোজিনে মিউটেশন হলে সেটি হয়ে যায় প্রকট এবং অন্য কপিকে আর সুস্থভাবে কাজ করতে দেয় না। যাই হোক,ক্যান্সারের প্রবৃত্তিই হলো সব রকম প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার ফাঁক গলে বের হয়ে যাওয়া। কখনো এমনও হতে পারে যে দুটো কপিতেই মিউটেশন হলো কিংবা একটি কপিতে মিউটেশন হলেও অন্য সুস্থ কপি কোনো কারণে হারিয়ে গেল। তখন আর টিউমারকে আটকানোর মত কেউ থাকে না।

এখানেই শেষ নয়। একটা দুটো মিউটেশন হলেই তা ক্যান্সার হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যাবস্থা ডিএনএ’র ছোটোখাটো মিউটেশনগুলোকে ঠিক করে নিতে পারে কিংবা খারাপ অবস্থায় চলে গেলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা আক্রান্ত কোষটিকে ধ্বংস করে ফেলে। একটি সুস্থ কোষকে ক্যান্সারে পরিণত হবার জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ টি মিউটেশনের শিকার হতে হয়।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মিউটেশন অর্ডার’অর্থাৎ কোনো জিনের মিউটেশন আগে,কোনো জিনের মিউটেশন পরে হলে সেটিও ক্যান্সারের তীব্রতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেহের স্বাভাবিক কোষগুলো প্রতিবার বিভাজিত হবার সময় এর ক্রোমোজোমের এক প্রান্ত ছোট হতে থাকে। একসময় কোষটি মরে যায় এবং নতুন সুস্থ কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। কিন্তু ক্যান্সার কোষ এ ব্যাবস্থাকে ঠকিয়ে নিজের ক্রোমোজোমকে খুব যত্ন করে আগলে রাখে। ফলে ক্যান্সার কোষগুলো বলা চলে অমর হয়ে যায়।

যেহেতু প্রতিটি টিউমার ভিন্ন পথ অবলম্বন করে বিকশিত হয়, এটা চিকিৎসক এবং গবেষকদের জন্য কঠিন যে কোন পথকে আসলে টার্গেট করতে হবে। তাহলে কোন কোন উচ্ছন্নে যাওয়া জিনের কারণে টিউমার হয়েছে সেটাকে না জেনে কীভাবে তারা এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেবেন? একটি উপায় হতে পারে ছুরি নিয়ে টিউমারটি ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলা। কিন্তু সেটা তো সব সময় সম্ভব হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কেটে ফেলার পরেও টিউমার ফিরে আসে।

অনেক দিন ধরে ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে ভালো সমাধান ছিল দেহে কিছু একটা প্রয়োগ করা যা সমস্ত দ্রুত বিভাজনশীল কোষকে আক্রমন করবে। যেমন কেমোথেরাপী কিংবা রেডিওথেরাপী। রেডিওথেরাপীতে এমন ধরনের তেজস্ক্রিয়তা প্রয়োগ করা হয় যা কোষের ডিএনএ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো এ তেজস্ক্রিয়তা আশেপাশে সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে। তাই চিকিৎসকরা প্রয়োগ করার সময় খুব চেষ্টা করেন যাতে যথাসম্ভব কম ক্ষতি হয়।

কেমোথেরাপী রয়েছে একাধিক ধরনের। তবে এরা যেহেতু রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়,এদের কারণে সারা দেহ প্রভাবিত হতে পারে। কিছু কিছু কেমো ডিএনএ’র গাঠনিক এককের ছদ্মবেশে থাকে। ক্যান্সার কোষ বিভাজিত হবার সময় তা নতুন ডিএনএ সূত্রক তৈরি করে এবং এদেরকে নতুন ডিএনএ-তে যুক্ত করে ফেলে। কিন্তু সেই ডিএনএ আর সঠিক কার্যক্ষম থাকে না। অনেকটা বিষটোপ দিয়ে শত্রুনাশের মতো ব্যাপার। কিছু কিছু কেমো আবার কোষের অন্তঃকংকালকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে কোষটি আর বিভাজিত হতে পারে না।

কেমোথেরাপী ক্যান্সারের বৃদ্ধি দমাতে পারলেও আমাদের দেহে প্রচুর সুস্থ কোষও আছে যাদের বিভাজিত হওয়া প্রয়োজন। যেমন চুলের ফলিকল বিভাজিত না হলে চুলের বৃদ্ধি হবে না। আবার হজমের সময় নিঃসৃত এসিডের কারণে অন্ত্রের আস্তরনের যে ক্ষয় হয় সেটিও পূরণ করা দরকার।

এ কারণেই কেমোথেরাপীর ফলে চুল পড়ে যায়,হজমে সমস্যা দেখা যায়। এরকম হাজারো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে সাথে নিয়ে কেমোথেরাপী কাজ করে। ক্যান্সার রোগীর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি প্রচন্ড মানসিক চাপেরও সৃষ্টি করে। তাই ন্যাড়া মাথার কাউকে দেখে মজা করার আগে সবসময় খেয়াল করবেন তার চোখে ভ্রু আছে কিনা।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে অস্ত্রটিকে বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে উন্নত করার চেষ্টা করে আসছেন তা হলো জিনোম সিকোয়েন্সিং। এ প্রক্রিয়াটি এখন এতটাই দ্রুত আর সস্তা যা দশ বছর আগেও শুধু স্বপ্নেই সম্ভব ছিল। এখন এটি সরাসরি রোগীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।

বর্তমানে কয়েক দিনের ব্যাবধানে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার কোষের জিনোম সিকোয়েন্স করে তার কোথায় এবং কীভাবে মিউটেশন ঘটেছে তা বের করা সম্ভব। এ তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই পার্সোনালাইজড মেডিসিন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির, নির্দিষ্ট ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা সম্ভব।

যে দুটো বড় প্রজেক্ট এ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা হলো- ১. ক্যান্সার জিনোম প্রজেক্ট ও ২. ক্যান্সার সেল লাইন এনসাইক্লোপিডিয়া।

তারা নানা ধরনের ক্যান্সার কোষের বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রভাব পরীক্ষা করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু কিছু ওষুধ বিশেষ বিশেষ ক্যান্সার কোষের বিপরীতে ভালো কাজ করে। তারা মিউটেশনের ধরনের উপর ভিত্তি করে কোনো ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন। তাই ক্যান্সারের জন্য ওষুধ নির্বাচন এখন আর অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মত নয়। অন্তত তত্ত্ব সেটাই বলে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে আরেকটি কার্যকর অস্ত্র হতে পারে ন্যানোটেকনোলজি। ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার স্কেলে যে টেকনোলজি কাজ করে সেটাই অল্প কথায় ন্যানোটেকনোলজি। বেশির ভাগ সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়া এবং যেসব প্রক্রিয়া ক্যান্সারের কারণ হতে পারে সেগুলোও ন্যানোস্কেলে সংঘটিত হয়। তাই ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে নিরাময় পর্যন্ত সকল পর্যায়েই বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের সুবিধা পাওয়ার কথা।

ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বায়োপসি করার আগে সাধারণত ইমেজিং কিংবা স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া হয়। ন্যানোটেকনোলজি দুটো পদ্ধতিকেই আরো দক্ষ করে তুলতে পারে। যেমন ইমেজিং এর কথা যদি বলি,এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তখনই ক্যান্সার নির্ণয় করা যায় তখন বিপুল সংখ্যক কোষের ক্যান্সারে রূপান্তরের কারণে টিস্যুতে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো পরিবর্তন আসে। তবে ততক্ষণে হয়তো হাজার হাজার ক্যান্সার কোষ এদিক ওদিকে ছড়িয়ে গেছে। আবার দেখা গেলেও সেটা কতোটা মারাত্মক সেটা বোঝার জন্য বায়োপসি ছাড়া উপায় নেই।

ইমেজিংকে কার্যকর করার জন্য দুটি জিনিস দরকার। এমন কিছু যেটা একদম খাপে খাপ ক্যান্সার কোষকে চিনে নিতে পারবে এবং স্ক্যানিং ডিভাইসকে চেনাতে সাহায্য করবে। দুটোই ন্যানোটেকনোলজির দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। যেমন, যেসব অ্যান্টিবডি ক্যান্সার কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে পারে তাদেরকে ন্যানো আকারের ধাতব অক্সাইডের গায়ে লেপে দিলে তারা MRI কিংবা CT Scan এ স্পষ্টতর সংকেত তৈরি করতে পারে।

ন্যানোটেকনোলজির ভিত্তিতে যেসব ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো সাধারণের তুলনায় বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভালো কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এসবের অর্ধায়ু, স্থায়ীত্ব, আক্রান্ত কোষ চেনার ক্ষমতা অধিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ন্যানোপার্টিকেল ব্যবহার করে মাল্টিড্রাগ ডেলিভারি সিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছেন যেগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্যান্সারের বিপক্ষে শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

ক্যান্সার নিয়ে আসলেই অনেক কাজ হচ্ছে সারা বিশ্বে। গুগল ট্রেন্ডে গিয়ে যদি ক্যান্সার এবং এইডস এই দুটি রোগের নাম সার্চ আইটেম হিসেব লিখেন তাহলে এরকম একটি গ্রাফ পাবেনঃ

এটা কিন্ত এদের আপেক্ষিক গুরুত্ব নয় বরং ইন্টারনেটে এদের জনপ্রিয়তার একটা তুলনা। যদিও এইডস রোগটি কম ভয়ানক নয়,ইন্টারনেটে এর জনপ্রিয়তা যে কারণেই হ্রাস পাক,ক্যান্সার কিন্তু বিগত কয়েক বছরে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। তো আমরা ধরে নিতেই পারি যে,সামাজিক নেটওয়ার্ক,ব্লগ ও নিউজপোর্টালগুলো ছাড়াও বৈজ্ঞানিক জার্নাল-গুলোতেও ক্রমাগত এ শব্দটি বারবার এসেছে। তবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যে ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছে,আমরা তার কতোটা আমদানী করতে পেরেছি?

আমাদের ক্যান্সার আক্রান্তরা কেমন সেবা পাচ্ছে সেটাও ভাবার বিষয়। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত প্রায় ১৫ লক্ষ। এত বিশাল সংখ্যক আক্রান্ত জনগোষ্ঠী মানেই বিশাল একটা ব্যবসা। তাই রথী-মহারথীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের জন্য নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন ও প্রদানের মাধ্যমে সংবাদপত্রের হেডলাইন হতে ও টাকা কামাতে যতটা উৎসাহ, ততটা কি পুরোপুরি নিরাময় লক্ষ্যে কাজ করাতে আছে?

তথ্যসূত্রঃ

১. Mutation order reveals what cancer will do next by Andy Coghlan, New Scientist Magazine

২. nano.cancer.gov

৩. Fighting Cancer with Nanomedicine by Dean Ho, The Scientist Magazine.

৪. Syed Md Akram Hussain, Comprehensive update on cancer scenario of Bangladesh, South Asian Journal of Cancer.

৫. The Cancer Industry is Too Prosperous to Allow a Cure By John P. Thomas, The Health impact News.

featured image: trans4mind.com

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center

 

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center