মূত্র থেকে প্লাস্টিক

মহাকাশ নিয়ে মানবজাতির তুমুল আগ্রহ। তারই ধারাবাহিকতায় স্পেস-এক্স এর তত্ত্বাবধায়নে এগিয়ে যাচ্ছে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের প্রস্ততি। মঙ্গল গ্রহে যাত্রা কিংবা অন্য যেকোনো গ্রহে যাত্রা যথেষ্ট দীর্ঘ হবে। সেখানে অবশ্যই থাকবে বস্তু ও সরঞ্জামের সমস্যা। তাই সকল বস্তু পূণর্ব্যবহা্রের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত থাকতে হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীরা মূত্র থেকে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত পানি পান করে থাকেন। মঙ্গল গ্রহের দীর্ঘ যাত্রায় সফল হতে চাইলে নভোচারীদের কাছে বিদ্যমান সবকিছুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সাউথ ক্যারোলিনার ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন এক প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে মূত্র ও নিঃশ্বাসের সাথে ত্যাগ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে প্লাস্টিক বানানো সম্ভব।

এ প্রক্রিয়ায় Yarrowia lipolytica  নামক ইস্ট ব্যবহার করা হয়। শুরুতে মূত্র থেকে প্রাপ্ত নাইট্রোজেন ও নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টকে প্রদান করা হয়। ইস্টকে এমনভাবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারং করা হয়েছে যেন তা নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের পর পলিএস্টার মনোমার তৈরী করে। এসকল মনোমার থেকে তৈরী হয় প্লাস্টিক পলিমার। প্রাপ্ত প্লাস্টিক একটি থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে ব্যবহার্য বস্তু তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

চিত্র: ঈস্ট ব্যবহার করে মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে প্লাস্টিক উৎপাদন

উক্ত ইস্টের ভিন্ন একটি স্ট্রেইন অনুরূপ প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে  মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড উৎপাদনে সক্ষম। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মানবদেহের জন্য অপরিহার্য এক উপাদান যা আমরা নিজেরা তৈরী করতে পারি না, খাদ্যবস্তু থেকে পাই।

নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টের গ্রহণ উপযোগী করার জন্য সায়নোব্যাকটেরিয়া বা শৈবাল ব্যবহৃত হয়।

তথ্যসূত্র: BBC Focus

ত্বকের কোষ থেকে সন্তান উৎপাদন

বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বসে নেই। তারা নিত্যনতুন চিন্তা ভাবনা করে চলেছেন। বিজ্ঞানীদের নানা কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয় যা আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক জীবেরই প্রজনন হয়। প্রাণীদের ক্ষেত্রে সেই প্রজনন ঘটে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে। যৌনক্রিয়ার সময় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু মিলিত হয় এবং নিষেকের পর ভ্রূণ গঠিত হয়। সেই ভ্রূণ পরিণত হয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এটাই প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজননের সরল একটি বর্ণনা।

কিন্তু বিজ্ঞান তো এতটুকুতেই থেমে নেই। তারা মানবদেহের প্রজনন ক্রিয়া বোঝার জন্য অনরবত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার ফলস্বরূপ ১৯৯৭ সালে আমরা পেয়েছি ‘ডলি’কে। ডলি ভেড়ার কথা আমরা সবাই জানি। ডলির মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা প্রথম কোনো স্তন্যপায়ীকে ক্লোন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর আগে ব্যাঙের ক্লোন করা হয়েছিল।

ডলির ক্লোন করা ছিল প্রজনন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ। তারপর আমরা দেখেছি টেস্টটিউব শিশু। এখানে নারী ও পুরুষের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দেহের বাইরে মিলিত করা হয়। কিন্তু ত্বকের কোষ? এটি নিশ্চয় পরোক্ষ হোক আর প্রত্যক্ষ হোক প্রজননের মতো কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যদি বলা হয় ত্বকের কোষ থেকে শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণু তৈরি সম্ভব তাহলে হতবাক হতেই হয়।

চিত্র: ল্যাবরেটরিতে তৈরি ডিম্বাণু

বিজ্ঞানী হাইয়াশি ইঁদুরের ত্বক কোষ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তা থেকে ইঁদুরের সন্তানের জন্ম হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষেত্রেও এটি সম্ভব হবে। এমন অনেক দম্পতি আছেন যাদের সন্তান হয় না। অনেক সময় দেখা যায় পুরুষের শুক্রাণুতে সমস্যা রয়েছে। আবার অনেক সময় নারীর ডিম্বাণুতেও সমস্যা দেখা দেয়। আবার বয়স হয়ে গেলে নারীরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে যায়, কারণ তখন তাদের ডিম্বাণু তৈরি হয় না।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ল্যাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব। তাই তখন যেকোনো নারী অথবা পুরুষ শুধুমাত্র একটু রক্ত দিলেই তা থেকে তৈরি হতে পারে তাদের সন্তান। এমনকি যারা সমলিঙ্গ বিবাহিত তারাও তাদের জৈবিক সন্তান পেতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত মানুষের উপর এটি প্রয়োগ করা হয়নি।

হাইয়াশি এই পদ্ধতিটির মূল কঠামো পেয়েছিলেন ইয়ামানাকার গবেষণা থেকে। জাপানের কয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ামানাকা গবেষণা করে বের করেছিলেন কীভাবে যেকোনো কোষকে স্টেম কোষে রূপান্তরিত করা যায়। এ আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

প্রথমে হাইয়াশি একটি পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের লেজ থেকে কোষ নেন। তারপর সেই কোষকে রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে মেশান। সেই রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে থাকে চার ধরনের জিন। এগুলো ঐ কোষকে স্টেম কোষে পরিণত করে। স্টেম কোষ ডিম্বাণু তৈরিতে সক্ষম।

এই ডিম্বাণুকে পরিণত হিসেবে করার জন্য সঠিক পরিবেশ দরকার। বিজ্ঞানীরা এজন্য ডিম্বাণু তৈরিতে প্রস্তুত সেই স্টেম কোষকে জীবিত ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করান। কিন্তু তাতে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ডিম্বাণুটি পুরোপুরি তৈরি করতে ডিম্বাশয়েরর উপর নির্ভর করইতে হচ্ছে। এবার তারা ইঁদুরেরে ডিম্বাশয়ের কোষ নিয়ে তা সেই স্টেম কোষটির সাথে রাখলেন যেন স্টেম কোষটি মনে করে সে ডিম্বাশয়ে আছে।

পাঁচ সপ্তাহে ডিম্বাণুটি পরিণত হলে এটিকে একটি স্বাভাবিক শুক্রাণুর সাথে মিলিত করেন। উৎপন্ন ভ্রূণ একটি ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করান। এই গবেষণায় আটটি ইঁদুর টিকে থাকে। পরবর্তীতে এই ইঁদুরগুলো নিজেরা বংশবৃদ্ধি করে।

চিত্র: কৃত্রিম ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়া ইঁদুর

আমেরিকার ১০% নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম। অনেকে তখন আইভিএফ তথা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের শরণাপন্ন হন। আইভিএফকে আমরা সবাই টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি নামে চিনি। এই পদ্ধতিটি অনেক ব্যয়বহুল। এতে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে। তার উপর শতকরা ৬৫ ভাগ সময় এটি ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রীর যেকোনো একজনের জনন কোষ সুস্থ না থাকলে তখন শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণুদাতা খুঁজতে হয়। যা সকলে গ্রহণ করতে চান না। কারণ এতে যেকোনো একজন (পুরুষ কিংবা নারী) সন্তানটির জৈবিক অভিভাবক হওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে বাবা মা উভয়ই সন্তানের জৈবিক অভিভাবক হতে পারেন। এতে নারীদের কৃত্রিমভাবে হরমোন দেয়া হয় যেন তিনি পরিমাণে ডিম্বাণু তৈরি করে। তবে এই অতিরিক্ত হরমোন প্রদানে নারীদেহে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হয় কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে এটি করা সহজ হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এত সহজ নয়। কারণ ইঁদুরের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে পাঁচ দিন। আর মানুষের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে ৩০ দিন। এতদিন ধরে ডিম্বাণুটিকে ঠিক রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা করা শুরু করে দিয়েছেন। মারমোসেট বানর নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এই বানরের গর্ভ ধারণে ১৪০ দিন সময় লাগে। তবে এখন বানরের পরিবর্তে শুকরও ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ শুকরের ভ্রূণের গঠনের ধাপ মানুষের সাথে মিলে। আর শুকর বানরের চেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ডিম্বাণুকে পরিণত করার জন্য ডিম্বাশয়ের কোষ লাগে। বিজ্ঞানী হায়াসী চাইছেন ভিন্ন কিছু। যে কোষটি ডিম্বাণু পরিণত করার সিগন্যাল দেয় সেটিকে শনাক্ত করতে চাইছেন। স্টেম কোষ থেকে সেই কোষটি তৈরি করার পদ্ধতিও তিনি বের করতে চান। যেন ডিম্বাণু তৈরি থেকে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়াটি গবেষণাগারে সম্পন্ন করা যায়। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন ডিম্বাণুগুলোকে গবেষণাগারে পরিণত করলে কিছু সমস্যা থেকে যাবে। এতে হয়তো দুর্বল শুক্রাণু তৈরি হতে পারে।

চিত্র: সবকিছু সম্পূর্ণরূপে গবেষণাগারে তৈরি করলে দেখা দিতে পারে সমস্যা।

শুক্রাণু তৈরিতে সক্ষম স্টেম সেলকে সরাসরিই যদি শুক্রাশয়ে স্থানান্তর করা যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের প্রজননের সময় যে শুক্রাণুগুলো সুস্থ শুধু সেগুলোই নির্বাচিত হয় এবং নিষিক্ত হয়। গবেষণাগারে অযোগ্য শুক্রাণু দ্বারা নিষেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তারা কৃত্রিমভাবে তৈরি শুক্রাণু শুক্রাশয়ে স্থাপনের পক্ষপাতী।

অনেকে এই কৃত্রিম ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরিতে সম্মতি দেন না। কারণ এতে বিকলাঙ্গ ও দুর্বল সন্তান জন্ম নিতে পারে। শিশু হয়তো পরবর্তীতে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এতে মূল্যবোধজনিত কিছু সমস্যাও থেকে যায়। কারণ এই পদ্ধতিতে যেকোনো ব্যক্তির কোষ নিয়ে তার সম্মতি ছাড়াই সন্তান তৈরি করা যায়। নিজের অজান্তেই মানুষ হয়ে যেতে পারে সন্তানের পিতা-মাতা।

এভাবে অতি সহজে মানুষ তৈরি মানুষের জীবনের গুরুত্ব কমিয়ে দিবে। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান কমে যেতে পারে সহজে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো এতে একজন মানুষের কোষ থেকেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করে সন্তান তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সে সন্তানের মা ও বাবা একজনই হবে।

এসব দিক চিন্তা করে ভ্রূণ গবেষণায় টাকার অনুদান কমিয়ে দেয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসন এটাকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এটিকে আবারো কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে দেশ ভেদেও গবেষণা নির্ভর করে। যেমন জাপানে ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা নিষেধ। কিন্তু ইজারাইলে এ নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই বরং এতে উৎসাহ দেয়া হয়।

তবে এই গবেষণার ভালো ফলগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সন্তান জন্মদানে অক্ষম স্বামী-স্ত্রী এই পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে পারে। আবার এপিজেনেটিক্সে পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নানা রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। \

তাই সকল পক্ষের সাথে বসে এই গবেষণা নিয়ে গভীর আলোচনা করা দরকার। এই গবেষণার সুফল যেন আমরা ভোগ করতে পারি এবং এর খারাপ দিক থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারি, এগুলোই যেন হয় এ সংক্রান্ত গবেষণার ভবিষ্যৎ।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান, মার্চ ২০১৮

featured image: truthpraiseandhelp.wordpress.com

বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

রোগব্যাধী ও মৃত্যু থেকে দূরে থাকার জন্য বর্তমানে আমাদের আছে বৈচিত্র্যময় ও বিশাল পরিমাণ ওষুধের সরবরাহ। মজার ব্যাপার হলো জীবন রক্ষাকারী অনেক ওষুধ তৈরী হয় প্রাণঘাতী বিভিন্ন বিষ থেকে।

চিত্র: বোটুলিনাম বিষের ত্রিমাত্রিক গঠন।

পাশের চিত্রটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদানের ত্রিমাত্রিক গঠন। এই বিষাক্ত যৌগটির মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ, আস্ত একটি দেশের সকল মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। এক কেজি পরিমাণ এই বিষ সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষকে মারতে সক্ষম। এই বিষ এতটাই বিপদজনক যে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় এটিকে উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষের প্রতি কেজির মূল্য ১০০ ট্রিলিয়ন ইউরো। যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া সবচেয়ে দামী ও ব্যয়বহুল উপাদান।

মারাত্মক এই উপাদানটি হলো বোটুলিনাম বিষ। বোটক্স (Botox) নামেই অধিক পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সসেজ জাতীয় খাদ্যে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়ায় বোটক্স আবিষ্কৃত হয়। ল্যাটিন ভাষায় সসেজ মানে হলো বোটুলাস। এখান থেকেই এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে।

বিষের বিষাক্ততা মাপা হয় আছে LD50 স্কেলে। বিষ প্রয়োগের পর বিষ দ্বারা আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মারতে কত পরিমাণ সময় লাগে তার উপর ভিত্তি করে এই স্কেল তৈরি করা হয়েছে। এই স্কেলে বোটক্সের মান হলো ০.০০০০০১ মিলিগ্রাম/কেজি। অর্থাৎ একটি ৭০ কেজি ভরের মানুষকে মারতে আপনার মাত্র ০.০০০০৭ মিলিগ্রাম বোটক্স প্রয়োজন হবে।

অন্যভাবে বললে আপনার জন্য প্রাণঘাতী এক ডোজ বোটক্সের পরিমাণ এক কিউবিক মিলিমিটার বায়ু থেকেও কম। বোটুলিনাম বিষ শ্বসনক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিকে মেরে ফেলে। এটি নিউরোটক্সিন। স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে কোষ ও কোষের অভ্যন্তরের প্রোটিন ধ্বংস করতে শুরু করে।

সাধারণত স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন দ্বারা স্নায়ুর অনুভূতি তড়িৎ সংকেত বা Electric Impules হিসেবে স্নায়ুসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে এটি বিশেষ এক রাসায়নিক সংকেতে পরিবর্তিত হয়ে স্নায়ুসন্ধি অতিক্রম করে এবং পেশীকোষে যায়। পেশীকোষের গিয়ে এই রাসায়নিক সংকেত পুনরায় তড়িৎ সংকেতে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পেশী কোষ সংকোচিত হয়।

অ্যাক্সন নামক যে প্রান্ত দ্বারা একটি স্নায়ুকোষ, পেশীকোষের সাথে সন্ধি সৃষ্টি করে সেখান থেকে এসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রোগী পেশী সঞ্চালনে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত্র হয়। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের মাধ্যমেই পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সময় লাগতে পারে মাসের পর মাস।

চিত্র: স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে বিদ্যমান স্নায়ুসন্ধি।

বোটক্স এত বিষাক্ত হওয়ার পরেও এত জনপ্রিয় কীভাবে হলো? বয়স বৃদ্ধির সাথে মানুষের চেহারায় ও ত্বকে যে ভাঁজ সৃষ্টি হয় তা এই বিষ দূর করতে সক্ষম। যেসকল স্নায়ুকোষ ত্বকে ভাঁজ সৃষ্টির জন্য দায়ী সেসব কোষ ধ্বংসের মাধ্যমে বোটক্স ত্বকের ভাঁজ হওয়া বা কুঞ্চন রোধ করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বোটক্সের পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র, যা প্রায় এক গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ এবং এটি স্যালাইনের সাথে মিশ্রিত করে প্রদান করা হয়।

বোটক্স ব্যবহারের ফলে ত্বক ঠিকই মসৃণ হয়, কিন্তু স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুখে এক অদ্ভুতুরে অভিব্যক্তির সৃষ্টি করে।

চিত্র: ত্বক মসৃণ করতে ব্যবহার হয় বোটক্স।

বোটুলিনাম বিষ শুধুমাত্র একটি সাধারণ সৌন্দর্য্যবর্ধক উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তা কিন্তু নয়। নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানেও বোটক্স অত্যন্ত উপযোগী। এদের মধ্যে আছে তির্যকদৃষ্টি, মাইগ্রেন, অত্যাধিক ঘামরোগ, দুর্বল মূত্রথলী ইত্যাদি। বর্তমানে ২০টিরও বেশি রোগ নিরাময়ের জন্য বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিষ দিয়ে চিকিৎসার এটি তো একটি মাত্র উদাহরণ। এরকম আরো অনেক আছে। ক্যাপটোপ্রিল হলো উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান এক ওষুধ। এটি প্রস্তুত করা হয় সাপের বিষ থেকে। এক্সেনাটাই (বাণিজ্যিক নাম বেয়েট্টা, Byetta) একটি কার্যকরী ওষুধ। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে বাস করা গিরিগিটি জাতীয় প্রাণী গিলা মনস্টার-এর বিষাক্ত লালারস গবেষণা করে এই ওষুধটি আবিষ্কার করা হয়।

বিষ যে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে তার ইতিহাস কিন্তু মোটেও মধুর নয়। রাণী ভিক্টোরিয়ার যুগ, ব্রিটেনে তখন জীবন বীমার পরিমাণ হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে। বীমার সহজলভ্য টাকার লোভে খুনের পরিমাণও তুমুল পরিমাণে বাড়তে থাকে। এদের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে।

তখনকার অনেক বেশি আলোচিত মামলার একটি ছিল মেরি এন কটন নামক এক মহিলার নামে। তিনি ১৮৭৩ সালে একাধিকবার খুনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি ৪টি বিয়ে করেন এবং তার স্বামীর ৩ জনই সমৃদ্ধ বীমার মালিক ছিলেন। তারা সকলে স্ত্রীর হাতে খুন হন। বেঁচে যাওয়া স্বামী বীমা উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানালে উনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন।

তার মোট ১০ সন্তান মারা যায় তাদের পরিপাক জটিলতার কারণে। মানবিকভাবে প্রত্যেকটা মৃত্যু দুঃখজনক হলেও কটনের জন্য তা ছিল আরো বীমার টাকার হাতছানি। তার শাশুড়ি, ননদ, স্বামী সবাই এক এক করে মারা যায়। ১৮৭২ সালের মাঝে তিনি বিস্ময়করভাবে ১৬ জন নিকট আত্মীয়কে হারান। বাকি ছিল শুধুমাত্র একজন। তার ৭ বছরের সৎ ছেলে চার্লস। তিনি তাকে স্থানীয় কারখানায় পাঠাতে চাইলেও কারখানার মালিক তাকে রাখতে রাজি হয়নি। এর কদিন পরেই অল্পবয়সী চার্লসও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কারখানার ম্যানেজারের মনে এই ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করলে তিনি স্থানীয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। নানা ঘটনা শেষে পুলিশ সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনি, শিশু চার্লসকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। তারা জানতে পারেন এ কাজটি করা হয়েছে আর্সেনিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

চিত্র: আর্সেনিক অক্সাইড, এক নীরব বিষ।

আর্সেনিক অক্সাইড সমূহ হলো খনিজ। আর বিষ হিসেবে এসব খনিজ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অক্সাইড স্বাদহীন, গরম পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি মানুষ মারার জন্য এক আউন্স পরিমাণের ১০০ ভাগের ১ ভাগই যথেষ্ট। তবুও উনবিংশ শতাব্দীতে এই আর্সেনিক খনিজ ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতে থাকে। সে সময় আর্সেনিক অক্সাইড ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। শিশুরা খুশিমনে দোকান থেকে চা, চিনি কিংবা শুঁকনো খাবারের পাশাপাশি এটিও কিনতে পারত।

অন্যদিকে, আদালতে মেরি কটনের বিচার নির্ভর করছিল পুলিশ তার সৎ ছেলে চার্লসের দেহে আর্সেনিকের আলামতো খুঁজে পায় কিনা তার উপর। সে সময় ফরেনসিক বিজ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও আর্সেনিকের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য একটি ভালো পরীক্ষা তাদের জানা ছিল।

মৃত চার্লসের পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে নেয়া নমুনা এসিড ও কপারের সাথে উত্তপ্ত করা হয়। কপার গাড় ধূসর রঙ ধারণ করলেই আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণ হবে।

পুলিশ তদন্ত করে দেখায় যে, প্রাণঘাতী আর্সেনিকের ডোজ প্রদানের মাধ্যমে চার্লসকে হত্যা করা হয়। কটনকে চার্লসের খুনের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং দুরহাম জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

এরকম বহু বেপরোয়া খুন ও বিষ প্রয়োগের ঘটনার কারণে প্রথম আর্সেনিক আইন ও এরপর ওষুধ আইন ১৮৬৮ এর দিকে নিয়ে যায়। এই আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট এবং ওষুধ-বিক্রেতাই নানাবিধ বিষাক্ত উপাদান ও বিপদজনক ওষুধ বিক্রি করতে পারবে।

বিষক্রিয়া, দুর্ঘটনা, খুন এসবের মাধ্য দিয়েই বর্তমান আধুনিক ওষুধ শিল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে। জানলে অবাক হবেন এই আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই ক্যান্সার প্রতিরোধে বৈধভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

তথ্যসূত্র: bbc.com/news/magazine-24551945

সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীতে যেভাবে আলো আসে

নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার নাম শুনে থাকবো নিশ্চয়। সূর্যের কেন্দ্রে অবিরাম সংঘটিত হচ্ছে এই বিক্রিয়া। উৎপন্ন করছে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রা এবং বিপুল শক্তি। মানুষের বেঁচে থাকতে হলে যেমন হার্টের কার্যকারিতা প্রয়োজন, তেমনি সূর্যের তেজ বা জীবন এই ফিউশন বিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।

সূর্য গাঠনিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন: কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিকিরণ অঞ্চল, পরিচলন অঞ্চল ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সূর্যের জ্বালানী ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাকি অঞ্চলগুলো কেন্দ্রে উৎপন্ন ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রাকে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

সূর্যের কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত বিলিয়ন বিলিয়ন পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে চলছে। প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে ৫৬০ মিলিয়ন টন হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে। আর বাকি চার মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে উল্লেখিত শক্তি তৈরি হচ্ছে। ফিউশন বিক্রিয়ায় সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন এই শক্তি সূর্যের বহিরাংশের দিকে ফোটন তথা তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ হিসেবে আলোক কণা সৌর পৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ১৫ গুন বেশি। আবার সূর্যের বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর মোট ব্যাসার্ধ ৬,৯৫,৭০০ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের ১০৯ গুন। সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। যদিও সূর্যের কেন্দ্র থেকে বাইরের অঞ্চলের দিকে ঘনত্ব পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়,তবুও কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে অনেক সময় লাগে। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, বিকিরণ অঞ্চলকে পাড়ি দিতে একটি গামা রশ্মির তথা ফোটন কণার গড়ে ১,৭১,০০০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ বছর সময় লাগে এবং সৌর পৃষ্ঠ হতে পৃথিবীতে আসতে লাগে মাত্র সোয়া আট মিনিট।

সুতরাং চিন্তা করতেও অবাক লাগে, আমরা পৃথিবীতে বসে আজকে যে আলো পাচ্ছি তা কত লক্ষ বছর পূর্বে সূর্যের কেন্দ্রের ফিউশন বিক্রিয়ার ফল? একারণেই বলতে হয়, আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকালে শুধু অতীতকেই দেখতে পাই। আমরা আজ আলোচনা করব কীভাবে তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ এই বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ছে।

সূর্যের কেন্দ্রকে ঘিরে রাখা প্লাজমার ( ইলেকট্রন ও আয়নের মিশ্রণ) ঘনত্ব অনেক বেশি। তাইতো ফিউশন বিক্রিয়ায় নির্গত গামা রশ্মি( ফোটনের সর্বনিম্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য) খুব কম দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার পূর্বে ইলেকট্রন দ্বারা শুষিত হয়। এই ইলেকট্রন সমূহ শোষিত ফোটনকে সকল দিকে পুনরায় নির্গমন করে, কিন্তু এই ঘটনায় কিছু পরিমান শক্তি খোয়া যায়। পরবর্তীতে এই ফোটন সমূহ বিকিরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে।

বিকিরণ অঞ্চল সূর্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জন্য অন্তরকের আবরণ হিসেবে কাজ করে, যাতে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপ ধরে রেখে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়। এই অঞ্চল পাড়ি দিতে একটি ফোটন অসংখ্য বার ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত ও নির্গত হয়, ফলে নেট শক্তি প্রবাহের গতি ধীর হয়ে যায় এবং শক্তির পরিমান কমে যায়। ফলে গামা রশ্মি থেকে এক্সরে তে পরিণত হয়।

চিত্র : সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সমূহ

কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোক শক্তি তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ তথা ফোটন ( প্রধানত এক্সরে) হিসেবে বিকিরণ, তাপীয় পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিকিরণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ অঞ্চলের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা কেন্দ্র থেকে কম কিন্তু পরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি।

কেন্দ্রে উৎপন্ন এক্সরে বাবল তৈরি করে কম তাপমাত্রা, ঘনত্ব, চাপের পথ অনুসরণ করেন সূর্য পৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয়। হাইড্রোজেন, হিলয়াম, অসম্পৃক্ত ইলেকট্রন দ্বারা বিকিরণ অঞ্চল পূর্ণ থাকে। এ অঞ্চলের গভীরে, এক্সরে বিভিন্ন কনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বারবার সংঘর্ষের ফলে এক্সরের দিক বারবার পরিবর্তন হয়। দুটি ধাক্কার মধ্যে এক্স রে মাত্র কয়েক মিলিমিটার পথ অতিক্রম করে।

এভাবে ধাক্কার পর ধাক্কা খেয়ে এক্সরে সৌর পৃষ্ঠের দিকে গমন করে। তাই ফোটন তথা এক্সরের এই অঞ্চল পাড়ি দিতে ১৭১,০০০ থেকে ১ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। ধাক্কার দরুন এক্সরের শক্তি প্লাজমা অনু কর্তৃক শোষিত হওয়ায় এক্সরে এর শক্তি কমে যায় কিন্তু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে এবং পৃষ্ঠে এসে দৃশ্যমান আলোয় পরিনত হয়। একই সাথে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন থেকে ১.৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিনে হ্রাস পায়।

বিকিরণ অঞ্চলকে বেষ্টন কারী পরবর্তী পরিচলন অঞ্চলের ব্যাসার্ধ সূর্যের মোট ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০% হয়ে থাকে। এটি সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলসমূহের মধ্যে সর্ববহিঃস্থস্তর। এর তাপমাত্রা ও ঘনত্ব বিকিরণ অঞ্চল থেকে কম।

প্রথমত, এ আবরণের নিন্ম প্রান্তে অবস্থিত গ্যাসীয় অনুসমুহ বিকিরণ অঞ্চল থেকে বিকিরিত তাপ গ্রহণ করে। ফলে অনুসমুহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরা প্রসারিত হয়ে বেলুনের তথা বাবলের মত ফুলে যায়। ফলে এদের ঘনত্ব কমে যায়। তখন তারা পরিচলন অঞ্চলের উপরে অংশে তুলনামূলক কম তাপমাত্রার দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে।

image source: scienceisntscary.wordpress.com

যখন এই উত্তপ্ত গ্যাসীয় অনুসমুহ পরিচলন অঞ্চলের বহির্ভাগে পৌঁছায়, তখন এরা তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়। ফলে তাদের আয়তন কমে গিয়ে ঘনত্ব বেড়ে যায়। এরা আবার পরিচলন অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে আসে এবং পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এর তাপ পরিবহন দৃশ্য অনেকটা পানির স্ফুটন দৃশ্যের মত, যেখানে বাবল ( bubble) তৈরি হয়। বাবল তৈরির এ প্রক্রিয়াকে গ্রানুলেশন বলা হয়। এখানে তাপ স্থানান্তর প্রক্রিয়া এতই দ্রুত যে, এক গুচ্ছ ফোটনের এ অঞ্চল পাড়ি দিতে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময় লাগে।

চিত্র : সূর্যের পরিচলন অঞ্চল দিয়ে তাপের পরিবহন

আমরা জানি তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গ হলো গামা রশ্মির।তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট বলে গামা রশ্মির শক্তি অনেক বেশি। সূর্যের কেন্দ্র থেকে এই রশ্মি বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে দৃশ্যমান আলোতে পরিনত হয়।

আমরা সূর্যের দিকে তাকালে সূর্যে আলোক মন্ডল নামক অঞ্চল টি দেখতে পাই, কারণ তা দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করে।গামা রশ্মি বিভিন্ন কনার সাথে ধাক্কা খেয়ে কিংবা ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত হয়ে শক্তি হারিয়ে ফেলে। শক্তি হারানোর ফলে ফোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তাইতো দৃশ্যমান আলো সূর্য থেকে পাওয়া যায়। এভাবেই সূর্য থেকে তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর ক্ষুদ্র বর্ণালী থেকে বহৎ বর্ণালী পাওয়া যায়।

উৎস:

১. http://sciexplorer.blogspot.com/2013/03/the-sun-part-5-how-inner-layers-work.html?m=1

২. http://www.astronoo.com

৩. https://www.universetoday.com/40631/parts-of-the-sun/

৪.http://solar.physics.montana.edu/ypop/Spotlight/SunInfo/Radzone.html

featured image: planetfacts.org