পৃথিবীর আদি রঙ ছিল গোলাপি

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে
প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে–

জীবনানন্দ দাশ সাগরের নীলে প্রেম খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু জীবনানন্দ কেন, এমন শত কবি সহস্রবার যে নীলে উদাস হয়েছেন… সে নীলে আমরাও হারিয়েছি। আকাশ আর সাগরময় পৃথিবী নীল হয়েছে এ দুইয়ে। কিন্তু এই নীলই কি আদি রঙ? পুরোটা অতীত কি নীল পৃথিবীরই?

প্রাগৈতিহাসিক সাগরও কি নীল ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাচীন সাগর ছিল গোলাপী রঙের। সে হিসেবে গোলাপী হবে মানুষের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে আদি রঙ। নীল পৃথিবী আজ গোলাপি পৃথিবীর ভবিষ্যত।

গবেষকরা এই গোলাপি রঙের হদিস পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়, সাহারা মরুভূমিতে ব্যাকটেরিয়ায় ফসিলে। প্রাপ্ত ফসিল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার, মনে করা হচ্ছে এরা ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগের। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেঁচে থাকত। দীর্ঘসময় ধরে সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সাগরে সাগরে রাজত্ব করেছে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বরং শৈবালের থেকেও আদিম। বিবর্তনীয় ধারায় জীবনের বিকাশে সায়ানোব্যাকটেরিয়া আদি উৎসদের মধ্যে অন্যতম। বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যত বিবর্তনীয় ইতিহাস ধরে পিছনে যাওয়া যাবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কাছে পৌঁছে যেতে হবে। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে এবছরের ৯ই জুলাই।

এই অণুজীবদের গোলাপি হওয়ার পেছনের কারণ কী? অন্য রঙ না হয়ে গোলাপিই কেন হল। ফসিল অবস্থায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ক্লোরোফিলকে পাওয়া যাচ্ছে গাঢ় লাল এবং বেগুনি রঙে, অধিক ঘনমাত্রার দশায়। অর্থাৎ, যখন মাটি পানির সাথে মিশে এর ঘনমাত্রা কমে যাবে তখন এটি গোলাপি রঙ দিবে পানিতে। অর্থাৎ, উপসংহার টেনে বললে সাগরের ক্ষেত্রেও রঙের প্রভাব তাই হওয়ার কথা।

ক্লোরোফিল বলতেই সবুজ রঙ মাথায় খেলে যায়। কিন্তু ক্লোরোফিল আজকের জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অস্ত্র, আদিম পৃথিবীর প্রাণ এত উন্নত ছিল না, শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাও এতটা দক্ষ ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার পূর্বে ছিল বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব। অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণ তখনকার জন্য বহুদূরের গল্প, পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন সালফারময় পরিবেশে। এজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কাজ ছিল ইলেকট্রন আলাদা করে ফেলা। এদের ছিল বেগুনী কণিকা যা সবুজ আলো শোষণ করত এবং লাল ও নীল রঙের আলো ছেড়ে দিত।

৪,৪০০ গুণ বিবর্ধিত বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া। স্বাদু এবং নোনা উভয় জলাশয়েই এদের অস্তিত্ব ছিল; Image Credit: Dennis Kunkel /Science Photo Library

অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণে সায়ানোব্যাকটেরিয়া একেবারেই আদি, শুরুটা হয় বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার পরিত্যক্ত শক্তি ব্যবহার করে। বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার ত্যাগ করা লাল এবং বেগুনী রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তি কাজে লাগাত আদি সায়ানোব্যাকটেরিয়া। প্রাচীন ক্লোরোফিলের উপর ব্যাকটেরিয়ার ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

৬৫ কোটি বছরের ব্যবধানে যখন আমরা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা করছি, তাদের চেহারা একই রকম হওয়ার কথা নয়। ; Image Credit: River Dell High School | Slideplayer.com

এই প্রাচীন ক্লোরোফিল ধরা পড়ার জন্য উপযুক্ত ঘটনারও তো দরকার রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই নমুনা সম্ভবত কোনো কারণে দ্রুত সাগরগর্ভে চাপা পড়ে যায়। এজন্য অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশের দরকার ছিল। আর একবার চাপা পড়ার পর অণুজীবেরা একে ফসিলে পরিণত করেছে, ফলে এরা স্থবির হয়ে রয়ে গেছে তাদের চাপা পড়া স্থানেই।

 

— HowStuffWorks অবলম্বনে।

সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আলসারের ব্যাকটেরিয়া

আলসার রোগটি সারা পৃথিবীতেই মানুষের জন্য এক উৎপাতের নাম। আমাদের পাকস্থলিতে আলসার হবার একটি কারণ Helicobacter pilori নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। ড. ব্যারি মার্শাল এই বিষয়টি আবিষ্কার করেন কিন্তু কেউ তার কথায় গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে বিশ্বাস করেনি। শেষে উপায়ান্তর না দেখে ১৯৮৪ সালে পেট্রিডিশে গবেষণার জন্য রাখা H. pilori ভর্তি তরল পান করে ফেলেন তিনি। এ থেকে কিছুদিনের মধ্যে তার আলসার হয়।

image source: livescience.com

ব্যাকটেরিয়া পানের পঞ্চম দিন হতে তার আলসার জনিত বমি শুরু হয়। চতুর্দশ দিন হতে তিনি এন্টিবায়োটিক গ্রহণ শুরু করেন এবং আলসার ভালো হতে শুরু করে। পরের বছর তিনি এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালে তিনি এই ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তথ্যসূত্রঃ bigganpotrika.com

featured image: coxshoney.com

প্ল্যাস্টিক খাওয়া ব্যাকটেরিয়ার গল্প

বর্তমান সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হয় যার বিশাল একটি অংশ ব্যবহৃত হয় প্যাকেজিং শিল্পে। এদের মধ্যে মাত্র ১৪% পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয় আর বাকিটা থেকে যায় পরিবেশে। প্লাস্টিক পঁচনশীল নয় বলে এদের অস্তিত্ব অন্যান্য অস্তিত্বকে ফেলে দেয় ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে সামুদ্রিক দূষণের অন্যতম হোতা হচ্ছে প্লাস্টিক। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বর্তমানে পঁচনশীল প্লাস্টিক তৈরির জন্য যে গবেষণা চলছে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আশা দিতে সক্ষম হলেও আশু সমাধান এর থেকে সম্ভব নয়।

তাহলে উপায়? একটা সময় মানুষেরা ছিল পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণ প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতো। কালের পরিক্রমায় আমরা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা শিখলাম। সেই ব্যবহার এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সে যাই হোক, প্লাস্টিক আমাদের জীবনযাত্রা সহজ করে থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নিঃসন্দেহে পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে ৭০ বছর ধরে। এই সমস্যা সমাধানের আভাস যখন প্রকৃতির মাঝেই পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন আশাবাদী মন ভাবতেই পারে, সেরা জীব হিসেবে মানুষের স্পর্ধা অহংকারের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলেও, প্রকৃতি হয়তো এখনো আমাদের ভালোবাসে।

জাপানের বিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন প্লাস্টিকভুক এক ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির। এই ব্যাকটেরিয়া পলিথাইলিন টেরেফথ্যালেট (Polyethylene Terephthalate) সংক্ষেপে PET কে ভাঙ্গতে সক্ষম। এই পি.ই.টি. দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন পানীয় কিংবা খাবারের বোতল তৈরি হয়। বিশ্বের প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ পি.ই.টি। প্রাকৃতিকভাবে এই প্লাস্টিকের ক্ষয় হতে ৫ থেকে ১০ বছর লাগলেও নতুন আবিষ্কৃত ব্যাকটেরিয়াটি এর পাতলা ফিল্মকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙ্গে নিয়ে যায় এর কার্বন উৎসে। এই আবিষ্কার ক্ষতিকারক প্লাস্টিক থেকে আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়র হতে পারে।

চিত্রঃ মাইক্রোস্কোপের নিচে Ideonella sakaiensis

এতদিন পর্যন্ত আমরা জানতাম পি.ই.টি এর জৈববিভাজন (Bio-degradation) সম্ভব নয়। কিন্ত একেও বিভাজিত করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব স্বয়ং আবিষ্কারকদেরকেও বিস্মিত করেছে। এমনটাই জানিয়েছেন জাপানের কিয়োটো ইন্সটিউট অব টেকনোলজির অণুজীববিজ্ঞানী কোহেই ওদা। নতুন আবিষ্কৃত প্লাস্টিকভুক ব্যাকটেরিয়ার নাম Ideonella sakaiensis। যেহেতু বিভিন্ন জটিল অণুকে ডিগ্রেড করার যুদ্ধে বিভিন্ন অণুজীব সবসময়ই থাকে একেবারে সামনের সারিতে, তাই এই আবিষ্কার কোনো দূর্ঘটনা নয়। প্রকৃতিতে বিভিন্ন অণুজীব বিভিন্ন জটিল অণুকে সরল অণুতে পরিণত করার এনজাইম নিঃসরণ করে থাকে। কিন্তু অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকে একেবারেই পাত্তা না দেয়া PET এর রাসায়নিক বন্ধনগুলোকে ভাঙ্গতে পারছে বলেই আইডিওনেলা ব্যাকটেরিয়াটি এতটা অনন্য।

আইডিওনেলাকে পাবার জন্য জাপানের ওসাকা শহরের প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের পলি, মাটি, বর্জ্যপানি এবং কাঁদা থেকে ২৫০ ধরনের প্লাস্টিকের ভগ্নাবশেষ সংগ্রহ করা হয়। এদের মধ্যে থেকে যাচাই বাছাই শেষে একটিতে পাওয়া গিয়েছে এই আনকোরা অণুজীবটি। এটি শুধুমাত্র প্লাস্টিককে তার একমাত্র পুষ্টির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে টিকে থাকছে। ব্যাপারটা দুই ধাপে ঘটে। প্রথমে এরা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি এনজাইম PETase নিঃসরণ করে। এই এনজাইম পি.ই.টি প্লাস্টিককে বিভাজত করে তৈরি করে Mono Hydroxyethyl Terephthalic Acid (MHET)। MHET কে ব্যাকটেরিয়াটি নিজের দেহে শোষণ করে নেয়। সেখানে MHET hydrolase এর মাধ্যমে ইথিলিন গ্লাইকল এবং টেরেফথ্যালিক এসিড তৈরি হয়। মজার বিষয় হলো, টেরেফথ্যালিক এসিডকে পি.ই.টি প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদি এই ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে প্লাস্টিক থেকে টেরেফথ্যালিক এসিড সংগ্রহ করা যায় তাহলে এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল-ভিত্তিক কাঁচামাল বাঁচানো সম্ভব।

চিত্রঃ আইডিওনেলার প্লাস্টিক ভোজন প্রক্রিয়া।

যেহেতু এখনো এর জৈববিভাজন ক্ষমতা খুবই ধীর, তাই ব্যবহারিক পর্যায়ে যেতে আরো সময় লাগবে। এমন হতে পারে যে আইডিওনেলাকে আরো শক্তিশালী করা হলো, কিংবা এর যে জিনগুলোর দ্বারা PETase এবং MHET hydrolase তৈরি হচ্ছে সেসব সংগ্রহ করে অন্য আরেকটি ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডের মাঝে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ঢুকিয়ে বিপুল পরিমাণে এই এনজাইমগুলো তৈরি করা হলো। তবে তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

পি.ই.টি প্লাস্টিক প্রকৃতিতে আছে মাত্র ৭০ বছর। এই সময়ের কোনো পর্যায়ে আইডিওনেলা গণের ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হলো কিংবা যদি এরা আগে থেকেও থেকে থাকে কীভাবে এই প্লাস্টিকে এদের রুচি তৈরি হলো সেটাও কিন্তু ভাবার বিষয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রকৃতিতে হয়তো অন্যান্য প্লাস্টিকের জৈববিভাজনে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াও ইতোমধ্যে আবির্ভুত হয়ে গেছে। আমাদের শুধু সঠিক উপায়ে, সঠিক জায়গায় খুঁজে দেখতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

Feeding on plastic a bacterium completely degrades poly (ethylene terephthalate) by Uwe T. Bornscheuer, Science magazine, 11th March, 2016

অতিকায় ভাইরাসের গল্প

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও তামাক একটি অর্থকরী ফসল। এই ফসল যদি এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয় যার ফলে কৃষকেরা চাষ করাই ছেড়ে দিচ্ছেন,তাহলে তামাক উৎপাদনকারী একটি দেশের জন্য চিন্তার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক।

১৮৭৯ সালে নেদারল্যান্ডের এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের ডিরেক্টর এডলফ মেয়ারের নজরে আনা হয় এমন এক অদ্ভুত রোগ ‘টোবাকো মোজাইক ডিজিজ’। তিনি বহুদিন এটা নিয়ে কাজ করলেন,কিন্তু কীসের জন্য যে এই রোগটা হচ্ছে সেটা ঠিক বের করতে পারলেন না। তিনি বললেন যে,আক্রান্ত গাছের রস ফিল্টার পেপারের মাধ্যমে পরিশোধিত করা হলে প্রাথমিকভাবে সংক্রামক থাকলেও বেশ কয়েকবার ফিল্টার করার পর করার রসটাতে আর সংক্রমক থাকছে না। সুতরাং কোনো অজানা ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হচ্ছে।

১৮৯২ সালের দিকে রাশিয়ান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দিমিত্রি আইভানভস্কি একই রোগে আক্রান্ত গাছের রস সেই একই পদ্ধতিতে পরিশোধিত করেন,শুধু মাধ্যমটা ভিন্ন। তিনি ব্যবহার করেন প্রলেপবিহীন পোরসেলিন ফিল্টার যার পোর সাইজ ০ ১ থেকে ১ মাইক্রন। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না,ঠিকই সেই রসে সংক্রামক রয়ে গেল। তিনি বললেন,এটা ব্যাকটেরিয়া নয়। বরং তার চেয়েও অনেক ছোট কিছু এই রোগের জন্য দায়ী। পরবর্তীতে যা ভাইরাস হিসেবে শনাক্ত হয়। হ্যাঁ,এবং সেই ভাইরাসের নাম ‘টোবাকো মোজাইক ভাইরাস’।

ভাইরাস তো আবিষ্কার হলো,সেই সাথে একে খুঁজে পেতে যে কাঠ-খড়টা পুরলো। সে কারণে সবাই ধরেই নিলো ভাইরাসের আকৃতি হবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এই প্রচলিত ধারণের কারণেই হয়তো অনেকদিন অন্য আরেকটি জগৎ আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য ছিল।

আইভানভস্কির এক্সপেরিমেন্টের একশ বছর পর ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ডের একটি হাসপাতালে নিউমোনিয়া প্রাদুর্ভাব দেখা দিলো। এর উৎস খুঁজতে খুঁজতেই কাছের পানির টাওয়ার থেকে পাওয়া একটি অ্যামিবার ভেতরে দেখা গেল নতুন একটি গ্রাম পজিটিভের অস্তিত্ব। তাৎক্ষণিকভাবে একে কোনো বর্গীভূত না করা হলেও পরবর্তীতে ব্র্যাডফোর্ডকক্কাস ব্যাকটেরিয়া নাম দিয়ে ফ্রীজে ঢুকিয়ে ভুলে যাওয়া হয়।

১৯৯৮ সালে বার্নার্ড লা স্কোলা নামক এক ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের মধ্যে দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত বিষয়। এর মধ্যে কোনো রাইবোজোম নেই!

রাইবোজোম হচ্ছে কোনো কোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই ঘটনা ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের চরিত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক ঘটালে আরেক দল বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এরা অন্য সকল ব্যাকটেরিয়ার মতো বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধিও করে না। এর মাধ্যমে এই নকুলে ভাইরাস সম্পর্কে সব রহস্যের অবসান নয়,বরং সূচনা হলো। যাকে এখন আমরা ‘মিমি ভাইরাস’ বলে চিনি। যেহেতু এরা গ্রাম স্টেইনিং পরীক্ষায় গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়াকে অনুকরণ (Mimic) করে সেজন্যই এই নাম।

অণুজীব নিয়ে যদি আপনার পড়াশোনা এবং আগ্রহ দুটোই থেকে থাকে আর এমন যদি হয় যে মিমি ভাইরাস সম্পর্কে আজই প্রথম শুনছেন তাহলে ‘গ্রাম পজিটিভ ভাইরাস’ শুনেই আপনার মুখ হা হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তা-ই হয়ে,তাহলে আপনাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়ার মতো দুটো তথ্য দিয়ে আমোদিত করতে চাই। মিমি ভাইরাস দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০০ ন্যানোমিটার,এবং জিনের সংখ্যা ১০১৮টি। যেখানে তারই বন্ধু এইচআইভি’র জিন মাত্র ৯টি!

চিত্রঃ বিভিন্ন অতিকায় ভাইরাসের সাথে এইচআইভি এবং ব্যাকটেরিয়ার তুলনা।

ফ্রান্সের এক্সিস-মার্সিয়েলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মিমি ভাইরাস শনাক্ত করার পর এরকম বড় বড় ভাইরাস খুঁজতে শুরু করেন। দিদিয়ার রাউল্ট নামের একজন গবেষক খুঁজতে থাকেন সবচেয়ে সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে, অর্থাৎ অন্যান্য পানির টাওয়ার ইত্যাদি। এবং তিনি প্যারিসে যেন স্বর্ণের খনি পেয়ে বসলেন। তিনি যে ভাইরাসটি পেয়েছিলেন তার নাম দেয়া হয় ‘মামা ভাইরাস’। তবে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার,তার ভেতরে যেটা পাওয়া গেলো, একটি ‘স্পুটনিক ভাইরোফাজ’।

প্রথমবারের মতো দেখা গেলো একটি ভাইরাস অন্য আরেকটি ভাইরাসকে আক্রান্ত করছে। এই ঘটনা ভাইরাস কি জীবিত না মৃত সেই পুরনো বিতর্ক আবারো উস্কে দিলো। কারণ এখানে মামা ভাইরাস অন্য ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছে।

২০১০ সালে রাউল্ট নদী,হ্রদ,ট্যাপ সহ বিভিন্ন জায়গার পানির মধ্যে পাওয়া নতুন ১৯টি নমুনা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন। এর পরের বছর রাউল্টের আরেক সহকর্মী জ্যা-মাইকেল ক্ল্যাভেরি পেলেন আরো বড় আকৃতির ভাইরাস। চিলির সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাওয়া এই ভাইরাসের নাম দেন ‘মেগা ভাইরাস’।

এরপর চিলির নদী এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি পুকুরের কাদা থেকে তিনি শনাক্ত করেন ‘প্যানডোরা ভাইরাসে’র দুটো প্রকরণ। যার একটিতে রয়েছে ১৫০০ টি জিন এবং অন্যটিতে প্রায় ২৫৫০। এরপরই ক্ল্যাভেরি সম্ভবত সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটি করেন। ৩০,০০০ বছর পুরনো বরফের টুকরোর মর্মস্থল থেকে শনাক্ত করেন দর্শনীয় পিথো-ভাইরাস। এটি লম্বায় প্রায় দেড় মাইক্রোমিটার,যা সবার পরিচিত একটি ভাইরাস E. coli এর কাছাকাছি।

এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মেমব্রেনের গায়ের একটি ফুটো,যা কর্কের মতো একটি জিনিস দ্বারা আটকানো থাকে। ক্ল্যাভেরির ভাষ্যমতে “এখন আমরা বলতেই পারি যে, অতিকায় ভাইরাসেরা সর্বত্রই ছড়ানো। আমরা যদি সঠিক পদ্ধতিতে দেখি তবে আমি নিশ্চিত আপনার বাগানেও এদের পাওয়া যেতে পারে।”

যে প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের বিব্রত করে আসছে তা হলো, অতিকায় ভাইরাসগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং জীবনের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাসের কোন স্তরে এদের ফেলা যায়? গোড়ার দিকে এই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতির দুই শাখা (ডোমেইন),আদিকোষী এবং প্রকৃতকোষী। প্রকৃতকোষীর মধ্য রয়েছে সব প্রাণী ও গাছপালা।

আদিকোষীর দুইভাগের একটি হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া,অন্যটি আর্কিয়া। ব্যাকটেরিয়ার কোষগুলো প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের চেয়ে সরল এবং নিউক্লিয়াসবিহীন। আর্কিয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো হলেও এদের রসায়নটা ভিন্ন। এই তিন মৌলিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে সব ধরনের জীবসত্বাকে জায়গা দিতে পারার কথা।

কিন্তু আপনি যদি এই অতিকায় ভাইরাসগুলোর জিনের দিকে তাকান,তাদের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ জিনই আর কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি অতিকায় ভাইরাসের একেকটি গোত্রের মধ্যেও খুব বেশি সাধারণ জিন নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন এই অতিকায় ভাইরাসগুলো কিছু বিলুপ্ত ডোমেইনের অবশেষ। তাই এদেরকে শ্রেণিবিন্যাসের যদি জায়গা দিতেই হয়,তাহলে একাধিক ডোমেইনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ক্ল্যাভেরির ভাষায় “মিমি ভাইরাসের সন্ধান পাওয়ার পরই আমরা বলেছিলাম, চতুর্থ একটি ডোমেইন সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এখন বিশ্বাস করি এটা শুধু চতুর্থ নয় বরং পঞ্চম,ষষ্ঠ এবং সপ্তম।”

২০১২ সালে একদল বিজ্ঞানী বিভিন্ন ভাইরাস এবং অন্যান্য যেসব কোষের একই ধরনের প্রোটিন রয়েছে তাদের নিয়ে একটি বিবর্তনিক বৃক্ষ (Evolutionary Tree) তৈরি করেন যেটা থেকে অনুমান করা যায় অতিকায় ভাইরাসগুলো অন্য সব কিছু থেকেও প্রাচীন, যা একদিক দিয়ে ক্ল্যাভেরির ধারণাকেই শক্তিশালী করে। ক্ল্যাভেরির সমালোচকরা বলেন, সব ভাইরাসই হচ্ছে মিউটেশনের রাজা। তাই একটি জিনকে যদি চিনতে না পারেন, তাহলে সেটা এমনও হতে পারে যে একটি পরিচিত জিনই উপর্যুপরি মিউটেশনের জন্য এমন অবস্থায় এসেছে যে তাকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না।

চিত্রঃ অণুজীবের বিবর্তনীয় বৃক্ষ

তবে এটাও যৌক্তিক যে একটা অণুজীব, পরজীবী জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে তার জিনোম ক্রমাগত ছোট হবার কথা,যেহেতু সে পোষকের যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করছে তার মৌলিক কার্যকলাপের জন্য। তাই এর থেকেও বলা যায় যে অতিকায় ভাইরাসগুলো আমাদের অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের তুলনায় প্রাচীন।

অতিকায় ভাইরাসদের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রাণের সংজ্ঞা সম্পর্কে ভাবাচ্ছে। তারা বলছেন,ভাইরাসকে বিচার করতে চাইলে তার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় নয় বরং সে পোষকের জিনোমের সাথে একীভূত হওয়া অবস্থায় কীভাবে আছে সেটার ভিত্তিতে বিচার করা উচিৎ। এ অবস্থায় সে একটি পরজীবী ব্যাকটেরিয়ার মতো আচরণ করে প্রায়। অবশ্য একে জীবিত বলার জন্য জন্য আমাদের চিন্তাধারাকে আরো প্রশস্ত করতে হবে। শুধু চলৎক্ষম রাইবোজোম বাহক কোষকেই জীবিত বলতে হবে,এটা খুবই কায়েমী মনোভাব। আমরা বরং জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি,রাইবোজোম থাকলে রাইবোসেল এবং ভাইরাস চালিত ভাইরোসেল।

তবে এটা পরিষ্কার যে, জীবন এবং ভাইরাসের মধ্যকার দেয়ালটা বেশ ঝাপসা। ভাইরাস নাকি কোষ? কে জীবন্ত কে মৃত এই প্রশ্নে মাথা খারাপ করে দিলেও কিছু করার নেই। এখন পর্যন্ত অতিকায় ভাইরাসের অনুসন্ধান শুধু অ্যামিবার মধ্যেই চলতো,কারণ মূলত এরা একটি জানা পোষক এবং ল্যাবে এদের নিয়ে কাজ করাও সহজ। তার মানে এখনো বহু বহু পোষক প্রকটিত করা বাকী। যা ক্ল্যাভেরির মত বিজ্ঞানীর জন্য একইসাথে ভীতিকর এবং রোমাঞ্চকর। তার নিজের ভাষায় –

“We don’t know what a virus is any more – or what to expect next.”

তথ্যসূত্রঃ

  • Infect and Direct, Gary Hamilton, New Scientist Magazine, January 15, 2016.
  • A phylogenomic data-driven exploration of viral origins and evolution, Arshan Nasir, Gustavo Caetano-Anollés, Science Advances, September 25, 2015.

সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়