হাবল কীভাবে গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করেছিলেন?

গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত অপসারিত হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। এ নিয়ে বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের সূত্র আছে। সূত্রের সাহায্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতিবেগ সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

হাবল তো আর এমনিতেই এই ধারণাটি পাননি। তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় হাবল কীভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করলেন? এর জন্য তিনি সেসব গ্যালাক্সি থেকে নির্গত আলোর লাল সরণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। লাল সরণ বিশ্লেষণ করলে গতিশীল বস্তুর বেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

ধরি একজন দর্শক একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং একটি গাড়ি সাইরেন বাঁজাতে বাঁজাতে যাচ্ছে। গাড়িটি যখন দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যায় তখন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতাও কমে যায়। গাড়ির গতিবেগ যত বেশি হবে তীক্ষ্ণতার পরিবর্তনও হবে তত বেশি। কোনোভাবে যদি সাইরেনের শব্দের কম্পাংক জানা যায় তাহলে সেখান থেকে গাড়িটির বেগ বের করা সামান্য কিছু গাণিতিক হিসেবের ব্যাপার মাত্র। সাইরেনের প্রারম্ভিক কম্পাংক এবং দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংককে তুলনা করলেই গাড়িটির গতিবেগ বের হয়ে যাবে।

কোনো একটি উৎস যদি আলো বা শব্দের মতো কোনো সিগন্যাল প্রেরণ করতে থাকে তাহলে তার প্রারম্ভিক সিগন্যালগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম্পন সম্পন্ন করবে। কিন্তু যখন এই সিগন্যাল কোনো দর্শকের কাছে পৌঁছুবে তখন দর্শকের সাপেক্ষে এর কম্পনের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

দর্শকের সাপেক্ষে উৎস কত বেগে চলমান কিংবা উৎসের সাপেক্ষে দর্শক কত বেগে চলমান তার উপর নির্ভর করে সিগন্যালের কম্পন কত হবে। উৎস যদি দর্শকের কাছে আসতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের অধিক কম্পন অনুভব করবে। কারণ সেক্ষেত্রে সিগন্যালের কম্পন বা স্পন্দনগুলো ঘন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে উৎস যদি দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের স্বল্প কম্পন অনুভব করবে।

চিত্র: সাইরেনের কম্পাংক জানলেই বের হয়ে আসবে গাড়ির গতিবেগ। ছবি: সিকে

চমকপ্রদ এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান জোহান ডপলার (১৮০৩–১৮৫৩)। তার নাম অনুসারেই সিগন্যাল বা তরঙ্গের বিশেষ এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ডপলার প্রভাব। বিখ্যাত একটি পরীক্ষণের মাধ্যমে শব্দের ডপলার প্রভাবের সঠিকতা যাচাই করে দেখেছিলেন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ হেনড্রিক (১৮১৮–১৮৯০)।

দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই ডপলার প্রভাবকেই ব্যবহার করেছিলেন। দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে নির্গত আলোর স্বাভাবিক কম্পাংক এবং ঐ একই আলোর দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংকের মাঝে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থেকেই হাবল তাদের বেগ নির্ণয় করেছিলেন।

কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়? নিম্নবর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যাবে। তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের অনেকগুলো রূপ আছে। তাদের মাঝে একটি হলো আলো। এই বিকিরণকে তরঙ্গের মতো করে সাদামাটাভাবে নীচের চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। কয়েকটি শীর্ষ আছে এখানে। দুটি শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বলা হয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য। এই বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যখন ০.০০০০২ থেকে ০.০০০১ সেন্টিমিটারের মাঝে থাকবে তখন একে আমরা বলি ‘আলো’। কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই সীমা পর্যন্ত আমাদের চোখ সংবেদনশীল।

চিত্র: দুই শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

এর চেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। সেসবের উদাহরণ ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও ওয়েভ। ইনফ্রারেড বিকিরণ হলো তাপ। উত্তপ্ত বস্তু থেকে এটি বের হয়। আলোর চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। এর উদাহরণ আল্ট্রাভায়োলেট, এক্স-রে এবং গামা রে। নীচের সারণিতে এই বিকিরণগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো।

বিকিরণের প্রকৃতি তরঙ্গদৈর্ঘ্য (সেন্টিমিটার)
রেডিও ১০ এর চেয়ে বড়
মাইক্রোওয়েভ ০.০১ – ১০
ইনফ্রারেড (তাপ) ০.০০০১ – ০.০১
দৃশ্যমান আলো ০.০০০০২ – ০.০০০১
অতিবেগুনী রশ্মি ১০-৭ – ০.০০০০২
এক্স-রে ১০-৯ – ১০-৭
গামা রে ১০-৯ এর চেয়ে ছোট

সারণি: তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও বিকিরণের প্রকৃতি

তরঙ্গদৈর্ঘ্য যা-ই হোক, সকল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ একই বেগে চলে। সকলের বেগই আলোর বেগের সমান। তরঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘কম্পাংক’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। কোনো বিকিরণ প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো কম্পন সম্পন্ন করে তাকে বলা হয় কম্পাংক। পূর্ববর্তী চিত্রে কতগুলো পূর্ণ তরঙ্গ দেখানো হয়েছে। একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হলে একে বলা যায় একটি কম্পন।

প্রতি সেকেন্ডে এরকম হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ কম্পন সম্পন্ন করে তড়িৎচুম্বকের একেকটি বিকিরণ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাংক পরস্পর সম্পর্কিত। আলোর বেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে কম্পাংক পাওয়া যায়। এ হিসেবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বড় হবে বিকিরণের কম্পাংক তত কম হবে। উল্টোভাবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হবে কম্পাংক তত বেশি হবে।

কোনো নক্ষত্র কিংবা কোনো গ্যালাক্সি সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিকিরণ করে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে ঘটা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া (mechanism)-র ফলে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটে চলছে। এর ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপ ও আলোক শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। নক্ষত্র সেই তাপ ও আলোক শক্তিকে বিকিরণের মাধ্যমে চারদিকে নিঃসরণ করে দিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছে।

চিত্র: নক্ষত্রগুলো প্রতিনিয়ত বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ছবি: নাসা/উইকিমিডিয়া কমন্স

বিশাল নক্ষত্র ছেড়ে অতি ক্ষুদ্র জগতে গেলেও দেখা যাবে সেখানে বিকিরণ হচ্ছে। বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণার গতির ফলেও বিকিরণ তৈরি হয়। যেমন ইলেকট্রন ও প্রোটন। এদের দ্বারাই জগতের সকল বস্তু গঠিত। এই বিকিরণ নিঃসৃত হবার সময় চার্জিত বস্তু থেকে শক্তি বহন করে নিয়ে আসে। ফলে বস্তুটি শক্তি হারায়।

সত্যি কথা বলতে কি, সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে, সকল প্রকার বিকিরণই আসলে চার্জিত কণার গতির ফলে সৃষ্টি। যেকোনো পদার্থের মাঝেই তার ইলেকট্রনগুলো এলোমেলোভাবে গতিশীল থাকে। লোহা বা অন্য কোনো ধাতুকে যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন আসলে তার মাঝে থাকা ইলেকট্রনের এলোমেলো গতির পরিমাণ বেড়ে যায়। গতি বাড়লে সেখান থেকে তাপ বা ইনফ্রা-রেড তরঙ্গ বিকিরিত হয়।

আরো বেশি উত্তপ্ত করলে সেখানের ইলেকট্রনের গতি আরো বেড়ে যায়। গতি আরো বেড়ে গেলে সেখান থেকে ইনফ্রা-রেডের চেয়েও উচ্চ তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। ইনফ্রা-রেডের চেয়ে উচ্চ তরঙ্গ হলো দৃশ্যমান আলোক রশ্মি। এদের মাঝে সবচেয়ে কাছের হলো লাল রঙের তরঙ্গ। সেজন্যই দেখা যায় লোহার কোনো খণ্ডকে বেশি উত্তপ্ত করলে সেটি লালচে আভা বিকিরণ করে।

উত্তপ্ত লোহা থেকে লালচে আভা বের হয়। এর পেছনে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার কার্যকলাপ। ছবি: ড্রিমসটাইম

নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং তাদের কর্তৃক বিকিরণ সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বর্ণালি বা স্পেকট্রাম। স্পেকট্রোমিটার বা বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণের বর্ণালি বের করা হয়। বর্ণালিবীক্ষণের একদম সরলীকৃত রূপ হলো প্রিজম। প্রিজমের মাঝেও বিকিরণের বর্ণালির ক্ষুদ্র একই অংশ দেখা যায়। অন্যদিকে স্পেকট্রোমিটারে বিকিরণের বর্ণালির খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানা যায়।

ভিন্ন ভিন্ন বিকিরণকারী বস্তুর বর্ণালি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণ যেমন হয়ে থাকে, নক্ষত্র থেকে নির্গত বিকিরণ তেমন হবে না। আবার এক খণ্ড লোহা থেকে যে বিকিরণ বের হয় তা গ্যালাক্সি কিংবা নক্ষত্র কিংবা অন্য কোনোকিছুর মতো হবে না।

কিছু কিছু নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বাইরের দিকে শীতল গ্যাসের আবরণ থাকে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কিছু বিকিরণ ঐ আবরণে শোষিত হয়ে যায়। এই শোষণ একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে হয়। কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের পদার্থে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আবৃত আছে তার উপর।

গ্যাসীয় আবরণে ক্যালসিয়াম পরমাণু থাকলে বর্ণালির এক অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, লোহা থাকলে অন্য অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, অন্য কোনো মৌল থাকলে অন্য কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে।

কোন কোন উপাদান কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষণ করে তা বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানেন। গবেষণাগারে সেসব উপাদানকে বিশ্লেষণ করে তারা এটি বের করেছেন।

নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির গ্যাসীয় আবরণ যদি বিশেষ কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণকে শোষণ করে নেয় তাহলে ঐ নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বর্ণালির মাঝে একটি শূন্যতা তৈরি হবে। যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হয়েছে, বর্ণালির ঐ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অংশে একটি অন্ধকার অঞ্চল (Dark line) দেখা যাবে। যার অর্থ হলো ঐ অংশের বিকিরণ এসে পৌঁছাতে পারেনি, কোথাও আটকে গেছে।

চিত্র: নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির আবরণকারী উপাদানভেদে বর্ণালির বিভিন্ন অংশে অন্ধকার অঞ্চল দেখা যায়। ছবি: নাসা

বিজ্ঞানী হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে আগত আলো এবং তাদের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করলেন। তিনি দেখতে পেলেন বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্রমেই বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে।

অনেকগুলো গ্যালাক্সির বর্ণালি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর ক্রম-অপসারণ বেগের কারণেই বর্ণালিতে এই সরণ ঘটছে। এই সরণই হলো লাল সরণ বা রেড শিফট। বর্ণালির অন্ধকার অংশের সরণ হচ্ছে বড় তরঙ্গের দিকে, আর দৃশ্যমান আলোতে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বড়, তাই এই সরণের নাম দেয়া হয়েছে লাল সরণ।

হাবলই কিন্তু প্রথম নন, মহাজাগতিক বস্তুর বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চলের উপস্থিতি সম্পর্কে আরো অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। জার্মান পদার্থবিদ জসেফ ভন ফ্রনহফার (১৭৪৭ – ১৮২৬) সূর্যের আলোর বর্ণালি সর্বপ্রথমতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৮০২ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওয়ালাস্টোনও বিকিরণকারী বস্তুর মাঝে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান।

চিত্র: এডউইন হাবলের আগেই বিজ্ঞানী ফ্রনহফার নক্ষত্রের বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান। ছবি: উকিমিডিয়া কমন্স

১৮৬৮ সালের দিকে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হিউগিনস (১৮২৪ – ১৯১০) এ সম্পর্কিত বেশ কিছু গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে, কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে লাল অংশের দিকে কিংবা ধীরে ধীরে নীল অংশের দিকে সরে যাচ্ছে।

তিনি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ডপলার প্রভাবের সাহায্যে এবং এই ব্যাখ্যা ছিল সঠিক। তিনি বলেন, নক্ষত্রগুলো ক্রমান্বয়ে আমাদের নিকটে আসার কারণে কিংবা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার কারণে এটি হয়েছে।

ক্যাপেলা (capella) নামে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আছে। উজ্জ্বলতার বিচারে এটির অবস্থান ষষ্ঠ। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়।

সূর্যের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলের চেয়ে ক্যাপেলার বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল লাল তরঙ্গের দিকে 0.01% বেশি অগ্রসর হয়ে আছে। যেহেতু লালের দিকে তথা বড় তরঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাই এখান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্যাপেলা আমদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরে সরে যাবার বেগ, আলর বেগের 0.01%। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে। আলর বেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার।

প্রতি মুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছে ক্যাপেলা নক্ষত্র। ছবি: বব মুলার

পরবর্তী বেশ কয়েক দশক পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল নক্ষত্র, শনির বলয় ইত্যাদির বেগ নির্ণয় করতে ডপলার প্রভাব ব্যবহার করা হতো।

তো হাবল কীভাবে জানলেন, বেশি লাল সরণের গ্যালাক্সিগুলো কিংবা বেশি বেগে অপসৃয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো বেশি দূরে অবস্থিত? তিনি জেনেছেন কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন গড়পড়তাভাবে যে নক্ষত্রগুলো যত ক্ষীণ (অনুজ্জ্বল) সেগুলোর লাল সরণ তত বেশি। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে অনুজ্জ্বল বা ক্ষীণ নক্ষত্রগুলোই দূরে অবস্থান করছে।

তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ শুধুমাত্র দূরে অবস্থান করলেই যে গ্যালাক্সি অনুজ্জ্বল হবে এমন নয়। কম পরিমাণে বিকিরণ করার কারণেও উজ্জ্বলতা কম হতে পারে। হতে পারে এর নিজস্ব উজ্জ্বলতাই অল্প, যার কারণে কাছে থাকা সত্ত্বেও ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। সেজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছে।

হিসেবের জন্য তাকে বিশেষ শ্রেণির কিছু গ্যালাক্সিকে বেছে আলাদা করে নিতে হয়েছে যেন হিসেবে ঝামেলা না হয়। বাছাইকৃত এ শ্রেণির গ্যালাক্সিকে বলা হয় ‘মানবাতি’ বা Standard Candle বিশেষ এ শ্রেণির গ্যালাক্সিগুলোর আপাত উজ্জ্বলতা দেখেই বের করা যায় এরা কত দূরে অবস্থিত। যদি কোনো গ্যালাক্সি ‘মানবাতি’ শ্রেণিতে পড়ে এবং এর উজ্জ্বলতা খুব ক্ষীণ হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি অবশ্যই অনেক দূরে অবস্থিত আছে। মানবাতির উজ্জ্বলতা যত ক্ষীণ হবে পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব তত বেশি হবে।

আবার অন্যদিকে মানবাতি খুঁজে পাওয়াও বেশ দুরূহ কাজ। দুরূহ কর্ম সম্পন্ন করে হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির আপাত উজ্জ্বলতা এবং তাদের লাল সরণের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। এই সম্পর্ক থেকে বলা যায় যে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং তাদের অপসরণ বেগও পরস্পর সম্পর্কিত। যেহেতু এই বিশেষ শ্রেণির গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতা তাদের দূরত্বের উপর নির্ভর করে এবং দূরত্ব বেশি হলে লাল সরণও বেশি হয় তাই বলা যায় দূরের গ্যালাক্সিগুলো বেশি দ্রুত বেগে অপসারিত হচ্ছে।

চিত্র: এডউইন হাবল

একে বলা যায় আগেভাগেই ফলাফল অনুমান করে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সকল শ্রেণির গ্যালাক্সিকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে কাজ করলে হয়তো ফলাফলটা এত সহজে পাওয়া যেত না। তাই আগে থেকেই একটা অনুমান করে নিয়েছেন যে, ‘সম্ভবত’ গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। আসলেই দূরে সরে যাচ্ছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ কিছু গ্যালাক্সিকে আলাদা করে নিয়েছেন যেন হিসেবের জটিলতা কমে যায়। এর মানে আগে থেকেই ফলাফল অনুমান করে নেয়া। এমনিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলাফল আগে থেকে অনুমান করে নিলে ক্ষেত্রবিশেষে সেটি গবেষণার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

আলোর উৎসের অপসারণ বেগ ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াতেও লাল সরণ ঘটতে পারে। যেমন আলো যদি শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সম্পন্ন কোনো উৎস থেকে নির্গত হয় এবং সে আলো যদি দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রে অবস্থান করা কোনো পর্যবেক্ষক বিশ্লেষণ করে তাহলে ঐ পর্যবেক্ষণ আলোর লাল সরণ দেখতে পাবে।

তবে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় উৎসের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর লাল সরণ ঘটছে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক। পর্যবেক্ষণে যে পরিমাণ লাল সরণ পাওয়া গেছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কারণে এত পরিমাণ লাল সরণ ঘটে না। দ্বিতীয়ত, ক্রম-প্রসারণের ফলে লাল সরণের যে সুস্থিত ও নিয়মতান্ত্রিক বৃদ্ধি ঘটেছে তা মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের লাল সরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা ঐক্যমতে এলেন যে, গ্যালাক্সির অপসরণ বেগের কারণেই লাল সরণ ঘটছে।

তবে এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে। সেটি বলছে, অন্ততপক্ষে সামান্য কিছু লাল সরণের পেছনে তাদের পশ্চাদপসরণ দায়ী নয়। এদের ক্ষেত্রে হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র দায়ী নাহয় তাদের পেছনে এমন কোনো ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করছে যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

এ বেলায় আরেকটি সমস্যার দিকে আলোকপাত করা দরকার। হাবলের সূত্র বলছে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব যত বেশি হবে তাদের অপসরণ বেগও তত বেশি হবে। এ অপসরণ বেগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। যত খুশি তত পরিমাণে উন্নীত হতে পারে। এদিকে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাহলে গ্যালাক্সির যত খুশি তত বেগে উন্নীত হওয়া কি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে লঙ্ঘন করছে না?

চিত্র: গ্যালাক্সিগুলো কি আসলেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে ছুটছে? ছবি: বিগ থিংক

জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের পরিমাণকে z দিয়ে প্রকাশ করেন। উৎস হতে নির্গত তরঙ্গের মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং পর্যবেক্ষক কর্তৃক গৃহীত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পার্থক্য (বিয়োগ) বের করা হয়। তারপর ঐ পার্থক্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করা হয়। তারপর যে মানটি পাওয়া যায় তা-ই হলো z এর মান।

এই z এর সাহায্যে গ্যালাক্সিগুলোর বেগ সহজেই বের করা যায়। আলোর বেগের সাথে লাল সরণ z-কে গুণ করে দিলেই গ্যালাক্সির গতিবেগ পাওয়া যাবে। আলোর বেগ c হলে গ্যালাক্সির বেগ cz। যেমন, কোনো গ্যালাক্সির লাল সরণের মান যদি হয় ০.১৫ তাহলে তার অপসরণ বেগ আলোর বেগের ১৫ শতাংশ। লাল সরণের মান ০.২৫ হলে তার অপসরণ ২৫ শতাংশ।

তবে এ নিয়মটি শুধুমাত্র আলোর বেগের তুলনায় খুব স্বল্প বেগে ধাবমান গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি হলেই এ নিয়ম আর কাজ করে না। এমনিতে বিজ্ঞানীদের পক্ষে খুব বেশি মানের লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব (সেটা যে উৎসেরই হোক), কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে ধাবমান কোনো গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আবার তত্ত্ব বলছে লাল সরণ যদি খুব বেশি হয়ে যায় তাহলে উৎসের গতিও আলোর বেগের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

যে দূরত্বে গেলে গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণ বেগ আলোর বেগের সমান হয় সে দূরত্বকে বলা হয় দিগন্ত বা হরাইজন। দিগন্তের বাইরের কোনো গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণ করা যম্ভব নয়। তাহলে কি এর মানে এমন দাড়াচ্ছে না যে, বাইরের গ্যালাক্সিগুলোর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি? কিছু দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, হ্যাঁ, এদের বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাতে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।

কীভাবে? বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নিয়ম-নীতি তখনই খাটবে যখন কোনোপ্রকার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতি থাকবে না। কিন্তু মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রেই মহাকর্ষ বিদ্যমান। এই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান ও কালের প্রকৃতিকে আমূলে পালটে দেয়। আর এটি ঘটে আইনস্টাইনেরই দেয়া সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে।

ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘বস্তু’ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। এখানে মূলত ‘স্থান’ নিজেই প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। বস্তু হয়তো আলোর বেগের বেশি বেগে চলতে পারে না কিন্তু স্থান ঠিকই পারে। আর ঐ বেশি বেগে চলা স্থানে যদি কোনো বস্তু থাকে তাহলে স্থানের সাথে সাথে বস্তুটিও বেশি বেগেই চলবে। বস্তু হয়তো আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলছে না, কিন্তু স্থান তাকে চালিয়ে নিচ্ছে।

যদিও আমরা দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সিগুলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু স্থানের প্রসারণের প্রকৃতি থেকে তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সির গতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি জটিল ফর্মুলার মাধ্যমে সুরাহা করা যায়। তবে এখানে আলচ্য বিষয় অনুধাবন করার জন্য এত সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশের প্রয়োজন নেই।

উৎস Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Chapter 3, Cambridge University Press

featured image: scitechdaily.com

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

স্থির পৃথিবীর বিরুদ্ধে গ্যালিলিওর জাহাজ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে তত্ত্ব সবচেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল সেটি হল আইনস্টাইনের “জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটি”। হালের বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি সব কিছুতেই এ তত্ত্ব বিশাল এক স্থান জুড়ে রয়েছে। আইনস্টাইন তার রিলেটিভির জেনারেল থিওরি দিয়েছিলেন ১৯১৫ সালে। এরও ১০ বছর আগে তিনি স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি হলো রিলেটিভিটি বা, আপেক্ষিকতার জেনারেল তত্ত্বেরই এক বিশেষ রুপ। রিলেটিভিটির স্পেশাল তত্ত্বটি জেনারেল তত্ত্বের চেয়ে কিছুটা সহজ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরো অনেক বিষয় জানতে হলে জেনারেল থিওরি অভ রিলেটিভিটির অন্ততপক্ষে ধারণাগত জ্ঞান কিছুটা হলেও প্রয়োজন। আর সে পথে হাঁটার জন্য আমরা এখন স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটিটা খুব সংক্ষেপে একটু শেখার চেষ্টা করি।

Image result for albert einstein general relativity

রিলেটিভিটি কথাটির অর্থ আপেক্ষিকতা। বাসে চড়ে যদি আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই তাহলে আমাদের কাছে মনে হয় রাস্তার পাশের গাছগুলো শাঁ শাঁ করে ছুটে চলেছে। কিন্তু গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ দেখবে আমাদের বাসটি আসলে ছুটে চলেছে। এই বিষয়টিই হল আপেক্ষিকতা। দর্শকভেদে পুরো ঘটনাটিই পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া।

রিলেটিভিটির জনক কিন্তু আইনস্টাইন নন। প্রথম গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬৩২ সালে তার “ডায়ালগ কনসার্নিং দ্যা টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস” বইয়ে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন। বইটি মূলত তিনি লিখেছিলেন পৃথিবীই যে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে এ সত্যটি তুলে ধরার জন্য। সেসময় পৃথিবী যে আসলে ঘোরে না এর বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি প্রচলিত ছিল। একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এমন, ধরুন আমি উঁচু কোন বিল্ডিং থেকে একটা পাথর আস্তে করে ছেড়ে দিলাম। পাথরটি মাটিতে পড়তে কিছুটা সময় নেবে। পৃথিবী যদি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরতে থাকে তাহলে এ সময়ে পৃথিবী পূর্ব দিকে কিছুটা ঘুরে সামনে এগিয়ে যাবে। ফলে পাথরটি সোজা না পড়ে বেশ কিছুটা পশ্চিম দিকে গিয়ে পড়বে। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে আসলে কোন উঁচু বিল্ডিং থেকে পাথর ফেললে তা পশ্চিম দিকে বেঁকে না পড়ে সোজা গিয়েই পড়ে। এর অর্থ আমাদের পৃথিবী আসলে ঘুরছে না।

গ্যালিলিওর বইটির টাইটেল পেজ

এ যুক্তির বিরুদ্ধে তার এই বইয়ে গ্যালিলিও একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র প্রস্তাব করেন। পদার্থবিজ্ঞানে থট এক্সপেরিমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে আছে। থট এক্সপেরিমেন্টে বিজ্ঞানীর মাথাতেই এক্সপেরিমেন্ট বা, পরীক্ষাগুলো হয়ে থাকে। থট এক্সপেরিমেন্টটা ছিল একটা জাহাজকে কেন্দ্র করে। তাই এ থট এক্সপেরিমেন্টকে গ্যালিলিওর জাহাজের থট এক্সপেরিমেন্ট বলা হয়। পরীক্ষাটি অবশ্য গ্যালিলিও বাস্তবেও করেছিলেন। তবে আমাদের এ জন্য জাহাজে যাওয়ার দরকার নেই। চলুন বিজ্ঞানীদের মত আমাদের মাথাতেই এ থট এক্সপেরিমেন্টের কাজ সেরে ফেলি।

নিজের মস্তিষ্কের পরীক্ষাগার এবার চালু করুন। কল্পনা করুন একটি নিয়মিত ঢেউবিশিষ্ট সমুদ্রে সমবেগে চলমান একটি জাহাজের কথা। সমবেগে চলমান অর্থ জাহাজটির বেগ সবসময় একই থাকবে এবং জাহাজটি একটি সরলরেখায় চলবে। অর্থাৎ, জাহাজটির কোনরকম ত্বরণ থাকবে না। এমন একটি জাহাজের একটি কক্ষে আপনাকে বন্দী করে দেয়া হল। এখন আপনি কি ঘরের বাইরে না দেখে বদ্ধ একটি ঘরে বসে (কিংবা শুয়ে বা, দাঁড়িয়ে) থেকে বলতে পারবেন যে আসলে জাহাজটি চলছে কিনা?

খুবই সহজ! তাই না? উপড়ে বলা পরীক্ষাটিই আমরা করে দেখতে পারি। আমরা ঘরের ছাদ থেকে মেঝেতে একটি বল ফেলতে পারি। জাহাজটি যদি ডানদিকে চলে তাহলে বলটি পড়তে পড়তে জাহাজটি কিছুটা ডানে সড়ে যাবে। ফলে বলটি সোজা না পড়ে কিছুটা বামে গিয়ে পড়বে। একইভাবে জাহাজটি যদি বামদিকে চলে তবে বলটি কিছুটা ডানে গিয়ে পড়বে। এভাবেই আমরা বলটি যদি কিছুটা ডানে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে বাম দিকে গতিশীল আর বলটি যদি কিছুটা বামে পড়ে তাহলে বলতে পারব জাহাজটি আসলে ডান দিকে গতিশীল। আর সোজা পড়লে বলে দেব বলটি স্থির আছে। তাই নয় কি?

Image result for galileo's ship

না, তাই নয়। গ্যালিলিও পরীক্ষা করে দেখলেন, জাহাজ ডানে যাক বা, বামে যাক বা, স্থিরই থাকুক বলটি সবসময় সোজা গিয়েই পড়ে। সুতরাং এভাবে বল ফেলে আসলে প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলে সিস্টেমটি বা, এক্ষেত্রে জাহাজ বা, আমাদের পৃথিবীটি আসলে গতিশীল আছে কিনা। সিস্টেমটির সাথে যে ব্যক্তি পাথর ফেলছে সেও এবং পাথরটি নিজেও গতিশীল হওয়াতেই এ ঘটনাটি ঘটে। তারা নিজেরাও সিস্টেমটির অংশ। সুতরাং পৃথিবীর স্থির থাকার পক্ষের একটি যুক্তি সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজের ভেতর বসে থেকে যেমন তীরের দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে গতিশীল মনে হয় তেমনি পৃথিবীতে বসে থেকে সূর্যকে আমাদের কাছে গতিশীল মনে হয়। এটাই আপেক্ষিকতা!

এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি পেয়ে যাই। আমাদের জাহাজটি ছিল সমবেগে চলা একটি জাহাজ। আমরা এখানে বল ফেলে পদার্থবিজ্ঞানের একটা পরীক্ষা করেছি। যা গতিশীল অবস্থায় বা, স্থির অবস্থায় যেভাবেই করিনা কেন একই ফলাফল দেয়। অর্থাৎ জাহাজে না বসে থেকে তীরে বসেও যদি কেউ এ পরীক্ষাটি করত সেও একই ফলাফল পেত। তাই গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতার প্রথম স্বীকার্যটি হল- “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়”।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।

মাইকেলসন মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষার গল্প

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই আলোর চলাচলের জন্য এক রকমের মাধ্যমের কল্পনা করতেন। এ মাধ্যমই হল ইথার। ইথারের নামটা এসেছিল আলোর জন্য নির্ধারিত এক গ্রীক ঈশ্বরের নাম থেকে।

মাইকেলসন ইথারের ধারণাতে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে তিনি একরকম নিশ্চিত ছিলেন যে আলোর বেগে তাত্ত্বিকভাবে কাঙ্খিত তারতম্যটি তার পরীক্ষায় ধরা পড়বে। তিনি মূলত পরীক্ষাটি করেছিলেনই ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। তার এই পরীক্ষাটি মাইকেলসন-মর্লির বিখ্যাত এক ব্যর্থ পরীক্ষা নামেই পরিচিত।

Image result
মাইকেলসন

১৮৮০ সালে মাইকেলসন এমন একটি যন্ত্র বানালেন যার সাহায্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলেই তিনি ধারণা করলেন। তার যন্ত্রটির সম্পূর্ণ গঠন এবং কার্যপ্রণালী আমরা দেখব। তার আগেই তার যন্ত্রটি যে নীতির উপড় দাঁড়িয়ে ইথারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে চেয়েছিল তা আমরা একটু বুঝে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যখন নদীতে সাঁতার কাটি তখন আসলে কি হয়? যদি আমরা স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটতে থাকি তাহলে আমাদের সাঁতার কাটার বেগ কিন্তু অনেক কম থাকে। আবার সেই আমরাই যদি স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কাটি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই সাঁতার কাটা যায়। স্রোতের বেগের সাথে নিজের সাঁতার কাটার বেগ যোগ হয়ে আমাদের বেগ অনেক বেশি হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি স্রোতের সাথে ৯০ ডিগ্রী বা, সমকোণে বা, আড়াআড়িভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তাহলে কি হবে? তাহলে স্রোতের বিপরীতে এবং স্রোতের দিকে এ দুইদিকে যে দুইরকম বেগ পাওয়া যায় তার মাঝামাঝি ধরনের একটা বেগ আমরা পাব। অর্থাৎ, খুব বেশিও না আবার খুব কমও নয় এমন একটি বেগ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, স্রোতের দিকে সাঁতার কাটা বা, স্রোতের বিপরীত দিকে সাঁতার কাটার বেগের সাথে আড়াআড়ি বা, সমকোণে সাঁতার কাটার বেগের মাঝে একটা ভাল পরিমাণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাবে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আমাদের পৃথিবীটাও ইথারের সাগরে নিমজ্জিত থেকে ১,০০,০০০ কি.মি. প্রতি ঘন্টা বেগে ঘুরছে। তাই আলো যখন এই পৃথিবীর বেগের দিকে চলবে তখন তার বেগ কিছুটা বেড়ে যাবে। আবার যখন পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে বা, আড়াআড়ি চলবে তখন আগের বেড়ে যাওয়া বেগের চেয়ে কিছুটা কম বেগ পাওয়া যাবে।

এতটুকু বুঝলে আমরা এখন আবার ফেরত যেতে পারি মাইকেলসনের সেই ১৮৮০ সালে তৈরি করা যন্ত্রটির দিকে। এই যন্ত্রটির নাম ছিলো ইন্টারফেরোমিটার। মাইকেলসনের এ যন্ত্রটি আলোর উৎস থেকে আসা আলোর রশ্নিকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলে। তারপর একটাকে আরেকটার সাথে সমকোণে দুইদিকে পাঠিয়ে দেয়। আলোক রশ্মি দুটির চলার পথেই সমান দূরত্বে একটা করে আয়না রাখা থাকে। আলোক রশ্মি দুটি আয়নাতে বাঁধা পেয়ে আবার আগের পথেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটি একবার সামনে যায় আরেকবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে পেছনে ফিরে আসে এবং এ যাত্রা পথে রশ্মিদুটো সমান দূরত্ব অতিক্রম করে।

Image result
মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষা

এই বিভক্ত হয়ে যাওয়া রশ্মি দুটোর একটাকে পাঠানো হয় পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেকটাকে পাঠানো হয় এ গতির সমকোণে। অর্থাৎ, এ দুটো আলোকরশ্মির বেগের মাঝে একটা পার্থক্য সৃষ্ট হয়। পৃথিবীর বেগ আলোর বেগের তুলনায় খুব কম হওয়াই এ পার্থক্য খুবই নগণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু মাইকেলসনের যন্ত্রটি অত্যন্ত নিখুঁত এবং সংবেদনশীল করে তৈরি করা হয়েছিল যা এ পার্থক্য ধরতে পারতে সক্ষম ছিল।

ইথারের কারণে আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত হতো তবে আলোকরশ্মি দুটো মিলিত হওয়ার পরে এক ধরণের উজ্জ্বল-কালো ডোরা ডোরা প্যাটার্ন বা, নকশা দেখা যাওয়ার কথা ছিল। আলোর বেগ যদি পরিবর্তিত না হয়ে একই থাকত তবে কিন্তু তেমন কোন নকশা দেখা যাবে না।

মাইকেলসন প্রচুর টাকা খরচ করে তার যন্ত্র অত্যন্ত নিখুঁত করে বানিয়েছিলেন। সব কিছু খুব সতর্কতার সাথে করা হয়েছিল। এরপরই মাইকেলসন তার কাঙ্খিত ইথার খোঁজার কাজ শুরু করলেন। মাইকেলসন বারবার পরীক্ষাটি করলেন। যা যা করলে ইথার খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে তার সব চেষ্টাই করে দেখলেন তিনি। কিন্তু হায়! ইথার খুঁজে পাওয়া গেলো না। সবাই চমকে গেলো।

Image result

মাইকেলসন নিজের পরীক্ষাকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি এবার এডওয়ার্ড মর্লির সাথে যৌথভাবে পরীক্ষাটি আবার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মর্লি হয়ত তিনি যেসব ভুল করছেন সেগুলো ধরতে পারবে। তারা দুজন মিলে আরো সূক্ষভাবে আবার যন্ত্রগুলো তৈরি করলেন। টানা ৭ বছর ধরে তারা আলোর বেগে কোন তারতম্য ধরার চেষ্টা করলেন। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ১৮৮৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা তাদের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলেন। আলোর বেগের কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। আলোর বেগ যেনো সবসময় একই! পৃথিবীর বেগের উপড় বা, অন্য যে কারো বেগের উপড় তা নির্ভর করে না!

Image result

এভাবেই প্রায় মৃত্যু ঘটল ইথার ধারণাটির। ইথার বিজ্ঞান জগতের অদ্ভুত এক কাল্পনিক ধারণা ছিল। এর ঘনত্ব ছিল খুবই কম, কিন্তু দৃড়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অত্যন্ত অদ্ভুত। তারপরও আলোর জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার জন্য বিজ্ঞানীরা এ ধারণাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মাইকেলসন নিজেও তার পরীক্ষার ফলাফলে খুব অখুশি হলেন। এই পরিক্ষাটিকেই ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যর্থ পরীক্ষা বলা হয়। মাইকেলসন ও মর্লির এ পরীক্ষাটিকেই ইথার ধারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী আরো সূক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইথারের অস্তিত্ব আছে কিনা তা বের করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছিলেন। ইথারের এই ব্যর্থ পরীক্ষার জন্যই মাইকেলসন ১৯০৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজের হাইপোথিসিস

ইতিহাসে ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন-মর্লির ইথারের বিখ্যাত পরীক্ষাটিই ইথার ধারণাকে একরকম প্রায় বাতিলই করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তাই সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই ইথার ধারণাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নতুন নতুন হাইপোথিসিস বা, প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসলেন। এ বিষয়ে জানার আগে আমরা একটু মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষাটি কিছুটা গাণিতিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি চলুন।

Image result

মাইকেলসন-মর্লি তাদের পরীক্ষায় আলোর উৎস থেকে আসা আলোকে দুই ভাগ করে এক অংশকে পৃথিবীর গতির অভিমুখে এবং আরেক অংশকে পৃথিবীর গতির সাথে সমকোণে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে মাইকেলসন মর্লি আশা করেছিলেন যে, আলোক রশ্মি দুটির বেগে পার্থক্য ধরা পড়বে। অর্থাৎ, আলোক রশ্মি দুটোর অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বিন্দুতে আবার ফিরে আসার সময়ের মাঝে একটা পার্থক্য ধরা পড়ার কথা ছিল। গণিতের সাহায্যে এ পার্থক্য খুব সহজেই বের করে ফেলা যায়। চলুন চেষ্টা করে দেখি। কেউ চাইলে গণিতের এই অংশটি সরাসরি বাদ দিয়ে দিতে পারেন। তাতেও পরবর্তি বিষয়গুলো বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিতের শুরু*

প্রথমেই আমরা দেখবো একটা অর্ধরুপায়িত আয়না থেকে আলোক রশ্মি যখন দুইভাগ হয়ে যায় তখন পৃথিবীর গতির অভিমুখে যাওয়া আলোকরশ্মিটির “ L ” দূরত্বে থাকা আয়নাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে কত সময় লাগে।

আমরা ধরে নেই আলোর বেগ “ c ” এবং পৃথিবীর বেগ “ v ”।

এখন, আমরা জানি, বেগ= দূরত্ব/সময়। তাহলে সময়=কত? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ।

তাহলে আলোটি যখন পৃথিবীর অভিমুখে সামনে যায় তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ + পৃথিবীর বেগ) এর সমান। মানে (c+v) । আবার আয়নায় ধাক্কা খেয়ে আলো যখন পৃথিবীর বেগের বিপরীত দিকে আসতে থাকে তখন তার বেগ হয় (আলোর বেগ – পৃথিবীর বেগ) অর্থাৎ, (c-v)।

প্রতিফলক আয়না থেকে অর্ধরুপায়িত আয়নার দূরত্ব কিন্তু সবসময়ই সমান। আর তা হল “ L ”। তাহলে আলোক রশ্মিটি পৃথিবীর বেগের অভিমুখে সামনে যায় তখন সামনের আয়নায় পৌঁছাতে এর কত সময় লেগেছে? হ্যাঁ, সময়= দূরত্ব/বেগ এই সমীকরণ আমরা এখানে ব্যবহার করতে পারি। এই সময়কে যদি  ধরি তাহলে,

এখন, আলোর পৃথিবীর বেগের বিপরীতে ফিরে আসার সময়কে  যদি ধরি তাহলে,

তাহলে আলোর একবার সামনের আয়নায় যেয়ে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসার মোট সময়,

অর্থাৎ,

                                                                                                                                        ……………………………………………………(1)

 

আরেকটি আলোক রশ্মিকে পৃথিবীর বেগের অভিমুখের সমকোণে পাঠানো হয়েছিলো। সেই আলোক রশ্মির সামনের আয়নায় যাওয়া এবং ফিরে আসার মোট সময় এবার বের করে ফেলা যাক। এক্ষেত্রে আলোকে সমকোণে পাঠানো হলে তা পৃথিবীর বেগের কারণে ভেক্টরের নিয়মানুসারে সোজা না যেয়ে নিচের ছবিটির (b) অপশানের মত একটু বেঁকে যাবে।

এভাবে গেলেই আলোকরশ্মিটি আয়নাতে আঘাত করে আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফেরত আসতে পারবে। (a) অপশানের মতো একদম সোজা গেলে কিন্তু পৃথিবীর বেগের কারণে সামনের আয়নাটি কিছুটা সাইডে বা, পার্শ্বে সরে যাবে এবং আলোক রশ্মি আয়নায় ধাক্কা না খেয়ে বরং সোজা চলে যাবে! আলোক রশ্মিটি এভাবে না বেঁকে একদম সোজা তখনই যেতে পারবে যখন পৃথিবী স্থির থাকবে। অর্থাৎ, সেক্ষেত্রে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় হতো,

কিন্তু পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, আলোর বেগের ওপড় পৃথিবীর বেগের প্রভাব আছে। কিন্তু তারপরও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মাইকেলসন সমকোণে পাঠানো আলোর ক্ষেত্রে এই ভুল হিসাবটিই করে ফেলেন। তিনি এই হিসাবের উপড় ভিত্তি করে পরীক্ষাটি করেছিলেন ১৮৮১ সালে। পরবর্তিতে ১৮৮২ সালে আলফ্রেড পটিয়ের এবং ১৮৮৬ সালে লরেন্টজ বিষয়টি ঠিক করে দেন। ১৮৮৭ সালে আবার বিশুদ্ধ ভাবে এই পরীক্ষাটি করেও মাইকেলসন আলোর বেগের কোন তারতম্য ধরতে পারেন নি।

এখন যদি আলো পৃথিবীর বেগের কারণে ছবির (b) অপশানের মতো বেঁকে যায় তাহলে আলোক রশ্মিটিকে কিছুটা বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে আগের “L” দূরত্বের চেয়ে। ধরি এই দূরত্ব “L*”। L* দূরত্ব আলো অতিক্রম করে “t” সময়ে। সুতরাং, L*=c t । এই সময়ে অর্ধরুপায়িত আয়নাটি v বেগে অর্থাৎ, পৃথিবীর বেগে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধরুপায়িত আয়নাটির t সময়ে অতিক্রান্ত দূরত্ব “vt” . তাহলে পীথাগোরাসের সূত্র অনুসারে,

বা,

বা,

বা,

আমরা যদি উপড়ের ছবির (b) অপশানটির দিকে তাকায় তবে দেখবো এতক্ষণ আমরা এর অর্ধেক অংশ নিয়ে কাজ করলাম। আলোক রশ্মিটি আবার একইভাবে (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে এক ধরণের সিমেট্রি তৈরি হয়েছে) ফিরে আসবে। অর্থাৎ, উপড়ে আমরা যে অর্ধেক পথের সময় বের করলাম তাকে ২ দ্বারা গুন করে দিলেই আমরা সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মিটির দুইভাগ হয়ে যাওয়ার পর আবার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে কত সময় লাগবে তা বের করে ফেলতে পারবো। তাহলে, সমকোণে পাঠানো আলোর জন্য মোট সময়,

                                                                                                                                                         …………………………………….(2)

 

এই চিত্রের লাল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর বেগের সাথে সমকোণে পাঠানো আলোক রশ্মি, আর নীল আলোকরশ্মিটি পৃথিবীর অভিমুখে পাঠানো আলোক রশ্মি।

*গণিত শেষ*

উপড়ের পুরো গাণিতিক অংশের কিছু না দেখলেও শুধু (১) এবং (২) নং সমীকরণটি আমাদের লাগবে। আমরা এই ১ নম্বর এবং ২ নম্বর একুয়েশান ২ টি ভালো করে লক্ষ্য করি। দুই জায়গাতেই   এসেছে যার পুরোটাই একটা ধ্রুবক। (২) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি  কে। এবং (১) নং সমীকরণে আমরা ফ্যাক্টর হিসেবে পেয়েছি (২) নং সমীকরণের ফ্যাক্টরের স্কয়ার বা, বর্গ     কে।

এই যে, (২) নং সমীকরণের   ফ্যাক্টরটি, এই ফ্যাক্টরটিকেই বলা হয় লরেন্টজ ফ্যাক্টর। একে গ্রীক অক্ষর গামা  দ্বারা প্রকাশ করা হয়। মাইকেলসন-মর্লি যখন ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণে ব্যার্থ হলেন তখন এই ফ্যাক্টরটি কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশানের জন্য ১৮৮৭ সালে প্রথম ব্যবহার করেন জার্মান পদার্থবিদ উলডেমার ভয়েগট ( Woldemar Voigt )।

Image result for Woldemar Voigt lorentz
উলডেমার ভয়েগট

লরেন্টজ প্রথম এটি ব্যবহার করেন ১৮৯৫ সালে। কিন্তু তিনি উলডেমার ভোগেটের কাছ থেকে কোন রকম ধারণা ধার করেননি। তার কোঅর্ডিনেট ট্রান্সফর্মেশান অনেকটাই অন্যরকম ছিল। এরপর লার্মর, লরেন্টজ এবং পয়েন্ট কেয়ার মিলে লরেন্টেজের ট্রান্সফর্মেশানকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন।

Image result for lorentz
স্যার হেন্ডরিক লরেন্টজ

অন্য দিকে জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজগেরাল্ড পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের কথা বললেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর যখন ইথারের ভেতর দিয়ে যায় তখন মাইকেলসন-মর্লি যে যন্ত্রগুলোর দ্বারা আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করছিলো সেগুলো আসলে ছোট বা, সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে তিনি পদার্থের নিজেদের অণু-পরমাণুর সঙ্কোচনের কথা বলেছিলেন। স্পেস-টাইম বা, স্থান-কালের সঙ্কোচনের কথা বলেন নি। লরেন্টজ ফিটজগেরাল্ডের এই ধারণাটি গ্রহণ করলেন এবং দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের জন্য একটি ফ্যাক্টর বের করলেন যা,  ।

Image result for fitzgerald contraction

লরেন্টজ এবং ফিটজগেরাল্ড এ দুজন মিলে ইথারকে বাঁচানোর জন্য দাঁড়া করালেন “ফিটজগেরাল্ড-লরেন্টজ সঙ্কোচন প্রকল্প”। এ প্রকল্প অনুসারে কোন পদার্থ ইথারের বেগ বরাবর সঙ্কুচিত হয়। পদার্থটির দৈর্ঘ্য যদি হয়, “L”, তবে তার পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য হবে, zrdxcfbhnjk। লরেন্টজ আর ফিটজগেরাল্ডের এ প্রকল্প বেশ সাড়া ফেলে দেয়। কারণ এটি ব্যবহার করে তারা মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হলেন। কিভাবে? আচ্ছা চলুন দেখা যাক।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় আলোক রশ্মিদুটোর অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লেগেছিল। অর্থাৎ, (১) এবং (২) নং সমীকরণের tfuvybunjk একই ছিল। এখন লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ড হাইপোথিসিস অনুসারে পৃথিবীর বেগ বরাবর বা, আপেক্ষিকভাবে বললে ইথারের বেগ বরাবর যে আলোক রশ্মিটি পাঠানো হয়েছিল সে বরাবর সব কিছুর দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটবে। আগে এ দৈর্ঘ্য ছিল “L”। কিন্তু এখন হয়ে যাবে wzrexnui । দৈর্ঘ্যের এ মানটি  (১) নং সমীকরণে বসালে আমরা পাই,

এই “  ” হলো (২) নং সমীকরণে সমকোণে পাঠানো আলোর ফিরে আসার সময়। সুতরাং, (১) নং সমীকরণে লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প ব্যবহার করে আমরা যে সময় পেলাম তা (২) নং সমীকরণের সময়ের সমান। সুতরাং, লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প সঠিক হলে, আলোকে পৃথিবীর অভিমুখে বা, সমকোণে যে পথেই পাঠানো হোক না কেন তার অর্ধরুপায়িত আয়নায় ফিরে আসতে সমান সময় লাগার কথা। এ ঘটনাটিই মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় দেখা গেছে। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত তাদের পরীক্ষার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব হলো। সেটাও কাল্পনিক ইথার এবং পদার্থের দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের মত ধারণার বিনিময়ে।

লরেন্টজ-ফিটজগেরাল্ডের সঙ্কোচন প্রকল্প মোটামুটি সঠিক পথেই ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল তাদের স্বীকার্য বা, অনেকটা জোর করে ধরে নেয়া বিষয়গুলোতে যা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা এবং সমাধান করেছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী ধারণাগুলো আমাদের বিশ্ব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভংগিই পাল্টিয়ে দিয়েছিলো। আইনস্টাইনের সেই যুগান্তকারী স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা আমরা না হয় জানবো অন্য কোন লেখায়। আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।