ক্ষুদ্র কণায় বিপুল শক্তি

সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশও প্রবেশ করেছে পরমাণু যুগের ভেতর। ফলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তথা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এখন সারা দেশের আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা পরিবেশ নিয়ে ভাবছেন কিংবা যারা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন তারা রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করছেন।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত অন্য সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রক্রিয়া একই।[1] সবগুলোতেই ট্রান্সফরমার থাকে, জেনারেটর থাকে, টারবাইন থাকে। এদের কর্মপ্রক্রিয়াও প্রায় একই, ভিন্নতা শুধুমাত্র জ্বালানীতে।

জ্বালানী না বলে বলতে হবে শক্তির মূল উৎসতে। কোনো কোনোটিতে শক্তির উৎস হিসেবে পানির বিভব শক্তি[2] ব্যবহার করা হয়, কোনো কোনোটিতে শক্তির জন্য কয়লা কিংবা গ্যাস পুড়ানো হয় আবার কোনো কোনোটিতে অণু-পরমাণুর মাঝে লুকিয়ে থাকা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রক্রিয়া। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরমাণুর বিশেষ কৌশলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বলা হয়। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরমাণুকে ভেঙে সেখান থেকে শক্তি বের করে আনা হয়। প্রশ্ন হতে পারে পরমাণুকে ভাঙলে কেন শক্তি উৎপন্ন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে উঁকি দিতে হবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে।

প্রকৃতিতে চার ধরনের মৌলিক বল আছে। মহাকর্ষ বল, তাড়িতচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল ও সবল নিউক্লীয় বল।  এদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো সবল নিউক্লীয় বল।[3] সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি কেমন বেশি তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাধারণত ধনাত্মক চার্জ আকর্ষণ করে ঋণাত্মক চার্জকে। ঋণাত্মক-ঋণাত্মক কিংবা ধনাত্মক-ধনাত্মক চার্জ কখনো একত্রে অবস্থান করে না।

কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেখানে ধনাত্মক চার্জের প্রোটনগুলো একত্রে অবস্থান করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সবল নিউক্লীয় বলের উপস্থিতির ফলে। সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি এতই বেশি যে প্রোটনের পারস্পরিক বিকর্ষণকেও কাটিয়ে দিয়ে জোর করে বসিয়ে রাখতে পারে।[4]

প্রবল শক্তি দিয়ে ধনাত্মক চার্জের পরস্পর বিকর্ষণকারী প্রোটনগুলোকেও একত্রে আটকে রাখতে পারে। ছবি: সায়েন্স ব্রেইন ওয়েভ

কিন্তু সবল নিউক্লীয় বলের বড় ধরনের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এটি খুবই অল্প দূরত্ব পর্যন্ত আকর্ষণ করতে পারে। এর আকর্ষণের পাল্লা খুবই কম।[5] এতই কম যে বড় আকারের পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রে রাখতে পারে না। বড় পরমাণুর বড় নিউক্লিয়াসে যদি কোনোভাবে আঘাত করা যায় তাহলে খুব সহজেই এদেরকে ভেঙে একাধিক টুকরো করে ফেলা যাবে।

একাধিক টুকরো হলে পরমাণুর আকৃতি কমে আসবে ফলে সেখানে সবল নিউক্লীয় বল দৃঢ়ভাবে প্রভাব রাখতে পারবে। বড় পরমাণুর বেলায় সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতাকে ভিত্তি করেই মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়।

যেহেতু এটি বিদ্যুৎ শক্তি বা তাপ শক্তি তাই শক্তি সম্পর্কিত কোনো না কোনো সূত্রের প্রয়োগ থাকবেই। শক্তি সম্পর্কে আইনস্টাইনের বিখ্যাত একটি সূত্র আছে। সূত্রটি খুবই সহজ, E=mc^2। সচরাচর আমরা দেখি বস্তু কখনো সৃষ্টিও হয় না ধ্বংসও হয় না। এক আকৃতি থেকে আরেক আকৃতিতে রূপান্তরিত করা যায় শুধু। চাল থেকে চালের গুড়ি করা যায়, গুড়ি থেকে রুটি তৈরি করা যায়, রুটি খাওয়া যায়, সে রুটির উপাদানগুলো দেহে মিশে একসময় ভিন্ন রূপে দেহ থেকে বের হয়ে যায়।

এক বস্তু থেকে আরেক বস্তু হচ্ছে কিন্তু ঘুরেফিরে মূল বস্তুর পরিমাণ একই থাকছে। নতুন কোনো বস্তু তৈরি হচ্ছে না কিংবা ধ্বংস হচ্ছে না। শক্তির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় শুধু, নতুন করে তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যায় না। যেমন মোবাইলে কথা বলকে শব্দ শক্তি রূপান্তরিত হয় যান্ত্রিক শক্তিতে, যান্ত্রিক শক্তি আবার অন্য প্রান্তের মোবাইলে গিয়ে শব্দ শক্তিতে পরিণত হয়। যেভাবেই যাক, যতগুলো ধাপ পেরিয়ে যাক মূল শক্তির পরিমাণ একই থাকছে।

এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয় শক্তি। ছবি: স্মাগমাগ

কিন্তু আইনস্টাইনের সূত্র বলছে অন্য কথা। এ সূত্র অনুসারে নতুন করে বস্তু তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে। উল্টোভাবে নতুন করে শক্তিও তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে।  সূত্রে E হলো শক্তি আর m হলো ভর। যেহেতু ভর ও শক্তি একই সূত্রে আছে তারমানে কোনো না কোনো একদিক থেকে তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অনেকে ইতিমধ্যেই ধরে ফেলেছে আইনস্টাইনের সূত্র বলছে ভরকে (অর্থাৎ বস্তুকে) শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এবং উল্টোভাবে শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়।

সূত্রে আরো একটি অংশ বাকি রয়ে গেছে, । এখানে c হলো আলোর বেগ। এটি গুণক হিসেবে ভরের সাথে আছে। আলোর বেগ অবিশ্বাস্য পরিমাণ বেশি। প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রায়। যেহেতু আলোর বেগের মান বেশি এবং এটি এখানে গুণ হিসেবে আছে, তারমানে অল্প পরিমাণ বস্তুকে রূপান্তরিত করলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতার পাশাপাশি আইনস্টাইনের এই ভর-শক্তি সম্পর্কের সূত্রটিকেও ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম মৌল ব্যবহার করা হয়। এ মৌলগুলোর আকার বড় হয়ে থাকে। বাইরে থেকে একটি নিউট্রন দিয়ে যদি এদের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে তাহলে নিউক্লিয়াসটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। বিভক্ত হয়ে দুটি মৌল তৈরি করবে। মৌলের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু নিউট্রনও তৈরি করবে।

নতুন দুটি মৌল এবং নতুন তৈরি হওয়া নিউট্রনের ভর একত্রে যোগ করলে মূল ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়ামের ভরের সমান হবার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এখানে মূল ভর থেকে পরিবর্তিত ভর সামান্য কম থাকে। এই কম ভরটা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া ভরটা আইনস্টাইনের সূত্রানুসারে শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।[6] এই শক্তিকে ব্যবহার করেই টারবাইন ঘোরানো হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে যায় ইউরেনিয়াম পরমাণু। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে প্রক্রিয়াটিকে যত সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে এটি তত সহজ নয়। ছবিটির দিকে খেয়াল করুন। প্রথম একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করার ফলে পরমাণু ভেঙে আরো কতগুলো নিউট্রন তৈরি হয়েছে। সে নিউট্রনগুলো আবার অন্যান্য পরমাণুকে আঘাত করবে এবং সেসব পরমাণু থেকেও নিউট্রন অবমুক্ত হবে।

সেই নিউট্রন আবার আরো মৌলকে আঘাত করবে। এভাবে একটি চেইন বিক্রিয়ার জন্ম নেবে। এর ভয়াবহতা সহজেই আচ করার কথা। কারণ এটি সমান্তর ধারায়[7] নয়, গুণোত্তর ধারায়[8] অগ্রসর হচ্ছে। এই ঘটনাটি গুণোত্তর ধারায় অগ্রসর হবার মানে হচ্ছে একসময় শক্তির তীব্রতায় তা প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবে।

তবে এই চেইন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমন কোনোকিছু যদি দিয়ে দেয়া যায় যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষণ করে নেবে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্যাডমিয়াম নামে একটি মৌল আছে। এরা নিউট্রন শোষণ করতে পারে। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটরের মাঝে ক্যাডমিয়ামের রড রেখে দিলে তারা অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষে নিতে পারে।[9]

ক্যাডমিয়ামের নিয়ন্ত্রক রড। ছবি: টকিং আইডেন্টিটি

এখানেও কিছু জ্যামিতিক হিসেব করা যায়। রডের পরিমাণ (ক্ষেত্রফল) যদি বাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে বিদ্যুৎ কম উৎপন্ন হবে। আবার যদি ক্যাডমিয়াম রড কমিয়ে নেয়া হয় তাহলে চেইন রিঅ্যাকশন অধিক হারে হবে, ফলে বিদ্যুৎ বেশি উৎপন্ন হবে।

কিন্তু কেউ যদি বেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য কমাতে কমাতে বেশি কমিয়ে ফেলে কিংবা সম্পূর্ণই সরিয়ে ফেলে তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা মূলত নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই ঘটেছিল। এধরনের দুর্ঘটনায় এতই তাপ উৎপন্ন হতে পারে যে মুহূর্তের মাঝেই চুল্লিটিকে গলিয়ে ফেলতে পারবে।[10]

একটি বড় মৌলকে ভেঙে দুটি ছোট মৌল তৈরি করার এই ঘটনাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। পদার্থবিজ্ঞানে খুব গুরুত্বের সাথে নিউক্লিয়ার ফিশন আলোচনা করা হয়। এরকম আরো একটি ঘটনা আছে। দুটি ছোট মৌল একত্র হয়ে বড় একটি তৈরি করা।

একাধিক মৌল মিলে একটি মৌল তৈরি করার ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এতেও প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সূর্য। সূর্য থেকে যত ধরনের শক্তি পাই তার সবই তৈরি হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। কোনো তেল নয়, কোনো কাঠ নয়, কোনো গ্যাস নয় শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের বুকে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় শক্তি।

২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ভয়ানক ক্ষমতার বোমা বানানোর জন্য পরমাণু প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে মানবকল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তা ভাবনা করা হয়। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে দ্য এক্সপেরিমেন্টাল ব্রিডার রিঅ্যাকটর ১ থেকে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরবর্তীতে এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়।

বর্তমানে অনেকগুলো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ১৬ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে।[11] কোনো কোনো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই বেশি। যেমন ফ্রান্সে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদার ৭৭ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত থেকে।[12]

অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মত আছে। পক্ষের মত বিপক্ষের মত উভয়েরই প্রয়োজন আছে। আমরাও চেষ্টা করবো পরমাণু বিদ্যুৎ ও রূপপুর প্রকল্প সম্বন্ধে আরো আলোচনা করতে।

তথ্য সূত্রঃ 

[1] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[2] বিভব শক্তিকে বলা যেতে পারে সঞ্চিত শক্তি। বাসার ছাদের উপর যদি এক টাংকি পানি থাকে তাহলে ভূমির সাপেক্ষে পানিতে অনেকগুলো শক্তি সঞ্চিত আছে। একইভাবে সমস্ত পৃথিবী থেকে সূর্যের তাপের মাধ্যমে পানির কণাগুলো বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে। তারপর পানিচক্রের মাধ্যমে নদীতে আসে। নদীতে যদি বাধ দিয়ে একপাশের পানি আটকে দেয়া যায় তাহলে একপাশে পানির স্তর উপরে উঠে যাবে এবং অপর পাশে পানির স্তর নীচে নেমে যাবে। তাহলে নীচের অংশের সাপেক্ষে উপরের অংশে শক্তি সঞ্চিত আছে। উপরের পানিকে একটি টানেল দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পড়তে দিয়ে তাকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একেই বলে বিভব শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

[3] Fundamental Forces, http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/Forces/funfor.html

[4] https://education.jlab.org/qa/atomicstructure_04.html

[5] http://aether.lbl.gov/elements/stellar/strong/strong.html

[6] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[7] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৩, ৩-এর পর ৪, ৪-এর পর ৫, এভাবে যোগের মতো কোনো ধারা চলমান থাকলে তাকে বলে সমান্তর ধারা।

[8] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৪, ৪-এর পর ৮, ৮-এর পর ১৬, ১৬-এর পর ৩২ এভাবে কোনো ধারা গুণ বা সূচকের মতো চলমান থাকলে তাকে বলে গুণোত্তর ধারা।

[9] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[10] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[11] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[12] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

featured image: oilprice.com

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র বাতি

গ্রাফিন, কার্বনের এক প্রকার রূপভেদ যা ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী আর তামার চেয়ে বেশি পরিবাহী। গ্রাফিনের বিস্ময়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছে তার আলোক তৈরি করার ক্ষমতা। গবেষকরা আলোক নিঃসরক গ্রাফিন ট্রানজিস্টর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ফিলামেন্ট বাল্বগুলো যেরকম কাজ করে এগুলোও সেরকমই কাজ করে।

প্রকৌশলী ও পদার্থবিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই এমন এমন একটা কিছু খুঁজছিলেন যা আলো নিঃসরণ করবে এবং যার আকৃতি হবে অনেক ক্ষুদ্র। এই ধরনের ক্ষুদ্র আলোক নিঃসরকদের খুব সহজেই ইলেকট্রনিক চিপের মাঝে স্থাপন করা যাবে। এই ধরনের নিঃসরকদের বলা হবে ‘ফোটনিক সার্কিট (Photonic circuit)’। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সহ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেক ন্যানো যন্ত্রপাতির বেলায় এই ধরনের ‘বাল্ব’ খুব কাজে আসবে।

কিন্তু এই ধরনের ক্ষুদ্র বাল্ব নির্মাণে কিছু সমস্যার দেখা দেয়। প্রথমত এত ক্ষুদ্র আকৃতির বাল্ব নির্মাণ করা খুব চ্যালেঞ্জিং দ্বিতীয়ত তাপমাত্রা সমস্যা। প্রকৌশল বিদ্যায় কোনো বস্তু হতে তখনই আলোক নিঃসৃত হয় যখন বস্তুটি প্রচণ্ড পরিমাণ উত্তপ্ত হয়। ক্ষুদ্র বস্তুতে এত উত্তাপ প্রদান করলে বস্তুটি গলে যাবে যা বড় ধরনের সমস্যা।

গ্রাফিন যেহেতু ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী, তামার চেয়ে বেশি পরিবাহী ও তাপ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন তাই গ্রাফিন এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। সেই লক্ষে বিজ্ঞানীরা কাজে নেমে পড়লেন এবং সফলও হলেন। তারা জানান গ্রাফিনের এই জিনিসটি উদ্ভাবনের ফলে খুব ক্ষুদ্র স্কেলে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রতিবন্ধকতা দূর হবে।

বাস্তব জীবনেও প্রচুর উপকার বয়ে আনতে পারে এই উদ্ভাবন। যেমন নিত্যদিনের ব্যবহার করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ক্ষুদ্র চিপ ব্যবহার করতে হয়। এটি এই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে সমস্ত মানবজাতির উপকারে আসবে। বিজ্ঞানীদের এই প্রচেষ্টা হয়তো ক্ষুদ্র স্কেলের গবেষণা তথা ন্যানো প্রযুক্তিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স

featured image: nyerogep.co

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেকার ঘটনা। পৃথিবী তখন অনেকটাই অন্যরকম ছিল। সেখানে কোনো পাতাবহুল উদ্ভিড, জন্তু-জানোয়ার, পোকামাকড় কিছুই ছিল না। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করতো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো ছিল তাদের আবাস। তাদের জীবনচক্র ছিল খুবই সরল। ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই শ্বসন ও বিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। তখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। অক্সিজেন কেবল পানির অণুতে আর ধাতব যৌগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর শুরু হলো পরিবর্তন। আবির্ভাব ঘটল নতুন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এরা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম। এরা সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করতে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপন্ন মুক্ত অক্সিজেন সমুদ্রে দ্রবীভূত লোহা দ্বারা শোষিত হতো। যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে পাললিক শিলা গঠন করতে থাকে। এই সময়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে থাকে। খনিজগুলোও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে আর অক্সিজেন শোষণ সম্ভব হচ্ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ছিল, সেগুলো ছিল অবাত অর্থাৎ সেগুলোর জন্য মুক্ত অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। ফলে অসংখ্য ব্যাকটে-রিয়ার প্রজাতি ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘The Great Oxygena-tion Event’।

এর আগ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সক্রিয় অণুর উপস্থিতি কম ছিল। তবে সেখানে মিথেনের আধিক্য ছিল। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এর তুলনায় অধিক কার্যকর গ্রিন হাউজ গ্যাস। এই মিথেনই পৃথিবীকে উষ্ণ রাখছিল। কিন্তু যেহেতু অক্সিজেনের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করলো, এর কিছু অংশ মিথেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে থাকে। মিথেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়

চিত্রঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর তাপমাত্রাও কমে যেতে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেরাও ছিল বিপদাপন্ন। এদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।

বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যে অনুপাত জীবের উপযোগী তা গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে, ‘Great Oxygenation Event’ এরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পর।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রাচীন উদ্ভিদ, যেমন ব্রায়োফাইটা জাতীয় মস। এই উদ্ভিদগুলো সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম ছিল। এজন্য এদের কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামের অঙ্গাণু ছিল। ক্লোরোপ্লাস্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, এদের মাঝে সমান আকৃতির প্রায় ২০০টি ডিএনএ অণু থাকতে পারে, এদের রাইবোজোম আছে, এরা নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরিতে সক্ষম, প্রয়োজনে নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন সংশ্লেষ করতে পারে, বংশানুসারে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রকৃ্তপক্ষে সায়ানব্যাকটেরিয়া যা বিবর্তনের গতিপথে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সহজীবী (symbiotic)হিসেবে বসবাস করছে। মস উদ্ভিদ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মিল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় ব্যাকটেরিয়াগুলো কোনো এক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন উদ্ভিদগুলোতে প্রবেশ করেছিল এবং নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এগুলো সূর্যালোক থেকে শক্তি তৈরি করতো যা উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করতো। এভাবে এরা উদ্ভিদদেহে স্থান পেয়েছিল এবং বিবর্তনের পথে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলো পৃথিবীর বুকে সবুজ কার্পেটের মতো ছেয়ে গিয়েছিল। এই উদ্ভিদগুলোর জন্যই অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। উদ্ভিদগুলো বায়ু থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেন ত্যাগ করে। উদ্ভিদগুলোর সালোকসংশ্লেষণের পুনরাবৃত্তিই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল অক্সিজেন চক্র গঠন করে। প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলোই বায়ুমণ্ডলে ৩০% পরিমাণে অক্সিজেনের যোগান দিয়েছিল। উদ্ভিদগুলো আশ্চর্যজনকভাবে উৎপাদনশীল ছিল এবং তারাই ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতা।

এখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, স্বল্প পরিমাণ আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস রয়েছে। অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে কেবল শ্বসন উপযোগীই করছে না, সেই সাথে ওজোন স্তর গঠন করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে জীবদের রক্ষা করছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদগুলো না থাকলে পৃথিবীতে আজ আজ আমাদের কারোই অস্তিত্ব থাকতো না।

তথ্যসূত্র

১. https://www.newscientist.com/article/2101032-without-oxygen-from-ancient-moss-you-wouldnt-be-alive-today/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Oxygenation_Event

৩. https://youtu.be/DE4CPmTH3xg

 

যে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ না থাকলে অস্তিত্বই থাকতো না মানুষের

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগেকার ঘটনা। পৃথিবী তখন অনেকটাই অন্যরকম ছিল। সেখানে কোনো পাতাবহুল উদ্ভিড, জন্তু-জানোয়ার, পোকামাকড় কিছুই ছিল না। তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করতো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। পৃথিবীর সমুদ্রগুলো ছিল তাদের আবাস। তাদের জীবনচক্র ছিল খুবই সরল। ব্যাকটেরিয়াগুলো অক্সিজেন ছাড়াই শ্বসন ও বিপাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। তখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। অক্সিজেন কেবল পানির অণুতে আর ধাতব যৌগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর শুরু হলো পরিবর্তন। আবির্ভাব ঘটল নতুন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যার নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। এরা সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম। এরা সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করতে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন উৎপন্ন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপন্ন মুক্ত অক্সিজেন সমুদ্রে দ্রবীভূত লোহা দ্বারা শোষিত হতো। যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে পাললিক শিলা গঠন করতে থাকে। এই সময়ে ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচুর পরিমাণে জন্মাতে থাকে। খনিজগুলোও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে আর অক্সিজেন শোষণ সম্ভব হচ্ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়া ছাড়া অন্য যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ছিল, সেগুলো ছিল অবাত অর্থাৎ সেগুলোর জন্য মুক্ত অক্সিজেন ছিল বিষাক্ত। ফলে অসংখ্য ব্যাকটে-রিয়ার প্রজাতি ধ্বংস হতে থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘The Great Oxygena-tion Event’।

এর আগ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে সক্রিয় অণুর উপস্থিতি কম ছিল। তবে সেখানে মিথেনের আধিক্য ছিল। মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এর তুলনায় অধিক কার্যকর গ্রিন হাউজ গ্যাস। এই মিথেনই পৃথিবীকে উষ্ণ রাখছিল। কিন্তু যেহেতু অক্সিজেনের প্রাচুর্য বাড়তে শুরু করলো, এর কিছু অংশ মিথেনের সাথে মিলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করতে থাকে। মিথেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়

চিত্রঃ সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যারা পৃথিবীতে অক্সিজেন তৈরির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর তাপমাত্রাও কমে যেতে থাকে। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেরাও ছিল বিপদাপন্ন। এদের সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেনের আবির্ভাব ঘটে।

বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের যে অনুপাত জীবের উপযোগী তা গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে, ‘Great Oxygenation Event’ এরও প্রায় ২ বিলিয়ন বছর পর।

প্রায় ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রাচীন উদ্ভিদ, যেমন ব্রায়োফাইটা জাতীয় মস। এই উদ্ভিদগুলো সালোকসংশ্লেষণে সক্ষম ছিল। এজন্য এদের কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামের অঙ্গাণু ছিল। ক্লোরোপ্লাস্টের বিশেষ কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন, এদের মাঝে সমান আকৃতির প্রায় ২০০টি ডিএনএ অণু থাকতে পারে, এদের রাইবোজোম আছে, এরা নিজস্ব প্রতিরূপ তৈরিতে সক্ষম, প্রয়োজনে নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন সংশ্লেষ করতে পারে, বংশানুসারে নিজেদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে ইত্যাদি।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ক্লোরোপ্লাস্ট হলো প্রকৃ্তপক্ষে সায়ানব্যাকটেরিয়া যা বিবর্তনের গতিপথে কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সহজীবী (symbiotic)হিসেবে বসবাস করছে। মস উদ্ভিদ থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার মিল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় ব্যাকটেরিয়াগুলো কোনো এক প্রক্রিয়ায় প্রাচীন উদ্ভিদগুলোতে প্রবেশ করেছিল এবং নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। এগুলো সূর্যালোক থেকে শক্তি তৈরি করতো যা উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করতো। এভাবে এরা উদ্ভিদদেহে স্থান পেয়েছিল এবং বিবর্তনের পথে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলো পৃথিবীর বুকে সবুজ কার্পেটের মতো ছেয়ে গিয়েছিল। এই উদ্ভিদগুলোর জন্যই অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। উদ্ভিদগুলো বায়ু থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বায়ুতে মুক্ত অক্সিজেন ত্যাগ করে। উদ্ভিদগুলোর সালোকসংশ্লেষণের পুনরাবৃত্তিই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল অক্সিজেন চক্র গঠন করে। প্রাচীন এই উদ্ভিদগুলোই বায়ুমণ্ডলে ৩০% পরিমাণে অক্সিজেনের যোগান দিয়েছিল। উদ্ভিদগুলো আশ্চর্যজনকভাবে উৎপাদনশীল ছিল এবং তারাই ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রধান যোগানদাতা।

এখনকার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, স্বল্প পরিমাণ আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস রয়েছে। অক্সিজেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে কেবল শ্বসন উপযোগীই করছে না, সেই সাথে ওজোন স্তর গঠন করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে জীবদের রক্ষা করছে।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদগুলো না থাকলে পৃথিবীতে আজ আজ আমাদের কারোই অস্তিত্ব থাকতো না।

তথ্যসূত্র

১. https://www.newscientist.com/article/2101032-without-oxygen-from-ancient-moss-you-wouldnt-be-alive-today/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Oxygenation_Event

৩. https://youtu.be/DE4CPmTH3xg

 

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ