ডার্ক ম্যাটার নিজের সাথে নিজেই মিথষ্ক্রিয়া করে না

ডার্ক ম্যাটার এখনো পদার্থবিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত কণা। নতুন এক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার আবেল ৩৮২৭ এ থাকা ডার্ক ম্যাটার স্পষ্টভাবে সব ধরণের পদার্থকে এড়িয়ে যায়— এমনকি নিজেকেও। ইংল্যান্ডের লিভারপুলে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ বিজ্ঞান সপ্তাহে ৬ এপ্রিলে এ সংক্রান্ত তথ্য জ্যোতির্বিদরা প্রকাশ করেন।

গবেষণাপত্রটি অনলাইনে arXiv.org এ প্রকাশিতও হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল আবেল ৩৮২৭ এর ডার্ক ম্যাটার ঐ গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের নক্ষত্রগুলো থেকে আলাদা। ক্লাস্টার বদলে দল বোঝায়, এই গ্যালাক্সির দলটি চারটি সংঘর্ষপ্রবণ গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত। পৃথিবী থেকে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ সময়ে মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ রিচার্ড ম্যাসে এবং তার সহকর্মীরা বলেন এ ক্লাস্টারের ডার্ক ম্যাটার হয়ত গ্যালাক্সিগুলোর পেছনে পড়ে গেছে অন্য এক ঝোপ ডার্ক ম্যাটারের সাথে মিথষ্ক্রিয়ায়। কিন্তু বর্তমান তত্ত্বগুলোর কাছেও এ প্রস্তাবনা টেকে না। ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের ভরের অধিকাংশ গঠিত ডার্ক ম্যাটার দিয়ে। সাধারণ (মামুলি অর্থে) পদার্থের সাথে ডার্ক ম্যাটারের একমাত্র মিথষ্ক্রিয়া হল মহাকর্ষ। কেবলমাত্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণের মাধ্যমেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি বোঝা যেতে পারে।

ডার্ক ম্যাটার কী তার চেয়ে বরং আমরা জানি ডার্ক ম্যাটার কী নয়! ডার্ক ম্যাটার কিন্তু প্রতিপদার্থের সাথেও কোনো মিথষ্ক্রিয়া করে না। এমনকি ডার্ক ম্যাটার কৃষ্ণগহ্বরও না। ডার্ক ম্যাটার নামকরণের ডার্ক শব্দটি বোঝায় এটা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা। আমরা এর কিছুই জানি না কিভাবে এটা কী করে! কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবে জানি যে এর অস্তিত্ব আছে। আমরা যে পরিমাণ ভর গ্যালাক্সিগুলোয় দেখি আসলে সে ভর দিয়ে হিসেব করলে মহাকর্ষ প্রভাবের হিসেব মিলে না। মহাকর্ষ দৃশ্যমান ভরের হিসেবের চেয়ে বেশি। সেখান থেকেই আসে আরো কিছু আছে। তাই ডার্ক ম্যাটারকেই কারণ হিসেবে ধরা হয় গ্যালাক্সির অস্তিত্বের কারণ হিসেবে।

দৃশ্যমান ভর আসলে আমাদের মহাবিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ। বাকি ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ৭৩ শতাংশ ডার্ক এনার্জি।

কিন্তু সম্প্রতি চিলিতে অবস্থিত আতাকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারে দিয়ে করা পর্যবেক্ষণে ডার্ক ম্যাটারের অস্বাভাবিক কোনো আচরণ খেয়াল করা যায় নি। যেমনটা আচরণ করার কথা তেমনই ছিল। উল্লেখ্য এই পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি একটি রেডিও টেলিস্কোপ। রেডিও টেলিস্কোপ কাজ করে ভারী নক্ষত্র চিহ্নিত করতে। যেসব নক্ষত্র সাধারণ আলোতে দেখা যায় না, রেডিও টেলিস্কোপে ধরা পড়ার সুযোগ রয়েছে।

আতাকামায় অবস্থিত রেডিও টেলিস্কোপ; image source: European Southern Observatory

তবে রেডিও টেলিস্কোপও কিন্তু ডার্ক ম্যাটারকে ধরতে পারে না। কারণ ডার্ক ম্যাটার আসলে কোনো কিছুর সাথে সংঘর্ষ করে না। বায়ুশূন্য স্থানে অভিকর্ষের প্রভাবে যেমন কোনো কিছুই নিচে পড়তে কোনো বাধা পায় না তেমনি অনেকটা। ডার্ক ম্যাটার কোনো বিকিরণ শোষণও করে না আবার ত্যাগও করে না। অর্থাৎ রেডিও টেলিস্কোপ সরাসরি এদের ধরতে পারবে না। ডার্ক ম্যাটার ধরা পড়ার একমাত্র উপায় মহাকর্ষের প্রভাব। রেডিও টেলিস্কোপ আবার ভারী নক্ষত্র যেমন কোয়াসার, নিউট্রন তারা এদের চিহ্নিত করতে পারে। অতএব এদের সাথে মহাকর্ষের হিসেব করে ইঙ্গিত পাওয়ার উপায় রয়েছে।

ইংল্যান্ডের ডারহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ম্যাসে বলেন তারা দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ডার্ক ম্যাটার যথাযথ অবস্থানেই আছে বলে মনে করেন।

তবে এটি এখনো সম্ভব যে অন্যান্য গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারও আমাদের সংজ্ঞার পর্যবেক্ষণের বাইরে। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণেরও প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গবেষক ম্যাসের দল একটি বেলুন টেলিস্কোপের ডিজাইন করেছেন। অর্থাৎ বেলুনে করে টেলিস্কোপ উপর আকাশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ করবে মহাকাশ। এর নাম দিয়েছেন সুপারবিট (SuperBIT).

বিট উড্ডয়নের মুহূর্ত; image source: sites.physics.utoronto.ca

সুপারবিটের উদ্দেশ্য এ ধরণের শত শত গ্যালাক্সিগুলো ধরে ধরে পর্যায়ক্রমে যাচাই করা কোনগুলোয় এমন অজানা আচরণ করছে ডার্ক ম্যাটার। BIT বলতে বোঝায় Ballon-borne Imaging Telescope. অর্থাৎ, বেলুনে করে যে টেলিস্কোপ ছবি তোলে।

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে তোলা বেলুন টেলিস্কোপের সূর্যদয়ের ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

এ বেলুন টেলিস্কোপ কাজ করবে স্ট্রাটোস্ফিয়ারে। বেলুন টেলিস্কোপের বড় সুবিধা এটা ট্রপোমণ্ডলের ঘন বায়ুর বাধা কাটিয়ে উপর থেকে স্বচ্ছ ছবি পাঠাতে পারবে। স্বচ্ছতম ছবির জন্যই কিন্তু আমরা মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠাই, কিন্তু সে যজ্ঞের খরচও তো মাথায় রাখতে হবে। এদিক থেকে বেলুন টেলিস্কোপ একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান খরচের সাথে তুলনায়। এরা ভূমি থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে গিয়ে কাজ করতে পারে।

সুপারবিটের তোলা ঈগল নীহারিকার ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

আমরা ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে খুবই কম জানি— এটাই সবচেয়ে বড় সংকট। সেহেতু ধাপে ধাপে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে সামনে এগিয়ে যাবার কারণ, এর মাধ্যমে আসলে আমরা আসলে আমাদের  মহাবিশ্বের অতীতের দিকেও অগ্রসর হচ্ছি— কিভাবে শুরু হয়েছিল সবকিছুর।

 

সায়েন্স নিউজ অবলম্বনে।

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

অজানা অদৃশ্য মহাবিশ্ব

আমাদের সূর্য আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ঘূর্ণায়মান বাহুর একপাশে অবস্থান করছে। রাতের আকাশের দিকে খালি চোখে তাকালে আমরা যে এক হাজারের মতো নক্ষত্র দেখতে পাই তার বেশিরভাগই আকাশগঙ্গায় অবস্থিত। খালি চোখে না তাকিয়ে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ব্যবহার করলে চোখের সামনে নক্ষত্রের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। যাকে এখন সাধারণ মানের দূরবীন বলা হচ্ছে একটা সময় কিন্তু বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপও এর সাথে পাল্লা দিতে পারতো না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ধারণা ছিল আকাশগঙ্গা ছায়াপথই আমাদের সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব। ১৯২০ সালের আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার চেয়ে বেশি কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীদের টেলিস্কোপের ক্ষমতাও বাড়তে লাগল। নতুন নতুন শক্তিশালী টেলিস্কোপ আকাশের দিকে তাক করে বিজ্ঞানীরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন।

১৯২০ সালের দিকে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল আবিষ্কার করলেন এই মহাবিশ্ব আকাশগঙ্গা ছায়াপথ চেয়েও অনেক বেশি বড়। আগে যেসব ঝাপসা আলোর বিন্দুকে অনেক দূরবর্তী নক্ষত্র ভাবা হতো, তাদের অনেকগুলোই আসলে আকাশগঙ্গার মতোই আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রতিদিন নতুন নতুন গ্যালাক্সি আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। সেই সময় Fritz Zwicky ছিলেন ক্যালটেকের প্রফেসর। তিনি Coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আশেপাশের অন্যান্য গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কোনো একটি গ্যালাক্সির গতিবেগ পর্যবেক্ষণ করে তাদের মধ্যে কতটুকু ভর আছে সেটি বের করা সম্ভব।

প্রফেসর Fritz Zwicky, coma cluster-এর গ্যালাক্সিগুলোর গতিবেগ মেপে নিয়ে তার মধ্যে ঠিক কতটুকু ভর থাকতে পারে তা হিসেব করে বের করে নিলেন। কিন্তু এই ভরকে দৃশ্যমান ভরের সাথে তুলনা করতে গিয়ে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারলেন না। দৃশ্যমান ভর বলতে বোঝানো হয় গ্যালাক্সির যেসব নক্ষত্র আলো বিকিরণ করে কিংবা যেসব ধূলিকণা, গ্যাসের মেঘ নক্ষত্রের আলোকে আটকে দেয়। মোটকথা গ্যলাক্সির দিকে তাকিয়ে আমরা যেটুকু দেখতে পাই তার মোট ভর। Fritz Zwicky-এর হিসেব অনুযায়ী ক্লাস্টারের মধ্যে গ্যালাক্সিগুলোর যে গতিবেগ ততটুকু গতিবেগ অর্জন করতে হলে গ্যালাক্সিগুলোতে তাদের দৃশ্যমান ভরের প্রায় ১৬০ গুণ বেশি ভর থাকা উচিৎ ছিল।

তার মানে অদৃশ্য কোনো ভর গ্যালাক্সিগুলোর এই গতিবেগের জন্য দায়ী। সেই অদৃশ্য ভরকে কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া গেল না। তিনি অনেকভাবে হিসেব করে দেখলেন, একটি বিশাল পরিমাণ অদৃশ্য ভর না থাকলে Coma cluster-এর ভারসাম্য বজায় থাকত না। তিনি এই অদৃশ্য ভরের নাম দিলেন ‘হারানো ভর’ বা Missing matter।

ধরা-ছোঁয়া যায় এমন প্রায় সবকিছুর ভরই দাঁড়িপাল্লার নীতি ব্যবহার করে মেপে বের করে ফেলা যায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে অকল্পনীয় দূরত্বে অবস্থিত এসব নক্ষত্র কিংবা গ্যালাক্সির ভর বিজ্ঞানীরা ঠিক কীভাবে মাপেন? পৃথিবীর ভর প্রায়  কেজি, সূর্যের ভর প্রায়  কেজি, বৃহস্পতির ভর প্রায়  কেজি, মিল্কিওয়ের ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ভর সূর্যের ভরের প্রায়  গুণ।

কিন্তু এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কাছে গিয়ে গ্যালাক্সিটাকে একটা দাঁড়িপাল্লায় নিয়ে ভর মেপে নেয়ার কোনো উপায় নেই। তাই বিজ্ঞানীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরের অনেক দূরবর্তী পদার্থের ভর মাপেন একটু বাঁকা পথে। পথটা বাঁকা হলেও পদ্ধতিটি খুব সহজ। আমরা জানি একটি বস্তুর ভর যত বেশি হবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ হবে তত বেশি। আর বস্তুটি থেকে দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণও ততই কমে যাবে (বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ এবং ঠিক এ কারণেই সূর্যের চারিদিকে নিজের কক্ষপথে ভারসাম্য বজায় রাখতে বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি। নেপচুনের গতিবেগ সেই তুলনায় অনেক অনেক কম)। তাই আশেপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘ ইত্যাদির গতিবেগ এবং দূরত্ব থেকে খুব সহজেই ভরটুক বের করে ফেলা যায়।

2চিত্রঃ বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ। তাই বুধের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।

একটি ভরকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া পদার্থের আরেকটি উদাহরণ হলো সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। যেসব গ্যলাক্সির একটি অত্যন্ত ভারী কেন্দ্র থাকে এবং গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্র সেই ভারী কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে থাকে তদেরকে বলা হয় সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। তাই ঠিক একইরকম হওয়ার কথা সর্পিলাকার গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর ঘূর্ণন বেগ কেন্দ্রের দিকে নক্ষত্রগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। বিজ্ঞানী ভেরা রুবিন কিন্তু সেরকমটি দেখলেন না।

3চিত্রঃ সর্পিলাকার গ্যালাক্সি।

মিল্কিওয়ের মতো সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করতে করতে তিনি দেখলেন গ্যালাক্সিগুলোর কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে যেমন নক্ষত্র, গ্যাস আর ধুলিকণার মেঘের গতিবেগ কমে যাওয়ার কথা ছিল, তেমনটি হচ্ছে না। বরং গতিবেগ প্রায় সমান সমান।

ভেরা রুবিনের হিসেব অনুযায়ী গ্যালাক্সিগুলোতে দৃশ্যমান যতটুক ভর আছে এবং সেই ভরের জন্য গ্যালাক্সির মধ্যে নক্ষত্র, গ্যাসের মেঘের যতটুক গতিবেগ নিয়ে ঘোরার কথা ছিল তার তুলনায় এ গতিবেগ প্রায় দশগুণ বেশি। তারমানে নিশ্চয়ই গ্যলাক্সির মধ্যে এমন কোনো পদার্থ আছে যা গ্যালাক্সির এই গতির জন্য দায়ী এবং কোনো এক কারণে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। রুবিন হিসেব করে বের করলেন, এমনটা হবে যদি গ্যালাক্সির মধ্যে অদৃশ্য ভরের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের দশগুণ হয়।

অদৃশ্য পদার্থকে এখন বলা হয় ‘Dark matter’। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা শত শত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই সেই একই ব্যাপার। কিন্তু বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পেলেন না। যে বস্তুকে চোখেই দেখা যায় না তাকে খুঁজে পাবেন কীভাবে?

ডার্ক ম্যাটার সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় আর আশ্চর্যজনক বস্তুগুলোর মধ্যে একটি। ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত কোনো পদার্থের সাথে কোনোরকম মিথস্ক্রিয়া করে না। তবে আর কিছুই না হোক ডার্ক ম্যাটারের ভর আছে (এই ভর যেকোনো হিসেবে বিশাল, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন আমাদের মহাবিশ্বের ২৩ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার)। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখেছি, যেকোনো ভর তার আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে। তাই মহাকাশে কোথাও ডার্ক ম্যাটার থাকলে তা নিজের ভরের জন্য আশেপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলবে।

কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র আর আমাদের দৃষ্টির মাঝে যদি ডার্ক ম্যাটার চলে আসে তবে সেই গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র থেকে আসা আলো বেঁকে যাবে। আমরা বুঝে ফেলব মাঝে প্রচণ্ড ভারী কিছু একটা আছে। শুধু সেই ভরকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! ভারী বস্তুর আলোকে বাঁকিয়ে দেয়ার ধর্মকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন Gravitational Lensing।

গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং শুনতে যতটা খটমটে, বাস্তবে ঠিক ততটাই কাজের জিনিস। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা শুধুমাত্র ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন তাই নয়, কোনো জায়গায় ঠিক কতটুকু ডার্ক ম্যাটার আছে, কীভাবে বিন্যস্ত আছে সব বের করতে পারেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একেকটি গ্যালাক্সির মোট ভরের বেশিরভাগই আসলে ডার্ক ম্যাটারের ভর। গ্যালাক্সিগুলোতে নক্ষত্র, ধূলিকণা এবং গ্যাসের মেঘ ছাড়া যেসব ফাঁকা স্থান আছে সেগুলো আসলে ঠিক ফাঁকা নয়, সেখানে আছে ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা রীতিমতো ডার্ক ম্যাটারের ম্যাপও তৈরি করে ফেলেছেন।

4চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ভরের জন্য গালাক্সি থেকে আসা আলো বেঁকে যাচ্ছে।

ডার্ক ম্যাটার খুঁজে পাওয়ার পর পরই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন, এটি তৈরি হয়েছে কী দিয়ে? আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু নাকি অজানা কোনো কণা দিয়ে?

সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের চেনা জানা অণু-পরমাণু দিয়েই তৈরি। শুধু তারা আলো বিকিরণ করে না বলে আমরা দেখতে পাই না। অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি কিন্তু আলো বিকিরণ করে না এমন অনেক পদার্থের কথাই আমরা জানি। সবার প্রথমে আসে ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোল আলো বিকিরণ করে না, প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলে সবকিছু নিজের দিকে টানতে থাকে। গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং ব্যবহার করে তাদের খুঁজে বের করতে হয়।

তারপরেই আসে M.A.C.H.O. বা Massive Compact Halo Object। এরা আসলে ছোট ছোট ভারী নক্ষত্র যারা খুব অল্প আলো বিকিরণ করে। এদেরকেও গ্র্যাভিটেশনাল ল্যান্সিং দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। তাছাড়া আছে Brown dwarf. এরা যথেষ্ট ভারী কিন্তু খুব বেশি আলো বিকিরণ করে না। কিন্তু গ্যালাক্সি আর ক্লাস্টারগুলোতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ এতো বেশি যে এসব কিছুও যথেষ্ট না। এক একটি গ্যালাক্সিতে ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ দৃশ্যমান ভরের প্রায় দশ গুণ। শুরুর দিকে নিউট্রিনো বা এক্সিওন এর কথাও চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু এরা খুবই হালকা ভরের কণিকা। এরপর আর একটি সম্ভাবনাই বাকি থাকে। হয়তো ডার্ক ম্যাটার নতুন ধরনের কোনো কণিকা দ্বারা তৈরি যাদের আমরা এখনো খুঁজে পাইনি।

আমাদের চেনা পরিচিত অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি না হলেও ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্য কীরকম হতে পারে তা বিজ্ঞানীরা বের করেছেন। এরা আলোর মতো দ্রুত গতির নয়। এরা আমাদের পরিচিত সাধারণ সকল পদার্থকে মহাকর্ষ বলে আকর্ষণ করে এবং মহাকর্ষ ছাড়া অন্য কোনোভাবে পদার্থের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না। আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণিকা এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে, আমরা টের পাচ্ছি না। কারণ তারা কোনোভাবেই অণু-পরমাণুকে প্রভাবিত করে না। বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাব্য কণিকার নাম দিয়েছেন WIMP (Weakly Interacting Massive Particle)। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে তারা খুবই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। তাই এখন পর্যন্ত WIMP আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা বসে থাকেননি। আমেরিকার Soudan-এ মাটির নিচে একটি পরিত্যাক্ত লোহার খনিতে প্রায় অর্ধমাইল নীচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। এই ল্যাবে শূন্য কেলভিনেরও কম তাপমাত্রায় ১৬টি জার্মেনিয়াম সেন্সর বসানো আছে। সেন্সরগুলোতে জার্মেনিয়ামের ঘনত্ব খুব বেশি, পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি, প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। সেন্সরটিকে যখন শূন্য কেলভিনের নিচে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এটি অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। কোনো কণা বা রশ্মি এই সেন্সরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেই বিজ্ঞানীরা কণা বা রশ্মির বৈশিষ্ট্য হিসেব করে বের করে ফেলতে পারেন।

এই সেন্সর থেকে খুব সূক্ষ্ম মান পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীপৃষ্ঠে এটি নিয়ে কাজ করার খুব বড় রকমের একটি সমস্যা আছে। অনেকে নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন সূর্য থেকে প্রতিনিয়ত নিউট্রিনো এসে পৃথিবীকে আঘাত করছে। সেই সাথে আছে মিউওন, বিভিন্ন মহাজাগতিক রশ্মি, পৃথিবীপৃষ্ঠে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন রশ্মি। সেন্সরগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে যেকোনো ধরনের কণার আঘাতেই বিক্ষেপ দেখাবে। এতসব সমস্যাকে পাশ কাটাতে বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছেন। মাটির বিভিন্ন স্তর ভেদ করে সব ধরনের কণা এবং রশ্মি সেন্সর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন পরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা জার্মেনিয়াম সেন্সরে কোনো একদিন একটি WIMP কণিকা আঘাত করবে। যদিও WIMP কণিকা অণু-পরমাণুর সাথে এতই দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করার কথা যে, জার্মেনিয়াম সেন্সর দিয়ে WIMP কণিকা ধরা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা এখনো WIMP কণিকা ধরতে পারেননি, এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

5চিত্রঃ ভূমির গভীরে এই স্থানে অবস্থিত গবেষণাগার। পূর্বে এটি স্বর্ণ উত্তোলন খনি ছিল।

শুনতে অবাক লাগবে, মহাবিশ্বের প্রায় ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার হলেও টেলিস্কোপ দিয়ে দৃশ্যমান আলো ব্যবহার করে আমরা যতটুকু বস্তু দেখতে পাই সেটি মহাবিশ্বের ৪ শতাংশ মাত্র। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে না থেকে ছাড়াছাড়াভাবে ছড়িয়ে থাকার কারণও ডার্ক ম্যাটার। কঙ্কাল যেমন দেহের আকারের পেছনে কাজ করে ডার্ক ম্যাটারের ক্ষেত্রেও সেই একই ব্যাপার। এখানে ২৩ + ৪ = ২৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছে মাত্র। সেটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে। মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল সেটা অজানা এক ধরনের Energy। বিজ্ঞানীরা বলেন ‘Dark Energy’।

একসময় ভাবা হতো আমাদের মহাবিশ্ব স্থির। সর্বপ্রথম ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখলেন মহাবিশ্ব মোটেও স্থির নয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আলোর শিফট দেখে বলে দেয়া যায় তারা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে নাকি দূরে সরে যাচ্ছে। রেড শিফট অর্থাৎ আলো লালের দিকে সরে গেলে বুঝতে হবে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ব্লু শিফট হলে বা নীলের দিকে হলে বুঝতে হবে এগিয়ে আসছে। এডউইন হাবল আকাশের সবদিকের গ্যালাক্সি থেকেই রেড শিফট পেলেন। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে পৃথিবী বুঝি মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর বাকি সব পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা গেলো পৃথিবী থেকে একটি গ্যালাক্সি যত দূরে তার দূরে ছুটে যাওয়ার হারও ততই বেশি। যার একটিই অর্থ হতে পারে- পৃথিবী মোটেই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, পৃথিবীসহ মহাবিশ্বের সবকিছু একটি অন্যটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সোজা বাংলায়, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কৃত হবার পর সবার আগে যেটা মাথায় আসে, একটা সময় মহাবিশ্বের সবকিছু নিশ্চয়ই এক জায়গায় একত্রিত ছিল। তারপর একদিন হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ বা অন্য কোনো কারণে সব আলাদা হয়ে বাইরের দিকে ছুটে যেতে শুরু করলো। বিজ্ঞানীরা এ বিস্ফোরণকে বলেন বিগ ব্যাং। বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের সবকিছু একবিন্দুতে একত্রিত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিগ ব্যাং-এর প্রবল ধাক্কার ফলাফল হিসেবে মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই মহাকর্ষ বল সম্প্রসারণের বেগটাকে কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই একসময় সম্প্রসারণের বেগ কমতে কমতে মহাবিশ্ব স্থির হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে আবার সংকোচন শুরু হবে। এর মাঝে বলে নেই, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুধুমাত্র স্থানের মধ্যে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা না। সেরকম কিছু হলে পৃথিবী ধীরে ধীরে সূর্য থেকে দূরে সরে যেতো। স্থান শাশ্বত কিছু নয়। বিগ ব্যাং এর ফলে পদার্থের সাথে সাথে স্থানও সৃষ্টি হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বলতে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, ধূলিকণা ইত্যাদির মধ্যবর্তী স্থানের সম্প্রসারণ বোঝানো হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের মহাবিশ্বের পরিণতি কী? একটি সম্ভাব্য উত্তর হবার কথা ছিল- এখন মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে এ সম্প্রসারণের বেগ কমে আসার কথা এবং শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে হতে আবার একটি বিন্দুতে চলে আসার কথা। বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই বছর কয়েক আগে কয়েকজন পদার্থবিজ্ঞানী ভাবলেন সম্প্রসারণ কমে আসার হারটা বের করা যাক। সেটা বের করতে হলে প্রথমেই জানা দরকার বিগ ব্যাং-এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ কেমন ছিল।

বর্তমান সময়ে বসে কীভাবে অতীতের সম্প্রসারণ বেগ বের করা যায়? তার জন্য খুব সহজ উপায় আছে। ধরা যাক, এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে দশ হাজার আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্যালাক্সি থেকে আলো আসছে। তার মানে হচ্ছে, গ্যলাক্সিটা থেকে দশ হাজার বছর আগে যে আলোটুকু পৃথিবীর দিকে রওনা দিয়েছিল সেই আলোটুকু পৃথিবী আর গ্যালাক্সিটার মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করে এই মাত্র আমাদের কাছে এসে পৌঁছলো। আমরা যদি এই আলোর রেড শিফট মাপি তাহলে পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়ার যে বেগ পাবো সেটা হচ্ছে দশ হাজার বছর আগের সম্প্রসারণের গতিবেগ। বর্তমানে সেই গতিবেগ হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনই সেটি জানার কোনো উপায় নেই। সেটি জানতে হলে আরো দশ হাজার বছর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক একই পদ্ধতিতে আরও কাছের বা দূরের গ্যালাক্সি বা আলোকিত কোনো বস্তুর রেড শিফট মেপে বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণের বেগ বের করা সম্ভব (খুব সূক্ষ্মভাবে রেড শিফট মাপার জন্য দরকার খুব উজ্জ্বল লক্ষ্যবস্তু। বিজ্ঞানীরা তাই মহাকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল টাইপ-১ সুপারনোভা ব্যবহার করেন)। বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা আলাদাভাবে প্রায় ৬০ টি সুপারনোভার রেড শিফট মেপে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার মোটেই কমে যাচ্ছে না, বরং তা ত্বরিত হারে বাড়ছে।

বারবার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা একই ফল পেলেন। যার অর্থ হচ্ছে মহাবিশ্বে এক ধরনের এনার্জি বিদ্যমান যা বিকর্ষণধর্মী বল সৃষ্টি করে স্থানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন Dark Energy। এই ডার্ক এনার্জিই মহাবিশ্বের বাকি ৭৩ শতাংশ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি বিগ ব্যাং-এর সাথে সাথেই সৃষ্টি হয়েছিল। সম্প্রসারণের হার বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম ৯ বিলিয়ন বছর মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ঠিক তার পরপরই হঠাৎ করে সম্প্রসারণের হার বাড়তে শুরু করেছিল এবং গত পাঁচ বিলিয়ন বছর ধরে এ হার বেড়েই চলেছে।

যার অর্থ হচ্ছে- প্রথমদিকে মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আর সাধারণ পদার্থের মহাকর্ষের আধিপত্য ছিল। তাই সম্প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। যতই সময় গেল আর মহাবিশ্ব বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে ডার্ক এনার্জির আধিপত্য শুরু হলো। সম্প্রসারণের বেগ আবার বেড়ে যেতে শুরু করল। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা উচ্চ তাপমাত্রা আর অধিক ঘনত্বে (মহাবিশ্বের শুরুর অবস্থা) ডার্ক এনার্জির ক্রিয়া ধর্তব্যের মাঝে আসবে না। তাপমাত্রা যতই কমে আসবে, ঘনত্ব যতই কমে আসবে, ডার্ক এনার্জি ততই মহাকর্ষ বলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে। পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে এ কারণেই আবার সম্প্রসারণের বেগ বাড়তে শুরু করেছিল।

ডার্ক এনার্জিকে বলা যায় স্থানের এক রহস্যময় ধর্ম যা সম্পর্কে এখনো খুব বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীরা এখনো জানে না ডার্ক এনার্জি এভাবেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকবে নাকি কোনো একসময় দিক পরিবর্তন করে ফেলবে। তাই শেষ পর্যন্ত মহাবিশ্ব সংকুচিত হবে, নাকি এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে তা এ মুহূর্তেই বলা সম্ভব নয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন মহাবিশ্ব এভাবেই প্রসারিত হতে থাকবে।

সেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীব্যাপী পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি Unified তত্ত্ব বের করার চেষ্টা করে আসছেন। একগুচ্ছ সমীকরণ, যার মাধ্যমে পুরো মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাবে। আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ত্রিশ বছর চেষ্টা করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। তার পরে এখনো বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। যতই তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন, মহাবিশ্ব যেন ততই নতুন নতুন রহস্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। বাস্তব মহাবিশ্ব যে যেকোন রহস্য উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশেই কম না সেটা আমরা মাঝে মাঝেই ভুলে বসে থাকি।

তথ্যসূত্র

১) http://pics-about-space.com/planet-mars-black-and-white?p=2#img7875126582525238326

২) en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy

৩) en.wikipedia.org/wiki/Solar_mass

৪) www.sudan.umn.edu/cdms/

৫) cdms.berkeley.edu/experiment.html