স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

হাবল নন, গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়া প্রথম দেখেছিলেন সিলফার

ভেস্টো মেলভিন সিলফার একজন আমেরিকান জ্যোতিপদার্থবিদ ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর রেডিয়াল ভেলসিটি বা, অরীয় বেগ পরিমাপ করে (আমরা রেডিয়াল ভেলসিটি শব্দটিই ব্যবহার করব) দেখান যে আমাদের পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সিগুলো আসলে দূরে সরে যাচ্ছে।

Image result for Vesto Slipher
ভেস্টো সিলফার

কোন বস্তুর রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে বোঝায় কোন একটা বিন্দুর সাপেক্ষে কোন বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তনের হার। সময়ের সাথে দূরত্বের পরিবর্তনের হার হল বেগ। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে আমরা কোন বিন্দুর সাপেক্ষে  কোন বস্তুর বেগকেই বুঝব। এখন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেই বিন্দুকে প্রায় সবসময় পৃথিবী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সুতরাং, আমাদের রেডিয়াল ভেলসিটি হল পৃথিবীর সাপেক্ষে কোন কিছুর দূরে সরে যাওয়ার বা, কাছে আসার বেগ।

মেলভিন সিলফারই প্রথম এ রেডিয়াল ভেলসিটির হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে গ্যালাক্সিগুলোর রেড শিফট বা, লাল অপসারণ লক্ষ্য করেন যা তাকে গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নাম অনেক কম মানুষই জানে। সাধারণত এডউইন হাবলকে গ্যালাক্সির রেডশিফটের আবিষ্কর্তা হিসেবে সবাই বলে থাকে। যা একদমই সত্য নয়। সিলফার তার এই পর্যবেক্ষণের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় গুরুত্বের বিষয়ে তখন বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন এগুলো শুধুই সর্পিলাকার নেবুলা কিন্তু পরবর্তিতে বোঝা যায় এগুলো আসলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের গ্যালাক্সিগুলো ছিল।

পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কার্ল উইলহেলম উইর্টজ নেবুলাগুলোর রেডশিফট আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এতে তিনি দাবী করেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডশিফট কাছে থাকা গ্যালাক্সির রেডশিফটের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডিয়াল ভেলসিটি বেশি বলেই এমন হয়। একই বছর লেখা আরেকটি গবেষণা পত্রে তিনি দাবী করেন, ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে ঘুরতে থাকা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফট ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সিসমূহের থেকে কম হয়ে থাকে।

Image result for Carl Wilhelm Wirtz redshift
কার্ল উইলহেলম উইর্টজ

অর্থাৎ, এডউইন হাবলের অনেক আগে থেকেই এই দুইজন বিজ্ঞানী দেখিয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো যতদূরে তাদের রেডশিফট তত বেশি। কিন্তু তাদের এই গবেষণাগুলো জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেসময় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তারা নিজেরাও তখন বুঝতে পারেননি যে তাদের এই গবেষণাকর্ম আসলে কত বড় একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর আগের সময়ঃ জনপ্রিয় কিছু তত্ত্ব

সময়ের কি শুরু আছে? শেষ? আমাদের কাছে থাকা তথ্য উপাত্ত নির্দেশ করে যে আমাদের মহাবিশ্ব সারাজীবন এমন ছিল না। অর্থাৎ, পদার্থবিদরা এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে হয়েলের স্টেডি স্টেট থিওরি আসলে একটি ভুল। আমাদের মহাবিশ্ব আগেও এমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে হয়েলের এ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র আমাদের বলে এনট্রপি বা, বিশৃঙ্খলা সর্বদা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। যা হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্বের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল। ১৪ বিলিয়ন একটি বিশাল সংখ্যা। এক বিশাল সময়। আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল, এটাই সম্ভবত জ্যোতিপদার্থবিদ্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটাই এখন সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি এ পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পরের সময়কালের সাথে তুলনা করতে যান।

পদার্থবিদরা এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে বিগ ব্যাং এর পরে আমাদের মহাবিশ্বে কি কি ঘটেছে। কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? বিগ ব্যাং কি করে হল? এ সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থিওরি বা, তত্ত্বগুলো কি বলে?

বিগ ব্যাং ঘটার বিষয়ে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব বলে এক ধরণের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান থেকে এক ধরণের ইনফ্লেশান বা, অতি দ্রুত গতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের গোটা মহাবিশ্বের উদ্ভব।

Image result for inflationary universe

চিত্রঃ ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স

২০১৩ সালে বাইসেপ-২ এমন একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন যা আমাদের আদি মহাবিশ্বের ইনফ্লেশানের প্রমাণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সেই পরীক্ষার ফলাফলে ভুল ধরা পড়ে। যদি ইনফ্লেশানের ধারণা সত্য হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব একটি আরো বড় মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ।  এছাড়াও ইনফ্লেশান থিওরির সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটি হল ইটারনাল ইনফ্লেশান যা আমাদের বলে মহাবিশ্ব প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বা, প্রতিনিয়ত বিগ ব্যাং ঘটেই চলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সেই বহু বিগব্যাং এরই একটির ফলাফল।

Image result for eternal inflation

 

আরেকটি বিকল্প ধারণা হল আমাদের মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোল বা, কৃষ্ণ গহবরের থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারণা সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ব্ল্যাকহোল কি? অতি ভর সম্পন্ন কোন নক্ষত্র (সূর্যের চেয়ে ৩-৫ গুন) যখন তার জীবন কালের শেষ পর্যায়ে পাউলির বর্জন নীতি অগ্রাহ্য করতে সক্ষম হয় তখন তা নিজেই নিজের মহাকর্ষের আকর্ষণ বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় আয়তনহীন বিন্দুতে পরিণত হয়। একে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি। এ সিঙ্গুলারিটিতে শক্তির ঘনত্ব অসীম। কারণ, আমরা জানি, ঘনত্ব= ভর/আয়তন । এখানে নক্ষত্রটির আয়তন শূন্য । তাই এ সিঙ্গুলারিটি অবস্থায় ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। এ অসীম ঘনত্বের জন্য তার মহাকর্ষ বলও অত্যন্ত বেশি থাকে। জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের বলে কোন স্থানে ভর যত বেশি থাকবে সেখানকার স্থান-কালে তত বেশি বক্রতার সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে ভারী কোন বস্তুর বা, বেশি ঘনত্বের কোন বস্তুর আশে পাশে সময় ধীরে চলতে শুরু করবে। তাহলে অসীম ঘনত্বের কোন বস্তুর স্থান-কালের অবস্থা কেমন হবে? সেখানে আসলে স্থান বা কাল বলে কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে সময় একদম স্থির হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে বা, সিঙ্গুলারিটিতেও সময় একদম স্থির।

স্থান-কালের এই একই রকম অবস্থা বিগ ব্যাং এর সময়ও দেখা যায়। বিষয়টি বুঝতে হলে বিগ ব্যাং থিওরির পক্ষের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ হাবলের সম্প্রসারণের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। ১৯২৯ সালে হাবল তার টেলিস্কোপ দ্বারা গ্যালাক্সিগুলোর লাল অপভ্রংশ বা, রেড শিফটের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি এখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে বা, প্রসারিত হতে থাকে তাহলে এর একটাই অর্থ হতে পারে, আর তা হল আমরা যদি সময়কে উলটো দিকে চালনা করি তাহলে দেখতে পাব আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছু এক সময় একসাথে খুব ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান  করছিল। যা বিগ ব্যাং থিওরির দিকে আমাদের নির্দেশ করে। এভাবে সময়ের চাকাকে উলটো দিকে চালাতে চালাতে এমন এক সময় পাওয়া যাবে যার আগে আর সময় বলে কিছু ছিল না। সব কিছু অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল। এ অবস্থার সাথে কি উপড়ের ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির অবস্থার মিল পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এ অবস্থাকে বিগ ব্যাং এর সময়ের সিঙ্গুলারিটি অবস্থা বলা হয়, যা ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি অবস্থার অনুরুপ। উভয় সিঙ্গুলারিটিতেই সময় শূন্য।

বিগ ব্যাং এর সিঙ্গুলারিটি আসলে একটি ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি ছিল এমন ধারণা থেকেই আসলে ব্ল্যাকহোল থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভবের তত্ত্বের উৎপত্তি।

Image result for black hole

 

এ তত্ত্ব আমাদের বলে আমাদের এ মহাবিশ্বের আগেও অনেক মহাবিশ্ব ছিল। আমাদের মহাবিশ্বকে যদি আমরা n তম মহাবিশ্ব বলি তাহলে n-1 তম মহাবিশ্বটি বিগ ক্রাঞ্চ বা, এমন কোন উপায়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছিল আর সেই ব্ল্যাকহোল থেকেই আমাদের আজকের এই n তম মহাবিশ্বের উৎপত্তি। একসময় হয়ত বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বও সঙ্কুচিত হতে শুরু করবে এবং একটি অসীম ভরের ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর সেখান থেকেই n+1 তম মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটবে।

আজ আমরা বিগব্যাং এর আগে কি ছিল বা, বিগ ব্যাং কিভাবে হয়েছিল এ বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি তত্বের বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে জানলাম। ভবিষ্যতে এ তত্বগুলোর বিষয়ে এবং তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

কেন্দ্রহীন মহাবিশ্বের কেন্দ্রের গল্প

প্রতিদিন সকালে সূর্য পূর্বদিকে উঠে দিন শেষে পশ্চিমে গিয়ে অস্ত নামে। তার পেছন পেছন দেখা দেয় রাতের আকাশের অগণিত তারা। রাত যত রাত বাড়ে তারার দল ততই পূর্ব থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ে। একসময় রাতের শেষে সূর্যকে পূর্বদিকে আগমণ জানিয়ে বিদায় নেয়। বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তারা দেখা গেলেও প্রতিবছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

একজন আকাশ পর্যবেক্ষক খুব সহজেই এসব দেখে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, সূর্য সহ সকল তারকারাজি আমাদের কেন্দ্রকরে ঘুরে। বিশেষ করে সময়টা যখন খ্রিষ্টপূর্ব শতাব্দীর। তখন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি যেমন অ্যারিস্টটল, টলেমি প্রমুখ এমন মত-ই পোষণ করেছিলেন। এমনকি টলেমি পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে মহাবিশ্বের একটা ভূকেন্দ্রিক মডেলও তৈরি করেছিলেন।

টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বচিত্র

সেই সময়েই স্রোতের বিপরীতে চলে সর্বপ্রথম গ্রিসের সামোস দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ এরিস্টকাস বলেন সৌরকেন্দ্রিক মডেলের কথা। তিনি গণিতের সাহায্য নিয়ে সূর্য এবং চাঁদের আকৃতি ও দূরুত্ব বের করেন। প্রকৃত মানের সাথে তা না মিললেও তাঁর এই সিদ্বান্ত ঠিক ছিল যে সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড় এবং অনেক দূরে।

তিনি বিশ্বাস করতেন তারকাদের অবস্থান অনেক দূরে বলে সূর্যের মতো তাদের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তনের বদলে স্থির মনে হয়। যাকে বলে লম্বন। সূর্যের আকৃতি বিশাল হওয়ায় এবং আগুনের মতো আলোক বিকিরণ করায় ঐ মডেলের মাঝখানে সূর্য হবে। এখানে ‘ঐ মডেল’ বলতে এরিস্টকাসেরও আগে এমন একজনের মডেল বুঝানো হয়েছে যার ধারণা ছিল পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, তারা সবকিছু একটা আগুনের উৎসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তিনি হলেন ফিলোলাউস।

ফিলোলাউস ছিলেন একজন পিথাগোরিয়ান দার্শনিক যিনি প্লেটোনিজম এবং পিথাগোরিয়নিজমের মাঝে সমন্বয় ঘটান। ফিলোলাউস সেই আগুনের নাম দিয়েছিলেন কেন্দ্রিক আগুন। এটাই ছিল মানুষের তৈরি প্রথম মহাবিশ্বের মডেল যেখানে সবকিছু বৃত্তপথে কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরে।

কিন্তু কেন তিনি আগুনকে কেন্দ্রে রাখতে গেলেন? মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার প্রথম সোপান ছিল আগুন আবিষ্কার। হয়তো তিনি আগুনকে অলৌকিক কিছু ভাবতেন। তবে তিনি যাই ভাবতেন না কেন এরিস্টকাসের মাথায় সৌরকেন্দ্রিক মডেলের অবতারণা করার জন্য তার ভাবনা অনেক সাহায্য করেছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে টলেমিরে ভূকেন্দ্রিক মতবাদ এতোটাই গ্রহণযোগ্য ছিল যে তা তারকাসমূহের ভবিষ্যত অবস্থানও বলে দিতে পারতো। ফলশ্রুতিতে সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ অগ্রাহ্য এবং অবহেলিতভাবে পড়ে থাকে। এর দীর্ঘকাল পর ১৬শ শতকে সৌরকেন্দ্রিক জগতের একটি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করেন ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং ক্যাথলিক ধর্মবেত্তা পোল্যান্ডের নিকোলাস কোপের্নিকাস।

কোপার্নিকাস একটা জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত টেবিল তৈরি করেন যার দ্বারা তারাদের অতীত এবং ভবিষ্যত অবস্থান বলে দেয়া যেতো। কিন্তু গ্রহদের একটু ব্যতিক্রমি গতি থাকায় এদের অবস্থান একমাত্র টলেমির মডেল অনুসারেই অধিক গ্রহণযোগ্য ছিল।

চিত্রঃ কোপানিকার্সের মডেল, যেখান সর্বপ্রথম প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথ চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কোপার্নিকাসের পর আরো একজন জ্যোতির্বিদের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি টাইকো ব্রাহে। তিনি কোপার্নিকাসের টেবিলের ভুলটি ধরতে পেরেছিলেন অরো গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। কোপার্নিকাস গ্রহগুলোর গতিপথ বৃত্তাকার ভেবেছিলেন। টাইকো ব্রাহে দেখলেন গতিপথ বৃত্তাকার হলে এদের লম্বন অনুপস্থিত। তাই তিনি ভুলটা একটু শুধরে গ্রহদের সূর্যকেন্দ্রিক রাখলেও সেই সূর্যকে পৃথিবী কেন্দ্রিকই রেখে দিলেন।

বিজ্ঞানের বিবর্তন আসলে একজনের ভুল আরেকজন শুধরে সামনে এগোয়। পরবর্তীতে জোহানেস কেপলার টাইকো ব্রাহের নির্ভূল পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে তাঁর তিনটা সূত্র প্রদান করেন। যেখানে পৃথিবী সহ গ্রহগুলোর উপাবৃত্তার গতিপথের কথা বলেছিলেন। ফলে তিনি সৌরকেন্দ্রিক মডেলকে ভূকেন্দ্রিক মডেলের সমকক্ষ করতে সক্ষম হন। বাকি ছিল শুধু হাতে নাতে অর্থাৎ পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণ।

সময়টা ১৬১০ সাল। নিজের বানানো টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের অদ্ভূৎ সৌন্দর্য্যকে সর্বপ্রথম উপভোগ এবং পর্যবেক্ষণ করছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। তিনি দেখলেন বৃহস্পতির চারপাশে কিছু তুলনামূলক ছোট বস্তু নির্দিষ্ট সময় পরপর লুকিয়ে যাচ্ছে। আরো কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর তার আর বুঝার বাকি রইলো না যে ঐ বস্তুগুলো বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এগুলোকে আমরা বৃহস্পতির উপগ্রহ হিসেবে চিনি। যা টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলকে একদম বাতিল করে ছাড়লো। টিকে রইল সৌরকেন্দ্রিক মডেল।

টেলেস্কোপের উন্নতির ফলে ১৭৮৫ সালে উইলিয়াম হার্শেল আকাশগঙ্গা ছায়াপথ আবিষ্কার করেন। এমনিতে খালি চোখে আলো দূষণহীন অকাশে উজ্জ্বল মেঘের মতো উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত আকাশগঙ্গার একটা বিশাল অংশ চোখে পড়ে।

হার্শেল তাঁর টেলিস্কোপ সে দিকে তাক করে বার বার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এটি অনেক অনেক তারা সমষ্টি, যার কেন্দ্র অনেক বেশি উজ্জল। যখন এন্ড্রোমিডা ছায়াপথ আবিষ্কৃত হয় তখন বুঝা গেল আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথটিও এমনই একটি ছায়াপথ। এরপর থেকে এত এত ছায়াপথ আমরা দেখেছি যে ‘অগণিত’ শব্দ দিয়ে একে সম্বোধন করতে হয়। ফলশ্রুতিতে বহু বছর ধরে সৌরজগতের ভেতর আটকে থাকা মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ভাটা পড়ে।

চিত্রঃ হার্শেল তার পর্যবক্ষেণ দ্বারা আকাশগঙ্গাকে প্রথমে যেমন ভেবেছিলেন।

১৯২৬ সালে এডুইন হাবল তাঁর সবচেয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপে যখন অগণিত ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তখন এক অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন। দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হবার হার সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে ছায়াপথ যত দূরে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ছায়াপথগুলোর বেগ দূরত্বের সমাণুপাতিক।

হাবলের পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের কেন্দ্রের ইতিহাসের ইতি টেনে দেয় এই সিদ্বান্ত দিয়ে যে আমরা এক প্রসারণশীল মহাবিশ্বে বাস করছি। যার ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। কেন্দ্র খোঁজা বাদ দিয়ে আমরা শুরু করলাম আমাদের অতীতকে জানতে।

সূর্য থেকে আলোক রশ্মি আমাদের নিকট আসতে ৮ মিনিট সময় নেয়। সূর্যের নিকটবর্তী তারকা প্রক্সিমা সেন্টৌরি থেকে আলো আসতে ৪ বছর সময় নেয়। আমরা যত দূরে তাকাতে পারব তত দূরের অতীত আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হবে।

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন যানবাহনকে দূর থেকে হর্ণ বাজাতে বাজাতে পাশ দিয়ে সামনে চলে যেতে দেখি। এক্ষেত্রে একটা জিনিস যদি খেয়াল করি তবে বুঝতে পারবো, গাড়িটি দূরে থাকা অবস্থায় হর্ণের শব্দটা একটু ক্ষীণ থাকে এবং যত নিকটবর্তী হয় শব্দ তত তীক্ষ্ণ হয়। এমনটা হবার কারণ আসলে গাড়ির গতির ফলে গাড়ি থেকে বেরুনো শব্দ তরঙ্গের পরিবর্তন। গাড়ি যত কাছে অগ্রসর হয়েছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ক্ষুদ্র হয়েছে। একে বলে ডপলার ইফেক্ট।

আলোর ক্ষেত্রে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় থেকে ছোট হওয়া মানে রং লাল থেকে নীল হওয়া, যার নাম ব্লু শিফট্। এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট থেকে বড় হওয়া মানে রং নীল থেকে লালে পরিণত হওয়া, যাকে বলে রেড শিফট্।

আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গেলে ডপলার ইফেক্ট গবেষণার প্রাণ হিসেবে কাজ করে। দূরবর্তী তারকা থেকে আসা আলোকের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন দেখে বলে দেয়া যায় সেটি কত দূরে অবস্থিত। যত দূরের বস্তু হবে তত তার রেড শিফট্ হবে। যদি সবচেয়ে অতীত অর্থাৎ সময়ের শুরুটা দেখতে চাই তাহলে ঠিক কতটা দূরে তাকাতে হবে?

সত্তরের দশকে অতীততম সময়ের সেই আলোকটিই খুঁজে বের করেন দুই জ্যোতির্বিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন। এ আলোক ছিল আমাদের থেকে সবচেয়ে দূরের এবং সবচেয়ে অতীতের একদম মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী মুহুর্তের। সবচেয়ে দূরের হওয়ায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বড়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য বড় বলে বর্ণালীতে এর অবস্থান অণুতরঙ্গ (microwave) পরিসরে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ’। দূরত্ব নির্ধারণ করলে দাড়ায় ৪৬ বিলিয়ন আলকবর্ষ। সময় ১৩.৭ বিলিয়ন হলেও দূরত্ব ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণ একটু পরেই বলছি। একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়া খুব স্বাভাবিক, এ আলোকই যে মহাবিস্ফোরণের সময়কার তার প্রমাণ কী?

চিত্রঃ মহা বিস্ফোরণের ঠিক পরের মহাবিশ্বের আদিম চেহারা।

যেহেতু এখন আমরা মহাবিশ্বকে প্রসারিত হতে দেখছি তাহলে নিশ্চয়ই আগে সবকিছু সংকুচিত অবস্থায় ছিল। যে সংকুচিত অবস্থার নাম অনন্যতা বা অদ্বৈত বিন্দু (Singularity)। শব্দখানা শুনে মনে হতে পারে হয়ত একটা একক বিন্দুর কথা বলা হচ্ছে যেখানে সবকিছু পুঞ্জীভূত ছিল। কিন্তু আসলে এটা কোনো একক বিন্দু নয়। স্থান-কালকে অসীম ধরা হয়। এখন যদি অসীম বিস্তৃত স্থান-কাল কে সংকুচিত করা হয় তাহলে কি কখনও সংকোচন শেষ হবে? হবে না।

আমরা বরং অসীম স্থান-কালের অসীম সংখ্যাক বিন্দুর কথা ভাবতে পারি। এখন অসীম বিন্দুর একটিকে আবার চিহ্নিত করতে গেলে বাধে বিপত্তি। কারণ তখন তাকে প্রকাশ করতে হবে ১/অসীম দিয়ে, যেখানে ১/অসীম মানে গণিতের ভাষায় শূন্য। অর্থাৎ এখানে এসে আমাদের সব সূত্র অকেজো হয়ে পড়ে। তবে যদি একটা একক বিন্দুর ক্ষেত্রে চিন্তা করি তবে ভাবা যায় ঐ বিন্দুর চারপাশের সবকিছু ঐ বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে ছিল। তারপর হঠাৎ সেখান থেকে প্রসারণ শুরু হয়। মহা বিস্ফোরণ।

অসীম সংখ্যাক বিন্দু থেকে অসীম সংখ্যাক প্রসারণ হয়েছে। যা ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পাড়ি দিয়ে আজকের জানা বিশাল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তাই মহাবিস্ফোরণকে বিস্ফোরণ না বলে ‘সর্বত্র প্রসারণ’ বলা চলে।

মহাবিস্ফোরণের পর প্লাজমা অবস্থায় যে ফোটনগুলো ছিল স্থান-কালের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি আপনি যেখানে আছেন সেখানেও আছে। তাই যে দিকেই এন্টেনা তাক করি না কেন আমরা একে ধরতে পারব। চাইলে আপনিও পারবেন। এখনই টিভি বা রেডিও অন করে রিমোটটা হাতে নিন এবং একটা অব্যবহৃত চ্যানেলে যান, নিশ্চয়ই ঝির ঝির করা শো শো শব্দর ছবি দেখছেন। এটাই সেই মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ। আবিষ্কারের আগে একে যান্ত্রিক গোলযোগ ধরে নিয়ে সংকেত আদান প্রদান করা হতো।

আমাদের পক্ষে কি ১৩.৭ বিলিয়ন অলোকবর্ষের চেয়ে দূরের কোনো বস্তুকে দেখা সম্ভব হবে না? এক্ষেত্রে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে পারি। আমাদের অবস্থান থেকে যে বস্তুগুলো যত দূরে তাদের প্রসারণ বেগ তত বেশি। ১৩.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের বস্তুগুলোর প্রসারণ বেগ আলোর থেকেও বেশি। তাই তাদের থেকে নিঃসৃত আলো আরো বেশি বেগে দূরে চলে যায়।

আমরাও যেহেতু প্রসারিত হচ্ছি এক পর্যায় সে আলোককে আমাদের ধরে দেখা সম্ভব। এভাবে আরো ৩২ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দেখা সম্ভব। তাহলে সব মিলিয়ে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত আমাদের দেখা সম্ভব। এই হলো আমাদের পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্বের সীমানা।

চিত্রঃ পর্যবেক্ষণ যোগ্য মহাবিশ্ব।

আমি যদি পৃথিবী থেকে বেরিয়ে মহাবিশ্বের অন্য কোনো স্থানে যেতাম তবে সে অবস্থানের চারদিকে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত হত আমার দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। তবে আমি যদি যেতে যেতে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে চলে যাই তখন আর পৃথিবীতেই ফিরে আসতে পারব না। বস্তুগুলোর মতো স্থানকালের প্রসারণের ফলে আমরাও পৃথিবীর সাপেক্ষে আলোর চেয়ে বেশি বেগে দূরে চলে যেতে থাকব।

অণুসন্ধিৎসু মানব মন সবকিছুর পরও একটা কেন্দ্র ঠিক করে যদি সুস্থির থাকতে চায় তবে এই বলে উপসংহার টানা যায় যে, প্রকৃত অর্থে মহাবিশ্ব অসীম। তাই এর কোনো কেন্দ্র নেই। তবে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কেন্দ্র আছে। সে কেন্দ্র আমরা নিজেরাই!

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Geocentric_model
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Heliocentrism
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_the_center_of_the_Universe
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Cosmic_microwave_background
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Big_Bang

featured image: thephysicsmill.com

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর আগের সময়ঃ জনপ্রিয় কিছু তত্ত্ব

সময়ের কি শুরু আছে? শেষ? আমাদের কাছে থাকা তথ্য উপাত্ত নির্দেশ করে যে আমাদের মহাবিশ্ব সারাজীবন এমন ছিল না। অর্থাৎ, পদার্থবিদরা এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে হয়েলের স্টেডি স্টেট থিওরি আসলে একটি ভুল। আমাদের মহাবিশ্ব আগেও এমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, ভবিষ্যতেও এমনই থাকবে হয়েলের এ তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র আমাদের বলে এনট্রপি বা, বিশৃঙ্খলা সর্বদা সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। যা হয়েলের স্টেডি স্টেট তত্বের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল। প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল। ১৪ বিলিয়ন একটি বিশাল সংখ্যা। এক বিশাল সময়। আমাদের মহাবিশ্বের একটা শুরু ছিল, এটাই সম্ভবত জ্যোতিপদার্থবিদ্যার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটাই এখন সর্বজনস্বীকৃত। আমাদের মহাবিশ্বের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিশেষ করে আপনি যদি এ পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের পরের সময়কালের সাথে তুলনা করতে যান।

পদার্থবিদরা এ সম্বন্ধে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই জানেন যে বিগ ব্যাং এর পরে আমাদের মহাবিশ্বে কি কি ঘটেছে। কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? বিগ ব্যাং কি করে হল? এ সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য থিওরি বা, তত্ত্বগুলো কি বলে?

বিগ ব্যাং ঘটার বিষয়ে সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্ব বলে এক ধরণের কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশান থেকে এক ধরণের ইনফ্লেশান বা, অতি দ্রুত গতির সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের গোটা মহাবিশ্বের উদ্ভব।

Image result for inflationary universe

চিত্রঃ ইনফ্লেশনারি ইউনিভার্স

২০১৩ সালে বাইসেপ-২ এমন একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন যা আমাদের আদি মহাবিশ্বের ইনফ্লেশানের প্রমাণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সেই পরীক্ষার ফলাফলে ভুল ধরা পড়ে। যদি ইনফ্লেশানের ধারণা সত্য হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে, আমাদের মহাবিশ্ব একটি আরো বড় মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র অংশ।  এছাড়াও ইনফ্লেশান থিওরির সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটি হল ইটারনাল ইনফ্লেশান যা আমাদের বলে মহাবিশ্ব প্রতি নিয়ত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বা, প্রতিনিয়ত বিগ ব্যাং ঘটেই চলেছে। আমাদের মহাবিশ্ব শুধুমাত্র সেই বহু বিগব্যাং এরই একটির ফলাফল।

Image result for eternal inflation

 

আরেকটি বিকল্প ধারণা হল আমাদের মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোল বা, কৃষ্ণ গহবরের থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারণা সম্বন্ধে জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ব্ল্যাকহোল কি? অতি ভর সম্পন্ন কোন নক্ষত্র (সূর্যের চেয়ে ৩-৫ গুন) যখন তার জীবন কালের শেষ পর্যায়ে পাউলির বর্জন নীতি অগ্রাহ্য করতে সক্ষম হয় তখন তা নিজেই নিজের মহাকর্ষের আকর্ষণ বলে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় আয়তনহীন বিন্দুতে পরিণত হয়। একে বলা হয় ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি। এ সিঙ্গুলারিটিতে শক্তির ঘনত্ব অসীম। কারণ, আমরা জানি, ঘনত্ব= ভর/আয়তন । এখানে নক্ষত্রটির আয়তন শূন্য । তাই এ সিঙ্গুলারিটি অবস্থায় ব্ল্যাকহোলের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। এ অসীম ঘনত্বের জন্য তার মহাকর্ষ বলও অত্যন্ত বেশি থাকে। জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের বলে কোন স্থানে ভর যত বেশি থাকবে সেখানকার স্থান-কালে তত বেশি বক্রতার সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় বললে ভারী কোন বস্তুর বা, বেশি ঘনত্বের কোন বস্তুর আশে পাশে সময় ধীরে চলতে শুরু করবে। তাহলে অসীম ঘনত্বের কোন বস্তুর স্থান-কালের অবস্থা কেমন হবে? সেখানে আসলে স্থান বা কাল বলে কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে সময় একদম স্থির হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে বা, সিঙ্গুলারিটিতেও সময় একদম স্থির।

স্থান-কালের এই একই রকম অবস্থা বিগ ব্যাং এর সময়ও দেখা যায়। বিষয়টি বুঝতে হলে বিগ ব্যাং থিওরির পক্ষের প্রথম চাক্ষুষ প্রমাণ হাবলের সম্প্রসারণের দ্বারস্থ হতে হবে আমাদের। ১৯২৯ সালে হাবল তার টেলিস্কোপ দ্বারা গ্যালাক্সিগুলোর লাল অপভ্রংশ বা, রেড শিফটের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, আমাদের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের মহাবিশ্ব যদি এখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে বা, প্রসারিত হতে থাকে তাহলে এর একটাই অর্থ হতে পারে, আর তা হল আমরা যদি সময়কে উলটো দিকে চালনা করি তাহলে দেখতে পাব আমাদের মহাবিশ্বের সব কিছু এক সময় একসাথে খুব ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান  করছিল। যা বিগ ব্যাং থিওরির দিকে আমাদের নির্দেশ করে। এভাবে সময়ের চাকাকে উলটো দিকে চালাতে চালাতে এমন এক সময় পাওয়া যাবে যার আগে আর সময় বলে কিছু ছিল না। সব কিছু অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দুতে ঘন সন্নিবেশিত ছিল। এ অবস্থার সাথে কি উপড়ের ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটির অবস্থার মিল পাওয়া যায়? হ্যাঁ, এ অবস্থাকে বিগ ব্যাং এর সময়ের সিঙ্গুলারিটি অবস্থা বলা হয়, যা ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি অবস্থার অনুরুপ। উভয় সিঙ্গুলারিটিতেই সময় শূন্য।

বিগ ব্যাং এর সিঙ্গুলারিটি আসলে একটি ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি ছিল এমন ধারণা থেকেই আসলে ব্ল্যাকহোল থেকে মহাবিশ্ব উদ্ভবের তত্ত্বের উৎপত্তি।

Image result for black hole

 

এ তত্ত্ব আমাদের বলে আমাদের এ মহাবিশ্বের আগেও অনেক মহাবিশ্ব ছিল। আমাদের মহাবিশ্বকে যদি আমরা n তম মহাবিশ্ব বলি তাহলে n-1 তম মহাবিশ্বটি বিগ ক্রাঞ্চ বা, এমন কোন উপায়ে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়েছিল আর সেই ব্ল্যাকহোল থেকেই আমাদের আজকের এই n তম মহাবিশ্বের উৎপত্তি। একসময় হয়ত বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্বও সঙ্কুচিত হতে শুরু করবে এবং একটি অসীম ভরের ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। আর সেখান থেকেই n+1 তম মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটবে।

আজ আমরা বিগব্যাং এর আগে কি ছিল বা, বিগ ব্যাং কিভাবে হয়েছিল এ বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি তত্বের বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে জানলাম। ভবিষ্যতে এ তত্বগুলোর বিষয়ে এবং তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করা হবে। ধন্যবাদ।

হাবল নন, গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়া প্রথম দেখেছিলেন সিলফার

ভেস্টো মেলভিন সিলফার একজন আমেরিকান জ্যোতিপদার্থবিদ ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর রেডিয়াল ভেলসিটি বা, অরীয় বেগ পরিমাপ করে (আমরা রেডিয়াল ভেলসিটি শব্দটিই ব্যবহার করব) দেখান যে আমাদের পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সিগুলো আসলে দূরে সরে যাচ্ছে।

Image result for Vesto Slipher
ভেস্টো সিলফার

কোন বস্তুর রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে বোঝায় কোন একটা বিন্দুর সাপেক্ষে কোন বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তনের হার। সময়ের সাথে দূরত্বের পরিবর্তনের হার হল বেগ। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে আমরা কোন বিন্দুর সাপেক্ষে  কোন বস্তুর বেগকেই বুঝব। এখন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেই বিন্দুকে প্রায় সবসময় পৃথিবী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সুতরাং, আমাদের রেডিয়াল ভেলসিটি হল পৃথিবীর সাপেক্ষে কোন কিছুর দূরে সরে যাওয়ার বা, কাছে আসার বেগ।

মেলভিন সিলফারই প্রথম এ রেডিয়াল ভেলসিটির হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে গ্যালাক্সিগুলোর রেড শিফট বা, লাল অপসারণ লক্ষ্য করেন যা তাকে গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নাম অনেক কম মানুষই জানে। সাধারণত এডউইন হাবলকে গ্যালাক্সির রেডশিফটের আবিষ্কর্তা হিসেবে সবাই বলে থাকে। যা একদমই সত্য নয়। সিলফার তার এই পর্যবেক্ষণের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় গুরুত্বের বিষয়ে তখন বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন এগুলো শুধুই সর্পিলাকার নেবুলা কিন্তু পরবর্তিতে বোঝা যায় এগুলো আসলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের গ্যালাক্সিগুলো ছিল।

পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কার্ল উইলহেলম উইর্টজ নেবুলাগুলোর রেডশিফট আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এতে তিনি দাবী করেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডশিফট কাছে থাকা গ্যালাক্সির রেডশিফটের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডিয়াল ভেলসিটি বেশি বলেই এমন হয়। একই বছর লেখা আরেকটি গবেষণা পত্রে তিনি দাবী করেন, ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে ঘুরতে থাকা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফট ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সিসমূহের থেকে কম হয়ে থাকে।

Image result for Carl Wilhelm Wirtz redshift
কার্ল উইলহেলম উইর্টজ

অর্থাৎ, এডউইন হাবলের অনেক আগে থেকেই এই দুইজন বিজ্ঞানী দেখিয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো যতদূরে তাদের রেডশিফট তত বেশি। কিন্তু তাদের এই গবেষণাগুলো জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেসময় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তারা নিজেরাও তখন বুঝতে পারেননি যে তাদের এই গবেষণাকর্ম আসলে কত বড় একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল।

হাবল নন, গ্যালাক্সির দূরে সরে যাওয়া প্রথম দেখেছিলেন সিলফার

ভেস্টো মেলভিন সিলফার একজন আমেরিকান জ্যোতিপদার্থবিদ ছিলেন। ১৯১২ সালে তিনিই প্রথম গ্যালাক্সিগুলোর রেডিয়াল ভেলসিটি বা, অরীয় বেগ পরিমাপ করে (আমরা রেডিয়াল ভেলসিটি শব্দটিই ব্যবহার করব) দেখান যে আমাদের পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সিগুলো আসলে দূরে সরে যাচ্ছে।

Image result for Vesto Slipher
ভেস্টো সিলফার

কোন বস্তুর রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে বোঝায় কোন একটা বিন্দুর সাপেক্ষে কোন বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তনের হার। সময়ের সাথে দূরত্বের পরিবর্তনের হার হল বেগ। অর্থাৎ, সোজা ভাষায় রেডিয়াল ভেলসিটি বলতে আমরা কোন বিন্দুর সাপেক্ষে  কোন বস্তুর বেগকেই বুঝব। এখন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেই বিন্দুকে প্রায় সবসময় পৃথিবী হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সুতরাং, আমাদের রেডিয়াল ভেলসিটি হল পৃথিবীর সাপেক্ষে কোন কিছুর দূরে সরে যাওয়ার বা, কাছে আসার বেগ।

মেলভিন সিলফারই প্রথম এ রেডিয়াল ভেলসিটির হিসাব নিকাশ করতে যেয়ে গ্যালাক্সিগুলোর রেড শিফট বা, লাল অপসারণ লক্ষ্য করেন যা তাকে গ্যালাক্সির রেড শিফটের আবিষ্কর্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার নাম অনেক কম মানুষই জানে। সাধারণত এডউইন হাবলকে গ্যালাক্সির রেডশিফটের আবিষ্কর্তা হিসেবে সবাই বলে থাকে। যা একদমই সত্য নয়। সিলফার তার এই পর্যবেক্ষণের জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় গুরুত্বের বিষয়ে তখন বুঝতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন এগুলো শুধুই সর্পিলাকার নেবুলা কিন্তু পরবর্তিতে বোঝা যায় এগুলো আসলে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের গ্যালাক্সিগুলো ছিল।

পরবর্তীতে ১৯১৮ সালে কার্ল উইলহেলম উইর্টজ নেবুলাগুলোর রেডশিফট আবার পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯২২ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন। এতে তিনি দাবী করেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডশিফট কাছে থাকা গ্যালাক্সির রেডশিফটের চেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন দূরবর্তি গ্যালাক্সিসমূহের রেডিয়াল ভেলসিটি বেশি বলেই এমন হয়। একই বছর লেখা আরেকটি গবেষণা পত্রে তিনি দাবী করেন, ঘড়ির কাঁটার বিপরীতদিকে ঘুরতে থাকা সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলোর রেডশিফট ঘড়ির কাটার দিকে ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সিসমূহের থেকে কম হয়ে থাকে।

Image result for Carl Wilhelm Wirtz redshift
কার্ল উইলহেলম উইর্টজ

অর্থাৎ, এডউইন হাবলের অনেক আগে থেকেই এই দুইজন বিজ্ঞানী দেখিয়েছিলেন যে, গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং গ্যালাক্সিগুলো যতদূরে তাদের রেডশিফট তত বেশি। কিন্তু তাদের এই গবেষণাগুলো জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানে সেসময় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। তারা নিজেরাও তখন বুঝতে পারেননি যে তাদের এই গবেষণাকর্ম আসলে কত বড় একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করছিল।

আইনস্টাইনও চিন্তা করেছিলেন স্টেডি স্টেট থিওরির কথা

আমার শেষ পোস্ট যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় স্টেডি স্টেট তত্ত্বের বেশ কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। সেখানে তো স্টেডি স্টেট তত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ীর কথা জেনেছি। আজ জানবো তাদেরও আগে যারা মহাবিশ্বের একই রকম বা, প্রায় কাছাকছি মডেল নিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিষয়ে।

স্যার জেমস হপউড জিনস একজন ইংরেজ পদার্থবিদ এবং গণিতবিদ ছিলেন। যারা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তারা অনেকেই রেইলে-জিনসের নীতি বা, ‘ল’ পড়েছেন। এই স্যার জেমস হপউড জিনস হলেন সেই নীতির জিনস নামক বিজ্ঞানী। তিনিই ১৯২৮ সালে তার “অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড কসমোলজি” বইয়ে এমন এক মহাবিশ্বের কথা তুলে ধরেন যেখানে প্রতিনিয়ত পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে। যদিও তিনি গাণিতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরেন নি। তিনি শুধু তার ধারণার কথা বলেছিলেন।

Image result for James Hopwood Jeans
স্যার জেমস হপউড জিনস

আরেকজন ব্যক্তি যিনি এই তত্ত্বের কথা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর ১৭ বছর আগেই চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন স্যার মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন। স্থির মহাবিশ্বের কথা পদার্থবিদরা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করতেন। প্রথম এর বিরুদ্ধে কথা বলেছিল বিগ ব্যাং। কিন্তু আইনস্টাইন নিজেও স্থির মহাবিশ্বই সমর্থন করতেন। যদিও তার দেয়া সূত্র থেকেই বিগ ব্যাং ধারণার জন্ম হয়েছিল। হাবল যখন গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারণশীল তখন আইনস্টাইন বিগ ব্যাং মেনে নিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তার মনে তখনও ছিল অবিশ্বাস। এ বিষয়টা আমরা জানতে পেরেছি ২০১৪ সালে এসে।

আলবার্ট আইনস্টাইন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে ১৯৩১ সালে, এডউইন হাবল (মাঝখানে) এবং ওয়াল্টার অ্যাডামসের সাথে

আইনস্টাইনের অনেক কাজ জেরুজালেমের আলবার্ট আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে। এতদিন সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও ২০১৪ সালে এসে একদল বিজ্ঞানী দেখতে পান তার একটা খসড়া পেপার, যা তিনি কোন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন না তাতে গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের কথায় যেনো বলা আছে। তাও ১৭ বছর আগে। গোল্ড, বন্ডী আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট তত্ত্বের মূল কথা ছিল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে নতুন নতুন পদার্থ একদম শূন্য থেকে তৈরি হওয়া।

আইনস্টাইন তার সেই খসড়ায় লিখেছিলেন “মহাবিশ্বের পদার্থসমূহের ঘনত্ব সমান হওয়ার জন্য এতে নিশ্চিতভাবেই নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হতে হবে”। যা বন্ডী, গোল্ড আর হয়েলত্রয়ীর স্টেডি স্টেট মহাবিশ্বের কথারই মূল সুর। এ থেকেই বোঝা যায় হয়েলদের স্টেডি স্টেট তত্ত্ব একদম মনগড়া কিছু ছিল না।

আইনস্টাইন তার ভুল গাণিতিক হিসাব সংশোধন করেছেন কাটাকাটি করে

যদিও পর্যবেক্ষণগত দিক থেকে হয়েলদের তত্ত্ব পরবর্তিতে বাতিল হয়ে যায় কিন্তু গাণিতিক দিক থেকে এটা সঠিক ছিল। তারা আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটিরই একটু পরিবর্তিত রুপ ব্যবহার করেছিলেন তাদের নতুন পদার্থ সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে। কিন্তু আইনস্টাইনের খসড়া থেকে বোঝা যায় আইনস্টাইন প্রথমে ভেবেছিলেন যে এভাবে নতুন পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব তার সমীকরণের কোনরকম পরিবর্তন না করেই। কিন্তু তারপর তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তিনি আর তার থিওরির কোন রকম পরিবর্তন চিন্তা করেন নি এবং ধারণাটি বাতিল করে দেন। ফলে এ বিষয়ক কোন পেপারও তিনি আর প্রকাশ করেন নি। পরবর্তিতেও তিনি এ বিষয়ে কখনই কিছু বলেন নি। তবে তার এ কাজ থেকে বোঝা যায় তিনি তখনও বিগ ব্যাং থিওরিকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমদিকে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্বকে একবার জঘন্যও বলেছেন।

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব নিয়ে একটি মজার ঘটনাও আছে। যা এর আগের পোস্টে বলা হয় নি। স্টেডি স্টেট থিওরির ধারণা কিভাবে শুরু হয়েছিল এ বিষয়ে গল্পটি বলেছিলেন ফ্রেড হয়েল।১৯৪৭ সালের একদিনে হারমান বন্ডী, টমি গোল্ড আর ফ্রেড হয়েল একটি সিনেমা দেখতে গেলেন। তারা তিনজনই তিনজনজনকে আগে থেকেই চিনতেন কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা রাডারের একই বিষয়ক গবেষণা করছিলেন। সিনেমাটি ছিল একটি ভূতের সিনেমা। সিনেমাটি যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই শেষ হয়। এ বিষয়টিই তিনিজনকে একই বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করল, এক অপরিপর্বতনীয় কিন্তু গতিশীল মহাবিশ্বের কথা। মহাবিশ্বটির শুরু আর শেষ একই রকম, যার কোন পরিবর্তন নেই। হয়েল বলেন, “মানুষ সাধারণত অপরিবর্তনীয় বলতে ধরেই নেয় তা স্থির, কিন্তু ভূতের সিনেমাটি আমাদের এ ভুলটি ভেঙ্গে দিল। অনেক কিছুর পরিবর্তনের পরও একজনের অবস্থা ঠিক আগের মতই আবার হয়ে যেতে পারে সেটি আমাদের দেখালো। অনেকটা প্রবাহমান নদীর মত”। আর কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারণের পরও অপরিবর্তিত ছিল তার একটা সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে বেশি দেরি হলনা তাদের। সেখান থেকেই প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে একদম শূন্য থেকেই পদার্থের সৃষ্টির তত্ত্ব দিয়ে বসলেন তারা।

(বাম থেকে) টমি গোল্ড, হারমান বন্ডী এবং ফ্রেড হয়েল, ১৯৬০ সালে

স্টেডি স্টেট তত্ত্ব অনুসারে খুব ধীর গতিতে একদম শূন্য থেকে পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে ৬ ঘন কিলোমিটার আয়তনের কোন স্থানে প্রতি বছরে মাত্র ১ টা করে হাইড্রোজেন পরমাণু সৃষ্টি হয়।

স্টেডি স্টেট তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটা বলে আমাদের মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে আছে, আর অসীম সময় ধরে থাকবে। অর্থাৎ, অসীমের যেমন কোন শেষ নেই, উলটো দিকে গেলে এর শুরুও পাওয়া যাবে না। তাই গাণিতিকভাবে আমাদের মহাবিশ্ব হঠাৎ তৈরি হওয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। এটা সবসময় এমনই ছিল। আবার স্টেডি স্টেট থিওরি অনুসারে আকৃতিগতভাবেও এর কখনই কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অসীম কোন কিছুর প্রসারণ হলেও তা অসীমই থাকবে।

এ বিষয়গুলো হয়েলের খুব পছন্দের ছিল। হয়েল ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। মহাবিশ্ব অসীম সময় ধরে থাকলে এটা কিভাবে সৃষ্টি হল এ প্রশ্ন আর ওঠে না। কারণ, অসীম সময় ধরে থাকার অর্থ আমাদের মহাবিশ্ব সবসময়ই ছিল। ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রশ্ন আর আসে না। ফলে এর ধ্বংসেরও প্রশ্ন আসে না। কারণ এটা সারা জীবন এমনই থাকার কথা। বিগ ব্যাং এর মত এ তত্ত্বতে হঠাৎ করে মহাবিশ্ব তৈরি হয় না। তাই নাস্তিক হিসেবে ফ্রেড হয়েল এ তত্ত্বের বিষয়ে খুব খুশি ছিলেন।

যদিও পরবর্তিতে তাদের এ তত্ত্ব বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এবং বাতিল হিসেবে পরিগণিত হয়। সেসব চ্যালেঞ্জ আর কিভাবে এ তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেল তা না হয় অন্য কোন দিনের জন্য তোলা থাকল। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এর সাবেক প্রতিদ্বন্দীঃ স্টেডি স্টেট থিওরি

আমাদের মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হয়েছে এ প্রশ্ন সব যুগেই মানুষকে ভাবিয়েছে। এ চিন্তা-ভাবনার চূড়ান্ত রুপ আমরা দেখতে পাই গত শতাব্দির পঞ্চাশের দশকে এসে। আমাদের মহাবিশ্ব বিষয়ক একই সাথে দুটি চমৎকার থিওরি এ সময় বীর দর্পে তাদের জৌলুস দেখিয়েছে। এ দুই থিওরির একটি ছিল বিগ ব্যাং। আরেকটি হল স্টেডি স্টেট থিওরি।

আধুনিক যুগের এই দুই তত্ত্বের মাঝে যুদ্ধ আমাদের যেনো প্রাচীনকালের সূর্যকেন্দ্রিক নাকি পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের তত্ত্ব দুটির মাঝের যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিগ ব্যাং সম্বন্ধে তো আজ আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু কি বলে স্টেডি স্টেট থিওরি? চলুন জেনে নেয়া যাক স্টেডি স্টেট থিওরি আমাদের কি বলে এবং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

মহাবিশ্বের এ মডেলটি তৈরি করেছিলেন হারমান বন্ডি, থমাস গোল্ড এবং ফ্রেড হয়েল। স্যার হারমান বন্ডি ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির উন্নতিতেও বেশ অবদান রেখেছিলেন।

Image result for Hermann Bondi
চিত্রঃ হারমান বন্ডী

থমাস গোল্ড ছিলেন একজন অস্ট্রিয়ান জ্যোতিপদার্থবিদ। তিনি লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলোও ছিলেন। স্টেডি স্টেট থিওরির আরেক জনক ছিলেন ফ্রেড হয়েল। তিনিও একজন জগৎবিখ্যাত পদার্থবিদ ছিলেন।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর হয়েল আর বন্ডী ক্যাম্ব্রিজে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে থমাস গোল্ডও ক্যাম্বিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে কাজ শুরু করেন। গোল্ড সেখানেই হয়েল আর বন্ডীর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। তারা রেড শিফট বা, লাল অপভ্রংশ আর হাবলের নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। এ আলোচনায় তাদের তিনজনকেই একই বিন্দুতে এনে মেলাল। তিন জনই জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং থিওরিকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন।

Image result for thomas gold astronomer
চিত্রঃ থমাস গোল্ড

Image result for fred hoyle
চিত্রঃ ফ্রেড হয়েল

যেই ভাবা সেই কাজ। পদার্থবিদদের তো আর বসে থাকলে চলে না। শুধু ভুল ধরলে বা সন্দেহ করলেই তো চলে না। আরেকটি বিকল্প তত্ত্বও তো দিতে হবে!! তারা লেগে গেলেন সেই কাজে। ১৯৪৮ সালেই বিগ ব্যাং থিওরির বিকল্প হিসেবে দুটি পেপার পাবলিশ হয়ে গেল। জন্ম হল “স্টেডি স্টেট থিওরি”র। একটি পেপার ছিল গোল্ড আর বন্ডির, আরেকটি হয়েলের লেখা।

আজ তাদের সেই তত্ত্বের মূল কথা বলেই শেষ করব। হাবলের নীতি থেকে তারা জানতেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারিত হচ্ছে। সুতরাং তাদের দেয়া মডেলও এই পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। তাই গোল্ড আর বন্ডি বললেন যদিও মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু তা দেখতে কোন রকম পরিবর্তন হচ্ছে না। সবসময় একই রকম থাকছে। মহাবিশ্বের কোন শুরুও নেই, কোন শেষও নেই। তারা “পার্ফেক্ট কসমোলজিক্যাল প্রিন্সিপল” নামে একটি নীতির প্রস্তাব করলেন। তাদের এই নীতি বলে আমাদের এ মহাবিশ্ব “হোমোজেনিয়াস” এবং “আইসোট্রপিক”। সোজা বাংলায় বললে আমাদের মহাবিশ্ব সব জায়গায়, সব দিকে একই রকম (বড় স্কেলে)। এটিকে দেখতে আজ যেরকম লাগছে বিলিয়ন বছর আগেও এমনই ছিল, আর বিলিয়ন বছর পরেও এমনই থাকবে। তাই এ তত্ত্বের নাম স্টেডি স্টেট থিওরি।

বিষয়টা বুঝতে গেলে আমরা একটি রুপক ব্যবহার করব। আমাদের মহাবিশ্বকে আমরা একটা প্রবাহমান নদীর মত চিন্তা করতে পারি। নদীর পানির অণুগুলো কিন্তু দূরে সরে যাচ্ছে, তারপরও নতুন পানির অণু এসে সেই স্থান পূরণ করে ফেলে। আর আমাদের কাছে নদীটিকে সবসময় সবদিক থেকে দেখতে একই রকম লাগে। ঠিক যেনো স্টেডি স্টেট থিওরির প্রস্তাবিত মহাবিশ্বের মত।

এখন প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক যে, হাবলের নীতি বলে আমাদের এই মহাবিশ্ব সর্বদাই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব একই রকম থাকে কেমন করে? এটারও একটা সমাধান দেন বন্ডি, গোল্ড আর হয়েল ত্রয়ী। তারা বলেন আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু এর ঘনত্ব সবসময় একই রকম থাকছে। অর্থাৎ, সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট হওয়া ফাঁকা স্থানে সর্বদাই আগের পরিমাণে পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফলে আমাদের মহাবিশ্ব সবসময় একই রকম থাকছে।

Image result for steady state theory vs big bang theory

বিষয়টা এমন যে, আমরা একটা বালতিতে কিছু পানি নিলাম। তারপর এতে কিছু চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু শরবত তৈরি করলাম (আমাদের মহাবিশ্ব অবশ্যই শরবতের মতই সুস্বাদু)। মহাবিশ্বের প্রসারণকে আমরা বালতিতে বাইরে থেকে পানি ঢালার সাথে তুলনা করতে পারি। মহাবিশ্বের প্রসারণ হওয়ার অর্থ শরবতে আরো পানি যোগ করা। ফলে শরবতের ঘনত্ব কমে লঘু হয়ে যাবে। হাবলের নীতি সত্য হলে আমাদের মহাবিশ্বেরও পদার্থের ঘনত্ব কমার কথা।কিন্তু স্টেডই স্টেট থিওরির মতামত হল আমাদের মহাবিশ্বের ঘনত্ব সর্বদা একই থাকবে।  স্টেডি স্টেট থিওরি বলল মহাবিশ্বের প্রসারণের সময় আসলে দুটি গ্যালাক্সির মধ্যে সৃষ্ট ফাঁকা স্থানে নতুন নতুন পদার্থের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে সেখানে নতুন গ্যালাক্সির তৈরি হয়।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনি শুধু শরবতে পানিই যোগ করছেন না, এর সাথে সাথে আগের অনুপাতেই চিনিও যোগ করে চলেছেন। ফলে শরবতের মিষ্টতা এবং ঘনত্ব আগের মতই আছে।

আমরা আজ স্টেডি স্টেট থিওরির মূল কথা এবন এর সাথে জড়িত বিজ্ঞানীদের সম্বন্ধে জানলাম। পরবর্তিতে আমরা এ বিষয়ে আরো কিছু জানার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

বিগ ব্যাং এবং আমাদের মহাবিশ্বের বিক্ষিপ্ত কিছু কথা

মানুষ! পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র জীব। সেই পৃথিবী আবার এ বিশাল সৌরজগতের এক ছোট্ট গ্রহ। আমাদের এই সৌরজগৎ আবার এই সৌরজগত বিশাল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। আর এমন কোটি কোটি গ্যালাক্সির সমন্বয় এ মহাবিশ্ব। আমাদের এ অসীম, অনন্ত এবং একই সাথে রহস্যময় মহাবিশ্ব তাহলে কিভাবে সৃষ্টি হল? কোথা থেকে এলাম আমরা, আমাদের পৃথিবী, সূর্য আর অন্যান্য গ্রহ?

রাতের তারাঘেরা আকাশের দিএক তাকিয়ে কত হাজার রাত্রি মানুষ হয়ত কাটিয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের একটা যৌক্তিক উত্তর মানুষের হাতে এসে ধরা দেয় গত শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে। পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গিয়েছেন কি সেই উত্তর!

হ্যাঁ, উত্তরটি আপনাদের অনুমিত “বিগ ব্যাং”ই!!

 

Image result for big bang space

আমাদের এ মহাবিশ্বটি অত্যন্ত গরম এবং ঘন এক অবস্থার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অনেকেই বিগ ব্যাং এর এ অবস্থাকে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আমাদের এ মহাবিশ্ব যখন সবেমাত্র প্লাঙ্ক টাইম  সেকেন্ড) অতিক্রম করছিল যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক সময় তখন এটি এক অস্বাভাবিক প্রসারণের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা এখন ইনফ্লেশান বলেন। বলা হয়ে থাকে এ সময় স্পেস বা, স্থান নিজেই আলোর চেয়ে বেশি গতিতে সম্প্রসারিত হতে থাকে (যারা খাঁটি পদার্থবিদ তারা আমার এ কথায় কিছুটা রাগ করতে পারে। হ্যাঁ, এ ঘটনাটি আসলে ঘটেছিল স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কোন নিয়ম ভঙ্গ না করেই।)

Image result for inflation universe

 

চোখের পলকে আমাদের মহাবিশ্বটি একটি ইলেক্ট্রনের আকার থেকে একটি গলফ বলের আকারের মত হয়ে যায়। এ ইনফ্লেশানের সময়ে কমপক্ষে ৯০ বার আমাদের মহাবিশ্ব তার আকার দ্বিগুন করে ফেলে। সময়কে পিছিয়ে যেহেতু বিগ ব্যাং এর সময়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এসবই কিন্তু বিজ্ঞানীরা বের করে ফেলেছেন তাদের পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক জটিল জটিল সব সমীকরণের সমাধানের মাধ্যমে।

ইনফ্লেশান পরবর্তি সময়েও কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে যায় নি। কিন্তু অনেক ধীর হয়ে যায়। এ সম্প্রসারণের ফলে আমাদের মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে এবং পদার্থের সৃষ্টি হতে থাকে। আর সে সময়ের প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পরে এসে আপনি আজ মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া সৌরজগতে অবস্থান করে আমার এ লেখাটি পড়ছেন।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও আমাদের বিজ্ঞানীরা রাতের আকাশ সম্বন্ধে মনে করতেন আমরা যা দেখি, তাই সত্য। অর্থাৎ, তারা ভাবতেন আমাদের মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাওয়া পদার্থ বা, ব্যারিয়নিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। কিন্তু এখন তারা জানেন সম্ভবত তাদের সেই জানাটা সঠিক ছিল না।

সর্বশেষ তথ্য-প্রমাণ আমাদের বলছে যে, আমাদের মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি যা আমরা দেখা তো দূরের কথা ছুঁতেও পারি না। আদর করে এই রহস্যময় কিন্তু অদৃশ্য এই পদার্থের নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের মহাবিশ্বে পদার্থ আর শক্তি মিলিয়ে যা কিছু আছে এর ৪.৬% হল ব্যারিয়নিক পদার্থ বা, স্বাভাবিক পদার্থ। আর ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণ শুনলে তো চোখ কপালে উঠে যায়। আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ২৩% ই হল এ রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার। এ ডার্ক ম্যাটারের বাইরেও এমন নক্ষত্র আছে যা আমরা চোখে দেখতে পাই না। এসব  নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। এই নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা, কৃষ্ণ গহবর।

ডার্ক ম্যাটারেই কাহিনী থেমে থাকেনি। আমাদের মহাবিশ্ব যে প্রসারিত হচ্ছে তা বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু ১৯৯০-২০০০ সালের দিকে তারা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন যে, আমাদের মহাবিশ্ব শুধু প্রসারিতই হচ্ছে না, তার প্রসারণের হার আসলে বাড়ছে। অর্থাৎ, আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারণের একটি ত্বরণ আছে। এ ত্বরণের ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে বিজ্ঞানীদের নিয়ে আসতে হল নতুন এক কাল্পনিক শক্তি “ডার্ক এনার্জি”। আর আমাদের মহাবিশ্বের প্রায় ৭২% ই হল এ ডার্ক এনার্জি।

 

Image result for now you are doing mathematics like physicist meme dark number

মহাবিশ্বের এ সম্প্রসারণের কারণে এমন অনেক গ্যালাক্সি আছে যা আলোর চেয়েও বেশি বেগে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর অর্থ এ গ্যালাক্সিগুলো থেকে কোন আলো কখনই আমাদের কাছে এসে পৌঁছাবেনা। এ সব গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান কোন সভ্যতা থেকেও থাকে তবুও তারা কখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না। তাহলে এলিয়েনদের আমাদের সাথে যোগাযোগ না করার কারণ কি এটাই? ভেবে দেখার মত একটি বিষয়।

উপড়ের আলোচনা যদি কোন পাঠক মন দিয়ে পড়ে আসেন তাহলে তিনি খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবেন যে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান আজ কত উন্নত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ? না। এমন অনেক বিষয় আছে যা আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বলছে।

এমন অনেক অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ রয়েছেন যারা খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করেন যে, আমাদের মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। আরো অনেক অনেক মহাবিশ্ব রয়েছে। আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা বহু মহাবিশ্ব বা, মাল্টিভার্সের ক্ষুদ্র অংশ। আমরা আগেই ইনফ্লেশান তত্বের নাম শুনেছি। এই ইনফ্লেশান তত্বের জনক হলেন অ্যালান গুথ। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পদার্থবিদদের ছোট্ট থেকে ছোট্ট তালিকা করতে গেলেও তার নাম অনায়াসেই চলে আসবে। তিনি বলেছেন-“এমন একটি ইনফ্লেশনারি মহাবিশ্বের মডেল করা খুবই দূরুহ যা প্রাকৃতিকভাবেই মাল্টিভার্স বা, বহু মহাবিশ্ব তৈরি করে না।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করেন আমাদের মহাবিশ্ব যে বিগ ব্যাং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আসলে প্রথম বিগ ব্যাং ছিল না। এর আগেও অনেকবার বিগব্যাং হয়েছে আর পরেও হবে। মহাবিশ্বগুলো একবার প্রসারিত হয় আবার সঙ্কুচিতও হয় এবং তারা বিশ্বাস করেন এটি একটি নিয়মিত চক্র।

দেখতেই পাচ্ছি বিগব্যাং থেকে শুরু করে আমাদের এ বর্তমান মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, ব্ল্যাক হোল, ইনফ্লেশান এসবই অত্যন্ত রহস্যঘেরা। আমি চেষ্টা করব এ সব বিষয়েই ধীরে ধীরে যতটা বিস্তারিতভাবে বলা যায় বলার। আজ এই পর্যন্তই। ধন্যবাদ।