হাবল কীভাবে গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করেছিলেন?

গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত অপসারিত হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। এ নিয়ে বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের সূত্র আছে। সূত্রের সাহায্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতিবেগ সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

হাবল তো আর এমনিতেই এই ধারণাটি পাননি। তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় হাবল কীভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করলেন? এর জন্য তিনি সেসব গ্যালাক্সি থেকে নির্গত আলোর লাল সরণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। লাল সরণ বিশ্লেষণ করলে গতিশীল বস্তুর বেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

ধরি একজন দর্শক একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং একটি গাড়ি সাইরেন বাঁজাতে বাঁজাতে যাচ্ছে। গাড়িটি যখন দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যায় তখন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতাও কমে যায়। গাড়ির গতিবেগ যত বেশি হবে তীক্ষ্ণতার পরিবর্তনও হবে তত বেশি। কোনোভাবে যদি সাইরেনের শব্দের কম্পাংক জানা যায় তাহলে সেখান থেকে গাড়িটির বেগ বের করা সামান্য কিছু গাণিতিক হিসেবের ব্যাপার মাত্র। সাইরেনের প্রারম্ভিক কম্পাংক এবং দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংককে তুলনা করলেই গাড়িটির গতিবেগ বের হয়ে যাবে।

কোনো একটি উৎস যদি আলো বা শব্দের মতো কোনো সিগন্যাল প্রেরণ করতে থাকে তাহলে তার প্রারম্ভিক সিগন্যালগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম্পন সম্পন্ন করবে। কিন্তু যখন এই সিগন্যাল কোনো দর্শকের কাছে পৌঁছুবে তখন দর্শকের সাপেক্ষে এর কম্পনের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

দর্শকের সাপেক্ষে উৎস কত বেগে চলমান কিংবা উৎসের সাপেক্ষে দর্শক কত বেগে চলমান তার উপর নির্ভর করে সিগন্যালের কম্পন কত হবে। উৎস যদি দর্শকের কাছে আসতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের অধিক কম্পন অনুভব করবে। কারণ সেক্ষেত্রে সিগন্যালের কম্পন বা স্পন্দনগুলো ঘন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে উৎস যদি দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের স্বল্প কম্পন অনুভব করবে।

চিত্র: সাইরেনের কম্পাংক জানলেই বের হয়ে আসবে গাড়ির গতিবেগ। ছবি: সিকে

চমকপ্রদ এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান জোহান ডপলার (১৮০৩–১৮৫৩)। তার নাম অনুসারেই সিগন্যাল বা তরঙ্গের বিশেষ এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ডপলার প্রভাব। বিখ্যাত একটি পরীক্ষণের মাধ্যমে শব্দের ডপলার প্রভাবের সঠিকতা যাচাই করে দেখেছিলেন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ হেনড্রিক (১৮১৮–১৮৯০)।

দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই ডপলার প্রভাবকেই ব্যবহার করেছিলেন। দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে নির্গত আলোর স্বাভাবিক কম্পাংক এবং ঐ একই আলোর দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংকের মাঝে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থেকেই হাবল তাদের বেগ নির্ণয় করেছিলেন।

কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়? নিম্নবর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যাবে। তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের অনেকগুলো রূপ আছে। তাদের মাঝে একটি হলো আলো। এই বিকিরণকে তরঙ্গের মতো করে সাদামাটাভাবে নীচের চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। কয়েকটি শীর্ষ আছে এখানে। দুটি শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বলা হয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য। এই বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যখন ০.০০০০২ থেকে ০.০০০১ সেন্টিমিটারের মাঝে থাকবে তখন একে আমরা বলি ‘আলো’। কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই সীমা পর্যন্ত আমাদের চোখ সংবেদনশীল।

চিত্র: দুই শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

এর চেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। সেসবের উদাহরণ ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও ওয়েভ। ইনফ্রারেড বিকিরণ হলো তাপ। উত্তপ্ত বস্তু থেকে এটি বের হয়। আলোর চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। এর উদাহরণ আল্ট্রাভায়োলেট, এক্স-রে এবং গামা রে। নীচের সারণিতে এই বিকিরণগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো।

বিকিরণের প্রকৃতি তরঙ্গদৈর্ঘ্য (সেন্টিমিটার)
রেডিও ১০ এর চেয়ে বড়
মাইক্রোওয়েভ ০.০১ – ১০
ইনফ্রারেড (তাপ) ০.০০০১ – ০.০১
দৃশ্যমান আলো ০.০০০০২ – ০.০০০১
অতিবেগুনী রশ্মি ১০-৭ – ০.০০০০২
এক্স-রে ১০-৯ – ১০-৭
গামা রে ১০-৯ এর চেয়ে ছোট

সারণি: তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও বিকিরণের প্রকৃতি

তরঙ্গদৈর্ঘ্য যা-ই হোক, সকল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ একই বেগে চলে। সকলের বেগই আলোর বেগের সমান। তরঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘কম্পাংক’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। কোনো বিকিরণ প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো কম্পন সম্পন্ন করে তাকে বলা হয় কম্পাংক। পূর্ববর্তী চিত্রে কতগুলো পূর্ণ তরঙ্গ দেখানো হয়েছে। একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হলে একে বলা যায় একটি কম্পন।

প্রতি সেকেন্ডে এরকম হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ কম্পন সম্পন্ন করে তড়িৎচুম্বকের একেকটি বিকিরণ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাংক পরস্পর সম্পর্কিত। আলোর বেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে কম্পাংক পাওয়া যায়। এ হিসেবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বড় হবে বিকিরণের কম্পাংক তত কম হবে। উল্টোভাবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হবে কম্পাংক তত বেশি হবে।

কোনো নক্ষত্র কিংবা কোনো গ্যালাক্সি সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিকিরণ করে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে ঘটা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া (mechanism)-র ফলে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটে চলছে। এর ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপ ও আলোক শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। নক্ষত্র সেই তাপ ও আলোক শক্তিকে বিকিরণের মাধ্যমে চারদিকে নিঃসরণ করে দিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছে।

চিত্র: নক্ষত্রগুলো প্রতিনিয়ত বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ছবি: নাসা/উইকিমিডিয়া কমন্স

বিশাল নক্ষত্র ছেড়ে অতি ক্ষুদ্র জগতে গেলেও দেখা যাবে সেখানে বিকিরণ হচ্ছে। বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণার গতির ফলেও বিকিরণ তৈরি হয়। যেমন ইলেকট্রন ও প্রোটন। এদের দ্বারাই জগতের সকল বস্তু গঠিত। এই বিকিরণ নিঃসৃত হবার সময় চার্জিত বস্তু থেকে শক্তি বহন করে নিয়ে আসে। ফলে বস্তুটি শক্তি হারায়।

সত্যি কথা বলতে কি, সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে, সকল প্রকার বিকিরণই আসলে চার্জিত কণার গতির ফলে সৃষ্টি। যেকোনো পদার্থের মাঝেই তার ইলেকট্রনগুলো এলোমেলোভাবে গতিশীল থাকে। লোহা বা অন্য কোনো ধাতুকে যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন আসলে তার মাঝে থাকা ইলেকট্রনের এলোমেলো গতির পরিমাণ বেড়ে যায়। গতি বাড়লে সেখান থেকে তাপ বা ইনফ্রা-রেড তরঙ্গ বিকিরিত হয়।

আরো বেশি উত্তপ্ত করলে সেখানের ইলেকট্রনের গতি আরো বেড়ে যায়। গতি আরো বেড়ে গেলে সেখান থেকে ইনফ্রা-রেডের চেয়েও উচ্চ তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। ইনফ্রা-রেডের চেয়ে উচ্চ তরঙ্গ হলো দৃশ্যমান আলোক রশ্মি। এদের মাঝে সবচেয়ে কাছের হলো লাল রঙের তরঙ্গ। সেজন্যই দেখা যায় লোহার কোনো খণ্ডকে বেশি উত্তপ্ত করলে সেটি লালচে আভা বিকিরণ করে।

উত্তপ্ত লোহা থেকে লালচে আভা বের হয়। এর পেছনে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার কার্যকলাপ। ছবি: ড্রিমসটাইম

নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং তাদের কর্তৃক বিকিরণ সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বর্ণালি বা স্পেকট্রাম। স্পেকট্রোমিটার বা বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণের বর্ণালি বের করা হয়। বর্ণালিবীক্ষণের একদম সরলীকৃত রূপ হলো প্রিজম। প্রিজমের মাঝেও বিকিরণের বর্ণালির ক্ষুদ্র একই অংশ দেখা যায়। অন্যদিকে স্পেকট্রোমিটারে বিকিরণের বর্ণালির খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানা যায়।

ভিন্ন ভিন্ন বিকিরণকারী বস্তুর বর্ণালি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণ যেমন হয়ে থাকে, নক্ষত্র থেকে নির্গত বিকিরণ তেমন হবে না। আবার এক খণ্ড লোহা থেকে যে বিকিরণ বের হয় তা গ্যালাক্সি কিংবা নক্ষত্র কিংবা অন্য কোনোকিছুর মতো হবে না।

কিছু কিছু নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বাইরের দিকে শীতল গ্যাসের আবরণ থাকে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কিছু বিকিরণ ঐ আবরণে শোষিত হয়ে যায়। এই শোষণ একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে হয়। কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের পদার্থে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আবৃত আছে তার উপর।

গ্যাসীয় আবরণে ক্যালসিয়াম পরমাণু থাকলে বর্ণালির এক অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, লোহা থাকলে অন্য অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, অন্য কোনো মৌল থাকলে অন্য কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে।

কোন কোন উপাদান কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষণ করে তা বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানেন। গবেষণাগারে সেসব উপাদানকে বিশ্লেষণ করে তারা এটি বের করেছেন।

নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির গ্যাসীয় আবরণ যদি বিশেষ কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণকে শোষণ করে নেয় তাহলে ঐ নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বর্ণালির মাঝে একটি শূন্যতা তৈরি হবে। যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হয়েছে, বর্ণালির ঐ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অংশে একটি অন্ধকার অঞ্চল (Dark line) দেখা যাবে। যার অর্থ হলো ঐ অংশের বিকিরণ এসে পৌঁছাতে পারেনি, কোথাও আটকে গেছে।

চিত্র: নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির আবরণকারী উপাদানভেদে বর্ণালির বিভিন্ন অংশে অন্ধকার অঞ্চল দেখা যায়। ছবি: নাসা

বিজ্ঞানী হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে আগত আলো এবং তাদের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করলেন। তিনি দেখতে পেলেন বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্রমেই বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে।

অনেকগুলো গ্যালাক্সির বর্ণালি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর ক্রম-অপসারণ বেগের কারণেই বর্ণালিতে এই সরণ ঘটছে। এই সরণই হলো লাল সরণ বা রেড শিফট। বর্ণালির অন্ধকার অংশের সরণ হচ্ছে বড় তরঙ্গের দিকে, আর দৃশ্যমান আলোতে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বড়, তাই এই সরণের নাম দেয়া হয়েছে লাল সরণ।

হাবলই কিন্তু প্রথম নন, মহাজাগতিক বস্তুর বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চলের উপস্থিতি সম্পর্কে আরো অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। জার্মান পদার্থবিদ জসেফ ভন ফ্রনহফার (১৭৪৭ – ১৮২৬) সূর্যের আলোর বর্ণালি সর্বপ্রথমতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৮০২ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওয়ালাস্টোনও বিকিরণকারী বস্তুর মাঝে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান।

চিত্র: এডউইন হাবলের আগেই বিজ্ঞানী ফ্রনহফার নক্ষত্রের বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান। ছবি: উকিমিডিয়া কমন্স

১৮৬৮ সালের দিকে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হিউগিনস (১৮২৪ – ১৯১০) এ সম্পর্কিত বেশ কিছু গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে, কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে লাল অংশের দিকে কিংবা ধীরে ধীরে নীল অংশের দিকে সরে যাচ্ছে।

তিনি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ডপলার প্রভাবের সাহায্যে এবং এই ব্যাখ্যা ছিল সঠিক। তিনি বলেন, নক্ষত্রগুলো ক্রমান্বয়ে আমাদের নিকটে আসার কারণে কিংবা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার কারণে এটি হয়েছে।

ক্যাপেলা (capella) নামে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আছে। উজ্জ্বলতার বিচারে এটির অবস্থান ষষ্ঠ। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়।

সূর্যের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলের চেয়ে ক্যাপেলার বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল লাল তরঙ্গের দিকে 0.01% বেশি অগ্রসর হয়ে আছে। যেহেতু লালের দিকে তথা বড় তরঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাই এখান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্যাপেলা আমদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরে সরে যাবার বেগ, আলর বেগের 0.01%। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে। আলর বেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার।

প্রতি মুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছে ক্যাপেলা নক্ষত্র। ছবি: বব মুলার

পরবর্তী বেশ কয়েক দশক পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল নক্ষত্র, শনির বলয় ইত্যাদির বেগ নির্ণয় করতে ডপলার প্রভাব ব্যবহার করা হতো।

তো হাবল কীভাবে জানলেন, বেশি লাল সরণের গ্যালাক্সিগুলো কিংবা বেশি বেগে অপসৃয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো বেশি দূরে অবস্থিত? তিনি জেনেছেন কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন গড়পড়তাভাবে যে নক্ষত্রগুলো যত ক্ষীণ (অনুজ্জ্বল) সেগুলোর লাল সরণ তত বেশি। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে অনুজ্জ্বল বা ক্ষীণ নক্ষত্রগুলোই দূরে অবস্থান করছে।

তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ শুধুমাত্র দূরে অবস্থান করলেই যে গ্যালাক্সি অনুজ্জ্বল হবে এমন নয়। কম পরিমাণে বিকিরণ করার কারণেও উজ্জ্বলতা কম হতে পারে। হতে পারে এর নিজস্ব উজ্জ্বলতাই অল্প, যার কারণে কাছে থাকা সত্ত্বেও ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। সেজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছে।

হিসেবের জন্য তাকে বিশেষ শ্রেণির কিছু গ্যালাক্সিকে বেছে আলাদা করে নিতে হয়েছে যেন হিসেবে ঝামেলা না হয়। বাছাইকৃত এ শ্রেণির গ্যালাক্সিকে বলা হয় ‘মানবাতি’ বা Standard Candle বিশেষ এ শ্রেণির গ্যালাক্সিগুলোর আপাত উজ্জ্বলতা দেখেই বের করা যায় এরা কত দূরে অবস্থিত। যদি কোনো গ্যালাক্সি ‘মানবাতি’ শ্রেণিতে পড়ে এবং এর উজ্জ্বলতা খুব ক্ষীণ হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি অবশ্যই অনেক দূরে অবস্থিত আছে। মানবাতির উজ্জ্বলতা যত ক্ষীণ হবে পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব তত বেশি হবে।

আবার অন্যদিকে মানবাতি খুঁজে পাওয়াও বেশ দুরূহ কাজ। দুরূহ কর্ম সম্পন্ন করে হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির আপাত উজ্জ্বলতা এবং তাদের লাল সরণের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। এই সম্পর্ক থেকে বলা যায় যে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং তাদের অপসরণ বেগও পরস্পর সম্পর্কিত। যেহেতু এই বিশেষ শ্রেণির গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতা তাদের দূরত্বের উপর নির্ভর করে এবং দূরত্ব বেশি হলে লাল সরণও বেশি হয় তাই বলা যায় দূরের গ্যালাক্সিগুলো বেশি দ্রুত বেগে অপসারিত হচ্ছে।

চিত্র: এডউইন হাবল

একে বলা যায় আগেভাগেই ফলাফল অনুমান করে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সকল শ্রেণির গ্যালাক্সিকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে কাজ করলে হয়তো ফলাফলটা এত সহজে পাওয়া যেত না। তাই আগে থেকেই একটা অনুমান করে নিয়েছেন যে, ‘সম্ভবত’ গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। আসলেই দূরে সরে যাচ্ছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ কিছু গ্যালাক্সিকে আলাদা করে নিয়েছেন যেন হিসেবের জটিলতা কমে যায়। এর মানে আগে থেকেই ফলাফল অনুমান করে নেয়া। এমনিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলাফল আগে থেকে অনুমান করে নিলে ক্ষেত্রবিশেষে সেটি গবেষণার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

আলোর উৎসের অপসারণ বেগ ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াতেও লাল সরণ ঘটতে পারে। যেমন আলো যদি শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সম্পন্ন কোনো উৎস থেকে নির্গত হয় এবং সে আলো যদি দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রে অবস্থান করা কোনো পর্যবেক্ষক বিশ্লেষণ করে তাহলে ঐ পর্যবেক্ষণ আলোর লাল সরণ দেখতে পাবে।

তবে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় উৎসের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর লাল সরণ ঘটছে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক। পর্যবেক্ষণে যে পরিমাণ লাল সরণ পাওয়া গেছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কারণে এত পরিমাণ লাল সরণ ঘটে না। দ্বিতীয়ত, ক্রম-প্রসারণের ফলে লাল সরণের যে সুস্থিত ও নিয়মতান্ত্রিক বৃদ্ধি ঘটেছে তা মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের লাল সরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা ঐক্যমতে এলেন যে, গ্যালাক্সির অপসরণ বেগের কারণেই লাল সরণ ঘটছে।

তবে এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে। সেটি বলছে, অন্ততপক্ষে সামান্য কিছু লাল সরণের পেছনে তাদের পশ্চাদপসরণ দায়ী নয়। এদের ক্ষেত্রে হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র দায়ী নাহয় তাদের পেছনে এমন কোনো ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করছে যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

এ বেলায় আরেকটি সমস্যার দিকে আলোকপাত করা দরকার। হাবলের সূত্র বলছে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব যত বেশি হবে তাদের অপসরণ বেগও তত বেশি হবে। এ অপসরণ বেগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। যত খুশি তত পরিমাণে উন্নীত হতে পারে। এদিকে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাহলে গ্যালাক্সির যত খুশি তত বেগে উন্নীত হওয়া কি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে লঙ্ঘন করছে না?

চিত্র: গ্যালাক্সিগুলো কি আসলেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে ছুটছে? ছবি: বিগ থিংক

জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের পরিমাণকে z দিয়ে প্রকাশ করেন। উৎস হতে নির্গত তরঙ্গের মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং পর্যবেক্ষক কর্তৃক গৃহীত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পার্থক্য (বিয়োগ) বের করা হয়। তারপর ঐ পার্থক্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করা হয়। তারপর যে মানটি পাওয়া যায় তা-ই হলো z এর মান।

এই z এর সাহায্যে গ্যালাক্সিগুলোর বেগ সহজেই বের করা যায়। আলোর বেগের সাথে লাল সরণ z-কে গুণ করে দিলেই গ্যালাক্সির গতিবেগ পাওয়া যাবে। আলোর বেগ c হলে গ্যালাক্সির বেগ cz। যেমন, কোনো গ্যালাক্সির লাল সরণের মান যদি হয় ০.১৫ তাহলে তার অপসরণ বেগ আলোর বেগের ১৫ শতাংশ। লাল সরণের মান ০.২৫ হলে তার অপসরণ ২৫ শতাংশ।

তবে এ নিয়মটি শুধুমাত্র আলোর বেগের তুলনায় খুব স্বল্প বেগে ধাবমান গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি হলেই এ নিয়ম আর কাজ করে না। এমনিতে বিজ্ঞানীদের পক্ষে খুব বেশি মানের লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব (সেটা যে উৎসেরই হোক), কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে ধাবমান কোনো গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আবার তত্ত্ব বলছে লাল সরণ যদি খুব বেশি হয়ে যায় তাহলে উৎসের গতিও আলোর বেগের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

যে দূরত্বে গেলে গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণ বেগ আলোর বেগের সমান হয় সে দূরত্বকে বলা হয় দিগন্ত বা হরাইজন। দিগন্তের বাইরের কোনো গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণ করা যম্ভব নয়। তাহলে কি এর মানে এমন দাড়াচ্ছে না যে, বাইরের গ্যালাক্সিগুলোর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি? কিছু দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, হ্যাঁ, এদের বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাতে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।

কীভাবে? বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নিয়ম-নীতি তখনই খাটবে যখন কোনোপ্রকার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতি থাকবে না। কিন্তু মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রেই মহাকর্ষ বিদ্যমান। এই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান ও কালের প্রকৃতিকে আমূলে পালটে দেয়। আর এটি ঘটে আইনস্টাইনেরই দেয়া সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে।

ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘বস্তু’ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। এখানে মূলত ‘স্থান’ নিজেই প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। বস্তু হয়তো আলোর বেগের বেশি বেগে চলতে পারে না কিন্তু স্থান ঠিকই পারে। আর ঐ বেশি বেগে চলা স্থানে যদি কোনো বস্তু থাকে তাহলে স্থানের সাথে সাথে বস্তুটিও বেশি বেগেই চলবে। বস্তু হয়তো আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলছে না, কিন্তু স্থান তাকে চালিয়ে নিচ্ছে।

যদিও আমরা দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সিগুলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু স্থানের প্রসারণের প্রকৃতি থেকে তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সির গতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি জটিল ফর্মুলার মাধ্যমে সুরাহা করা যায়। তবে এখানে আলচ্য বিষয় অনুধাবন করার জন্য এত সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশের প্রয়োজন নেই।

উৎস Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Chapter 3, Cambridge University Press

featured image: scitechdaily.com