পৃথিবীর আদি রঙ ছিল গোলাপি

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে
প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে–

জীবনানন্দ দাশ সাগরের নীলে প্রেম খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু জীবনানন্দ কেন, এমন শত কবি সহস্রবার যে নীলে উদাস হয়েছেন… সে নীলে আমরাও হারিয়েছি। আকাশ আর সাগরময় পৃথিবী নীল হয়েছে এ দুইয়ে। কিন্তু এই নীলই কি আদি রঙ? পুরোটা অতীত কি নীল পৃথিবীরই?

প্রাগৈতিহাসিক সাগরও কি নীল ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাচীন সাগর ছিল গোলাপী রঙের। সে হিসেবে গোলাপী হবে মানুষের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে আদি রঙ। নীল পৃথিবী আজ গোলাপি পৃথিবীর ভবিষ্যত।

গবেষকরা এই গোলাপি রঙের হদিস পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়, সাহারা মরুভূমিতে ব্যাকটেরিয়ায় ফসিলে। প্রাপ্ত ফসিল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার, মনে করা হচ্ছে এরা ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগের। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেঁচে থাকত। দীর্ঘসময় ধরে সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সাগরে সাগরে রাজত্ব করেছে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বরং শৈবালের থেকেও আদিম। বিবর্তনীয় ধারায় জীবনের বিকাশে সায়ানোব্যাকটেরিয়া আদি উৎসদের মধ্যে অন্যতম। বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যত বিবর্তনীয় ইতিহাস ধরে পিছনে যাওয়া যাবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কাছে পৌঁছে যেতে হবে। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে এবছরের ৯ই জুলাই।

এই অণুজীবদের গোলাপি হওয়ার পেছনের কারণ কী? অন্য রঙ না হয়ে গোলাপিই কেন হল। ফসিল অবস্থায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ক্লোরোফিলকে পাওয়া যাচ্ছে গাঢ় লাল এবং বেগুনি রঙে, অধিক ঘনমাত্রার দশায়। অর্থাৎ, যখন মাটি পানির সাথে মিশে এর ঘনমাত্রা কমে যাবে তখন এটি গোলাপি রঙ দিবে পানিতে। অর্থাৎ, উপসংহার টেনে বললে সাগরের ক্ষেত্রেও রঙের প্রভাব তাই হওয়ার কথা।

ক্লোরোফিল বলতেই সবুজ রঙ মাথায় খেলে যায়। কিন্তু ক্লোরোফিল আজকের জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অস্ত্র, আদিম পৃথিবীর প্রাণ এত উন্নত ছিল না, শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাও এতটা দক্ষ ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার পূর্বে ছিল বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব। অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণ তখনকার জন্য বহুদূরের গল্প, পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন সালফারময় পরিবেশে। এজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কাজ ছিল ইলেকট্রন আলাদা করে ফেলা। এদের ছিল বেগুনী কণিকা যা সবুজ আলো শোষণ করত এবং লাল ও নীল রঙের আলো ছেড়ে দিত।

৪,৪০০ গুণ বিবর্ধিত বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া। স্বাদু এবং নোনা উভয় জলাশয়েই এদের অস্তিত্ব ছিল; Image Credit: Dennis Kunkel /Science Photo Library

অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণে সায়ানোব্যাকটেরিয়া একেবারেই আদি, শুরুটা হয় বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার পরিত্যক্ত শক্তি ব্যবহার করে। বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার ত্যাগ করা লাল এবং বেগুনী রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তি কাজে লাগাত আদি সায়ানোব্যাকটেরিয়া। প্রাচীন ক্লোরোফিলের উপর ব্যাকটেরিয়ার ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

৬৫ কোটি বছরের ব্যবধানে যখন আমরা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা করছি, তাদের চেহারা একই রকম হওয়ার কথা নয়। ; Image Credit: River Dell High School | Slideplayer.com

এই প্রাচীন ক্লোরোফিল ধরা পড়ার জন্য উপযুক্ত ঘটনারও তো দরকার রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই নমুনা সম্ভবত কোনো কারণে দ্রুত সাগরগর্ভে চাপা পড়ে যায়। এজন্য অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশের দরকার ছিল। আর একবার চাপা পড়ার পর অণুজীবেরা একে ফসিলে পরিণত করেছে, ফলে এরা স্থবির হয়ে রয়ে গেছে তাদের চাপা পড়া স্থানেই।

 

— HowStuffWorks অবলম্বনে।

শূন্যে শাক-সবজি চাষ

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীগণ মহাশূন্যে তাদের জন্মানো সবজির স্বাদ পরীক্ষা করে দেখেছেন। সবজি জন্মানোর এ পদ্ধতিতে লেটুস জন্মানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কিছু বীজতলা, লাল, সবুজ ও নীল রঙের LED আর পানি। লাল আর নীল LED ব্যবহার করা হয়েছিল যেন তারা তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে বিচ্ছুরিত করতে পারে। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি সাধনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। সবুজ LED সেগুলোকে খাওয়ার জন্য আরো উপযোগী করে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

হয়তো একদিন মঙ্গলের দীর্ঘ অভিযানের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পুষ্টিকর ও দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যের উৎস তৈরি করা যাবে।

featured image: gossipsociety.com

শরতের পাতার রঙের রসায়ন

শরতের আগমনের সাথে সাথেই গাছের পাতার রঙের মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। এ বিচিত্রতা যদিও আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে চোখে পড়ে, কিন্তু এর মধ্যে যে রসায়নের খেলা চলে তা নিয়ে আমরা হয়তো খুব কমই মাথা ঘামাই।

পাতায় বিভিন্ন রঙ প্রদানকারী যৌগ সম্পর্কে জানার আগে করার আগে প্রাথমিক অবস্থায় এদের উৎপত্তি বিষয়ে জেনে নেই। এ উদ্দেশ্যে যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বন্ধনের উদ্ভব ঘটে। শরতের পাতার রঙ পরিবর্তনের পিছনে একক ও দ্বি-বন্ধনের মিশ্রিণ এবং কনজুগেশন বন্ধনেরও ভূমিকা আছে। কজুগেশন বন্ধনের কারণে পাতায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের দৃশ্যমান আলো শোষিত হতে পারে। চোখে আপতিত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ভিন্নতার কারণে পাতার রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়।

ক্লোরোফিল

পাতার সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল নামের উপাদানটি। পাতার কোষের ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকে এ ক্লোরোফিল, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ক্লোরোফিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক।

গ্রীষ্ম শেষ হবার সাথে সাথে যেহেতু উষ্ণতা ও সূর্যালোক উভয়ই প্রতিকূলে যেতে থাকে তাই তখন ক্লোরোফিল উৎপাদনের হারও কমতে থাকে। অন্যদিকে পাতার মাঝে সঞ্চিত ক্লোরোফিল বিয়োজিত হতে থাকে। এ অবস্থায় পাতার রঙ সবুজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আদি হলদেটে রূপ ধারণ করে।

ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড

রাসায়নিক যৌগের পরিবারের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড বিশাল স্থান দখল করে আছে। এরা লাল ও হলুদ রঙের জন্য দায়ী। ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্যাভিনয়েড ক্লোরোফিলের সাথে উপস্থিত থাকে। এমনকি এমনকি গ্রীষ্মেও। তবে গ্রীষ্মে ক্লোরোফিল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে বিধায় পাতার মাঝে এদের প্রভাব দেখা যায় না। ফলে পাতা সবুজ দেখায়।

তবে শরতের আগমনের সাথে সাথে আবার ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি প্রকট হতে থাকে ফলে হলুদ রঙের উদ্ভব ঘটে। এদের মাঝে ক্যারোটিনয়েড লাল আর ফ্যাভিনয়েড কমলা রঙের আবির্ভাব ঘটায়। শরত শেষ হবার সাথে সাথে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি কমতে থাকে।

ক্যারোটিনয়েডের আরো কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিন (গাজরে থাকে), লুটেইন (ডিমের কুসুমের হলুদ রঙের জন্য দায়ী), লাইকোপিন (টমেটোর টকটকে লাল রঙের জন্য দায়ী)।

অ্যান্থোসায়ানিন

ফ্যাভিনয়েড শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত অ্যান্থোসায়ানিন। কিন্তু ফ্যাভিনয়েডের মতো অ্যান্থোসায়ানিন সারা বছর জুড়ে পাতার মধ্যে থাকে না। বেলা নামার সাথে সাথে পাতার মাঝে অবশিষ্ট শর্করা সূর্যালোকের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন ঘটায়।

যদিও পাতার মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রকৃত ভূমিকা জানা যায়নি, ধারণা করা হয় অ্যান্থোসায়ানিন আলোক নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। অর্থাৎ পাতাকে অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। আর পাতাকে রঙ দানের ক্ষেত্রে অ্যান্থোসায়ানিন লাল, বেগুনি ও অন্যান্য মিশ্রিত রঙের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকে। পাতার রসের মধ্যে অম্লের উপস্থিতির কারণেও রঙের আবির্ভাবের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ কম্পাউন্ড কেমিস্ট্রি, http://www.compoundchem.com/2014/09/11/autumnleaves/

featured image: turningstar.com

দুধসহ চা, দুধ ছাড়া চা: বিজ্ঞান কোনটার পক্ষে?

চা। আমাদের অতি পছন্দের একটি পানীয়। পৃথিবীর ২০০ কোটির উপরে মানুষ চা পান করে থাকে। শুধু ব্রিটেনেই প্রতিদিন ১৬ কোটি ৫ লাখ কাপ চা পান করা হয়ে থাকে। যার অর্থ ব্রিটেনের প্রতিটি মানুষ দিনে গড়ে ৩ কাপ করে চা পান করে থাকে। কেউ চা খায় ঘুম তাড়াতে, কেউ চা খায় স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, কেউ চা খায় বন্ধুদের সঙ্গ দিতে আর কেউবা নিছকই অভ্যাসবশতই খেয়ে থাকে। চা পান অনেকে মানুষকে বিভিন্ন চিন্তা থেকেও দূরে রাখে। চা পানকারীদের মধ্যেও আছে নানা রকম বিভাজন। কেউ পছন্দ করে দুধ চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া রঙ চা খেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করে বেশি। কেউ গ্রীন টি বা, সবুজ চা আবার কেউ উলং চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ৪ ধরনের চা কিন্তু আসে একই গাছ থেকে। সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেসিস

কিন্তু কোন ধরণের চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি? দুধ চা নাকি রঙ চা? চলুন উত্তর খোঁজা যাক। কিন্তু সাধারণভাবে নয়, একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

রঙ চা বনাম দুধ চা; image source: medianp.net

চায়ের মাঝে অ্যান্টিওক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এছাড়াও চা পানকারীরা খুব সাধারণভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত থাকেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, চা পানকারীদের এসকল সুবিধা সম্পূর্ণরুপে বাতিল হয়ে যায় যদি তারা অধিকাংশ চা পানকারীদের মতো চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খান।  

চা কে অনেক আগে থেকেই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। চা যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, তেমনি আবার ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে। আবার দেহের বাড়তি মেদ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, দেহের কোষের সুরক্ষা প্রদানেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জার্মানীর এক দল গবেষকের ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে কয়েক বছর আগে  প্রকাশিত এক পেপারে দেখানো হয়েছে যে, চায়ে দুধের ব্যবহার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চায়ের যে উপকারিতা তার অনেকগুলোকেই নষ্ট করে দেয়।

চায়ে ক্যাটেচিন্স নামের এক ধরণের উপাদান থাকে। এই ক্যাটেচিন্সকেই চায়ের সেই উপাদান হিসেবে ধারণা করা হয় যা আমাদের হৃদপিন্ডকে সুরক্ষিত রাখে এবং আমাদের রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে চায়ের সাথে দুধ মেশালে এই প্রভাব কমে যেতে থাকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যারিটে হসপিটালের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার কাজটি পরিচালনা করেছেন।

রঙ চা; image source: lifehack.org

এই গবেষণা ১৬ জন সুস্থ মহিলার উপর পরিচালনা করা হয়। তাদেরকে আধা লিটার চা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া পান করতে দেয়া হয়েছিল। চা খাওয়ার পরে তাদের বাহুর মাঝ দিয়ে রক্ত চলাচল আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল।

রঙ চা খাওয়ার পরে মহিলাদের রক্ত চলাচলের বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু এই উন্নতির কোনো লক্ষণ দুধ চায়ের মাঝে দেখা গেল না। এরপর গবেষকরা এক দল ইঁদুরের উপরও একই পরীক্ষা চালালেন। এক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করা গেল।

মূলত দুধে অবস্থান করা ক্যাসেইন্স নামের এক দল প্রোটিন চায়ের সাথে বিক্রিয়া করে এবং চায়ে থাকা ক্যাটেচিন্সের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও সকল বিজ্ঞানীরা এখনো এটা বিশ্বাস করেন না যে চায়ের সাথে দুধ মেশালে সেটি খুব বেশি পরিমাণে এই প্রভাবগুলো কমিয়ে দেয়।

দুধ চা; image source: Healthmania.org

তবে এই ফলাফলের ঠিক বিপরীত ফলাফলও আছে। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডে একদল বিজ্ঞানী ১২ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা চালান। দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চা পান করার পর তাদের দেহের ক্যাটেচিন্সের (যে উপাদানের কারণে দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি দেখা যায়) পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তারা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চায়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য দেখলেন না। কিন্তু এই গবেষণা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি গবেষণা ছিল। এই গবেষণাটি মূলত ইউনিলিভার কোম্পানির অর্থায়নে হয়েছিল। চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইউনিলিভার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। লিপ্টন, পি জি টিপস তাদের চায়ের ব্র্যান্ড। গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের চাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বৈজ্ঞানিকগবেষণার কোনোভাবেই আদর্শ হতে পারে না।

২০১১ সালেও আরো একটি গবেষণায় উপরের ফলাফলের মতো আরো একটি ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এবারো এই গবেষণার অর্থায়নে ছিল ইউনিলিভার এবং শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ডের চাকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে হওয়া পৃথক ৩টি গবেষণার ৩টিই চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খাওয়ার চেয়ে রঙ চা খাওয়াকে বেশি উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে এরপরও যদি কেউ একান্তই দুধ ছাড়া চা না খেতে পারে তবে সে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন। সয়া দুধে লেসিথিন রয়েছে, যার আণবিক গঠন ক্যাসেইন্সের চেয়ে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। এই লেসিথিনের ক্যাটেচিনের সাথে বিক্রিয়া করার সম্ভাবনা ক্যাসেইন্সের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই এক্ষেত্রে দুধ চা পানকারীদের ভালো বিকল্প হতে পারে সয়া দুধ।

যদিও এটা সত্য যে, খাবারের কাছে এসে এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বা, বাঁধা নিষেধ মেনে চলা বেশ কঠিন একটা কাজ। আমাদের স্বাদের অনুভবের কাছে বিজ্ঞানের এসব নির্দেশনা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে বিজ্ঞানের নির্দেশ অমান্য করলেও যে চলে না। এরপর থেকে চায়ে দুধ মেশানোর আগে আরেকটিবার ভাববেন কি? অন্তত নিজের জন্য?

ফিচারড ইমেজঃ medianp.net

আপনার ‘মল’ আপনাকে কী বলছে শুনেছেন কি?

চলুন, আজকে আপনার ‘ইয়ে’র সম্পর্কে কিছু জেনে নেয়া যাক। প্রতিদিন কম করে হলেও একবার ‘ইয়ে’র সাথে আপনার দেখা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো বেশির ভাগ মানুষই তার ‘ইয়ে’কে ভালো মতো দেখে না। আর দেখবেই বা কেন? ‘ইয়ে’ তো আর অনন্য সুন্দর কিছু না যে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে হবে। ‘ইয়ে’ হলো স্টুল (Stool), শুদ্ধ বাংলা ভাষায় যাকে বলে ‘মল’।

দেখতে খারাপ হলেও এ স্টুলই আপনাকে জানিয়ে দিতে পারে আপনার শরীরের কলকব্জার কোনোটি বিদ্রোহ করল কিনা। শরীরের অবস্থা সম্পর্কে জানার শর্টকাট উপায়। কীভাবে বুঝবেন? খুব সোজা, স্টুলেও কালার দেখে বোঝা যায় ঠিক কোথায় সমস্যা হচ্ছে। তাই বলে একগাদা লাল শাক খেয়ে ভাববেন না, ‘ইয়া আল্লাহ, লাল স্টুল! আমি তো গেছি।’ এ লেখায় আপনি দুটো জিনিস শিখতে পারবেন- (১) স্টুলের বিভিন্ন রঙ দিয়ে আসলে কী বুঝায় এবং (২) স্টুল ত্যাগ করার সঠিক পজিশন কী।

রঙ বেরঙ এর দুনিয়া

হালকা বাদামিঃ দারুণ! আপনি সুস্থ আছেন। অধিকাংশ মানুষের ধারণা স্টুলের স্বাভাবিক রঙ বুঝি হলুদ। এটা একেবারেই ভুল ধারণা। স্টুলের স্বাভাবিক রঙ হালকা বাদামি। আর এ রংয়ের জন্য দায়ী বিলিরুবিন। স্বাভাবিক স্টুলে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ হয় না।

সবুজঃ এটা একইসাথে দুটো জিনিস বোঝাচ্ছে। হয় আপনি খুব বেশি পরিমাণে সবুজ শাক সবজি খাচ্ছেন যার কারণে বাদামি স্টুল হয়ে গেছে সবুজ, অথবা যদি শাক সবজি খাওয়া ছাড়াই স্টুল সবুজ হয় তাহলে বুঝতে হবে শরীরে কোথাও গড়বড় আছে। আপনি যে খাবার খাচ্ছেন সেটা ঠিকমতো পরিপাক হচ্ছে না। যা খাচ্ছেন সেটি খুব দ্রুত স্টুলে পরিণত হচ্ছে।

image source: mamanatural.com

যেমন ধরুন, কোনো খাবার খেয়ে ঠিকমতো পরিপাক হয়ে স্টুল হতে সময় লাগে ২ মিনিট যার ভেতর ১ মিনিট সে থাকে বৃহদান্ত্রে। কোনো কারণে যদি অন্ত্র তাকে ১ মিনিট ধরে রাখতে অস্বীকার করে এবং পরের ধাপে পাঠিয়ে দেয় তাহলেই আপনার স্টুল হয়ে যাবে সবুজ। জিনিসটা খুব একটা ভালো না, কারণ আমাদের বেশির ভাগ পুষ্টি এ স্তরে শোষিত হয়।

হলুদঃ কখনো খেয়াল করেছেন কিনা, এ ধরনের হলুদ স্টুলে বাজে গন্ধ বেশি হয়! যারা মোটাসোটা, তাদের দেহে অধিক পরিমাণ চর্বি জমে আছে। সাধারণত তাদের স্টুল হলুদ হবার প্রবণতা থাকে। আর এ বিচ্ছিরি রকমের হলুদ স্টুল দিয়ে বোঝায়, আপনার শরীরে চর্বির শোষণে গোলমাল হয়েছে। জন্ডিস হলেও স্টুল ক্যাটকেটে হলুদ হয়ে যায়।

কালোঃ টানা কিছু দিন আঠালো কালো স্টুল হচ্ছে? এখনই ডাক্তারের কাছে দৌড় দিন। এ জিনিস খুব একটা ভালো না। কারণ কালো স্টুল ইঙ্গিত করে আলসার বা ক্যান্সারের কারণে আপনার পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে কিছু ড্রাগ,ভিটামিন সাপ্লিমেন্টও স্টুলের কালো রঙয়ের জন্য দায়ী।

সাদাঃ স্টুলের সাধারণ রঙের জন্য যে দায়ী উপাদান বিলিরুবিন ঠিকমতো খাবারের সাথে মিশতে পারছে না। সাদা রংয়ের স্টুল দিয়ে বোঝায়, বিলিরুবিন আসার জন্য যে নালীকা আছে সেটায় কোনো বাধার সৃষ্টি হয়েছে। তাই বেশ কিছুদিন সাদাটে ধূসর কিংবা সাদা স্টুল দেখলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান।

লাল/উজ্জ্বল লালঃ কালো স্টুলের মতো আরেকটি বাজে ও বিপজ্জনক স্টুলের রঙ হলো লাল। এর মানে হলো আপনার পায়ুপথ বা পরিপাকতন্ত্রের কোথাও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যদি কখনো দেখেন স্টুল লাল দেখাচ্ছে বা স্টুলের সাথে রক্ত যাচ্ছে, তাহলে এক মিনিটও দেরি না করে সাথে সাথেই ডাক্তারের কাছে চলে যাবেন।
ত্যাগ

রংয়ের ব্যাপার তো গেলো। এবার আসি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে কীভাবে মল ত্যাগ করবেন সেই আলোচনায়। প্রশ্ন করতে পারেন ‘আরে, এটা আর এমন কী ব্যাপার?’ সত্যি কথা হচ্ছে, এটা আসলে অনেক কিছু। কমোড আমাদের দেশে দুই ধরনের হয়ে থাকে, নিচু কমোড ও হাই কমোড।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ নিচু কমোডেই অভ্যস্ত। তাদের নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই, কারণ এভাবে বসার পজিশনই সবচেয়ে ভালো। কিছুটা পা ভাঁজ করে বসার ফলে যে কোণ তৈরি হয় সেটি মলনালী থেকে স্টুল বের হবার জন্য আদর্শ। কিন্তু যারা হাই কমোডে বসে মল ত্যাগ করতে পছন্দ করেন তারা এবার একটু চোখ ফেরান।

হাই কমোডে বসে মল ত্যাগ করা অনেকটা চেয়ারে বসে থাকার মতো। কেউ যখন চেয়ারে বসে থাকে তখন পায়ুপথের স্ফিংটারগুলো একটি বাকানো লুপ তৈরি করে যা পায়ু ছিদ্রকে ওপরের দিকে চাপ দেয়। সোজা ভাষায় স্টুলটিকে রেকটামের ভেতরে সুন্দর করে ধরে রাখে।

কেউ মল ত্যাগ করছে কিন্তু তার স্ফিংটার যতটুকু রিল্যাক্স হবার দরকার ছিল ঠিক ততটুকু হতে পারছে না। এ পজিশন ঠিক স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ মল বের হবার জন্য যতটুকু জায়গা দরকার ততটুকু পাচ্ছে না।

যারা অসুস্থ, নিচু কমোডে বসতে সমস্যা তাদের বেলায় তাহলে কী হবে? একটা উপায় আছে। মল ত্যাগের সময় পায়ের নিচে উঁচু কিছু দিয়ে রাখতে পারেন। এতে বসার পজিশন ঠিক সেভাবেই থাকবে যেটা মল ত্যাগের জন্য সবচেয়ে ভালো।

সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানেই শেষ করছি।

featured image: factinate.com