প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্ক কি সত্যিই নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে?

গত বিশ বছর যাবৎ ধারণা করা হচ্ছে একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্ক অসংখ্য নতুন নিউরন বা কোষ তৈরি করতে পারে, আর এই ধারনাটিই মানুষকে আশা জাগাচ্ছে যে কৃত্রিম উপায়ে কোষ উৎপাদন সম্ভব। স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি , নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য গবেষকদের গবেষণা – এ সব কিছুই হতাশা বা অ্যালজেইমার ব্যাধি ( Alzheimer’s Disease)  এর মত অসুখ বিসুখের চিকিৎসা বা প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু নেচার (Nature)  জার্নালে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত গবেষণার কারণে উপরোক্ত আশাটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিপুর্ণ মানুষ হিসেবে ক্রমবিকাশ লাভের পর অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়েই কমতে শুরু করে এবং প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পর পুরোপুরিভাবে থেমে যায়।

হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন, টরেন্টো, কানাডা এর স্নায়ুতত্ত্ববিদ Paul Frankland বলেন, “প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ এবং বানরের ব্রেইনে নতুন স্নায়ুকোষ খোঁজার গবেষণার ফলাফল অনেককেই হতাশ করবে”।

“নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়াটি কার্যগতভাবে আসলে খুবই দূর্বল”, বলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী Rene Hen.

তবে সকলের মতেই এ গবেষণাগুলোতে আসলে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে। টিস্যুগুলো পরিক্ষানীরিক্ষা করার পদ্ধতি, রোগীর মানসিক অবস্থার ঘটনা কাহিনী, তাদের ব্রেইনে কোনো ধরনের প্রদাহ ছিল কিনা, এসবের দ্বারা হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব কেন গবেষকরা এখনো পুরোপুরিভাবে সফল হতে পারেননি।

 

সূত্রপাতঃ

নিউরন বা স্নায়ুকোষ সৃষ্টির প্রথম ঘটনা দেখা যায় ১৯৯৮ সালে। ক্যান্সার রোগীদের উপর জীবিত অবস্থাতেই একটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। নাম ছিল- ব্রোমোডিঅক্সিইউরিডিন (Bromodeoxyuridine)। রাসায়নিকটি প্রয়োগের পর তাদের মস্থিষ্কে নতুন বিভাজিত কোষ দেখা যায়। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে যেমন নতুন কোষগুলো ছড়ানো অবস্থায় থাকে এটা কিছুটা সেরকম। স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের Jonas Frisen’s ল্যাবের একটি গবেষণা এই বিষয়টি কে আর শক্তিশালী করে। ৫৫ জন রোগ্রাক্রান্ত মানুষের প্রত্যেকের ব্রেইন টিস্যুর প্রতিটি নিউরনের ‘কার্বন ডেটিং’ করা হয়। এ পদ্ধতিতে নিউরনের বয়স নির্ধারণ করার পর সিদ্ধান্তে আসা হয় ঐ মানুষগুলোর মস্তিষ্কের ডেন্টেট জাইরাস (Dentate gyrus)এ প্রায় ৭০০টি পুরাতন নিউরন নতুন নিউরন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

Arturo Alvarez-Buylla (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো) ১৯৮০ সাল থেকে গবেষণা করছেন মস্তিষ্কের নতুন কোষ উৎপাদনের ক্ষমতার উপর। কিন্তু তিনিও সন্দেহপ্রবণ। তিনি দেখিয়েছিলেন (Rodent) বা নিচু শ্রেণীর তীক্ষ্ণ দাঁত বিশিষ্ট কিছু প্রাণীদের মস্তিষ্কে স্টেম সেল কীভাবে নতুন অংশ পুনরুৎপাদন করে। কিন্তু কার্বন ডেটিং এ প্রাপ্ত ফলাফল এটি প্রমাণ করে না যে, মানব মস্তিষ্কেও ঠিক একই বিষয়টিই ঘটে।

মানব মস্তিষ্কের বিষয়টির ক্ষেত্রে অনেক ধাপ রয়েছে। আবার অনেক ধাপে ধারণা করে নেওয়া হয়েছে এমন বিষয়ও রয়েছে। যার কারনে আসল ব্যাপারটিতে পৌঁছানোর আগে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

Buylla এবং তাঁর দল ৫ বছর ধরে ৫৯ জন মানুষের ব্রেইন টিস্যু সংগ্রহ করেন। যাদের কেউ বা মারা গিয়েছিলেন, কারও আবার বিভিন্ন বয়সে সার্জারি করে খিঁচুনীর জন্য দায়ী টিস্যু ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ মানুষগুলোর বয়স ছিল মোটামুটি জন্মের আগ থেকে শুরু করে ৭৭ বছর পর্যন্ত। নিউরনের পূর্ণতা প্রাপ্তির বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন থাকে, এগুলোকে স্পেসিফিক প্রোটিন নামেই ডাকা হয়ে থাকে। এই প্রোটিন গুলোকে চিহ্নিত করতে ফ্লুরোসেন্ট এন্টিবডি ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসা হয়েছিল কোনও লম্বা সহজ সরল আকৃতির বাচ্চা নিউরনকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

[ইঁদুরের রেটিনায়  নতুন কোষ বিভাজন]

গবেষণাকারী এই দলটি দেখতে পেলেন, নবজাতকের ব্রেইনে একটি বড় সংখ্যায় জন্মদাতা কোষ অর্থাৎ প্রোজেনিটর সেল (progenitor cell) এবং স্টেম সেলের উপস্থিতি আছে। জন্মের সময় এই সংখ্যাটি মোটামুটি প্রতি মিলিমিটার ব্রেইন টিস্যুতে ১৬১৮টি নতুন নিউরন এরকম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কোষগুলো নতুন কোষ তৈরিতে অংশ নেয় না। এক থেকে সাত বছরের মধ্যে নতুন নিউরন সৃষ্টি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। পূর্ণবয়ষ্ক হতে হতে নতুন নিউরনের জোগান প্রায় পুরোপুরিভাবেই থেমে যায়।

Alvarez-Buylla এর মতে, “অন্যরা এ নিয়ে কী দাবী করছে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়”

অপরদিকে আবার Frisen এর মতে, এন্টিবডি মার্কার পদ্ধতিটি পুরোপুরিভাবে নির্ভরযোগ্য নয়, কারন এতে ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্স ফলাফলকে ঘোলাটে করে দিতে পারে। তিনি দাবী করেন এ পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য গবেষকেরা প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্রেইনে নতুন কোষ উৎপাদন দেখেছেন। Frankland এর মতে ,”এ তর্ক চলতেই থাকবে, আরো অনেক কিছু এখনো বাকি”।

 

 

ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হবে মানুষের মস্তিষ্ক

ইলন মাস্ক এমন একটি প্রযুক্তি জন্য কাজ করছেন যার মাধ্যমে মানুষের ব্রেন সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করা যাবে। এই প্রযুক্তি এরকম হবে না যে মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সাথে প্লাগ ইন করা হলো। এখানে ব্যবহার হবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট। মস্তিষ্ক থেকে নির্গত তরঙ্গকে সিগনাল হিসেবে গ্রহণ করা এবং তা কম্পিউটারে প্রেরণ করা হচ্ছে ঐ হ্যালমেটের কাজ।

image source: concarez.com

তেমনই কম্পিউটারও তরঙ্গ হিসেবে সিগনাল প্রেরণ করবে যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট গ্রহণ করে মস্তিষ্কের উপযোগী করে নেবে। ফলাফল, কম্পিউটার এবং মস্তিষ্ক একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

যদি সত্যিই এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হয় তাহলে এর ফলাফল মানবজাতির জন্য অনেক কিছু বয়ে আনবে। তবে এই প্রযুক্তির প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য ছিল মস্তিষ্কের মাধ্যমে কোনো কাজ করা। যেমন প্রতিবন্ধীরা হাত পায়ের সাহায্য ছাড়াই কোনো কিছু নাড়ানো, খাওয়া, মস্তিষ্কের মাধ্যমে কথা বলা, মস্তিষ্কের সাহায্যে গাড়ি বা যানবাহন চালানো সহ আরো অনেক কিছু। ধরে নেয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক কিছুই সম্ভব, যা আগে মানুষ সম্ভব বলে ভাবতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

www.technewsworld.com/story/Elon-Musk-Plans-to-Build-a-Human-AI-Interface-84415.html

ডার্ক চকলেট বাড়াবে জীবনীশক্তি

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে ডার্ক চকলেট খেলে তা দৈনন্দিন জীবনে খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শরীরের বিভিন্ন ধকল এবং প্রদাহ কমায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মন মেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডার্ক চকলেট থেকে কয়েক ধরনের শারীরিক উপকারিতা লাভ করা সম্ভব। 

সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি-২০১৮ এর একটি কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত দুটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাকাও (Cacao) থাকে। প্রদাহ ও ধকল কমাতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ক্যাকাও।

ফ্লাভোনয়েডস নামক একটি মূল্যবান খাদ্য উপাদানের প্রধান উৎস হলো ক্যাকাও। গবেষণায় জানা যায় বুদ্ধিবৃত্তি, রক্তসঞ্চালন, এমনকি দেহের বিভিন্ন নিঃসরনের ক্ষেত্রে ফ্লাভোনয়েডস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

image source: dietitianrenupreet.com

সাইকোনিউরোইমিউনোলজি এবং ফুড সায়েন্সের গবেষক লি এস বার্ক উপরোক্ত গবেষণাগুলোতে প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। “কয়েক বছর ধরে আমরা নিউরনের উপর ডার্ক চকলেটের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে এসেছি” বলেন বার্ক। 

পরীক্ষাগুলো থেকে দেখা যায়, যত বেশি ক্যাকাও তত বেশি দেহের বুদ্ধি, স্মৃতি, মন মেজাজ ইত্যাদির উপর ভালো প্রভাব। ক্যাকাও-তে যে ফ্লাভোনয়েডস নামক পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় তা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহপ্রতিরোধকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের জন্যও বেশ উপকারী।

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি- ২০১৮ এর কনফারেন্সে উপস্থাপিত কিছু ফলাফল এখানে তুলে ধরা হলো। 

(১)

কোষের প্রতিরক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীলতায় ভুমিকা রাখে

(২)

ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের EEG ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্কে কতটা ইলেকট্রিক্যাল একটিভিটি উৎপন্ন হচ্ছে তা জানা যায় EEG পদ্ধতিতে। নতুন কিছু শেখা, কোনো কিছু মনে করা, সামঞ্জস্যতা, ধ্যান, মস্তিষ্কের নমনীয়তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে এটি।

 

গবেষক বার্ক বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেহের প্রতিরক্ষা এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উপর এটির কী প্রভাব ফেলে তা জানার জন্য, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। অধিক মাত্রায় ডার্ক চকলেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক এবং আচরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা ফেললে তার প্রভাব কেমন হবে এটি এখন গবেষণা করে দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: sciencedaily

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

মস্তিষ্কের নকশা

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)।

মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়।

অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন।

তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই।

তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/

featured image: bigthink.com

বয়মের মধ্যে মস্তিষ্ক সংরক্ষণ

প্রশ্নঃ টেলিভিশন ধারাবাহিক বা সিনেমাগুলোতে প্রায় সময়ই বয়ামের মধ্যে সংরক্ষিত মস্তিষ্ক দেখা যায়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বাস্তবে কি বয়ামে ভরে মস্তিষ্ক জীবিত রাখা সম্ভব?

উত্তরঃ কিছু নীতিগত ব্যাপার জড়িত বলে এ নিয়ে এখনো খুব বেশি গবেষণা হয়নি। একটি জীবন্ত মস্তিষ্ক শরীর থেকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা সম্ভব, কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য মাত্র। নৈতিক কিছু বিষয়ের কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ এ জাতীয় ব্যাপারগুলো একেবারে পরিহার করে চলেন।

৯০ এর দশকের প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা একটি স্তন্যপায়ী জীবের মস্তিষ্ক আলাদা করে তা সংরক্ষণ করেছিলেন। এটি আট ঘন্টা পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এটি এবং এর পরে সংগঠিত এই জাতীয় সকল গবেষণাগুলোতে গিনিপিগের মস্তিষ্ক ব্যবহার করা হয়েছিল।

গিনিপিগের মস্তিষ্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কের তুলনায় আকৃতিতে বড় এবং গবেষণার জন্য অধিক উপযোগী। শরীর থেকে আলাদা করার পর মস্তিষ্কটি কতক্ষণ সক্রিয় থাকে তা পরীক্ষা করে দেখেন গবেষকরা। শুধুমাত্র সক্রিয়তার সময়কাল পরীক্ষা করাই ইউরোপীয় গবেষণাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল না, পাশাপাশি এদের অধিকাংশই সংগঠিত হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্কের সামগ্রিক আকৃতি সম্বন্ধে অবগত হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে।

একটি জীবের শরীর থেকে তার মস্তিষ্ক ‘আলাদা’ করে রেখে গবেষণা করার মধ্যে নৈতিকতা-সম্বন্ধীয় কিছু সমস্যা জড়িত, তাই যুক্তরাষ্ট্রে গুটিকয়েকবার মাত্র এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এর বেশি এগোনো যায়নি।

তবে বাস্তবসম্মতভাবে এবং নৈতিকতা-বিরোধী কোনো সমস্যা ছাড়া এ কাজ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মৃত প্রাণীর মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে হবে, যা নিষ্ক্রিয় হলেও ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা একটি ইঁদুরের নিউরাল সার্কিট সংরক্ষণ করেছিলেন। এজন্য তাঁদেরকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে চর্বি জাতীয় অণু, প্রোটিন সংযোজন এবং মস্তিষ্কের পানির জায়গায় প্লাস্টিক ব্যবহার করতে হয়েছিল।

চিত্রঃ বয়ামে আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক

যতদিন না পর্যন্ত একে স্ক্যান করে এবং পুনরায় এর নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে কোনো রোবট দেহে বা ভার্চ্যুয়াল এনভায়রনমেন্টে ব্যবহার করার জন্য নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কৃত না যাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত একে বয়মে ভরে একটা শেলফে রেখে অনায়াসে সংরক্ষণ করা যাবে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অভিনব এবং ভালো, কেননা অনন্তকালের জন্য বয়মের মতো আবদ্ধ স্থানে জীবন্ত কিছু আটকে রাখার চেয়ে এটা অনেকগুণ কম ভয়াবহ!

তথ্যসূত্রঃ ডিসকভার ম্যাগাজিন

featured image: digitallusions.deviantart.com

শীত ও গ্রীষ্মে ভিন্নভাবে কাজ করে মানুষের মস্তিষ্ক

একটি নতুন গবেষণা বলছে আমাদের মস্তিষ্ক একেক ঋতুতে একেকভাবে কাজ করে। এই গবেষণার সাথে যুক্ত গবেষক গিলস ভেনডেওয়ালের ভাষ্যে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপের চলমান প্রক্রিয়া ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন। বেলজিয়ামের গবেষকরা ২৮ জন মানুষেকে নিয়ে বিভিন্ন ঋতুতে এই পরীক্ষাটি করেন।

পরীক্ষায় প্রতিবার একজন ব্যক্তি ৪/৫ দিন শুধুমাত্র একটি গবেষণাগারে কাজ করেন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন। এরপর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা হয়। তাদের কর্মদক্ষতা, কাজের প্রতি মনোযোগ বজায় রাখা, তথ্য সংগ্রহ ও তুলনা করার দক্ষতা, স্মৃতিতে তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

গবেষকরা দেখতে পান বিভিন্ন সময়ে মানুষের কর্মদক্ষতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু দেখা যায়, এই গবেষণায় কাজগুলো সম্পাদন করতে ‘নিউরাল কস্ট’ ও মস্তিষ্কের কার্যাবলির প্রক্রিয়ার পরিবতর্ন হয়। এটি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রকম হয়। যেমন, মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা মনোযোগ বজায় রাখার সমানুপাতিক।

বছরের জুন মাসের দিকে, অর্থাৎ শীতকালে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে উপরে। অন্যদিকে ডিসেম্বর মাসে গ্রীষ্মের সময়ে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে নিচের দিকে। আবার আরেকটি ব্যাপার, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার পর্যায়, স্মৃতিতে ধারণক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। কার্যক্ষমতা শরতে থাকে শীর্ষে এবং বসন্তে থাকে সর্বনিম্নে।

পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মানুষের দৈনন্দিন কার্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, শীতকালে মানুষের ক্যালরি গ্রাস করার ঝোঁক গ্রীষ্মকালের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জিনের সক্রিয়তা ঋতুর সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষের মেজাজ এবং ঋতুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। শীতকালে মস্তিষ্কের সিজনেবল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) এর লক্ষণ দেখা যায়।

গবেষক ভেনডেওয়ালে বলেন, যদিও গবেষকরা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক এই নতুন গবেষণায় পরীক্ষা করেননি, কিন্তু যারা SAD-এ ভুগছেন, তাদের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যাবলীর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষকরা আরো বলেন, নতুন গবেষণায় পাওয়া ঋতু পার্থক্যের সাথে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মূল কারণ ও প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নিউরোট্রান্সমিটার যেমন সেরোটোনিনের মাত্রা এবং সেই সাথে মস্তিষ্কের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রোটিনের মাত্রা ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষকরা এই নতুন গবেষণা থেকে উপনীত হন যে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মস্তিষ্কের সক্রিয়তার বৈচিত্রময় পরিবর্তন হয়। এই নতুন গবেষণাটি ৮ ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/53643-your-brain-works-differently-seasons.html

featured image: edition.cnn.com

নবজাত শিশুর মাথায় নরম অংশটি কেন থাকে?

সকল নবজাত শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় এদের মাথার খুলির উপরে একটি অংশ নরম, শুধু চামড়া দ্বারা আবৃত, কোনো অস্থি নেই। শিশুদের মাথায় অস্থিবিহীন, ঝিল্লী দ্বারা আবৃত নরম এই অংশকে বলে ফন্টান্যাল (Fontanelle)

ঘুমন্ত শিশুর মাথায় ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

নবজাতক শিশুদের মাথায় জন্মের সময় সকল অস্থি পূর্ণ গঠিত অবস্থায় থাকে না। জন্মের পরে ধীরে ধীরে সে অস্থিগুলো বৃদ্ধি লাভ করে। যেসকল স্থানে অস্থি সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয় না সে সকল স্থানই ফন্টান্যাল নামে পরিচিত। এমন ফন্টান্যাল নবজাত শিশুর মাথায় প্রায় ৬টি থাকে। এর মাঝে প্রধান দুটি হলো-

১. সম্মুখ ফন্টান্যালঃ মাথার সামনে ফ্রন্টাল ও দুটি প্যারাইটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে । এটি শিশুর ১-৩ বছর বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। তাই বয়স বৃদ্ধির পর শিশুর দেহে এই নরম জায়গা আর দেখা যায়না।

২. পশ্চাৎ ফন্টান্যালঃ মাথার পেছনে প্যারাইটাল অস্থি ও অক্সিপিটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে। এটি শিশুর ৬ মাস বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

সম্মুখ ও পশ্চাৎ ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

শিশুদেহে এই ফন্টান্যালগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জন্মের সময় এতো সরু নালী দিয়ে শিশুর মাথা বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ফন্টান্যালগুলোর স্থানে শিশুর মাথার অস্থি একটার সাথে আরেকটা উপরিপাতিত হয়। ফলে শিশুর মাথা স্বাভাবিক থেকে ছোট আকার লাভ করে এবং মায়ের প্রসব কষ্ট অনেকটা হ্রাস পায়।

অন্যদিকে নবজাত শিশুর মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্কের প্রায় ২৫ ভাগ হয়, যা এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০ ভাগ। মস্তিষ্কের এই বৃদ্ধি  প্রায় ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ফন্টান্যাল না থাকলে জন্মের পর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হত। ফন্টান্যাল থাকায়, এগুলো অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক বৃদ্ধি চলতে থাকে।

Feature image: heylittleyou.co.uk

মস্তিষ্ক কি পূর্ণ হতে পারে?

মস্তিষ্ক সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক। এ যেন এক অবিরাম গ্রন্থাগার যার প্রতিটি তাক আমাদের জীবদ্দশার অতি মূল্যবান স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু এমন কি কোনো বিন্দু আছে যেখানে মস্তিষ্ক তার সংরক্ষণ ক্ষমতার চূড়ান্ত অবস্থায় পৌছায়? অন্য কথায়,মস্তিষ্ক কি ‘পূর্ণ’ হতে পারে?

উত্তরটি প্রশ্নাতীত ভাবেই হবে ‘না’। কারণ মস্তিষ্ক তার চেয়েও একটু বেশি বুদ্ধি সম্পন্ন, বেশি স্মার্ট। এ বছরের শুরুর দিকে ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ সাময়িকীর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নতুন স্মৃতিকে ধারণ করতে মস্তিষ্ক তার পুরাতন স্মৃতির সাথে গাদাগাদি করে রাখার পরিবর্তে পুরোনো তত্থ্যগুলোকেই সড়িয়ে ফেলে। আচরণগত দিক নিয়ে আগের গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, নতুন তথ্যের আগমন পুরাতনকে ভুলে যাবার অন্যতম কারণ হতে পারে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা

মস্তিষ্কে যখন আমরা প্রায় একই রকম কিছু তথ্য ধরে রাখতে চেষ্টা করি তখন আসলে কী ঘটে? এই কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন কয়েকজন গবেষক-বিজ্ঞানী। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একই ধরনের তথ্য পূর্ব থেকে বিদ্যমান তথ্যের সাথে জট পাকিয়ে যেতে চায়।

মস্তিষ্ক যখন একটি ‘নির্দিষ্ট’ স্মৃতি সংরক্ষণ করতে যায় তখন কীভাবে সে কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত হয় তা নিয়ে বিজ্ঞানী দল পরীক্ষা করলেন। যেমন একই সময়ে একটা জিনিস মনে রাখা এবং তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটা জিনিস মনে রাখা। দ্বিতীয় জিনিসটি হতে পারে প্রথম জিনিসটির বিপরীতধর্মী কোনো কিছু। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ-কারীদেরকে দুটি ভিন্ন চিত্রের সাথে কোনো একটি শব্দের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে বলা হয়। যেমন মেরিলিন মনরো এবং একটি টুপির সাথে sand শব্দটির কী সম্পর্ক বের করা।

গবেষকেরা দেখতে পেলেন টার্গেট করা স্মৃতিটি প্রায়ই যখন মনে করা হয় তখন সেই স্মৃতির জন্য মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। কিন্তু যখন ঐ গোত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতির আগমন ঘটে তখন মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। স্মৃতি সংক্রান্ত এমন কর্মকাণ্ড মস্তিস্কের মধ্য অঞ্চল (হিপোক্যাম্পাস) এর চেয়ে অগ্র অঞ্চল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেই বেশি ঘটে। হিপোক্যাম্পাস স্বভাবগতভাবেই স্মৃতি নষ্টের কারণ।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অনেক জটিল জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় যেমন, পরিকল্পনা প্রণয়ন,সিদ্ধান্ত গ্রহণ,স্মৃতি সংক্রান্ত বিষয় নির্বাচন করার মতো কাজের সাথে জড়িত থাকে। নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে,আমাদের মস্তিষ্কের এই অংশটি বিশেষ ধরনের কিছু স্মৃতিকে আহরণ করার জন্য হিপোক্যাম্পাস এর সমন্বয়ে কাজ করে থাকে।

যদি হিপোক্যাম্পাসকে একটি সার্চ ইঞ্জিনের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে সেই ফিল্টার সমতুল্য। যা নির্ধারণ করে কোন স্মৃতিটি বেশি প্রাসঙ্গিক ও সাদৃশ্যপূর্ণ। এই অঞ্চলটিই নির্ধারণ করে একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করে ফেলা স্মৃতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ কোনো স্মৃতির ঝক্কি ছাড়াই সমতুল্য তথ্যে প্রবেশ করানোর মতো সামর্থ্যও মস্তিষ্কের থাকতে হয়।

যদি হিপোক্যাম্পাস হয় সার্চ ইঞ্জিন তাহলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হবে তথ্যের ফিল্টার; image source: aboutmodafinil.com

ভুলে যাওয়া যখন ভালো লক্ষণ

দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়ারও কিছু সুবিধা আছে। উদাহরণস্বরূপ, মনে করুন, আপনি আপনার ব্যাঙ্কের কার্ডটি হারিয়ে ফেলেছেন। যখন নতুন কার্ডটি আসবে তখন সেটা একটা নতুন পিন নম্বর সহ আসবে। এক্ষেত্রে গবেষণা বলে যে প্রত্যেক বার কেউ যখন নতুন পিন নম্বরটি মনে রাখতে চেষ্টা করবে, তখন পুরাতন পিন নম্বরটি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকবে। এই প্রক্রিয়া পুরনো স্মৃতিতে হটিয়ে দেবার মাধ্যমে নতুন তথ্যের উন্নতির পথ সুগম করে।

আমাদের মধ্যে অনেককেই পাওয়া যাবে যারা পুরাতন স্মৃতির সাথে নতুন সমতুল্য স্মৃতিকে মিলিয়ে ফেলার হতাশায় ভুগছেন। ধরুন,আপনি এক সপ্তাহ আগে কার পার্কিং জোনের কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন তা মনে করার চেষ্টা করছেন। এ ধরনের স্মৃতি সুনির্দিষ্টভাবেই এর জন্য সংবেদনশীল, মনে রাখা দরকার ও মনে রাখা দরকার নয় এই দোটানায় উপরিপাতিত হয়। যখন আমরা সম্পূর্ণ নতুন কোনো তথ্য আহরণ করি তখন আমাদের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভিতরে থাকা তথ্যের সাথে নতুন তথ্যকে সুবিন্যস্ত করে অঙ্গীভূত করে নেয়।

পূর্বের গবেষণায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে শিখি এবং নতুন তথ্য মনে রাখি তার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু আগে উল্লেখিত বর্তমানের গবেষণা আলোকপাত করছে, আমরা কেন ভুলে যাই তার উপর। এবং এই ব্যাপারটার গুরত্ব অধিক হারে মূল্যায়িত হচ্ছে।

স্মৃতির অভিশাপ

খুব কম সংখ্যক মানুষই জীবনের সমস্ত তথ্য খুঁটি নাটি সহ মনে রাখতে পারে, তাদের হাইপারথাইমেস্টিক সিন্ড্রোম থাকে। এমনকি যদি দিন তারিখের স্মৃতিও হয় তাহলে তারা আপনাকে নির্দিষ্ট দিনে কখন কোথায় কী করেছিল তাও বলে দিতে পারবে। যদিও এটা শুনতে অনেকের কাছেই আশীর্বাদ মনে হতে পারে, কিন্তু এই বিশেষ বৈশিষ্টের স্বল্পসংখ্যক মানুষের কাছে তাদের অসাধারণ ক্ষমতা আগুনের মতো জ্বালা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এটি একটি রোগ।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কখনো কখনো কেউ বর্তমান অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে পারে না তার কারণ অতীতের কোনো স্মৃতির কারণে ভিতরে থাকা অনুভূতি।

এখানের আলোচনা নির্দেশ করে যে মনে রাখা এবং ভুলে যাওয়া একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এক দিক থেকে ভুলে যাওয়া হলো নতুন স্মৃতিকে ধারণ করার একটি রাস্তা। এই হিসেবে ভুলে যাওয়াকে বলা যায় মস্তিষ্কের পূর্ণ হয়ে যাওয়া ঠেকানোর একটি মেকানিজম, যা মানুষ বিবর্তনের পথে হাজার হাজার বছরে অর্জন করেছে।

featured image: vivacomfelicidade.com

কানিজসা ত্রিভুজ রহস্য- না থাকা এই ত্রিভুজ আমরা কেন দেখি?

Kanizsa Triangle হলো এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম যা ইতালীয় মনোবিজ্ঞানী Gaetano Kanizsa ১৯৫৫ সালে বর্ণনা করেন। এর দিকে তাকালে দেখা যাবে, মাঝখানে একটা উজ্জ্বল ভাসমান ত্রিভুজ, যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা মস্তিষ্কের একধরনের কারসাজি। এই দৃষ্টিভ্রমের পিছনে কারণ হিসাবে দুই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

গাইতানো কানিজসা; image source: alchetron.com

১. মস্তিষ্কের একধরনের প্রবণতা হলো কোনো আংশিক উপাদান থেকে সম্পূর্ণ পরিচিত কোনো বস্তুর আকৃতি তৈরি করা।

২. বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য কোনো বস্তুর আকার এবং প্রান্ত সনাক্তকরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য আমরা সামান্য কোনো অংশ দেখে একটা পরিচিত সম্পূর্ণ আকৃতির বস্তু কল্পনা করতে পারি।

সত্যিই, জগতে যদি সবচেয়ে অদ্ভুত এবং রহস্যময় কোনো কিছু থাকে সেটা হলো মানব মস্তিষ্ক।

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

বাস্তবতা কী?

জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তাই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?

এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। বিশটিরও অধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বেশি শক্তিশালী। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।

কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলবো? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?

ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে

বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।

আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।

অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌড়ে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।

এদিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।

আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই,

এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।

আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এদিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।

মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।

সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।

নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কিওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster) স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।

এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

যেসকল জিনিসের বাস্তবতা ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় না, সেসকল জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেন। পদ্ধতিটির নাম ‘মডেল’। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি পরিচিত নয়। মডেল হচ্ছে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার সত্যিকার মাধ্যম। আমাদের আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের আশেপাশের এইখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল। এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জীব জগৎ ও জড় জগৎ নিয়ে এভাবেই বৈজ্ঞানিক মডেল উপস্থাপন করেন। মডেল প্রদানের পর ঐ মডেলকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। মডেল হতে পারে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি কোনো রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি কিংবা হতে পারে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কিংবা হতে পারে কম্পিউটারের কোনো সিমুলেশন।

এই মডেল যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ফলাফল হিসেবে কী দেখার কথা বা কী শোনার কথা কিংবা কোনো যন্ত্রে কী প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে মডেলের বেলায় গাণিতিক হিসাব নিকাশ করেও গাণিতিক ফলাফল কী পাবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মডেলে দাবি করা কথাগুলো যাচাই করা হয় এবং এই মডেল সঠিক হয়ে থাকলে এটির ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো কিছু সম্পর্কে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। সঠিক হয়ে থাকলে কী দেখতে পাবার কথা বা কী শুনতে পাবার কথা কিংবা কী উপলব্ধি করতে পারার কথা তা মিলিয়ে দেখা হয়। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় তাহলে মডেলকে আপাতত

সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে পারি যে, মডেলে যা দাবি করা হচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার অংশ।

উৎরে যাওয়া মডেলকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যত বেশি পরীক্ষায় পাশ করবে তত বেশি পরিমাণ নির্ভুল ও তত বেশি পরিমাণ বাস্তব বলে বিবেচিত হবে। যদি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী না মিলে তাহলে এটিকে বাতিল ও ভুল বলে গণ্য করা হয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। অন্য উপায়েও যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তাহলে মডেলটিকে সংশোধন করে আবারো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বেলায় কোনো ছাড় নেই।

বৈজ্ঞানিক মডেল নিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমরা জানি বংশগতির একক জিন, DNA নামক এক প্রকার তন্তু দিয়ে গঠিত। আজকের যুগে DNA সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। DNA কী, কীভাবে কাজ করে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানি। কিন্তু DNA’র গঠন কেমন তা দেখতে পারি না। এমনকি খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেও এর গঠন দেখা যায় না। DNA সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় সবই এসেছে কল্পনায় তৈরি করা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল ও মডেলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।

মানুষ যখন DNA সম্পর্কে কিছুই জানতো না, এমনকি DNA -র নামও শুনেনি তখনও জিন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের জানা ছিল। দেড়শো বছর আগের কথা, ইতালির পাশের দেশ অস্ট্রিয়ায় গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। মেন্ডেল তার গির্জার বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। মটরশুঁটি বীজ নিয়ে তার মনে একটা ভাবনা খেলা করায় তিনি যত্ন নিয়ে বাগানে বেশ কিছু মটরশুঁটি রোপণ করলেন, এবং পরিচর্যা করে বড় করতে লাগলেন। যে যে গাছ ফল হিসেবে সবুজ বা হলুদ কিংবা উভয়ের মিশ্রণ দিয়েছে তাদের গুনে রাখলেন। এ বীজগুলো থেকে আবার চারা তৈরি করে ঐ চারার বীজের রঙ পর্যবেক্ষণ করলেন। এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে তিনি চমৎকার একটি সূত্র খুঁজে পান।

চিত্রঃ মগ্ন মেন্ডেল। চিত্রঃ Charley Harper Art Studio

তিনি খেয়াল করে দেখলেন মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্যগুলো চমৎকার একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে বংশ পরম্পরায় বয়ে চলে। মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সন্তানরা দেখতে শুনতে কিংবা অন্য কোনো

বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রায় সময় তাদের বাবা-মায়ের মতো হয়। মেন্ডেলের আবিষ্কার করা এই জিনিসটার জন্যই সন্তানেরা বাবা-মায়ের মতো হয়।

মেন্ডেল কিন্তু কোনো জিনকে কখনো চোখে দেখেননি বা ছুঁতেও পারেননি। কিন্তু তারপরেও তিনি অনুধাবন করেছিলেন ‘কিছু একটা’ জিনিস আছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এর সবগুলোই তিনি করেছিলেন গণনা ও হিসাব নিকাশের মাধ্যমে। মটরশুঁটি গাছের সবুজ ও হলুদ বীজ নিয়ে তিনি একটি মডেল প্রদান করেছিলেন। এই মডেল যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবুজ ও হলুদ মটরশুঁটিকে বিশেষ উপায়ে নিষিক্ত করা হলে এক পর্যায়ে সবুজ মটরশুঁটির তিনগুণ হলুদ মটরশুঁটি পাওয়া যাবে। এবং তার পরীক্ষার ফলাফলে ঠিক এমনটাই পাওয়া গিয়েছিল।

বিপ্লবী এই আবিষ্কারটা তিনি করেছিলেন তার কল্পনার মডেলের মাধ্যমেই। এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক আবিষ্কার হয়েছে মডেলের মাধ্যমে। মেন্ডেলের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার কোনো উপায় ছিল না। এসব সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের মডেলের আরো উন্নয়ন করেন। মটরশুঁটি বীজের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের উপরও এই সূত্র প্রয়োগ করেন।

মেন্ডেল DNA দেখতে পাননি। DNA-র আকার আকৃতি কেমন আজকের যুগে আমরা তা জানি। শুধু আকার আকৃতিই না, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে DNA সম্পর্কে অনেক অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছে।

DNA-র সত্যিকার আকৃতি কেমন তা জানতে পেরেছি বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের কল্যাণে। ওয়াটসন ও ক্রিকের পাশাপাশি তাদের আগে ও পরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও অবদান আছে। ওয়াটসন আর ক্রিকও কিন্তু DNA-র আকৃতি নিজেদের চোখে দেখননি। তারাও গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি করেছিলেন তাদের কল্পিত মডেল প্রদানের মাধ্যমে এবং ঐ মডেলের সত্যাসত্য যাচাইয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।

তাদের মডেল বাস্তবায়নের জন্য লোহা ও কাঠ ব্যবহার করে DNA-র আনুমানিক গঠনের একটি রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। এই মডেল সঠিক হলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে তাও গবেষণা-হিসাব-নিকাশ করে বের করলেন। অর্থাৎ কিছু একটা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

রোজালিল্ড ফ্রাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ওয়াটসন ও ক্রিকের দাবী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। তারা এক্স-রে বীম দিয়ে বিশুদ্ধ DNA ক্রিস্টালের ছবি তুললেন। তাদের তোলা ছবিতে DNA-র গঠন আর ওয়াটসন ও ক্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করা DNA-র গঠন ঠিক ঠিক মিলে যায়। এর ফলে একটি কল্পিত মডেল যুগান্তকারী এক আবিষ্কারে পরিণত হয়। ওয়াটসন ও ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল মূলত মেন্ডেলেরই আবিষ্কারের আধুনিক রূপ।

চিত্রঃ ওয়াটসন ও ক্রিক। অলংকরণঃ Dave McKean

আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাস্তবতা কী, তিনটি ভিন্ন উপায়ে বাস্তবতা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানলাম। প্রথমটি হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি কোনোকিছুকে উপলব্ধি করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শেষের পদ্ধতিটি হচ্ছে মডেল তৈরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা ঐ মডেলের সত্যাসত্য নির্ণয়ের মাধ্যমে আরো পরোক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। মানে ঘুরেফিরে এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে সেটি শেষমেশ ইন্দ্রিয়তে গিয়েই শেষ হচ্ছে। যে পদ্ধতিতেই হোক, বেলা শেষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বাস্তবতা নির্ধারিত হচ্ছে।

তাহলে তার মানে কি এই, যা নির্ণয়-নির্ধারণ করা যাবে তা-ই শুধু বাস্তব আর বাকি সব অবাস্তব? তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালোবাসার মতো জিনিসগুলো কোথায় যাবে? তারা কি অবাস্তব?

অবশ্যই এরা বাস্তব। কিন্তু এই আবেগ-অনুভূতিগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের উপর তাদের তীব্রতার পরিমাণ নির্ভর করে। আবার সব প্রাণীর মস্তিষ্কে সব ধরনের আবেগ-অনুভূতি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক কিংবা অন্যান্য উন্নত প্রাণী যেমন- শিম্পাঞ্জী, কুকুর, তিমি মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের তীব্র আবেগ অনুভূতি আছে। ইট-পাথর পাথরের কোনো আনন্দ-বেদনা নেই, পাহাড়-পর্বতেরা কখনো প্রেমে পড়ে না।

এই অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে তখনই বাস্তব হবে যখন মস্তিষ্ক এই অনুভূতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করবে। অভিজ্ঞতা লাভ করার আগ পর্যন্ত এর সত্যিকার রূপ সম্বন্ধে মস্তিষ্ক কিছুই জানবে না। একটা উদাহরণ দেই। একটি ছেলে বা মেয়ের কথা বিবেচনা করি, যে তার জীবনে এখন পর্যন্ত একটাও আম খেয়ে দেখেনি। বই-পুস্তকে অনেকবার পড়েছে ও অনেকের কাছে শুনেছে, পাকা টসটসে হিমসাগর আম অনেক সুস্বাদু হয়। বইতে আরো পড়েছে এই জাতের আম অনেক মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হয়, কিন্তু খেয়ে দেখেনি কখনো। সে বই-পুস্তকে যত বিবরণই পড়ুক, যত প্রশংসাই শুনুক, পাকা আমের সত্যিকার স্বাদ সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্তু কিছুই জানতে পারছে না। মস্তিষ্কে অনুভূতি তখনই বাস্তব হবে যখন ঐ অনুভূতি সম্পর্কে মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

চিত্রঃ এখানের সবকটি ফলের স্বাদের অনুভূতি কি আপনার আছে? ছবিঃ Visual Encyclopedia of Fruits

তবে আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করতে পারি না অন্যরা সেই অনুভূতি ঠিকই অনুভব করতে পারে। এমনও অনুভূতি থাকতে পারে যার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। এমনও হতে পারে দূরের কোনো গ্রহে এমন কোনো এলিয়েন আছে যাদের মস্তিষ্কে আমাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো অনুভূতি কাজ করছে। কে জানে কী অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক অনুভূতি খেলা করছে তাদের মস্তিষ্কে।

তথ্যসূত্র

লেখাটি The Magic of Reality: How we know whats really true, D. Richard, Free Press, New York, 2011 এর প্রথম অধ্যায় what is reality? What is magic? এর প্রথম অংশের ভাবানুবাদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং প্রয়োজনীয় ছবি যোগ করা হয়েছে।

 

মানুষের স্মৃতিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণের পথে বিজ্ঞান

ভাবুন তো, আমাদের যদি স্মৃতি না থাকত তাহলে কী হতো? একটা ঘটনা ঘটার পরে আমরা আর তা কোনো দিনও মনে করতে পারতাম না। সুস্বাদু বিরিয়ানী খাবার পরে ২য় বার আর তা কখনোই খেতে চাইতাম না। কারণ সেই বিরিয়ানী খাওয়ার কোন স্মৃতিই যে আমাদের মস্তিষ্কে নেই। কিংবা নিজের প্রেমিক বা, প্রেমিকাকেই কিছুক্ষণ পর চিনতে পারতাম না। অর্থাৎ, স্মৃতি যে আমাদের জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ তা আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি। আর বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের সেই স্মৃতিকেই নিয়ন্ত্রণের পথে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতেই তারা আমাদের অতীতের কোনো স্মৃতিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হবেন কিংবা কোনো মিথ্যা স্মৃতিকে আমাদের মস্তিষ্কে সত্য হিসেবে ঢুকিয়েও দিতে পারবেন।

পথের শুরুটা হয়েছিল কার্ল ল্যাশলি নামের একজন বিখ্যাত মনোবৈজ্ঞানিকের হাত ধরে। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, আমাদের স্মৃতিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের কোষে কিছু নির্দিষ্ট বিন্যাসে সংরক্ষিত হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের এই অঞ্চলের কোষের যে সমাবেশ তাকে এনগ্রাম বলে। মস্তিষ্কের এই অংশে পরিবর্তন দেখা যায় যখন আমরা কোন কিছু শিখি আবার মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে যখন আমরা কোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন ধরনের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের সেই নির্দিষ্ট নিউরন কোষগুলোর মাঝের সংযোগগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। যখন আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্মৃতিগুলোকে মনে করার চেষ্টা করে তখন আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশটি আগের সেই সন্নিবেশে উজ্জ্বিবীত হয়।

কার্ল ল্যাশলি; image source: en.calameo.com

ল্যাশলি তার জীবনভর গবেষণায় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, আমাদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অংশের টিস্যু নষ্ট করে দিলে আমাদের স্মৃতিরও কিছু অংশ সারা জীবনের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি তার এই মতবাদ প্রমাণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অসাধারণ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি ইঁদুরদের একটি গোলকধাম বা, গোলকধাঁধা থেকে কীভাবে বের হতে হয় এর উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন এবং তারপর তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ নষ্ট করে দিচ্ছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন তিনি যদি স্মৃতির সেই নির্দিষ্ট অংশ ধ্বংস করতে সক্ষম হন তবে ইঁদুরগুলো তাদের জানা পথ ভুলে যাবে এবং আর গোলকধাম থেকে বের হতে পারবে না। কিন্তু এরপরও ইঁদুরদের মস্তিষ্কের ঠিক কোথায় তাদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে তা তিনি বের করতে পারছিলেন না। ল্যাশলী তার সারা জীবন গবেষণার পরেও তার এই মতামতের পক্ষে কোনো প্রমাণ জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালের দিকে এসে ল্যাশলি পরাজয় মেনে নেন এবং তার নতুন মত প্রকাশ করেন। নতুন করে তিনি বলেন, আমাদের স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কের ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশে নয় গোটা মস্তিষ্কেই ছড়িয়ে থাকে।

image source: newscientist.com

ল্যাশলির ব্যর্থ গবেষণার প্রায় ৫০ বছর পর এসে টরোন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী শিলা জোসেলিন এক দল ইঁদুরের উপর চালানো একটি পরীক্ষার ফলাফল দেখে বিভ্রান্ত হন এবং ল্যাশলির মতবাদের দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য হন। ইঁদুরের মস্তিষ্কের এক পাশে অ্যামিগডালা নামক অংশে এমন কিছু কোষ রয়েছে যা তাদের স্মৃতির সাথে সংযুক্ত। জোসেলিন দেখলেন অ্যামিগডালা অংশের মাত্র কিছু কোষের বিন্যাস পরিবর্তনে ইঁদুরের স্মৃতিশক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

ইঁদুরগুলোকে একটা নির্দিষ্ট শব্দ শোনানোর পরে ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হতো। এরপর একদল ইঁদুরের অ্যামিগডালা অংশের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল। আরেক অংশের উপর এই পরিবর্তনের কাজ করা হয়নি। দেখা গেলো, যে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের কোষে পরিবর্তন করা হয়েছিল তারা এই ভয়ের স্মৃতি খুব ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। কিন্তু অন্য ইঁদুরগুলোর ক্ষেত্রে এই উন্নতি দেখা গেলো না।

image source: thepsychreport.com

এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলো যে একটি নির্দিষ্ট অংশে থাকে এ ব্যাপারে জোসেলিন একটি আশার আলো দেখতে পেলেন। কিন্তু একটি সত্যিকারের প্রমাণ জোগাড় করতে তার প্রায় ১০ বছর সময় লেগে গেলো।

২০০৯ সালে এসে জোসেলিন এবং তার দল একদল ইঁদুরের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কোষ ধ্বংস করে দিয়ে তাদের মস্তিষ্ক থেকে কিছু স্মৃতি চিরদিনের জন্য মুছে দিতে সক্ষম হলেন। অবশেষে ল্যাশলির মস্তিষ্কের এনগ্রাম অঞ্চলের খোঁজ শুরুর ১০০ বছরের বেশি সময় পর এসে স্নায়ুবিজ্ঞানী জোসেলিন সেই অঞ্চল খুঁজে পেলেন।

শিনা জোসেলিন; image source: quantamagazine.org

জোসেলিনের দলের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল এক ধরণের আণবিক যন্ত্র, যা নতুন স্মৃতির সাথে যে নিউরন কোষগুলো উদ্দীপ্ত হত সেগুলোকে চিহ্নিত করতে সক্ষম ছিল।

শব্দ শোনার পর এবং ইলেক্ট্রিক শক দেয়ার আগে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশ উদ্দীপ্ত হয়। সেই অঞ্চলটাকেই খুঁজে বের করল ল্যাশলি এবং তার দল। এরপর ইঁদুরের মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলের কোষগুলোকে মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু অন্যান্য কোষগুলোকে আগের মতই রাখা হলো। দেখা গেল ইঁদুরগুলো আর শব্দ শুনে বিচলিত হচ্ছে না। তাদের শব্দ শোনার সাথে সাথে ভয়ের যে অনুভূতির স্মৃতি তা হারিয়ে গেছে।

এরপর আরো উন্নত পরীক্ষাও এসব ইঁদুরদের উপর চালানো হয়েছে। এনগ্রাম অঞ্চলের কোষের কাজ বিশেষ পদ্ধতিতে বন্ধ এবং পুনরায় চালু করে দেখা হয়েছে। এমনকি ইঁদুরদের স্মৃতি শুধু ধ্বংস করতেই বিজ্ঞানীরা সক্ষম হননি, তাদের মস্তিষ্কে মিথ্যা স্মৃতি ঢুকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা সাফল্য পেয়েছেন।

স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণের পথে এই এগিয়ে চলা একই সাথে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ এবং অন্যদিকে খুবই ভীতিজনক। এ ধরনের প্রযুক্তি এতদিন শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতেই দেখা যেত, যেখানে এই প্রযুক্তি কখনো সুখের সন্ধানে আবার কখনও ধোঁকা দিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এ ধরনের গবেষণা বিভিন্ন স্মৃতিজনিত রোগের চিকিৎসা বা, মাদকাসক্তির চিকিৎসায় অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে গবেষকরা আশাবাদী।

Featured image: humanbrainfacts.org

গোঁফ কেটে স্ট্রোকের চিকিৎসা

স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার পর সুস্থ্য হতে কতদিন লাগবে কিংবা আদৌ সুস্থ হবেন কি না তা ঠিক আগে থেকেই বলা যায়না। কিন্তু কিছু কিছু কার্যকলাপ যদি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে সুস্থ করতে পারে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন মু লি উদ্ভাবন করেছেন যে, ইঁদুরের গোঁফ ছোট করে দিলে তারা স্ট্রোক থেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত সুস্থ হয়। তিনি বলেছেন “এটাই প্রথম গবেষণা যাতে মগজের বিশেষ কিছু অংশকে পুনর্বিন্যাসের প্রতি সংবেদনশীল করা গেছে।”

তাদের পরীক্ষায় লি ও তার দল ইঁদুরের মস্তিষ্কের সামনের ডান পায়ের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রক অংশে কৃত্রিমভাবে স্ট্রোক ঘটান। এরপর অর্ধেক সংখ্যক ইদুরের গোঁফ ছোট করে ৮ সপ্তাহ রাখেন।

image source: flickriver.com

দেখা গেল ছোট গোঁফের ইদুরগুলো ৫ সপ্তাহের মধ্যে নিরাময় লাভ করলো এবং ডান পাটিকে সম্পুর্নরূপে ব্যবহার করতে শুরু করলো। অন্যদিকে লম্বা গোঁফের ইদুরগুলোর ৭ সপ্তাহে পুরো সুস্থ্য হয়নি আর কখনোই ডান পা কে ঠিক মত ব্যবহার করতে পারেনি।

ছবি তুলে জানা গেছে ছোট গোঁফের ইঁদুরের মস্তিষ্কের রিম্যাপিং ঘটেছে। যেই অংশ আগে গোঁফ থেকে আগত স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতো সেটা এখন সামনের পায়ের স্নায়ু নিয়ন্ত্রনের কাজও করছে। এটা অন্য ইদুরগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু হয়নি। যখন গোঁফ পুনরায় বড় হলো, রিম্যাপ হওয়া অংশ একই সাথে পা এবং গোঁফের স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতে পারছে।

লি বলেন, অন্ধ প্রাণি কিংবা মানুষের ক্ষেত্রে যা ঘটে, রিম্যাপিং আসলে সেটাই। যখন চোখ থেকে কোন সংকেত আসেনা তখন তার জন্য সংরক্ষিত মস্তিষ্কের অংশ শব্দ, ভাষা কিংবা গণিতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

লি আশা করেন এই নতুন অনুধাবন রোগীদের জন্য নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজে দেবে।