মেসন তত্ত্ব ও একজন ইউকাওয়া

কল্পনা করুন আপনার হাতে দুইটি লোহার দণ্ড আছে। যদি দণ্ড দুটি হাত থেকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? যদি সেগুলো বেঁধে রাখা না হয় তাহলে আলাদা হয়ে নীচে পড়ে যাবে। কিন্তু সেই লোহার দণ্ডের পরিবর্তে যদি এবার চুম্বকের দণ্ড নেয়া হয় তবে কী ঘটবে? এবার কিন্তু আর আলাদা হয়ে যাবে না। চুম্বকদ্বয় পরস্পর আকর্ষণ বলের সাহায্যে একত্রে লেগে থাকবে। অর্থাৎ কোনোকিছুকে একত্রে রাখতে হলে অবশ্যই একটি আকর্ষণ বলের প্রয়োজন। এবার কল্পনার পরিসীমা বিবর্ধিত করে কোয়ান্টাম জগতে যাওয়া যাক।

কণা হিসেবে পরমাণু হলো নিরপেক্ষ এবং স্থায়ী। এর মাঝে আছে ধনাত্মক নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে এর চারিদিকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করছে। ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস বিপরীত চার্জে চার্জিত বলে তারা পরস্পরকে আকর্ষণ বলে আকর্ষণ করছে। ইলেকট্রন এ কারণেই তার গতির জন্য ছিটকে পরমাণুর বাইরে চলে আসতে পারে না, নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাঁধা থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস কোনো মৌলিক কণা নয়। এর মাঝে আছে প্রোটন ও নিউট্রনের সমাহার।

এদের মাঝে নিউট্রন নিরপেক্ষ কণা, আর প্রোটন ধনাত্মক কণা। যেহেতু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে সেহেতু দুটি প্রোটনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করে। এতে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব নষ্ট হবার কথা। কিন্তু তা দেখা যায় না বরং ভারী কিছু নিউক্লিয়াস ছাড়া প্রায় সব নিউক্লিয়াসই দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন ধরে নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে ১৯৩২ সালে পরিত্রান পান।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী চ্যাডউইক কর্তৃক আরেকটি নিউক্লিয়ন (নিউট্রন) আবিষ্কার হবার পর নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা কিছুটা স্পষ্ট হতে পেরেছিলেন। এর কিছু সময় পরেই এশীয় বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া তার বিখ্যাত ‘মেসন তত্ত্বে’র মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব ব্যাখ্যা করেন। নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের জন্য কোনো একধরনের বল দায়ী এবং সেই বলের বাহক কণা হিসেবে কোনো কণা কাজ করে। এই তথ্য ধীরে ধীরে জানা যায়। তবে মেসন তত্ত্ব প্রমাণিত হতে আরো ১৫ বছর সময় লেগে যায়।

১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া জাপানের কিয়োটো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে অবশ্য তার নাম হিদেকী ইউকাওয়া  ছিল না, ছিল হিদেকী ওগাওয়া। স্কুল জীবনে তেমন ভালো ছাত্র না হলেও গণিতের প্রতি হিদেকীর অপার আগ্রহ ছিল। তবে কলেজ পর্যায়ে এসে হিদেকীর গণিতের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসে।

একবার তিনি ভিন্ন নিয়মে অঙ্ক করাতে তার শিক্ষক সেটা কেটে দেয়। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে হিদেকী গণিত পড়ার বা গণিতবিদ হবার ইচ্ছা বাদ দেন। আবার কলেজ পর্যায়েই একদিন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার জন্য তাকে ভৎসর্না শুনতে হয়েছিল। তাই রাগ করে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা নিয়েও কাজ করবেন না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ইউকাওয়া।

অসম্ভব মেধাবী এবং খামখেয়ালী এই বিজ্ঞানী কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঝুঁকে পড়েন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। ১৯৩২ সালে বিয়ে করার পর নিজের পারিবারিক নাম ‘ওগাওয়া’ থেকে ‘ইউকাওয়া’তে পরিবর্তন করেন এবং ‘হিদেকী ইউকাওয়া’ রূপে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা করে তিনি তার মেসন তত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়নের মাঝে আকর্ষণ বল কীরূপে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কণা-পদার্থবিদরা জানতে পারে নতুন এক শ্রেণির কণার নাম।

নিউক্লিয়াসে পরমাণু ভেদে অনেক সংযুক্তির প্রোটন থাকে এবং কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ বলের প্রভাবে তারা স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের বিপরীতে কাজ করতে পারে। এই বলের মাধ্যমে তারা একত্রে থাকতে পারে। এই বলকে বলে রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বল। আরো একপ্রকার সবল নিউক্লীয় বল আছে যা কোয়ার্ক-গ্লুয়ন এর মধ্যে কাজ করে। উল্লেখ্য কোয়ার্ক-গ্লুয়নের অবস্থান প্রোটন ও নিউট্রনের মাঝে। এখানে বিদ্যমান সবল বলের নাম মৌলিক সবল নিউক্লীয় বল।

নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের সাথে মৌলিক সবল নিউক্লীয় বলের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে নিউক্লীয়নের উপর কাজ করা রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের। হিদেকী ইউকাওয়া দেখেছিলেন এই রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের বাহক কণার ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি হবে। তাই গ্রীক শব্দ ‘মেসো’ অর্থ মাঝামাঝি থেকে এই বাহক কণার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘মেসোট্রন’ কণা। পরবর্তীতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কর্তৃক কণাটির নাম সংশোধিত হয়ে হয়। তিনি এর পরিবর্তিত নাম প্রদান করেন ‘মেসন’ (Meson) কণা।

মেসন কিন্তু একক কোনো কণা নয়। এটি মূলত কণাদের একটি শ্রেণি। মেসন শ্রেণির কণাদের মাঝে অনেক কণা আছে। যেমনঃ পাই মেসন (পায়ন), কায়ন, রো মেসন ইত্যাদি। হিদেকী ইউকাওয়ার দেয়া মেসন তত্ত্ব বর্তমানে এসে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক ধারণা মতে সকল মেসন কণারা যেহেতু বল বাহক কণা এবং তাদের সংখ্যায়ন বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সাথে মিলে যায় তাই তারা বোসন শ্রেণির কণা। অর্থাৎ সকল মেসনই বোসন, তবে সকল বোসন মেসন নয়।

বোসন কণারা বলবাহক কণা, অর্থাৎ তারা বল বহন করে। যেকোনো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা থেকে সর্বদাই অগণিত বোসন কণা নির্গত হচ্ছে এবং তা পুনরায় ঐ ফার্মিয়ন কর্তৃকই শোষিত হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি ফার্মিয়ন কণার পাশে আরেকটি ফার্মিয়ন কণা চলে আসে তখন এক ফার্মিয়ন কর্তৃক নিঃসৃত বোসন কণা আরেক ফার্মিয়ন কর্তৃক শোষিত হয়। এই সময়ই আকর্ষণ-বিকর্ষণের ঘটনা ঘটে।

নিউক্লিয়াসের প্রতিটি প্রোটন থেকে সর্বদাই মেসন কণা নিক্ষিপ্ত হয়, যে মেসন কণা পুনরায় অপর প্রোটন কর্তৃক শোষিত হয়। ফলে তাদের মাঝে একটি আকর্ষণ বল কাজ করে। সকল পরিস্থিতিতে এরকম হলে দুটি প্রোটনকে কখনোই আলাদা করা যেত না। কিন্তু এরকম হয় না।

প্রোটন-প্রোটনের এই আকর্ষণ বল খুবই অল্প পরিসরে বিরাজমান থাকে। শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই এই আকর্ষণ বল কাজ করে। প্রোটন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন নিউক্লিয়াসের ব্যাসের চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন আর এই আকর্ষণ বল কাজ করে না। ঐ পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করবে। কারণ তখন কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বল কাজ করবে।

মেসন শ্রেণির কণাদের আয়ু খুবই কম। এ ধরনের কণা এক প্রোটন হতে নির্গত হয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এদের আয়ুষ্কালে এরা যত দূর যেতে পারে অন্য প্রোটনটি যদি সেই সীমার মাঝে থাকে তবেই আকর্ষণ বল কার্যকর হয়। অন্যথায় এই আকর্ষণ বল কাজ করে না।

আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন নিউক্লীয়নগুলো আকর্ষিত হয় তখন কি বিকর্ষণ বল কাজ করে না? অবশ্যই করে। কিন্তু আকর্ষণ বলের মান বিকর্ষণ বলের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিকর্ষণ বল লোপ পেয়ে আকর্ষণ বলই সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ লব্ধির দিক থেকে আকর্ষণ বল জয়ী হয়।

যেহেতু এই আকর্ষণ বল বিশাল একটি বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে তাই এখান থেকে সহজেই বোঝা যায় এই আকর্ষণ বল কতটা শক্তিশালী। একারণেই এর নাম সবল নিউক্লীয় বল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল মৌলিক বলগুলির মাঝে এই বল শক্তিশালী।

চিত্রঃ প্রোটন ও নিউট্রনের আভ্যন্তরীণ গঠন।

আধুনিক ধারণা মতে মেসন কণা একটি কোয়ার্ক কণা ও একটি অ্যান্টি-কোয়ার্ক কণা দ্বারা গঠিত। যেমনঃ পায়ন কণা একটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। আবার কোয়ার্কোনিয়ামগুলোও একপ্রকার মেসন কণা।

কোয়ার্কোনিয়াম হচ্ছে একটি কোয়ার্ক ও ঐ কোয়ার্কেরই অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। যেমনঃ একটি বটম কোয়ার্ক ও একটি বটম অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা যে বটমোনিয়াম গঠিত হয় তার নাম এপসিলন মেসন। ইউকাওয়া যে বাহক কণা কল্পনা করেছিলেন তার ভর তিনি ধরেছিলেন ১০০ MeV/c2 এর কাছাকাছি। বর্তমানে দেখা গেছে, সবচেয়ে হালকা মেসনের ভর ১৩৪.৯ MeV/c2 এবং সবচেয়ে ভারী মেসন হলো ৯.৪৬০ GeV/c2 ভরের।

১৯৩৪ সালে আবিষ্কৃত হবার পর ইউকাওয়া কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মেসন কণার খোঁজ শুরু হয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৬ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কর্তৃক মিউয়ন কণা আবিষ্কৃত হয়। এর ভর মেসন কণার ভরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই একে মেসন মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে এটি ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা ২য় প্রজন্মের একটি লেপটন মাত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিউয়নকে এখনো ভুল করে অনেকে মিউ মেসন বলে ডেকে থাকে।

সর্বপ্রথম প্রকৃত মেসন কণার খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালে। প্রথম জ্ঞাত মেসন কণার নাম হচ্ছে পাই-মেসন। এই মেসন কণা পাবার পরপরই ১৯৪৯ সালে হিদেকী ইউকাওয়াকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মাঝে হিদেকী ইউকাওয়ার নাম অত্যন্ত স্মরণীয়। কণা-পদার্থবিদ্যায় হিদেকী ইউকাওয়ার হাত ধরেই উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা জাপানি কণা-পদার্থবিদ। তন্মধ্যে ৩য় প্রজন্মের কোয়ার্কের ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী মাসাকাওয়া এবং কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী নিশিজিমার নাম অন্যতম।

হিদেকী ইউকাওয়া জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Yukawa Institute for Theoretical Physics যা এখনো কণা-পদার্থবিদ্যা, স্ট্রিং তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান। ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হিদেকী ইউকাওয়া মৃত্যুবরণ করলেও বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও তিনি একটি স্মরণীয় নাম।

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Meson
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mesons
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Strong_interaction
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_force
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Pion
  6. https://en. wikipedia.org/wiki/Hideki_Yukawa
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Yukawa_Institute_for_Theoretical_Physics
  8. http:// curtismeyer.com/material/lecture.pdf
  9. http://minimafisica.biodec.com/Members/k/machleidt-potentials.pdf

featured image: globalfirstsandfacts.com

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।