পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/

‘ব্যর্থ’ পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের বিপ্লব

পদার্থবিজ্ঞানের উত্থানের উত্তপ্ত সময়টিতে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইথার’। ইথার বলতে এমন একটি কাল্পনিক মাধ্যমকে বোঝানো হতো যার ভেতর দিয়ে আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু বিজ্ঞান ‘কাল্পনিক’ শব্দটাতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে তাই বিজ্ঞানী মহলে কম হুল্লোড় হয়নি। বিজ্ঞানীদের কাছে ইথার ছিল মরীচিকার সমার্থক। অসংখ্য আলোচনার জন্ম দেওয়া এই ইথারের সাথেই জড়িয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিন্তু আপাত ব্যর্থ ‘মাইকেলসন-মর্লির ইন্টারফেরোমিটার’ পরীক্ষা।

কী রহস্য এই ইথারের? ব্যর্থ পরীক্ষার ফলাফল কি আসলেই শূন্য ছিল? নাকি তার অভ্যন্তরেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন?

তার আগে আপেক্ষিকতার কিছু সহজ বিষয়ে চোখ বুলিয়ে নেই। সহজ ভাষায় আপেক্ষিকতা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ কাঠামোতে কোনো বস্তুর গতি ভিন্ন হওয়া। এটি গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা হিসেবে পরিচিত। বাস্তব জীবনে যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে এই বিষয়ক উদাহরণের কমতি পড়বে না।

ধরা যাক, আপনি ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছেন, ট্রেনটি প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার বেগে গতিশীল। ট্রেনের কামড়ার এক পাশে দাঁড়িয়ে আপনি অপর পাশের দেয়াল বরাবর (যেদিক বরাবর ট্রেন গতিশীল) একটি বল ছুড়ে মারলেন ৫ মিটার/সেকেন্ড গতিতে। আপনার কাছে বলটির গতি ৫ মিটা/সেকেন্ড। কারণ আপনি আর ট্রেন একই বেগে আছেন এবং আপনার প্রসঙ্গ কাঠামোয় ট্রেন আর আপনি স্থির।

কিন্তু ঠিক একই সময়ে যদি ট্রেনের বাইরে দাঁড়ানো কেউ এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে তাহলে তার জন্য বলটির গতি হবে ২৫ মিটার/সেকেন্ড। আগের গতির সাথে মিল নেই। কেন? কারণ তার প্রসঙ্গ কাঠামোয় বল, আপনি এবং ট্রেন প্রথম অবস্থা থেকেই ২০ মিটার/সেকেন্ড বেগে গতিশীল ছিলেন। তার মানে বাস্তবিকে একেক বস্তুর গতি একেক প্রসঙ্গ কাঠামো বা পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে একেক রকম হবে। এর ফলশ্রুতিতে বলা যায় কোনোভাবেই কোনো বস্তুর পরম গতি নির্ণয় করা সম্ভব না।

এখন আসি গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল এর কাছে। ম্যাক্সওয়েল ১৮৬০ সালে ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম নিয়ে তার জগৎ বিখ্যাত সূত্রগুলো প্রদান করেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যে তার সমীকরণগুলোর সমন্বয় থেকে তড়িৎচুম্বক বিকিরণের জন্য বেগের মান নির্ণয় করা যায়। এই বেগের মান একটি ধ্রুবক সংখ্যা যা প্রায় আলোর বেগের সমান। এই ফলাফল থেকে ধারণা করা হয় আলো তড়িৎচুম্বক বিকিরণেরই একটি বিশেষ রূপ। আর এর বেগের মান ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত বেগের মানের সমান এবং ধ্রুবক।

আলো যদি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গই হয়ে থাকে তবে শূন্য মাধ্যমে কীভাবে স্থানান্তরিত হয়? যেকোনো ধরনের তরঙ্গ স্থানান্তরিত হবার জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আলোর জন্য শূন্য মাধ্যমে কোন ধরনের প্রভাবক কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার জন্যই বিজ্ঞানীরা তখন ‘ইথার’ নামক একটি কাল্পনিক মাধ্যমের আশ্রয় নেন। ইথারকে সমগ্র মহাবিশ্ব বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন ও পরম স্থির এক অদৃশ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মহাবিশ্বের সবকিছুই এই ইথারের মধ্যে ভাসমান।

ইথারকে পরম স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত ফলাফল অনু্যায়ী আলোর বেগকে সার্বজনীন ধ্রুবক হিসেবে চিন্তা করা হলো। পাশাপাশি শূন্যস্থানে আলো স্থানান্তরের জন্য মাধ্যম জনিত সমস্যার সমাধানও ঘটল। কিন্তু এই কাল্পনিক ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেরি হলো না।

সেই সূত্র ধরেই অ্যালবার্ট মাইকেলসন এবং এডওয়ার্ড মর্লি ১৮৮৭ সালে আলোর ব্যতিচার ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটি এক্সপেরিমেন্টের পরিকল্পনা করেন। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ইথার যদি আসলেই থেকে থাকে তবে তার অস্তিত্ব নিরুপণের জন্য দৃঢ় প্রমাণ সংগ্রহ করা। সময়ের প্রেক্ষাপটে এই পরীক্ষার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। এবং ফলাফলের ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষায় যাবার আগে আবারো সেই ট্রেন থেকে ঘুরে আসি। ধরা যাক আপনি এবার ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। যথারীতি আপনার হাতে সেই বল। ট্রেনের ছাদে দাড়ানোর পরপর প্রথমেই অনুভব হবে বাতাসের তীব্র ঝাপটা। আদতে চারপাশের বাতাস কিন্তু স্থির কিন্তু ট্রেন সেই বাতাসের ভেতর দিয়ে গতিশীল হওয়ায় মনে হচ্ছে বাতাস আপনার দিকে ছুটে আসছে।

এক্ষেত্রে বাতাসের বেগ আর ট্রেনের বেগ সমান। এখন বাতাসের গতির দিকে অর্থাৎ ট্রেনের গতির বিপরীত দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলেন এবং এর গতি পরিমাপ করলেন। তাহলে যে মান পাওয়া যাবে, ঠিক বাতাসের উল্টো দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলে যে বেগ পাওয়া যাবে তা পরস্পর সমান নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বেগের মান কমে যাবে। সহজ ভাষায় বাতাসের বাধার কারণে বলটির বেগের তারতম্য ঘটবে।

একই আইডিয়া মাইকেলসন আর মর্লির চিন্তাতেও আসলো। ইথার যেহেতু সকল শূন্যস্থানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত এবং তা পরম স্থির, তাহলে এর মধ্য দিয়ে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনও ঐ ট্রেনের ছাদ ও বাতাসের বাধার মতো আচরণ করবে। অপরদিকে আলো ইথারের মধ্য দিয়ে তরঙ্গ হিসেবে সঞ্চালিত হয়। যদি তা-ই হয় তাহলে ইথার ক্ষেত্রে কোনো দিকে গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে আলোর বেগ যেমন হওয়া উচিৎ তার বিপরীত বা অন্যান্য দিকে তার চেয়ে কম পাওয়ার কথা। কিছু একটা তারতম্য হবার কথা।

আলোর বেগের এই তারতম্য যদি সত্যি সত্যিই পাওয়া যায় তাহলে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় এবং তা মেনে নিতে হবে। এই আইডিয়া থেকেই মাইকেলসন ও মর্লি মিলে এই পরীক্ষা করতে পারবে এমন একটি ইন্টারফেরোমিটার তৈরি করেন।

চিত্র: মাইকেলসন ও মর্লির তৈরি করা ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্রের নমুনা।

এই ইন্টারফেরোমিটারে একটি অর্ধপ্রলেপ দেওয়া সিলভারের আয়না আড়াআড়ি করে রাখা হয়। পাশে দুটি সম্পূর্ণ প্রতিফলক আয়না পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে অর্ধপ্রলেপ দেয়া সিলভার আয়না থেকে সমান দূরত্বে রেখে বসানো হয়।

ব্যতিচার বা ইন্টারফিয়ারেন্স-এর ক্ষেত্রে একই কম্পাংকের দুটি আলোক রশ্মি পরস্পরের উপর উপরিপাতিত হয়ে পর্যবেক্ষণ পর্দার কোথাও উজ্জ্বল এবং কোথাও অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে। আলোকরশ্মিদ্বয় যদি একই দশায় আপতিত হয় তবে উজ্জ্বল এবং সম্পূর্ণ বিপরীত দশায় আপতিত হলে কালো বা অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় একই উৎস থেকে একটি আলোক রশ্মি নির্গত হয়ে সিলভারের অর্ধ-প্রলেপ দেয়া আয়নায় আপতিত হয় এবং এর একটা অংশ প্রতিসরিত হয়ে অপর পাশে রাখা আয়নায় প্রতিফলিত হয়। আরেকটা অংশ সিলভার আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে উলম্ব বরাবর রাখা আয়নায় গিয়ে প্রতিফলিত হয়।

উভয় প্রতিফলিত রশ্মি পুনরায় সিলভার আয়নায় ফিরে এসে আবার যথাক্রমে প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ পর্দায় আপতিত হয়। এখন যদি আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় থাকে তাহলে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচারের জন্য উজ্জ্বল আলোক দেখা এবং বিপরীত দশায় থাকলে পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের জন্য অনুজ্জ্বল বা অন্ধকার এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে।

যেহেতু আলোক রশ্মিদ্বয় সমান পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেক্ষেত্রে ইথার যদি না থাকে তবে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচার দেখা যাবে। কিন্তু যদি ইথার থাকে তবে? ইথার যদি সত্যি হয় তবে ইথার বাতাসের কারণে আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগ একই হবে না, কেননা তারা পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে যাতায়াত করেছে। সেক্ষেত্রে তারা পর্দায় একই দশায় আপতিত না হয়ে ভিন্ন কোনো দশায় আপতিত হবে এবং পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার প্রদর্শিত হবে।

চিত্রঃ মাইকেলসন-মর্লির ব্যতিচার পরীক্ষা।

তো মাইকেলসন মর্লি তাদের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপে কী পেলেন? তারা দেখতে পেলেন পর্দায় আলোকরশ্মিদ্বয় আপতিত হয়ে গঠণমূলক ব্যতিচার তৈরি করছে অর্থাৎ আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগে কোনো পার্থক্য হচ্ছে না। আর আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় আপতিত হচ্ছে যা ইথারের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।

তারা তাদের যন্ত্রকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাপেক্ষে বিভিন্ন দিকে বসিয়ে পরীক্ষা করেন এবং প্রতিবার প্রায় একইরকম ফলাফল পান। তাদের এই ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই পুরো বিজ্ঞানমহলে অসংখ্য বিতর্কের জন্ম দিল। এক্ষেত্রে দুটি উপসংহারে আসা যায়, এক- পৃথিবী ও ইথার একইসাথে পরম স্থির, দুই- ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রথম সিদ্ধান্তের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটিই বেশি গ্রহণযোগ্য। এতদিন ধরে ইথারকে কল্পনা করে শূন্য মাধ্যমে আলোর তরঙ্গ আকারে স্থানান্তরের ব্যাখ্যা মুহুর্তেই দোলাচালে পড়ে গেল।

ইথার যদি না থাকে তবে সেক্ষেত্রে আলোর প্রকৃতি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। এরকম ক্রান্তিকালে আইনস্টাইন হাজির হলেন তার স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। তার থিওরি অনুযায়ী আলোর বেগ শূন্য মাধ্যমে পরম এবং এর বেগের মান সকল প্রসঙ্গ কাঠামো এবং সকল পর্যবেক্ষকের জন্য সমান। একইসাথে তিনি কাল্পনিক ইথার মাধ্যমের অস্তিত্বকে নাকচ করে দিলেন।

নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মূল্যবান থিওরিগুলোর মধ্যে একটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কেননা আইনস্টানের থিওরি অব রিলেটিভিটি তখনই সত্য যখন ইথার এর কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার ইথারের অস্তিত্বের প্রমাণ মিললে থিওরি অব রিলেটিভিটি দিয়ে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা আলোর প্রকৃতিও নড়বড়ে হয়ে যায়।

তাই ১৯০৬ সালে আমেরিকান ফিজিকাল সোসাইটির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পদার্থবিজ্ঞানী ডেটন মিলার মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষাটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি পূর্বেকার চেয়েও আরো উন্নত যন্ত্র নিয়ে পরিক্ষাটি চালান এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অসংখ্যবার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি দাবি করেন যে, মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতো তার পরীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্তের ফলাফল শূন্য নয় বরং সেখানে আসল ফলাফলের চেয়ে সামান্য কিছুটা বিচ্যুতি পাওয়া যায়। এই বক্তব্য ইথার এর অস্তিত্ব এর স্বপক্ষে অবস্থান নেয়।

ডেটন মিলারের প্রাপ্ত ফলাফল যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে ইথার বিদ্যমান এবং সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের এর থিওরি অব রিলেটিভিটি অকেজো। তবে থিওরি অব রিলেটিভিটির জনপ্রিয়তার কাছে সে ফলাফল চাপা পড়ে যায়। আইনস্টাইন ১৯২১ সালে মিলারের সাথে দেখা করে তাকে এই পরীক্ষা আরো নিখুঁতভাবে করার জন্য অনুরোধ করেন।

মিলারের ধারণা ছিল পৃথিবী পৃষ্ঠে এই পরীক্ষা চালানোয় ইথার ক্ষেত্রের ঘর্ষণের প্রভাব ভালোভাবে পাওয়া যায়নি, তাই তিনি তার পরীক্ষাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৫০ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে পরিচালনা করেন এবং প্রায় ২৫০০০০ বারের মতো পরীক্ষার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

কিন্তু মিলারের প্রাপ্ত ফলাফলের বেশিরভাগই ছিল শূন্য, অতি সামান্য কিছু ফলাফলই কেবল ইথারের স্বপক্ষে পজিটিভ মান দিয়েছিল যা ছিল খুবই নগণ্য। ফলে মিলার কখনোই তার পরীক্ষায় পাওয়া পজিটিভ ফলাফল এর স্বপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেননি।

তার পরীক্ষাও মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতোই ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে চাপা পড়ে যায়। মিলার অবশ্য তার বিভিন্ন লেখনীতে ইথার থাকার সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেননি। ধারণা করা হয় যে মিলারের এই দীর্ঘসময়ব্যপী করা পরীক্ষার কারণেই আইনস্টাইন তার থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্য নোবেল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। (আইনস্টাইন নোবেল পেয়েছিলেন ফটো তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য)।

চিত্র: ডেটন মিলার

যাহোক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী ইথারের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। গ্যালিলিও বা নিউটনের পর পদার্থবিজ্ঞান অনেকখানি পথ এগিয়ে এসেছে। এখনো বহুদূর বাকি। পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামোতে পরিবর্তনটাও এসেছে সবচেয়ে বেশি। এই পরিবর্তনের অংশীদার মাইকেলসন – মর্লির পরীক্ষার মতো অজস্র প্রচেষ্টা। পদার্থবিজ্ঞানের এই অসম্ভব সুন্দর যাত্রা এভাবেই গৌরবের সহিত এগিয়ে যাক এবং আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হোক। ইথার গল্পটার এখানেই সমাপ্তি।

তথ্যসূত্র

Michelson-Morley & The Story of The Aether Theory, by Richard Milton

feature image: quora.com

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether
প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

সুপার হিউম্যান তৈরির অমানবিক এক্সপেরিমেন্ট

গত শতাব্দীতে জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছে তা বিগত কয়েক হাজার বছরের উন্নতি থেকেও বেশি। মানবসভ্যতাকে এখন রোগ-মহামারীর ভয়ে বিলীন হতে হয় হয় না। এমনকি এমন বিলীন হয়ে যাওয়া নিয়ে ভয়ও পেতে হয় না। বিজ্ঞান উন্নত হয়েছে, অবশ্যই এটা ভালো দিক।

তবে কখনো কখনো ভালোর মাঝেও খারাপ থাকে। চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের প্রয়োজনে মানুষকে বহুবার বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে করা হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে অনেকবারই মানবিকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অতিমানব বানানোর প্রচেষ্টা করা হয়েছে। অমানবিকভাবে করা এমন কিছু এক্সপেরিমেন্টের কথাই বলবো এখানে।

যুদ্ধবাজ জেনারেলদের সবসময় চাই নতুন নতুন অস্ত্র। যে অস্ত্র প্রতিপক্ষ থেকে নিজেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত বিশ্ব অনেকগুলো যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। যতই দূরপাল্লার মিসাইল বা বিমান নির্মাণ করা হোক না কেন ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধের জন্য পদাতিক বাহিনী লাগবেই। যদি সৈন্যদের শারীরিকভাবে একটু উন্নত করা যায় তাহলে হয়তো যুদ্ধের অঙ্ক বদলে যাবে। আর এসব ভেবেই অতিমানব তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে মানবদেহের উপর এক্সপেরিমেন্ট সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। কিন্তু গত শতাব্দীতে মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা চালানোর উদাহারণ অনেক বেশি। বেশিরভাগ মানুষই জানতো না তাদের উপর কী পরীক্ষা চালানো হবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ জানলেও তাদের অধিকার বলে কিছু ছিল না। কারণ তারা ছিল প্রতিপক্ষ শিবিরে আবদ্ধ যুদ্ধবন্দী।

নাৎসি জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট

১৯৪১ সালে জার্মানরা হাইপোথার্মিয়া প্রতিরোধ নিয়ে কয়েকটি এক্সপেরিমেন্ট করে। হাইপোথার্মিয়ার ফলে দেহে কোন ধরনের পরিবর্তন সম্পন্ন হয় তা বুঝতে বন্দীদেরকে হিমাংকের নীচে ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখা হতো। এই পরীক্ষায় প্রায় সবাই মারা যায়।

১৯৪২ – ১৯৪৫ সালের সময়কালে আরো একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। দাচু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ১২ শত বন্দীকে ম্যালেরিয়ার দ্বারা সংক্রমিত করা হয়। তাদের তৈরিকৃত ওষুধ কেমন কার্যকর তা জানতেই পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়েছিল ম্যালেরিয়ার জীবাণু। এক্ষেত্রেও প্রায় অর্ধেক বন্দী মারা যায়।

ড. জোসেফ মেঙ্গেল নামে একজন গবেষক জেনেটিক যমজদের মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন। চোখে রঙ প্রবেশ করানো, দুজন আলাদা যমজ দিয়ে যুক্ত যমজ তৈরি ইত্যাদি। যমজদের উপর এক্সপেরিমেন্ট শেষে সরাসরি হৃদপিণ্ডে ক্লোরোফর্ম প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হতো।

আরেক গবেষক ড. কার্ল কুবার্কের নেতৃত্বে ৩০০ জন নারী বন্দীর দেহে কৃত্তিমভাবে অজ্ঞাত শুক্রাণু প্রবেশ করানো হয়। এই পরীক্ষায় নারীদেরকে জানানো হতো তাদের গর্ভে পশু বেড়ে উঠছে। এই প্রজেক্ট সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে পরে তাদেরকে যে হত্যা করা হতো তা জানা যায়।

চিত্রঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট।


ইউনিট ৭৩১ রাভেনবার্ক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হাড়, স্নায়ু, পেশী ইত্যাদি পুনরুৎপাদন এবং প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে বন্দীদের শরীর থেকে এই অঙ্গগুলো আলাদা করা হতো। আর এই কাজ করা হতো কোনো ব্যথানাশক ছাড়াই। এই পরীক্ষার কোনো ব্যক্তি সুস্থ তো হতে পারেইনি বরং বেশিরভাগই মারা যায়। এছাড়া নাৎসিরা মানব চর্বি থেকে সাবান তৈরির চেষ্টাও করেছিল।

এটি জাপানিদের কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র নিয়ে গবেষণার প্রজেক্ট। জাপানের হারবিন শহরে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত এটি চলে। সেখানে বন্দী হওয়া রুশ ও চাইনিজরা ছিল এখানকার সাবজেক্ট।

জীবিত ও সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় বন্দীর শরীর থেকে মস্তিষ্ক, চোখ, যকৃত, কিডনি খুলে নেয়া হতো। এসব কাজে নেতৃত্ব দিতো জাপানি সার্জন কিন ইয়ুশা। তার ধারণা ছিল শতভাগ অক্ষত ও কার্যকর অঙ্গ পেতে হলে জীবিত শরীর থেকে অঙ্গ খুলে নিতে হবে।

ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার জন্য বন্দীদের শরীরে রোগ প্রবেশ করানো ছিল ইউনিট ৭৩১ এর একটি রুটিনবদ্ধ কাজ। প্লেগ, এনথ্রাক্স, কলেরা ইত্যাদির জীবাণুবাহী বোমা ফেলে ৪ লক্ষ চাইনিজকে হত্যার অভিযোগ আছে ইউনিট ৭৩১ এর বিরুদ্ধে। বিপজ্জনক জীবাণু অস্ত্র নিয়ে কাজ করার সময় ১ হাজার ৭০০ জন জাপানির মৃত্যুও হয়। Unit 731 Laboratory Of The Devil নামে একটি সিনেমা আছে। সেখানে ইউনিট ৭৩১ এর ভয়াবহতা ও নির্মমতা তুলে ধরা হয়েছে।

চিত্রঃ অজ্ঞাত ক্যাম্পে জাপানিদের এক্সপেরিমেন্ট। পেছনে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পর্যবেক্ষণ করছেন।

প্রজেক্ট এম কে আলট্রা

নাৎসিদের কাছ থেকে জব্দ করা নথির উপর ভিত্তি করে ১৯৫০ সালে প্রজেক্ট এম কে আলট্রা শুরু হয় এবং ১৯৬০ পর্যন্ত এটি চলে। উত্তর কোরিয়াতে বন্দী মার্কিন সৈন্যদের উপর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের চালানো এক্সপেরিমেন্ট সিআইএকে উদ্বুদ্ধ করে। মানবতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ এই প্রজেক্ট। প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল হিপনোসিস ও মন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষা করা। এমন গুপ্তচর তৈরি করা যারা নিজেরাও জানে না যে তারা আসলে গুপ্তচর।

এম কে আলট্রার আরেকটি সফল অধ্যায় ছিল ‘ট্রুথ সিরাম’ তৈরি করা। ট্রুথ সিরাম কেন্দ্রীয় স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয় এবং মস্তিষ্ক তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে অনেকটা নিজের অজান্তেই জেরার সময় সত্য বলতে বাধ্য হয়।

চিত্রঃ ট্রুথ সিরামের উপাদান অ্যামোবারবিটাল।

এম কে আলট্রা সমালোচিত হবার কারণ হলো কর্তৃপক্ষরা পরীক্ষাধীন ব্যক্তির উপর এল.এস.ডি ড্রাগ ব্যবহার করে। এল.এস.ডি স্নায়ুতে ক্ষণিক সময়ের জন্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো। ব্যক্তির অজান্তেই এগুলো প্রয়োগ করা হতো। এল.এস.ডি ছাড়াও বারবিচুরেট-৪, আমফেটামিন-৪, টেমাজিপাম (অজ্ঞাত ড্রাগ) ব্যবহার করা হতো। বারবিচুরেট-৪ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর পরে আমফেটামিন-৪ প্রয়োগ করা হতো বলে পরীক্ষাধীন ব্যক্তি তন্দ্রাভাবে নিজের অবচেতন মনে সব নির্দেশ গ্রহণ করতো।

ডিসকভারি চ্যানেলে প্রচারিত Deception with Keith Barry অনুষ্ঠানটি যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় হিপনোসিস সম্বন্ধে ধারণা রাখেন। এর একটি পর্বে দেখানো হয় ঘুম থেকে উঠার পর একজন মানুষ মনে করতে পারে না যে সে ঘুমের মাঝে উঠে চুরি করতে গিয়েছিল। ইউটিউবে সার্চ করলেও এ নিয়ে অনেক ভিডিও পাবেন যেখানে লাইভ শোতে হিপনোসিস করা হয়।

জেসন বর্ন মুভিতে দেখা যায় একজন স্মৃতিভ্রষ্ট সিআইএ এজেন্ট তার পূর্বপরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে হত্যার মিশনে নিয়োজিত হয়। বাস্তবেও হয়তো এমনটা সম্ভব করে ফেলেছিল সিআইএ।

চিত্রঃ মিডিয়াতে এমকে আলট্রা সংক্রান্ত খবর।

গর্ভবতী নারীর উপর তেজস্ক্রিয় পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যানডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২৯ জন গর্ভবতী মহিলাকে শিশুর বিকাশ বৃদ্ধির ভিটামিন-পানীয় বলে তেজস্ক্রিয় পানীয় খাওয়ানো হয়। ডিম্বকবাহী গর্ভফুলে কত তাড়াতাড়ি তেজস্ক্রিয়তা প্রভাব ফেলে এটা পর্যবেক্ষণ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। লিউকোমিয়া এবং ক্যানসারে ৭ টি শিশু নিশ্চিতভাবে মারা যায়। বেঁচে থাকা শিশু ও মা উভয়কেই অনেক রোগের শিকার হতে হয় পরবর্তী জীবনে। প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ শিশুদের পঙ্গু করা যায় কিনা এরকম ভাবনা থেকেই এই এক্সপেরিমেন্ট করা হয়।

চিত্রঃ তেজস্ক্রিয়তা প্রদান করা হচ্ছে।

গুয়েতমালা সিফিলিস পরীক্ষা

১৯৪৬ – ৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়েতেমালা সরকারের সম্মতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে জেলখানার বন্দী, সৈন্য, পতিতা এবং মানসিক রোগীদের মধ্যে সিফিলিস ছড়ানো হয়। শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়েটিক দিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হয় এবং অফিশিয়ালি ৩০ জনের মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

অতিমানব তৈরির উচ্চাভিলাস

ফিকশন বা ভিডিও গেমে অহরহ দেখা যায় এমন সুপারহিউম্যান যে একাই হাজার জনের কাজ করতে পারে। সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা এমন সৈন্য তৈরি করা যারা অন্তত ১২০ ঘণ্টা নির্ঘুম থাকতে পারবে, নিজের ভরের চেয়ে বেশি ভর বহন করে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের সমান গতিতে দৌড়াতে পারবে, অনেকদিন খাবার গ্রহণ না করে সঞ্চিত ফ্যাট থেকে শক্তি নিতে পারবে এবং আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেহের প্রত্যঙ্গ নিজেই পুনরুৎপাদন করতে পারবে।

অতিমানব বা সুপার-হিউম্যান তৈরি কল্পকাহিনীতে যতটা সহজ বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। অন্তত আগামী ১০০ বছরের জন্য তা আকাশ কুসুম কল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মানব জিন মডিফায়িং গবেষণা নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (DARPA) সুপার-সোলজার বা অতি ক্ষমতাধর সৈনিক তৈরির কাজ করে যাচ্ছে।

এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু যান্ত্রিক কংকালতন্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে যা এখনই যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী। যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র এমন একটি কাঠামো যা মানবদেহের হাড়ের সমান্তরালে থেকে বাড়তি শক্তি যোগাবে।

পক্ষাঘাতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অ্যালুমিনিয়াম আর কার্বন ফাইবারের মিশ্রণে তৈরি যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র বাজারে এসেছে। মানবদেহের জন্য কৃত্তিম হাত-পা অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। এখন এগুলোর মাঝে মস্তিষ্ক থেকে ডিজিটাল সিগন্যাল গ্রহণ করে মস্তিষ্কের নির্দেশমতো চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি আসতেও সম্ভবত খুব দেরি নেই।

২০১৫ সালে ব্রিটিশ গবেষকরা আশা প্রকাশ করেন আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে তারা মানুষের জিন মডিফাই করে গর্ভাবস্থায় অন্ধত্ব প্রতিরোধ করতে পারবেন। ২০১৬ তে চাইনিজ গবেষকরা ২১৩ টি নিষিক্ত মানব ডিম্বাণুর সাথে জিনোমের মডিফাই করতে পেরেছেন যা এইচ.আই.ভির সাথে লড়াই করতে সক্ষম। গবেষক স্টিভ শু এর মতে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানবের আইকিউ লেভেল ১০০০ বা তার বেশিও হতে পারে। উল্লেখ্য আইনস্টাইনের আইকিউ স্কোর ছিল ১৬০।

বর্তমানে অহরহ দেখা যাচ্ছে শস্যের জিন মডিফাই করে তাদের আরো বেশি উৎপাদনশীল করা হচ্ছে এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মানুষের সাথে তাহলে এমন করতে সমস্যাটা কোথায়?

একটি শস্যের প্রজাতিকে নতুনভাবে মডিফাই করতে ঐ প্রজাতির হাজার হাজার গাছ লাগিয়ে পরীক্ষা করা হয় কিন্তু আমরা কি মানুষকেও এভাবে পরীক্ষা করবো? ধরা যাক কৃত্রিম জরায়ু এবং সেখানে স্থাপন করা ভ্রূণে পুষ্টি প্রদানের প্রযুক্তি রপ্ত করা হয়ে গেছে। একটি মানুষকে এভাবে জন্ম দিলে তার পরিচয় কী হবে বা পরীক্ষার পর তাদের কী করা হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।

The Island সিনেমায় দেখা যায় পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের ক্লোন করা হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। জেনেটিকভাবে তাদের এতই মডিফাই করা হয়েছে যে তারা শুধু খাওয়া ঘুম এবং কতৃপক্ষের বলা একটি তথাকথিত দ্বীপে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকে। In Time সিনেমায় দেখা যায় জেনেটিকালি মডিফাই করে মানুষের আয়ু ২৫ বছর করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা থেকে যায়। যদি কোনোভাবে মাতৃহীন মডিফাই করা মানুষ বানানো সম্ভব হয়, তাহলে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাকে কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে। তখন হয়তো The Island সিনেমার কাহিনীর মতো একেকটি প্রজন্মকে মাটি চাপা দিতে হবে আর সেই সাথে মানবিকতাকেও।

বর্তমানে রপ্ত করা জেনেটিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি, ন্যানোটেকনোলজি দিয়ে মানুষের বেশ কিছু

রোগ নির্মূল, শারীরিক অক্ষমতা দূর, অঙ্গ পুনঃনির্মাণ সম্ভব হবে। তবে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানব এখনো কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রচেষ্টা থেমে থাকবে না এবং আগের প্রজেক্টগুলোর মতো অসংখ্য নিরীহ মানুষকে সবার অগোচরে শিকার হতে হবে এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিজ্ঞানের উন্নতি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিৎ কিন্তু ল্যাবরেটরির বাইরে সমস্ত মনুষ্যত্বকে বলিদান করে নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Doctors from Hell by vivien spitz
  2. Nuremberg: Evil on Trial
  3. Unit731: Japan’s Secret Biological Warfare in WWII
  4. MKULTRA: the CIA’s Secret Program in Human Experimentation and behavior Modification by GEORGE ENDREWS
  5. http://creepypasta.wikia.com/wiki/The_Russian_Sleep_Experiment
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_MKUltra
  7. http://bestpsychologydegrees.com/30-most-disturbing-human-experiments-in-history/
  8. http://theatlantic.com/international/archive/2015/09/military-technology-pentagon-robots/406786/
  9. http://sciencealert.com/scientists-genetically-modify-an-embryo-for-only-the-second-time-ever

featured image: collective-evolution.com

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether
প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

কাল্পনিক এক মাধ্যম ইথারের গল্প

বিজ্ঞানীরা তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে আগেই দেখেছিলেন শব্দই হোক বা, পানির তরঙ্গই হোক তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আলোও এক প্রকার তরঙ্গ। কিন্তু ভন গুইরিকের পরীক্ষা থেকে দেখা গেলো যে শব্দ শূন্য মাধ্যমে চলাচল করতে না পারলেও আলো কিন্তু শূন্য মাধ্যমেই চলাচল করছে। শূন্য মাধ্যমের ভেতর দিয়েও যে কোন তরঙ্গ চলাচল করতে পারে তা তখনকার বিজ্ঞানীরা ঠিক মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যে, শূন্য মাধ্যম কি আসলেই শূন্য?

বিজ্ঞানীরা আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে পারে এটা মানতে পারলেন না। তাই তারা এক নতুন রকম মাধ্যমের কল্পনা করলেন যা সারা মহাবিশ্বের প্রতিটি স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এ মাধ্যমে কম্পন সৃষ্টি করেই আলো চলাচল করে। এ কাল্পনিক মাধ্যমের নাম দেয়া হল ইথার। ইথারের ধারণা কিন্তু নতুন ছিল না। অ্যারিস্টোটল প্রথম ইথারের কথা বলে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে আলোর শূন্য মাধ্যমে চলার ব্যাখ্যা দিতে সেই ইথার ধারণাটিরই পুনর্জন্ম ঘটাতে হল বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন ইথার সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইথার এক রকমের পদার্থ যা বাতাসের চেয়ে কম হালকা। বাতাস ইথারের চেয়ে মিলিয়ন, মিলিয়ন এবং আরো মিলিয়ন গুন বেশি ঘনত্ব সম্পন্ন। এর দৃঢ়তা এর ঘনত্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। ইথার সম্ভবত সেকেন্ডে চারশ মিলিয়ন-মিলিয়ন বার কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। এর ঘনত্ব খুব কম হওয়ার জন্য এর ভেতর দিয়ে যখন কোন কিছু যায় তখন ইথার তার গতিতে এতটুকুও বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেনা।

Image result for aristotle aether
প্রথম ইথারের কথা বলেছিলেন অ্যারিস্টোটল

অর্থাৎ, ইথার হল খুবই শক্ত কিন্তু খুবই কম ঘনত্বের এক কাল্পনিক মাধ্যম। যা স্বচ্ছ এবং ঘর্ষণবিহীন। এ মাধ্যম রাসায়নিকভাবেও নিষ্ক্রিয় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল এই ইথারই আমাদের সর্বদা ঘিরে রেখেছ।

 

এখন শুরু হল ইথার খোঁজাখুঁজির কাজ। কারণ বিজ্ঞানীদের শুধু কল্পনা করলেই চলে না তাদের কল্পনাকে প্রমাণও করে দেখাতে হয়। ইথার খোঁজাখুঁজি শুরু করার আগে আমরা আলো যদি আসলেই ইথারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয় তাহলে কি ঘটবে সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করি।

ধরুন একটি গাড়ি আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনিও গাড়িটির দিকে দৌড়ে গেলেন। তাহলে কি ঘটবে? আপনাদের মধ্যে যারা একটু দুষ্ট বুদ্ধির অধিকারি তারা চট করে বলে দেবেন যে, কি আর ঘটবে, দুর্ঘটনা ঘটবে। আচ্ছা ধরুন গাড়িটি অনেক দূরে আছে। তাহলে? গ্যালিলিওর আপেক্ষিকতার কথা চিন্তা করুন তো? হ্যাঁ, গাড়িটির বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যে বেগ মনে হত তার চেয়ে কিছুটা বেশি মনে হবে। আবার গাড়ি যেদিকে যাচ্ছে আপনি যদি সেই একই দিকে হঠাৎ করে ভোঁ দৌড় শুরু করেন তাহলে আপনার কাছে গাড়ির বেগ আপনি স্থির অবস্থায় গাড়ির যে বেগ দেখতেন তার চেয়ে কম মনে হবে।

এবার গাড়ি থেকে তরঙ্গে যাই আমরা। ধরুন কোন একটি স্থান থেকে মাইকের মাধ্যমে গান বাজানো হচ্ছে। আপনি সেই স্থানটির দিকে যদি দৌড়িয়ে যান তাহলে কি হবে? হ্যাঁ, শব্দের বেগ আপনার কাছে আপনি স্থির থাকা অবস্থায় যা মনে হত তার চেয়ে বেশি মনে হবে আর উল্টো দিকে দৌড় দিলে শব্দের বেগ তার চেয়ে বেশি মনে হবে। আলোর ক্ষেত্রেও কি এ কথাটি সত্য নয়?

এ প্রশ্নটি প্রথম ভালভাবে বিশ্লেষণ করা শুরু করেন স্যার ম্যাক্সওয়েল। তিনিই প্রথম তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে আলো একরকম তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। তিনি চিন্তা করলেন আলোও যেহেতু শব্দের মত একটি তরঙ্গ তাই কেউ যদি ইথারের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসের দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে (অনেকটা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাইকের দিকে দৌড় দেয়ার মত) তাহলে তার কাছে আলোর বেগ বেশি মনে হবে। আর কেউ যদি আলোর উৎসের বিপরীত দিকে দৌড় দেয়া শুরু করে তবে তার কাছে আলোর বেগ কম মনে হবে।

Image result for maxwell aether

এখন আমাদের মহাবিশ্বের সর্বত্র ইথার বিদ্যমান। অর্থাৎ, আমাদের হাত-পা থেকে শুরু করে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীটিও ইথারের মাঝে নিমজ্জিত আছে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরাঘুরি করে। জানুয়ারি মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে তার ৬ মাস পরে অর্থাৎ, জুলাই মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ তার বিপরীত দিকে থাকে। ঠিক তেমনি এপ্রিল মাসে পৃথিবীর ঘূর্ণনের অভিমুখ যেদিকে থাকে অক্টোবর মাসে ঠিক তার বিপরীত দিকে থাকে। বেগের দিক সম্পূর্ণ উলটো হওয়ার কারণে ৬ মাস পর পর পৃথিবী থেকে আলোর বেগ মাপলে পৃথিবীর সাপেক্ষে সেই আলোর বেগের একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা। এই বিষয়টিই লক্ষ্য করলেন ম্যাক্সওয়েল। ম্যাক্সওয়েল তার এই চমৎকার ধারণার কথা রয়্যাল সোসাইটির এক জার্নালের প্রধানকে জানান। কিন্তু সেই সম্পাদক তার ধারণাকে একরকম হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল পাকস্থলির ক্যান্সারে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর।

Image result for maxwell aether

ম্যাক্সওয়েলের এই ধারণাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন আমেরিকার প্রথম নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী। আলবার্ট মাইকেলসন। মাইকেলসনের বয়স যখন কেবল ২৫ তখনই তিনি আলোর বেগ নির্ণয় করেন যার মান ছিল, ২,৯৯,৯১০±৫০ কি.মি./সেকেন্ড। আলোর বেগের এই মানটি পূর্বের যেকোন মান থেকে ২০ গুন বেশি সঠিক ছিল।

মাইকেলসন পৃথিবীর ঘূর্ণনের জন্য আলোর বেগে যে তারতম্য পাওয়ার কথা তা খুঁজে বের করার জন্য একটি পরীক্ষার কথা কল্পনা করলেন। এ পরীক্ষায় যদি আলোর বেগের মাঝে তারতম্য পাওয়া যায় তবে ইথারের অস্তিত্ব কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পাওয়া যায়? তাহলে হয়ত ইথারের ধারণা নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা শুরু করতে হবে। মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি কিন্তু নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে কাঙ্খিত তারতম্য ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যররথ পরীক্ষা নামেই পরিচিত। তার সেই ব্যররথতার গল্প পরবর্তি কোন এক লেখায় তুলে ধরা হবে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।