কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হবে মানুষের মস্তিষ্ক

ইলন মাস্ক এমন একটি প্রযুক্তি জন্য কাজ করছেন যার মাধ্যমে মানুষের ব্রেন সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করা যাবে। এই প্রযুক্তি এরকম হবে না যে মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সাথে প্লাগ ইন করা হলো। এখানে ব্যবহার হবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট। মস্তিষ্ক থেকে নির্গত তরঙ্গকে সিগনাল হিসেবে গ্রহণ করা এবং তা কম্পিউটারে প্রেরণ করা হচ্ছে ঐ হ্যালমেটের কাজ।

image source: concarez.com

তেমনই কম্পিউটারও তরঙ্গ হিসেবে সিগনাল প্রেরণ করবে যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট গ্রহণ করে মস্তিষ্কের উপযোগী করে নেবে। ফলাফল, কম্পিউটার এবং মস্তিষ্ক একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

যদি সত্যিই এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হয় তাহলে এর ফলাফল মানবজাতির জন্য অনেক কিছু বয়ে আনবে। তবে এই প্রযুক্তির প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য ছিল মস্তিষ্কের মাধ্যমে কোনো কাজ করা। যেমন প্রতিবন্ধীরা হাত পায়ের সাহায্য ছাড়াই কোনো কিছু নাড়ানো, খাওয়া, মস্তিষ্কের মাধ্যমে কথা বলা, মস্তিষ্কের সাহায্যে গাড়ি বা যানবাহন চালানো সহ আরো অনেক কিছু। ধরে নেয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক কিছুই সম্ভব, যা আগে মানুষ সম্ভব বলে ভাবতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

www.technewsworld.com/story/Elon-Musk-Plans-to-Build-a-Human-AI-Interface-84415.html

রোবটেরও কি মানুষের মত অধিকার থাকা উচিত নয়?

সায়েন্স ফিকশন সিনেমায় প্রায়ই দেখে থাকি, রোবট নিজ থেকে চিন্তা করতে পারছে এবং বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। কখনো মানুষের উপকার করছে আবার কখনো সংগ্রাম করছে মানুষের বিরুদ্ধে। যদি এমন হয় যে, বাস্তব জগতেও রোবট এভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে, নিজেই নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে কেমন জটিলতার জন্ম হবে?

ইতিমধ্যে গত বছর ইউরেপিয়ান পার্লামেন্টে এই বিষয়ে সভা বসেছিল। সেখানে রোবটের ব্যাপারে আইনি ধারা প্রণয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যে আইনের সাহায্যে বুদ্ধিদীপ্ত রোবট বা “ইলেকট্রনিক ব্যক্তি”কে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। যত দিন যাচ্ছে রোবটগুলো উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। এগুলো এখন আর স্রেফ একটি যন্ত্র বা মেশিন নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হওয়া সাধারণ যন্ত্রের চেয়েও উপরের কাতারে উঠে এসেছে রোবট।

সাধারণ রোবটে কোনো কারিগরি ত্রুটি থাকলে সেটার দায়ভার সেই রোবটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায়। কিন্তু যেসব রোবট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন, আশেপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে তথ্য নিয়ে নিজে সেটার সাথে মানিয়ে চলতে পারে বা পরিস্থিতি মোতাবেক নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে; তাদের দ্বারা কোনো ক্ষতি হলে সেটার দায় কে নেবে?

শুধু প্রোগ্রামিং সফটওয়্যারের উপর দোষ চাপানো যাবে না। কারণ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে প্রোগ্রামিং এখন দুর্বোদ্ধ ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। যেখানে একটি রোবট নিজে বুদ্ধি খাটিয়ে ত্রুটিপূর্ণ বা ক্ষতিকর কিছু করে বসছে সেখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে দোষারোপ করা অন্যায়।

আর ঠিক এখানেই রোবটকে শুধুই একটি যন্ত্র হিসেবে না ভেবে ‘ইলেকট্রনিক ব্যক্তি’ হিসেবে বিচার করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। যেখানে রোবটের এরকম কার্যকলাপের জন্য দায়ী থাকবে রোবটটির মালিক ও রোবট নিজে।

image source: express.co.uk

উন্নত কম্পিউটারের জনক অ্যালান টিউরিং অনেক আগেই এক ধরনের টেস্ট করার প্রস্তাব রেখেছিলেন যেখানে একজন মেধাবী ব্যক্তি ও বুদ্ধিদীপ্ত কম্পিউটারকে মুখোমুখি অবস্থানে রাখা হবে এবং দেখা হবে কম্পিউটারটি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়া ও পাল্টা প্রশ্ন করার মাধ্যমে মানুষটিকে বোকা বানিয়ে ফেলতে পারে কিনা। তখনকার সময় এরকম টেস্ট করার পরিকল্পনা অলীক কল্পনা মনে হলেও আজকের দিনে এটা আর অলীক কল্পনা নয়।

ইতিমধ্যে এমন কিছু কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে যেগুলো ভিডিও ফাইলে নিজ থেকে শব্দ সংযোজন করতে পারে এবং সেই শব্দ এতটাই নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত হয় যে যেকোনো মানুষ বোকা বনে যেতে বাধ্য।

একটি রোবট তৈরি হয়েছে যেটা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ক্যাপচা সমাধান করতে পারে নিমিষেই। আরেকটি রোবট আছে যেটা মানুষের হাতের লেখা হুবহু নকল করতে পারে। পোকার খেলায় পৃথিবীর কয়েকজন সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এরকম রোবটও আছে। ভাবা যায়?

এখানেই শেষ নয়, সামনে রোবটগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা হবে যেগুলো ব্যথা, বেদনা পর্যন্ত অনুভব করতে পারবে। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে রোবটকে নিছকই যন্ত্র হিসেবে গণণা করা যে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, সেটা বলাই বাহুল্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউই-সুয়েন বলেছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষ রোবটের দুনিয়ার বাস করতে শুরু করবে। জাপানের অর্থমন্ত্রানালয় ইতিমধ্যে রোবট পরিচালনার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে নীতিমালা প্রণয়ণ করে ফেলেছে।

এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, রোবটকে যদি যন্ত্র হিসেবে না ধরা হয় তাহলে কি ব্যক্তি হিসেবে ধরা হবে? রাষ্ট্রে তাদের পদমর্যাদা কী হবে? রোবট যদি সত্যিকার অর্থেই মানুষের মতো বুদ্ধিদীপ্ত ও সাবলীল হয়ে ‘ইলেকট্রনিক ব্যক্তি’ হিসেবে গড়ে ওঠে সেক্ষেত্রে হয়তো তারা মানুষের মতো বিভিন্ন অধিকার পাবে। যেমন, অর্থ উপার্জন করা, নিজের খুশিমতো চাকরি নেয়া ও ছেড়ে দেয়া, ট্যাক্স দেয়া, কর্মঘণ্টা অনুযায়ী কাজ করা, আইনি সহায়তা পাওয়া ইত্যাদি।

এ ব্যাপারে ইউরেপিয়ান পার্লামেন্টে ভোট অনুষ্ঠিত হবার কথা। ভোটের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, অদূর ভবিষ্যতে এরকম রোবোটাধিকারের ফলে সমগ্র আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইন্স্যুরেন্স পলিসিতেও প্রচুর জটিলতা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র

https://theconversation.com/robot-rights-at-what-point-should-an-intelligent-machine-be-considered-a-person-72410

featured image: sciencenewsforstudents.org

মস্তিষ্কের নকশা

মানব মস্তিষ্ক একটি বিস্ময়। এটি সব ধরনের অনুভূতি ধারণ করতে পারে। সারাজীবন ধরে স্মৃতি সংরক্ষণ করতে পারে এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সাড়া দিতে পারে। কীভাবে মস্তিষ্ক এ কাজগুলো করে সে ব্যাপারে আমরা খুব কমই জানি। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করতে আমরা কি পুরো মস্তিষ্কের একটি ডায়াগ্রাম বানাতে পারি যেখানে প্রত্যেকটি নিউরন এবং সিন্যাপ্স তারের মতো পরিষ্কারভাবে চিত্রায়িত হবে? এটা কি সম্ভব?

তার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মস্তিষ্কের কার্যক্রম নির্ভর করে নিউরনগুলোর সংযোগের উপর। বিভিন্ন স্তরের নিউরনের সংযোগ একটি একক সত্ত্বা হিসেবে কাজ করে। নিউরনের এই নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন কানেকটম (Connectome)।

মানব মস্তিষ্কের কানেকটমকে বৃহৎ অথবা আণুবীক্ষনিক কোনো স্কেলেই মাপা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণা এখন অনেক দূর এগিয়েছে। The Human Connectome Project-এ মোটামুটি ১,০০০ মানুষের মস্তিষ্কের Connectome ম্যাক্রো স্কেলে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার বা মায়েলিন শীথ দ্বারা মোড়ানো স্নায়ুতন্তুর Connectome নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। এই কাজে ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং পদ্ধতি বা MRI ব্যবহার করা হয়।

২২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৬০ জন মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, যারা ভালো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে (যেমনঃ উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি) তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগও বেশ উন্নত হয়।

অপরদিকে নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যারা (যেমনঃ ধুমপান, মদ্যপান, উগ্র আচরণ ইত্যাদি) তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংযোগ আগের দলের তুলনায় তেমন উন্নত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় এটি ভবিষ্যত আচরণ সম্পর্কে ধারণা করার একটি মাধ্যম হতে পারে। কিংবা কোনো মাদকদ্রব্যের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব কেমন তাও জানা যেতে পারে Connectome এর সাহায্যে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার বিশ্ববিখ্যাত গবেষক Jeff Lichtman। তিনি হিস্টোলজি (টিস্যু বিষয়ক বিজ্ঞান)-র উপর একসময় একটি কোর্স শুরু করেছিলেন। এ কোর্সের ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ করার সময় বিভিন্ন রোগাক্রান্ত টিস্যু নিয়ে গবেষণা করেন।

তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন অটিজম, সাইজোক্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অস্বাভাবিকতার কোনো শারীরিক লক্ষণ নেই। কিন্তু যদি ক্ষুদ্র টিস্যু স্তরে পর্যবেক্ষণ করা যায় তবে প্রদাহ কিংবা বিবর্ণতার মতো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ এ অসুখগুলোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষ পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিকতা নিরূপণ করা সম্ভব।

মানব মস্তিষ্ক অন্যান্য যেকোনো অঙ্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে জটিল। এটিকে শুধু বিস্তৃত করে দেখলেই চলে না, এটিকে বুঝতেও হয়। মস্তিষ্ক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে যেখানে একটি স্নায়ুকোষের সাথে হাজারো স্নায়ুকোষের সংযোগ স্থাপিত হয়।

চিত্রঃ ডেনড্রাইটের সংযোগের ক্লোজ আপ চিত্র।

Lichtman প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সময় মানব শিশু এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, শিশু বড় হবার সাথে সাথে স্নায়ুতন্ত্র নতুনভাবে সজ্জিত হয়। তিনি এটিকে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে চিহ্নিত করতে চাইলেন। কিন্তু দেখা গেলো, এতগুলো স্তর চিহ্নিত করতে গেলে যে পরিমাণ রঙের দরকার সে পরিমাণ রঙই নেই।

তবে মানুষের বেলায় করা না গেলেও এ পদ্ধতিতে একটি প্রাণীর সম্পূর্ণ Connectome চিহ্নিত করা গিয়েছিল। প্রাণীটি roundwarm, যেটির মাত্র ৩০২ টি নিউরন রয়েছে। গবেষকেরা তারপর ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের প্রচেষ্টা শুরু করলেন।

Lichtman এবং তার ২০ জন সহকর্মী মিলে ইঁদুরের Connectome নির্ণয়ের নতুন একটি পদ্ধতি তৈরি করলেন- নিউ ইমেজিং টেকনোলোজি। এটি আসলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ন্যানোস্কেল পর্যায়ে ব্রেইন ইমেজিংয়ের একটি পদ্ধতি। তারপর তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পরীক্ষা করেন এবং অ্যাক্সন ও ডেনড্রাইটের মধ্যে অপূর্ব এক নেটওয়ার্ক খুঁজে পান। Lichtman ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা নিরূপণে এ পদ্ধতি অনেক কাজে দিবে।

Connectome এর ডায়াগ্রাম বানানোর মুল প্রেরণা ছিল মস্তিষ্কে কত স্মৃতি জমা আছে তা জানার চেষ্টা। Lichtman এর মতে, জীবনের সব অভিজ্ঞতাই মস্তিষ্কে জমা রয়েছে কিন্তু এ স্মৃতিগুলো আসলে মস্তিষ্কে কী রূপে জমা আছে তা এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তিনি ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের এ ডায়াগ্রাম বানানো সম্ভব হলে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

বিশাল তথ্যসম্ভার

এতকিছু না হলেও, মস্তিষ্কের ডায়াগ্রাম তৈরি করা সম্ভব হলে এটি মস্তিষ্ক সম্পর্কে না জানা অনেক তথ্যের বিশাল সম্ভার দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রতি ঘনমিলিমিটার স্থানেই প্রায় দুই টেরাবাইটের সমান তথ্য থাকা সম্ভব!

খুব মজার একটি ব্যাপার হলো, সম্পূর্ণ পৃথিবীর জন্য গুগল ম্যাপে যে পরিমাণ তথ্য রয়েছে তা মোটামুটি ২০ পেটাবাইট অর্থাৎ ২০৫০০ টেরাবাইট। মানব মস্তিষ্ককে সামগ্রিকভাবে এক মিলিয়ন ঘনমিলিমিটারের একটি বস্তু কল্পনা করলে আর প্রতি ঘনমিলিমিটারে ২ টেরাবাইত করে তথ্য থাকলে একজন মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের পরিমাণ হতে পারে ২ মিলিয়ন টেরাবাইট বা ২ হাজার পেটাবাইট বা ২ এক্সাবাইট! এমনকি ৩০২ টি নিউরনযুক্ত roundwarm এর ক্ষেত্রেও এ তথ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ টেরাবাইট। প্রকৃতিতে খুব শৃঙ্খলার সাথে প্রত্যেকটি প্রাণীর সকল কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণও মূলত মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্য সমাহার।

দৃষ্টিভঙ্গী যদি সীমিত হয় তবে বিশাল জিনিস কল্পনা করাও কঠিন হয়। মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা তেমনই বিশাল। আর ধীরে ধীরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত থেকে বিশালতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে হঠাৎ করেই বিশাল সীমানা পার করাটা যেকোনো দিক দিয়েই ক্ষতিকর। মস্তিষ্কের এ বিশাল তথ্যসম্ভার যেকোনো মানুষের কল্পনা থেকেও অনেক বেশি জটিল। আমরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারি তবে তার ফলাফল এখনো আমাদের অজানা। এর জন্য আরো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র

http://gizmag.com/connectome-wiring-diagram-human-brain/39659/

featured image: bigthink.com

শীত ও গ্রীষ্মে ভিন্নভাবে কাজ করে মানুষের মস্তিষ্ক

একটি নতুন গবেষণা বলছে আমাদের মস্তিষ্ক একেক ঋতুতে একেকভাবে কাজ করে। এই গবেষণার সাথে যুক্ত গবেষক গিলস ভেনডেওয়ালের ভাষ্যে, মস্তিষ্কের কার্যকলাপের চলমান প্রক্রিয়া ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন। বেলজিয়ামের গবেষকরা ২৮ জন মানুষেকে নিয়ে বিভিন্ন ঋতুতে এই পরীক্ষাটি করেন।

পরীক্ষায় প্রতিবার একজন ব্যক্তি ৪/৫ দিন শুধুমাত্র একটি গবেষণাগারে কাজ করেন। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকেন। এরপর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা হয়। তাদের কর্মদক্ষতা, কাজের প্রতি মনোযোগ বজায় রাখা, তথ্য সংগ্রহ ও তুলনা করার দক্ষতা, স্মৃতিতে তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখা হয়।

গবেষকরা দেখতে পান বিভিন্ন সময়ে মানুষের কর্মদক্ষতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু দেখা যায়, এই গবেষণায় কাজগুলো সম্পাদন করতে ‘নিউরাল কস্ট’ ও মস্তিষ্কের কার্যাবলির প্রক্রিয়ার পরিবতর্ন হয়। এটি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রকম হয়। যেমন, মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা মনোযোগ বজায় রাখার সমানুপাতিক।

বছরের জুন মাসের দিকে, অর্থাৎ শীতকালে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে উপরে। অন্যদিকে ডিসেম্বর মাসে গ্রীষ্মের সময়ে মস্তিষ্কের কাজের মাত্রা থাকে নিচের দিকে। আবার আরেকটি ব্যাপার, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার পর্যায়, স্মৃতিতে ধারণক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। কার্যক্ষমতা শরতে থাকে শীর্ষে এবং বসন্তে থাকে সর্বনিম্নে।

পূর্ববর্তী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মানুষের দৈনন্দিন কার্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, শীতকালে মানুষের ক্যালরি গ্রাস করার ঝোঁক গ্রীষ্মকালের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জিনের সক্রিয়তা ঋতুর সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষের মেজাজ এবং ঋতুর মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে। শীতকালে মস্তিষ্কের সিজনেবল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) এর লক্ষণ দেখা যায়।

গবেষক ভেনডেওয়ালে বলেন, যদিও গবেষকরা মস্তিষ্কের সক্রিয়তা এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে মানুষের মেজাজ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক এই নতুন গবেষণায় পরীক্ষা করেননি, কিন্তু যারা SAD-এ ভুগছেন, তাদের ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের জ্ঞান সম্বন্ধীয় কার্যাবলীর প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষকরা আরো বলেন, নতুন গবেষণায় পাওয়া ঋতু পার্থক্যের সাথে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পরিবর্তনের পেছনে দায়ী মূল কারণ ও প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়। তবে আগের গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নিউরোট্রান্সমিটার যেমন সেরোটোনিনের মাত্রা এবং সেই সাথে মস্তিষ্কের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রোটিনের মাত্রা ঋতু পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়।

গবেষকরা এই নতুন গবেষণা থেকে উপনীত হন যে, ঋতুর পরিবর্তনের সাথে মস্তিষ্কের সক্রিয়তার বৈচিত্রময় পরিবর্তন হয়। এই নতুন গবেষণাটি ৮ ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তথ্যসূত্রঃ লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/53643-your-brain-works-differently-seasons.html

featured image: edition.cnn.com

প্যারিডোলিয়াঃ এখানে ওখানে মানুষের মুখ

চাঁদে, বিকৃত আকৃতির সবজিতে, পোড়া টোস্টে মুখাবয়ব দেখার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বার্লিন ভিত্তিক একটি সংঘ স্যাটেলাইট ইমেজারির মাধ্যমে পুরো গ্রহে এমন মানব-সদৃশ মুখাবয়বের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষ ‘প্যারিডোলিয়া’ শব্দটিই কখনো শুনেনি। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকেরই এর সম্মুখীন হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে।

কেউ চাঁদের দিকে তাকিয়ে যদি দুইটি চোখ, একটি নাক ও একটি মুখ দেখতে পায় তবে সে ‘প্যারিডোলিয়া’ ব্যাপারটি অনুভব করতে পারবে। ওয়ার্ল্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, এটা হচ্ছে কোনো ছাঁচ বা অর্থ উপলব্ধি করার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ক্ষমতা। প্রকৃতপক্ষে যার সেখানে কোনো অস্তিত্ব নেই।

পূর্ব রাশিয়ার ম্যাগাডান প্রদেশের ল্যান্ডস্কেপে মুখমন্ডল

জার্মান ডিজাইন স্টুডিও প্যারিডোলিয়ার ব্যাপারে আরো খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিচ্ছে যেটা হয়তো এ নিয়ে করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সিস্টেমেটিক প্রকল্প। তাদের ‘গুগল ফেসেস প্রোগ্রাম’ পরবর্তী কয়েকমাস গুগল ম্যাপে প্যারিডোলিয়ার জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে।

গুগল ফেসেস সম্পূর্ণ পৃথিবীকে বিভিন্ন কোণ থেকে কয়েকবার স্ক্যান করবে। এখনো পর্যন্ত প্রোগ্রামটি রাশিয়ার দূরবর্তী প্রদেশ ম্যাগাডানে একটি ভীতিজনক প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছে যা লোমশ নাসারন্ধ্রযুক্ত একটি মুখাবয়ব। এটি অ্যাশফোর্ড নামক স্থানে অবস্থিত।

আলাস্কার পর্বতের মধ্যেও এটি ম্যাঙ্গি প্রাণীর মুখ-সদৃশ প্যারিডোলিয়ার সন্ধান পেয়েছিল। তবে এমন অজায়গায় এসব মুখাবয়বের দেখা পাওয়ার ঘটনা এই প্রথমই ঘটেনি। এই সপ্তাহে, ইউএস ডিপার্টমেন্ট স্টোর ‘পেনি’ একটি কেটলি বিক্রি করে। সামাজিক সংবাদ মাধ্যম রেডিটে প্রকাশিত হওয়ার পর।


মাদার তেরেসা সদৃশ এই খাবারের আইটেমটির নাম ‘নান-বান’।

এই কেটলির মধ্যে থার্ড রেইকের নেতার চেহারার সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। গত বছর e-bay’তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের মতো দেখতে একটি চিকেন নাগেট ৮১০০ ডলার বিক্রি হয়েছিল। এক দশক আগে, ২০০০০ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল যেখানে একটি চাপাতির মধ্যে আগুনে দগ্ধ যীশু খ্রিষ্টের প্রতিমা দেখা গিয়েছিল। কিছু দর্শনার্থী সেখানে প্রার্থনাও করেছিল।

একটি টাম্বলার সাইট আছে, যারা মূলত হিটলাদের সাথে সদৃশ আছে এমন জিনিস খুঁজে থাকে। ২০১১ সালে একটি সুন্দর সমতল বাড়ির ছবি প্রকাশ করেছিল যার ছাদের অংশটুকু ছিল একদম হিটলারের চুল আঁচড়ানোর ঢংয়ের অনুরূপ, আর এর দরজার ঢালাই ঠিক যেন হিটলারের চির পরিচিত গোঁফের স্মারক।

অ্যামেরিকান একটি ঘটনা। ডায়না ডায়জার নামে একজন মহিলা একবার স্যান্ডউইচ খেতে গিয়ে সেই স্যান্ডউইচের মধ্যে যিশু খ্রিস্টের মাতা ম্যারিকে দেখতে পান। প্রথমবার কামড় দাওয়ার পরে স্যান্ডউইচের মধ্যে ম্যারির প্রতিমা ভেসে ওঠে। স্যান্ডউইচের বাকি অংশ এক দশকেরও বেশি সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখে। ডায়জার বিক্রির জন্য স্যান্ডউইচটিকে e-bay’তে নিলামে তোলে যেখানে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন আগ্রহী ব্যক্তির হিড়িক পড়ে যায়। স্যান্ডউইচটি শেষ পর্যন্ত ২৮০০০ ডলারে বিক্রি হয়।

ডায়না ডায়জার এবং তার পবিত্র স্যান্ডউইচ।

গুগল ফেসেস ডিজাইনার সেডরিক কাইফার এবং জুলিয়া লবও প্যারিডোলিয়া দ্বারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে ভাইকিং ১ অরবিটারের তোলা বিখ্যাত ‘ফেস ইন মার্স’ দেখার পর এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করার পর তারা ভাবতে শুরু করেন কীভাবে প্যারিডোলিয়ার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটি একটি যন্ত্র দিয়ে জেনারেট করা যায়। তারা ভাবেননি তাদের প্রজেক্টটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারবে।

কিন্তু রাশিয়ান তান্দ্রায় এবং ব্রিটেনে তাদের তোলা মুখাবয়বের ছবিগুলো খুব দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল। কাইফার বলেন, এসব দেখে মনে হয় প্যারিডোলিয়ার সাথে আকর্ষণীয় কিছু ব্যাপার জড়িত।

চিত্রঃ ‘দ্যা ফেসেস ইন মার্স ১৯৭৬’ এর ছবি। পাশে সাম্প্রতিক কালের আরেকটি ছবি।

কিন্তু কেন মানুষ সেসব বস্তুর মধ্যে বিভিন্ন মুখাকৃতি দেখতে পায় যেগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছুর দাগ বা প্রলেপ অথবা বিকৃত আকৃতির পাথর ছাড়া আর কিছুই না? এদের মধ্যে কিছু কিছু হলো বিবর্তনের পথে মানুষের ক্রমবিকাশের ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য।

মানুষ জন্মগতভাবে মুখাবয়ব শনাক্ত করার ক্ষমতা পেয়ে থাকে। কয়েক মিনিট বয়সী একটা শিশু এমন কিছুর দিকে তার দৃষ্টি চালনা করবে যার মধ্যে মুখ-সদৃশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এমন কিছুর দিকে সে তাকাবে না যেখানে ঠিক একই বৈশিষ্ট্যসমূহ অবিন্যস্তভাবে থাকবে।

পরিচিত বা চেনা কিছু খোঁজার প্রবণতা এসেছে সেই আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকেই। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উদাহরণ হতে পারে প্রস্তর যুগের মানব। ধরা যাক একটা ঝোপের পাশে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে কোনো এক প্রস্তর যুগের মানুষ ভাবছে, ঝোপের ওপাশে খচমচে আওয়াজ সৃষ্টিকারী প্রাণীটি কি আসলে একটা বাঘ, নাকি অন্য কিছু?

আপনি বেঁচে যাবেন যদি আপনি ভেবে নেন যে ওখানে একটা খড়গ-দন্ত বাঘ রয়েছে এবং তাই তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালান। তা না করলে অন্যথায় আপনি সেই প্রাণীর দুপুরের খাবার হিসেবে পরিণত হতে পারেন।

চিত্রঃ পাতার মধ্যে মোনালিসা অথবা ভার্জিন মেরি, চকোলেটের মধ্যে ম্যাডোনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যারিডোলিয়া হচ্ছে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সিস্টেমের প্রভাব। মস্তিষ্ক ক্রমাগতভাবে চক্রাকারে বিভিন্ন রেখা, আকৃতি, রঙ এবং পৃষ্ঠতলের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। তবে অর্থ আরোপ করলে এদের অন্যরকম গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন দীর্ঘমেয়াদী কোনো শিক্ষা বা অভিজ্ঞতার সাথে এগুলো মিলানো। এই পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যাবার ফলই হচ্ছে প্যারিডোলিয়া।

চিত্রঃ গুয়াডালুপ রদ্রিগেজ টেক্সাসে একটি ক্যাফেটেরিয়া বেকিং ট্রে’র মধ্যে দেখতে পায় ভার্জিন মেরিকে।

প্যারিডোলিয়া মানুষের আশা-প্রত্যাশার ফলাফলও হতে পারে। টোস্টের মধ্যে যীশুকে দেখতে পাওয়াই বলে দেয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধীয় ব্যাপারগুলো নিয়ে কী ঘটছে। এটা হচ্ছে ইল্যুশনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, এটি খুব সহজে আপনার মনে একটা ব্যাপারকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করতে পারে।

কিন্তু কেন মানুষ এক টুকরো খাবারে পাওয়া মুখাবয়ব একটু দেখার জন্য তীর্থযাত্রা করে অথবা সেটা কিনার জন্য হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করে? এর কারণ আধুনিক যুগের মানুষেরাও দৈব ঘটনায় বিশ্বাস রাখে। কেউ যদি দৈব ঘটনায় বিশ্বাস করে তাহলে প্যারাডলিয়া খুবই গুঢ় অর্থপূর্ণ হতে পারে। যার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করা কোনো ব্যাপারই না।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, http://www.bbc.com/news/magazine-22686500

মানুষের অন্যান্য ইন্দ্রিয়

পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা মানুষের স্নায়বিক উত্তেজনাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। কিন্তু এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় ছাড়াও মানুষের আরও বেশ কিছু স্নায়ু রয়েছে যা আমাদের অগোচরে কাজ করে। ধরুন, আপনি ডাইনিং রুমে চেয়ারে বসে রাতের খাবার খাচ্ছেন। চেয়ারে বসা, খাদ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি গ্রহণ এবং তা সম্পর্কে অনুভূতি ও খাদ্যের চিবানোর শব্দ – এই সব কিছুই আপনার পঞ্চ ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, অন্যান্য কিছু স্নায়ু দ্বারা এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়সমূহ নিয়ন্ত্রিত।

আমাদের পরিচিত ইন্দ্রিয়সমূহ; image source: qsstudy.com

সাধারণত চেয়ারে বসা এবং খাদ্যের গ্রহণের বার্তা মস্তিষ্কে প্রেরণ করা সেন্সরি স্নায়ুর কাজ। খাওয়ার সময় আপনার দৃষ্টি কখনোই অঙ্গ-প্রতঙ্গের দিকে থাকে না। পেশির কাজ এবং হাঁটুর অবস্থানের দিকেও আপনার মনোযোগ থাকে না। কিন্তু আপনার মনোযোগের অজান্তেই এদের কাজগুলো সংঘটিত হয়। আপনি যখন খাবার টেবিলে যান, তখন সেন্সরি স্নায়ু অভ্যন্তরীণ কর্ণকে খাদ্যের গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে সাবধান করে দেয়।

খাদ্যের গ্রহণের সময় একগুচ্ছ সেন্সরি স্নায়ু একগুচ্ছ নসিসেপ্টারকে (এক ধরনের স্নায়ু যা সেন্সরি স্নায়ু হতে বার্তা গ্রহণ করে) খাদ্যের তাপমাত্রার অবস্থা সম্পর্কে বার্তা প্রেরণ করে এবং নসিসেপ্টার এই বার্তা মুখের অভ্যন্তরের স্নায়ুগুলোকে প্রেরণ করে। একই সময়ে রক্ত এবং রক্তরস কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশ অনুযায়ী কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অক্সিজেনের অনুপাত নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের অজান্তেই এই কাজগুলো সম্পন্ন হয়।

আমরা যখন খাদ্য গ্রহণ করি,তখন মস্তিষ্ক সেন্সরি স্নায়ুকে নির্দেশ দেয় যাতে খাদ্য পাকস্থলীতে প্রবেশ করে এবং খাদ্য পরিপাক ক্রিয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে পাকস্থলী পূর্ণ হতে থাকে এবং পরিপাককৃত খাদ্য যখন ক্ষুদ্রান্তে প্রবেশ করে, তখন এক প্রকার হরমোন নিঃসৃত হয় যা আমাদের খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত রাখে। পরে এই খাদ্য পরিপাক হয়ে রেচন পদার্থে পরিণত হয় এবং ক্ষুদ্রান্ত হতে মূত্রথলিতে জমা হয়। মূত্রথলি পরিপূর্ণ হলে,তা নিষ্কাশনের জন্য সেন্সরি স্নায়ু মস্তিষ্কে বার্তা প্রেরণ করে।

প্রকৃতপক্ষে,পঞ্চ ইন্দ্রিয় আমাদের সজ্ঞানে কাজ করে। অথচ আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অন্যান্য স্নায়ু কর্তৃক আমাদের অজান্তেই সংঘটিত হয়।

featured image: doctorsimpossible.com