ডি ব্রগলীর কণা-তরঙ্গ দ্বৈততাঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে এক বিরাট লাফ

লুই ডি ব্রগলী ভৌতবিজ্ঞানের জগতে যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী প্রদান করে গেছেন, তা যদি আমাদের বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে প্রকাশ করা হতো, তবে শিরোনামটা বোধহয় এমনই হতো। পুরো পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রচলিত, প্রতিষ্ঠিত, বারংবার পরীক্ষিত ও প্রমাণিত তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন তত্ত্ব প্রদানের ঘটনা খুব কমবারই ঘটেছে।

আর যখনই তা ঘটেছে, তা হয়েছে যুগান্তকারী। কিন্তু, ডি ব্রগলী ছিলেন আরো একধাপ এগিয়ে। তিনি যুগান্তকারী তত্ত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে আরেক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার লুই ডি ব্রগলী কী করেছিলেন তা জেনে নেয়া যাক।

পরমাণুর বস্ত্রহরণের যে বিপ্লব উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে শুরু হয়েছিল, তাতে ১৯৯৮ সালে জে জে থমসন তার পরমাণুর মডেল প্রস্তাব করেন এবং বলেন, পরমাণুতে একটি ধনাত্বক চার্জিত পাত্রের মাঝে ঋণাত্বক চার্জিত ইলেকট্রন বিক্ষিপ্তভাবে থাকে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে জাপানি পদার্থবিদ হ্যানতারো নাগাওকা সর্বপ্রথম “কক্ষীয়” পরমাণুর ধারণা দেন। ইলেকট্রনগুলো পরমাণুতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থেকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদিক্ষণ করে, এই কথা তিনিই সর্বপ্রথম বলেন।

তবে তার তত্ত্বে নিউক্লিয়াসের ধারণা অনুপস্থিত থাকায় তা বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি। কিছুদিনের মাঝেই নাগাওকার অনুরূপ তত্ত্ব প্রদান করে এবং নিউক্লিয়াসের ধারণা দিয়ে বিপ্লব সৃষ্টি করেন বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড। [1]

রাদারফোর্ডের মডেল অনেক ঘটনার সফল ব্যাখ্যা দিলেও চিরায়ত বলবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল কিছুদিনের মাঝেই বাতিল হয়ে যায়। কারণ চিরায়ত বলবিদ্যারই অন্যতম অনুষঙ্গ “ম্যাক্সওয়েলের তাড়িতচৌম্বকীয় তত্ত্ব” রাদারফোর্ডের মডেলে প্রয়োগ করলে, রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে পরমাণুর স্থায়ীত্বের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

এরপর ১৯১৩ সালে গুরু রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলকে বাঁচানোর জন্য নীলস বোর পরমাণুর অভ্যন্তরে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করেন। এতদিনের প্রতিষ্ঠিত তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলিকেও তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। বলে দেন, ওসব নিয়ম পরমাণুর অভ্যন্তরে খাটবেনা। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব উঠে যায়।

চিত্রঃ শনি গ্রহকে ধনাত্বক আধান ও শনির বলয়কে ইলেকট্রনের কক্ষপথ ধারণা করে সর্বপ্রথম কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা দেন বিজ্ঞানী হ্যানতারো নাগাওকা।

কিন্তু, এই ধন্য ধন্য রব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্ণালীর মিহিগড়ন(Fine structure), জিম্যান ক্রিয়া, স্টার্ক ক্রিয়া ইত্যাদি ব্যাখ্যায় অপারগ হওয়ার পর বোর পরমাণু মডেলকে বিদায় নেবার জন্য তৈরি হতে হয়। তারপরেও ১৯১৬ সালে ইলেকট্রনকে কণা ধরে কক্ষীয় পরমাণুতে শেষবারের মত হাত দিতে মঞ্চে আসেন বিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফিল্ড।

সমারফিল্ড নতুন দুইটা কোয়ান্টাম সংখ্যা যোগ করলেও তার পক্ষে কক্ষীয় পরমাণুর ধারণা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।[2] কক্ষীয় পরমাণুর সব আয়োজন ভন্ডুল করে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী লুই ডি ব্রগলী।

লুই ডি ব্রগলী আসলে যে কাজ করেছিলেন তা এতটাই প্রথাবিরোধী ও সাধারণ চিন্তাবিরোধী ছিল যে, তার গবেষণাপত্র অনুমোদনের জন্য যে ৩ জন অধ্যাপক দায়িত্বে ছিলেন, তারা সেই গবেষণাপত্রের কিছুই বুঝতে পারেন নি।

তার গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের নিকট পাঠানো হলে আইনস্টাইন তা স্বীকৃত দেন এবং আইনস্টাইনের স্বীকৃতি লাভের পর লুই ডি ব্রগলী পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।[3] লুই ডি ব্রগলীর কাজটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক শতাব্দী পূর্বে, ‘আলো কি কণা? নাকি তরঙ্গ?’ বিষয়ক ঐতিহাসিক বিতর্কে।

আইজ্যাক নিউটন বললেন আলো হলো কণা, তার সমসাময়িক ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন তা মানলেন না, বললেন আলো তরঙ্গ। টমাস ইয়াং তো তার বিখ্যাত দ্বিচিড় পরীক্ষার মাধ্যমে আলোর ব্যতিচার ঘটিয়ে সুস্পষ্ট দেখিয়ে দিলেন যে, আলো তরঙ্গ। বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলও কিছু ধারণা সংস্কার করে তরঙ্গ পথের অনুসারী হলেন। আবার আলোক তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কিত পরীক্ষার মাধ্যমে হার্জ প্রমাণ করলেন আলো হলো কণা।

বিতর্কের যখন এই অবস্থা, তখন সব পথ – সব মত উপেক্ষা করলেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। প্ল্যাঙ্ক ফিরিয়ে আনলেন আলোর কণা তত্ত্বকে, তবে সংস্কার করে। বলা যেতে পারে আলোর কণা তত্ত্বকে বাদ দিয়ে প্যাকেট তত্ত্ব চালু করলেন, যা আমরা আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলে জানি। আইনস্টাইন তা মেনে নিয়ে বললেন, আলোর তরঙ্গমুখ অসংখ্য কণা দ্বারা গঠিত বলে কল্পনা করা যায়। অর্থাৎ, আইনস্টাইন নিয়ে আসলেন আলোক তরঙ্গের কণাধর্ম। এই তত্ত্বটিই বিজ্ঞানী মহলে “The particle nature of light wave” নামে পরিচিত। [4]

আলো কণা নাকি তরঙ্গ বিতর্কের এই অবস্থায় মঞ্চে প্রবেশ করলেন ডি ব্রগলী। তিনি ভাবলেন, তরঙ্গের কণাধর্ম যদি থেকে থাকে তবে কি কণারও তরঙ্গধর্ম থাকতে পারে? প্রথমেই তিনি এই ধারণা প্রকাশ করেন নি। পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রনকে তিনি কোনো কণা কল্পনা না করে স্থির তরঙ্গরূপে কল্পনা করলেন। ব্রগলী বললেন, পরমাণুতে ইলেকট্রনের আবদ্ধ যাত্রাপথের পরিধির মান হবে, ইলেকট্রনের সাথে জড়িত সেই স্থির তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর পূর্ণগুণিতক।

এর ফলে হিসাব করে যা পাওয়া গেল, তা পরীক্ষালব্ধ মানের সাথে একদম মিলে যায়। আবার বোর তার পরমাণু মডেলে যে তথ্যগুলি স্বীকার্য হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন, সেটার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ডি ব্রগলীর অনুমান থেকে পাওয়া গেছিল। বড় কথা হল ইলেকট্রনকে তরঙ্গরূপে চলমান ধরলে তাড়িতচৌম্বকের নিয়মগুলি অস্বীকার করা লাগেনা।

রাদারফোর্ড ও বোর যেভাবে বলেছিলেন যে, ওসব নিয়ম খাটবে না, তা ডি ব্রগলীকে বলতে হয়নি। কারণ চার্জিত কণা শক্তি বিকিরণ করে মন্দনপ্রাপ্ত হলেও তরঙ্গের ক্ষেত্রে শক্তি বিকিরণ করে তার বেগ মন্দনপ্রাপ্ত হয় না। তাই স্থির তরঙ্গের এই মডেল তাড়িতচৌম্বকের নিয়মে আক্রোশ থেকেও মুক্ত ছিল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার রূপকার বিজ্ঞানী “লুইস ভিক্টর পিয়্যেরে রেইমন্ড ৭ম ডিউক ডি ব্রগলী”

ইলেকট্রনে এমন একটি স্থিরতরঙ্গ জড়িয়ে দিয়ে সফলতা লাভের পর ডি ব্রগলী চলে গেলেন যেকোনো বস্তুতে। বললেন, আমাদের সাথে এমনকি সবকিছুর সাথেই নাকি একটা তরঙ্গ আছে। প্রতিটি জড়বস্তুতে জড়িত এই তরঙ্গকে ডি ব্রগলীর তরঙ্গ বা বস্তু তরঙ্গ বা ম্যাটার ওয়েভ বলা হয়। ডি ব্রগলীর এই বক্তব্য শোনার পর থেকে দর্শনবাদী আর প্রমাণবাদীরা চিৎকার করে উঠলেন, প্রমাণ চাই! প্রমাণ চাই! বলে।

ডি ব্রগলী অঙ্ক কষে দেখালেন যে, যেকোনো গতিশীল বস্তুতে এই স্থিরতরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান হচ্ছে h/p. যেখানে h হচ্ছে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক এবং p হচ্ছে গতিশীল বস্তুটির ভরবেগ। এখানে ব্যবহৃত প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক h এর মান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যা দেখি, যা নিয়ে চলাফেরা করি তাতে এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান এতই ছোট যে, জাগতিক কোনো যন্ত্রের সাহায্যে তা পরিমাপ করা সম্ভব না। তাহলে কি পরবর্তীতে ডি ব্রগলীর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি?

অবশ্যই প্রমাণিত হয়েছে। অণু-পরমাণুর ক্ষুদ্র জগতে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্যর মান তাদের সাপেক্ষে বৃহৎ হওয়ায় তা অনুভূতিগ্রাহ্য হয়। ডি ব্রগলী তার তত্ত্বের একটি প্রমাণ প্রস্তাব করেছিলেন। তরঙ্গের ধর্ম হচ্ছে সরু ছিদ্র বা তীক্ষ্ণ ধারের পাশ দিয়ে যাবার সময় তরঙ্গের অভিমুখ কিছুটা বিচ্যুত হয়ে যায়। তরঙ্গের এই ধর্মের নাম অপবর্তন। এটা শুধু তরঙ্গের ক্ষেত্রেই হয়, কণাদের ক্ষেত্রে এরকম হয় না। ডি ব্রগলী তাই ইলেকট্রনকে সরু কোনো ছিদ্রের মধ্য দিয়ে পাঠিয়ে তার অপবর্তন হয় কি না তা দেখতে চেয়েছিলেন।

যদি অপবর্তন ঘটে তবে ইলেকট্রন তরঙ্গ; না ঘটলে ইলেকট্রন একটি কণা। এর কিছুদিনের মাঝেই বিজ্ঞানী এলেসার বিভিন্ন কেলাসের অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রন পাঠিয়ে অপবর্তন পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেও তিনি পরীক্ষা করতে পারেন নি। শেষে ১৯২৭ সালে ডেভিসন ও লেস্টার জারমার এবং স্বতন্ত্রভাবে জর্জ পেজেট থমসন এই পরীক্ষা করে দেখলেন ইলেকট্রন সত্যি সত্যিই অপবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ ইলেকট্রনেরও তরঙ্গধর্ম রয়েছে এবং ডি ব্রগলীর কথাও সঠিক![5]

আইনস্টাইন বলেছিলেন, তরঙ্গ কণার ন্যায় আচরণ করতে পারে। ডি ব্রগলী পরে বললেন, কণাও তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ কণা-তরঙ্গের দ্বৈতাদ্বৈত রূপ ডি ব্রগলীই প্রথম সার্থকভাবে তুলে ধরেছিলেন। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি মজবুতকরণে তার এই সাহসী পদক্ষেপের তাৎপর্য বিশাল।

চিত্রঃ কণা-তরঙ্গ দ্বৈততার পরীক্ষামূলক প্রমাণ দানকারী বিজ্ঞানী ক্লিনটন ডেভিসন(বামে) ও লেস্টার জারমার(ডানে)

ইতিহাস অনেক রসিক। স্যার জে জে থমসন ইলেকট্রন নামক কণা আবিস্কার করেছিলেন এবং গ্যাসের তড়িৎ পরিবাহীতার উপর উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। আবার তারই পুত্র জে পি থমসন ইলেকট্রনকে তরঙ্গ প্রমাণ করে ডেভিসনের সাথে যৌথভাবে ১৯৩৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ইলেকট্রনকে কণা প্রমাণকারী পিতা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯০৬ সালে,[6] ৩০ বছর পর পুত্র নোবেল পুরস্কার পেলেন ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম প্রমাণ করে।[7]

চিত্রঃ লুইস ডি ব্রগলীর তত্ত্ব অনুসারে সংশোধিত নীলস বোরের পরমাণুর মডেলের চেহারা, এটি তরঙ্গ বলবিদ্যা পরমাণু মডেল বলেও পরিচিত।

লুই ডি ব্রগলীও বাদ যাননি! ১৯২৭ সালে প্রমাণিত হবার পরপরই ১৯২৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে তিনি নোবেল লাভ করেন।[8] কণা আর তরঙ্গের মাঝের সকল বিভেদ দূর করে কণা-তরঙ্গকে মিলেমিশে একাকার করে দিয়ে গেছেন লুই ডি ব্রগলী। সাথে সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসে ডি ব্রগলী নিজেও একাকার হয়ে গেছেন।

তথ্যসূত্রঃ

[1] 22-23, Atomic model- Nagaoka’s Saturnian Model, Compendium of Quantum Physics, Book 2009. (http://www.link.springer.com)

[2] ৩য় অধ্যায়-উৎকেন্দ্রিক সমারফিল্ড, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[3] ৪র্থ অধ্যায়-দ্বৈততার রূপকার, কণা-কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ-লেখকঃ রেজা এলিয়েন, রোদেলা প্রকাশনী

[4] http://www.reference.com/science/meant-dual-wave-particle-nature-light-52b1a5ca6b8c8e5c

[5] http://www.en.wikipedia./wiki/Davisson-Germer_experiment

[6] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1906

[7] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1937

[8] http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1929

feature image: sciencenews.org

পঞ্চম মৌলিক বলের সন্ধান

এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্বের নিপুণ কাঠামো টিকে আছে চারটি মৌলিক বলের কল্যাণে। এরা হলো মহাকর্ষ, তড়িচ্চুম্বকীয় এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল। কিন্তু গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির একদল পদার্থবিদ সর্বপ্রথম সম্ভাব্য নতুন আরেকটি (পঞ্চম) মৌলিক বলের প্রমাণ পান। এই বলটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মহাবিশ্বের অনেকগুলো রহস্যের সমাধান হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার রহস্যের সমাধানেরও ইঙ্গিত। ব্যপারটি ইদানিং আবারো আলোচনায় এলো।

গত ১৪ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল একই মতের পক্ষ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে সেই ফলাফলগুলো বিচার করে দেখলেন যে সত্যিই নতুন একটি বলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রধান গবেষক জোনাথন ফেং বলেন, “সত্য হয়ে থাকলে এটা হবে একটি বৈপ্লবিক আবিষ্কার। আরো পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এর সত্যতা পাওয়া যায় তবে পঞ্চম বলের এই আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল পাল্টে দেবে। মৌলিক বলদের একীভবন ও ডার্ক ম্যাটার গবেষণার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকবে।”

বিষয়টি প্রথম হাঙ্গেরিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের এক দল গবেষকের নজরে আসে। তারা দেখলেন উচ্চ-শক্তির প্রোটন রশ্মিকে লিথিয়াম-৭ এর দিকে নিক্ষেপ করলে ধ্বংসাবশেষের সাথে খুবই হালকা একটি অতিপারমাণবিক কণিকা পাওয়া যায়। এটাকে তখন একটি নতুন ধরনের বোসন কণিকা মনে

করেছিলেন। এটা ছিল ইলেকট্রনের চেয়ে মাত্র ৩০ গুণ ভারী। কণাপদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এর কোনো পূর্বাভাস ছিল না। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে এখন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক গুচ্ছ সমীকরণই সবচেয়ে মোক্ষম ভূমিকা পালন করছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, প্রত্যেকটি মৌলিক বলেরই নিজ নিজ বোসন কণিকা আছে। সবল বলের বাহক হচ্ছে গ্লুয়ন, তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে বহন করে আলোক কণা ফোটন এবং Wও Zবোসন করেদুর্বলনিউক্লীয়বলবহনেরকাজ।কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের দুর্বলতা হলো, আমরা এখনো মহাকর্ষের জন্য কোনো বোসন কণিকা খুঁজে পাইনি। তবে অনুমান করা হচ্ছে মহাকর্ষের ক্ষেত্রে বল বহনের কাজটি করবে গ্র্যাভিটন নামক কণাটি। একে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

হাঙ্গেরির দলটি প্রথমে মনে করেছিলেন নতুন পাওয়া এই কণিকাটি হয়তো কোনো ধরনের ডার্ক ফোটন হবে। ডার্ক ম্যাটারের ক্রিয়া বহনকারী কল্পিত কণিকাকে বলা হয় ডার্ক ফোটন। তাদের গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফেং বলেন“উনারা দাবি করতে পারেননি যে এটি নতুন একটি মৌলিক বলের ফলে হয়েছে। তাদের মতে এই বাড়তি জিনিসটি ছিল একটি নতুন কণিকার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে এটা কি বস্তুকণা (matter particle)ছিল নাকি বলবাহীকণা (force-carrying) ছিল।”

বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানতে ফেং তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রাথমিক উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষা করে দেখেন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরীক্ষাগুলোও। এরপরই শক্তিশালী তাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেল যে এই নতুন প্রতিক্রিয়ার পেছনে বস্তুকণা বা ডার্ক ফোটন কারোরই হাত নেই। বরং তাদের হিসাব-নিকাশ থেকে দেখা গেল যে এটা প্রকৃতির পঞ্চম বলের নিজস্ব বোসন হতে পারে। ডার্ক ম্যাটারসহ মহাবিশ্বের রহস্যময় নানান কিছুর ব্যাখ্যা এর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

কাল্পনিক নতুন এই বোসনকে আপাতত বলা হচ্ছে প্রোটোফোবিক এক্স। এর বিস্ময়কর দিক হলো, এটি শুধু ইলেকট্রন এবং নিউট্রনের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাও খুবই স্বল্প পাল্লায়, যার ফলে একে শনাক্ত করা খুবই কঠিন ছিল। আরেক গবেষক টিমোথি টেইট বলেন, “এর আগে এরকম বৈশিষ্ট্যধারী কোনো বোসন কণিকা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি। একে আমরা কখনো কখনো এক্স বোসন বলে থাকি, যেখানে এক্স অর্থ হলোঅজানা।”

এই গবেষণাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মে মাসে। তখন এটি প্রকাশিত হয় প্রি-প্রিন্ট সাইট arXiv.org-তে। কিন্তু এখন এর পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন হবার পর এটি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস এর মতো জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তা হলো, আমরা একটি বিস্ময়কর কণা পেলাম যাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ

হিসাব-নিকাশ বলছে এটি প্রকৃতির পঞ্চম মৌলিক বলের বাহক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এ বিষয়ে পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনো যথেষ্ট হয়নি। তবে সারা বিশ্বের গবেষকরা এর পেছনে লেগেছেন, যার ফলে আশা করা হচ্ছে এক বছরের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া যাবে।

ফেং বলেন, “কণিকাটি খুব হালকা হবার কারণে এর প্রতিক্রিয়াও খুব দুর্বল। তবে সারা বিশ্বে গবেষকদের অনেকগুলো দল বিভিন্ন পরীক্ষাগারে কাজ করছেন। প্রাথমিক সেই ইঙ্গিতের কারণে সবাই এখন অন্তত এটুকু জানেন যে কোথায় খুঁজতে হবে একে।”কণিকাটি ভারী না হলেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে থেকেই এমন হালকা কণিকা তৈরি করার মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের হাতে আছে।

কী হবে যদি সত্যিই পাওয়া যায় এই পঞ্চম বল?আমরা এখনো সেটা থেকে বেশ দূরে আছি। তবে ফেং বলছেন, বলটি তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল ও সবল নিউক্লীয় বলের সাথে যুক্ত হয়ে একটি সুপার ফান্ডামেন্টাল বল গঠন করতে পারে, যে বলটি এর নিজস্ব কণা ও বলের মাধ্যমে ডার্ক সেক্টরে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, “হতে পারে এই দুটি সেকটর অজানা কোনো উপায়ে একে অপরের সাথে সম্পর্ক রেখে চলছে।” হাঙ্গেরির এই পরীক্ষার ফলে হয়তো আমরা এই ডার্ক সেক্টরের বলকেই প্রোটোফোবিক বল হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। অন্য দিকে আবার ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার জন্যে পরিচালিত গবেষণার সাথেও এই ফলাফলের মিল রয়েছে। স্টার ওয়ারস মুভি সিরিজের ফোর্সের অন্ধকার (ডার্ক) ও আলোকীয় অংশের সাথেও মিল আছে এর।

নোট ১:এখনপর্যন্তজানামৌলিকবলসমূহ

প্রথমহলোমহাকর্ষ।নিউটনেরপরআইনস্টাইনতারসার্বিকআপেক্ষিকতত্ত্বেরমাধ্যমেমহাকর্ষেরউন্নতরূপপ্রদানকরেন১৯১৫সালে।তত্ত্বটিপ্রযোজ্যমহাবিশ্বেরবড়স্কেলেরকাঠামোসমূহেরক্ষেত্রে।এখানেমহাকর্ষকেতুলেধরাহয়েছেস্থান-কালেরবক্রতাহিসেবে।

দ্বিতীয় প্রকার মৌলিক বল হলো তড়িচ্চুম্বকীয় বল। বৈদ্যুতিক চার্জধারী কণারা এই বলের মাধ্যমে কাজ করে। অণু ও পরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। তৃতীয় মৌলিক বল সবল নিউক্লীয় বল (সংক্ষেপে শুধু ‘সবল বল’)। এর কাজ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠনকারী কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখা। আর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জন্যে দায়ী হলো চতুর্থ মৌলিক বল দুর্বল নিউক্লীয় বল।

ম্যাক্সওয়েল, ফ্যারাডে ও ওয়েরেস্টেডদের হাত ধরে ১৮৩০ এর দশকে তড়িৎ ও চুম্বক বলকে একীভূত করা সম্ভব হয়। ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল বল দুটির সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব (ফিল্ড থিওরি) প্রকাশ করেন। ম্যাক্সওয়েল দেখেছিলেন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ সব সময় একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে। সেই বেগটি হয়ে দাঁড়ালো আলোর বেগে সমান। আলোর বেগ ধ্রুব কেন তা তখন মাথায় না ঢুকলেও সেই ধ্রুবতা কাজে লাগিয়েই ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন স্থান-কালকে একত্র করে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরি করেন। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সন্ধি করলেও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব এখনো অন্য বলদের সাথে একমত হয়নি। ভাইল, কালুজা এবং স্বয়ং আইনস্টাইন নিজেও এর পেছনে সময় দিয়ে গেছেন, কিন্তু সফলতার মুখ মেলেনি এখনো। অন্যদিকে ১৯৬০ এর দশকে শেলডন গ্লশো, আব্দুস সালাম ও স্টিভেন উইনবার্গের হাত ধরে তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে একত্র করার তত্ত্ব পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে আসে তাদের মতের পক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ। সমন্বিত তত্ত্বটিকে এখন ইলেকট্রোউইক থিওরি বলা হয়। ১৯৭৯ সালে তারা এ জন্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম সার্নের গবেষণাগারে ডাব্লিও এবং জেড বোসন তৈরি করা সম্ভব হয়।

ইলেকট্রোউইক থিওরিকে সবল বলের সাথে একইসাথে ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্ল্যাশো ও জর্জি প্রথম একটি গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি দেন। পরে সালাম ও জোগেশ পাটিও একই রকম মডেল দাঁড় করান। তৈরি হয় এরকম নানান মডেল। তবে এসব মডেলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেতে খুব উচ্চ শক্তির পরীক্ষার প্রয়োজন বলে তা এখনো সম্ভব হয়নি।

কিন্তু মহাকর্ষ এখনো অন্যদের সাথে সন্ধি করার কোনোরকম মানসিকতা দেখাচ্ছে না। এ অবস্থায় আরেকটি বল পাওয়া গেলে থিওরি অব এভরিথিং প্রস্তুত করতে খাটুনি একটু বাড়বে বৈকি। অবশ্য আগেই আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি যে একে অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেয়া মহাকর্ষের মতো কঠিন হবে না।

নোট ২:

নতুন মৌলিক বলটি সম্পর্কে এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। অনেক সময়ই এমন হয় যে তথ্য-উপাত্তকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে না পারার কারণে ভুল জিনিসকে প্রমাণিত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যেমন কিছু দিন আগেই গুঞ্জন উঠেছিল, নতুন একটি মৌলিক কণিকা খুঁজে পাওয়া গেছে। পরে আগস্টের শুরুতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্ন অফিসিয়ালি

 

untitled-4

জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যটি সঠিক নয়। আপাতত কোনো মৌলিক বল পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে সার্নের গবেষণাগারে দুই দুইবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়, আলোর চেয়ে বেশি বেগ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সন্দেহ যায়নি। পরে ২০১২ সালের মার্চে এসে দেখা যায় পরীক্ষায় ভুল ছিল।

তবে মৌলিক বল খুঁজে পাবার এ ব্যাপারটি সেরকম নয় বলেই মনে হয়। অন্তত এর ভাবভঙ্গী দেখে তাই মনে হচ্ছে। কারণ এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুর সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। তাই আমরা চেয়ে থাকতে পারি নতুন কিছুর আশায়।

তথ্যসূত্র                  

১.http://earthsky.org/space/physicists-confirm-a-possible-5th-force

২.http://www.sciencealert.com/new-study-confirms-physicists-might-have-spotted-a-fifth-force-of-nature

৩.http://www.sciencealert.com/physicists-think-they-might-have-just-detected-a-fifth-force-of-nature

৪.http://arxiv.org/abs/1608.03591

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Unified_field_theory#History

 

পানির সুরক্ষায় প্লাস্টিকের বল

‘শেড বল’ পানিকে ময়লা-আবর্জনা, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। লস এঞ্জেলস শহরে পানি নিরাপদ রাখার জন্য এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ৯৬ মিলিয়ন প্লাস্টিকের বল কাজে লাগানো হয়েছে সেখানে।

এত এত প্লাস্টিকের বল দিয়ে বোঝাই জলাধারগুলোকে দেখলে হয়তো বল দিয়ে বানানো বিশালাকৃতির একটা কূপ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে হবে। এই শেড বলগুলো ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রতিরোধ করে সূর্যরশ্মিকে পানির নাগাল পাওয়া থেকে বাধা দেয়।

জলাধারগুলোর নিম্নদেশের পানিতে ব্রোমাইড এবং ক্লোরিন উভয় বিদ্যমান যেগুলো সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে ‘ব্রোমেট’ গঠন করে। ব্রোমেট একটি যৌগিক পদার্থ যা মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বলগুলো বাষ্পীভবন প্রতিরোধেও সাহায্য করার মাধ্যমে প্রতি বছর এক বিলিয়ন লিটার পানি সঞ্চয় করতে পারে।

featured image: inhabitat.com

কংক্রিটের ফাটল সারাবে ছত্রাক

শরীরের কোথাও কেটে গেলে যেমন নিজে নিজেই জায়গাটি সেরে উঠে ঠিক সেভাবেই ছত্রাকও কোন অবকাঠামোতে ফাটল ধরলে নিজে থেকেই সেটাকে সারিয়ে তুলতে পারবে এমনটাই দাবি করছেন বিংগহামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। Trichoderma reesei নামক এক ছত্রাককে কাজে লাগানো হবে এতে।

বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক নিয়ে পরীক্ষা করা হয় যে কোন ছত্রাক ফাটল সারাতে সাহায্য করবে; Image Source: Scientific American

কংক্রিট বড় বড় সব অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এ অবকাঠামোগুলোকে বিভিন্ন কারণে প্রচণ্ড বল, চাপ সহ্য করতে হয়। তাই কংক্রিটে যদি ছোট ফাটলও তৈরি হয় তাতে এর ভিতর পানি বা অক্সিজেন ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কংক্রিটের ভেতরে থাকে প্রসারণ বা টান সহ্য করার জন্য রড। এই রডগুলো আবার পানি বা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে এতে ফাটল ধরতে পারে যেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অনেক কঠিন। এর জন্য অনেক জনবল এবং অর্থ প্রয়োজন।

Trichoderma reesei নামক ছত্রাক; Image Source: Scientific American

এসব কারণে বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন এমন কিছু উপায় আবিষ্কার করা যেটা নিজে নিজেই ফাটল ঘটলে সারিয়ে তুলবে। বিজ্ঞানীদের তত্ত্বটি এমন যে কংক্রিটের মধ্যে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে। আবার এই ছত্রাকও ক্যালসিয়ামযুক্ত পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত। তাই বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে যদি কংক্রিট তৈরির প্রাথমিক অবস্থায়ই এই ছত্রাকগুলোকে কংক্রিট তৈরির অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় তাহলে পরে গিয়ে যখন এতে ফাটল ধরবে তখন যদি এর ভিতরে পানি যায় তাহলে এই ছত্রাকগুলো পানির সংস্পর্শে এসে অঙ্কুরিত হতে পারবে এবং কংক্রিটের ভিতর জন্মাতে পারবে। এরফলে ফাটলের এখানে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কেলাস তৈরি হবে এবং ফাটলকে মিলিয়ে দিতে সাহায্য করবে। এখনও এই তত্ত্ব পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। তবে খুব শিগগিরি বিজ্ঞানীরা বাস্তবে এর প্রয়োগ শুরু করবেন।

তথ্যসূত্র- সায়েন্টিফিক আমেরিকান

ফিচার ইমেজঃ liftrightconcrete.com

পঞ্চম মৌলিক বলের সন্ধান

এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্বের নিপুণ কাঠামো টিকে আছে চারটি মৌলিক বলের কল্যাণে। এরা হলো মহাকর্ষ, তড়িচ্চুম্বকীয় এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল। কিন্তু গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির একদল পদার্থবিদ সর্বপ্রথম সম্ভাব্য নতুন আরেকটি (পঞ্চম) মৌলিক বলের প্রমাণ পান। এই বলটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মহাবিশ্বের অনেকগুলো রহস্যের সমাধান হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার রহস্যের সমাধানেরও ইঙ্গিত। ব্যপারটি ইদানিং আবারো আলোচনায় এলো।

গত ১৪ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল একই মতের পক্ষ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে সেই ফলাফলগুলো বিচার করে দেখলেন যে সত্যিই নতুন একটি বলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রধান গবেষক জোনাথন ফেং বলেন, “সত্য হয়ে থাকলে এটা হবে একটি বৈপ্লবিক আবিষ্কার। আরো পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এর সত্যতা পাওয়া যায় তবে পঞ্চম বলের এই আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল পাল্টে দেবে। মৌলিক বলদের একীভবন ও ডার্ক ম্যাটার গবেষণার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকবে।”

বিষয়টি প্রথম হাঙ্গেরিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের এক দল গবেষকের নজরে আসে। তারা দেখলেন উচ্চ-শক্তির প্রোটন রশ্মিকে লিথিয়াম-৭ এর দিকে নিক্ষেপ করলে ধ্বংসাবশেষের সাথে খুবই হালকা একটি অতিপারমাণবিক কণিকা পাওয়া যায়। এটাকে তখন একটি নতুন ধরনের বোসন কণিকা মনে

করেছিলেন। এটা ছিল ইলেকট্রনের চেয়ে মাত্র ৩০ গুণ ভারী। কণাপদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এর কোনো পূর্বাভাস ছিল না। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে এখন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক গুচ্ছ সমীকরণই সবচেয়ে মোক্ষম ভূমিকা পালন করছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, প্রত্যেকটি মৌলিক বলেরই নিজ নিজ বোসন কণিকা আছে। সবল বলের বাহক হচ্ছে গ্লুয়ন, তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে বহন করে আলোক কণা ফোটন এবং Wও Zবোসন করেদুর্বলনিউক্লীয়বলবহনেরকাজ।কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের দুর্বলতা হলো, আমরা এখনো মহাকর্ষের জন্য কোনো বোসন কণিকা খুঁজে পাইনি। তবে অনুমান করা হচ্ছে মহাকর্ষের ক্ষেত্রে বল বহনের কাজটি করবে গ্র্যাভিটন নামক কণাটি। একে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

হাঙ্গেরির দলটি প্রথমে মনে করেছিলেন নতুন পাওয়া এই কণিকাটি হয়তো কোনো ধরনের ডার্ক ফোটন হবে। ডার্ক ম্যাটারের ক্রিয়া বহনকারী কল্পিত কণিকাকে বলা হয় ডার্ক ফোটন। তাদের গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফেং বলেন“উনারা দাবি করতে পারেননি যে এটি নতুন একটি মৌলিক বলের ফলে হয়েছে। তাদের মতে এই বাড়তি জিনিসটি ছিল একটি নতুন কণিকার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে এটা কি বস্তুকণা (matter particle)ছিল নাকি বলবাহীকণা (force-carrying) ছিল।”

বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানতে ফেং তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রাথমিক উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষা করে দেখেন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরীক্ষাগুলোও। এরপরই শক্তিশালী তাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেল যে এই নতুন প্রতিক্রিয়ার পেছনে বস্তুকণা বা ডার্ক ফোটন কারোরই হাত নেই। বরং তাদের হিসাব-নিকাশ থেকে দেখা গেল যে এটা প্রকৃতির পঞ্চম বলের নিজস্ব বোসন হতে পারে। ডার্ক ম্যাটারসহ মহাবিশ্বের রহস্যময় নানান কিছুর ব্যাখ্যা এর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

কাল্পনিক নতুন এই বোসনকে আপাতত বলা হচ্ছে প্রোটোফোবিক এক্স। এর বিস্ময়কর দিক হলো, এটি শুধু ইলেকট্রন এবং নিউট্রনের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাও খুবই স্বল্প পাল্লায়, যার ফলে একে শনাক্ত করা খুবই কঠিন ছিল। আরেক গবেষক টিমোথি টেইট বলেন, “এর আগে এরকম বৈশিষ্ট্যধারী কোনো বোসন কণিকা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি। একে আমরা কখনো কখনো এক্স বোসন বলে থাকি, যেখানে এক্স অর্থ হলোঅজানা।”

এই গবেষণাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মে মাসে। তখন এটি প্রকাশিত হয় প্রি-প্রিন্ট সাইট arXiv.org-তে। কিন্তু এখন এর পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন হবার পর এটি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস এর মতো জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তা হলো, আমরা একটি বিস্ময়কর কণা পেলাম যাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ

হিসাব-নিকাশ বলছে এটি প্রকৃতির পঞ্চম মৌলিক বলের বাহক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এ বিষয়ে পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনো যথেষ্ট হয়নি। তবে সারা বিশ্বের গবেষকরা এর পেছনে লেগেছেন, যার ফলে আশা করা হচ্ছে এক বছরের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া যাবে।

ফেং বলেন, “কণিকাটি খুব হালকা হবার কারণে এর প্রতিক্রিয়াও খুব দুর্বল। তবে সারা বিশ্বে গবেষকদের অনেকগুলো দল বিভিন্ন পরীক্ষাগারে কাজ করছেন। প্রাথমিক সেই ইঙ্গিতের কারণে সবাই এখন অন্তত এটুকু জানেন যে কোথায় খুঁজতে হবে একে।”কণিকাটি ভারী না হলেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে থেকেই এমন হালকা কণিকা তৈরি করার মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের হাতে আছে।

কী হবে যদি সত্যিই পাওয়া যায় এই পঞ্চম বল?আমরা এখনো সেটা থেকে বেশ দূরে আছি। তবে ফেং বলছেন, বলটি তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল ও সবল নিউক্লীয় বলের সাথে যুক্ত হয়ে একটি সুপার ফান্ডামেন্টাল বল গঠন করতে পারে, যে বলটি এর নিজস্ব কণা ও বলের মাধ্যমে ডার্ক সেক্টরে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, “হতে পারে এই দুটি সেকটর অজানা কোনো উপায়ে একে অপরের সাথে সম্পর্ক রেখে চলছে।” হাঙ্গেরির এই পরীক্ষার ফলে হয়তো আমরা এই ডার্ক সেক্টরের বলকেই প্রোটোফোবিক বল হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। অন্য দিকে আবার ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার জন্যে পরিচালিত গবেষণার সাথেও এই ফলাফলের মিল রয়েছে। স্টার ওয়ারস মুভি সিরিজের ফোর্সের অন্ধকার (ডার্ক) ও আলোকীয় অংশের সাথেও মিল আছে এর।

নোট ১:এখনপর্যন্তজানামৌলিকবলসমূহ

প্রথমহলোমহাকর্ষ।নিউটনেরপরআইনস্টাইনতারসার্বিকআপেক্ষিকতত্ত্বেরমাধ্যমেমহাকর্ষেরউন্নতরূপপ্রদানকরেন১৯১৫সালে।তত্ত্বটিপ্রযোজ্যমহাবিশ্বেরবড়স্কেলেরকাঠামোসমূহেরক্ষেত্রে।এখানেমহাকর্ষকেতুলেধরাহয়েছেস্থান-কালেরবক্রতাহিসেবে।

দ্বিতীয় প্রকার মৌলিক বল হলো তড়িচ্চুম্বকীয় বল। বৈদ্যুতিক চার্জধারী কণারা এই বলের মাধ্যমে কাজ করে। অণু ও পরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। তৃতীয় মৌলিক বল সবল নিউক্লীয় বল (সংক্ষেপে শুধু ‘সবল বল’)। এর কাজ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠনকারী কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখা। আর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জন্যে দায়ী হলো চতুর্থ মৌলিক বল দুর্বল নিউক্লীয় বল।

ম্যাক্সওয়েল, ফ্যারাডে ও ওয়েরেস্টেডদের হাত ধরে ১৮৩০ এর দশকে তড়িৎ ও চুম্বক বলকে একীভূত করা সম্ভব হয়। ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল বল দুটির সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব (ফিল্ড থিওরি) প্রকাশ করেন। ম্যাক্সওয়েল দেখেছিলেন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ সব সময় একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে। সেই বেগটি হয়ে দাঁড়ালো আলোর বেগে সমান। আলোর বেগ ধ্রুব কেন তা তখন মাথায় না ঢুকলেও সেই ধ্রুবতা কাজে লাগিয়েই ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন স্থান-কালকে একত্র করে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরি করেন। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সন্ধি করলেও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব এখনো অন্য বলদের সাথে একমত হয়নি। ভাইল, কালুজা এবং স্বয়ং আইনস্টাইন নিজেও এর পেছনে সময় দিয়ে গেছেন, কিন্তু সফলতার মুখ মেলেনি এখনো। অন্যদিকে ১৯৬০ এর দশকে শেলডন গ্লশো, আব্দুস সালাম ও স্টিভেন উইনবার্গের হাত ধরে তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে একত্র করার তত্ত্ব পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে আসে তাদের মতের পক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ। সমন্বিত তত্ত্বটিকে এখন ইলেকট্রোউইক থিওরি বলা হয়। ১৯৭৯ সালে তারা এ জন্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম সার্নের গবেষণাগারে ডাব্লিও এবং জেড বোসন তৈরি করা সম্ভব হয়।

ইলেকট্রোউইক থিওরিকে সবল বলের সাথে একইসাথে ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্ল্যাশো ও জর্জি প্রথম একটি গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি দেন। পরে সালাম ও জোগেশ পাটিও একই রকম মডেল দাঁড় করান। তৈরি হয় এরকম নানান মডেল। তবে এসব মডেলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেতে খুব উচ্চ শক্তির পরীক্ষার প্রয়োজন বলে তা এখনো সম্ভব হয়নি।

কিন্তু মহাকর্ষ এখনো অন্যদের সাথে সন্ধি করার কোনোরকম মানসিকতা দেখাচ্ছে না। এ অবস্থায় আরেকটি বল পাওয়া গেলে থিওরি অব এভরিথিং প্রস্তুত করতে খাটুনি একটু বাড়বে বৈকি। অবশ্য আগেই আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি যে একে অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেয়া মহাকর্ষের মতো কঠিন হবে না।

নোট ২:

নতুন মৌলিক বলটি সম্পর্কে এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। অনেক সময়ই এমন হয় যে তথ্য-উপাত্তকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে না পারার কারণে ভুল জিনিসকে প্রমাণিত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যেমন কিছু দিন আগেই গুঞ্জন উঠেছিল, নতুন একটি মৌলিক কণিকা খুঁজে পাওয়া গেছে। পরে আগস্টের শুরুতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্ন অফিসিয়ালি

 

untitled-4

জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যটি সঠিক নয়। আপাতত কোনো মৌলিক বল পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে সার্নের গবেষণাগারে দুই দুইবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়, আলোর চেয়ে বেশি বেগ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সন্দেহ যায়নি। পরে ২০১২ সালের মার্চে এসে দেখা যায় পরীক্ষায় ভুল ছিল।

তবে মৌলিক বল খুঁজে পাবার এ ব্যাপারটি সেরকম নয় বলেই মনে হয়। অন্তত এর ভাবভঙ্গী দেখে তাই মনে হচ্ছে। কারণ এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুর সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। তাই আমরা চেয়ে থাকতে পারি নতুন কিছুর আশায়।

তথ্যসূত্র                  

১.http://earthsky.org/space/physicists-confirm-a-possible-5th-force

২.http://www.sciencealert.com/new-study-confirms-physicists-might-have-spotted-a-fifth-force-of-nature

৩.http://www.sciencealert.com/physicists-think-they-might-have-just-detected-a-fifth-force-of-nature

৪.http://arxiv.org/abs/1608.03591

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Unified_field_theory#History

 

পঞ্চম মৌলিক বলের সন্ধান

এতদিন আমরা জানতাম মহাবিশ্বের নিপুণ কাঠামো টিকে আছে চারটি মৌলিক বলের কল্যাণে। এরা হলো মহাকর্ষ, তড়িচ্চুম্বকীয় এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল। কিন্তু গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির একদল পদার্থবিদ সর্বপ্রথম সম্ভাব্য নতুন আরেকটি (পঞ্চম) মৌলিক বলের প্রমাণ পান। এই বলটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মহাবিশ্বের অনেকগুলো রহস্যের সমাধান হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার রহস্যের সমাধানেরও ইঙ্গিত। ব্যপারটি ইদানিং আবারো আলোচনায় এলো।

গত ১৪ আগস্ট ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল একই মতের পক্ষ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তারা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে সেই ফলাফলগুলো বিচার করে দেখলেন যে সত্যিই নতুন একটি বলের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে। প্রধান গবেষক জোনাথন ফেং বলেন, “সত্য হয়ে থাকলে এটা হবে একটি বৈপ্লবিক আবিষ্কার। আরো পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এর সত্যতা পাওয়া যায় তবে পঞ্চম বলের এই আবিষ্কার মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমূল পাল্টে দেবে। মৌলিক বলদের একীভবন ও ডার্ক ম্যাটার গবেষণার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকবে।”

বিষয়টি প্রথম হাঙ্গেরিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের এক দল গবেষকের নজরে আসে। তারা দেখলেন উচ্চ-শক্তির প্রোটন রশ্মিকে লিথিয়াম-৭ এর দিকে নিক্ষেপ করলে ধ্বংসাবশেষের সাথে খুবই হালকা একটি অতিপারমাণবিক কণিকা পাওয়া যায়। এটাকে তখন একটি নতুন ধরনের বোসন কণিকা মনে

করেছিলেন। এটা ছিল ইলেকট্রনের চেয়ে মাত্র ৩০ গুণ ভারী। কণাপদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এর কোনো পূর্বাভাস ছিল না। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে এখন পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এক গুচ্ছ সমীকরণই সবচেয়ে মোক্ষম ভূমিকা পালন করছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, প্রত্যেকটি মৌলিক বলেরই নিজ নিজ বোসন কণিকা আছে। সবল বলের বাহক হচ্ছে গ্লুয়ন, তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে বহন করে আলোক কণা ফোটন এবং Wও Zবোসন করেদুর্বলনিউক্লীয়বলবহনেরকাজ।কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের দুর্বলতা হলো, আমরা এখনো মহাকর্ষের জন্য কোনো বোসন কণিকা খুঁজে পাইনি। তবে অনুমান করা হচ্ছে মহাকর্ষের ক্ষেত্রে বল বহনের কাজটি করবে গ্র্যাভিটন নামক কণাটি। একে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

হাঙ্গেরির দলটি প্রথমে মনে করেছিলেন নতুন পাওয়া এই কণিকাটি হয়তো কোনো ধরনের ডার্ক ফোটন হবে। ডার্ক ম্যাটারের ক্রিয়া বহনকারী কল্পিত কণিকাকে বলা হয় ডার্ক ফোটন। তাদের গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফেং বলেন“উনারা দাবি করতে পারেননি যে এটি নতুন একটি মৌলিক বলের ফলে হয়েছে। তাদের মতে এই বাড়তি জিনিসটি ছিল একটি নতুন কণিকার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে এটা কি বস্তুকণা (matter particle)ছিল নাকি বলবাহীকণা (force-carrying) ছিল।”

বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানতে ফেং তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রাথমিক উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষা করে দেখেন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরীক্ষাগুলোও। এরপরই শক্তিশালী তাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেল যে এই নতুন প্রতিক্রিয়ার পেছনে বস্তুকণা বা ডার্ক ফোটন কারোরই হাত নেই। বরং তাদের হিসাব-নিকাশ থেকে দেখা গেল যে এটা প্রকৃতির পঞ্চম বলের নিজস্ব বোসন হতে পারে। ডার্ক ম্যাটারসহ মহাবিশ্বের রহস্যময় নানান কিছুর ব্যাখ্যা এর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

কাল্পনিক নতুন এই বোসনকে আপাতত বলা হচ্ছে প্রোটোফোবিক এক্স। এর বিস্ময়কর দিক হলো, এটি শুধু ইলেকট্রন এবং নিউট্রনের সাথে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাও খুবই স্বল্প পাল্লায়, যার ফলে একে শনাক্ত করা খুবই কঠিন ছিল। আরেক গবেষক টিমোথি টেইট বলেন, “এর আগে এরকম বৈশিষ্ট্যধারী কোনো বোসন কণিকা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি। একে আমরা কখনো কখনো এক্স বোসন বলে থাকি, যেখানে এক্স অর্থ হলোঅজানা।”

এই গবেষণাটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মে মাসে। তখন এটি প্রকাশিত হয় প্রি-প্রিন্ট সাইট arXiv.org-তে। কিন্তু এখন এর পিয়ার রিভিউ সম্পন্ন হবার পর এটি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস এর মতো জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত তা হলো, আমরা একটি বিস্ময়কর কণা পেলাম যাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ

হিসাব-নিকাশ বলছে এটি প্রকৃতির পঞ্চম মৌলিক বলের বাহক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু এ বিষয়ে পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনো যথেষ্ট হয়নি। তবে সারা বিশ্বের গবেষকরা এর পেছনে লেগেছেন, যার ফলে আশা করা হচ্ছে এক বছরের মধ্যেই ফলাফল পাওয়া যাবে।

ফেং বলেন, “কণিকাটি খুব হালকা হবার কারণে এর প্রতিক্রিয়াও খুব দুর্বল। তবে সারা বিশ্বে গবেষকদের অনেকগুলো দল বিভিন্ন পরীক্ষাগারে কাজ করছেন। প্রাথমিক সেই ইঙ্গিতের কারণে সবাই এখন অন্তত এটুকু জানেন যে কোথায় খুঁজতে হবে একে।”কণিকাটি ভারী না হলেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে থেকেই এমন হালকা কণিকা তৈরি করার মতো প্রযুক্তি বিজ্ঞানীদের হাতে আছে।

কী হবে যদি সত্যিই পাওয়া যায় এই পঞ্চম বল?আমরা এখনো সেটা থেকে বেশ দূরে আছি। তবে ফেং বলছেন, বলটি তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল ও সবল নিউক্লীয় বলের সাথে যুক্ত হয়ে একটি সুপার ফান্ডামেন্টাল বল গঠন করতে পারে, যে বলটি এর নিজস্ব কণা ও বলের মাধ্যমে ডার্ক সেক্টরে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।

তিনি আরো বলেন, “হতে পারে এই দুটি সেকটর অজানা কোনো উপায়ে একে অপরের সাথে সম্পর্ক রেখে চলছে।” হাঙ্গেরির এই পরীক্ষার ফলে হয়তো আমরা এই ডার্ক সেক্টরের বলকেই প্রোটোফোবিক বল হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। অন্য দিকে আবার ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার জন্যে পরিচালিত গবেষণার সাথেও এই ফলাফলের মিল রয়েছে। স্টার ওয়ারস মুভি সিরিজের ফোর্সের অন্ধকার (ডার্ক) ও আলোকীয় অংশের সাথেও মিল আছে এর।

নোট ১:এখনপর্যন্তজানামৌলিকবলসমূহ

প্রথমহলোমহাকর্ষ।নিউটনেরপরআইনস্টাইনতারসার্বিকআপেক্ষিকতত্ত্বেরমাধ্যমেমহাকর্ষেরউন্নতরূপপ্রদানকরেন১৯১৫সালে।তত্ত্বটিপ্রযোজ্যমহাবিশ্বেরবড়স্কেলেরকাঠামোসমূহেরক্ষেত্রে।এখানেমহাকর্ষকেতুলেধরাহয়েছেস্থান-কালেরবক্রতাহিসেবে।

দ্বিতীয় প্রকার মৌলিক বল হলো তড়িচ্চুম্বকীয় বল। বৈদ্যুতিক চার্জধারী কণারা এই বলের মাধ্যমে কাজ করে। অণু ও পরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। তৃতীয় মৌলিক বল সবল নিউক্লীয় বল (সংক্ষেপে শুধু ‘সবল বল’)। এর কাজ হলো পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠনকারী কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখা। আর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের জন্যে দায়ী হলো চতুর্থ মৌলিক বল দুর্বল নিউক্লীয় বল।

ম্যাক্সওয়েল, ফ্যারাডে ও ওয়েরেস্টেডদের হাত ধরে ১৮৩০ এর দশকে তড়িৎ ও চুম্বক বলকে একীভূত করা সম্ভব হয়। ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল বল দুটির সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব (ফিল্ড থিওরি) প্রকাশ করেন। ম্যাক্সওয়েল দেখেছিলেন তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ সব সময় একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে। সেই বেগটি হয়ে দাঁড়ালো আলোর বেগে সমান। আলোর বেগ ধ্রুব কেন তা তখন মাথায় না ঢুকলেও সেই ধ্রুবতা কাজে লাগিয়েই ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন স্থান-কালকে একত্র করে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরি করেন। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সন্ধি করলেও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব এখনো অন্য বলদের সাথে একমত হয়নি। ভাইল, কালুজা এবং স্বয়ং আইনস্টাইন নিজেও এর পেছনে সময় দিয়ে গেছেন, কিন্তু সফলতার মুখ মেলেনি এখনো। অন্যদিকে ১৯৬০ এর দশকে শেলডন গ্লশো, আব্দুস সালাম ও স্টিভেন উইনবার্গের হাত ধরে তড়িচ্চুম্বকীয় এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলকে একত্র করার তত্ত্ব পাওয়া যায়। ১৯৭৩ সালে আসে তাদের মতের পক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ। সমন্বিত তত্ত্বটিকে এখন ইলেকট্রোউইক থিওরি বলা হয়। ১৯৭৯ সালে তারা এ জন্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম সার্নের গবেষণাগারে ডাব্লিও এবং জেড বোসন তৈরি করা সম্ভব হয়।

ইলেকট্রোউইক থিওরিকে সবল বলের সাথে একইসাথে ব্যাখ্যা করার জন্যে গ্ল্যাশো ও জর্জি প্রথম একটি গ্র্যান্ড ইউনিফায়েড থিওরি দেন। পরে সালাম ও জোগেশ পাটিও একই রকম মডেল দাঁড় করান। তৈরি হয় এরকম নানান মডেল। তবে এসব মডেলের পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেতে খুব উচ্চ শক্তির পরীক্ষার প্রয়োজন বলে তা এখনো সম্ভব হয়নি।

কিন্তু মহাকর্ষ এখনো অন্যদের সাথে সন্ধি করার কোনোরকম মানসিকতা দেখাচ্ছে না। এ অবস্থায় আরেকটি বল পাওয়া গেলে থিওরি অব এভরিথিং প্রস্তুত করতে খাটুনি একটু বাড়বে বৈকি। অবশ্য আগেই আমরা ইঙ্গিত পেয়েছি যে একে অন্যদের সাথে মিলিয়ে নেয়া মহাকর্ষের মতো কঠিন হবে না।

নোট ২:

নতুন মৌলিক বলটি সম্পর্কে এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। অনেক সময়ই এমন হয় যে তথ্য-উপাত্তকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে না পারার কারণে ভুল জিনিসকে প্রমাণিত হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যেমন কিছু দিন আগেই গুঞ্জন উঠেছিল, নতুন একটি মৌলিক কণিকা খুঁজে পাওয়া গেছে। পরে আগস্টের শুরুতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্ন অফিসিয়ালি

 

untitled-4

জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যটি সঠিক নয়। আপাতত কোনো মৌলিক বল পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালে সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে সার্নের গবেষণাগারে দুই দুইবার পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়, আলোর চেয়ে বেশি বেগ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সন্দেহ যায়নি। পরে ২০১২ সালের মার্চে এসে দেখা যায় পরীক্ষায় ভুল ছিল।

তবে মৌলিক বল খুঁজে পাবার এ ব্যাপারটি সেরকম নয় বলেই মনে হয়। অন্তত এর ভাবভঙ্গী দেখে তাই মনে হচ্ছে। কারণ এটি প্রতিষ্ঠিত কোনো কিছুর সরাসরি বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। তাই আমরা চেয়ে থাকতে পারি নতুন কিছুর আশায়।

তথ্যসূত্র                  

১.http://earthsky.org/space/physicists-confirm-a-possible-5th-force

২.http://www.sciencealert.com/new-study-confirms-physicists-might-have-spotted-a-fifth-force-of-nature

৩.http://www.sciencealert.com/physicists-think-they-might-have-just-detected-a-fifth-force-of-nature

৪.http://arxiv.org/abs/1608.03591

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Unified_field_theory#History