দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ

দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন দুগ্ধজাত পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও মাখনের রঙ দুধ থেকে ভিন্ন হয়। মাখন কিছুটা হলদেটে হয় আর দুধ হয় ধবধবে সাদা। এক জাতীয় উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে রঙের ভিন্নতা দেখা যায় কেন?

দুধ বা মাখনের রঙের ভিন্নতা মূলত নির্ভর করে এদের মাঝে চর্বি বা ফ্যাট কী পরিমাণে আছে তার উপর। পরিমাণের পাশাপাশি চর্বি কী অবস্থায় আছে তার উপরও নির্ভর করে রঙ কেমন দেখাবে। গরু সাধারণত খাদ্য হিসেবে ঘাস, ঘাসের ফুল ও লতা-পাতা খায়। এসব ঘাস, লতা-পাতা ও ফুলের মাঝে ‘ক্যারোটিন’ নামে একধরনের হলুদ বর্ণ-কণিকা থাকে। ক্লোরোফিলের কারণে যেমন উদ্ভিদের পাতা সবুজ হয়, তেমনই ক্যারোটিনের কারণে পাতা বা ফুল হলুদ হয়। বয়স্ক হলুদ পাতার পাশাপাশি সবুজ পাতার মাঝেও অল্প পরিমাণে ক্যারোটিন উপস্থিত থাকে।

গরু যখন খাদ্য হিসেবে এসব ফুল-পাতা খায় তখন পাতার সাথে ক্যারোটিন চলে যায় উদরে। এই ক্যারোটিন পাওয়া যায় গরুর চর্বিতে। দুধেও স্বল্প পরিমাণ চর্বি থাকে এবং চর্বির সাথেও মিশে চলে যায় ক্যারোটিন নামের এই উপাদানটি। তবে দুধে এর রঙের প্রভাব দেখা যায় না। কারণ দুধের প্রায় সবটাই পানি, চর্বির পরিমাণ খুবই কম। সাকুল্যে চর্বি থাকে মাত্র ৩% থেকে ৪%। অন্যদিকে দুধ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপন্ন মাখনের মাঝে চর্বির উপস্থিতি প্রায় ৮০%। অধিক পরিমাণ চর্বির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এতে রঙের ভিন্নতা দেখা দিবে।

শুধু এটাই নয়। দুধ-মাখনের মাঝেও আছে পদার্থবিজ্ঞানের কারসাজি। দুধের মাঝে চর্বির বিন্দুগুলো (globule) একটি পাতলা পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে ক্যারোটিনগুলোও আবৃত হয়ে যায়। যখন আলোক রশ্মি এদের উপর এসে পড়ে তখন পর্দায় প্রতিফলিত হয়ে চলে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পর্দার রঙ দেখতে পাই, আড়ালে থাকা ক্যারোটিনের রঙ দেখতে পাই না। অন্যদিকে মাখন তৈরি করার সময় দুধকে প্রচুর নাড়াচাড়া করা হয়। ঘন ঘন নাড়ার ফলে দুধ থেকে মাখন বের হয়ে আসে। যখন তীব্রভাবে দ্রুত গতিতে নাড়াচাড়া করা হয় তখন চর্বি বা চর্বিগুচ্ছের আবরণকারী পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। পর্দা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যারোটিনের হলদেটে রঙ প্রতিফলিত হয়ে চোখে ধরা দেয় এবং আমরা মাখনকে কিছুটা হলুদাভ হিসেবে দেখতে পাই।

চিত্রঃ প্রচুর নাড়াচাড়া করে মাখন তৈরি করা হয়। ছবিঃ Survivopedia

হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ভেড়া বা ছাগল বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি মাখন সাদা রঙের হয়। এসব প্রাণীতে মাখন সাদা হবার কারণ হলো গরু যেভাবে শারীরিক প্রক্রিয়ায় বিটা ক্যারোটিন সংগ্রহ করে রাখতে পারে এরা সেভাবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে না। এদের শারীরিক প্রক্রিয়ায় এই বাড়তি সুবিধাটি নেই। তারা এর বদলে বিটা ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত করে ফেলে। ভিটামিন এ আবার বর্ণহীন, যার কারণে দুধ ও মাখনের রঙে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।

গরু যদি চারণভূমিতে পালন করা হয় তাহলে এর দুধ থেকে তৈরিকৃত মাখন অধিক হলুদাভ হয়। এসব চারণভূমিতে শীত ও গ্রীষ্মে পাতার মানের তারতম্য ঘটে, তাই শীত ও গ্রীষ্মের মাখনেও হলুদ রঙের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের বেলায় গরুর দুধের মাখন কম হলুদ হয়। অন্যদিকে যেসব গরু ফার্মে লালন-পালন করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে ঘাস-লতা-পাতা দেয়া না হয় তাহলে তাদের দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন প্রায় সাদাই হবে। কারণ তখন দুধে ক্যারোটিন থাকবে না। একারণেই বিদেশের দোকানগুলোতে সময়ে সময়ে মাখনের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।

তথ্যসূত্র

১. নিউ-ইয়র্ক টাইমস ওয়েল ব্লগ

২. কোরা (Quora) প্রশ্নোত্তর

সিরাজাম মুনির

দুধসহ চা, দুধ ছাড়া চা: বিজ্ঞান কোনটার পক্ষে?

চা। আমাদের অতি পছন্দের একটি পানীয়। পৃথিবীর ২০০ কোটির উপরে মানুষ চা পান করে থাকে। শুধু ব্রিটেনেই প্রতিদিন ১৬ কোটি ৫ লাখ কাপ চা পান করা হয়ে থাকে। যার অর্থ ব্রিটেনের প্রতিটি মানুষ দিনে গড়ে ৩ কাপ করে চা পান করে থাকে। কেউ চা খায় ঘুম তাড়াতে, কেউ চা খায় স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, কেউ চা খায় বন্ধুদের সঙ্গ দিতে আর কেউবা নিছকই অভ্যাসবশতই খেয়ে থাকে। চা পান অনেকে মানুষকে বিভিন্ন চিন্তা থেকেও দূরে রাখে। চা পানকারীদের মধ্যেও আছে নানা রকম বিভাজন। কেউ পছন্দ করে দুধ চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া রঙ চা খেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করে বেশি। কেউ গ্রীন টি বা, সবুজ চা আবার কেউ উলং চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ৪ ধরনের চা কিন্তু আসে একই গাছ থেকে। সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেসিস

কিন্তু কোন ধরণের চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি? দুধ চা নাকি রঙ চা? চলুন উত্তর খোঁজা যাক। কিন্তু সাধারণভাবে নয়, একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

রঙ চা বনাম দুধ চা; image source: medianp.net

চায়ের মাঝে অ্যান্টিওক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এছাড়াও চা পানকারীরা খুব সাধারণভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত থাকেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, চা পানকারীদের এসকল সুবিধা সম্পূর্ণরুপে বাতিল হয়ে যায় যদি তারা অধিকাংশ চা পানকারীদের মতো চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খান।  

চা কে অনেক আগে থেকেই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। চা যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, তেমনি আবার ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে। আবার দেহের বাড়তি মেদ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, দেহের কোষের সুরক্ষা প্রদানেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জার্মানীর এক দল গবেষকের ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে কয়েক বছর আগে  প্রকাশিত এক পেপারে দেখানো হয়েছে যে, চায়ে দুধের ব্যবহার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চায়ের যে উপকারিতা তার অনেকগুলোকেই নষ্ট করে দেয়।

চায়ে ক্যাটেচিন্স নামের এক ধরণের উপাদান থাকে। এই ক্যাটেচিন্সকেই চায়ের সেই উপাদান হিসেবে ধারণা করা হয় যা আমাদের হৃদপিন্ডকে সুরক্ষিত রাখে এবং আমাদের রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে চায়ের সাথে দুধ মেশালে এই প্রভাব কমে যেতে থাকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যারিটে হসপিটালের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার কাজটি পরিচালনা করেছেন।

রঙ চা; image source: lifehack.org

এই গবেষণা ১৬ জন সুস্থ মহিলার উপর পরিচালনা করা হয়। তাদেরকে আধা লিটার চা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া পান করতে দেয়া হয়েছিল। চা খাওয়ার পরে তাদের বাহুর মাঝ দিয়ে রক্ত চলাচল আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল।

রঙ চা খাওয়ার পরে মহিলাদের রক্ত চলাচলের বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু এই উন্নতির কোনো লক্ষণ দুধ চায়ের মাঝে দেখা গেল না। এরপর গবেষকরা এক দল ইঁদুরের উপরও একই পরীক্ষা চালালেন। এক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করা গেল।

মূলত দুধে অবস্থান করা ক্যাসেইন্স নামের এক দল প্রোটিন চায়ের সাথে বিক্রিয়া করে এবং চায়ে থাকা ক্যাটেচিন্সের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও সকল বিজ্ঞানীরা এখনো এটা বিশ্বাস করেন না যে চায়ের সাথে দুধ মেশালে সেটি খুব বেশি পরিমাণে এই প্রভাবগুলো কমিয়ে দেয়।

দুধ চা; image source: Healthmania.org

তবে এই ফলাফলের ঠিক বিপরীত ফলাফলও আছে। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডে একদল বিজ্ঞানী ১২ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা চালান। দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চা পান করার পর তাদের দেহের ক্যাটেচিন্সের (যে উপাদানের কারণে দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি দেখা যায়) পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তারা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চায়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য দেখলেন না। কিন্তু এই গবেষণা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি গবেষণা ছিল। এই গবেষণাটি মূলত ইউনিলিভার কোম্পানির অর্থায়নে হয়েছিল। চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইউনিলিভার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। লিপ্টন, পি জি টিপস তাদের চায়ের ব্র্যান্ড। গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের চাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বৈজ্ঞানিকগবেষণার কোনোভাবেই আদর্শ হতে পারে না।

২০১১ সালেও আরো একটি গবেষণায় উপরের ফলাফলের মতো আরো একটি ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এবারো এই গবেষণার অর্থায়নে ছিল ইউনিলিভার এবং শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ডের চাকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে হওয়া পৃথক ৩টি গবেষণার ৩টিই চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খাওয়ার চেয়ে রঙ চা খাওয়াকে বেশি উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে এরপরও যদি কেউ একান্তই দুধ ছাড়া চা না খেতে পারে তবে সে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন। সয়া দুধে লেসিথিন রয়েছে, যার আণবিক গঠন ক্যাসেইন্সের চেয়ে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। এই লেসিথিনের ক্যাটেচিনের সাথে বিক্রিয়া করার সম্ভাবনা ক্যাসেইন্সের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই এক্ষেত্রে দুধ চা পানকারীদের ভালো বিকল্প হতে পারে সয়া দুধ।

যদিও এটা সত্য যে, খাবারের কাছে এসে এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বা, বাঁধা নিষেধ মেনে চলা বেশ কঠিন একটা কাজ। আমাদের স্বাদের অনুভবের কাছে বিজ্ঞানের এসব নির্দেশনা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে বিজ্ঞানের নির্দেশ অমান্য করলেও যে চলে না। এরপর থেকে চায়ে দুধ মেশানোর আগে আরেকটিবার ভাববেন কি? অন্তত নিজের জন্য?

ফিচারড ইমেজঃ medianp.net

দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ

দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন দুগ্ধজাত পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও মাখনের রঙ দুধ থেকে ভিন্ন হয়। মাখন কিছুটা হলদেটে হয় আর দুধ হয় ধবধবে সাদা। এক জাতীয় উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে রঙের ভিন্নতা দেখা যায় কেন?

দুধ বা মাখনের রঙের ভিন্নতা মূলত নির্ভর করে এদের মাঝে চর্বি বা ফ্যাট কী পরিমাণে আছে তার উপর। পরিমাণের পাশাপাশি চর্বি কী অবস্থায় আছে তার উপরও নির্ভর করে রঙ কেমন দেখাবে। গরু সাধারণত খাদ্য হিসেবে ঘাস, ঘাসের ফুল ও লতা-পাতা খায়। এসব ঘাস, লতা-পাতা ও ফুলের মাঝে ‘ক্যারোটিন’ নামে একধরনের হলুদ বর্ণ-কণিকা থাকে। ক্লোরোফিলের কারণে যেমন উদ্ভিদের পাতা সবুজ হয়, তেমনই ক্যারোটিনের কারণে পাতা বা ফুল হলুদ হয়। বয়স্ক হলুদ পাতার পাশাপাশি সবুজ পাতার মাঝেও অল্প পরিমাণে ক্যারোটিন উপস্থিত থাকে।

গরু যখন খাদ্য হিসেবে এসব ফুল-পাতা খায় তখন পাতার সাথে ক্যারোটিন চলে যায় উদরে। এই ক্যারোটিন পাওয়া যায় গরুর চর্বিতে। দুধেও স্বল্প পরিমাণ চর্বি থাকে এবং চর্বির সাথেও মিশে চলে যায় ক্যারোটিন নামের এই উপাদানটি। তবে দুধে এর রঙের প্রভাব দেখা যায় না। কারণ দুধের প্রায় সবটাই পানি, চর্বির পরিমাণ খুবই কম। সাকুল্যে চর্বি থাকে মাত্র ৩% থেকে ৪%। অন্যদিকে দুধ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপন্ন মাখনের মাঝে চর্বির উপস্থিতি প্রায় ৮০%। অধিক পরিমাণ চর্বির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এতে রঙের ভিন্নতা দেখা দিবে।

শুধু এটাই নয়। দুধ-মাখনের মাঝেও আছে পদার্থবিজ্ঞানের কারসাজি। দুধের মাঝে চর্বির বিন্দুগুলো (globule) একটি পাতলা পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে ক্যারোটিনগুলোও আবৃত হয়ে যায়। যখন আলোক রশ্মি এদের উপর এসে পড়ে তখন পর্দায় প্রতিফলিত হয়ে চলে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পর্দার রঙ দেখতে পাই, আড়ালে থাকা ক্যারোটিনের রঙ দেখতে পাই না। অন্যদিকে মাখন তৈরি করার সময় দুধকে প্রচুর নাড়াচাড়া করা হয়। ঘন ঘন নাড়ার ফলে দুধ থেকে মাখন বের হয়ে আসে। যখন তীব্রভাবে দ্রুত গতিতে নাড়াচাড়া করা হয় তখন চর্বি বা চর্বিগুচ্ছের আবরণকারী পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। পর্দা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যারোটিনের হলদেটে রঙ প্রতিফলিত হয়ে চোখে ধরা দেয় এবং আমরা মাখনকে কিছুটা হলুদাভ হিসেবে দেখতে পাই।

চিত্রঃ প্রচুর নাড়াচাড়া করে মাখন তৈরি করা হয়। ছবিঃ Survivopedia

হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ভেড়া বা ছাগল বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি মাখন সাদা রঙের হয়। এসব প্রাণীতে মাখন সাদা হবার কারণ হলো গরু যেভাবে শারীরিক প্রক্রিয়ায় বিটা ক্যারোটিন সংগ্রহ করে রাখতে পারে এরা সেভাবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে না। এদের শারীরিক প্রক্রিয়ায় এই বাড়তি সুবিধাটি নেই। তারা এর বদলে বিটা ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত করে ফেলে। ভিটামিন এ আবার বর্ণহীন, যার কারণে দুধ ও মাখনের রঙে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।

গরু যদি চারণভূমিতে পালন করা হয় তাহলে এর দুধ থেকে তৈরিকৃত মাখন অধিক হলুদাভ হয়। এসব চারণভূমিতে শীত ও গ্রীষ্মে পাতার মানের তারতম্য ঘটে, তাই শীত ও গ্রীষ্মের মাখনেও হলুদ রঙের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের বেলায় গরুর দুধের মাখন কম হলুদ হয়। অন্যদিকে যেসব গরু ফার্মে লালন-পালন করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে ঘাস-লতা-পাতা দেয়া না হয় তাহলে তাদের দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন প্রায় সাদাই হবে। কারণ তখন দুধে ক্যারোটিন থাকবে না। একারণেই বিদেশের দোকানগুলোতে সময়ে সময়ে মাখনের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।

তথ্যসূত্র

১. নিউ-ইয়র্ক টাইমস ওয়েল ব্লগ

২. কোরা (Quora) প্রশ্নোত্তর

সিরাজাম মুনির

দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ

দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন দুগ্ধজাত পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও মাখনের রঙ দুধ থেকে ভিন্ন হয়। মাখন কিছুটা হলদেটে হয় আর দুধ হয় ধবধবে সাদা। এক জাতীয় উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে রঙের ভিন্নতা দেখা যায় কেন?

দুধ বা মাখনের রঙের ভিন্নতা মূলত নির্ভর করে এদের মাঝে চর্বি বা ফ্যাট কী পরিমাণে আছে তার উপর। পরিমাণের পাশাপাশি চর্বি কী অবস্থায় আছে তার উপরও নির্ভর করে রঙ কেমন দেখাবে। গরু সাধারণত খাদ্য হিসেবে ঘাস, ঘাসের ফুল ও লতা-পাতা খায়। এসব ঘাস, লতা-পাতা ও ফুলের মাঝে ‘ক্যারোটিন’ নামে একধরনের হলুদ বর্ণ-কণিকা থাকে। ক্লোরোফিলের কারণে যেমন উদ্ভিদের পাতা সবুজ হয়, তেমনই ক্যারোটিনের কারণে পাতা বা ফুল হলুদ হয়। বয়স্ক হলুদ পাতার পাশাপাশি সবুজ পাতার মাঝেও অল্প পরিমাণে ক্যারোটিন উপস্থিত থাকে।

গরু যখন খাদ্য হিসেবে এসব ফুল-পাতা খায় তখন পাতার সাথে ক্যারোটিন চলে যায় উদরে। এই ক্যারোটিন পাওয়া যায় গরুর চর্বিতে। দুধেও স্বল্প পরিমাণ চর্বি থাকে এবং চর্বির সাথেও মিশে চলে যায় ক্যারোটিন নামের এই উপাদানটি। তবে দুধে এর রঙের প্রভাব দেখা যায় না। কারণ দুধের প্রায় সবটাই পানি, চর্বির পরিমাণ খুবই কম। সাকুল্যে চর্বি থাকে মাত্র ৩% থেকে ৪%। অন্যদিকে দুধ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপন্ন মাখনের মাঝে চর্বির উপস্থিতি প্রায় ৮০%। অধিক পরিমাণ চর্বির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এতে রঙের ভিন্নতা দেখা দিবে।

শুধু এটাই নয়। দুধ-মাখনের মাঝেও আছে পদার্থবিজ্ঞানের কারসাজি। দুধের মাঝে চর্বির বিন্দুগুলো (globule) একটি পাতলা পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে ক্যারোটিনগুলোও আবৃত হয়ে যায়। যখন আলোক রশ্মি এদের উপর এসে পড়ে তখন পর্দায় প্রতিফলিত হয়ে চলে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পর্দার রঙ দেখতে পাই, আড়ালে থাকা ক্যারোটিনের রঙ দেখতে পাই না। অন্যদিকে মাখন তৈরি করার সময় দুধকে প্রচুর নাড়াচাড়া করা হয়। ঘন ঘন নাড়ার ফলে দুধ থেকে মাখন বের হয়ে আসে। যখন তীব্রভাবে দ্রুত গতিতে নাড়াচাড়া করা হয় তখন চর্বি বা চর্বিগুচ্ছের আবরণকারী পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। পর্দা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যারোটিনের হলদেটে রঙ প্রতিফলিত হয়ে চোখে ধরা দেয় এবং আমরা মাখনকে কিছুটা হলুদাভ হিসেবে দেখতে পাই।

চিত্রঃ প্রচুর নাড়াচাড়া করে মাখন তৈরি করা হয়। ছবিঃ Survivopedia

হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ভেড়া বা ছাগল বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি মাখন সাদা রঙের হয়। এসব প্রাণীতে মাখন সাদা হবার কারণ হলো গরু যেভাবে শারীরিক প্রক্রিয়ায় বিটা ক্যারোটিন সংগ্রহ করে রাখতে পারে এরা সেভাবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে না। এদের শারীরিক প্রক্রিয়ায় এই বাড়তি সুবিধাটি নেই। তারা এর বদলে বিটা ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত করে ফেলে। ভিটামিন এ আবার বর্ণহীন, যার কারণে দুধ ও মাখনের রঙে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।

গরু যদি চারণভূমিতে পালন করা হয় তাহলে এর দুধ থেকে তৈরিকৃত মাখন অধিক হলুদাভ হয়। এসব চারণভূমিতে শীত ও গ্রীষ্মে পাতার মানের তারতম্য ঘটে, তাই শীত ও গ্রীষ্মের মাখনেও হলুদ রঙের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের বেলায় গরুর দুধের মাখন কম হলুদ হয়। অন্যদিকে যেসব গরু ফার্মে লালন-পালন করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে ঘাস-লতা-পাতা দেয়া না হয় তাহলে তাদের দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন প্রায় সাদাই হবে। কারণ তখন দুধে ক্যারোটিন থাকবে না। একারণেই বিদেশের দোকানগুলোতে সময়ে সময়ে মাখনের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।

তথ্যসূত্র

১. নিউ-ইয়র্ক টাইমস ওয়েল ব্লগ

২. কোরা (Quora) প্রশ্নোত্তর

সিরাজাম মুনির