প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্ক কি সত্যিই নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে?

গত বিশ বছর যাবৎ ধারণা করা হচ্ছে একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্ক অসংখ্য নতুন নিউরন বা কোষ তৈরি করতে পারে, আর এই ধারনাটিই মানুষকে আশা জাগাচ্ছে যে কৃত্রিম উপায়ে কোষ উৎপাদন সম্ভব। স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি , নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য গবেষকদের গবেষণা – এ সব কিছুই হতাশা বা অ্যালজেইমার ব্যাধি ( Alzheimer’s Disease)  এর মত অসুখ বিসুখের চিকিৎসা বা প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু নেচার (Nature)  জার্নালে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত গবেষণার কারণে উপরোক্ত আশাটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিপুর্ণ মানুষ হিসেবে ক্রমবিকাশ লাভের পর অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়েই কমতে শুরু করে এবং প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পর পুরোপুরিভাবে থেমে যায়।

হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন, টরেন্টো, কানাডা এর স্নায়ুতত্ত্ববিদ Paul Frankland বলেন, “প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ এবং বানরের ব্রেইনে নতুন স্নায়ুকোষ খোঁজার গবেষণার ফলাফল অনেককেই হতাশ করবে”।

“নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়াটি কার্যগতভাবে আসলে খুবই দূর্বল”, বলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী Rene Hen.

তবে সকলের মতেই এ গবেষণাগুলোতে আসলে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে। টিস্যুগুলো পরিক্ষানীরিক্ষা করার পদ্ধতি, রোগীর মানসিক অবস্থার ঘটনা কাহিনী, তাদের ব্রেইনে কোনো ধরনের প্রদাহ ছিল কিনা, এসবের দ্বারা হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব কেন গবেষকরা এখনো পুরোপুরিভাবে সফল হতে পারেননি।

 

সূত্রপাতঃ

নিউরন বা স্নায়ুকোষ সৃষ্টির প্রথম ঘটনা দেখা যায় ১৯৯৮ সালে। ক্যান্সার রোগীদের উপর জীবিত অবস্থাতেই একটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। নাম ছিল- ব্রোমোডিঅক্সিইউরিডিন (Bromodeoxyuridine)। রাসায়নিকটি প্রয়োগের পর তাদের মস্থিষ্কে নতুন বিভাজিত কোষ দেখা যায়। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে যেমন নতুন কোষগুলো ছড়ানো অবস্থায় থাকে এটা কিছুটা সেরকম। স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের Jonas Frisen’s ল্যাবের একটি গবেষণা এই বিষয়টি কে আর শক্তিশালী করে। ৫৫ জন রোগ্রাক্রান্ত মানুষের প্রত্যেকের ব্রেইন টিস্যুর প্রতিটি নিউরনের ‘কার্বন ডেটিং’ করা হয়। এ পদ্ধতিতে নিউরনের বয়স নির্ধারণ করার পর সিদ্ধান্তে আসা হয় ঐ মানুষগুলোর মস্তিষ্কের ডেন্টেট জাইরাস (Dentate gyrus)এ প্রায় ৭০০টি পুরাতন নিউরন নতুন নিউরন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

Arturo Alvarez-Buylla (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো) ১৯৮০ সাল থেকে গবেষণা করছেন মস্তিষ্কের নতুন কোষ উৎপাদনের ক্ষমতার উপর। কিন্তু তিনিও সন্দেহপ্রবণ। তিনি দেখিয়েছিলেন (Rodent) বা নিচু শ্রেণীর তীক্ষ্ণ দাঁত বিশিষ্ট কিছু প্রাণীদের মস্তিষ্কে স্টেম সেল কীভাবে নতুন অংশ পুনরুৎপাদন করে। কিন্তু কার্বন ডেটিং এ প্রাপ্ত ফলাফল এটি প্রমাণ করে না যে, মানব মস্তিষ্কেও ঠিক একই বিষয়টিই ঘটে।

মানব মস্তিষ্কের বিষয়টির ক্ষেত্রে অনেক ধাপ রয়েছে। আবার অনেক ধাপে ধারণা করে নেওয়া হয়েছে এমন বিষয়ও রয়েছে। যার কারনে আসল ব্যাপারটিতে পৌঁছানোর আগে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

Buylla এবং তাঁর দল ৫ বছর ধরে ৫৯ জন মানুষের ব্রেইন টিস্যু সংগ্রহ করেন। যাদের কেউ বা মারা গিয়েছিলেন, কারও আবার বিভিন্ন বয়সে সার্জারি করে খিঁচুনীর জন্য দায়ী টিস্যু ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ মানুষগুলোর বয়স ছিল মোটামুটি জন্মের আগ থেকে শুরু করে ৭৭ বছর পর্যন্ত। নিউরনের পূর্ণতা প্রাপ্তির বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন থাকে, এগুলোকে স্পেসিফিক প্রোটিন নামেই ডাকা হয়ে থাকে। এই প্রোটিন গুলোকে চিহ্নিত করতে ফ্লুরোসেন্ট এন্টিবডি ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসা হয়েছিল কোনও লম্বা সহজ সরল আকৃতির বাচ্চা নিউরনকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

[ইঁদুরের রেটিনায়  নতুন কোষ বিভাজন]

গবেষণাকারী এই দলটি দেখতে পেলেন, নবজাতকের ব্রেইনে একটি বড় সংখ্যায় জন্মদাতা কোষ অর্থাৎ প্রোজেনিটর সেল (progenitor cell) এবং স্টেম সেলের উপস্থিতি আছে। জন্মের সময় এই সংখ্যাটি মোটামুটি প্রতি মিলিমিটার ব্রেইন টিস্যুতে ১৬১৮টি নতুন নিউরন এরকম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কোষগুলো নতুন কোষ তৈরিতে অংশ নেয় না। এক থেকে সাত বছরের মধ্যে নতুন নিউরন সৃষ্টি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। পূর্ণবয়ষ্ক হতে হতে নতুন নিউরনের জোগান প্রায় পুরোপুরিভাবেই থেমে যায়।

Alvarez-Buylla এর মতে, “অন্যরা এ নিয়ে কী দাবী করছে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়”

অপরদিকে আবার Frisen এর মতে, এন্টিবডি মার্কার পদ্ধতিটি পুরোপুরিভাবে নির্ভরযোগ্য নয়, কারন এতে ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্স ফলাফলকে ঘোলাটে করে দিতে পারে। তিনি দাবী করেন এ পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য গবেষকেরা প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্রেইনে নতুন কোষ উৎপাদন দেখেছেন। Frankland এর মতে ,”এ তর্ক চলতেই থাকবে, আরো অনেক কিছু এখনো বাকি”।

 

 

মস্তিষ্ক কি পূর্ণ হতে পারে?

মস্তিষ্ক সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। এ যেন এক অবিরাম গ্রন্থাগার যার প্রতিটি তাক আমাদের জীবদ্দশার অতি মূল্যবান স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু এমন কি কোনো বিন্দু আছে যেখানে মস্তিষ্ক তার সংরক্ষণ ক্ষমতার চূড়ান্ত অবস্থায় পৌছায়? অন্য কথায়,মস্তিষ্ক কি ‘পূর্ণ’ হতে পারে?

উত্তরটি প্রশ্নাতীত ভাবেই হবে ‘না’। কারণ মস্তিষ্ক তার চেয়েও একটু বেশি বুদ্ধি সম্পন্ন, বেশি স্মার্ট। এ বছরের শুরুর দিকে ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ সাময়িকীর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নতুন স্মৃতিকে ধারণ করতে মস্তিষ্ক তার পুরাতন স্মৃতির সাথে গাদাগাদি করে রাখার পরিবর্তে পুরোনো তত্থ্যগুলোকেই সড়িয়ে ফেলে। আচরণগত দিক নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, নতুন তথ্যের আগমন পুরাতনকে ভুলে যাবার অন্যতম কারণ হতে পারে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা

মস্তিষ্কে যখন আমরা প্রায় একই রকম কিছু তথ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করি তখন আসলে কী ঘটে? এই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন কয়েকজন গবেষক-বিজ্ঞানী। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই ধরনের তথ্য পূর্ব থেকে বিদ্যমান তথ্যের সাথে জট পাকিয়ে যেতে চায়।

মস্তিষ্ক যখন একটি ‘নির্দিষ্ট’ স্মৃতি সংরক্ষণ করতে যায় তখন কীভাবে সে কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত হয় তা নিয়ে বিজ্ঞানী দল পরীক্ষা করলেন। যেমন একই সময়ে একটা জিনিস মনে রাখা এবং তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটা জিনিস মনে রাখা। দ্বিতীয় জিনিসটি হতে পারে প্রথম জিনিসটির বিপরীতধর্মী কোনো কিছু। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ-কারীদেরকে দুটি ভিন্ন চিত্রের সাথে কোনো একটি শব্দের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে বলা হয়। যেমন মেরিলিন মনরো এবং একটি টুপির সাথে sand শব্দটির কী সম্পর্ক বের করা।

গবেষকেরা দেখতে পেলেন টার্গেট করা স্মৃতিটি প্রায়ই যখন মনে করা হয় তখন সেই স্মৃতির জন্য মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। কিন্তু যখন ঐ গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতির আগমন ঘটে তখন মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। স্মৃতি সংক্রান্ত এমন কর্মকাণ্ড মস্তিস্কের মধ্য অঞ্চল (হিপোক্যাম্পাস) এর চেয়ে অগ্র অঞ্চল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেই বেশি ঘটে। হিপোক্যাম্পাস স্বভাবগতভাবেই স্মৃতি নষ্টের কারণ।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অনেক জটিল জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় যেমন, পরিকল্পনা প্রণয়ন,সিদ্ধান্ত গ্রহণ,স্মৃতি সংক্রান্ত বিষয় নির্বাচন করার মতো কাজের সাথে জড়িত থাকে। নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে,আমাদের মস্তিষ্কের এই অংশটি বিশেষ ধরনের কিছু স্মৃতিকে আহরণ করার জন্য হিপোক্যাম্পাস এর সমন্বয়ে কাজ করে থাকে।

যদি হিপোক্যাম্পাসকে একটি সার্চ ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে সেই ফিল্টার সমতুল্য। যা নির্ধারণ করে কোন স্মৃতিটি বেশি প্রাসঙ্গিক ও সাদৃশ্যপূর্ণ। এই অঞ্চলটিই নির্ধারণ করে একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করে ফেলা স্মৃতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ কোনো স্মৃতির ঝক্কি ছাড়াই সমতুল্য তথ্যে প্রবেশ করানোর মতো সামর্থ্যও মস্তিষ্কের থাকতে হয়।

যদি হিপোক্যাম্পাস হয় সার্চ ইঞ্জিন তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে তথ্যের ফিল্টার; image source: aboutmodafinil.com

ভুলে যাওয়া যখন ভালো লক্ষণ

দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়ারও কিছু সুবিধা আছে। উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন, আপনি আপনার ব্যাঙ্কের কার্ডটি হারিয়ে ফেলেছেন। যখন নতুন কার্ডটি আসবে তখন সেটা একটা নতুন পিন নম্বর সহ আসবে। এক্ষেত্রে গবেষণা বলে যে প্রত্যেক বার কেউ যখন নতুন পিন নম্বরটি মনে রাখতে চেষ্টা করবে, তখন পুরাতন পিন নম্বরটি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকবে। এই প্রক্রিয়া পুরনো স্মৃতিতে হটিয়ে দেবার মাধ্যমে নতুন তথ্যের উন্নতির পথ সুগম করে।

আমাদের মধ্যে অনেককেই পাওয়া যাবে যারা পুরাতন স্মৃতির সাথে নতুন সমতুল্য স্মৃতিকে মিলিয়ে ফেলার হতাশায় ভুগছেন। ধরুন,আপনি এক সপ্তাহ আগে কার পার্কিং জোনের কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন তা মনে করার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের স্মৃতি সুনির্দিষ্টভাবেই এর জন্য সংবেদনশীল, মনে রাখা দরকার ও মনে রাখা দরকার নয় এই দোটানায় উপরিপাতিত হয়। যখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন কোনো তথ্য আহরণ করি তখন আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভিতরে থাকা তথ্যের সাথে নতুন তথ্যকে সুবিন্যস্ত করে অঙ্গীভূত করে নেয়।

পূর্বের গবেষণায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে শিখি এবং নতুন তথ্য মনে রাখি তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু আগে উল্লেখিত বর্তমানের গবেষণা আলোকপাত করছে, আমরা কেন ভুলে যাই তার উপর। এবং এই ব্যাপারটার গুরত্ব অধিক হারে মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্মৃতির অভিশাপ

খুব কম সংখ্যক মানুষই জীবনের সমস্ত তথ্য খুঁটি নাটি সহ মনে রাখতে পারে, তাদের হাইপারথাইমেস্টিক সিন্ড্রোম থাকে। এমনকি যদি দিন তারিখের স্মৃতিও হয় তাহলে তারা আপনাকে নির্দিষ্ট দিনে কখন কোথায় কী করেছিল তাও বলে দিতে পারবে। যদিও এটা শুনতে অনেকের কাছেই আশীর্বাদ মনে হতে পারে, কিন্তু এই বিশেষ বৈশিষ্টের স্বল্পসংখ্যক মানুষের কাছে তাদের অসাধারণ ক্ষমতা আগুনের মতো জ্বালা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এটি একটি রোগ।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কখনো কখনো কেউ বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে পারে না তার কারণ অতীতের কোনো স্মৃতির কারণে ভিতরে থাকা অনুভূতি।

এখানের আলোচনা নির্দেশ করে যে মনে রাখা এবং ভুলে যাওয়া একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এক দিক থেকে ভুলে যাওয়া হলো নতুন স্মৃতিকে ধারণ করার একটি রাস্তা। এই হিসেবে ভুলে যাওয়াকে বলা যায় মস্তিষ্কের পূর্ণ হয়ে যাওয়া ঠেকানোর একটি মেকানিজম, যা মানুষ বিবর্তনের পথে হাজার হাজার বছরে অর্জন করেছে।

featured image: vivacomfelicidade.com