চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

বিচিত্র প্রাণীর অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস

পৃথিবীতে প্রায় ৮.৭ লক্ষ প্রজাতি বিদ্যমান। এদের যেমন ভিন্নতা রয়েছে গড়নে, তেমনি বৈচিত্র্যও আছে খাবারে। এদের কেউ তৃণভোজী, কেউ মাংসাশী, কেউ বা সর্বভুক। এদের খাদ্যাভ্যাস যেমন আলাদা হয়ে থাকে, তেমনি কখনো কখনো তা অদ্ভুতুড়েও হয়ে থাকে। প্রায় অজানা-অচেনা এসব প্রাণী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য, যাদের উদ্ভট খাদ্যাভ্যাস যেমন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আপনার মনোযোগ কাড়তে সক্ষম।

অশ্রুপানকারী মথ

মজার ব্যাপার হলো, বেচারা পাখি কিন্তু তাতে কোনো বিরক্তি দেখায় না। কেননা পাখি ঘটনা টেরই পায় না! পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এমনভাবে ম্যাগপাই রবিন, নিউটোনিয়া প্রভৃতি পাখির ঘাড়ে বসে এই মাদাগাস্কান টিয়ার ড্রিংকিং মথ প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে অশ্রুপান করে যেতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় বটে।কষ্ট পেলে অশ্রু বিসর্জন করা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এমন কি কখনো শুনেছেন যে, পরের দুঃখকে খাবার বানিয়েও বেঁচে থাকা যায়?

চিত্রঃ অশ্রুপাণরত মাদাগাস্কান মথ।

ঘটনা পুরোপুরি এরকম না হলেও ২০০৬ সালে মাদাগাস্কারে আবিষ্কৃত এক প্রকার মথের খাদ্যাভ্যাস প্রায় এর মতো। প্রবোসসিস নামক একটি অঙ্গ ঘুমন্ত পাখির চোখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করায় এবং প্রবোসসিস এর অগ্রভাগে লাগানো কাঁটার খোঁচায় পাখির চোখ থেকে নির্গত অশ্রু আনন্দের সাথে পান করে।

চিত্রঃ অশ্রুপানে ব্যবহৃত হার্পুন আকৃতির প্রবোসসিস।

কেন তারা এভাবে পরের দুঃখকে ভোজনের উপলক্ষ্য বানায়, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। এদের মাঝে সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হচ্ছে- মথগুলো তাদের সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে এই পদ্ধতি বেছে নেয়। তাদের কাছে লবণ তেমন সুলভ নয়। শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড ও বংশবৃদ্ধিতে সোডিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রয়োজনীয় কিন্তু তাদের জন্য সহজলভ্য নয়, তাই অদ্ভুত এই উপায়কেই বেছে নিতে হয় তাদের।

লিফ-কাটার অ্যান্ট

এই মহাশয় মোটেই তেমন অশ্রুচোষা নয়। পোকামাকড়দের মাঝে এরাই একমাত্র প্রজাতি, যারা নিজের খাবার নিজেই চাষাবাদ করে। তাদের শক্তিশালী চোয়াল ব্যবহার করে পাতা কাটে এবং কাটা পাতা বাসা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তারপর পাতাগুলোকে চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরোয় বিভক্ত করে এবং সেগুলোকে বাসার ‘ফাঙ্গাল চেম্বার’ নামক বিশেষ স্থানে সংরক্ষণ করে। পাতাগুলো পচনশীল। এই পাতার সাথে নিজেদের মল ও লালা মিশিয়ে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে।

চিত্রঃ লিফ কাটার অ্যান্ট।

মল, লালারস এবং আর্দ্রতা এক প্রকার ছত্রাকের বেড়ে উঠার জন্য আদর্শ পরিবেশ। এখানে বেড়ে উঠা ছত্রাকদেরকেই তারা খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। একেকটি লিফ কাটার প্রজাতির পিঁপড়ে নিজের ওজনের প্রায় দশগুণ বেশি ভার বহন করতে পারে।

ওমাটোকোইটা

চিত্রঃ গ্রীনল্যান্ড হাঙরের চোখে ওমাটোকোইটা পরজীবী।

যে হাঙরের চোখে বাসা বানায় সেগুলো মূলত ‘গ্রীনল্যান্ড হাঙর’। এদের চোখে এই পরজীবী উপস্থিত থাকায় অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এরা হাঙ্গরটির জন্য শিকার আকর্ষণে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে এরা পরস্পরের উপকারী মিথোজীবী। পরজীবীটি সারা জীবন ধরে হাঙরের অন্তচক্ষু আহার করে যায়।

অন্যদিকে হাঙ্গরের শিকারের কাজও সহজ করে দেয়।ওমাটোকোইটা ইলঙ্গেটা একটি সামুদ্রিক পরজীবী যা হাঙরের মতো জাঁদরেল শিকারীকে তার শিকার বানায়। লম্বায় প্রায় ৩ – ৫ সেন্টিমিটার। নিজেকে সরাসরি হাঙরের চোখের কর্নিয়ার আশেপাশের টিস্যুর সাথে সংযুক্ত করে নেয়। চোখের ভেতরে থাকা জেলী সদৃশ পদার্থকেই এরা আহার করে।

সিসিলিয়ান

সিসিলিয়ানরা দেখতে কেঁচোর মতো হলেও এরা আসলে উভচর। স্ত্রী সিসিলিয়ান বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে জন্মের পর বাচ্চাগুলো মায়ের শরীরের চামড়া খেয়ে বড় হয়।

চিত্রঃ সিসিলিয়ান।

মজার ব্যাপার হলো- সন্তানকে নিজের চামড়া খাওয়ালেও মা সিসিলিয়ানের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং সন্তানকে খাওয়ানোর জন্য প্রতি তিন দিনে একবার মা সিসিলিয়ান অতিরিক্ত পুষ্টিযুক্ত একটি বহিঃত্বক গঠন করে, যা সহজে খুলে আসে এবং শিশু সিসিলিয়ানরা তা নিয়ে মহাভোজে মেতে উঠে।নবজাতকদের অত্যন্ত ধারালো দাঁত এবং শরীরের তুলনায় বড় মুখ আছে যা দিয়ে জন্মের পরপরই মা এর শরীরের চামড়া খাবার জন্য হুলস্থুল বাধিয়ে দেয়। এমনকি তারা এক টুকরো চামড়া নিয়ে একে অপরের সাথে কাড়াকাড়িও লেগে যায়। এই কাড়াকাড়ি, মারামারি করে খাদ্যগ্রহণ ততদিন পর্যন্ত চলে যতদিন না তারা নিজেরাই শিকার ধরতে সক্ষম হয়।

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া

সাইমোথোয়া এক্সিগুয়া আইসোপড শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষুদ্র পরজীবী। এরা সামুদ্রিক। এরা মোটেই সুস্বাদু আকাঙ্ক্ষিত কিছু নয়। বরং মাছের জন্য এরা এক দুঃস্বপ্নেরই নাম। এরা যে শুধু মাছের মুখে ঢুকে এর জ্বিহ্বা ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে তা-ই নয়, মাছের শরীরের ভেতর বংশবৃদ্ধিও করে!

এ পরজীবীরা লার্ভাদশায় সুস্বাদু মাছের সন্ধানে সাগরে ভেসে বেড়ায়। পছন্দসই মাছ পেয়ে গেলেই কানকোর মাধ্যমে ঢুকে পেছনের পা ব্যবহার করে জিহ্বার গোড়ায় জেঁকে বসে। অতঃপর থাবা দিয়ে জ্বিহ্বা ক্ষতবিক্ষত করে তার রক্ত খেতে শুরু করে।

পরজীবী যত বড় হতে থাকে জ্বিহ্বায় রক্ত সংবহন তত কমতে থাকে এবং একসময় তা বিকল হয়ে যায়। তখন পরজীবীটি নিজেকে জ্বিহ্বার পেশীগুলোতে আটকে মেকী-জিভ বা ছদ্মবেশি জিভ (pseudo tongue) হিসেবে কাজ করে।

যারা জিহ্বাভুক, তারা পুরুষ হয়। যদি কোনো পুরুষ পরজীবীযুক্ত মাছে নতুন করে কোনো পুরুষ পরজীবী প্রবেশ করে, তাহলে পুরনো পরজীবীটি তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে স্ত্রী সাইমোথোয়া হয়ে নবাগত পুরুষ সাইমোথোয়ার সাথে মিলিত হয়। এই মিলনের ফলে সৃষ্ট লার্ভা বেড়িয়ে যায় নতুন মাছের খোঁজে।

পরজীবী জ্যাগার

চিত্রঃ স্কুয়া বা জ্যাগার।

এরা পাখিদের এমনভাবে তাড়া করে যে, পাখি তার খাওয়া খাবার বমি করে উগরে দেয়। উগরে দেয়া অর্ধগলিত খাদ্যই স্কুয়ারা খাবার হিসেবে খায় যা তাদের শীতকালীন খাদ্যের শতকরা ৯৫ ভাগের যোগান দেয়। মাছ, পোকা-মাকড় এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও এরা তাড়া করে। চুরি করে পাখির ডিমও খায়। অনেক সময় বড় শিকারকে কাবু করতে এরা দলবেঁধে হানা দেয়। খাবার কাড়তে একঘেয়েমি চলে আসলে দলগতভাবে নিজেদের শিকারকে ধারালো চঞ্চু দিয়ে হত্যা করে।পরজীবী জ্যাগার বা আর্কটিক স্কুয়া হলো পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র সামুদ্রিক পাখি। এরা অন্যান্য প্রজাতির কাছ থেকে খাবার চুরি করে খায়। বিশেষ পদ্ধতিতে এরা টার্ন, পাফিন, গাংচিল প্রভৃতি পাখির কাছ থেকে মাছসহ অন্যান্য খাবার কেড়ে নেয়। অ্যাসাসিন বাগ

চিত্রঃ অ্যাসাসিন বাগ

প্রকৃতি যেন এদেরকে খুনী হিসেবেই তৈরি করেছে। বিষ ও শক্তিশালী পা দিয়ে তারা তাদের চেয়ে আকারে বড় কীটকেও পরাজিত করতে পারে। এদের মুখ থেকে একপ্রকার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, যা শিকার ধরার পর শিকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দেয়। সামনের পা দিয়ে শক্ত করে ধরে প্রবেশ করানোর কাজটি সম্পন্ন করা হয়। বিষক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ তরল হয়ে যায় এবং অ্যাসাসিন বাগ তা আনন্দের সাথে পান করে নেয়।

ল্যামপ্রে

বিকট দর্শন এ মাছ অন্য মাছের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের হুকের মত ভেতরের দিকে বাঁকানো দাঁত থাকে।

ড্রাকুলা অ্যান্ট

চিত্রঃ ড্রাকুলা অ্যান্ট।

ডাং বিটলনাম থেকেই আচ করা যায় এই প্রজাতির পিঁপড়ে কেমন হতে পারে। বলা যায় ভ্যাম্পায়ারের মতোই। বোলতার মতো দেখতে এই পিঁপড়া নিজের লার্ভারই প্লাজমা খায়। এরা তাদের সন্তানদের প্রথমে খেতে দেয়, তারপর তাদের চিবোতে থাকে যতক্ষণ না ভেতর থেকে প্লাজমা বের হয়। তারপর নির্গত প্লাজমা পান করে ফেলে। এই প্লাজমা তাদের ক্ষেত্রে এনার্জি ড্রিংক এর মতো কাজ করে। এত ঝাক্কির পরও কিন্তু লার্ভাগুলো মরে না। শরীজুড়ে অজস্র ক্ষত নিয়ে তারা ঠিকই বেঁচে থাকে।

চিত্রঃ ডাং বিটল।

এ সকল ভিন্ন প্রাণীর বিচিত্র খাদ্যাভ্যাসের ধরণ ও প্রকরণ প্রকৃতির আজব খেয়ালেরই অংশ। এগুলো যেমন আকর্ষণ ও আগ্রহের খোরাক তেমনি এখানে গবেষণারও অবকাশ আছে আছে প্রচুর।এরা অন্য প্রাণীর মল খেয়ে বেঁচে থাকে। দিনের শুরুতে পছন্দসই গন্ধযুক্ত মলের দলার খোঁজে উড়ে বেড়ায়। তৃণভোজী প্রাণীদের মল বেশি পছন্দ করে। লার্ভাগুলি মলের অপাচ্য দৃঢ় অংশ খায়, পূর্ণ বয়স্করা খায় তরল অংশ। পুরুষরা মহিলা বিটলদের মলের তৈরি দুর্গন্ধযুক্ত বল দিয়ে প্রস্তাব দেয়। এদের বংশবিস্তার এবং জীবন মল ও মাটিকে ঘিরেই।

তথ্যসূত্র

১) wonderlist.com/10-lesser-known-animals-bizarre-dietary-behaviors/

২) newscientist.com/article/dn10826-moths-drink-the-tears-of-sleeping-birds/

৩) kids.sandiegozoo.org/animals/insects/leaf-cutter-ant

৪) cracked.com/article_19073_the-8-most-terrifying-diets-in-animal-kingdom.html

৫) elasmo-research.org/education/topics/lh_somniosus.htm

featured image: campeche.com

বিচিত্র কাপ

ভিক্টোরিয়ান যুগে পুরুষদের মুখের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গোঁফ। এমনকি নিজেদের বড় গোঁফকে শক্ত রাখতে তারা তাতে মোমও ব্যবহার করতো! কিন্তু বিপত্তি বাধতো চা পানের সময়। চায়ের গরম ধোঁয়ায় সেই মোমের কিছুটা গলে কাপে পড়ে গিয়ে বিচ্ছিরি এক ব্যাপার ঘটতো। তাই সেই যুগের ‘আসল পুরুষ’দেরকে এমন ঝামেলা থেকে বাঁচাতে ১৮৬০ সালে এগিয়ে আসেন এক ইংরেজ, নাম হার্ভে অ্যাডামস।

তিনি কাপের একদিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির এ ধারকটি যুক্ত করে দেন যাতে করে সেটা অনেকটা গোঁফের কেস হিসেবে কাজ করতো। ফলে চা পানের বেলায় উটকো ঝামেলায় পড়া থেকে বেঁচে যায় গোঁফধারী সকলেই।

featured image: yandex.ru

ঋতুস্রাবের কারণ ও বিচিত্র ইতিহাস

মেয়েটির বয়স যখন কেবল এগারো তখনই হয়তো তার পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব (menstruation) এর অভিজ্ঞতা হয়। তারপরের কয়েক বছর তা শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণই হয়ে দাঁড়ায় না, সাথে তাকে সহ্য করতে হয় অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা। এসময়টা হট ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে তাকে কুঁকড়ে থাকতে হয় বিছানায়, সামান্য নড়াচড়া করাটাও যেন হয়ে ওঠে বিশাল যন্ত্রণা। অধিকাংশ মেয়েদেরকেই এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো একদমই অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য প্রাণীদের এই পিরিয়ডের ঝামেলা নেই। তাই এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা রহস্যজনকও বটে। ঋতুস্রাব কেন হয়? কেন শুধু মানুষের মাঝেই এটি দেখা যায়? এটি দরকারি হয়ে থাকলে অন্যান্য প্রাণীদের বেলায় কেন নেই?

ঋতুচক্র প্রজননের একটি অংশ। নারীর প্রজনন প্রক্রিয়া প্রতি মাসে দুটি হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের প্রতি সাড়া দেয়। প্রতিমাসে জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তর, এন্ডোমেট্রিয়াম গর্ভধারণের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে ঋতুস্রাবের সাহায্যে।

এন্ডোমেট্রিয়াম কতগুলো স্তরে সজ্জিত এবং রক্তনালিকা সমৃদ্ধ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ না করলে প্রোজেস্টেরন লেভেল কমতে থাকে। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং রক্তনালিকাগুলো তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং যোনিপথে বেরিয়ে যায়। এই রক্তপাতকেই বলে ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড। সাধারণত প্রতি ২৮ দিন পর পর এই চক্র সম্পন্ন হয়ে থাকে।  এই চক্রকে বলে ঋতুচক্র।

একজন নারীর ঋতুস্রাবের সময় গড়পড়তা ৩  থেকে ৭ দিন। এই সময়ে মোটামুটি ৩০ থেকে ৯০ মিলিলিটার  ফ্লুইড দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। এই ফ্লুইডে থাকে রক্ত, মিউকাস ও এন্ডোমেট্রিয়ামের ভাঙা অংশ। এই পরিমাণটা জানা খুব সহজ, ব্যবহার করার আগের ও পরের স্যানিটারী ন্যাপকিনের ভরের পার্থক্য থেকেই বের করা যায়।

অনেকেই এই প্রক্রিয়াটিকে অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় বলে মনে করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন এটা হয়? আগে মনে করা হতো ঋতুস্রাব হয়ে থাকে নারীদেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেবার জন্য। ১৯০০ সালের দিকের বেশিরভাগ গবেষণা মেয়েদের ঋতুস্রাবকে ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধারণা এখনো রয়ে গেছে।

১৯২০ সালে Bela Schick নামের একজন বিখ্যাত শারীরতত্ত্ববিদ ‘Menotoxin’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একটি গবেষণা করেছিলেন যেখানে দুইজন মহিলা হাতে কিছু ফুল নিয়ে ধরে থাকেন। একজনের পিরিয়ড চলছিল এবং আরেকজন স্বাভাবিক ছিলেন। schick প্রস্তাব করেন, পিরিয়ড চলাকালীন মহিলার চামড়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ (menotoxin) নিঃসৃত হয় যার কারণে ফুল নেতিয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, পিরিয়ডকালীন এই বিষাক্ত পদার্থ ইস্টের বংশবৃদ্ধিও রহিত করে দেয়। তার ধারণা ছিল এই বিষাক্ত পদার্থটি পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে নারীর ঘামের সাথে নিঃসৃত হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী আবার তাকে সমর্থনও জানালেন। তারা বললেন, পিরিয়ড চলাকালীন একজন মহিলা তার গা থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গাছের বৃদ্ধি রহিত করে ফেলতে পারে, এমনকি বিয়ার, ওয়াইন, পিকেলসও নষ্ট করে ফেলতে পারে।

চিত্রঃ না, ঋতুস্রাব চলাকালীন নারী ফুলের নেতিয়ে পড়ার কারণ নয়

ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা

গবেষক Clancy আবার মত প্রকাশ করেন, এসব গবেষণা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এগুলো করা হয়েছিল সেই সময়ে যখন সমাজে মেয়েদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচের দিকে। বলা যায় অনেকটা পরিকল্পতভাবেই এমন ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা করা হয়েছিল। এসব গবেষণার সাহায্যে এটি কখনোই প্রমাণ হয় না যে, আসলেই মেনোটক্সিন নামক কোনো বিষাক্ত কিছু পিরিয়ডের সময় নিঃসৃত হয়।

১৯২৩ সালে ঋতুস্রাব নিয়ে আরেকটি অনুমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার Margie Profet প্রস্তাব করেন, নারীদেহে শুক্রাণুর সাথে যে রোগজীবাণু প্রবেশ করে তাদের থেকে রক্ষার জন্যই ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। Clancy আবার এসময় বলেন যে, “আসলে পুরুষেরাই হলো অপরিচ্ছন্ন, পুরুষের এই অপরিচ্ছন্নতার জন্য প্রবেশকৃত রোগ জীবাণু দূর করার জন্যই মেয়েদের ঋতুস্রাব হয়।”

চিত্রঃ শুক্রাণুই কি নারীর ঋতুস্রাবের কারণ?

উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে profet এর ধারণার খুব তাড়াতাড়িই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা তার ধারণা সঠিক হলে ঋতুস্রাবের আগে জরায়ুতে অনেক রোগজীবাণু থাকার কথা ছিল, কিন্তু এমনটা হয় না। এমনকি কিছু কিছু গবেষণা এটাও বলে যে ঋতুস্রাব ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। সেখানে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ভালো বংশবিস্তার করতে পারে। এখানে আয়রন, প্রোটিন, সুগার সবই থাকে। আবার ঋতুস্রাবের সময় যোনিপথের আশেপাশে মিউকাসের পরিমাণ কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়ার জন্য বেঁচে থাকা খুবই সুবিধাজনক হয়।

শক্তির ব্যবহার

Profet এর সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মিশিগান ইউনিভার্সিটির Beverly Strassmann. ১৯৯৬ সালে তিনি নিজের ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন ঋতুস্রাব বোঝার জন্য শুধু মানুষের উপর গবেষণা করলেই চলবে না,অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের বংশবিস্তার সমন্ধেও গবেষণা দরকার। তাদের প্রক্রিয়াও আলোচনায় আনা জরুরী। তার মতে, জরায়ুর মধ্যকার একটি পুরু রক্তনালিকা সমৃদ্ধ স্তরকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রেও জরায়ুর ভেতরের স্তরটি থাকে। গর্ভধারণ না করলে স্তরটির ভেতরের পদার্থগুলো শোষিত হয়ে যায় অথবা ভেঙে বেরিয়ে যায়। স্ট্রেসম্যানের মতে,স্তরটি ভেঙে আবার তৈরি করতে কম শক্তির প্রয়োজন হয়।

তিনি আসলে এখানে শক্তির মিতব্যয়ীতা বোঝাতে চেয়েছেন,রক্তপাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে চাননি। অবশ্য নারীদেহ সম্পূর্ণ রক্ত শোষণ করতে পারবে কিনা এটাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত হলে ঋতুস্রাবই ভালো পন্থা। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের রক্তপাত অভিযোজন নয় বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মায়ের সাথে গভীরভাবে প্রোথিত

লিভারপুল ইউনিভার্সিটির Colin Finn এমনই আরেকটি ধারণা দেন ১৯৯৮ সালে। তার মতে শক্তি সংরক্ষণের জন্য নয় বরং ডিম্বাণুর বেড়ে ওঠার জন্য ঋতুস্রাব প্রয়োজনীয়। ফিনের মতে ভ্রুণ বিভিন্ন স্তরের সাহায্যে মায়ের শরীরের সাথে খুব গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। যার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর কিছু সময়ের জন্য জরায়ু গর্ভধারণের জন্য যথাযথভাবে তৈরি থাকে। সময়মতো গর্ভধারণ না করলে উপরের স্তর আবার ভেঙে যায়।

উপরের দুটি ধারণাই সঠিক হতে পারে। সত্য অনুসন্ধানের জন্য আমাদের তুলনা করতে হবে অন্যান্য প্রজাতির সাথে যাদের ঋতুস্রাব হয় আর যাদের হয় না। মানুষ ছাড়া আর যেসব প্রাণীর ঋতুস্রাব হয় তাদের অধিকাংশই প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত। বানর, এপ, মানুষ সবাই আছে এর মাঝে।

ঋতুস্রাব হয় এমন একটি প্রজাতি হলো rhesus macaques. বড় আকারের এপের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়। এছাড়া শিম্পাঞ্জি আর গিবনের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই দেখা যায়। গরিলা আর ওরাং-ওটাং এর মধ্যে অবশ্য বহুলভাবে দেখা যায় না। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে টারশিয়ারের ঋতুস্রাব দেখা যায়, তবে খুব বিরল।

চিত্রঃ rhesus macaques, এদের মানুষের মতো ঋতুস্রাব হয়

পরিচিত প্রাণীদের মধ্যে হাতি আর বাদুরের ঋতুস্রাবীয় রক্তপাত হয়ে থাকে। নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির John Rasweiler এর মতে বাদুরের দুইটি গোত্র, free tailed bats এবং leaf-nosed bats এর পিরিয়ড হয়ে থাকে।

ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণী খুবই অল্প

উপরে উল্লেখিত প্রজাতিদের ঋতুস্রাব মোটামুটি মানুষের মতোই। শর্ট টেইলড ফ্রুট বাদুরের রজঃচক্র ২১–২৭ দিনের যেমনটা হয় মানুষের। বাদুরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানুষের মতো তেমন স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এটি বোঝা যায় কারণ এই বাদুরগুলোর জরায়ুকে ঘিরে ছোট ছোট রক্তনালিকা থাকে। দেখা যাচ্ছে ঋতুস্রাব হয় এমন প্রজাতি হাতে গোনা যায়। মানুষ, এপ, বানর, বাদুর এবং হাতী।

ভ্রুণ হতে আসা সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে জরায়ুর পরিবর্তন

ইয়েল ইউনিভার্সিটির Deena Emera’র মতে, একজন মায়ের তার জরায়ুর উপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে সেটি তার নিজের উপরই নির্ভর করে। ২০১১ তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইমেরা এবং তার সহকর্মীগণ উল্লেখ করেন, ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণীদের জরায়ুর ভেতরের স্তরটি সম্পূর্ণরূপে মায়ের দেহের প্রোজেস্টেরন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভ্রুণ শুধুমাত্র তখনই জরায়ুতে স্থাপিত হয় যখন জরায়ুর ভেতরের দেয়াল পুরু আর বড় বিশেষায়িত কোষযুক্ত হয়। একজন মহিলা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি গর্ভবতী হবেন কিনা। এই ক্ষমতাকে বলে ‘spontaneous decidualisation.

অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ভ্রুণ হতে আসা সংকেত জরায়ুর পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গর্ভাবস্থার প্রতি সাড়া দিতেই জরায়ুর পরিবর্তন হয়ে থাকে। ইমেরার মতে, “যেসব প্রজাতির ঋতুস্রাব হয় এবং যারা spontaneous decidualisation ক্ষমতা প্রদর্শন করে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।”

এর উপর ভর করেই তিনি মূল জিজ্ঞাসা খুঁজে বের করেন- “কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে কেন গর্ভাবস্থা মা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে আর কিছু প্রজাতির তা নিয়ন্ত্রিত হয় ভ্রুণ দ্বারা?” তিনি মত প্রকাশ করেন spontaneous decidualisation ক্ষমতাটা তৈরি হয়েছে মা এবং ভ্রুণের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য।

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে এবার দুটি সম্ভাবনা দেখানো যায়। প্রথমটি হলোঃ spontaneous decidualisation (গর্ভাবস্থা নিয়ন্ত্রণে মায়ের ক্ষমতা), যা আক্রমণাত্মক ফিটাস হতে মাকে রক্ষা করার জন্য বিকশিত হয়েছে।

সকল ভ্রুণই মায়ের জরায়ুতে গভীর পরিচর্যার জন্য আশ্রয় নেয়। ঘোড়া,গরু,শূকর এদের ক্ষেত্রে ভ্রুণ আলতোভাবে জরায়ুর উপরে স্থান নেয়। বিড়াল,কুকুরের ক্ষেত্রে ভ্রুণটি আরেকটু গভীরে প্রবেশ করে। কিন্তু মানুষ সহ অন্যান্য প্রাইমেটদের ভ্রুণ অত্যন্ত গভীরভাবে জরায়ু প্রাচীরে প্রোথিত হয়। কেউ কেউ এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, মা আর শিশু যেন একটি “চিরায়ত রশি টানাটানি” যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

মা চায় তার প্রত্যেক সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি বরাদ্দ রাখতে যাতে করে তার শক্তি কিছুটা বাঁচে এবং তা অন্য সন্তানকে দিতে পারে। অপরদিকে বেড়ে উঠতে থাকা বাচ্চাটি চায় তার মা থেকে যতটা সম্ভব বেশি শক্তি ব্যবহার করতে। ইমেরার মতে, “বাচ্চাটি যত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মা ততই সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে থাকে বাচ্চার আক্রমণ ঠেকানোর জন্য।”

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, spontaneous decidualisation ব্যবস্থাটি উন্নতি লাভ করেছে অনাকাঙ্খিত ভ্রুণ প্রতিরোধ করার জন্য। জীনগত অস্বাভাবিকতা ভ্রুণের ক্ষেত্রে খুব বেশি দেখা যায়। যার কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই অনেকের গর্ভপাত হয়। এটা হতে পারে অস্বাভাবিক যৌন ক্রিয়াকলাপের কারণে।

ভ্রুণে পরিণত হওয়া ডিম্বাণুটির বয়স বেশিও হতে পারে

মানুষ যেকোনো সময় যৌন সঙ্গমে মিলিত হতে পারে যেখানে অন্যান্য প্রাণীরা শুধুমাত্র ডিম্বপাতের সময় অর্থাৎ প্রজননকালে যৌন সঙ্গম করে। এটিকে বলে সম্প্রসারিত যৌন কাল।

অন্যান্য কিছু ঋতুস্রাবীয় প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেও এই সম্প্রসারিত যৌনকাল দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে অনেক সময় নিষিক্ত ডিম্বাণুর বয়স বেশ বেশি থাকে, যার কারণে এতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। জরায়ু পুরু হয়ে পরিবর্তিত হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক ভ্রুণের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। spontaneous decidualisation মাকে বাঁচানোর একটি পদ্ধতি হতে পারে। এটি মাকে অস্বাভাবিক ভ্রুণ হতে রক্ষা করে এবং নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করে।

এ থেকে একটি বিষয়ে ধারণা লাভ করা যায়, অধিকাংশ ঋতুস্রাবীয় স্তন্যপায়ীদের গর্ভকাল একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী হয়ে থাকে এবং তারা সন্তান ভূমিষ্ঠ করতে অধিক শক্তি বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়। ঝামেলাজনক গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্যই তারা বিবর্তিত হয়েছে।

সুতরাং ঋতুস্রাব বিবর্তনের একটি পার্শ্বক্রিয়া

২০০৮ সালে রেসাস বানরের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এদের ভ্রুণের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে এরকম তথ্য না পাওয়ার কারণে এই গবেষণা বেশি দূর এগোয়নি। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা spontaneous decidualisation এর কারণ খুঁজে বের করতে পারছি,ততক্ষণ ঋতুস্রাবের ধাঁধার জট খুলতে পারবো না।

স্ট্রেসম্যান,ফিন,ইমিরা সহ সকলের গবেষণা একটি দিক নির্দেশ করছে যে,ঋতুস্রাব প্রজননজনিত কারণে বিবর্তনের একটি আকস্মিক ঘটনা। যেসব প্রজাতি অন্যভাবে প্রজনন ঘটিয়ে থাকে তাদের ঋতুস্রাবের প্রয়োজন হয় না। বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ঋতুস্রাব খুব বিরল হয়ে থাকে।

মানুষের ক্ষেত্রে,যেসকল সমাজে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা কম,তাদের ঋতুস্রাবও কম হয়। এমনকি সেসব স্থানে মানুষ এখনো প্রাকৃতিক জন্মদানের উপর নির্ভরশীল। সেখানকার মহিলারা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটায় সন্তান জন্ম দিয়ে অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে।

মালির ডগন সম্প্রদায়ে গবেষণা করে স্ট্রেসম্যান আবিষ্কার করেছেন সেখানের মহিলারা জীবনে ১০০ টি পিরিয়ড পেয়ে থাকেন যেটা আমাদের প্রজাতির ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাভাবিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্বাভাবিক বিশ্বের মহিলারা ৩০০–৫০০ টি পিরিয়ড পান।

চিত্রঃ ডগন নারীরা নারীত্বের বেশিরভাগ সময়েই গর্ভবতী কিংবা দুগ্ধদানরত অবস্থায় থাকেন

Clancy বলেন, “এমন অনেক মহিলা আছেন যারা পিরিয়ড না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু আসলে আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বিশাল। সুতরাং প্রতিটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে বরং একটু সময় নেওয়াই ভাল।”

যাহোক এত বিশাল আলোচনা হয়তো একটি ১১ বছর বয়সী মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবের যন্ত্রণাকে কমাতে পারবে না। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ঠেলে দিয়ে আমাদের সকলের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীই পারে এই কষ্টকে ঘুচাতে। হাজার হোক একজন মানুষ, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তার জন্ম তো হয় এই ঋতুস্রাব প্রক্রিয়ার কারণেই।

তথ্যসূত্রঃ BBC Earth, http://www.bbc.co.uk/earth/story/20150420-why-do-women-have-periods

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371