প্যারিডোলিয়াঃ এখানে ওখানে মানুষের মুখ

চাঁদে, বিকৃত আকৃতির সবজিতে, পোড়া টোস্টে মুখাবয়ব দেখার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বার্লিন ভিত্তিক একটি সংঘ স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে পুরো গ্রহে এমন মানব-সদৃশ মুখাবয়বের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ ‘প্যারিডোলিয়া’ শব্দটিই কখনো শুনেনি। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকেরই এর সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে।

কেউ চাঁদের দিকে তাকিয়ে যদি দুইটি চোখ, একটি নাক ও একটি মুখ দেখতে পায় তবে সে ‘প্যারিডোলিয়া’ ব্যাপারটি অনুভব করতে পারবে। ওয়ার্ল্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, এটা হচ্ছে কোনো ছাঁচ বা অর্থ উপলব্ধি করার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ক্ষমতা। প্রকৃতপক্ষে যার সেখানে কোনো অস্তিত্ব নেই।

পূর্ব রাশিয়ার ম্যাগাডান প্রদেশের ল্যান্ডস্কেপে মুখমন্ডল

জার্মান ডিজাইন স্টুডিও প্যারিডোলিয়ার ব্যাপারে আরো খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিচ্ছে যেটা হয়তো এ নিয়ে করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সিস্টেমেটিক প্রকল্প। তাদের ‘গুগল ফেসেস প্রোগ্রাম’ পরবর্তী কয়েকমাস গুগল ম্যাপে প্যারিডোলিয়ার জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে।

গুগল ফেসেস সম্পূর্ণ পৃথিবীকে বিভিন্ন কোণ থেকে কয়েকবার স্ক্যান করবে। এখনো পর্যন্ত প্রোগ্রামটি রাশিয়ার দূরবর্তী প্রদেশ ম্যাগাডানে একটি ভীতিজনক প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছে যা লোমশ নাসারন্ধ্রযুক্ত একটি মুখাবয়ব। এটি অ্যাশফোর্ড নামক স্থানে অবস্থিত।

আলাস্কার পর্বতের মধ্যেও এটি ম্যাঙ্গি প্রাণীর মুখ-সদৃশ প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছিল। তবে এমন অজায়গায় এসব মুখাবয়বের দেখা পাওয়ার ঘটনা এই প্রথমই ঘটেনি। এই সপ্তাহে, ইউএস ডিপার্টমেন্ট স্টোর ‘পেনি’ একটি কেটলি বিক্রি করে। সামাজিক সংবাদ মাধ্যম রেডিটে প্রকাশিত হওয়ার পর।


মাদার তেরেসা সদৃশ এই খাবারের আইটেমটির নাম ‘নান-বান’।

এই কেটলির মধ্যে থার্ড রেইকের নেতার চেহারার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। গত বছর e-bay’তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মতো দেখতে একটি চিকেন নাগেট ৮১০০ ডলার বিক্রি হয়েছিল। এক দশক আগে, ২০০০০ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল যেখানে একটি চাপাতির মধ্যে আগুনে দগ্ধ যীশু খ্রিষ্টের প্রতিমা দেখা গিয়েছিল। কিছু দর্শনার্থী সেখানে প্রার্থনাও করেছিল।

একটি টাম্বলার সাইট আছে, যারা মূলত হিটলাদের সাথে সদৃশ আছে এমন জিনিস খুঁজে থাকে। ২০১১ সালে একটি সুন্দর সমতল বাড়ির ছবি প্রকাশ করেছিল যার ছাদের অংশটুকু ছিল একদম হিটলারের চুল আঁচড়ানোর ঢংয়ের অনুরূপ, আর এর দরজার ঢালাই ঠিক যেন হিটলারের চির পরিচিত গোঁফের স্মারক।

অ্যামেরিকান একটি ঘটনা। ডায়না ডায়জার নামে একজন মহিলা একবার স্যান্ডউইচ খেতে গিয়ে সেই স্যান্ডউইচের মধ্যে যিশু খ্রিস্টের মাতা ম্যারিকে দেখতে পান। প্রথমবার কামড় দাওয়ার পরে স্যান্ডউইচের মধ্যে ম্যারির প্রতিমা ভেসে ওঠে। স্যান্ডউইচের বাকি অংশ এক দশকেরও বেশি সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখে। ডায়জার বিক্রির জন্য স্যান্ডউইচটিকে e-bay’তে নিলামে তোলে যেখানে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন আগ্রহী ব্যক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্যান্ডউইচটি শেষ পর্যন্ত ২৮০০০ ডলারে বিক্রি হয়।

ডায়না ডায়জার এবং তার পবিত্র স্যান্ডউইচ।

গুগল ফেসেস ডিজাইনার সেডরিক কাইফার এবং জুলিয়া লবও প্যারিডোলিয়া দ্বারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে ভাইকিং ১ অরবিটারের তোলা বিখ্যাত ‘ফেস ইন মার্স’ দেখার পর এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করার পর তারা ভাবতে শুরু করেন কীভাবে প্যারিডোলিয়ার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটি একটি যন্ত্র দিয়ে জেনারেট করা যায়। তারা ভাবেননি তাদের প্রজেক্টটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারবে।

কিন্তু রাশিয়ান তান্দ্রায় এবং ব্রিটেনে তাদের তোলা মুখাবয়বের ছবিগুলো খুব দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাইফার বলেন, এসব দেখে মনে হয় প্যারিডোলিয়ার সাথে আকর্ষণীয় কিছু ব্যাপার জড়িত।

চিত্রঃ ‘দ্যা ফেসেস ইন মার্স ১৯৭৬’ এর ছবি। পাশে সাম্প্রতিক কালের আরেকটি ছবি।

কিন্তু কেন মানুষ সেসব বস্তুর মধ্যে বিভিন্ন মুখাকৃতি দেখতে পায় যেগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুর দাগ বা প্রলেপ অথবা বিকৃত আকৃতির পাথর ছাড়া আর কিছুই না? এদের মধ্যে কিছু কিছু হলো বিবর্তনের পথে মানুষের ক্রমবিকাশের ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য।

মানুষ জন্মগতভাবে মুখাবয়ব শনাক্ত করার ক্ষমতা পেয়ে থাকে। কয়েক মিনিট বয়সী একটা শিশু এমন কিছুর দিকে তার দৃষ্টি চালনা করবে যার মধ্যে মুখ-সদৃশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এমন কিছুর দিকে সে তাকাবে না যেখানে ঠিক একই বৈশিষ্ট্যসমূহ অবিন্যস্তভাবে থাকবে।

পরিচিত বা চেনা কিছু খোঁজার প্রবণতা এসেছে সেই আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ হতে পারে প্রস্তর যুগের মানব। ধরা যাক একটা ঝোপের পাশে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে কোনো এক প্রস্তর যুগের মানুষ ভাবছে, ঝোপের ওপাশে খচমচে আওয়াজ সৃষ্টিকারী প্রাণীটি কি আসলে একটা বাঘ, নাকি অন্য কিছু?

আপনি বেঁচে যাবেন যদি আপনি ভেবে নেন যে ওখানে একটা খড়গ-দন্ত বাঘ রয়েছে এবং তাই তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালান। তা না করলে অন্যথায় আপনি সেই প্রাণীর দুপুরের খাবার হিসেবে পরিণত হতে পারেন।

চিত্রঃ পাতার মধ্যে মোনালিসা অথবা ভার্জিন মেরি, চকোলেটের মধ্যে ম্যাডোনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারিডোলিয়া হচ্ছে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সিস্টেমের প্রভাব। মস্তিষ্ক ক্রমাগতভাবে চক্রাকারে বিভিন্ন রেখা, আকৃতি, রঙ এবং পৃষ্ঠতলের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। তবে অর্থ আরোপ করলে এদের অন্যরকম গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন দীর্ঘমেয়াদী কোনো শিক্ষা বা অভিজ্ঞতার সাথে এগুলো মিলানো। এই পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবার ফলই হচ্ছে প্যারিডোলিয়া।

চিত্রঃ গুয়াডালুপ রদ্রিগেজ টেক্সাসে একটি ক্যাফেটেরিয়া বেকিং ট্রে’র মধ্যে দেখতে পায় ভার্জিন মেরিকে।

প্যারিডোলিয়া মানুষের আশা-প্রত্যাশার ফলাফলও হতে পারে। টোস্টের মধ্যে যীশুকে দেখতে পাওয়াই বলে দেয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে কী ঘটছে। এটা হচ্ছে ইল্যুশনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, এটি খুব সহজে আপনার মনে একটা ব্যাপারকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে পারে।

কিন্তু কেন মানুষ এক টুকরো খাবারে পাওয়া মুখাবয়ব একটু দেখার জন্য তীর্থযাত্রা করে অথবা সেটা কিনার জন্য হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করে? এর কারণ আধুনিক যুগের মানুষেরাও দৈব ঘটনায় বিশ্বাস রাখে। কেউ যদি দৈব ঘটনায় বিশ্বাস করে তাহলে প্যারাডলিয়া খুবই গুঢ় অর্থপূর্ণ হতে পারে। যার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করা কোনো ব্যাপারই না।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, http://www.bbc.com/news/magazine-22686500