ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

একজন বড় বিজ্ঞানীর টুকরো গল্প

এপ্রিলের কোনো এক পড়ন্ত বিকেল। রৌদ্রের শেষ লাল ছটা রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে টেবিলের উপর রাখা হাতের প্রান্ত ছুঁয়ে পড়ছে। লোকটি একাই বসে আছে। আসলে লোক বলা উচিৎ হবে না। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বসে থাকার কারণে উচ্চতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একনাগারে এক নারীর দিকে চেয়ে আছে।

আসলে ছেলেটি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিদিন এই মেয়েটিই তাকে সার্ভ করে। তাই কিছুটা হাই-হ্যালো কথাবার্তাও হয়। মেয়েটি এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েট্রেস। কাস্টমার আজ বেশি থাকাতে কাজের চাপ বেশ। আজ কথা বলার সময় নেই। ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাতে লাভ হল বলে মনে হলো না। মানুষের ব্যাস্ততা নিয়ে চিন্তা করে আপন মনেই হেঁসে উঠল। শেষমেশ টিপসটা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টিপস নিতে গিয়ে দেখে দুটি পানি ভর্তি গ্লাসের মাথায় কাগজ দিয়ে উল্টিয়ে রাখা, আর সাথে একটি ছোট কাগজের নোট। সেখানে লেখা— টিপসটা একটু সাবধানে নেবেন। মেয়েটি সামান্য অবাক হলো। কিন্তু গ্লাসগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। টিপসের কয়েনগুলো গ্লাসের ভেতরে।

মেয়েটি যদিও টিপস নিতে পেরেছিল, কিন্তু অনেক বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর ছেলেটা? সে আসলে মেয়েটিকে ব্যাস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই দেবার জন্য ঐ কাজ করেছিল।

গল্পের এই ছেলেটির নাম রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? তাকে আমরা অনেকেই চিনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি এরকম অসংখ্য মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন জীবনে।

জিনিয়াস ও কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মানুষটি নিউইয়র্কের ফার রকওয়ে শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মা লুসিলি নি ফিলিপস ছিলেন গৃহিণী আর বাবা মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান ছিলেন একজন সেলস ম্যানেজার।

তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড়। ছোট ভাই হেনরি ফিলিপস মাত্র ৪ সপ্তাহে মারা যায়। দুই ভাইবোনের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। পরিবারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার কারণেই তার বোন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পারেন। বর্তমানে তিনি একজন নামকরা জ্যোতিঃপদার্থবিদ, নাম জোয়ান ফাইনম্যান।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ফাইনম্যানও ছিলেন একজন লেইট টকার। তিনিও দেরীতে কথা বলতে শিখেছিলেন। তিন বছর বয়সে কথা বলা শুরু করা শিশুটি এমআইটি থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর জন আরকিবাল্ড হুইলারের অধীনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেখানে তার করা গবেষণা কোয়ান্টম মেকানিক্সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়যুক্তরাষ্ট্রেরর হয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার অবদান ছিল। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে সারা জীবন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। বলেছিলেন—

আমরা বিজ্ঞানীরা চালাক একটু বেশিই চালাক আপনারা সন্তুষ্ট নন? একটা বোমা দিয়ে চার কিলোমিটার উরিয়ে দেয়া কি যথেষ্ঠ নয়? মানুষ এখনো ভাবছে। বলুন, আর কতটুক বেশি ধ্বংসাত্মক চান আপনারা!

যুদ্ধ পরবর্তী সময় তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৫০ সালে ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আসেন।

ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তার লেকচারসমূহ The Feynman Lecture on Physics নামে প্রকাশিত হয়। এগুলো আজও সারা বিশ্বের সকল পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম পাঠ্য বই হিসেবে স্বীকৃত।

এ ছাড়াও Quantum Electrodynamics (1961) এবং The Theory of Fundamental Processes (1961) বই দুটি তার লেকচারের উপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি আর পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে লিখেছেন QED: The Strange Theory of Light and Matter, The Character of Physical Law সহ আরো বেশ কয়েকটি বই।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তার অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জুলিয়ান এস শোইনযার এবং জাপানী বিজ্ঞানী শিনিচিরো তোমোনাগা এ সম্মান লাভ করেন। যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে তার একটি উক্তি হলো—

আমার মনে হয়, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স কেউ বোঝে না

তার শেষ কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের ধ্বংস হবার কারণ বের করা। সেই দুর্ঘটনায় ৭ জন নভোচারী মারা যায়। যাদের একজন ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ফাইনম্যান সফলভাবেই তার কাজ সম্পাদনা করেন। তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারে সবার কাছে মহকাশযানটি ধ্বংস হবার কারণ নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এ জন্যে তিনি এক গ্লাস বরফশীতল ঠাণ্ডা পানিতে একটি রাবারের সিল ডুবিয়ে দেখান যে, এমন অবস্থায় রাবার স্বাভাবিক থাকে না। খুব ভঙ্গুর হয়ে যায়। বরফ শীতল সকালে মহাকাশযানের বুস্টার রকেটের রাবারের সিলটিও বেশ ভঙ্গুর ছিল। এ কারণে রকেটটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয় এবং মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়।

চিত্র: চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের ভেতর বিস্ফোরিত হয়

ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি কার্ল এবং মিশেল নামে দুই সন্তানের পিতা। ১৯৭৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিকেল চেকআপের পর দেখা গেল তিনি লিপোসারকোমা নামক এক বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর তার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

চিত্র: ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের ডিজাইন করা ভ্যানের সামনে ফাইনম্যান এবং তার পরিবার

তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার মৃত্যুর পর, তার প্রকাশিত সেমি-অটোবায়োগ্রাফি Surely You’re Joking Mr. Feynman! আর What Do You Care What Other People Think? এর কারণে। বই দুটি সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে তাকে। যতটুকু না বিজ্ঞানী হিসেবে, তার চেয়েও বেশি ঐ মজার মানুষ হিসেবে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তার শেষ উক্তি ছিল—

আমি দ্বিতীয় বার মরতে চাই না, এটা খুবই বিরক্তকর।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.britannica.com/biography/Richard-Feynman
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Feynman
  3. Surely You’re Joking, Mr. Feynman! By Richard p. Feynman

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের গল্প

স্ট্যান্ডার্ড মডেলে(১)  বস্তুর গঠনের জন্য দায়ী কণা তথা ম্যাটার পার্টিকেলের মাঝে অন্যতম হলো কোয়ার্ক। ফার্মিয়ন শ্রেণির এই কোয়ার্ক কণাদের সর্বমোট ৬টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভার আছে। এদের নাম হলো আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, চার্ম কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক, টপ কোয়ার্ক ও বটম কোয়ার্ক। আজকে আমারা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সম্পর্কে জানবো। চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে প্রথমেই বলে রাখা ভাল, নামকরণে এদের নামের ইংরেজি অর্থ ভূমিকা রাখে না। এগুলো পরিচয়জ্ঞাপক নাম মাত্র।

কণা-পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে দেখা যায় চার্ম ও স্ট্রেজ কোয়ার্ক ২য় প্রজন্মের(২) কোয়ার্ক কণা। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সালের মাঝে যখন এইট-ফোল্ড তত্ত্ব(৩) গঠিত হয় এবং তা থেকে বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান হ্যাড্রনদের(৪) নতুন একটি গাঠনিক মডেল প্রকাশ করেন। তখন কোয়ার্কের ৬টি ফ্লেভারের কথা কেউ জানতো না। মনে করা হতো, সকল হ্যাড্রন কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ এবং কিছু কিছু কণাতে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক রয়েছে।

এইট ফোল্ড তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৯৬৪ সালে মারি গেলম্যান ও জর্জ জিউগ সর্বপ্রথম এই কণার তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এইট ফোল্ড তত্ত্বের এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসরণ করে ১৯৬৮ সালে স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টার (SLAC) আপ, ডাউন এবং স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন। স্ট্রেঞ্জ কণার ভবিষ্যদ্বাণীতে কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নামক একটি ধর্মের কথা স্মরণীয়। চার্জ, ভর বা স্পিন যেমন কণাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য তেমনি স্ট্রেঞ্জনেসও কণাদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

চিত্র: স্ট্যান্ডার্ড মডেলে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান। বাম দিক থেকে ২য় কলামে, উপরের দুটি।

স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মকে একটি ফ্লেভার কোয়ান্টাম সংখ্যার সাহায্যে বর্ণনা করা যায়। একে s দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কোনো কণার স্ট্রেঞ্জনেস বলতে বোঝায়, ঐ কণার অন্তর্গত স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণার সংখ্যা থেকে অ্যান্টি-স্ট্রেঞ্জ কণার সংখ্যা বিয়োগ করে বিয়োগফলের ঋণাত্বক মান।

যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা ও zটি অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক কণা থাকলে, ঐ কণার স্ট্রেঞ্জনেসের (s) মান হবে, s = -(x – z) অর্থাৎ কণাটিতে যদি স্ট্রেঞ্জনেসের মান ধনাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

আর যদি স্ট্রেঞ্জনেস ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। যেমন: একটি স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে -১ আবার অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের স্ট্রেঞ্জনেস হচ্ছে +১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই স্ট্রেঞ্জনেস ০। কেননা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রোটন বা নিউট্রনে কোনো স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক বা অ্যান্টিস্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক থাকে না।

স্ট্রেঞ্জনেস নামক কণাদের এই ধর্মের ধারণা প্রদান করেন মারি গেলম্যান ও কাজুহিকো নিশিজিমা। কণাদের বিভিন্ন সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন কায়ন, হাইপারন, সিগমা ডি মেসন ইত্যাদি কণার আচরণ ব্যাখ্যায় ১৯৫৫ সালের দিকে গেলম্যান-নিশিজিমা সূত্র গঠন করা হয়। এসব কণারা যখন সবল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় অনেক কম। কিন্তু সেই একই কণা যদি দুর্বল নিউক্লিয় বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন তাদের আয়ু হয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এই ঘটনা ব্যাখ্যায় কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস ধর্মের উৎপত্তি। যাই হোক, স্ট্রেঞ্জনেস ধারণার পর স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ অ্যান্টিকোয়ার্কের ধারণা আসলেও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ যৌগিক কণা দেখা যায় অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালেই কসমিক রশ্মিতে কায়ন কণার অস্তিত্ব দেখা যায়। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিস্কারের পর জানা যায়, কায়ন কণা মূলত স্ট্রেঞ্জ কণা দ্বারা গঠিত।

চিত্রঃ কোয়ার্ক মডেল, এইটফোল্ড ওয়ে, স্ট্রেঞ্জনেসসহ কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের গ্রুপ প্রতিসাম্য ভাঙনের সফল ব্যাখ্যাদানকারী বিজ্ঞানী মারি গেল ম্যান।

স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের চার্জ -১/৩ e এবং স্ট্রেঞ্জনেস -১। এই কণার আইসোস্পিন(৫) ০, ব্যারিয়ন সংখ্যা(৬) +১/৩ এবং স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা +১/২। স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের ভর ৯৫ MeV/c2 অর্থাৎ ভরের দিক থেকে এই কণা ৬টি কোয়ার্কের মাঝে ৪নং স্থানে আছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের অবস্থান চার্ম কোয়ার্কের ঠিক নিচেই।

আবিষ্কারের দিক থেকে চার্ম কোয়ার্ক চতুর্থ নম্বর এবং ভরের দিক থেকে ৩ নম্বর। বহুদিন ধরে ভাবা হতো এই ৩টি কোয়ার্কই মৌলিক কণা। কিন্তু চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কার হবার পর এই ধারণা ভেঙে যায়। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক উভয়টিই ২য় প্রজন্মের কোয়ার্ক বলে তাদের বেশ কিছু ধর্মের সাদৃশ্য বিদ্যমান। চার্ম কোয়ার্ক ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের মোট কৌণিক ভরবেগ, আইসোস্পিন, স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা ও ব্যারিয়ন সংখ্যা একই। আলাদা হলো ভর ও চার্জ। চার্ম কোয়ার্কের ভর ১২৭৫ MeV/c2 এবং চার্জ হলো +২/৩ e।

“ফ্লেভার পরিবর্তক নিরেপেক্ষ প্রবাহ” (Flavor-Changing Neutral Current) নামে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বে একটি টার্ম আছে। এটি দ্বারা বোঝায় কোনো একটি ফার্মিয়নের(৭) বৈদ্যুতিক চার্জ ঠিক রেখে শুধু ফ্লেভারের পরিবর্তন করা। এটি প্রকৃতিতে ঘটে না। যদিও ল্যাগ্রাঞ্জিয়ান মিথস্ক্রিয়া অনুসারে এটি ঘটার কথা।

এই FCNC ঘটার কথা থাকলেও কেন ঘটে না তার ব্যাখ্যা দিতে মঞ্চে আসে GIM মেকানিজম। ১৯৭০ বিজ্ঞানী শেলডন গ্লাসো, জন ইলোপুলাস ও লুচিয়ানো মায়ানি এই GIM মেকানিজম দ্বারা দেখান যে, কেন FCNC প্রাকৃতিকভাবেই দমিত থাকে।

কিন্তু GIM মেকানিজম সত্যি হতে হলে ৩টি কোয়ার্ক কণা যথেষ্ট ছিল না। আরেকটি কোয়ার্কের তাত্ত্বিক অস্তিত্ব চলে আসছিল। এর কিছুদিন পরেই ১৯৭৪ সালে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী স্যামুয়েলটিঙ ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার একসিলারেটর সেন্টারের বিজ্ঞানী বার্টন রিখটার কর্তৃক চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

চিত্রঃ Stanford Linear Accelerator Center

কণাদের স্ট্রেঞ্জনেসের মতো চার্মনেস বলেও একটি পরিভাষা আছে। তবে একে ঠিক চার্মনেস না বলে চার্ম বলা হয়। অর্থাৎ কোয়ার্কের নামও চার্ম এবং ধর্মের নামও চার্ম। স্ট্রেঞ্জনেসের সাথে চার্ম ধর্মের কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, কোনো একটি হ্যাড্রনে xটি চার্ম কণা ও zটি অ্যান্টিচার্ম কণা থাকলে, ঐ কণার চার্ম (c) মান হবে, c = x – z অর্থাৎ কণাটিতে যদি চার্ম মান ধনাত্মক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় চার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি। আর যদি চার্ম মান ঋণাত্বক হয়, তবে বুঝতে হবে ঐ কণায় অ্যন্টিচার্ম কোয়ার্কের সংখ্যা বেশি।

অর্থাৎ চার্ম ধর্ম স্ট্রেঞ্জনেসের পুরো উলটো। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। একটি চার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে +১ আবার অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্কের চার্ম মান হচ্ছে -১। একটি প্রোটন বা নিউট্রন, উভয়েরই চার্ম মান ০। স্ট্রেঞ্জনেসের বেলায় একটি মাইনাস চিহ্ন থাকে, যেটি চার্ম মানের বেলায় থাকে না।

এর কারণ হলো, প্রথাগতভাবে ফ্লেভার চার্জ তথা স্ট্রেঞ্জনেস, চার্ম মান, বটমনেস, টপনেস, আইসোস্পিন ইত্যাদি এবং বৈদ্যুতিক চার্জ- এই দুই চার্জের চিহ্ন একই রাখা হয়। এই নিয়ম মানতে গিয়ে স্ট্রেঞ্জনেস ও বটমনেসের আগে মাইনাস চিহ্ন আসলেও টপনেস ও চার্ম মানের আগে মাইনাস চিহ্ন আসে না।

চার্ম কোয়ার্কযুক্ত হ্যাড্রন কণাদেরও চার্ম কোয়ার্ক আবিষ্কারের আগেই পাওয়া গিয়েছিল। ডি মেসন, জে বাই সাই মেসন, চার্মড সিগমা মেসন ইত্যাদি মেসন কণাতে চার্ম কোয়ার্ক আছে। মেসন কণা বাদেও ব্যারিয়ন কণাতেও চার্ম কোয়ার্ক পর্যবেক্ষিত হয়েছে। চার্ম কোয়ার্কের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই কোয়ার্কের কোয়ার্কোনিয়াম(৮) অবস্থা অনেকগুলো।

অর্থাৎ একটি চার্ম কোয়ার্ক ও আরেকটি চার্ম অ্যান্টিকোয়ার্ক মিলে অনেকগুলি অবস্থা সৃষ্টি করে। যেমন, জে বাই সাই, চার্মড ইটা (1s), সাই (৩৬৮৬), সাই (৩৭৭০) ইত্যাদি। তবে চার্মোনিয়াম এর (একটি চার্ম ও একটি অ্যান্টিচার্ম কোয়ার্ক) ভূমি অবস্থা বা গ্রাউন্ড স্টেট হলো জে বাই সাই মেসন।

চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ- এই দুই কোয়ার্ক কণার আবিস্কার ছিল কণা পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী। কেননা এই দুই কোয়ার্ক কণা একটি নতুন প্রজন্মের কোয়ার্ক কণার যুগ সূচনা করেছিল। একসময় মনে করা হতো সকল কণায় আপ ও ডাউন কোয়ার্কের বিভিন্ন অবস্থার এবং বিভিন্ন অনুপাতের সংমিশ্রণ। আসলে সেটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে এই চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক আবিষ্কারের মাধ্যমেই।

আমরা এখন জানি, অধিকাংশ কণাই আপ ও ডাউন কোয়ার্ক সমৃদ্ধ হলেও কিছু কণা চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক সমৃদ্ধ। প্রোটন ও নিউট্রনে শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্ক কণাই রয়েছে- এই তথ্যটিও ভুল প্রমাণ হয়েছে স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক নিয়ে গবেষণার ফলে।

একটি প্রোটনে দুইটি আপ ও একটি ডাউন কোয়ার্ক ছাড়াও আরো যেকোনো সংখ্যক স্ট্রেঞ্জোনিয়া (স্ট্রেঞ্জোনিয়ামের বহুবচন) থাকতে পারে। প্রোটন ও নিউট্রন দেখতে ঠিক কেমন ও প্রোটন-নিউট্রনের ভেতরের কাহিনী নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি। আজকে চার্ম ও স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্কের কাহিনী বলে কোয়ার্কের জগতের সৌন্দর্য অনুধাবন করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

পাদটীকা

(১) মহাবিশ্বের কণাসমূহের মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা প্রদানকারী একটি তত্ত্বের নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

(২) স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণাসমূহকে ৩টি প্রজন্মে ভাগ করা যায়। এই ৩টি প্রজন্মকে কীসের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে, তা এখনও অমিমাংসিত।

(৩) মেসন ও ব্যারিয়ন কণাগুলোকে তাদের বিভিন্ন ধর্ম যেমন চার্জ, স্ট্র্যাঞ্জনেস, স্পিন ইত্যাদির ভিত্তিতে অষ্টকরূপে বিন্যাস করা যায়। য্যুভ্যাল নিম্যান ও মারি গেল ম্যান কর্তৃক প্রদত্ত এই বিন্যাসকে এইট-ফোল্ড তত্ত্ব বলে।

(৪) কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি করে তাকে হ্যাড্রন বলে। হ্যাড্রন ২ প্রকার। হ্যাড্রনের মাঝে যেখানে একটি কোয়ার্ক ও একটি যেকোনো অ্যান্টিকোয়ার্ক থাকে, তাকে মেসন বলে। অন্যপ্রকার হ্যাড্রনে ৩টি কোয়ার্ক থাকে। একে ব্যারিয়ন বলে।

(৫) আইসোস্পিন একটি এককবিহীন কোয়ান্টাম সংখ্যা। সবল নিউক্লিয় বলের মিথস্ক্রিয়ায় এই কোয়ান্টাম সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে।

(৬) একটি কণার অন্তর্গত মোট কোয়ার্ক সংখ্যা থেকে প্রতিকোয়ার্ক সংখ্যার বিয়োগফলের এক-তৃতীয়াংশকে ব্যারিয়ন সংখ্যা বলে। একটি কোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা +১/৩ এবং অ্যান্টিকোয়ার্কের ব্যারিয়ন সংখ্যা -১/৩

(৭) যেসব কণারা ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন মেনে চলে তথা যাদের স্পিন পূর্ণসংখ্যা নয়, বরং ভগ্নাংশ, তাদের ফার্মিয়ন বলে। সকল কোয়ার্ক ও লেপটন মিলে ফার্মিয়ন শ্রেণি গঠিত।

(৮) একটি কোয়ার্ক কণা ও ঐ কোয়ার্কেরই প্রতিকণা মিলে যে যৌগিক কণা তৈরি হয়, তাই কোয়ার্কোনিয়াম।

তথ্যসূত্র

  1. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Quarks
  2. http://en.wikipedia.org/wiki/Quark
  3. http://en.wikipedia.org/wiki/Charm_quark
  4. http://en.wikipedia.org/wiki/Strange_quark
  5. http://en.wikipedia.org/wiki/Book:Particles_of_the_Standard_Model
  6. http://en.wikipedia.org/wiki/Eightfold_Way_(physics)
  7. http://en.wikipedia.org/wiki/Quarkonium
  8. http://en.wikipedia.org/wiki/Strangeness
  9. http://en.wikipedia.org/wiki/Charmness
  10. http://en.wikipedia.org/wiki/Flavor-changing_neutral_current

বিশাল তথ্য ভান্ডারের গল্প

সুপারম্যান মুভির কথা মনে আছে? যেখানে একটি বিশেষ স্ফটিক দেখানো হয়েছিল। বিশাল পরিমাণ তথ্য সঞ্চয় করতে পারে পাশাপাশি ১০০০ ডিগ্রী পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এমন কিছুই করার চেষ্টা করছিলেন কিছু গবেষক।  পাঁচ-মাত্রার ডিজিটাল ডাটা ডিস্ক তৈরি করেছেন যা ১৩৮ কোটি বছরের জন্য ৩৬০ টেরাবাইট তথ্য সঞ্চয় করতে পারে।

ধারণা করা হয়, মানুষ প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্লু-রে ডিস্কের সমতুল্য পরিমাণ তথ্য তৈরি করছে। এই বিশাল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্ট হবে স্থান সঙ্কট। এই সংকট সমাধানের জন্যই পাঁচ মাত্রার এই বিশেষ ডিস্ক তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা।

কিন্তু এখানে পাঁচটি মাত্রার প্রশ্ন আসছে কেন? প্রথমত, প্রত্যেক ডট স্তরের তিনমাত্রার মধ্যেই রয়েছে। বাকি দুটি মাত্রা এর আকার এবং বিন্যাসের মধ্যে সীমিত। তবে এই তথ্য উদ্ধার করার জন্য একটি অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ এবং একটি পোলারাইজারের প্রয়োজন পড়ে।

গবেষকদলের মতে, যে সকল প্রতিষ্ঠান বিশাল আকারের আর্কাইভ নিয়ে কাজ করেন তারা এই ডিস্কগুলি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।

featured image: rtdo-group.com

কেন্দ্রহীন মহাবিশ্বের কেন্দ্রের গল্প

প্রতিদিন সকালে সূর্য পূর্বদিকে উঠে দিন শেষে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত নামে। তার পেছন পেছন দেখা দেয় রাতের আকাশের অগণিত তারা। রাত যত রাত বাড়ে তারার দল ততই পূর্ব থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ে। একসময় রাতের শেষে সূর্যকে পূর্বদিকে আগমণ জানিয়ে বিদায় নেয়। বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তারা দেখা গেলেও প্রতিবছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

একজন আকাশ পর্যবেক্ষক খুব সহজেই এসব দেখে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, সূর্য সহ সকল তারকারাজি আমাদের কেন্দ্রকরে ঘুরে। বিশেষ করে সময়টা যখন খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দীর। তখন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি যেমন অ্যারিস্টটল, টলেমি প্রমুখ এমন মত-ই পোষণ করেছিলেন। এমনকি টলেমি পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে মহাবিশ্বের একটা ভূকেন্দ্রিক মডেলও তৈরি করেছিলেন।

টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বচিত্র

সেই সময়েই স্রোতের বিপরীতে চলে সর্বপ্রথম গ্রিসের সামোস দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ এরিস্টকাস বলেন সৌরকেন্দ্রিক মডেলের কথা। তিনি গণিতের সাহায্য নিয়ে সূর্য এবং চাঁদের আকৃতি ও দূরুত্ব বের করেন। প্রকৃত মানের সাথে তা না মিললেও তাঁর এই সিদ্বান্ত ঠিক ছিল যে সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড় এবং অনেক দূরে।

তিনি বিশ্বাস করতেন তারকাদের অবস্থান অনেক দূরে বলে সূর্যের মতো তাদের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তনের বদলে স্থির মনে হয়। যাকে বলে লম্বন। সূর্যের আকৃতি বিশাল হওয়ায় এবং আগুনের মতো আলোক বিকিরণ করায় ঐ মডেলের মাঝখানে সূর্য হবে। এখানে ‘ঐ মডেল’ বলতে এরিস্টকাসেরও আগে এমন একজনের মডেল বুঝানো হয়েছে যার ধারণা ছিল পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, তারা সবকিছু একটা আগুনের উৎসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তিনি হলেন ফিলোলাউস।

ফিলোলাউস ছিলেন একজন পিথাগোরিয়ান দার্শনিক যিনি প্লেটোনিজম এবং পিথাগোরিয়নিজমের মাঝে সমন্বয় ঘটান। ফিলোলাউস সেই আগুনের নাম দিয়েছিলেন কেন্দ্রিক আগুন। এটাই ছিল মানুষের তৈরি প্রথম মহাবিশ্বের মডেল যেখানে সবকিছু বৃত্তপথে কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরে।

কিন্তু কেন তিনি আগুনকে কেন্দ্রে রাখতে গেলেন? মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার প্রথম সোপান ছিল আগুন আবিষ্কার। হয়তো তিনি আগুনকে অলৌকিক কিছু ভাবতেন। তবে তিনি যাই ভাবতেন না কেন এরিস্টকাসের মাথায় সৌরকেন্দ্রিক মডেলের অবতারণা করার জন্য তার ভাবনা অনেক সাহায্য করেছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে টলেমিরে ভূকেন্দ্রিক মতবাদ এতোটাই গ্রহণযোগ্য ছিল যে তা তারকাসমূহের ভবিষ্যত অবস্থানও বলে দিতে পারতো। ফলশ্রুতিতে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ অগ্রাহ্য এবং অবহেলিতভাবে পড়ে থাকে। এর দীর্ঘকাল পর ১৬শ শতকে সৌরকেন্দ্রিক জগতের একটি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করেন ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং ক্যাথলিক ধর্মবেত্তা পোল্যান্ডের নিকোলাস কোপের্নিকাস।

কোপার্নিকাস একটা জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত টেবিল তৈরি করেন যার দ্বারা তারাদের অতীত এবং ভবিষ্যত অবস্থান বলে দেয়া যেতো। কিন্তু গ্রহদের একটু ব্যতিক্রমি গতি থাকায় এদের অবস্থান একমাত্র টলেমির মডেল অনুসারেই অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল।

চিত্রঃ কোপানিকার্সের মডেল, যেখান সর্বপ্রথম প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথ চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কোপার্নিকাসের পর আরো একজন জ্যোতির্বিদের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি টাইকো ব্রাহে। তিনি কোপার্নিকাসের টেবিলের ভুলটি ধরতে পেরেছিলেন অরো গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোপার্নিকাস গ্রহগুলোর গতিপথ বৃত্তাকার ভেবেছিলেন। টাইকো ব্রাহে দেখলেন গতিপথ বৃত্তাকার হলে এদের লম্বন অনুপস্থিত। তাই তিনি ভুলটা একটু শুধরে গ্রহদের সূর্যকেন্দ্রিক রাখলেও সেই সূর্যকে পৃথিবী কেন্দ্রিকই রেখে দিলেন।

বিজ্ঞানের বিবর্তন আসলে একজনের ভুল আরেকজন শুধরে সামনে এগোয়। পরবর্তীতে জোহানেস কেপলার টাইকো ব্রাহের নির্ভূল পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে তাঁর তিনটা সূত্র প্রদান করেন। যেখানে পৃথিবী সহ গ্রহগুলোর উপাবৃত্তার গতিপথের কথা বলেছিলেন। ফলে তিনি সৌরকেন্দ্রিক মডেলকে ভূকেন্দ্রিক মডেলের সমকক্ষ করতে সক্ষম হন। বাকি ছিল শুধু হাতে নাতে অর্থাৎ পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ।

সময়টা ১৬১০ সাল। নিজের বানানো টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের অদ্ভূৎ সৌন্দর্য্যকে সর্বপ্রথম উপভোগ এবং পর্যবেক্ষণ করছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। তিনি দেখলেন বৃহস্পতির চারপাশে কিছু তুলনামূলক ছোট বস্তু নির্দিষ্ট সময় পরপর লুকিয়ে যাচ্ছে। আরো কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর তার আর বুঝার বাকি রইলো না যে ঐ বস্তুগুলো বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এগুলোকে আমরা বৃহস্পতির উপগ্রহ হিসেবে চিনি। যা টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলকে একদম বাতিল করে ছাড়লো। টিকে রইল সৌরকেন্দ্রিক মডেল।

টেলেস্কোপের উন্নতির ফলে ১৭৮৫ সালে উইলিয়াম হার্শেল আকাশগঙ্গা ছায়াপথ আবিষ্কার করেন। এমনিতে খালি চোখে আলো দূষণহীন অকাশে উজ্জ্বল মেঘের মতো উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত আকাশগঙ্গার একটা বিশাল অংশ চোখে পড়ে।

হার্শেল তাঁর টেলিস্কোপ সে দিকে তাক করে বার বার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এটি অনেক অনেক তারা সমষ্টি, যার কেন্দ্র অনেক বেশি উজ্জল। যখন এন্ড্রোমিডা ছায়াপথ আবিষ্কৃত হয় তখন বুঝা গেল আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথটিও এমনই একটি ছায়াপথ। এরপর থেকে এত এত ছায়াপথ আমরা দেখেছি যে ‘অগণিত’ শব্দ দিয়ে একে সম্বোধন করতে হয়। ফলশ্রুতিতে বহু বছর ধরে সৌরজগতের ভেতর আটকে থাকা মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ভাটা পড়ে।

চিত্রঃ হার্শেল তার পর্যবক্ষেণ দ্বারা আকাশগঙ্গাকে প্রথমে যেমন ভেবেছিলেন।

১৯২৬ সালে এডুইন হাবল তাঁর সবচেয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপে যখন অগণিত ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তখন এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন। দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হবার হার সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে ছায়াপথ যত দূরে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ছায়াপথগুলোর বেগ দূরত্বের সমাণুপাতিক।

হাবলের পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ইতি টেনে দেয় এই সিদ্বান্ত দিয়ে যে আমরা এক প্রসারণশীল মহাবিশ্বে বাস করছি। যার ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। কেন্দ্র খোঁজা বাদ দিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের অতীতকে জানতে।

সূর্য থেকে আলোক রশ্মি আমাদের নিকট আসতে ৮ মিনিট সময় নেয়। সূর্যের নিকটবর্তী তারকা প্রক্সিমা সেন্টৌরি থেকে আলো আসতে ৪ বছর সময় নেয়। আমরা যত দূরে তাকাতে পারব তত দূরের অতীত আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হবে।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন যানবাহনকে দূর থেকে হর্ণ বাজাতে বাজাতে পাশ দিয়ে সামনে চলে যেতে দেখি। এক্ষেত্রে একটা জিনিস যদি খেয়াল করি তবে বুঝতে পারবো, গাড়িটি দূরে থাকা অবস্থায় হর্ণের শব্দটা একটু ক্ষীণ থাকে এবং যত নিকটবর্তী হয় শব্দ তত তীক্ষ্ণ হয়। এমনটা হবার কারণ আসলে গাড়ির গতির ফলে গাড়ি থেকে বেরুনো শব্দ তরঙ্গের পরিবর্তন। গাড়ি যত কাছে অগ্রসর হয়েছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ক্ষুদ্র হয়েছে। একে বলে ডপলার ইফেক্ট।

আলোর ক্ষেত্রে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় থেকে ছোট হওয়া মানে রং লাল থেকে নীল হওয়া, যার নাম ব্লু শিফট্। এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট থেকে বড় হওয়া মানে রং নীল থেকে লালে পরিণত হওয়া, যাকে বলে রেড শিফট্।

আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গেলে ডপলার ইফেক্ট গবেষণার প্রাণ হিসেবে কাজ করে। দূরবর্তী তারকা থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন দেখে বলে দেয়া যায় সেটি কত দূরে অবস্থিত। যত দূরের বস্তু হবে তত তার রেড শিফট্ হবে। যদি সবচেয়ে অতীত অর্থাৎ সময়ের শুরুটা দেখতে চাই তাহলে ঠিক কতটা দূরে তাকাতে হবে?

সত্তরের দশকে অতীততম সময়ের সেই আলোকটিই খুঁজে বের করেন দুই জ্যোতির্বিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন। এ আলোক ছিল আমাদের থেকে সবচেয়ে দূরের এবং সবচেয়ে অতীতের একদম মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী মুহুর্তের। সবচেয়ে দূরের হওয়ায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বড়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় বলে বর্ণালীতে এর অবস্থান অণুতরঙ্গ (microwave) পরিসরে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ’। দূরত্ব নির্ধারণ করলে দাড়ায় ৪৬ বিলিয়ন আলকবর্ষ। সময় ১৩.৭ বিলিয়ন হলেও দূরত্ব ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণ একটু পরেই বলছি। একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়া খুব স্বাভাবিক, এ আলোকই যে মহাবিস্ফোরণের সময়কার তার প্রমাণ কী?

চিত্রঃ মহা বিস্ফোরণের ঠিক পরের মহাবিশ্বের আদিম চেহারা।

যেহেতু এখন আমরা মহাবিশ্বকে প্রসারিত হতে দেখছি তাহলে নিশ্চয়ই আগে সবকিছু সংকুচিত অবস্থায় ছিল। যে সংকুচিত অবস্থার নাম অনন্যতা বা অদ্বৈত বিন্দু (Singularity)। শব্দখানা শুনে মনে হতে পারে হয়ত একটা একক বিন্দুর কথা বলা হচ্ছে যেখানে সবকিছু পুঞ্জীভূত ছিল। কিন্তু আসলে এটা কোনো একক বিন্দু নয়। স্থান-কালকে অসীম ধরা হয়। এখন যদি অসীম বিস্তৃত স্থান-কাল কে সংকুচিত করা হয় তাহলে কি কখনও সংকোচন শেষ হবে? হবে না।

আমরা বরং অসীম স্থান-কালের অসীম সংখ্যাক বিন্দুর কথা ভাবতে পারি। এখন অসীম বিন্দুর একটিকে আবার চিহ্নিত করতে গেলে বাধে বিপত্তি। কারণ তখন তাকে প্রকাশ করতে হবে ১/অসীম দিয়ে, যেখানে ১/অসীম মানে গণিতের ভাষায় শূন্য। অর্থাৎ এখানে এসে আমাদের সব সূত্র অকেজো হয়ে পড়ে। তবে যদি একটা একক বিন্দুর ক্ষেত্রে চিন্তা করি তবে ভাবা যায় ঐ বিন্দুর চারপাশের সবকিছু ঐ বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ সেখান থেকে প্রসারণ শুরু হয়। মহা বিস্ফোরণ।

অসীম সংখ্যাক বিন্দু থেকে অসীম সংখ্যাক প্রসারণ হয়েছে। যা ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পাড়ি দিয়ে আজকের জানা বিশাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তাই মহাবিস্ফোরণকে বিস্ফোরণ না বলে ‘সর্বত্র প্রসারণ’ বলা চলে।

মহাবিস্ফোরণের পর প্লাজমা অবস্থায় যে ফোটনগুলো ছিল স্থান-কালের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি আপনি যেখানে আছেন সেখানেও আছে। তাই যে দিকেই এন্টেনা তাক করি না কেন আমরা একে ধরতে পারব। চাইলে আপনিও পারবেন। এখনই টিভি বা রেডিও অন করে রিমোটটা হাতে নিন এবং একটা অব্যবহৃত চ্যানেলে যান, নিশ্চয়ই ঝির ঝির করা শো শো শব্দর ছবি দেখছেন। এটাই সেই মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ। আবিষ্কারের আগে একে যান্ত্রিক গোলযোগ ধরে নিয়ে সংকেত আদান প্রদান করা হতো।

আমাদের পক্ষে কি ১৩.৭ বিলিয়ন অলোকবর্ষের চেয়ে দূরের কোনো বস্তুকে দেখা সম্ভব হবে না? এক্ষেত্রে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে পারি। আমাদের অবস্থান থেকে যে বস্তুগুলো যত দূরে তাদের প্রসারণ বেগ তত বেশি। ১৩.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের বস্তুগুলোর প্রসারণ বেগ আলোর থেকেও বেশি। তাই তাদের থেকে নিঃসৃত আলো আরো বেশি বেগে দূরে চলে যায়।

আমরাও যেহেতু প্রসারিত হচ্ছি এক পর্যায় সে আলোককে আমাদের ধরে দেখা সম্ভব। এভাবে আরো ৩২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দেখা সম্ভব। তাহলে সব মিলিয়ে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত আমাদের দেখা সম্ভব। এই হলো আমাদের পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্বের সীমানা।

চিত্রঃ পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্ব।

আমি যদি পৃথিবী থেকে বেরিয়ে মহাবিশ্বের অন্য কোনো স্থানে যেতাম তবে সে অবস্থানের চারদিকে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত হত আমার দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। তবে আমি যদি যেতে যেতে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চলে যাই তখন আর পৃথিবীতেই ফিরে আসতে পারব না। বস্তুগুলোর মতো স্থানকালের প্রসারণের ফলে আমরাও পৃথিবীর সাপেক্ষে আলোর চেয়ে বেশি বেগে দূরে চলে যেতে থাকব।

অণুসন্ধিৎসু মানব মন সবকিছুর পরও একটা কেন্দ্র ঠিক করে যদি সুস্থির থাকতে চায় তবে এই বলে উপসংহার টানা যায় যে, প্রকৃত অর্থে মহাবিশ্ব অসীম। তাই এর কোনো কেন্দ্র নেই। তবে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কেন্দ্র আছে। সে কেন্দ্র আমরা নিজেরাই!

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Geocentric_model
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Heliocentrism
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_the_center_of_the_Universe
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Cosmic_microwave_background
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Big_Bang

featured image: thephysicsmill.com

কান্না নিয়ে যত কথা

জীবন শুরু হয় কান্না দিয়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সমস্ত উপলক্ষে জড়িয়ে আছে কান্না। কখনো কাঁদি বিষাদে, কখনো বা আনন্দে, কখনো বা কারণ ছাড়াই। কান্না নিয়ে কত গল্পগাথা, কত কবিতা, কত গান। কখনো কি ভেবে দেখেছি আমরা কীভাবে কাঁদি? কেন কাঁদি? পেঁয়াজ কান্নার সাথে আনন্দে কান্না বা বিষাদে কান্নার পার্থক্য কিসে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা নিয়েই আজকের লেখাটি।

কান্না হচ্ছে আবেগের প্রতি সাড়া দিয়ে চোখের মাধ্যমে জল পড়া। চোখের উপরের পাতায় অশ্রুগ্রন্থির অবস্থান। এখানেই অশ্রুর উৎপত্তি হয়। চোখের উপরের অংশের কর্নিয়া এবং শ্বেত-তন্তুতে অনেকগুলো ছোট ছোট অশ্রুনালী (tear ducts) থাকে। এই নালী পথে অশ্রু পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। অশ্রু এই প্রক্রিয়ায় চোখকে আর্দ্র রাখে।

অশ্রুনালী ছড়িয়ে থাকে নাসাগহ্বরেও। যখন কোনো শক্তিশালী আবেগ আমাদের নাড়া দেয় অর্থাৎ আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে তখন চোখ দিয়ে তো অঝোরে জল ঝরেই, নাক দিয়েও ঝরে। একেই বলে ‘নাকের জলে চোখের জলে এক হওয়া’।

ভালো কাঁদতে পারা বা না পারা মনোশারীরিক কোনো মেধার স্বাক্ষর বহন করে কিনা, কিংবা সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভেদে কান্নার ধরণ আলাদা কিনা মনোবিজ্ঞীরা এইসব প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণা আমাদের সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কান্নাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।

নারীরা অবশ্যই পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন। জার্মান সোসাইটি অব অপথ্যালমোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে বছরে নারীরা গড়ে ৩০ থেকে ৬৪ বার আর পুরুষেরা গড়ে ৬ থেকে ১৭ বার কাঁদেন। শব্দ করে কান্নার ক্ষেত্রে নারীদের হার ৬৫%। পুরুষরা এদিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে! মাত্র ৬% পুরুষ শব্দ করে কাঁদেন।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন হয়?

শারীরতাত্ত্বিক দিক থেকে বলতে গেলে পুরুষের শরীরে থাকা টেস্টোস্টেরণ হরমোনই কান্নাকে দমিয়ে রাখে। অন্যদিকে, নারীদের শরীরে থাকে প্রোল্যাক্টিন। প্রোলাক্টিনের উপস্থিতির কারণেই নারীর কান্নার প্রবণতা বেশি। কিন্তু এই দুটি হরমোনের উপস্থিতিই যে আপনার কান্না বা কান্নাহীনতার জন্য সর্বাংশে দায়ী তা কিন্তু নয়। কান্না মূলত তিন প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকার কান্নার ধরণ ও কান্নায় জড়িত রাসায়নিক পদার্থগুলো আলাদা।

কান্নার প্রকারভেদ

চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ, ব্যাকটেরিয়ানাশক এক প্রকার তরল পদার্থ নির্গত হয়। চোখ মিটমিট করলে এই তরল পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। এই ধরনের কান্নাকে বলে বেসাল কান্না (basal tears)। এর ফলে আমাদের চোখ সবসময় আর্দ্র এবং সুরক্ষিত থাকে।

পেঁয়াজ কাটার সময়ের কান্না। এই কান্নাকে বলে রিফ্লেক্স কান্না (reflex tears)। রিফ্লেক্স কান্না চোখকে ক্ষতিকর পদার্থ যেমন বাতাস, ধোঁয়া এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ থেকে রক্ষা করে। এর ফলে চোখে হঠাৎ করে পড়া ময়লা, পোকামাকড় চোখ থেকে বেরিয়ে যায়।

তৃতীয় প্রকার কান্না হচ্ছে প্রাকৃতিক কান্না (physic tears)। এটা হলো আবেগজনিত কান্না। এই ধরনের কান্নার ফলে চোখ থেকে ঝর ঝর বাদল ধারার মতো অশ্রুধারা নামতে থাকে! মানসিক চাপ, হতাশা, বিষন্নতা থেকে এই কান্নার সৃষ্টি। এমনকি অনেক সময় অতিরিক্ত হাসলেও আমাদের চোখ থেকে পানি পড়ে। এটাও আবেগজনিত কান্না।

বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, আনন্দের ফলে চোখ থেকে অশ্রু ঝরা শরীরের আবেগীয় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এক পরীক্ষায় দেখেন, যারা ইতিবাচক সংবাদে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান তারা দ্রুত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

আচ্ছা, এসব নানা প্রকার চোখের জল কি একই রকম দেখতে? উত্তর হচ্ছে- না। ফটোগ্রাফার রোজলিন ফিশার তার নতুন প্রজেক্ট ‘টপোগ্রাফি অব টিয়ারস’ নিয়ে কাজ করার সময় চোখের জলের ব্যাপারে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন। তার নিজের চোখের জলকে একটি স্লাইডে রেখে শুকিয়ে ফেলেন। তারপর আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণের পর তার অনুভুতি প্রকাশ করেছেন- “এটা সত্যিই মজার ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্লেন থেকে দেখা নিচের কোনো দৃশ্য।”

ফিশার বিভিন্নরকম অশ্রু একই রকম দেখতে কিনা তা জানার জন্য কয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফি প্রজেক্টটি করেন। নিজের এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে একশয়েরও বেশি চোখের জলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এগুলো পরীক্ষা করেন এবং ছবি তোলেন। এর মধ্যে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর অশ্রুও ছিল। তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখের জলের যে গঠন দেখেন সাধারণভাবে তা ছিল স্ফটিকাকার লবণ।

কিন্তু, বিভিন্ন আবেগীয় অবস্থায় ঝরা জলের আণুবীক্ষনিক পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় এদের আকার এবং গঠন ভিন্ন। একই রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত দুটি প্রাকৃতিক কান্নার ছবি ছিল ভিন্ন। মানে আপনি আনন্দে কাঁদলেন আর আপনার বন্ধু দুঃখ পেয়ে কাঁদলেন, এই দূরকম চোখের জল দেখতে আলাদা হবে। এদের সান্দ্রতা, গঠন, বাষ্পীভবনের হার সহ আরো অনেক কিছুতেই পার্থক্য থাকবে।

চিত্রঃ বিভিন্ন সময়ের কান্নার আণুবীক্ষণিক গঠন।

ফিশারের গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় বিভিন্ন দৃষ্টকোণ থেকে দেখা চোখের শুকনো জলের স্লাইড আকাশ থেকে দেখা বিশাল কোনো দৃশ্যের মতো। তাই তিনি একে বলেন, ‘মনোভূখন্ডের অন্তরীক্ষ দৃশ্য’।

কান্নার সাথে জড়িত হরমোন

প্রোল্যাক্টিন এবং টেস্টোস্টেরণ ছাড়াও কান্নায় আরো কিছু হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। সেরকম একটি হরমোন হচ্ছে সেরেটোনিন। গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চা জন্মদানের পরে শরীরে ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। ট্রিপটোফ্যান সেরেটোনিনের ক্ষরণ ত্বরান্বিত করে। ট্রিপটোফ্যান কমে গেলে আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং কান্নার প্রবণতা বাড়ে। প্রেমে পড়লেও ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। এজন্যই দেখা যায় প্রেমাক্রান্ত নারী বেশি কাঁদে।

কান্না কি উপকারী?

হ্যাঁ, উপকারী। চলুন দেখি কান্না আমাদের কী কী উপকার করে। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ATCH (Adrenocorticotropic hormone) ক্ষরিত হয়। এর প্রভাবে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল উৎপন্ন হয়। কর্টিসল রক্তচাপ বাড়ায়। রক্তে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে তোলে। আরো বিভিন্ন শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন আমাদেরকে কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপ কমানোর মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে কান্না।

কান্নাকাটির পর শান্ত অনুভব করার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই আছে। এর কারণ হলো, কাঁদলে অতিরিক্ত ATCH বের হয়ে যায় এবং কর্টিসোলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে চাপ কমে যায়। আমাদের শরীরে থাকা চাপ নিবারক আরেকটি উপাদান হচ্ছে লিউসিন এনকেফালিন (leucine enkephalin)। আবেগজনিত অশ্রুর সাথে এটি নিঃসৃত হয়। এটি ব্যথা কমায় এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়। পেইনকিলার হিসেবে আমরা যে ওষুধগুলো খাই লিউ এনকেফালিন অনেকটা সেরকম কাজ করে।

বিভিন্ন বয়সে কান্না

প্রথমেই তাকাই শৈশবে। নতুন জন্মানো শিশুর কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। পানি পড়ে আরেকটু বড় হলে। কান্না আসলে শিশুদের যোগাযোগের মাধ্যম। ক্ষুধা লাগলে বা ঘুম পেলে কিংবা ব্যথা পেলে তারা কাঁদে। শিশু আরেকটু বড় হলে ধরা যাক ১০ মাস বয়সে কাঁদে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। দক্ষ অভিনেতার মতো এ কান্নাকে বলে মায়াকান্না (crocodile tears)।

বয়সন্ধীকালে টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণ ক্ষরিত হয়। এসময় মেয়েরা বেশি কাঁদে। ছেলেরা লক্ষ্যণীয়ভাবে কম কাঁদে। মেয়েদের বেশি কাঁদার আরেকটা কারণ তাদের অশ্রুনালী ছেলেদের তুলনায় কম দীর্ঘ। এজন্য দ্রুত চোখে পানি আসে। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার সাথে সাথে কান্নার ধরণ বদলাতে থাকে। কারণ টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণের মাত্রায় পরিবর্তন আসে তখন। পুরুষেরা বেশি কাঁদতে থাকে, নারীরা কম।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কান্না

সংস্কৃতি ভেদে কান্না ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন পশ্চিমা সমাজে কান্নাকে ইতিবাচকভাবে নেয়া হলেও এশীয় সমাজে বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকা এবং ইতালির লোকজন চীন এবং ঘানার লোকজনের চেয়ে বেশি কাঁদে।

পার্থক্য আছে শেষকৃত্যে কান্নার ধরণেও। যেমন ফিজিতে আপনি মরদেহ দাফন করার আগে পর্যন্ত কাঁদতে পারবেন না। ইরানে আবার জোরে জোরে কাঁদলে সমস্যা নাই। ধর্মভেদেও কান্না আলাদা হয়। যেমন ইসলামে কান্নাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আবার বুদ্ধধর্মে কান্না অনুমোদিত নয়।

কতটুকু কান্না স্বাভাবিক?

শিশুদের জন্য প্রতিদিন তিন ঘন্টা কাঁদা স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি কাঁদলে বুঝতে হবে তাদের চিকিৎসা দরকার। ঠান্ডা লাগা বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্কদের কান্নার ক্ষেত্রে কোনো সময় আসলে নাই। কান্নার পরিমাণ অনেকাংশেই প্রভাবিত হয় মানুষের পরিবেশ দ্বারা।

আপনি কতটুকু কাঁদছেন তা বলে দেয় আপনি মানসিকভাবে কতটুকু সুস্থ। অতিরিক্ত কান্নাকাটি ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। আবার একেবারে না কাঁদা বা কম কাঁদাটাও তীব্র ডিপ্রেসনের উপসর্গ হতে পারে। এই ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন, নেদারল্যান্ডসের গবেষকরা বেশি কান্না বা কম কান্না ডিপ্রেসনের লক্ষণ এই দাবীর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাননি।

কান্না যখন আবেগ ছাড়াও বেশি কিছু

আপনাকে কেউ অশ্রুসজল চোখে দেখার মানে এই নয় যে আপনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন! শরীরের অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। অশ্রুনালী বন্ধ হয়ে গেলেও আপনার চোখ প্লাবিত হতে পারে। বার্ধক্য, আঘাত, সংক্রমণ, প্রদাহের কারণে এমন হতে পারে। এই ধরনের কান্নার প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে বলে প্যাথলজিক্যাল কান্না। আবার কিছু কিছু রোগ যেমন, স্ট্রোক, আলঝেইমার, মাল্টিপল সেরোসিস ইত্যাদির কারণেও চোখ থেকে পানি পড়তে পারে।

গবেষকরা বলেন, এরকম অতিরিক্ত কান্নাকাটি বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা ছাড়াও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সেরেটোনিনের পরিমাণ কমে যাওয়ার উপর দোষ চাপানো যেতে পারে। সর্বোপরি, কান্না যতক্ষণ না প্যাথলজিক্যাল হচ্ছে এর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

সবশেষে বলা যায়, মানুষ একমাত্র প্রাণী যে আবেগে কাঁদতে পারে। কান্না শুধু মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্যেই নয়, এর আছে মানিসকভাবে মানুষকে সুস্থ রাখার বিশাল শক্তি। মন খুলে কাঁদা আমাদের সুস্থ এবং চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করে। কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, এটা একটা শক্তি। তাই, কান্না পেলে মন খুলে কাঁদুন। সুস্থ থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. wikipedia.org/wiki/crying

২. www.apa.org/monitor/2014/02/cry.apx

৩. http://www.telegraph.co.uk/news/science/science-news/11227082/Why-do-we-cry-tears-of-joy.html

৪. Microscopic view of dried human tears, joseph stromberg, smithsonian magazine

featured image: istockphoto.com

ডিএনএ’র গল্প

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না।

মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি।

সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি, তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়।

মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ মিশার

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন।

প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়।

তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন।

বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে।

তিনি আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

ওয়াটসন ও ক্রিক

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

Rosalind Franklin কর্তৃক গৃহীত ডিএনএ’র ঐতিহাসিক এক্স রে চিত্র।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

শরীর বাঁকানো রোগ ধনুষ্টঙ্কারের গল্প

ছোটবেলায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে কতো লোহা-পেরেকের গুঁতো খেয়েছি। মায়ের কাছ থেকে শুনতে হতো- ‘লোহার গুঁতো খেলে কিন্তু টিটেনাস ইনজেকশন দিতে হবে’। এর অভিজ্ঞতাও আছে, লোহার গুঁতো খেয়ে আমাকে ইনজেকশনের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তখন মনে করতাম, ধনুষ্টঙ্কার হলে ঘাড় মটকিয়ে যায়। তাই ছোটবেলায় পেরেককে ভয় পেতাম খুব। আজ এতদিন পর আমি সেই ধনুষ্টঙ্কারের জন্য দায়ী অণুজীব নিয়েই আলোচনা করতে বসেছি।

ধনুষ্টঙ্কার সৃষ্টির জন্য দায়ী মূল অণুজীব হলো Clostridium tetani. কিতাসাতো নামের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম মানবদেহ থেকে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি আলাদা করেন। এরা কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে তা জানার আগে এদের সাথে একটু পরিচিত হওয়া দরকার। এদের প্রথম পরিচয় এরা গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া। দেখতে রডের মতো এবং অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এরা বাঁচতে পারে না। এজন্য এদেরকে অবাত শ্বসনকারী বলা হয়। এমনিতে অধিক তাপ সহ্য করতে পারে না, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে স্পোর সৃষ্টি করে।

মাটিতে, মানুষ ও পশুর মলে এদের বিচরণ। তবে এরা এমনিতেই মানবদেহে সংক্রমিত হয় না। শরীরে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হলে সেই ক্ষতে যদি এরা প্রবেশ করে তবে ধনুষ্টঙ্কার হয়। এরা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে তবে গড়ে ৮ দিনের মতো সময় লাগে। নবজাতকের ক্ষেত্রে সময় লাগে গড়ে ৭ দিনের মতো।

একটি অণুজীব শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ সৃষ্টি করবে, এমন কিন্তু না। প্রত্যেক অণুজীবের নিজস্ব উপাদান থাকে যার মাধ্যমে সে রোগ সৃষ্টি করে। ইংরেজিতে যাকে বলে virulence factor. C.tetani’র ক্ষেত্রে সেই উপাদানটি হলো একটি টক্সিন, টিটানোস্পাসমিন (Tetanospasmin).

আমাদের শরীরের পেশী সংকোচন করে এসিটাইলকোলিন। ইনহিবিটোরি নিউরো-ট্রান্সমিটার এসিটাইলকোলিনকে শরীরে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে পেশী স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। কিন্তু টিটানোস্পাসমিন ইনহিবিটোরি নিউরোট্রান্সমিটারকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে শরীরে অস্বাভাবিক পেশী সংকোচন দেখা দেয়।

image source: medicalnewstoday.com

প্রথম দিকের এ রোগের উপসর্গ, মুখের চোয়াল লেগে যাওয়া। যাকে ‘লক জ’ (Lock jaw) বলে। অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো খিঁচুনি, খাবার গিলতে সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ঘাম, জ্বর ইত্যাদি। পেশীর অত্যধিক সংকোচনের ফলে স্পাইনাল কর্ড কিংবা শরীরের হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। শ্বাস প্রক্রিয়াও ব্যহত হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

ধনুষ্টঙ্কার চার ধরনের হতে পারে। একটি হলো সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার। আমরা ধনুষ্টঙ্কার বলতে মূলত একেই বুঝি। এটা আক্রান্ত স্থান থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রথম উপসর্গ হলো ‘লক জ’ বা চোয়াল লেগে জাওয়া। ধীরে ধীরে বাকি উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক মাস সময় লাগে।

দ্বিতীয় প্রকার ধনুষ্টঙ্কার হলো লোকালাইজড (Localized) ধনুষ্টঙ্কার। এর মানে হলো আক্রান্ত স্থানেই এই ধনুষ্টঙ্কার সীমাবদ্ধ থাকে। এই ধনুষ্টঙ্কার খুবই কম হয়। এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

তিন নম্বর ধনুষ্টঙ্কারটি হলো সেফালিক (Cephalic) ধনুষ্টঙ্কার। এটাও এক ধরনের লোকালাইজড ধনুষ্টঙ্কার। এটা আমাদের ক্রেনিয়াল নার্ভকে আক্রান্ত করে। ফলে মুখের পেশী আক্রান্ত হয়।

চিত্রঃ স্টেইনিংয়ের পর C.tetani কে টেনিস রেকেটের মতো দেখায়

সর্বশেষ ধনুষ্টঙ্কারটি হলো নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার। জন্মের পর নাড়ি কাটার সময় যদি জীবাণুযুক্ত কাচি ব্যবহার করা হয় তখন এ রোগের সংক্রমণ হয়। কিছু কিছু সংস্কৃতিতে নাড়ি কাটার পর তাতে গরুর গোবর দেয়া হয়। কি সাঙ্ঘাতিক! এ যেন দাওয়াত দিয়ে ধনুষ্টঙ্কার ডেকে নিয়ে আসা! যদিও এই রোগ ধীরে ধীরে কমছে তবুও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও এই রোগের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় করা যায় না। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় মূলত রোগের উপসর্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়। কারণ C.tetani চিহ্নিত করার সমস্যা। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৩০% C.tetani শনাক্ত করা যায়। এমনকি সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও C.tetani চিহ্নিত হতে পারে। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয়ের আরেকটি উপায় হলো স্পাটুলা টেস্ট।

ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধের জন্যে Tetanus toxoid টীকা নেয়া হয়। CDC এর মতে প্রতি দশ বছর পর পর ধনুষ্টঙ্কারের টীকা নেয়া উচিৎ। ধনুষ্টংকার চিকিৎসার জন্যে metronidazole, diazepam ব্যবহার করা হয়। শুরুতে পেরেক আর ধনুষ্টংকার নিয়ে যে কথা বলেছিলাম সেক্ষেত্রে বলে রাখি পেরেক বা লোহা বিঁধলেই যে ধনুষ্টংকার হবে এমন কোন কথা নেই। ধনুষ্টংকার হতে হলে সেই পেরেকে C.tetani থাকতে হবে।

featured image: oshatrainingu.com

অতিকায় ভাইরাসের গল্প

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও তামাক একটি অর্থকরী ফসল। এই ফসল যদি এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয় যার ফলে কৃষকেরা চাষ করাই ছেড়ে দিচ্ছেন,তাহলে তামাক উৎপাদনকারী একটি দেশের জন্য চিন্তার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক।

১৮৭৯ সালে নেদারল্যান্ডের এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের ডিরেক্টর এডলফ মেয়ারের নজরে আনা হয় এমন এক অদ্ভুত রোগ ‘টোবাকো মোজাইক ডিজিজ’। তিনি বহুদিন এটা নিয়ে কাজ করলেন,কিন্তু কীসের জন্য যে এই রোগটা হচ্ছে সেটা ঠিক বের করতে পারলেন না। তিনি বললেন যে,আক্রান্ত গাছের রস ফিল্টার পেপারের মাধ্যমে পরিশোধিত করা হলে প্রাথমিকভাবে সংক্রামক থাকলেও বেশ কয়েকবার ফিল্টার করার পর করার রসটাতে আর সংক্রমক থাকছে না। সুতরাং কোনো অজানা ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হচ্ছে।

১৮৯২ সালের দিকে রাশিয়ান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দিমিত্রি আইভানভস্কি একই রোগে আক্রান্ত গাছের রস সেই একই পদ্ধতিতে পরিশোধিত করেন,শুধু মাধ্যমটা ভিন্ন। তিনি ব্যবহার করেন প্রলেপবিহীন পোরসেলিন ফিল্টার যার পোর সাইজ ০ ১ থেকে ১ মাইক্রন। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না,ঠিকই সেই রসে সংক্রামক রয়ে গেল। তিনি বললেন,এটা ব্যাকটেরিয়া নয়। বরং তার চেয়েও অনেক ছোট কিছু এই রোগের জন্য দায়ী। পরবর্তীতে যা ভাইরাস হিসেবে শনাক্ত হয়। হ্যাঁ,এবং সেই ভাইরাসের নাম ‘টোবাকো মোজাইক ভাইরাস’।

ভাইরাস তো আবিষ্কার হলো,সেই সাথে একে খুঁজে পেতে যে কাঠ-খড়টা পুরলো। সে কারণে সবাই ধরেই নিলো ভাইরাসের আকৃতি হবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এই প্রচলিত ধারণের কারণেই হয়তো অনেকদিন অন্য আরেকটি জগৎ আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য ছিল।

আইভানভস্কির এক্সপেরিমেন্টের একশ বছর পর ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ডের একটি হাসপাতালে নিউমোনিয়া প্রাদুর্ভাব দেখা দিলো। এর উৎস খুঁজতে খুঁজতেই কাছের পানির টাওয়ার থেকে পাওয়া একটি অ্যামিবার ভেতরে দেখা গেল নতুন একটি গ্রাম পজিটিভের অস্তিত্ব। তাৎক্ষণিকভাবে একে কোনো বর্গীভূত না করা হলেও পরবর্তীতে ব্র্যাডফোর্ডকক্কাস ব্যাকটেরিয়া নাম দিয়ে ফ্রীজে ঢুকিয়ে ভুলে যাওয়া হয়।

১৯৯৮ সালে বার্নার্ড লা স্কোলা নামক এক ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের মধ্যে দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত বিষয়। এর মধ্যে কোনো রাইবোজোম নেই!

রাইবোজোম হচ্ছে কোনো কোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই ঘটনা ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের চরিত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক ঘটালে আরেক দল বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এরা অন্য সকল ব্যাকটেরিয়ার মতো বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধিও করে না। এর মাধ্যমে এই নকুলে ভাইরাস সম্পর্কে সব রহস্যের অবসান নয়,বরং সূচনা হলো। যাকে এখন আমরা ‘মিমি ভাইরাস’ বলে চিনি। যেহেতু এরা গ্রাম স্টেইনিং পরীক্ষায় গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়াকে অনুকরণ (Mimic) করে সেজন্যই এই নাম।

অণুজীব নিয়ে যদি আপনার পড়াশোনা এবং আগ্রহ দুটোই থেকে থাকে আর এমন যদি হয় যে মিমি ভাইরাস সম্পর্কে আজই প্রথম শুনছেন তাহলে ‘গ্রাম পজিটিভ ভাইরাস’ শুনেই আপনার মুখ হা হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তা-ই হয়ে,তাহলে আপনাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়ার মতো দুটো তথ্য দিয়ে আমোদিত করতে চাই। মিমি ভাইরাস দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০০ ন্যানোমিটার,এবং জিনের সংখ্যা ১০১৮টি। যেখানে তারই বন্ধু এইচআইভি’র জিন মাত্র ৯টি!

চিত্রঃ বিভিন্ন অতিকায় ভাইরাসের সাথে এইচআইভি এবং ব্যাকটেরিয়ার তুলনা।

ফ্রান্সের এক্সিস-মার্সিয়েলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মিমি ভাইরাস শনাক্ত করার পর এরকম বড় বড় ভাইরাস খুঁজতে শুরু করেন। দিদিয়ার রাউল্ট নামের একজন গবেষক খুঁজতে থাকেন সবচেয়ে সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে, অর্থাৎ অন্যান্য পানির টাওয়ার ইত্যাদি। এবং তিনি প্যারিসে যেন স্বর্ণের খনি পেয়ে বসলেন। তিনি যে ভাইরাসটি পেয়েছিলেন তার নাম দেয়া হয় ‘মামা ভাইরাস’। তবে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার,তার ভেতরে যেটা পাওয়া গেলো, একটি ‘স্পুটনিক ভাইরোফাজ’।

প্রথমবারের মতো দেখা গেলো একটি ভাইরাস অন্য আরেকটি ভাইরাসকে আক্রান্ত করছে। এই ঘটনা ভাইরাস কি জীবিত না মৃত সেই পুরনো বিতর্ক আবারো উস্কে দিলো। কারণ এখানে মামা ভাইরাস অন্য ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছে।

২০১০ সালে রাউল্ট নদী,হ্রদ,ট্যাপ সহ বিভিন্ন জায়গার পানির মধ্যে পাওয়া নতুন ১৯টি নমুনা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন। এর পরের বছর রাউল্টের আরেক সহকর্মী জ্যা-মাইকেল ক্ল্যাভেরি পেলেন আরো বড় আকৃতির ভাইরাস। চিলির সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাওয়া এই ভাইরাসের নাম দেন ‘মেগা ভাইরাস’।

এরপর চিলির নদী এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি পুকুরের কাদা থেকে তিনি শনাক্ত করেন ‘প্যানডোরা ভাইরাসে’র দুটো প্রকরণ। যার একটিতে রয়েছে ১৫০০ টি জিন এবং অন্যটিতে প্রায় ২৫৫০। এরপরই ক্ল্যাভেরি সম্ভবত সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটি করেন। ৩০,০০০ বছর পুরনো বরফের টুকরোর মর্মস্থল থেকে শনাক্ত করেন দর্শনীয় পিথো-ভাইরাস। এটি লম্বায় প্রায় দেড় মাইক্রোমিটার,যা সবার পরিচিত একটি ভাইরাস E. coli এর কাছাকাছি।

এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মেমব্রেনের গায়ের একটি ফুটো,যা কর্কের মতো একটি জিনিস দ্বারা আটকানো থাকে। ক্ল্যাভেরির ভাষ্যমতে “এখন আমরা বলতেই পারি যে, অতিকায় ভাইরাসেরা সর্বত্রই ছড়ানো। আমরা যদি সঠিক পদ্ধতিতে দেখি তবে আমি নিশ্চিত আপনার বাগানেও এদের পাওয়া যেতে পারে।”

যে প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের বিব্রত করে আসছে তা হলো, অতিকায় ভাইরাসগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং জীবনের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাসের কোন স্তরে এদের ফেলা যায়? গোড়ার দিকে এই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতির দুই শাখা (ডোমেইন),আদিকোষী এবং প্রকৃতকোষী। প্রকৃতকোষীর মধ্য রয়েছে সব প্রাণী ও গাছপালা।

আদিকোষীর দুইভাগের একটি হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া,অন্যটি আর্কিয়া। ব্যাকটেরিয়ার কোষগুলো প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের চেয়ে সরল এবং নিউক্লিয়াসবিহীন। আর্কিয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো হলেও এদের রসায়নটা ভিন্ন। এই তিন মৌলিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে সব ধরনের জীবসত্বাকে জায়গা দিতে পারার কথা।

কিন্তু আপনি যদি এই অতিকায় ভাইরাসগুলোর জিনের দিকে তাকান,তাদের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ জিনই আর কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি অতিকায় ভাইরাসের একেকটি গোত্রের মধ্যেও খুব বেশি সাধারণ জিন নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন এই অতিকায় ভাইরাসগুলো কিছু বিলুপ্ত ডোমেইনের অবশেষ। তাই এদেরকে শ্রেণিবিন্যাসের যদি জায়গা দিতেই হয়,তাহলে একাধিক ডোমেইনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ক্ল্যাভেরির ভাষায় “মিমি ভাইরাসের সন্ধান পাওয়ার পরই আমরা বলেছিলাম, চতুর্থ একটি ডোমেইন সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এখন বিশ্বাস করি এটা শুধু চতুর্থ নয় বরং পঞ্চম,ষষ্ঠ এবং সপ্তম।”

২০১২ সালে একদল বিজ্ঞানী বিভিন্ন ভাইরাস এবং অন্যান্য যেসব কোষের একই ধরনের প্রোটিন রয়েছে তাদের নিয়ে একটি বিবর্তনিক বৃক্ষ (Evolutionary Tree) তৈরি করেন যেটা থেকে অনুমান করা যায় অতিকায় ভাইরাসগুলো অন্য সব কিছু থেকেও প্রাচীন, যা একদিক দিয়ে ক্ল্যাভেরির ধারণাকেই শক্তিশালী করে। ক্ল্যাভেরির সমালোচকরা বলেন, সব ভাইরাসই হচ্ছে মিউটেশনের রাজা। তাই একটি জিনকে যদি চিনতে না পারেন, তাহলে সেটা এমনও হতে পারে যে একটি পরিচিত জিনই উপর্যুপরি মিউটেশনের জন্য এমন অবস্থায় এসেছে যে তাকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না।

চিত্রঃ অণুজীবের বিবর্তনীয় বৃক্ষ

তবে এটাও যৌক্তিক যে একটা অণুজীব, পরজীবী জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে তার জিনোম ক্রমাগত ছোট হবার কথা,যেহেতু সে পোষকের যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করছে তার মৌলিক কার্যকলাপের জন্য। তাই এর থেকেও বলা যায় যে অতিকায় ভাইরাসগুলো আমাদের অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের তুলনায় প্রাচীন।

অতিকায় ভাইরাসদের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রাণের সংজ্ঞা সম্পর্কে ভাবাচ্ছে। তারা বলছেন,ভাইরাসকে বিচার করতে চাইলে তার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় নয় বরং সে পোষকের জিনোমের সাথে একীভূত হওয়া অবস্থায় কীভাবে আছে সেটার ভিত্তিতে বিচার করা উচিৎ। এ অবস্থায় সে একটি পরজীবী ব্যাকটেরিয়ার মতো আচরণ করে প্রায়। অবশ্য একে জীবিত বলার জন্য জন্য আমাদের চিন্তাধারাকে আরো প্রশস্ত করতে হবে। শুধু চলৎক্ষম রাইবোজোম বাহক কোষকেই জীবিত বলতে হবে,এটা খুবই কায়েমী মনোভাব। আমরা বরং জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি,রাইবোজোম থাকলে রাইবোসেল এবং ভাইরাস চালিত ভাইরোসেল।

তবে এটা পরিষ্কার যে, জীবন এবং ভাইরাসের মধ্যকার দেয়ালটা বেশ ঝাপসা। ভাইরাস নাকি কোষ? কে জীবন্ত কে মৃত এই প্রশ্নে মাথা খারাপ করে দিলেও কিছু করার নেই। এখন পর্যন্ত অতিকায় ভাইরাসের অনুসন্ধান শুধু অ্যামিবার মধ্যেই চলতো,কারণ মূলত এরা একটি জানা পোষক এবং ল্যাবে এদের নিয়ে কাজ করাও সহজ। তার মানে এখনো বহু বহু পোষক প্রকটিত করা বাকী। যা ক্ল্যাভেরির মত বিজ্ঞানীর জন্য একইসাথে ভীতিকর এবং রোমাঞ্চকর। তার নিজের ভাষায় –

“We don’t know what a virus is any more – or what to expect next.”

তথ্যসূত্রঃ

  • Infect and Direct, Gary Hamilton, New Scientist Magazine, January 15, 2016.
  • A phylogenomic data-driven exploration of viral origins and evolution, Arshan Nasir, Gustavo Caetano-Anollés, Science Advances, September 25, 2015.

জেট ইঞ্জিনের গল্প

চাকার আবিষ্কার মানব সভ্যতার জন্য ছিল বিরাট এক বিপ্লব। এর উদ্ভাবন যোগাযোগকে করেছিল আরো সহজ, আরো গতিময়। চাকা আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ যোগাযোগকে আরো গতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। প্রথম প্রথম বিভিন্ন প্রাণীর পেশি শক্তি ব্যবহার করে যানবাহনগুলো চলাচল করতো। এরপর আসে ইঞ্জিনের ধারণা। যানবাহনে ইঞ্জিনে ব্যবহার মানব সভ্যতার গতিকেই পাল্টে দেয়।

আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির অন্যতম এক বিস্ময় হলো উড়োজাহাজ। যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লেগে যেতো, উড়োজাহাজের কল্যানে তা আজ এক দিনেরও কম সময়ে যাওয়া সম্ভব। আর উড়োজাহাজের এই প্রচণ্ড গতির পেছনের কারণ এর ইঞ্জিন। শুরুর দিকে উড়োজাহাজে পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহৃত হলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে পিস্টন ইঞ্জিনের পরিবর্তে উন্নতমানের ইঞ্জিনের দরকার হয়ে পড়ে। জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার মানুষের এ নতুন চাহিদাটি মেটালো। আজ আমরা এই জেট ইঞ্জিন নিয়েই আলোচনা করবো।

খুব সহজ ভাষায়, জেট ইঞ্জিন হলো এমন এক প্রকার ইঞ্জিন যা বায়ুমন্ডলের বাতাসকে এর ভেতরে টেনে নিয়ে প্রথমে ঘনীভূত করে এবং পরে জ্বালানী মিশ্রিত করে বিষ্ফোরণের মাধ্যমে প্রসারিত করে এর পেছন দিক দিয়ে নির্গত করে দেয়। জেট ইঞ্জিন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। তবে প্রকারভেদ যেমনই হোক, সব জেট ইঞ্জিনই কাজ করে নিউটনের ৩য় সূত্রানুসারে। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এটিই হচ্ছে জেট ইঞ্জিনের মূলনীতি।

জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি

ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে নিউটনের ৩য় সূত্রটি আরো ভালো করে বোঝা প্রয়োজন। একটি বেলুনকে বাতাস দিয়ে ভর্তি করে এর মুখ বন্ধ করে রেখে দিলে বেলুনটি স্থির অবস্থাতেই থাকবে। কারণ ভেতরের বাতাসের চাপ বেলুনটির গায়ে সমানভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা যদি বেলুনটিকে মুখ খোলা অবস্থায় রেখে দেই, তাহলে দেখবো বেলুনটি কিছু বেগ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেলুনের খোলা মুখটি দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি নিউটনের সূত্রের সেই ক্রিয়া। এর ফলে বেলুনটি সামনের দিকে সম-পরিমাণ বল অনুভব করে এবং এগিয়ে যায়। অবাক লাগে, অত্যাধিক জটিল যান্ত্রিক কৌশলের সমন্বয়ে তৈরি একটি জেট ইঞ্জিন এ সহজ নিয়মটি ব্যবহার করেই কাজ করে থাকে।

যাহোক, এবার জেট ইঞ্জিনের মূল কার্যপদ্ধতিতে যাওয়ার আগে এর প্রধান অংশগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে নেয়া যাক। একটি জেট ইঞ্জিনের মূল অংশগুলো হচ্ছে- ১. ফ্যান ২. কম্প্রেশর ৩. কমবাস্টশন চেম্বার ৪. টারবাইন। তবে ইঞ্জিনের ধরন অনুযায়ী আরো বিভিন্ন অংশ যোগ করা হতে পারে।

মূল ইঞ্জিনের সামনের অংশে থাকে একটি ফ্যান। ফ্যানটির কাজ বাইরে থেকে বাতাস টেনে ইঞ্জিনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ ডিজাইন সম্পন্ন ফ্যানের সাহায্যে এ কাজটি করা হয়। ফ্যানের ঠিক পেছনেই থাকে কম্প্রেশর। এর কাজ বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা। এ ধাপে বাইরে থেকে টেনে আনা বাতাসের চাপ প্রায় ৮ গুণ বাড়ানো হয় এবং বাতাসের গতি ৬০ ভাগ কমিয়ে ঘন্টায় ৪০০ কিলোমিটার করা হয়।

ইঞ্জিনের ওপরে এয়ারক্রাফটের ডানার নিচে জ্বালানী ট্যাংক থাকে। বাতাসের সংকুচিত অবস্থায়, ট্যাংক থেকে জ্বালানী এনে বাতাসের সাথে মেশানো হয়। এরপর একটি নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে প্রচন্ড উত্তপ্ত এগজস্ট গ্যাস (Exhaust Gas) উৎপন্ন হয়। এ সময় এগজস্ট গ্যাসের তাপমাত্রা প্রায় ৯০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড হয়।

প্রচন্ড উত্তাপের ফলে সংকুচিত গ্যাস হঠাৎ প্রসারিত হয়ে যায় এবং ইঞ্জিনের পেছন দিয়ে প্রচন্ড বেগে বাইরে নির্গত হয়। ইঞ্জিনের পেছনে রাখা থাকে বিশেষভাবে বাঁকানো একটি টার্বাইন। হঠাৎ প্রসারিত এগজস্ট গ্যাস এই টার্বাইনের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাইরে নির্গত হয় এবং বায়ু প্রবাহের ফলে টার্বাইনটি ঘুরতে থাকে, অনেকটা উইন্ডমিলের মতো।

ইঞ্জিনের পেছনের এ টার্বাইনটি আবার একটি শ্যাফটের মাধ্যমে কম্প্রেশর ও সামনের ফ্যানের সাথে যুক্ত থাকে। ফলে এগজস্ট গ্যাসের প্রভাবে যখন টার্বাইনটি ঘুরতে শুরু করে, তখন টার্বাইনের সাথে সাথে এর সাথে যুক্ত কম্প্রেশর এবং ফ্যানটিও ঘুরতে থাকে। অর্থাৎ প্রাথমিক অবস্থায় ইঞ্জিনটিকে একবার চালু করে দিলে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ না করা পর্যন্ত ইঞ্জিনটি নিজে নিজেই চলতে থাকবে। সংক্ষেপে এবং খুব সহজে, এভাবেই একটি জেট ইঞ্জিন কাজ করে!

চিত্রঃ জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি।

এবার আসি জেট ইঞ্জিনের প্রকারভেদে। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিন তৈরি করা হয়েছে। তবে সব জেট ইঞ্জিনই উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের জেট ইঞ্জিনের নাম দেয়া হলো- ১. রেম জেট ২. পালস জেট ৩. রকেট জেট ৪. গ্যাস টারবাইন ইত্যাদি।

রেম জেটঃ রেম জেট একেবারেই প্রাথমিক স্তরের জেট ইঞ্জিনের ধারণা মাত্র। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োগ এখন আর নেই। শুধুমাত্র জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি সহজভাবে বোঝাতে রেম জেট ব্যবহৃত হয়। রেম জেট ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করে এর ভেতরে বাতাস প্রবেশ করানো হয়। এরপর জ্বালানী মিশ্রিত করে নিয়ন্ত্রিত বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। বিষ্ফোরণের ফলে উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাস ইঞ্জিনের পেছনের নজল দিয়ে বের হয়ে আসে এবং নিউটনের ৩য় সূত্রের নিয়মে ইঞ্জিনটিকে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দেয়।

পালস জেটঃ পালস জেট অনেকটা রেম জেটের মতোই। তবে এ ইঞ্জিনকে প্রাথমিকভাবে সামনের দিকে গতিশীল করার দরকার হয় না। এর পরিবর্তে ইঞ্জিনটি এর কম্প্রেশর দ্বারা বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে যায়। এ ধরনের ইঞ্জিন অনেক টেকসই। তবে পালস-জেট ইঞ্জিনের জ্বালানী খরচ খুব বেশি। মূলত ফাইটার এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

চিত্রঃ পালস জেট ইঞ্জিন।

রকেট জেটঃ সাধারণ জেট ইঞ্জিনগুলো বায়ুমন্ডলের বাতাসকে ব্যবহার করে জেট তৈরি করে। কিন্তু রকেট জেট বায়ুমন্ডলের বাতাসের পরিবর্তে এর ভেতরে থাকা জ্বালানী আর অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহার করে জেট তৈরি করে থাকে। রকেট জেটের থ্রাস্ট খুব শক্তিশালী। তবে এর স্থায়িত্ব স্বল্প সময়ের জন্য হয়। স্পেস শিপ এবং মিসাইলে রকেট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

চিত্রঃ রকেট জেট ইঞ্জিন।

গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিনঃ গ্যাসে টারবাইন ইঞ্জিন আধুনিক এয়ারক্রাফটগুলোতে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিন বায়ুমন্ডল থেকে বাতাস টেনে এর ভেতরে নিয়ে প্রথমে সংকুচিত করে। আমরা জেট ইঞ্জিনের কার্যপদ্ধতি এ ধরনের ইঞ্জিনের সাহায্যেই আলোচনা করেছি। গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনকে এর ডিজাইনের উপর উপর ভিত্তি করে আবার ৩ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. টার্বোজেট ২. টার্বোপ্রপ ৩. টার্বোফ্যান।

টার্বোজেটঃ টার্বোজেট ইঞ্জিনের সামনে একটি কম্প্রেশার থাকে। এর সাহায্যে ইঞ্জিনের ভেতরে প্রতি মিনিটে কয়েক হাজার টন করে বাতাস নিয়ে যাওয়া হয়। টারবাইনের সাথে একটি শ্যাফটের মাধ্যমে ইঞ্জিনের কম্প্রেশারটিও যুক্ত থাকে। ফলে প্রথমে বাহ্যিক একটি শক্তির সাহায্যে কম্প্রেশারটি একবার চালিয়ে দিলে পরবর্তীতে এটি নিজে নিজেই চলতে থাকে এবং ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাতাস টেনে আনতে থাকে।

টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনঃ টার্বোপ্রপ জেট ইঞ্জিন অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই। তবে এ ধরনের ইঞ্জিনের উৎপন্ন এগজস্ট গ্যাসকে ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট উৎপন্ন করার পরিবর্তে ইঞ্জিনের পেছনে থাকা টারবাইনটি ঘোরানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের ইঞ্জিনের টারবাইন থাকে অনেকগুলো, এগুলো তুলনামূলক ভাবে কিছুটা বড় হয়। ফলে উৎপন্ন জেটের প্রায় সবটুকু শক্তিই ব্যয় হয় এ টারবাইনগুলো ঘোরানোর কাজে।

সামনের দিকে থাকে একটি প্রপেলার। প্রপেলারে সাধারণত ৪-৬ টি করে ব্লেড থাকে। প্রপেলার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে টারবাইন ও কম্পেশারের সাথে যুক্ত থাকে। টারবাইনের সাথে সাথে প্রপেলারটিও ঘুরে। এ প্রপেলারটিই এয়ারক্রাফটকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় থ্রাস্ট তৈরি করে। ছোট আকারের এয়ারক্রাফটে এ ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়।

টার্বোফ্যানঃ অনেকটা টার্বোজেট ইঞ্জিনের মতোই কাজ করে এমন আরেকটি জেট ইঞ্জিন হচ্ছে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিন। তবে টার্বোজেটের সাথে টার্বোফ্যান জেট ইঞ্জিনের মূল পার্থক্য হলো, এর সামনে থাকা কম্প্রেশারের ব্লেডগুলো অনেক বড় আকৃতির। ফলে বায়ুমন্ডল থেকে টেনে আনা বাতাসের পুরোটা ইঞ্জিনের ভেতর দিয়ে না গিয়ে কিছু অংশ ইঞ্জিনের বাইরের আবরণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বাতাসকে বাইপাস এয়ার বলা হয়। এর মূল সুবিধা হলো, বাইপাস এয়ারের কারণে ইঞ্জিনটি ঠান্ডা থাকে। আবার বিশেষ ব্যবস্থায় এ বাইপাস এয়ারকে জ্বালানী সহকারে বিষ্ফোরিত করে অতিরিক্ত এগজস্ট গ্যাস উৎপন্ন করা হয়। ফলে এয়ারক্রাফটের জন্য অতিরিক্ত থ্রাস্টও পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্রঃ
১. The Jet Engine- Rolls Royce
২. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ. কে. এম. আতাউল হক
৩. www.nasa.gov

featured image: maya.design

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!
প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়! মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা। স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?
এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে। ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

রেড ফক্স (Red Fox)

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

সী হর্স

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে! এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

গ্রিজলি বিয়ার

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

 ১.thescienceexplorer.com
 ২.mentalfloss.com

 

প্রাণিজগতের নানান বাবাদের গল্প

শৈশবে যারা সত্যিকার অর্থেই বাবার ভালোবাসা পেয়েছে তারা জানে বাবার ভালোবাসা অন্য এক জিনিস। ‘Silent, But Dominant’ কথাটা বোধহয় বাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রেই খাটে। একজন মা যখন তার প্রতিটি আচার-আচরণে, কথাবার্তায় সন্তানটির জন্য ভালোবাসা ব্যক্ত করেন, একজন বাবা সেখানে থাকেন নিশ্চুপ। পর্দার আড়ালে থেকেই তিনি সন্তানের প্রতিটি কার্যকলাপ সম্পর্কে খেয়াল রেখে যান। মুখ ফুটে কদাচিৎ হয়তো তিনি সন্তানের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেন, তবে মুখে ফুটে উঠা ভাবভঙ্গি দিয়েই তিনি ভালোবাসা প্রকাশে সক্ষম!
প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতিতেও বাবারা বেশ ভালোই সার্ভিস দেয়। মা প্রাণীর ডিম পাড়ার পর সেটি দেখাশোনা করা, শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে তার লালনপালন করার মতো গুরু দায়িত্বগুলো বাবারাই পালন করে থাকে। একজন আদর্শ বাবা কেমন হতে পারেন তার চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সেসব প্রাণী। তেমনই কিছু প্রাণীর গল্প শোনাতেই আজকের এ লেখা।

পেঙ্গুইন (Penguin)

ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন ডিমটি দিয়ে দেয় বাবাটির দিকে। এরপর শুরু হয় বাবার সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব। বাচ্চা বেরোবার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ ডিমটি আগলে রাখে বাবা। বাচ্চাটি যতদিনে ডিমের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে, ততদিনে বাবার উপোসের প্রায় চার মাস হয়ে যায়! মা ফিরে আসার আগে যদি বাচ্চা ডিম থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে বাবা নিজের খাদ্যনালী থেকে এক ধরনের পুষ্টিকর খাবার তার সন্তানকে খেতে দেন। নিজের কোলে নিয়েই বড় করতে থাকেন সন্তানকে। ঠান্ডার হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বাবা তাকে পায়ের উপরে নিয়েই ঘুরে বেড়ান।

কমন মিডওয়াইফ টড (Common Midwife Toads)

এ প্রজাতির স্ত্রী ব্যাঙেরা যখন ডিম পাড়ে, তখন সেগুলো জেলীর মতো এক ধরনের আঠালো পদার্থে আটকানো থাকে। এরপর সেগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে বাবাদের ঘাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর আগে ৩-৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেগুলো বয়ে বেড়ায় বাবা ব্যাঙেরা। এ সময় ডিমের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে তারা ঘুরে বেড়ায় নানা আর্দ্র জায়গায়।

রেড ফক্স (Red Fox)

বাচ্চা জন্ম দেয়ার পর প্রথম এক মাস পর্যন্ত এ প্রজাতির স্ত্রী খেঁকশেয়ালরা তাদের ডেরা ছেড়ে বেরোতে পারে না। সন্তানের লালনপালন, খাওয়াদাওয়া, উষ্ণ রাখার মতো কাজগুলো করতে করতেই কেটে যায় মায়ের প্রতিটি মুহুর্ত। আর এ সময় বাবা খেঁকশেয়ালের দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা। স্ত্রী যতদিন না তার ডেরা থেকে বেরোতে পারছে, ততদিন ৪-৬ ঘন্টা পরপর তার খাবার যোগানোর গুরুদায়িত্ব কিন্তু স্বামীরই। এখানে সে আদর্শ স্বামী, তাহলে আদর্শ বাবা কীভাবে? জনাব, মা সুস্থ থাকলেই তো তার সন্তানেরা সুস্থ থাকবে, তাই না?
এ তো গেলো পরোক্ষভাবে সন্তানদের দেখাশোনার কথা, প্রত্যক্ষভাবেও কিন্তু বাবা তার দায়িত্ব পালন করে পুরোপুরিই। বাচ্চার বয়স যখন তিন মাস ছোঁয় তখনই বাবা তার আসল কাজটি শুরু করে- ‘ভবিষ্যতের জন্য সন্তানকে গড়ে তোলা’। মানবসমাজ হলে নাহয় এ ‘গড়ে তোলা’র মানে হতো সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, কিন্তু শেয়াল সমাজে তো আর সেই কথা খাটবে না। সেখানে ‘গড়ে তোলা’র মানে সন্তানকে শিকার করার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এজন্য বাবা খেঁকশেয়াল তাদের উদ্বৃত্ত খাবারের কিছু অংশ ডেরার আশেপাশেই গর্ত করে লুকিয়ে রাখে, ঢেকে দেয় গাছের ঝরে পড়া পাতা ও ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে। ছোট্ট শেয়ালছানাটির তখন দায়িত্ব পড়ে সেগুলো খুঁজে বের করার। এভাবেই খেলার ছলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে শেয়ালছানাটি, গভীর হতে থাকে বাবার সাথে তার ভালোবাসার বন্ধন।

রেড ফক্স (Red Fox)

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

ছবিতে দেখানো মাছটির নাম ইয়েলো-হেডেড জফিশ। স্ত্রী ডিম পাড়ার পরই শুরু হয় তার স্বামীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- ডিমগুলোর দেখাশোনা করা। আর এ দেখাশোনার জন্য পুরুষটি ডিমগুলো একেবারে মুখে পুরে নেয়! সাধারণত ৭-৯ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এতদিন ধরে সন্তানদের মুখে নিয়েই ঘুরে বেড়ায় বাবা। আর মুখে সন্তানদের স্থান দেয়ার ফলে কিছু খেতেও পারে না সে। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর পরই মেলে তার মুক্তি!

ইয়েলো-হেডেড জফিশ (Yellow-Headed Jawfish)

সী হর্স (Sea Horse)

সমুদ্রের পানিতে বাস করা ঘোড়ামুখো এ প্রাণীদের পুরুষ প্রজাতিরাও কিন্তু বাবা হিসেবে বেশ দায়িত্ববান। স্ত্রী সী হর্স ডিম পেড়ে সেগুলো পুরুষ সঙ্গীর গায়ে থাকা থলেতে জমা করে। সেখানে চলতে থাকে ডিমগুলোর লালনপালন। এভাবে চলে প্রায় দেড় মাস। এরপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর সময় হয়, বাবা তার সন্তানদেরকে তখন পেশীর সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে সমুদ্রের নোনা পানির জগতের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
এতক্ষণ ধরে প্রাণিজগতে বাবাদের ভালো ভূমিকা পড়ে যদি মানব-বাবা হিসেবে বেশ ভালো লাগা শুরু করেন, তাহলে এবার দেখা যাক মুদ্রার উল্টো পিঠও।

সী হর্স

ব্যাস (Bass)

জন্মানোর পর অসহায় বাচ্চাগুলোকে দেখাশোনার কাজ অত্যন্ত যত্ন সহকারেই করে থাকে মাছটি। শিকারী মাছের হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা দলবদ্ধভাবে সন্তানদের নিপুণভাবে পরিচালনাও করে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আচরণ একেবারে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায়। বাংলায় প্রচলিত ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ প্রবাদের বাস্তব উদাহরণ হয়ে যায় বাবা ব্যাস মাছ। সে-ই এখন তার সন্তানদের ধরে ধরে খেতে শুরু করে! এ সময় বাবার রাক্ষুসে স্বভাব থেকে কৌশল খাটিয়ে রেহাই পাওয়া বাচ্চা ব্যাসেরাই তাদের বংশের ধারা অব্যাহত রেখে যায়। একসময় তারাও বাবা হয়, তারাও তাদের বাচ্চাদের খেতে শুরু করে, কিছু বাচ্চা আবারো বেঁচে যায়। এভাবেই চলতে থাকে বাবার গ্রাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানদের প্রজন্মান্তরের এ সংগ্রাম।

চিত্রঃ ব্যাস মাছ।

স্যান্ড গোবি (Sand Goby)

ব্যাসদের মতো স্যান্ড গোবিদের বাসও সমুদ্রে। তারাও দায়িত্ববান বাবার মতোই ডিমগুলোর দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু ডিমগুলো যেই না পরিপক্ব হয়ে ওঠে, সাথে সাথেই বাবাদের আচরণ যায় বদলে। আশেপাশে যত খাবারই থাকুক না কেন, বাবা তার নিজের ডিমই খেতে শুরু করে দেয়। এভাবে নিজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সন্তানকে খেয়ে তবেই থামে বাবা স্যান্ড গোবি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবারা সাধারণত বড় ডিমগুলো খেয়ে থাকে। বড় ডিম মানেই বেশি পুষ্টি উপাদান, তাই তো? আসলে কিন্তু তা না। বাবা স্যান্ড গোবি জানে বড় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে বেশি সময় লাগবে। কিন্তু অতদিন চুপচাপ পাহারা দেয়ার ধৈর্য যে তার নেই! তাই বড়গুলোকে খেয়ে অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্যবান সন্তানগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। তাহলেই ডিম দেখাশোনার দায়িত্ব থেকে মুক্তি মেলে তার। এরপরই সে বেরিয়ে পড়ে নতুন সঙ্গিনীর খোঁজে। নতুন করে মিলিত হবার আশায়!

চিত্রঃ স্যান্ড গোবি মাছ।

গ্রিজলি বিয়ার (Grizzly Bears)

এ ভালুকগুলোর দেখা মেলে উত্তর আমেরিকায়। ছোটবেলায় ইতিহাস পড়ার সময় আমরা দেখেছি, সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে কিংবা সেটি দখল করতে বিভিন্ন সময়ই মায়ের পেটের ভাইয়েরাও একে অপরের শত্রুতে পাল্টে গেছে। শৈশবে একসাথে খেলাধুলা করা ভাইকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাতে কিংবা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে ফেলতে অপর ভাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। মাঝে মাঝে এমন ঘটনা নিজেদের বাবা-মায়ের সাথেও ঘটেছে। প্রাণিজগতে এমন স্বভাবের সার্থক উদাহরণ এ গ্রিজলি বিয়ার।

গ্রিজলি বিয়ার

নিজেদের এলাকার মাঝে অন্য কারো অনুপ্রবেশ মেনে নিতে নারাজ এ প্রজাতির বাবা ভালুকেরা। কখনো কখনো তাদের সেই এলাকা ১,৫০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। বিশাল এ এলাকায় যদি কারো অনুপ্রবেশ নজরে পড়ে তার, হোক না সে তার আপন সন্তান, তাকে খুন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না বাবারা। এজন্য মা ভালুকেরা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকে। ভুলেও যেন আদরের সন্তানটি তার বাবার এলাকায় পা না রাখে, সেই ব্যাপারে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
বাবাদের সরব-নীরব ভালোবাসায় ভরে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবন, এ কামনায় আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

 ১.thescienceexplorer.com
 ২.mentalfloss.com

 

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm