তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

প্যারিডোলিয়াঃ এখানে ওখানে মানুষের মুখ

চাঁদে, বিকৃত আকৃতির সবজিতে, পোড়া টোস্টে মুখাবয়ব দেখার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বার্লিন ভিত্তিক একটি সংঘ স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে পুরো গ্রহে এমন মানব-সদৃশ মুখাবয়বের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ ‘প্যারিডোলিয়া’ শব্দটিই কখনো শুনেনি। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকেরই এর সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে।

কেউ চাঁদের দিকে তাকিয়ে যদি দুইটি চোখ, একটি নাক ও একটি মুখ দেখতে পায় তবে সে ‘প্যারিডোলিয়া’ ব্যাপারটি অনুভব করতে পারবে। ওয়ার্ল্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, এটা হচ্ছে কোনো ছাঁচ বা অর্থ উপলব্ধি করার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ক্ষমতা। প্রকৃতপক্ষে যার সেখানে কোনো অস্তিত্ব নেই।

পূর্ব রাশিয়ার ম্যাগাডান প্রদেশের ল্যান্ডস্কেপে মুখমন্ডল

জার্মান ডিজাইন স্টুডিও প্যারিডোলিয়ার ব্যাপারে আরো খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিচ্ছে যেটা হয়তো এ নিয়ে করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সিস্টেমেটিক প্রকল্প। তাদের ‘গুগল ফেসেস প্রোগ্রাম’ পরবর্তী কয়েকমাস গুগল ম্যাপে প্যারিডোলিয়ার জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে।

গুগল ফেসেস সম্পূর্ণ পৃথিবীকে বিভিন্ন কোণ থেকে কয়েকবার স্ক্যান করবে। এখনো পর্যন্ত প্রোগ্রামটি রাশিয়ার দূরবর্তী প্রদেশ ম্যাগাডানে একটি ভীতিজনক প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছে যা লোমশ নাসারন্ধ্রযুক্ত একটি মুখাবয়ব। এটি অ্যাশফোর্ড নামক স্থানে অবস্থিত।

আলাস্কার পর্বতের মধ্যেও এটি ম্যাঙ্গি প্রাণীর মুখ-সদৃশ প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছিল। তবে এমন অজায়গায় এসব মুখাবয়বের দেখা পাওয়ার ঘটনা এই প্রথমই ঘটেনি। এই সপ্তাহে, ইউএস ডিপার্টমেন্ট স্টোর ‘পেনি’ একটি কেটলি বিক্রি করে। সামাজিক সংবাদ মাধ্যম রেডিটে প্রকাশিত হওয়ার পর।


মাদার তেরেসা সদৃশ এই খাবারের আইটেমটির নাম ‘নান-বান’।

এই কেটলির মধ্যে থার্ড রেইকের নেতার চেহারার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। গত বছর e-bay’তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মতো দেখতে একটি চিকেন নাগেট ৮১০০ ডলার বিক্রি হয়েছিল। এক দশক আগে, ২০০০০ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল যেখানে একটি চাপাতির মধ্যে আগুনে দগ্ধ যীশু খ্রিষ্টের প্রতিমা দেখা গিয়েছিল। কিছু দর্শনার্থী সেখানে প্রার্থনাও করেছিল।

একটি টাম্বলার সাইট আছে, যারা মূলত হিটলাদের সাথে সদৃশ আছে এমন জিনিস খুঁজে থাকে। ২০১১ সালে একটি সুন্দর সমতল বাড়ির ছবি প্রকাশ করেছিল যার ছাদের অংশটুকু ছিল একদম হিটলারের চুল আঁচড়ানোর ঢংয়ের অনুরূপ, আর এর দরজার ঢালাই ঠিক যেন হিটলারের চির পরিচিত গোঁফের স্মারক।

অ্যামেরিকান একটি ঘটনা। ডায়না ডায়জার নামে একজন মহিলা একবার স্যান্ডউইচ খেতে গিয়ে সেই স্যান্ডউইচের মধ্যে যিশু খ্রিস্টের মাতা ম্যারিকে দেখতে পান। প্রথমবার কামড় দাওয়ার পরে স্যান্ডউইচের মধ্যে ম্যারির প্রতিমা ভেসে ওঠে। স্যান্ডউইচের বাকি অংশ এক দশকেরও বেশি সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখে। ডায়জার বিক্রির জন্য স্যান্ডউইচটিকে e-bay’তে নিলামে তোলে যেখানে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন আগ্রহী ব্যক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্যান্ডউইচটি শেষ পর্যন্ত ২৮০০০ ডলারে বিক্রি হয়।

ডায়না ডায়জার এবং তার পবিত্র স্যান্ডউইচ।

গুগল ফেসেস ডিজাইনার সেডরিক কাইফার এবং জুলিয়া লবও প্যারিডোলিয়া দ্বারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে ভাইকিং ১ অরবিটারের তোলা বিখ্যাত ‘ফেস ইন মার্স’ দেখার পর এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করার পর তারা ভাবতে শুরু করেন কীভাবে প্যারিডোলিয়ার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটি একটি যন্ত্র দিয়ে জেনারেট করা যায়। তারা ভাবেননি তাদের প্রজেক্টটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারবে।

কিন্তু রাশিয়ান তান্দ্রায় এবং ব্রিটেনে তাদের তোলা মুখাবয়বের ছবিগুলো খুব দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাইফার বলেন, এসব দেখে মনে হয় প্যারিডোলিয়ার সাথে আকর্ষণীয় কিছু ব্যাপার জড়িত।

চিত্রঃ ‘দ্যা ফেসেস ইন মার্স ১৯৭৬’ এর ছবি। পাশে সাম্প্রতিক কালের আরেকটি ছবি।

কিন্তু কেন মানুষ সেসব বস্তুর মধ্যে বিভিন্ন মুখাকৃতি দেখতে পায় যেগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুর দাগ বা প্রলেপ অথবা বিকৃত আকৃতির পাথর ছাড়া আর কিছুই না? এদের মধ্যে কিছু কিছু হলো বিবর্তনের পথে মানুষের ক্রমবিকাশের ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য।

মানুষ জন্মগতভাবে মুখাবয়ব শনাক্ত করার ক্ষমতা পেয়ে থাকে। কয়েক মিনিট বয়সী একটা শিশু এমন কিছুর দিকে তার দৃষ্টি চালনা করবে যার মধ্যে মুখ-সদৃশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এমন কিছুর দিকে সে তাকাবে না যেখানে ঠিক একই বৈশিষ্ট্যসমূহ অবিন্যস্তভাবে থাকবে।

পরিচিত বা চেনা কিছু খোঁজার প্রবণতা এসেছে সেই আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ হতে পারে প্রস্তর যুগের মানব। ধরা যাক একটা ঝোপের পাশে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে কোনো এক প্রস্তর যুগের মানুষ ভাবছে, ঝোপের ওপাশে খচমচে আওয়াজ সৃষ্টিকারী প্রাণীটি কি আসলে একটা বাঘ, নাকি অন্য কিছু?

আপনি বেঁচে যাবেন যদি আপনি ভেবে নেন যে ওখানে একটা খড়গ-দন্ত বাঘ রয়েছে এবং তাই তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালান। তা না করলে অন্যথায় আপনি সেই প্রাণীর দুপুরের খাবার হিসেবে পরিণত হতে পারেন।

চিত্রঃ পাতার মধ্যে মোনালিসা অথবা ভার্জিন মেরি, চকোলেটের মধ্যে ম্যাডোনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারিডোলিয়া হচ্ছে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সিস্টেমের প্রভাব। মস্তিষ্ক ক্রমাগতভাবে চক্রাকারে বিভিন্ন রেখা, আকৃতি, রঙ এবং পৃষ্ঠতলের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। তবে অর্থ আরোপ করলে এদের অন্যরকম গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন দীর্ঘমেয়াদী কোনো শিক্ষা বা অভিজ্ঞতার সাথে এগুলো মিলানো। এই পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবার ফলই হচ্ছে প্যারিডোলিয়া।

চিত্রঃ গুয়াডালুপ রদ্রিগেজ টেক্সাসে একটি ক্যাফেটেরিয়া বেকিং ট্রে’র মধ্যে দেখতে পায় ভার্জিন মেরিকে।

প্যারিডোলিয়া মানুষের আশা-প্রত্যাশার ফলাফলও হতে পারে। টোস্টের মধ্যে যীশুকে দেখতে পাওয়াই বলে দেয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে কী ঘটছে। এটা হচ্ছে ইল্যুশনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, এটি খুব সহজে আপনার মনে একটা ব্যাপারকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে পারে।

কিন্তু কেন মানুষ এক টুকরো খাবারে পাওয়া মুখাবয়ব একটু দেখার জন্য তীর্থযাত্রা করে অথবা সেটা কিনার জন্য হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করে? এর কারণ আধুনিক যুগের মানুষেরাও দৈব ঘটনায় বিশ্বাস রাখে। কেউ যদি দৈব ঘটনায় বিশ্বাস করে তাহলে প্যারাডলিয়া খুবই গুঢ় অর্থপূর্ণ হতে পারে। যার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করা কোনো ব্যাপারই না।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, http://www.bbc.com/news/magazine-22686500

পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

হেল অন আর্থ। কখনো শুনেছেন এরকম ? দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে একটি বৃহৎ মরুভূমি আছে, যাকে পৃথিবীর নরক বলা হয়। কিন্তু এই নরকের সাথে আরেকটি লাল রঙে আচ্ছাদিত এক স্থানের মিল দেখে বিজ্ঞানীরা একই সাথে উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

চিলির আটাকামা মরুভূমি হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। এই মরুভূমি এতই শুষ্ক যে কোনো কোনো সময় কয়েক দশক বা শতক ধরেও এখানে কোনো বৃষ্টির দেখা যায় না। আর এই প্রতিকূল স্থানকে আমরা পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরো মঙ্গল গ্রহ বলতে পারি এবং বিজ্ঞানীরা এই স্থানের ব্যাপারে এক মস্ত আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

চিলির আটাকামা ম্রুভূমি; image source: dailygalaxy.com

এই প্রথমবাবের মত গবেষকরা আটামাকার অস্বাভাবাবিক শুষ্ক মরুভূমিতে মাইক্রোবায়াল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই শুষ্ক এবং অত্যন্ত গরম পরিবেশে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের একটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রও আছে। তাই মঙ্গল গ্রহের প্রাণের আবিষ্কারের পূর্বে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার।

“এটা আমাকে সবসময়ই অবাক করে দেয় যে, মানুষ যেখানে চিন্তাও করত পারে না এইরকম একটা স্থানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে সেইরকম পরিবেশেও দেখা যায় যে জীবন ঠিকই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে আছে।” বলেন ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন যে, “জীবন যদি পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্ক পরিবেশে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে বেশ একটা ভালো সম্ভাবনা আছে যে, একইভাবে মঙ্গল গ্রহেও জীবনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।”

যদিও এর আগে বিজ্ঞানীরা আটাকামা মরুভূমিতে জীবাণু খুঁজে পেয়েছিলেন। পূর্বের গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, বালিমাটিতে যে সকল প্রাণের আবিষ্কার হবে তা হয় আগেই মারা গেছে বা, মৃতপ্রায় টেকসই কোষের অবশিষ্টাংশ হঠাৎ বায়ুমন্ডলীয় প্রক্রিয়ায় জমা থাকবে।

কিন্তু এইবার তারা আসলেই প্রমাণ পেয়েছেন দলবদ্ধ এবং বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় এক ধরনের জীবাণুর যারা বর্ধনশীল বা অন্তত টিকে থাকার চেষ্টা করছে প্রতিকূল পরিবেশে।

২০১৫ সালে ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক এবং তার সাথে গবেষকারা আটাকামা মরুভূমিতে পৌঁছানোর কিছু পরেই আকাশে বৃষ্টির দেখা দেয় যা কিনা খুবই দূর্লভ ঘটনা। এতটাই দূর্লভ যে ৪০ বছর আগেও মনে হয় এত বৃষ্টিপাত হয়নি বা তা রেকর্ড করা হয়নি।

এই অভাবনীয় বৃষ্টিপাতের পর পরই গবেষকরা মরুভূমির মাটিতে অস্বাভাবিক জীবত্বাত্তিক বিস্ফোরণ দেখতে পান। তারা অন্তত ৮ টি যায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একই ফলাফল দেখতে পান।

এর পর তারা ফিরে আসেন এবং পর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবার অনুসন্ধান চালান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা কোনো রকম বৃষ্টির দেখা পাননি এবং জীবন এর চিহ্ন পরবর্তী নমুনা গুলোতে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছিল।

আটাকামা মরুভূমিতে গবেষনায় ব্যাস্ত বিজ্ঞানীরা; image source: sciencealert.com

তবুও তারা জীনগত এবং কিছু রাসায়নিক পরীক্ষা করেন এবং টেস্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, এই জীবাণুরা এই বিশেষ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এইসকল কষ্টসহিষ্ণু ব্যাক্টেরিয়া দলবদ্ধভাবে মরুভূমির মাটির বেশ কয়েক হাত নিচে অনেক দিন পর্যন্ত পানি ছাড়া ঘুমিয়ে থাকে এবং যখন আবার বৃষ্টিপাত হয় তখন তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম আবার চালু হয়ে যায়।

“আটাকামার মরুভূমির মত এত প্রতিকূল পরিবেশে এত অটলভাবে বেঁচে থাকা কোনো জীবকে এই প্রথম কেউ খুঁজে পেল” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এই সকল অণুজীব যেভাবে শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় চিলির নরকের মতো মরুভূমিতে বেঁচে থাকতে পারে ঠিক তেমনি মঙ্গল গ্রহেও এরকম অণুজীব পাওয়া সম্ভব যারা অনেক বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।”

কিন্তু আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে চিলির আটাকাম মরুভূমি যতই রুক্ষ প্রকৃতির হোক না কেন মঙ্গল গ্রহ তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি রুক্ষ এবং ঠান্ডা।

আটাকামা মরুভূমি এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সাদৃশ্য; image source: sciencealert.com

তারপরেও যদি বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাণের আশা করে থাকেন তবে চিলির মরুভূমিতে আবিষ্কৃত অণুজীব গুলোই হবে মানদণ্ড স্বরূপ, কেননা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ হয়তবা এরকম কোন অনুজীবকে হয়ত বাঁচতে দিবে তার মাটির কয়েক স্তরের নিচে।

নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রমাণ পেয়েছেন যে ৪,০০,০০০ বছর আগেও মঙ্গল গ্রহে বরফ যুগ ছিল । এখনো মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে এবং তা আছে এই গ্রহের দুই মেরুতে।

“আমরা জানি যে মঙ্গলের মাটিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের বেলায় মঙ্গলে বরফ পড়ে তার একটা শক্ত ধারণা আমরা পেয়েছি। ফলে রাতের বেলায় এই লাল গ্রহের মাটিতে আর্দ্রতা সম্পৃক্ত ঘটনা ঘটে যার ফলে আমাদের আশংকা যে এখনো এখানে হয়ত মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে পৃথিবীর মতোই কিন্তু পৃথিবীর চাইতে কয়েক গুন বেশী সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অণুজীব।” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক ।

যদি কখনো মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা হয়ত রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নিচের আরেকটি স্তরে পাওয়া যাবে। আর তখন এসব গবেষণায় হয়ে থাকবে পথিকৃৎ।

featured image: the-martian.wikia.com