আন্ডারগ্র্যাড সমাপনী বর্ষঃ যেভাবে থিসিস লিখবেন

চতুর্থ বর্ষের শুরুতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে হয় তা হলো, তারা থিসিস করবে নাকি প্রজেক্ট? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর-

১) কে আপনার রিসার্চ সুপারভাইজার হবেন?

২) আপনি আসলে পাস করার পর কী করতে চান?

আপনি যদি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার কথা চিন্তা করেন তাহলে চোখ বন্ধ করে আপনার থিসিস করতে নেমে যাওয়া উচিত। যদিও আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কেও মৌলিক গবেষণা আশা করে না, এমনকি বাইরের দেশগুলোতেও আন্ডারগ্র্যাডের শিক্ষার্থীরা সাধারণত প্রজেক্টই করে। কিন্তু আপনি যদি থিসিস করেন এবং তা যদি কোনোভাবে কোনো জার্নাল কিংবা ভালো কনফারেন্সে পাবলিশ করতে পারেন তাহলে তা উচ্চ শিক্ষার জন্য আপনার যাত্রাকে অনেকখানি সহজ করে দেবে।

তবে এর মানে এই না যে, যারা প্রজেক্ট করেন তারা খুব সহজেই পার পেয়ে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার প্রজেক্টের কাজটিও যথেষ্ট জটিল এবং বড় হতে পারে। সহজ কথায় প্রজেক্ট ও থিসিসের পার্থক্য এখানে উল্লেখ করছি।

ধরা যাক, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই নেবেন। এর জন্য প্রথমে আপনাকে লাইব্রেরিতে গিয়ে অনেক সময় লাগিয়ে শেলফ থেকে বইটি খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তা নিয়ে কাউন্টারে জমা দিতে হবে এবং অতঃপর একজন ব্যক্তি রেজিস্টারে বইয়ের নাম, আপনার নাম, কবে নিলেন এবং কবে ফেরত দেবেন ইত্যাদি এন্ট্রি করে আপনাকে সবশেষে বইটি হাতে তুলে দিলেন।

অথচ এই পুরো ব্যাপারটা কিন্তু এক ক্লিকেই হয়ে যেতে পারত। আপনার মোবাইলে লাইব্রেরির একটা অ্যাপ থাকবে, যেখানে আপনি বইয়ের নাম লিখে সার্চ দিলে আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত বইটি লাইব্রেরি থেকে নেয়া যাবে কিনা তা দেখাবে।

এরপর আপনি বইটি যে নিতে চান তা অ্যাপের কোনো নির্দিষ্ট অপশনে গিয়ে জানিয়ে দিলে সাথে সাথেই লাইব্রেরিয়ানের কাছে নোটিফিকেশন চলে গেল যে, অমুক শিক্ষার্থী বইটি নিতে আসবে। তৎক্ষণাৎ লাইব্রেরিয়ান বইটি আপনার নামে রেজিস্টার করে সামনের কাউন্টারে দিয়ে রাখলেন যাতে আপনি আসা মাত্রই বইটি পেয়ে যেতে পারেন। এই অ্যাপ ডিজাইনের যে কাজ- এটাই একটা প্রজেক্ট।

আরেকজন ছাত্র চিন্তা করল, সামনের বছর থেকে যেহেতু সম্মিলিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে তাই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর জন্য নতুন ধরনের একটি এনক্রিপশন সিস্টেম উদ্ভাবন করা দরকার। সে টেক্সট এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার না করে প্রথমে প্রশ্নপত্রগুলাকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করবে এবং তারপর সেই ইমেজকে এনক্রিপ্ট করবে। এই যে কোনো টেক্সট ফাইলকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করে তা এনক্রিপ্ট করার নতুন ধারণা এবং তার সম্ভাব্য সমাধান– এই কাজটিই হলো থিসিস।

যদিও থিসিসের উদাহরণটি আন্ডারগ্র্যাড ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটু কঠিন হয়ে গেল, তবে সাধারণত তাদের কাছ থেকে কোনো যুগান্তকারী সমাধান আশা করা হয় না। সাধারণত কোনো একটি ছোট সমস্যা দিয়ে তাদেরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট থিওরির উপর ভিত্তি করে সমাধান করতে বলা হয়।

তবে থিসিস কিংবা প্রজেক্ট যে কাজই আপনিই করুন না কেন, দেখা হয় আপনার মাঝে অনুসন্ধানমূলক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা আছে কিনা এবং কোনো সমস্যা সমাধান করার যে ধাপগুলো আছে তা আপনি শিখতে পারছেন কিনা।

থিসিসের পূর্বপ্রস্তুতি

ভালো থিসিস করার পূর্বশর্ত হলো রিসার্চ পেপার পড়ার অভ্যাস করা। পাশাপাশি তত্ত্বীয় বিষয়গুলো নিয়ে নিজের ধারণা ঠিক করে নেয়া। থিসিস টপিক ঠিক হওয়ার পর অন্তত তিন মাস টপিক রিলেটেড রিসার্চ পেপারগুলো খুঁজে বের করে পড়া উচিত। শুরুর দিকে হয়তো কোনোকিছু বোধগম্য হবে না, কিন্তু এই তিন মাসে অন্তত যেসব পেপার পরবর্তীতে আপনার থিসিস লিখতে আপনাকে সাহায্য করবে তা চিহ্নিত করা যায়।

কাউকে যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং করতে হয়, তাহলে তার উচিত পুরনো পেপার খুঁজে বের করা। এ ধরনের পেপারগুলোতে ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন এবং তার সল্যুশনগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এজন্য পেপার পড়ার সময় রেফারেন্সগুলো চেক করা উচিত।

সাধারণত একই ধরনের ইক্যুয়েশন ব্যবহার করলে তা আগের প্রকাশিত হওয়া কোন রিসার্চ থেকে নেয়া হয়েছে তা সবাই উল্লেখ করে। এবং যেসব রিসার্চার এসব ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন তৈরি করেছিলেন, তাদের পুরনো পেপারগুলোতে খুবই বিস্তারিতভাবে তা দেয়া থাকে।

সেইসাথে জানতে হবে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথনের বেসিক প্রোগ্রামিংয়ের খুটিনাটি। বর্তমান সময়ে প্রোগ্রামিং জানাটা ইংরেজি জানার মতোই অত্যাবশ্যকীয়। আপনি যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং কিংবা সিমুলেশন ভিত্তিক কাজ করেন, তাহলে আপনাকে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথন ব্যবহার করে সেই কাজ করতেই হবে। আর যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজও করেন, সেখানেও কোনো ইক্যুয়েশন দিয়ে আপনার এক্সপেরিমেন্টাল রেজাল্টের ডাটা ফিটিং করার পদ্ধতিও আপনাকে জানতে হবে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর তেমন কোর্সওয়ার্ক করানো হয় না। তাই একাডেমিক রাইটিংয়ের বেশিরভাগ নিয়মকানুনই আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়। এজন্য ইউটিউব হতে পারে সবচেয়ে আদর্শ মাধ্যম। শুধু একাডেমিক রাইটিং লিখে সার্চ দিলেই অনেক ভিডিও আপনি পাবেন।

এরপর যেসব ভিডিওর ভিউ অনেক বেশি কিংবা যেসব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার অনেক বেশি, সেগুলো আপনি ফলো করতে পারেন। coursera.org কিংবা edx.org এর মতো সাইটেও একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর অনলাইন কোর্স পাওয়া যায়- আপনি চাইলেই যেকোনো একটি কোর্স শেষ করে ফেলতে পারেন।

কীভাবে ডাউনলোড করবেন রিসার্চ পেপার

রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সাই-হাব (Sci-hub)। সাই-হাব মূলত শুরু হয় আলেক্সান্দ্রা এলবাকিয়ানের হাত ধরে। তিনি একজন রাশিয়ান সফটওয়ার ডেভেলপার এবং নিউরোটেকনোলজি গবেষক। তিনি একাডেমিয়ার দস্যু রানী হিসেবে পরিচতি। তার নিজ হাতে তৈরি সাই-হাব থেকে বিনামূল্যে ৬৪.৫ মিলিয়নের অধিক একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল সরাসরি ডাউনলোড করা যায়, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের ছাত্র-ছাত্রী এবং গবেষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যেহেতু এ সাইট থেকে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার ইলেকট্রনিক পেমেন্ট মেথডকে এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি যেকোনো একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল নামানো যায়, তাই বিভিন্ন সময় এর ডোমেইনকে ব্লক করে রাখা হয়।

তবে আপনি যদি কোনোভাবেই সাই-হাবের কার্যকরী ডোমেইনটি খুঁজে না পান, তাহলে সেক্ষেত্রে libgen.io এই সাইটে গিয়ে Scientific Articles সিলেক্ট করে সার্চ বারে যে পেপারটি নামাতে চান তার শিরোনাম লিখে দিয়ে সার্চ করলেই তা আপনাকে সাই-হাবে নিয়ে যাবে, এবং সেখান থেকে আপনি পেপারটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

কীভাবে শুরু করবেন থিসিস পেপার লেখা

ধরে নিলাম, আপনার থিসিস সম্পর্কিত যাবতীয় কাজ প্রায় শেষের দিকে, আপনি এখন থিসিস লেখায় পুরাপুরি মনোনিবেশ করতে চান। তাই শুরুতেই কোনো কিছু লেখার আগে একটি স্ট্রাকচার সাজিয়ে নেয়া ভাল। আন্ডারগ্র্যাডের থিসিসের কাজ যেহেতু খুব ছোট পরিসরে হয়, সেক্ষেত্রে আপনার থিসিসের স্ট্রাকচারটি হতে পারে এরকম।

১) অ্যাবস্ট্রাক্ট (Abstract)

অ্যাবস্ট্রাকটকে বলা হয় আপনার পুরো গবেষণা কাজের সারমর্ম। এটি ৩০০-৩৫০ শব্দের মধ্যে হলেই ভালো। যদিও এটি সবার শুরুতে থাকে, কিন্তু এটি সবার শেষে লেখাই উত্তম। মানে মূল রচনা লেখা শেষ হলে তারপর অ্যাবস্ট্রাকট লিখবেন। সাধারণত একজন পাঠক আপনার থিসিস পেপার পড়বে কিনা তা নির্ভর করে আপনার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্টে তিনি নিম্নোক্ত পাঁচ প্রশ্নের উত্তর সে পাচ্ছে কিনা তার উপর।

  • আপনি এই গবেষণায় কী ধরনের কাজ করেছেন?
  • আপনার এই গবেষণার কাজের পেছনে কী কী কারণ ছিল? অন্যকথায়, আপনি কী ধরনের সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন?
  • আপনি কোন প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করেছেন?
  • আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো কী ছিল?
  • আপনার গবেষণালব্ধ ফলাফল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আপনি যদি চান মানুষ আপনার গবেষণাটি সম্পর্কে জানুক, তাহলে আপনার উচিত এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অ্যাবস্ট্রাক্ট-এ গল্প আকারে লেখা।

২) ইন্ট্রোডাকশন (Introduction)

সাধারণত এটি অ্যাবস্ট্রাক্টের তুলনায় বেশ বড় হয় এবং তাতে অবশ্যই আপনার থিসিসের ব্যাকগ্রাউন্ড, কী ধরনের কাজ এ পর্যন্ত হয়েছে তার আলোচনা, কোন কোন সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি, আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন, কীভাবে কাজ করবেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে ইন্ট্রোডাকশন শেষ করতে পারেন।

৩) লিটারেচার রিভিউ (Literature Review)

মূলত এ অংশে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন তা নিয়ে পূর্বে বিভিন্ন সময়ে যেসকল উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এবং কী ধরনের সমস্যার সমাধান করা এখনও বাকি আছে এবং আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন তার বর্ণনা থাকা উচিত।

আপনি চাইলে এই সেকশনটি আলাদাভাবে লিখতে পারেন, আর যদি আপনার হাতে লেখার সময় কম থাকে, তাহলে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে তা ইন্ট্রোডাকশনের সাথে জুড়ে দিতে পারেন। তবে সেই সাথে যেসকল একাডেমিক পেপার কিংবা বই থেকে তথ্য নিয়েছেন তা অবশ্যই বিস্তারিত রেফারেন্স সহকারে উল্লেখ করতে হবে।

৪) মেথড (Method)

এই অংশে মূলত আপনি কী ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে আপনার গবেষণার সমস্যাটির সমাধান করেছেন তার বর্ণনা থাকবে। আপনার যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয় তাহলে এক্সপেরিমেন্টের বিশদ বর্ণনা, থিওরিটিক্যাল মডেলিংয়ের কাজ হলে আপনি যেসব ইকুয়েশন সমাধান করে আপনার কাজটি করেছেন তার বিশদ ব্যাখ্যা থাকা চাই।

৫) রেজাল্ট (Result)

এই সেকশনে মূলত আপনি আপনার গবেষণা থেকে কী কী উত্তর খুঁজে পেলেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকা উচিত। আপনি সবসময় চেষ্টা করবেন আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো গ্রাফ আকারে রিপ্রেজেন্ট করতে। এতে করে যিনি ফলাফলগুলো দেখবেন তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো একটি টেবিল থেকে ডাটা পড়ার চেয়ে একটি গ্রাফ পড়া এবং বোঝা অনেক সহজ।

৬) ডিসকাশন (Discussion)

এই সেকশনে মূলত আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সম্পর্কে আপনার মতামত, ফলাফল থেকে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, আপনার গবেষণার ফলাফলে কোনো অপ্রত্যাশিত ফলাফল আছে কিনা, থাকলে কী কী কারণে তা হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সেই সাথে আপনার কাজের সীমাবদ্ধতা কী ছিল, ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে এবং সেই সাথে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন সেই টপিকে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে তা নিয়ে আপনার মতামত দিতে পারেন।

৭) কনক্লুশন (Conclusion)

এই সেকশনটিতে মূলত আপনি বলবেন আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল কী ছিল এবং তা থেকে আপনি সমস্যাটির সমাধানের যাবতীয় সকল প্রকার উত্তর পেয়ে গিয়েছেন; আর সেই সাথে আপনার কাজটি কেন এবং কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা পুনরায় সংক্ষেপে বলে লেখা শেষ করতে পারেন।

সবশেষে থাকবে রেফারেন্স সেকশন, যেখানে আপনি আপনার থিসিস লেখার সময় যেসকল একাডেমিক পেপার থেকে তথ্য কিংবা উপাত্ত নিয়েছেন ক্রমানুসারে সেই সকল পেপার এর বিস্তারিত শিরোনাম উল্লেখ থাকবে, যাতে কেউ চাইলে সহজেই সেই পেপারটি খুঁজে পায়।

থিসিস লেখার সহজীয়া পন্থা

থিসিস লেখার সময় অনেকেই ইন্ট্রোডাকশন লেখা দিয়ে শুরু করেন। কিন্তু আমার মতে শুরুতে আসলে মেথড, রেজাল্ট এবং ডিসকাশন এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা উচিত। কারণ আপনি কী কাজ করেছেন এবং আপনার গবেষণার ফলাফল কী সে সম্পর্কে আপনার চাইতে ভালো আর কেউ জানে না।

এই তিনটি সেকশনে পুরোটাই আপনার নিজের কাজের বর্ণনা থাকে। তাই এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা খুব সহজ হয়। আর যেহেতু সময় অনেক বেশি পাওয়া যায়, কাজেই এক্সপেরিমেন্টাল ডাটা এবং গ্রাফগুলো ভালোভাবে প্রেজেন্ট করার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

যদি পাবলিকেশন কোয়ালিটির ফিগার চান, তাহলে Origin Pro কিংবা KaleidaGraph ব্যবহার করতে পারেন। আমরা যদিও সবাই MATLAB ব্যবহার করি, কিন্তু উপরের দুটি সফটওয়্যার আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ। এদের ইমেজ কোয়ালিটি বেশ ভালো।

অনেকেই থিসিসের সবশেষে Appendix সেকশনে নিজেদের ম্যাটল্যাবের কোড দিয়ে থাকেন (যদি কাজের প্রয়োজনে লাগে)। কখনো কখনো এতে আপনার কাজ চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আপনার কোডটিকে চাইলে কেউ একটু উন্নত করে আরো ভালো রেজাল্ট জেনারেট করে দেখা যাবে আপনার আগেই কোনো জার্নাল কিংবা কনফারেন্সে পেপার পাবলিশ করে ফেলেছে।

এই তিন সেকশন লেখা শেষ হলে আপনি ইন্ট্রোডাকশন এবং লিটারেচার রিভিউ লেখা শুরু করতে পারেন। এই দুই সেকশন নতুনদের জন্য লেখা বেশ কষ্টসাধ্য এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রচুর তথ্য ধার করে তা নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখতে হয়।

এই দুটো সেকশন শুরুর দিকে লিখতে গেলে হয়তো দেখা যাবে আপনার বেশিরভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে এবং বাদবাকী গুরুত্বপূর্ণ সেকশনগুলো লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। তাই এই দুই সেকশন শেষেই লিখুন, এবং খুব বেশি সময় না পেলে সংক্ষেপে শেষ করে দিন। আর সবশেষে লিখে ফেলুন কনক্লুশন।

এই হলো থিসিস লেখার খুটিনাটি। পরবর্তী পর্বে আপনার থিসিসটি কীভাবে জার্নালে কিংবা কনফারেন্সে পাবলিশ করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

যেভাবে হতে পারে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সমাপ্তি

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নাসার প্রেরিত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। নিঃসন্দেহে ২৬ বছর অনেক বড় একটা সময়। ২৬ বছর ধরে একটা যন্ত্র ঠিকঠাক মতো কাজ করে যাওয়াও খুব ইতিবাচক একটা লক্ষণ। তবে এটাও সত্য যে অন্যান্য যন্ত্রের মতো হাবল টেলিস্কোপও চিরস্থায়ী নয়। অনেকদিন ধরে টিকে আছে মানে এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শীঘ্রই এর ভগ্নদশা চলে আসছে। সময় থাকতে আগেভাগেই কিছু একটা করা উচিত।

স্পেস শাটল ডিসকভারির মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল হাবল টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। কেন একটা টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করতে হবে? অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা অনুভব করে আসছিলেন ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া চিত্র অনেক ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বায়ুমণ্ডল দূষিত। মহাকাশের পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় না।

১৯৪৬ সালের দিকে লাইম্যান স্পিটজার নামে একজন বিজ্ঞানী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে একটি টেলিস্কোপ স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও তার সুবিধাদির কথা বর্ণনা করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তখন থেকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে টেলিস্কোপ স্থাপনের ব্যাপারটি জোর পায়। কিন্তু প্রযুক্তি অনুকূলে হয় না। অনেকদিন পরে ১৯৯০ সালে এই চাহিদা বাস্তবে রূপ নিলো, হাবল বায়ুমণ্ডলের বাইরে স্থাপিত হলো।

চিত্রঃ উৎক্ষেপণ মুহূর্তে হাবল টেলিস্কোপ

কক্ষপথে স্থাপনের পর থেকেই হাবল মহাকাশ সম্বন্ধে একের পর এক অসাধারণ তথ্য ও প্রমাণাদি দিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে একটি সমস্যা হয়েছিল, ছবি ঝাপসা আসছিল। পরে ১৯৯৩ সালে মহাকাশচারীদের নিয়ে টিম গঠন করে এর ত্রুটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের পাশাপাশি আরো উন্নতও করা হয়। এই টেলিস্কোপকে ব্যবহার করে মহাকাশ ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এর মাঝে আছে মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রমাণ, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব ইত্যাদি।

সময়ের সাথে সাথে যেন এটিও বয়স্ক হয়ে গেছে। এই কিংবদন্তীর সমাপ্তি নিয়েও ভাবনা চিন্তা করার সময় চলে এসেছে। হাবল টেলিস্কোপকে অপারেট করার দল আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যক্ত করেছেন যে, হাবল ২০২০ সাল পর্যন্ত ত্রুটিহীনভাবেই সেবা দিয়ে যাবে। এমনকি ২০২০ সালের পরেও আরো বেশ কয়েক বছর ভালোভাবে সেবা দেবার সম্ভাবনা আছে।

এ মুহূর্তে হাবল কেমন অবস্থানে আছে? অল্প স্বল্প ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে? হাবল মিশন অফিসের প্রধান কেন সেমব্যাচ জানিয়েছিলেন, হাবল এখন চমৎকার অবস্থায় আছে। নিকট ভবিষ্যতে হাবলের কোনো সমস্যা হবে বলেও তিনি মনে করেন না।

কীসের এদিক সেদিক হতে পারে?

  • নিয়ন্ত্রণের কৌশলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। হাবলের তিনটি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড আছে। তিনটিই আগের প্রযুক্তির। এখনকার প্রেক্ষিতে বলা যায় এগুলোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
  • নিয়ন্ত্রণ সেন্সরগুলো ঠিকমতো অপরিবর্তিত থাকতে হয়, কিন্তু এরা উচ্চ বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চিত্রঃ কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ
  • তবে আশার কথা হচ্ছে এটা নিয়ে ভাবার আরো অনেক সময় আছে। কম করে হলেও আরো ২০২০ সাল পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ করবে হাবল টেলিস্কোপ। যদি এর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলেও এর ধ্বংস হতে অন্তত ২০৩০ সাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।
  • রি-একশন হুইল ঠিকঠাকমতো কাজ না করলে হাবল তার উপজোগীতা হারাবে। হাবলের চারটি রি-একশন হুইল আছে। কাজ চালানোর জন্য কমপক্ষে তিনটি হুইল সক্রিয় থাকতে হয়। হাবলের একটি হুইল নষ্ট হয়ে গেলে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। তখন অকেজো হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিত যে ২০০৯ সালে নাসার প্রেরিত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল হুইল নষ্ট হয়ে যাবার জন্যই। ২০১৩ সালে এর চারটির মাঝে দুটি হুইল নষ্ট হয়ে যায়। (তবে কেপলার একেবারেই অকেজো হয়ে যায়নি, K2 নামে নতুন একটি মিশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কেপলারকে।)
  • কম্পিউটার ও প্রোগ্রাম সংক্রান্ত কোনো ত্রুটির ফলেও হাবলের সমাপ্তি ঘটতে পারে। সমস্ত সিস্টেমের সাথে যুক্ত আছে এমন কোনো প্যানেলে ত্রুটি দেখা দিলে টেলিস্কোপের পুরো সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিবে। এর ফলে হাবল ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। এমনটা হওয়া খুব দুর্লভ কিছু নয়। তবে কর্তৃপক্ষ আশার কথা জানাচ্ছেন, হাবলের বেলায় এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা একদমই কম।
  • হাবল পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৫৬৮ কিলোমিটার উপরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণের কারণে এই দূরত্বের পরিমাণ কমছে। এভাবে দূরত্ব কমতে থাকলে এবং নিজের ক্ষতি করতে থাকলে ভাবতে হয় এটি আর কতদিন সুস্থ ও বৈজ্ঞানিকভাবে উৎপাদনশীল থাকবে? এই অবস্থায় দুটি কাজ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে প্রথাগত উপায়ে হাবলকে আরো নিচে নামিয়ে কোনো সমুদ্রের মাঝে নামিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত বিশেষ পদ্ধতিতে একে আরো উপরের স্তরে পৌঁছে দেয়া।

  • হাবল টেলিস্কোপকে নিয়ে যদি কোনো চিন্তাই করা না হয়, কোনো খোঁজ-খবর নেয়া না হয় তাহলে একদিন এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রবল ঘর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে একে শেষ হয়ে যেতে দিলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
  • তাই হাবলকে উপরে পাঠালে কিংবা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নীচে নামিয়ে আনলেই হবে ভালো একটা সমাধান। কিন্তু দুইটা উপায়ের যেটাই করা হোক না কেন তাতে একটা স্পেস মিশনের দরকার হবে। কিন্তু এখনকার প্রযুক্তির তুলনায় পুরাতন এই টেলিস্কোপটিকে আবারো অনেক ব্যয় ও ঝামেলা করে উপরের স্তরে পাঠানো হবে নাকি এই অর্থ, সময় ও শ্রম নতুন কোনো একটি স্পেস টেলিস্কোপের পেছনে দেয়া হবে তাও ভাবার বিষয়।

পাশাপাশি হাবলকে নিয়ে অন্যান্য বিকল্প চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। নাসার প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট জেমস ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-র সাথে হাবলের সমাবেশ ঘটানোর কথাও বলা হচ্ছে। জেমস ওয়েবার টেলিস্কোপ ছবি তুলবে অবলোহিত (Infrared) আলোকের চোখ দিয়ে, আর হাবল ছবি তুলে দৃশ্যমান আলোকের চোখ দিয়ে।

দৃশ্যমান আলোতে তোলা ছবি ও অবলোহিত আলোতে তোলে ছবি পরস্পর তুলনা করলে অনেক ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে হাবলের কিংবা জেমস ওয়েবারের একার তোলা ছবি থেকে উভয়ের তোলা ছবির সম্মিলিত রূপ অধিক পরিমাণ সঠিক তথ্য বহন করবে।

তথ্যসূত্র-স্পেস ডট কম, জিরো টু ইনফিনিটি (এপ্রিল ২০১৫) ও নাসা

যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারণা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। তবে ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতো যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারণা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতো না। তখন তারা ভেবে নিতো হয়তো অ্যান্টিবডি সম্পর্কেই এখনো তারা অনেক কিছু জানেন না, তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রম ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, আর উপেক্ষা করা গেল না। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ দানকৃত অঙ্গটি গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীরে লাগানো হয়, তখন সে অঙ্গের কোষকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় গ্রহীতার দেহে।

দেহে কোনো এন্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ঐ অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ গ্রহণ করে, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই, তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন যেন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইঁদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটি প্রত্যাখ্যান (Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবলো ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোনো আত্নীয়ের দেহে প্রবেশ করানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখে না। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটি একটি বড় সমস্যা ছিল বহু বছর। এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কিনা।

কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোনো পদ্ধতি খুঁজতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ কেউই জানতো না যে আসলে কী খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী! ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মুরগীর পরিপাকতন্ত্রের নীচের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। থলেটির নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস।

এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বোঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো। এ জিনিসটির প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস। আর পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

ব্রুস গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন (Bursectomy) এবং অপেক্ষা করলেন কী হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোনো পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন। যেহেতু মুরগিগুলোতে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নেই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গ-এর কিছু মুরগি দরকার পড়লো সে সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের অঙ্গ কর্তিত মুরগিগুলোই নিলেন।

কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করলো না। এ পর্যায়ে যে কেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কিন্তু এ দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরো কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথমবারের মতো বোঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতো না। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটি ইমিউনলজির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটির জন্য তৈরি ছিল না তখন।

স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স-এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এর খোজ পেলেন, সেটি হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

তাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখল যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ব্যতীত দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো।

অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মতো থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিল ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সির কেসগুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলেন। এক ধরনের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তবে তারা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে।

তাদের অবস্থা বার্সার ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয়, এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এসবকিছু অবশেষে বুঝালো যে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ (B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ।

মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো। এমন নামের ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

সাবমেরিনের ব্যাবচ্ছেদঃ যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ, সুন্দর ও মিষ্টি এই নামটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কানে রক্ত শীতল করা শব্দ। ১৫৬২ সালে রাজা পঞ্চম চার্লস-এর উপস্থিতিতে ২ জন গ্রিক প্রথম সাবমারসিবল (অর্ধডুবোজাহাজ)-এর মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। এটিকে দাঁড় টেনে চালাতে হতো। পরে ১৫৭৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ ব্রূনো আর ১৫৯৭ সালে স্কটিশ গণিতবিদ নেফিয়ার তাদের বইতে ডুবোজাহাজ নিয়ে কিছু আঁকিবুকি করেন। পরবর্তীতে ১৮ শতকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হয় ডুবোজাহাজের।

গঠনপ্রণালী

সাবমেরিনের নাক থেকে শুরু করা যাক। সাবমেনিরের কাঠামোর চিত্রে যেটা Bow নামে দেখা যাচ্ছে ওটাই নাক। এটা সাবমেরিনের সামনের দিক। সাবমেরিন শুধু সামনের দিকে এবং স্বল্প গতিতে পেছনের দিকেও যেতে পারে। পাশাপাশি যেতে পারে না।

নাকের নিচে Sonar Dome নামে একটি অংশ আছে যা দিয়ে জাহাজটা তার আশেপাশের বস্তুর আকৃতি, দূরত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেয়। এদের মাঝে আছে চেইন লকার নামে একটি অংশ যা ডুবোজাহাজকে কোথাও নোঙর করতে ব্যবহৃত হয়।

এদের পেছনেই থাকে টর্পেডো কক্ষ (Torpedo Room)। সাধারণত এখানে ৩ টি টর্পেডো নিক্ষেপক (launcher) থাকে। পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড বাড়তি টর্পেডো রাখার জায়গাও থাকে। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকেও এমন একটি ঘর থাকে। পার্থক্য হলো ঐ ঘরে ২ টি নিক্ষেপক থাকে। তবে উন্নত মডেলে এর পরিমাণ বাড়তে পারে।

টর্পেডো ঘরের পেছনেই অফিসারদের থাকবার জায়গা (Quarters)। এর নিচে থাকে ডুবোজাহাজের ব্যাটারির স্থান। তার নিচেই থাকে জাহাজের চালিকাশক্তির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি। এই তেলের ঘরটি আসলে ওই প্রস্থচ্ছেদের সাবমেরিনের পুরো অংশ জুড়েই খোলসের মতো থাকে। তেল ডুবোজাহাজের ভারসাম্যে রক্ষাতেও অবদান রাখে।

অফিসারদের ঘরের পেছনেই থাকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room)। এখান থেকে পুরো সাবমেরিনকে পরিচালনা করা হয়। এর সাথেই থাকে রেডিও রুম আর উপরে থাকে কনিং টাওয়ার। টাওয়ারের অংশ থেকে রেডিও এন্টেনা ও পেরিস্কোপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্যারিস্কোপের মাধ্যমে পানির নিচে থেকেই উপরের স্তরের জাহাজ বা অন্যান্য বস্তুর অবস্থান দেখে নেয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিচেই পাম্প রুম। যা দিয়ে পানি কমিয়ে বাড়িয়ে ডুবোজাহাজকে ডুবানো বা ভাসানো হয়। এর সাথে লাগোয়া খোলস ঘরটি হচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংক। সাধারণত সাবমেরিনের মডেল ও আকার ভেদে চারটি বা তার অধিক ব্যালাস্ট ট্যাংক থাকে। সাবমেরিনের দুই পাশে দুটি ট্যাংকের মতো অংশ থাকে। এগুলো হচ্ছে ট্রিম ট্যাংক বা ভারসাম্য শোধন ঘর।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পেছনেই থাকে নাবিকদের থাকার কক্ষ (Mess) ও এর সাথে লাগোয়া কর্মচারীদের কক্ষ (Crew’s Quarters)। এদের নিচে একটি ব্যাটারি কক্ষ আছে। এর চারপাশে খোলসঘরে আছে তেল। এর পেছনেই ইঞ্জিন কক্ষ। মোট চার জোড়া ইঞ্জিন থাকে যারা তেল হতে শক্তি দিয়ে ডুবোজাহাজের পেছনের টারবাইন বা পাখা ঘোরায় এবং ব্যাটারী চার্জ করে। ব্যাটারীর চার্জ দিয়ে পানির নিচে নিঃশব্দে চলা যায়।

হালকালের কিছু সাবমেরিন নিউক্লিয়ার শক্তি দিয়ে চালনা করা হচ্ছে ফলে তারা পানির নিচে থাকতে পারে অনেক সময়। কিন্তু সমস্যা হলো এর ইঞ্জিন কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায় না। ফলে যুদ্ধে শতভাগ শব্দহীনতা এটা দিতে পারে না যা ডিজেল ইঞ্জিন চালিত পুরাতন ডুবোজাহাজগুলি দিতে পারে।

ইঞ্জিনরুমের পেছনেই ম্যানুভারিং রুম নামে একটি অংশ থাকে যেখান থেকে পুরো ডুবোজাহাজের যন্ত্রপাতির অবস্থা, বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক চালিকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকে রাডার নামে একটা বৈঠা থাকে যা দিয়ে এর গমন দিক নির্ধারণ করা হয়।

খোলসের ঘরগুলোয় যাবার জন্য ডুবজাহাজের উপরের কাঠামো (Deck Casing) হতে কিছু চাকতি আকৃতির দরজা থাকে। টর্পেডো রুম হতে বের হবার জন্যও এ ধরনের দরজা থাকে।

ডুবোজাহাজের কাঠামো সাধারণত এমন ধরনের লোহা সংকরে তৈরি হয় যেন তা পানির নিচে পানির চাপ সহ্য করতে পারে। সামনের দিকের আকৃতি এমন হয় যে তা যেন সহজেই পানি ভেদ করে এগুতে পারে।

সাবমেরিনের চলন পদ্ধতি

প্রথমেই সাবমেরিনের সামনের ব্যালাস্ট ট্যাংকে আল্প পানি প্রবেশ করানো হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে মাঝের দুটি ও পেছনেরটিতে পানি প্রবেশ করানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে ডুবা শুরু করলে ট্রিম ট্যাংক-এ পানি কম বেশি করে ডুবোজাহাজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়। ভাসবার সময় পাম্প হতে উচ্চ চাপের বাতাস প্রবেশ করানো হয় ব্যালাস্ট ট্যাংকে। তা দিয়ে ঠেলে পানিকে বের করে দেয়ার মাধ্যমেই এটা ভেসে ওঠে পানির ওপরে।

নাবিকদের জন্য প্রচুর রসদ, তেল ও সব ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পানিতে ডোবার পর Sonar ও রাডারের মাধ্যমে পথ চিনে গুটিগুটি ছন্দে এগোয় গুপ্তবাহন এই ডুবোজাহাজগুলো। হারিয়ে যায় সমুদ্রর অতলে কয়েক মাসের জন্য।

তথ্যসূত্র

মিলিটারি ডট কম, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া

featured image: bastion-karpenko.narod.ru

মহাকর্ষ যেভাবে শ্রোডিংগারের বিড়ালকে ধ্বংস করে

অনেকের কাছে বিড়াল বেশ আদুরে। পদার্থবিজ্ঞানেও একটি আদুরে বিড়াল আছে। পৃথিবীর আর সব বিড়ালের সাথে পার্থক্য এটাই যে এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গালভরা নাম- শ্রোডিংগারের বিড়াল। এই উপমা নিহিত বিড়ালটি পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার শাখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আচরণ বোঝাতে বর্ণনা করা হয়।

অস্ট্রিয় পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিংগার বিখ্যাত এই মানস-পরীক্ষণের ব্যাখ্যাকার। বিড়াল যদি কোয়ান্টাম তত্ত্বানুযায়ী আচরণ করে, তাহলে এটি একইসাথে একাধিক দশায় অবস্থান করবে। একইসাথে জীবিত এবং মৃত হিসেবে থাকবে। পর্যবেক্ষণ না করে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা সম্ভব না বিড়ালটি কোন দশায় আছে। এই ঘটনাটি অণু-পরমাণুর জগতে ঘটে, যা বাস্তব জগতের একটি বস্তু দিয়ে বোঝানো হয় কোয়ান্টাম জগতে এর আচরণ কেমন।

প্রাত্যহিক জীবনে এমন বিড়াল দূরে থাক, বিড়ালের লেজও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন পাওয়া যাবে না তার উত্তর কী? দৈনন্দিন পৃথিবীতে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন না দেখতে পাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কারণ হিসেবে আঙুল তুলেন পরিবেশে বিদ্যমান ঘটনার ব্যতিচারকে। সুপারপজিশন? এর মানে হলো কোনো বস্তু একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা।

ঘটনার ব্যতিচার হচ্ছে যখন দুটো ঘটনা একটি আরেকটিকে নাকচ করে দেয়। যখনই কোনো কোয়ান্টাম বস্তু কোনো বিক্ষিপ্ত বা ইতস্তত পরিভ্রমণরত কণার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে তখন প্রকৃতি কেবল একটি দশাকে বেছে নেয়। আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির আদলে কেবল একটি দশাই ফলাফল হিসেবে থাকে। বিড়ালের বাক্স খুলে ফেলা হলো মিথষ্ক্রিয়ার উপমা। বাক্স খোলামাত্র বিড়ালকে একটি দশায় পাওয়া যাবে, কিন্তু খোলার আগে কোনো দশাই নিশ্চিত নয়।

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যদি কোনো বৃহৎ বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারতেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে, এরপরও সেটি একটি দশায় গিয়ে ঠেকবে। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষকেরা বলেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কোয়ান্টাম সংলগ্নতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোথাও শ্রোডিংগারের বিড়ালের হয়তো একটি সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবী বা কোনো নিকট গ্রহে সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গবেষক ইগোর পাইকোভস্কি বলেন এর কারণ, মহাকর্ষ।

বিজ্ঞানের সেরা জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে পাইকোভস্কি[] এবং তার সহকর্মীদের এ ধারণা বর্তমানে গাণিতিক যুক্তিতর্কের অধীনে রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের পরীক্ষণ-পদার্থবিদ হেন্ড্রিক আলব্রিক্ট এর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার আশাবাদ করেন। তিনি এই গবেষণাপত্রের নিরীক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

অভিকর্ষ কীভাবে বিড়ালকে নাকচ করে দেয়?

সিনেমাপ্রেমী দর্শক যারা ইন্টারস্টেলার মুভিটি দেখেছেন তারা এই গবেষণাপত্রের মূলনীতির সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাছে যাওয়া যাক। যদি কোনো অতিকায় ভরবিশিষ্ট বস্তুর কাছাকাছি কোনো ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেটা খুব ধীরে চলবে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেবে।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায় অভিযাত্রীরা কৃষ্ণবিবরের কাছে এক গ্রহে অবতরণের পর সেখানকার এক ঘণ্টায় পৃথিবীতে সাত বছর পেরিয়ে যায়।[] শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সেখানকার সময়কে শ্লথ করে দিয়েছে। এই সময় শ্লথের বিষয়টি যন্ত্র-নিরপেক্ষ। কাঁটার ঘড়ি হোক, ডিজিটাল ডিসপ্লের ঘড়ি বা কোনো সিজিয়াম পরমাণুর কম্পন দিয়েই মাপা হোক সময়ের পরিমাপ শ্লথই পাওয়া যাবে।

বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত সূক্ষ্মতর স্কেলে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিকটে স্থাপিত কোনো অণু পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে দূরে স্থাপিত কোনো অণুর সাথে সময়ের ধীরলয় পাওয়া গেছে।

পাইকোভস্কির দল ধরতে পারে যে, স্থান-কালের উপর মহাকর্ষের প্রভাবে অণুর অন্তঃশক্তি প্রভাবিত হয়। অণুতে কণাসমূহের কম্পনের মাধ্যমে সময়ের সাপেক্ষে সেটা প্রকাশ পাবে। এবার আসছি আসল রাস্তায়- যদি কোনো অণুকে দুটো কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে রাখা যায়, এদের অবস্থান এবং অন্তঃশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বৈততাকে ভেঙে দেবে যাতে অণু একটি অবস্থান বা পথ বেছে নিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাহ্যিক কারণে অসঙ্গতি ঘটে থাকে কিন্তু এখানে অন্তঃকম্পন মিথষ্ক্রিয়া করছে অণুর নিজস্ব গতির সাথেই।

একটি বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা

উৎসের অসঙ্গতির কারণে কেউই এখনো এই প্রভাবকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। যেমন চৌম্বকক্ষেত্র, তাপীয় বিকিরণ এবং কম্পন- এই বিষয়গুলো গতানুগতিকভাবে মহাকর্ষের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে এরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াগুলোকে বিলীন করে দেয় মহাকর্ষের প্রভাবকে ছাপিয়ে। কিন্তু পরীক্ষণবিদরা চেষ্টা করতে আগ্রহী।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পরীক্ষণ-পদার্থবিদ মার্কাস আর্ন্ডট ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন পর্যবেক্ষণ করা যাবে কিনা। তিনি কণা-তরঙ্গ (দ্বৈত চরিত্র) ইন্টারফেরোমিটারের মধ্য দিয়ে এমন প্রক্রিয়ায় বড় আকারের অণু পাঠিয়েছেন যেন প্রতিটি অণু চলার পথে দুটো ভিন্ন পথ পায়। চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি অণু কেবল একটি পথেই পরিভ্রমণ করে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম অণু কার্যত উভয় পথেই পরিভ্রমণ করে এবং নিজের সাথেই ব্যতিচার ঘটায়। ছবিতে ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যসূচক তরঙ্গের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

চিত্র: জটিল ও বড় অণু ব্যবহার করে প্রাপ্ত ব্যতিচার

কোয়ান্টাম আচরণ ভেঙে দিতে মহাকর্ষের সক্ষমতা পরীক্ষায় অনুরূপ পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লম্ব ইন্টারফেরোমিটারের সাথে তুলনা করলে এক পথের সাথে অন্য পথের সাপেক্ষে সময়-প্রসারণের ফলে সুপারপজিশন অসঙ্গত হয়ে পড়বে। ইন্টারফেরোমিটার হচ্ছে ব্যতিচার (Interference) ব্যবহার করে দুটো আলোক রশ্মির সূক্ষ্ম মাপজোখ করার যন্ত্রবিশেষ।

গত বছর যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (যা খুবই সূক্ষ্ম) পাওয়া গিয়েছিল তা খুঁজে পেতেও ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছিল। মহাকর্ষের প্রভাব পেতে ইন্টারফেরোমিটারের আনুভূমিক সেট আপে সুপারপজিশন দেখা যেতে পারে। আর্ন্ডট ৮১০ পরমাণু বিশিষ্ট বড় অণু পর্যন্ত এই প্রভাব পরীক্ষা করেছেন।[]

বড় অণুগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাব পরীক্ষণে সুবিধাজনক। কেননা তারা অধিক সংখ্যক কণা ধারণ করে যারা অন্তঃশক্তিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সূক্ষ্মতর পরীক্ষণগুলোর সতর্কতাও রাখতে হয় তুঙ্গে। এ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে যে শুধু বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবককেই দমিয়ে রাখতে হবে তা নয়। তাদের পরীক্ষণে দুটো পথের দূরত্ব রাখা হয় মাইক্রোমিটার সীমায়, হয় এই সীমাকে মিটারে নিয়ে যেতে হবে নয়তো ১০ লক্ষ গুণ বড় অণু ব্যবহার করতে হবে। দুটো বিষয়ই একে অপরের প্রতিকূল বলে এক্সপেরিমেন্ট এগিয়ে নেয়া খুব চ্যালেঞ্জিং।

যদি মহাকর্ষের প্রভাব পৃথিবীতে কোয়ান্টাম আচরণের সীমা টেনে দিতে পারে, বড় বস্তুর জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.nature.com/news/how-gravity-kills-schr%C3%B6dinger-s-cat-1.17773

[২] http://interstellarfilm.wikia.com/wiki/Gargantua

[৩] http://pubs.rsc.org/en/Content/ArticleLanding/2013/CP/c3cp51500a

featured image: phys.org

উড়োজাহাজ যেভাবে ওড়ে

মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশে ওড়ার। একদিন আকাশে উড়তে শিখলো। তবে পাখির মতো নয়, এজন্য মানুষকে সাহায্য নিতে হয়েছে যন্ত্রের, যাদেরকে বলি আকাশযান। উড়োজাহাজের আবিষ্কার ছিল মানুষের জন্য যুগান্তকারী এক ঘটনা।

আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ বিভিন্ন রকমের আকাশযান তৈরি করেছে। এ আকাশযানগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। বায়ু অপেক্ষা ভারী এবং বায়ু অপেক্ষা হালকা। ঘুড়ি, বেলুন, এয়ারশিপ ইত্যাদি হচ্ছে হালকা আকাশযানের উদাহরণ। উড়োজাহাজ, রকেট, গ্লাইডার, ড্রোন ইত্যাদি হচ্ছে ভারী আকাশযানের উদাহরণ। বায়ু অপেক্ষা ভারী এমন আরেকটি আকাশযান হচ্ছে হেলিকপ্টার,যাকে আদর করে ডাকা হয় উড়ন্ত ফড়িং নামে। উড়ন্ত ফড়িং কীভাবে উড়ে তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

সামরিক বা বেসামরিক প্রয়োজনে এমন একটি আকাশযানের প্রয়োজন হয় যা সরাসরি আকাশে উড়তে পারবে এবং প্রয়োজনে আকাশে স্থির অবস্থায় ভাসতে পারবে,যা সাধারণ বিমানগুলো পারে না। এ চাহিদা থেকেই তৈরি করা হয় হেলিকপ্টার।

আজকাল বিভিন্ন সামরিক প্রয়োজনে, যেমন সেনা বা গোলাবারুদ পরিবহন,আকাশ থেকে নজরদারী, নিরাপত্তা বিধানের কাজে কিংবা বিশেষ সেনা অপারেশনে হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার শান্তিকালীন অবস্থায় মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ সরবরাহ কাজেও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিত্রঃ যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার

উড্ডয়ন কৌশল

এয়ারক্রাফটের মতোই হেলিকপ্টারও চার ধরনের বলের উপর ভিত্তি করে আকাশে ওড়ে। বল চারটি হচ্ছেঃ ১. লিফট, যা হেলিকপ্টারের উপর ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে; ২. থ্রাস্ট, যা হেলিকপ্টারের ওপর সম্মুখী বল তৈরি করে; ৩. ওজন, যা সরাসরি নিচের দিকে ক্রিয়া করে; ও ৪. ড্র্যাগ, যা হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে থ্রাস্টের বিপরীতে ক্রিয়া করে।

চিত্রঃ হেলিকপ্টারের ওপর ক্রিয়ারত চারটি বল

ওপরের দিকে একটি বিরাট আকৃতির পাখা থাকে, একে প্রপেলার বলা হয়। এতে ২ থেকে ৫ টি ব্লেড থাকে। ব্লেডগুলো বিশেষভাবে বাঁকানো থাকে। একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রপেলার ঘোরানো হয়। যখন ঘুরতে শুরু করে, তখন ব্লেডগুলো কৌণিকভাবে সমান্তরাল অবস্থায় ঘুরতে থাকে। ঘূর্ণনের ফলে আশেপাশের বাতাস সজোরে ব্লেডের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর পরবর্তী অবস্থা ব্যাখ্যা করে হয় নিউটনের বিখ্যাত তৃতীয় সূত্র। “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।”

বাতাস যখন সজোরে প্রপেলারের মধ্য দিয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, তখন নিউটনের তৃতীয় সূত্রানুসারে প্রপেলারের উপর উর্ধ্বমুখী সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োগ করে। ফলে প্রপেলারের সাথে সংযুক্ত হেলিকপ্টারটি উড়তে শুরু করে। তবে প্রপেলারের ব্লেডের বিশেষ আকারের জন্য এখানে বার্নলীর সূত্রও কাজ করে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ যে বৈশিষ্ট্যটি হেলিকপ্টারকে অন্য সব আকাশযান থেকে আলাদা করে রেখেছে তা হলো এর হোভারিং ক্ষমতা। হোভারিং বলতে হেলিকপ্টারের স্থির অবস্থায় আকাশে উড্ডয়ন করার ক্ষমতাকে বোঝায়। হেলিকপ্টার আকাশে যে কোনো উচ্চতায় স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারে এবং ঐ উচ্চতা থেকেই সরাসরি ডানে-বামে ও সামনে-পেছনে যেতে পারে। হোভারিং করার সময় হেলিকপ্টারের ওপর প্রযুক্ত ওপরের দিকের লিফট, এর নিচের দিকে ক্রিয়ারত ওজনের সমান থাকে এবং সম্মুখমুখী থ্রাস্ট, পশ্চাৎমুখী ড্রাগের সমান থাকে।

এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো হেলিকপ্টার কীভাবে সামনে-পেছনে, ডানে-বামে কিংবা উপরে-নিচে যায়। হোভারিং করা অবস্থায় যদি লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বল ও ওজন, ড্র্যাগের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে হেলিকপ্টারটি উপরের দিকে উঠে যাবে। আর যদি ওজন ও ড্রাগের লব্ধি বল, লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের তুলনায় বেশি হয় তাহলে হেলিকপ্টারটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকবে।

আকাশে স্থির অবস্থায় যদি হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে চায়, তাহলে হেলিকপ্টারের মেইন রোটর বা উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে ডানদিকে সামান্য বাঁকিয়ে দিতে হবে। এর ফলে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধি বলের দিক পরিবর্তন হবে এবং হেলিকপ্টারটি ডান দিকে যেতে থাকবে। একইভাবে প্রপেলারটিকে সামান্য বাম দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হেলিকপ্টারটি বাম দিকে যেতে থাকবে।

হোভারিং করা অবস্থায় সামনের দিকে যেতে হলে হেলিকপ্টারের উপরের প্রপেলারকে সামান্য সামনের দিকে বাঁকিয়ে দিলেই হবে। এতে লিফট ও থ্রাস্টের লব্ধির দিক পরিবর্তিত হবে এবং হেলিকপ্টারটি সামনের দিকে ছুটতে থাকবে। একইভাবে পেছনের দিকে যেতে চাইলে উপরের প্রপেলারটিকে সমান্তরাল অবস্থা থেকে সামান্য পেছনের দিকে বাঁকিয়ে দিতে হবে। এতে থ্রাস্ট দিক পরিবর্তন করে হেলিকপ্টারের সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে ক্রিয়া করে এবং থ্রাস্ট ও লিফটের লব্ধির দিক পরিবর্তনের ফলে হেলিকপ্টারটি পেছনের দিকে যেতে থাকে।

প্রপেলারকে বাঁকানোর কাজটি করা হয় কন্ট্রোল প্যানেলের একটি কন্ট্রোল স্টিকের সাহায্যে। কন্ট্রোল স্টিকটিকে ডানে নিলে প্রপেলার ডানে দিকে বেঁকে যায়, বামে নিলে বামদিকে বেঁকে যায়।

এয়ারক্রাফটের মতো হেলিকপ্টারে কোনো রাডার নেই। তাহলে হেলিকপ্টার দিক পরিবর্তন করে কীভাবে? এ কাজটি করা হয় এর পেছনের ‘টেইল’ এর সাথে সংযুক্ত আরেকটি ছোট প্রপেলারের সাহায্যে। এটি ‘এন্টি টর্ক প্রপেলার’ নামে পরিচিত।

হেলিকপ্টারের মূল প্রপেলার যখন ঘুরতে থাকে, তখন প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডিতেও একটি ঘূর্ণন বল তৈরি হয়। প্রপেলার যেদিকে ঘোরে, হেলিকপ্টারের মূল বডি সেদিকে ঘুরতে চায়। এ সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি দিয়ে। হেলিকপ্টারের লেজের শেষের দিকে অবস্থান করে এই প্রপেলারটি।

মূল প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগের সাথে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রেখে এন্টি টর্ক প্রপেলারটিকেও ঘোরানো হয়। এতে হেলিকপ্টারের মূল দেহের ঘূর্ণন প্রবণতা দূর হয়। মূলত এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ নিয়ন্ত্রণ করে এ কাজটি করা হয়। হেলিকপ্টারটি যখন একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তখন মূল প্রপেলারের ঘূর্ণনের ফলে হেলিকপ্টারের মূল বডির ঘূর্ণন প্রবণতা রোধ করে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি।

পাইলটের যদি ডান দিকে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, তাহলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের গতি মূল প্রপেলারের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা গতি থেকে কিছুটা কমিয়ে দেবেন, এর ফলে এন্টি টর্ক প্রপেলারটি হেলিকপ্টারের বডির ঘূর্ণন প্রবণতা আর সম্পূর্ণ রোধ করতে পারবে না। ফলে হেলিকপ্টারটি ডান দিকে ঘুরে যাবে। আবার বামদিকে যাওয়ার প্রয়োজন হলে পাইলট এন্টি টর্ক প্রপেলারের ঘূর্ণন বেগ মূল প্রপেলারের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাত বজায় রাখা বেগের থেকে একটু বাড়িয়ে দিবেন। এর ফলে হেলিকপ্টারটি বাম দিকে ঘুরে যাবে।

চিত্রঃ এন্টি টর্ক প্রপেলার

হেলিকপ্টারের উচ্চতা বাড়ানো কমানো নিয়ন্ত্রণ করা হয় এর মূল প্রপেলারের ব্লেডগুলোর কৌণিক অবস্থান বাড়িয়ে কমিয়ে। প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ালে একই পরিমাণ ঘূর্ণনে প্রপেলার বেশি পরিমাণে লিফট তৈরি করে। তাই উচ্চতা বাড়ানোর প্রয়োজন হলে প্রপেলার ব্লেডের কৌণিক অবস্থান বাড়ানো হয়। পাশাপাশি মূল ইঞ্জিনের গতিও বাড়ানো হয়। ফলে বেশি পরিমাণ লিফট অর্থাৎ ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি হয় এবং হেলিকপ্টারের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একইভাবে উচ্চতা কমানোর প্রয়োজন হলে ব্লেডের কৌণিক অবস্থান কমানোর পাশাপাশি ইঞ্জিনের পাওয়ার কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে লিফটের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং হেলিকপ্টার ক্রমেই উচ্চতা হারায়।

তথ্যসূত্রঃ

১. উড়োজাহাজ কেমন করে উড়ে- এ কে এম আতাউল হক

২. Theory of Flight

৩. www.helis.com

featured image: sandiegouniontribune.com

“হাল ছেড়ো না বন্ধু”- আইনস্টাইন যেভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন

ফেব্রুয়ারি ১১ তারিখ, যেদিন মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, অনেকের মতো আমিও এ বিষয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠি। মহাকর্ষ তরঙ্গ বলে একটা জিনিস যে আছে তা প্রায় একশ বছর আগে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলে গেছেন। আবদুল গাফফার রনির “থিওরি অব রিলেটিভিটি” (অন্বেষা, ২০১৬) বইটি পড়ে ফেলি। লেখক সাবলীল ভাষায় এ তত্ত্বটির মূল ধারণাগুলোর সহজবোধ্য বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি পদার্থবিজ্ঞানের বই হলেও বেশ উপভোগ্য, গাণিতিক সূত্রের ছড়াছড়ি নেই। এই জটিল বিষয়ে প্রাথমিক সাক্ষরতা লাভের জন্য বইটি বেশ চমৎকার।

আইনস্টাইন, যাকে বলা হয় বিজ্ঞানের পোস্টারবয়, বিজ্ঞানের রঙিন জগতের একজন তারকা, তিনি আরেকবার জিতলেন। তার তত্ত্বটিতে কী বলা হয়েছে, কিংবা মহাকর্ষ তরঙ্গ জিনিসটা আসলে কী- এসব বিষয় নিয়ে আমি কিছুই লিখবো না। কারণ বাংলা ভাষায় অনেকেই এ বিষয়গুলো নিয়ে খুব ভালো লিখছেন। আমার আগ্রহ হলো অন্য জায়গায়: আইনস্টাইন কীভাবে ‘আইনস্টাইন’ হয়ে উঠলেন, তার উপর।

আমরা যে শুনি, তিনি তৎকালীন নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের ভিত নড়িয়ে দিয়ে নতুন ধরনের পদার্থবিজ্ঞান চালু করেছেন- এরকম বিদ্রোহী কি একেবারে শুরু থেকেই ছিলেন? তিনি কাজ করতেন কীভাবে? তার কাছ থেকে তরুণরা কী শিখতে পারেন?

শৈশবের আইনস্টাইন; image source: biography.com

যে কোনো বড়সড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, কিংবা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে একটি প্রস্তুতির বিষয় থাকে। আমরা সেই বিরাট আবিষ্কার বা পরিবর্তন দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়ে যাই, ঘটনার নায়কের প্রচলিত জীর্ণ-নিয়ম ভেঙে ফেলা বিদ্রোহের সাফল্যে এতোটাই উদ্বেলিত হয়ে পড়ি যে, পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতির পরিশ্রমটা চোখেই পড়ে না। আর সে প্রস্তুতি যে প্রচলিত রীতিমাফিকই হয়ে থাকে, সে কথাটাও ভুলে যাই।

অনেক দিন আগে কাল নিউপোর্টের ব্লগে এ প্রসঙ্গে একটি লেখা পড়ি যেখানে তিনি আইনস্টাইনের প্রস্তুতির উপর আলো ফেলেছিলেন। সেখান থেকে একটা গল্প এখানে বলবো।

আইনস্টাইনের এই কাহিনীটা প্রায় সবাই শুনেছেন। গল্পটা এরকম-আইনস্টাইন শিক্ষাগত জীবনে বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেনগতানুগতিক পড়াশুনা তার ভালো লাগতো নাফলে পরীক্ষায় খারাপ নাম্বার পেতেনবিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষ হয়ে গেলোকিন্তু তখনকার শিক্ষায়তন তার প্রতিভা উপেক্ষা করে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে অস্বীকার করেফলে বেকার আইনস্টাইন অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা সর্বস্বান্ত হয়ে প্যাটেন্ট অফিসে ক্লার্ক হিসেবে নিচু পদের চাকরীতে যোগ দেন তবে চাকরী তার জন্য হিতেবিপরীত হয়ে দাঁড়ায়গতানুগতিক জ্ঞানচর্চার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সাহসী ও মৌলিক চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পানপরবর্তীতে চিন্তাভাবনা তাবৎ পৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানকে বদলে দেয়

তবে বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল ছিল আইনস্টাইন বিদ্রোহী ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি স্কুলে ও এন্ট্রান্স পরীক্ষায় গণিত ও পদার্থবিদ্যায় সব সময়েই উচ্চ নাম্বার পেতেন। কলেজের পর আইনস্টাইনকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। তবে অধ্যাপনার আবেদন করায় তাকে সেখানে নেয়া হয়নি- ঘটনা এমন নয়। তিনি গ্রাজুয়েশনের পর ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ পদে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু পাননি।

ইউনিভার্সিটি এসিস্টেন্টশিপ মূলতঃ গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীর ডক্টরাল গবেষণা চালানোর সময় জীবিকা নির্বাহের আর্থিক উৎস হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাজুয়েট শিক্ষার ক্ষেত্রে যাকে বলা হয় গবেষণা সহযোগী বা রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট।

এমন না আইনস্টাইনের প্রতিভা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। বরং আইনস্টাইন ‘অসামান্য প্রতিভার ছাপ’ রাখার মতো কোনো কাজই তখনো করেননি, তার কর্মজীবনের মাত্র শুরু তখন। গ্রাজুয়েশনের পর কৈশিক প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি যে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন সেটাও ছিল মাঝামাঝি মানের। বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগী হিসেবে কাজ না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল একজন অধ্যাপকের নেতিবাচক সুপারিশ; যিনি আবার আইনস্টাইনকে পছন্দ করতেন না।

এই গল্পে যে কথা অনুপস্থিত তা হলো প্যাটেন্ট অফিসের ক্লার্ক থাকা অবস্থাতেও আইনস্টাইন তার ডক্টরাল ডিগ্রির জন্য গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার একজন উপদেষ্টাও ছিলেন। ডক্টরাল-উপদেষ্টার সাথে আইনস্টাইন নিয়মিত একটি পাঠচক্রে দেখা করতেন, লেখালেখিও করতেন একে অপরকে (ছবি দ্রষ্টব্য)।

যে বছর আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন (১৯০৫), এই বছরেও তিনি অভিসন্দর্ভ জমা দেন এবং PhD ডিগ্রী পেয়ে যান। এর পরেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য সুযোগ পেয়ে যান ও তার একাডেমিক কর্মজীবন শুরু হয়।

অন্যভাবে বলা যায়, আইনস্টাইনকে পিএইচডি গবেষণা চালানোর পাশাপাশি একটা চাকরী করতে হতো জীবিকা নির্বাহের জন্য। পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি চাকরী করা খুবই ঝামেলার একটা ব্যাপার এবং গবেষকের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তবুও আইনস্টাইনের স্নাতক পড়াশুনা থেকে শুরু করে অধ্যাপনার কাজে নিয়োগ হওয়ার সময়টা মোটামুটি রীতিমাফিক পথ ও প্রতিষ্ঠিত সময়সীমা ধরেই চলেছে।

এই গল্প বলার পেছনে কারণ হলো এখান থেকে আমাদের একটা (বদ)অভ্যাস ধরা পড়ে, আমরা উদ্ভাবক-আবিষ্কারকদের আগন্তুক হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। আগন্তুক, কারণ তারা প্রথাকেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানের বাঁধন ছিড়ে মুক্ত মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন, পৃথিবীকে বদলে দেন। আগন্তুক, কারণ তারা প্রচলিত নিয়ম ভাঙেন, অনেকটা হঠাৎ করেই নতুন কিছু তৈরি করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বৈপ্লবিক আবিষ্কার বা ভিন্ন ধর্মী কাজ করতে হলে এর আগে রীতিমাফিক প্রশিক্ষণ বা তালিমের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে আসতে হয়।

আইনস্টাইন মেধাবী ও মৌলিক চিন্তার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ গ্রাজুয়েট শিক্ষা সম্পূর্ণ করার আগ পর্যন্ত তিনি যথেষ্ট পদার্থবিজ্ঞান জানতেন না; পদার্থবিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নেয়া ছিল আরো পরের ব্যাপার। অন্যান্য আবিষ্কারকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্টিভ জবস প্রথমে অ্যাপল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে বের হয়ে আসেন, দশ বছর অন্যান্য ব্যবসা করে আবার অ্যাপলে ফিরেন।

দ্বিতীয়বার অ্যাপলে ফিরে আসা ছিল তার ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়ার ঘটনা- এর পর থেকে তিনি সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠতে থাকেন। কারণ মাঝখানের দশ বছর তিনি কঠিন সময় পার করেছেন ব্যবসা বিষয়ে ওস্তাদ হতে, দরকারি বিভিন্ন দক্ষতা শানিয়ে নিতে। এ দীর্ঘ সময় রূঢ় বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে তৈরি করার পরেই কেবল অ্যাপল-২ তে তার মেধা প্রযুক্তির বাজার বদলে দেয়ার একটি ক্ষেত্র পায়।

আইনস্টাইন প্রথমেই বিপ্লবী বিজ্ঞানী হিসেবে আবির্ভূত হননি। তাকে নিজেকে তৈরি করে নিতে হয়েছে, স্নাতকের পর পিএইচডি করতে হয়েছে প্রচলিত রীতি অনুসারেই। যে কোনো যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে এটা তিক্ত সত্য। আমরা যদি অন্যান্যদের পৃথিবী বদলানোর জন্য উৎসাহিত করতে চাই, প্রথমে তাদেরকে ভেতর থেকে ভিত শক্ত করার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে।

এক্ষেত্রে সবচাইতে কৌশলের জায়গা হলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা, রীতি বা ঐতিহ্যমতো প্রশিক্ষণ বা তালিম নিয়ে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি নিজের মধ্যে ভিন্নভাবে ভাবার স্ফুলিঙ্গ বাঁচিয়ে রাখা। নতুন কিছু করা, নতুনভাবে চারপাশকে দেখার ইচ্ছেটা একটি দীর্ঘ সময় ধরে জিইয়ে রাখা, যতক্ষণ না সেই ভিন ধারার কাজটি করার জন্য ‘যথেষ্ট-ভালো’ একটি পর্যায়ে যাওয়া না যায়। কবীর সুমনের গানের কলি মনে পড়ে-

বন্ধু তোমার ভালোবাসার স্বপ্নটাকে রেখো,/ বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে জাপটে ধরে থেকো,

দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না,/ পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনো গেলো না,

…হাল ছেড়ো না…

featured image: nytimes.com